রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬

জ্বালানি তেলের সংকট: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে এক গভীর অন্ধকার

—-------------------------- মুহাম্মদ আবুল হুসাইন —------------------------------ দেশের অর্থনীতির স্পন্দন অনেকাংশেই নির্ভর করে জ্বালানি তেলের ওপর। পরিবহন, কৃষি, শিল্প—সবখানেই এর প্রভাব সরাসরি। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের বাজারে যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত কারসাজি, অবৈধ মজুত এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অদৃশ্য হাত। জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে ধরনের সংকট বারবার তৈরি হচ্ছে, তা কেবল সরবরাহ ঘাটতির স্বাভাবিক ফল নয়—বরং এটি একটি কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। এই দুর্বলতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি বড় অনুপস্থিতি: স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা। যেখানে এই দুটি উপাদান দুর্বল হয়, সেখানে সিন্ডিকেট শক্তিশালী হয়, বাজার অস্থিতিশীল হয়, আর সাধারণ মানুষ হয়ে পড়ে অসহায় দর্শক। সাধারণ হিসাব বলছে, বাংলাদেশে অন্তত দুই মাসের জ্বালানি তেল মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতা ও তথ্যও সেই কথাই বলে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য চাপ বা ‘হরমুজ প্রণালী’ ঘিরে অনিশ্চয়তার খবর ছড়াতেই এক মাসের মধ্যেই দেশে সংকটের আভাস তৈরি হচ্ছে। এই অস্বাভাবিক দ্রুততার ব্যাখ্যা কী? এখানেই সামনে আসে “কৃত্রিম সংকট” তৈরির অভিযোগ। অর্থাৎ, বাস্তবে তেলের ঘাটতি না থাকলেও বাজারে সরবরাহ কমিয়ে একটি ভীতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়, আর সাধারণ মানুষ হয়ে পড়ে জিম্মি। সংকটের প্রকৃত চেহারা: তথ্যের অস্বচ্ছতা জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তথ্যের অস্বচ্ছতা। দেশে ঠিক কত পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুত আছে, প্রতিদিন কত সরবরাহ হচ্ছে, কোথায় কত যাচ্ছে—এসব তথ্য সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, অনেক সময় নীতিনির্ধারকরাও পরিষ্কারভাবে জানেন না। এই অস্বচ্ছতাই তৈরি করে গুজবের বাজার। আর গুজবই সিন্ডিকেটের প্রধান হাতিয়ার। যখন মানুষ শুনতে পায় “তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে”, তখন তারা অতিরিক্ত কিনতে শুরু করে। এই চাহিদার চাপই কৃত্রিম সংকটকে বাস্তব সংকটে পরিণত করে। অবৈধ মজুত: লোভের সংগঠিত রূপ জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া। এর পেছনে মূলত দুটি উদ্দেশ্য কাজ করে— প্রথমত, অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন। বাজারে সংকটের গুজব ছড়িয়ে বা সরবরাহ কমিয়ে তেল আড়াল করা হয়, পরে তা বেশি দামে বিক্রি করা হয়। দ্বিতীয়ত, বাজারকে অস্থিতিশীল করা। যখন সরবরাহ হঠাৎ কমে যায়, তখন পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষি পর্যন্ত সব খাতে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই আতঙ্কই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। মজুত বনাম সংকট: দ্বন্দ্বের ব্যাখ্যা কোথায়? সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে অন্তত দুই মাসের জ্বালানি তেল মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে—কেন আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতা দেখা দিলেই দেশে সংকট তৈরি হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, সমস্যা সরবরাহে নয়, বরং ব্যবস্থাপনায়। তেল হয়তো আছে, কিন্তু তা সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে না। কোথাও তা আটকে যাচ্ছে, কোথাও ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হচ্ছে। এখানেই স্বচ্ছতার অভাব ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কারণ, যদি প্রতিটি স্তরে তথ্য উন্মুক্ত থাকত, তাহলে এই ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এত সহজ হতো না। সিন্ডিকেটের শক্তি কোথায়? সিন্ডিকেট কোনো দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক। বড় ব্যবসায়ী, পরিবেশক, কিছু অসাধু কর্মকর্তা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এই অদৃশ্য শক্তি। তাদের মূল শক্তি দুটি জায়গায়— প্রথমত, তথ্য নিয়ন্ত্রণ। দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিতার অভাব। যখন কেউ জানে না কোথায় কত তেল আছে, তখন সহজেই সরবরাহ কমিয়ে সংকট তৈরি করা যায়। আর যখন এই কাজের জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না, তখন সেই অপকর্ম চলতেই থাকে। জবাবদিহিতা: অনুপস্থিত একটি স্তম্ভ জ্বালানি খাতে কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সাধারণত নিচের স্তরের ডিলার বা খুচরা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু বড় কোম্পানি বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুবই কম। এই বৈষম্যই সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করে। কারণ, মূল হোতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর ছোটরা হয় বলির পাঁঠা। একটি কার্যকর জবাবদিহিতার কাঠামো না থাকলে কোনো খাতই সুস্থ থাকতে পারে না। জ্বালানি খাতও তার ব্যতিক্রম নয়। অভিযোগ উঠছে, এই মজুতদারি কেবল খুচরা ব্যবসায়ীদের কাজ নয়। বরং বড় বড় কোম্পানি এবং প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা ছাড়া এত বড় পরিসরে তেল গায়েব হয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এনসিপি নেতা ও সরকারি ক্রয় কমিটির সাবেক সদস্য আশিক মাহমুদ প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, সরকারের ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যক্তি ও করপোরেট গোষ্ঠী এই মজুতদারির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—সরকারি সংস্থার ভেতরে থাকা একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের কথাও উঠে এসেছে। এই সমন্বিত নেটওয়ার্কই আসলে “অদৃশ্য সিন্ডিকেট”, যারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, সংকট তৈরি করে এবং লাভের অঙ্ক বাড়ায়।অর্থনীতির ওপর অদৃশ্য চাপ জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট সরাসরি অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে, কিন্তু তার প্রভাব অনেক সময় চোখে পড়ে না। পরিবহন খরচ বাড়ে, ফলে পণ্যের দাম বাড়ে। কৃষক বেশি দামে ডিজেল কিনে উৎপাদন খরচ বাড়ায়। শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হয়। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ে, কিন্তু তার মূল কারণ অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি যেন একটি “অদৃশ্য কর”—যা সাধারণ মানুষকে দিতে হয়, কিন্তু যার হিসাব কোথাও লেখা থাকে না। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ঝুঁকি অবৈধ মজুত শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি বড় নিরাপত্তা ঝুঁকিও। শহরের ভেতরে, জনবহুল এলাকায় অনুমোদনহীনভাবে তেল সংরক্ষণ করা হচ্ছে—যা যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এই ঝুঁকির পেছনেও রয়েছে একই সমস্যা—নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং জবাবদিহিতার অভাব। কীভাবে ফিরবে স্বচ্ছতা? এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা। প্রথমত, জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করতে হবে। জনগণ জানুক—দেশে কত তেল আছে, কোথায় আছে, কীভাবে সরবরাহ হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সরবরাহ শৃঙ্খলকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে। প্রতিটি ডিপো, পরিবেশক ও পাম্পের তথ্য রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা গেলে কোনো অসঙ্গতি সহজেই ধরা পড়বে। তৃতীয়ত, স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে বড় কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম নিয়মিতভাবে যাচাই করা যায়। চতুর্থত, অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রভাবশালী হোক বা সাধারণ—আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমান হতে হবে। জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পথ জবাবদিহিতা কেবল শাস্তি নয়; এটি একটি সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে— অনিয়ম প্রমাণিত হলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনগণের কাছে জবাব দেওয়ার একটি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা। কারণ, এই খাতের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। জ্বালানি তেলের সংকটের পেছনে কেবল আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা বাজার নয়; আমাদের নিজেদের ব্যবস্থার দুর্বলতাও সমানভাবে দায়ী। যতদিন পর্যন্ত এই খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হবে এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন পর্যন্ত সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে না। প্রশ্নটা তাই এখন সরল—আমরা কি একটি অস্বচ্ছ, নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবস্থাকে মেনে নেব, নাকি একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর দিকে এগোব? এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, জ্বালানি খাত হবে জনগণের সেবক, নাকি কিছু প্রভাবশালীর মুনাফার যন্ত্র।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন