শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

আবার কি আসিলো ফিরে সেই অদ্ভুত আঁধার এক

আবার কি আসিলো ফিরে জীবনানন্দের সেই ‘অদ্ভুত আঁধার’;  নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো আকাশের বুক জুড়ে কোনো এক অচেনা বিষণ্নতা ঝুলে আছে আজ; শহরের ভাঙা রাস্তায় হাঁটে নীরব মানুষের ছায়া। ধানক্ষেতে আর শোনা যায় না রাখালের গান, বকুলের গন্ধে মেশে এক অদৃশ্য ক্লান্তি; দূরের নদীটি যেন ভুলে গেছে তার স্রোত— জলের ভেতর কেবল জমে আছে কালো নিঃশ্বাস। আমি কি তবে ফিরে এসেছি সেই চেনা পৃথিবীতে— যেখানে রোদ মানে কেবলই ছায়ার দীর্ঘশ্বাস, আর পাখিরা উড়ে যায় অজানা ভয়ের দিকে ডানার ভেতর লুকিয়ে রাখে রাতের অশ্রু? একদিন এই পথেই হেঁটেছিলাম একা, পায়ের তলায় মাটির ছিল উষ্ণ স্পন্দন; আজ  সেই মাটি যেন আবেগহীন নিথর শরীর মনে হয় কেউ সব স্বপ্ন তুলে নিয়ে গেছে গোপনে। তবু কি ফিরবো আবার, সেই নীল ধানের দেশে? যেখানে শিশির ভেজা ঘাসে লেগে থাকে জীবনের ঘ্রাণ, যেখানে অন্ধকারও ছিল মমতার মতো কোমল— ভয় নয়, ছিল শুধু নিঃশব্দ এক স্নেহের ছায়া।  হায়, আজ যেন এই আঁধার অন্যরকম; এখানে ফিরে আসা মানে হারিয়ে যাওয়া আরও গভীরে, এখানে প্রতিটি নিশ্বাসে জমে ওঠে অচেনা শূন্যতা। আবার কি আসিলো ফিরে সেই অদ্ভুত আঁধার এক অচেনা ভয়ে কেউ কথা বলে না  শুধু রাত বাড়ে, আর দূরে কোথাও একটি পাখি ডেকে ওঠে তার ডানায় লেগে থাকে অচেনা আঁধারের দাগ।

আবু লাহাবের পরিণাম

আবু লাহাব ছিল আল্লাহর রাসূল (সা)-এর আপন চাচা, কিন্তু তার অন্তর ছিল হিংসা ও শত্রুতায় পুড়ছিল। সে ছিল **হুযুরের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রতিবেশী**। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বাড়ির দরজায় ময়লা-আবর্জনা ও নাড়িভুঁড়ি ফেলে রাখা ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। শুধু তাই নয়, তার ইন্ধনে **তার স্ত্রী উম্মে জামিল** বুনো কাঁটা সংগ্রহ করে এনে রাতের অন্ধকারে আল্লাহর রাসূল (সা) যে পথ দিয়ে হাঁটতেন, সেখানে বিছিয়ে রাখত। কিন্তু এত কষ্টের মাঝেও রহমতুল্লিল আলামিনের ধৈর্যের কোনো কমতি ছিল না। দাওয়াতি কাজে আবু লাহাবের বৈরিতা ছিল সব সীমা ছাড়ানো। যখনই আল্লাহর রাসূল (সা) মক্কার বাজারে বা দূর থেকে আসা হাজীদের তাঁবুতে গিয়ে তাওহীদের দাওয়াত দিতেন, আবু লাহাব পেছন পেছন গিয়ে চিৎকার করে বলত, *"হে লোকসকল! ও তো উন্মাদ, ও মিথ্যাবাদী! তোমরা ওর কথা শুনো না।"* আপন চাচার মুখে এমন কথা শুনে আরবরা দ্বিধায় পড়ে যেত। তারা ভাবত, ঘরের মানুষই যখন মানছে না, তখন নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে। **ইসলামী দাওয়াতের কাজে তার এই বিরোধিতা এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল**, যা নবাগতদের মনে সন্দেহের বীজ বুনে দিত। আবু লাহাবের শত্রুতা শুধু মক্কার অলিতে-গলিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা আঘাত করেছিল রাসূল (সা)-এর পারিবারিক জীবনেও। আল্লাহর রাসূল (সা)-এর দুই কন্যা, হযরত রুকাইয়্যা (রা) ও হযরত উম্মে কুলসুম (রা)-এর বিয়ে হয়েছিল আবু লাহাবের দুই ছেলে উতবা ও উতাইবার সাথে। ইসলাম প্রচার শুরু হতেই আবু লাহাব চরম ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং **তার কন্যাদের তালাক দিতে নিজের পুত্রদের বাধ্য করে**। সে বলেছিল, *"মুহাম্মদের কন্যাদের বিদায় না করলে তোমাদের সাথে আমার সম্পর্ক শেষ।"* তার নিষ্ঠুরতা এখানেই থেমে থাকেনি। যখন আল্লাহর রাসূল (সা)-এর শিশুপুত্র কাসেম ও আবদুল্লাহ একে একে ইন্তেকাল করেন, তখন পুরো মক্কা যখন স্তব্ধ, আবু লাহাব তখন আনন্দে মেতে ওঠে। **নবী পুত্রের মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ করে** সে মক্কার কাফেরদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে, *"মুহাম্মদ তো নির্বংশ (আবতার) হয়ে গেছে! তার নাম নেওয়ার আর কেউ রইল না।"* এমনকি যখন গোটা কুরাইশ বংশ বনু হাশিমকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করে **'শিয়াবে আবি তালেব' নামক গিরিসঙ্কটে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল**, তখনো আবু লাহাবের রক্ত চাঙ্গা হয়ে ওঠেনি। ক্ষুধার তাড়নায় যখন অবরুদ্ধ শিশুরা গাছের পাতা চিবিয়ে কাঁদছিল, তখন আবু লাহাব মক্কার বাজারে গিয়ে ব্যবসায়ীদের বলত, *"তোমরা খাবারের দাম এত বাড়িয়ে দাও যেন মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীরা তা কিনতে না পারে। তোমাদের যা ক্ষতি হবে, তা আমি পুষিয়ে দেব।"* আপন গোত্রের এই চরম বিপদে সে কাফেরদের সাথে হাত মিলিয়েছিল। ### ঐশ্বরিক ঘোষণা ও অবমাননাকর পরিণতি আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর এই সীমাহীন অত্যাচারের জবাব স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অবতীর্ণ করলেন। সূরা লাহাব (আল-মাসাদ) নাজিল হলো: > *"আবু লাহাবের হাত ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও... শীঘ্রই সে প্রবেশ করবে লেলিহান আগুনে এবং তার স্ত্রীও—যে লাকড়ি বহনকারী, তার গলায় থাকবে খেজুর পাতার পাকানো রশি।"* > এই সূরা নাজিল হওয়ার পর আবু লাহাবের অহংকার আরও বেড়ে যায়, কিন্তু আল্লাহর বাণী তো অমোঘ। বদর যুদ্ধের সময় আবু লাহাব নিজে যুদ্ধে না গিয়ে তার পরিবর্তে অন্য একজনকে পাঠায়। কিন্তু বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের শোচনীয় পরাজয় এবং আবু জাহেলসহ মক্কার বড় বড় নেতাদের মৃত্যুর খবর যখন মক্কায় পৌঁছাল, আবু লাহাবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ঠিক তার পরপরই আবু লাহাব এক মারাত্মক ও সংক্রামক চর্মরোগে (عدسة - এক ধরণের প্লেগ বা গুটিবসন্তের মতো রোগ) আক্রান্ত হলো। তার পুরো শরীর পচতে শুরু করল এবং গা থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হতে লাগল। রোগটি ছড়ানোর ভয়ে তার নিজের সন্তান ও পরিবারের লোকেরাও তাকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করল। মক্কার এক কোণে একাকী, ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে অত্যন্ত পৈশাচিক ও অবমাননাকরভাবে তার মৃত্যু হলো। তার মৃত্যুর পর তিন দিন পর্যন্ত তার লাশ ঘরেই পড়ে রইল, কেউ ছুঁতেও সাহস পেল না। তীব্র দুর্গন্ধে যখন পুরো এলাকা অতিষ্ঠ হয়ে উঠল, তখন লোকলজ্জার ভয়ে তার ছেলেরা কিছু হাবশী গোলাম ভাড়া করল। তারা দূর থেকে লাঠি দিয়ে ঠেলে ঠেলে আবু লাহাবের লাশটিকে একটি গর্তে ফেলল এবং দূর থেকে পাথর ছুড়ে ছুড়ে লাশটি মাটি ও পাথরের নিচে চাপা দিল। ### উপসংহার যে আবু লাহাব নিজেকে মক্কার প্রভাবশালী ও সম্পদশালী ভাবত, যার অহংকারে আল্লাহর জমিন কেঁপে উঠত, দুনিয়াতেই তার পরিণতি হয়েছিল চরম অসম্মানজনক ও ঘৃণ্য। আর তার স্ত্রী উম্মে জামিলও একদিন গলায় রশি পেঁচানো অবস্থায় পাহাড়ের পাথরে দম আটকে মারা যায়। আবু লাহাবের এই গল্প ইতিহাসের পাতায় চিরকাল এই সাক্ষ্যই দেয় যে—সত্যের আলো নেভানোর চেষ্টা যারাই করবে, ক্ষমতা বা বংশমর্যাদা তাদের বাঁচাতে পারবে না; বরং তাদের কপালে জুটবে দুনিয়া ও আখিরাতের চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা।

রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

দারুল আরকামের প্রদীপ

সাফা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মক্কার অন্ধকার রাতটি আজ অন্যরকম শান্ত। মূর্তিপূজা, অন্যায় আর কুসংস্কারে নিমজ্জিত মক্কার বুকে তখন এক নতুন ভোরের প্রস্তুতি চলছে অত্যন্ত গোপনে। পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত তরুণ আরকামের বাড়ি—**'দারুল আরকাম'**। চারিদিকে নিস্তব্ধতা। মক্কার কুরাইশ নেতারা যখন মদের আসরে কিংবা কাবা ঘরের সামনে আড্ডায় মত্ত, তখন এই ছোট ঘরটিতে প্রদীপ জ্বলছে। ঘরের ভেতরে কয়েকজন মানুষ গোল হয়ে বসে আছেন। তাঁদের চোখ-মুখ থেকে এক অপার্থিব নূর ঝরে পড়ছে। তাঁদের সামনে বসে আছেন মানবতার মুক্তির দূত, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি পরম মমতায় তিলাওয়াত করছেন নতুন নাজিল হওয়া আল্লাহর বাণী। এই যে আজ মক্কার বুকে গোপনে আল্লাহর দ্বীনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হচ্ছে, এর পেছনে রয়েছে দুটি অনন্য বিশ্বাসের গল্প। দুটি এমন হৃদয়, যারা কোনো অলৌকিক মোজেজা দেখার আগেই শুধু ‘চরিত্রের সত্যতা’ দেখে ইসলামের আলোয় নিজেদের সঁপে দিয়েছিলেন। ## প্রথম প্রদীপ: হযরত খাদিজা (রা.)-এর অটুট বিশ্বাস গল্পের শুরুটা আরও তিন বছর আগের এক থমথমে রাতের। জাবালে নূরের হেরা গুহা থেকে যখন এক কাঁপানো শরীর আর ব্যাকুল হৃদয় নিয়ে আল্লাহর রাসুল ঘরে ফিরলেন, তখন মক্কার সেই অভিজাত বাড়িতে এক অভাবনীয় দৃশ্য তৈরি হয়েছিল। প্রচণ্ড ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নবীজি বললেন, *"আমাকে কম্বল দিয়ে আবৃত করো, খাদিজা! আমার জীবনের আশঙ্কা হচ্ছে।"* হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন তাঁর দীর্ঘ ১৫ বছরের সুখ-দুঃখের সাথি। তিনি স্বামীকে খুব কাছ থেকে চিনেছিলেন। তিনি জানতেন, তাঁর স্বামী কোনো সাধারণ মানুষ নন। বিয়ের আগে যখন নবীজি তাঁর ব্যবসায়ের কাফেলা নিয়ে সিরিয়া গিয়েছিলেন, তখন দাস মাইসারা এসে অলৌকিক মেঘের ছায়া দেওয়ার গল্প শুনিয়েছিল। সিরিয়ার পাদ্রী নাসতুরা স্পষ্ট বলেছিল, *"ইনিই শেষ নবী।"* এছাড়া খাদিজার চাতাতো ভাই, তাওরাত-ইঞ্জিলের পণ্ডিত ওরাকা বিন নওফেলও বারবার এমন একজন নবীর আগমনের আভাস দিয়েছিলেন। তাই স্বামী যখন হেরা গুহার কাঁপানো অভিজ্ঞতা শোনালেন, খাদিজা (রা.) বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলেন না। তিনি স্বামীকে জড়িয়ে ধরে পরম মমতায় বললেন: > *"কখনোই নয়! আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনোই লাঞ্ছিত করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখেন, অসহায়-দরিদ্রদের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বদের উপার্জন করে দেন, মেহমানদারী করেন এবং হকের পথে আপতিত বিপদে মানুষকে সাহায্য করেন।"* > যিনি মানুষের সাথে জীবনে কোনোদিন একটাও মিথ্যা বলেননি, সৃষ্টিকর্তা তাঁকে কখনো একা ছেড়ে দিতে পারেন না—এই অকাট্য বিশ্বাস থেকে খাদিজা (রা.) তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করলেন। তিনি শুধু প্রথম মুসলিমই হলেন না, বরং নিজের সমস্ত সম্পদ আর সামাজিক মর্যাদা দিয়ে ইসলামের প্রথম ও শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হলেন। ## দ্বিতীয় প্রদীপ: বন্ধু আবু বকরের তাৎক্ষণিক সাড়া খাদিজা (রা.)-এর পর যার নাম আসে, তিনি হযরত আবু বকর (রা.)। নবীজির বাল্যকালের বন্ধু, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং সুখ-দুঃখের ছায়াসঙ্গী। আবু বকর (রা.) মক্কার অন্য দশটা মানুষের মতো ছিলেন না। তিনি মূর্তিপূজাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন, কখনো মদের পাত্র ছুঁয়েও দেখেননি। তিনি মনে মনে একজন সত্যের দিশারীর খোঁজ করছিলেন। কিছুদিন আগেই তিনি ইয়ামেন সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে এক বৃদ্ধ কিতাবধারী পাদ্রী তাঁর চেহারা ও বংশের পরিচয় পেয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, *"মক্কায় খুব শীঘ্রই একজন নবী আসবেন, আর তুমি হবে তাঁর প্রধান উজির।"* মক্কায় ফিরে এসে তিনি লক্ষ্য করলেন, তাঁর প্রিয় বন্ধু মুহাম্মদ (সা.) মক্কার কোলাহল ছেড়ে হেরা গুহায় গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকছেন। আবু বকরের সূক্ষ্ম মন বুঝতে পেরেছিল, তাঁর বন্ধুর জীবনে মহান কিছু একটা ঘটতে চলেছে। নবুয়ত পাওয়ার পর একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু বকরের মুখোমুখি হলেন। নবীজি আল্লাহর একত্ববাদ আর নিজের নবুয়তের বার্তা তাঁর সামনে তুলে ধরলেন। সাধারণত মানুষ নতুন কোনো আদর্শের কথা শুনলে একটু ভাবার সময় নেয়। কিন্তু আবু বকরের মনে কোনো সংশয় ছিল না, কোনো প্রশ্ন ছিল না। তিনি জানতেন, মক্কার পুরো সমাজ যখন জাহেলিয়াত আর মিথ্যায় ডুবে ছিল, তখন এই একটি মানুষ ‘আল-আমিন’ বা পরম বিশ্বস্ত হিসেবে বেঁচে ছিলেন। যে মানুষ মানুষের সাথে ৪০ বছর মিথ্যা বলেনি, সে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলতে পারে না। নবীজির কথা শেষ হতে না হতেই আবু বকর (রা.) বলে উঠলেন, *"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর সত্য রাসুল।"* রাসুলুল্লাহ (সা.) পরবর্তীতে নিজেই বলেছিলেন, *"আমি যাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, তার মধ্যেই কিছু না কিছু দ্বিধা দেখেছি; একমাত্র আবু বকর ছাড়া।"* ইসলাম গ্রহণ করেই আবু বকর (রা.) শান্ত হয়ে বসে থাকেননি। তিনি তাঁর প্রভাবশালী বন্ধুদের কাছে গেলেন। কাফেরদের চোখে ধুলো দিয়ে অত্যন্ত সাবধানে দাওয়াত দিতে লাগলেন। তাঁরই হাত ধরে এই গোপন আলোয় আলোকিত হলেন উসমান বিন আফফান, আবদুর রহমান বিন আউফ আর সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসের মতো তরুণেরা, যারা পরবর্তীতে ইসলামের একেকটি স্তম্ভে পরিণত হয়েছিলেন। ## গিরিপথের গোপন ইবাদত ও দারুল আরকামের রাতগুলো প্রথম দুই বছর পার হয়ে তিনে পড়ল। মুসলিমদের সংখ্যা এখন প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি। মক্কার কাফেরদের চোখ এড়িয়ে সবাই এসে জড়ো হন দারুল আরকামে। সেখানে কোনো জাঁকজমক নেই, নেই কোনো পার্থিব লোভ। আছে শুধু একে অপরের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্য। সেখানে আরবের ধনী ব্যবসায়ী উসমান (রা.) বসে আছেন হাবশার কৃষ্ণকায় দাস বেলালের পাশে। কোনো ভেদাভেদ নেই, কোনো অহংকার নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের শেখাচ্ছেন কীভাবে ধৈর্য ধরতে হয়, কীভাবে গোপনে রাতের আঁধারে আল্লাহর সামনে চোখের জল ফেলতে হয়। একদিন রাতের শেষ প্রহরে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের দৃঢ়চেতা মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন: > *"তোমরা ধৈর্য ধরো। আল্লাহর কসম, এই দ্বীন পূর্ণতা পাবেই। এমন একদিন আসবে যখন একজন আরোহী সান'আ থেকে হাদরামাউত পর্যন্ত একা ভ্রমণ করবে, অথচ আল্লাহ ছাড়া সে কাউকেই ভয় পাবে না।"* > সাহাবিদের চোখে তখন অশ্রু, কিন্তু হৃদয়ে এক অপরাজেয় বিশ্বাস। খাদিজা (রা.)-এর ত্যাগ আর আবু বকর (রা.)-এর নিখাদ বিশ্বাসে গড়া সেই কাফেলা জানত, মক্কার এই অন্ধকার কেটে যাবে। ## বর্তমান উম্মাহর জন্য প্রেরণা আজকের পৃথিবীতে যখন মুসলিম উম্মাহ নানা সংকটে জর্জরত, তখন নবুয়তের প্রথম তিন বছরের এই গোপন দাওয়াত, হযরত খাদিজা ও আবু বকর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ আমাদের জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। * **চরিত্রই ইসলামের সবচেয়ে বড় দাওয়াত:** নবীজির সত্যবাদী চরিত্র দেখেই খাদিজা ও আবু বকর (রা.) ইসলাম এনেছিলেন। আজ আমাদেরও সমাজে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরতে হলে সবার আগে নিজেদের চরিত্রকে নিষ্কলঙ্ক করতে হবে। * **সংখ্যার চেয়ে ঈমানের জোর বড়:** সেদিনের সেই গুটি কয়েক মানুষ পুরো পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন, কারণ তাঁদের ঈমান ছিল পাহাড়ের চেয়েও দৃঢ়। আজ কোটি কোটি মুসলিমের মাঝে সেই একনিষ্ঠ ঈমানের বড় প্রয়োজন। * **দারুল আরকামের শিক্ষা জীবিত করা:** আমাদের পরিবার ও সমাজকে আজ একেকটি 'দারুল আরকাম' বানাতে হবে, যেখানে আমাদের সন্তানরা স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েও দ্বীন শিখবে এবং নিজেদের চরিত্রকে খাঁটি সোনার মতো গড়ে তুলবে। মক্কার সেই ৩ বছরের গোপন ত্যাগ আর এই মহান ব্যক্তিত্বদের আত্মনিবেদনই আজকের কোটি কোটি মুসলিমের ইবাদতের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। ভিত্তি যত গোপনে আর গভীরে রোপণ করা হয়, ঈমানের বৃক্ষ ততটাই বিশাল আর ফলদায়ক হয়—দারুল আরকামের রাতগুলো আমাদের এই শিক্ষাই দিয়ে যায়।

শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬

আকাশের কত রূপ!

স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শুরুর আগ থেকেই দেশের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বখতিয়ারের মনটা আনচান করছিল। সময় যেন আর কাটতেই চায় না। নচ্ছার পরীক্ষাটা কবে শেষ হবে আর কবে সে দাদীর কাছে যেতে পারবে, এই অস্থিরতার যেন শেষ নেই। আলীর অবস্থাও প্রায় একই। দাদী আর তুপ্পির জন্য তার ছোট্ট মনটাও কেমন যেন আকুলি-বিকুলি করে। সে বারবার আব্বুকে জিজ্ঞেস করে, “আব্বু, আমরা কবে দেশে যাব?” আব্বু যতই বলেন, “এই তো বাবা, পরীক্ষাটা আগে শেষ করো, তারপরই আমরা দেশে যাব”, ততই যেন তার ছেলেমানুষি অস্থিরতা বেড়ে যায়। দাদীর জন্য আর বিশেষ করে তুপ্পির জন্য দুই ভাইয়ের মনই কেবল ছটফট করে। এখানে বলে রাখা ভালো, আলী-বখতিয়ারের ‘তুপ্পি’ মানে তাদের ফুপু। ছোটবেলায় বখতিয়ার তার ফুপুকে ‘তুপ্পি’ বলে ডাকত। পরে তার দেখাদেখি আলীও সেই ডাক শুরু করে। এখন তারা অনেকটাই বড় হয়েছে, কিন্তু সেই আদুরে ডাকটি আর বদলাতে রাজি নয়। তাদের কাছে ‘তুপ্পি’ ডাকটাই সবচেয়ে আপন। আর তাদের ফুপু সায়মাও এই ডাক শুনে ভীষণ খুশি হন। ছোট্ট ভাইপোদের কচি মুখের সেই স্মৃতিমাখা ডাকটি তিনি ধরে রাখতে চান। তাই কেউ তাদের সংশোধন করতে গেলে তিনিও আপত্তি করেন। শহরের বৈচিত্র্যহীন নাগরিক জীবনে বন্দী থাকতে থাকতে বড়রাই হাঁপিয়ে ওঠে, সেখানে ওরা তো ছোট মানুষ! গ্রামের মেঠোপথ, খোলা মাঠ, প্রাণভরে দৌড়ঝাঁপ আর সতেজ বাতাসে নিশ্বাস নেওয়ার জন্য স্কুল বন্ধের এই সময়টাতে তারা অস্থির হয়ে ওঠে। তাই বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই তিন ভাইয়ের চলছিল বাড়ি যাওয়ার হিসাব-নিকাশ। পারলে যেন তখনই উড়াল দেয়! কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পরীক্ষা। বখতিয়ারের তো পরীক্ষার ওপর রীতিমতো রাগই হচ্ছিল। নচ্ছার পরীক্ষাটা যেন কিছুতেই শেষ হতে চায় না! আর আলীর কাছে এটি ছিল একপ্রকার গায়ের জ্বরের মতো। যত দ্রুত এই জ্বর কাটে, ততই যেন সে বাঁচে। রাইয়ানের অবশ্য পরীক্ষা নিয়ে তেমন কোনো চিন্তাই নেই। দাদী আর তুপ্পির মায়াবী মুখের মতো গ্রামের শ্যামল-সবুজ রূপও বখতিয়ার ও আলীকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ, সবুজ বৃক্ষের সারি, নদীর বুকে পালতোলা নৌকা, ছায়াঘেরা পাখিডাকা মেঠোপথ, পথের ধারে ঝলমলে সরিষাফুলের ঢেউ, কলাই-কলমি লতার নীলাভ-সাদা ফুল, পুকুরভরা শাপলা, এমনকি কচুরিপানার ফুলও তাদের মুগ্ধ করে। এসব তো শহরের একঘেয়ে পরিবেশে কল্পনাও করা যায় না। আর পুকুরে সাঁতার কাটা, মাছ ধরা, নৌকা চালানো কিংবা মাঠে-মেঠোপথে ছুটে বেড়ানোর আনন্দও তো বছরের এই কটা দিন ছাড়া তারা পায় না। গ্রামের বাড়ি যেতে দুই ভাইয়ের সবচেয়ে প্রিয় বাহন হলো স্টিমার আর পালতোলা নৌকা। আজকাল সড়কপথেও দেশে যাওয়া যায়, কিন্তু সড়কপথের কোলাহল, যানজট আর কালো ধোঁয়া তাদের একেবারেই অপছন্দ। তাই প্রতি বছরই দেশে যাওয়ার সময় নদীপথে যাওয়ার জন্য তারা আগেভাগেই আব্বুকে বলে রাখে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বলা যায়, তাদের আগাম নোটিশ পেয়েই আব্বুকে স্টিমারের টিকিট কাটতে হয়েছে। আসলে নদীপথে ভ্রমণের মজাই আলাদা। একদিকে সড়কপথের নানা বিড়ম্বনা থেকে বাঁচা যায়, অন্যদিকে নদীপথে ভ্রমণে উপভোগ করা যায় প্রকৃতি ও জীবনের অপার বৈচিত্র্য। নদীর তীরে গড়ে ওঠা হাট-বাজার, শহর-বন্দর, গ্রাম, জনপদ একের পর এক যেন চলমান চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। জেলেদের মাছ ধরা, ধানক্ষেতে কৃষকের ব্যস্ততা, নদীর ঘাটে কলসিতে পানি ভরতে আসা গ্রামীণ নারীরা, উঠোনে ধান শুকানো, ইটভাটা, কলকারখানার কর্মচাঞ্চল্য, ঘাটে মালামাল ওঠানামা, গয়না নৌকায় পণ্য পরিবহন, পালতোলা নৌকায় মাঝি-মাল্লাদের গান—সব মিলিয়ে যেন পুরো নদীমাতৃক রূপসী বাংলাকে একসঙ্গে দেখে ফেলা যায়। আর গাঙচিলের উড়াউড়ির কথা তো বলাই হয়নি! জেলে নৌকায় ধরা জ্যান্ত ইলিশ যখন লাফিয়ে ওঠে আর তার রুপালি গায়ে সোনালি রোদের ঝিলিক পড়ে, তখন যে চোখধাঁধানো দৃশ্যের সৃষ্টি হয়, তা নদীভ্রমণ না করলে বোঝা যায় না। সকালের বা দুপুরের নদীভ্রমণের আনন্দ একরকম। কিন্তু বিকেলে স্টিমার যখন মাঝনদীতে পৌঁছে যায়, তখন সৃষ্টি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতি। যতদূর চোখ যায়, শুধু জল আর জল। দূরের গ্রামগুলোকে মনে হয় দিগন্তে টানা কোনো কাজলরেখা। আকাশ যেন এসে মিশেছে নদীর তটরেখায়। উপরের বিশাল নীলাকাশ আর নিচের বিস্তৃত জলরাশি একাকার হয়ে গেছে। বিকেলে স্টিমার যখন মাঝনদীতে পৌঁছে যায়, তখন সৃষ্টি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতি। যতদূর চোখ যায়, শুধু জল আর জল। দূরের গ্রামগুলোকে মনে হয় দিগন্তে টানা কোনো কাজলরেখা। আকাশ যেন এসে মিশেছে নদীর তটরেখায়। উপরের বিশাল নীলাকাশ আর নিচের বিস্তৃত জলরাশি একাকার হয়ে গেছে। প্রকৃতির এই অপূর্ব রূপ ও রহস্য নদীপথে ভ্রমণ না করলে কি সত্যিই উপলব্ধি করা যায়? বিকেলে চা-নাস্তা শেষে রাইয়ান, বখতিয়ার ও আলী যখন আব্বুর সঙ্গে স্টিমারের ডেকে রেলিং ধরে দাঁড়াল, তখন আকাশের রূপ দেখে তারা মুগ্ধ হয়ে গেল। বখতিয়ার তো তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইল পশ্চিম আকাশের দিকে। সূর্য তখন ধীরে ধীরে হেলে পড়ছে। সাদা মেঘগুলো সুনীল আকাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সূর্য ডুবতে শুরু করতেই শুরু হলো রঙের এক অপূর্ব খেলা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাদা মেঘগুলো হলুদ ও কমলার মিশ্রণে নতুন রূপ ধারণ করল। এরপর সেই রঙ গাঢ় হয়ে লাল-কমলার আবেশে ছড়িয়ে পড়ল আকাশজুড়ে। তারপর ধূসর মেঘের গায়ে যেন কেউ লালচে রঙের প্রলেপ বুলিয়ে দিল। রহস্যময় রঙের জাদু ছড়িয়ে সূর্য ধীরে ধীরে দিগন্তের বুকে ডুবে যেতে লাগল। নদীর বুকে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের সেই দৃশ্য দেখে দুই ভাইয়ের মুখ থেকে একসঙ্গে বেরিয়ে এল একটি শব্দ—“অপূর্ব!” আলী বলল, “ঠিকই বলেছ ভাইয়া। আকাশের গায়ে রঙের এত নিপুণ আলপনা দেখে আমার মনে হচ্ছে, এ যেন কোনো মহান শিল্পীর আঁকা এক অনুপম শিল্পকর্ম।” আব্বু মৃদু হেসে বললেন, “সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি তাঁর সৃষ্টিজগতকে আমাদের জন্য এত সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছেন।”এই সংস্করণে পুনরাবৃত্ত অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে, বানান ও যতিচিহ্ন সংশোধন করা হয়েছে, বাক্যপ্রবাহ মসৃণ করা হয়েছে এবং শিশুতোষ গল্পের আবেগ ও প্রকৃতিবর্ণনার সৌন্দর্য আরও উজ্জ্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে।

রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

খাদ্যে ভেজাল, রাসায়নিক প্রয়োগ ও সাপ্লাই চেইনে বিশৃঙ্খলা: হুমকির মুখে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন একটি দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা বিকাশের মূল ভিত্তি হলো নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য। বাংলাদেশ বিগত দশকগুলোতে খাদ্য উৎপাদনে, বিশেষ করে দানাদার শস্য উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। দেশ আজ চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবে খাদ্যের এই ‘লভ্যতা’ বা পরিমাণের দিক থেকে অগ্রগতি হলেও, ‘নিরাপত্তা’ ও ‘মান’-এর দিক থেকে দেশটি চরম সংকটের মুখোমুখি। খাদ্যে অনিয়ন্ত্রিত ভেজাল, যত্রতত্র ক্ষতিকারক রাসায়নিকের ব্যবহার এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনের দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা আজ বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে এক বড় ধরনের হুমকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। ১. খাদ্যে ভেজাল: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক বাংলাদেশের বাজারে এমন খুব কম খাদ্যপণ্যই আছে যা ভেজালের কবল থেকে মুক্ত। চাল, ডাল, তেল, মসলা থেকে শুরু করে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসে প্রতিনিয়ত ভেজাল মেশানো হচ্ছে। নকল ও নিম্নমানের উপাদান: চা-পাতায় কাঠের গুঁড়ো বা ক্ষতিকর রং, মসলায় ইটের গুঁড়ো ও টেক্সটাইল ডাই, আর ভোজ্যতেলে সস্তা ও অখাদ্য পাম অয়েল বা খনিজ তেলের মিশ্রণ এখন ওপেন সিক্রেট। দুধ ও মিষ্টিতে ভেজাল: তরল দুধের পরিমাণ বাড়াতে পানি মেশানোর পাশাপাশি স্টার্চ, ডিটারজেন্ট, ফরমালিন এবং সস্তা গুঁড়ো দুধের মিশ্রণ পাওয়া গেছে বিভিন্ন ল্যাবরেটরি পরীক্ষায়। ছানা ও মিষ্টি তৈরিতেও ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ের বিষাক্ত রং ও নিম্নমানের উপাদান। এই ভেজাল মিশ্রিত খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী গ্যাস্ট্রিক, লিভার সিরোসিস, কিডনি বিকল হওয়া, হৃদরোগ এবং ক্যান্সারের মতো মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ২. রাসায়নিকের অবাধ ও অপপ্রয়োগ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজারজাতকরণের প্রতিটি স্তরে রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার খাদ্যকে বিষাক্ত করে তুলছে। কীটনাশকের অপব্যবহার: কৃষকেরা অজ্ঞতা বা অতিরিক্ত মুনাফার আশায় ফসলে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি কীটনাশক ব্যবহার করেন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, কীটনাশক প্রয়োগের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ফসল তোলা নিষেধ (উইথড্রয়াল পিরিয়ড), কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কীটনাশক ছিটানোর পরদিনই সেই সবজি বা ফসল বাজারে চলে আসে। ফলে বিষাক্ত রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ (Residue) মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। ফরমালিন ও কার্বাইড: মাছ ও মাংসে পচন রোধে ফরমালিন এবং ফলমূল (যেমন আম, কলা, পেঁপে) কৃত্রিম উপায়ে দ্রুত পাকানোর জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ব্যবহার দীর্ঘদিনের সমস্যা। যদিও ইদানীং নজরদারি কিছুটা বেড়েছে, তবুও এর আড়ালে নিত্যনতুন রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। ভারী ধাতুর উপস্থিতি: শিল্পবর্জ্য ও দূষিত পানির কারণে খাদ্যশৃঙ্খলে (বিশেষ করে মাছ, মুরগির মাংস এবং ডিমে) সিসা, ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর বিপজ্জনক উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে, যা শিশুদের মেধা বিকাশ ব্যাহত করছে এবং গর্ভবতী নারীদের জন্য চরম ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩. সাপ্লাই চেইনে বিশৃঙ্খলা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য খাদ্য নিরাপত্তা শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না, বরং উৎপাদিত পণ্য কীভাবে ভোক্তার থালায় পৌঁছাচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করে। বাংলাদেশের কৃষি বিপণন ও সরবরাহ শৃঙ্খল অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কার্টেল বা সিন্ডিকেট: চাল, পেঁয়াজ, আলু বা ডালের মতো অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে প্রায়ই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। বড় বড় চাতাল মালিক, আমদানিকারক ও আড়তদারদের ‘সিন্ডিকেট’ বা কার্টেল বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান না, অথচ ভোক্তাকে চড়া দামে পণ্য কিনতে হয়। সংরক্ষণাগার ও কোল্ড চেইনের অভাব: দেশে পর্যাপ্ত ও আধুনিক হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় প্রতিবছর উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলমূলের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ মাঠ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই পচে নষ্ট হয়ে যায়। এই বিপুল অপচয় খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও অব্যবস্থাপনা: দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে খাদ্যপণ্য পরিবহনের সময় মহাসড়কে ব্যাপক চাঁদাবাজির শিকার হতে হয় ট্রাক চালকদের। এই অতিরিক্ত খরচ পণ্যের মূল্যের সাথে যুক্ত হয়, যা কৃত্রিমভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয় এবং নিম্নবিত্ত মানুষের খাদ্য কেনার সক্ষমতা (Access to food) কমিয়ে দেয়। উত্তরণের উপায় ও করণীয় এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং একটি সমন্বিত ও কঠোর নীতিমালার বাস্তবায়ন প্রয়োজন: ১. আইনের কঠোর প্রয়োগ: ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ এবং ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন’ এর অধীন গঠিত সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা আরও বাড়াতে হবে। ভেজালকারী ও সিন্ডিকেটের হোতাদের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা না করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি (কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের জরিমানা) নিশ্চিত করতে হবে। ২. নিয়মিত বাজার ও ল্যাব মনিটরিং: ভ্রাম্যমাণ আদালতের (মোবাইল কোর্ট) সংখ্যা বাড়াতে হবে। শুধু উৎসব-পার্বণে নয়, বছরজুড়ে কাঁচাবাজার, সুপারশপ এবং উৎপাদন কেন্দ্রে আধুনিক ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে খাদ্যের মান পরীক্ষা নিশ্চিত করা দরকার। ৩. কৃষকদের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ: গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (GAP) বা উত্তম কৃষি চর্চা নিশ্চিত করতে কৃষকদের জৈব কীটনাশক ব্যবহার এবং রাসায়নিকের সঠিক মাত্রার ওপর ব্যাপক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ৪. সাপ্লাই চেইন আধুনিকীকরণ: মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরাসরি ‘কৃষক থেকে ভোক্তা’ (Farm to Fork) মডেল বা ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া, দেশের প্রতিটি অঞ্চলে আধুনিক হিমাগার এবং কোল্ড চেইন লজিস্টিকস তৈরি করা জরুরি। ৫. ভোক্তা সচেতনতা: সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। অতিরিক্ত চকচকে চাল বা কৃত্রিমভাবে পাকা সুন্দর ফল বর্জন করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। উপসংহার খাদ্য নিরাপত্তা মানে কেবল পেট ভরে খেতে পাওয়া নয়, বরং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা। খাদ্যে ভেজাল এবং সাপ্লাই চেইনের বিশৃঙ্খলাকে যদি এখনই কঠোর হস্তে দমন করা না যায়, তবে দেশ এক অসুস্থ ও মেধাহীন প্রজন্মের দিকে ধাবিত হবে। একটি সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে সরকারকে জরুরি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাদ্য খাতের এই ত্রিমুখী সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

পানির বিষ্ময়কর রহস্য

একদিন দুপুরবেলা স্কুল থেকে ফিরে রূপম খুব ক্লান্ত হয়ে এক গ্লাস পানি খেলো। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে গ্লাসের নিচে একটুখানি পানি রেখেই সে টেবিলের ওপর রেখে দিল। তা দেখে তাদের দাদু এসে রূপমকে আদর করে বললেন, "দাদুভাই, এই যে এক চুমুক পানি তুমি অবহেলা করে রেখে দিলে, তুমি কি জানো এই পানি কত মূল্যবান এবং এর মধ্যে লুকিয়ে আছে কত রহস্য? রূপম আর তুলি দুজনেই অবাক হয়ে দাদুর দিকে তাকাল। তুলি চোখ বড় বড় করে বলল, "পানির আবার কী রহস্য দাদু? এটা তো আমরা রোজ খাই, হাত-মুখ ধুই!" দাদু হেসে বললেন, "তাহলে শোনো পানির বিষ্ময়কর রহস্যের গল্প। আজ থেকে অনেক বছর আগে রাশিয়ার একজন মস্ত বড় বিজ্ঞানী ছিলেন, নাম মেন্ডেলিফ। তিনি পৃথিবীর সব উপাদান নিয়ে একটা নিয়মের ছক তৈরি করেছিলেন। বিজ্ঞানের সেই নিয়ম অনুযায়ী, পানির যে ওজন, সেই হিসেবে পানির কিন্তু তরল থাকারই কথা ছিল না! সামান্য গরমেই সব পানি গ্যাস হয়ে উড়ে যাওয়ার কথা ছিল।" রূপম ভুরু কুঁচকে বলল, " "উড়ে যেত? তাহলে তো নদী-নালা, সাগর-মহাসাগর কিচ্ছু থাকত না!,আরেকটু বুঝিয়ে বলো তো দাদু!" দাদু বললেন, "পানির সমগোত্রীয় হওয়া সত্ত্বেও অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন সালফাইড কিন্তু পানির মত তরল না, সেগুলো সাধারণ তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অবস্থায় বিরাজমান থাকে। এছাড়া পানির সমগোত্রীয় একই ধরনের যত রকমের গ্যাসীয় উপাদান আছে—যেমন হাইড্রোজেন সালফাইড বা হাইড্রোজেন ফ্লোরাইড—তারা সবাই খুব কম তাপমাত্রায় উবে যায়। কিন্তু পানি সেটা করতে পারে না। এর ভেতরে আছে এক অদৃশ্য 'হাইড্রোজেন চেইন', যা পানিকে সহজে উড়ে যেতে দেয় না। আর পানি তরল থাকে বলেই সাগরে বড় বড় জাহাজ ভেসে বেড়াতে পারে।" তুলি হাততালি দিয়ে বলল, "বাহ্! তাহলে তো খুব ভালো!" দাদু বললেন, "আসলে এটা সৃষ্টিকর্তার এক নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ এবং মানুষ সহ পৃথিবীর সব প্রাণী, গাছপালা, সৃষ্টি জগতের প্রতি তাঁর অসীম দয়ার নিদর্শন। তুলি বলল, "আল্লাহকে অনেক ধন্যবাদ।" দাদু বললেন, "শুধু কি তাই? পানির আরও একটা রহস্য আছে। শীতের দেশে যখন খুব ঠান্ডা পড়ে, তখন চারপাশের সব পানি বরফ হয়ে যায়। আচ্ছা রূপম, ভারী জিনিস নিচে যায় নাকি হালকা জিনিস?" রূপম চট করে উত্তর দিল, "ভারী জিনিস নিচে যায়।" দাদু বললেন, "হ্যাঁ, এটাই নিয়ম। কিন্তু পানি যখন বরফ হয়, তখন সে হালকা হয়ে যায় আর পানির ওপর ভেসে ওঠে! আর বরফ হওয়ার সময় সে নিজের ভেতর থেকে গরম তাপমাত্রা বা সুপ্ততাপ বের করে দেয়। ফলে কী হয় জানো? ওপরের দিকে বরফ জমে শক্ত হয়ে গেলেও, নিচের পানিটুকু গরম থাকে। আর সেই জাদুর চাদরের নিচে সাগরের মাছ আর জলজ প্রাণীরা মনের সুখে সাঁতার কাটে, ঠান্ডায় মরে যায় না। পানি যদি এই জাদুটা না দেখাত, তবে পুরো পৃথিবী একটা আস্ত বরফের টুকরো হয়ে যেত আর কোনো জীবন থাকত না।" রূপম আর তুলি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাদুর কথা শুনছিল। দাদু এবার রূপমের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "পবিত্র কোরআনেও এই পানির কথা বলা হয়েছে। স্রষ্টা যদি এই পানিকে আমাদের থেকে কেড়ে নেন বা অদৃশ্য করে দেন, তবে পৃথিবীর কোনো বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি দিয়ে আমরা আর এক ফোঁটা পানিও তৈরি করতে পারব না। আমাদের শরীর বলো আর গাছের শরীর বলো, সবকিছুর প্রাণ এই পানি। তাই পানি হলো আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় দয়া আর আশীর্বাদ।" দাদুর কথা শুনে রূপম টেবিলের দিকে তাকাল। সেই এক চিমটি উচ্ছিষ্ট পানিকে এখন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী হিরের টুকরোর মতো মনে হলো। সে গ্লাসটা তুলে নিয়ে বাকি পানিটুকু খেয়ে নিল আর মনে মনে বলল, "আল্লাহকে ধন্যবাদ, আমাদেরকে পানির মতো এত সুন্দর একটা উপহার দেওয়ার জন্য!" গল্পের শিক্ষা: প্রকৃতিতে পানির প্রতিটি ফোঁটা এক একটি অলৌকিক নিদর্শন। পানির অপচয় করা মোটেও উচিত নয়, কারণ পানি ছাড়া পৃথিবীতে জীবনের কোনো অস্তিত্বই থাকত না।

আহসান হাবীব বুলবুলের ‘হলুদ বরণ রোদ’ গল্পগ্রন্থ: শিশুদের প্রতি ভালোবাসা, মানবিকতা ও স্বপ্নের আলো

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন বাংলা শিশুসাহিত্যে এমন কিছু বই আছে, যেগুলো শুধু শিশুদের বিনোদন দেয় না, বরং তাদের মনোজগৎকে আলোকিত করে, মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে এবং সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রেরণা জোগায়। কবি, সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক আহসান হাবীব বুলবুলের গল্পগ্রন্থ ‘হলুদ বরণ রোদ’ তেমনই একটি গ্রন্থ। বইটির গল্পগুলোতে একদিকে যেমন আছে শিশুদের সরলতা, স্বপ্ন, কৌতূহল, আবেগ ও কল্পনার জগৎ, অন্যদিকে আছে শিক্ষা, মানবিকতা, পরিবেশ সচেতনতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিকতার পাঠ। গ্রন্থের গল্পগুলো পড়লে মনে হয়, লেখক শিশুদের খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের ভাষা বুঝেছেন এবং তাদের হৃদয়ের স্পন্দন অনুভব করেছেন। ফলে গল্পগুলোতে কৃত্রিমতার বদলে এসেছে জীবনের বাস্তবতা ও মমতার উষ্ণতা। সহমর্মিতা ও মানবিকতার গল্প ‘ফাহিমের দু’টি কলম’ গল্পে আমরা দেখি এক শান্ত ও ভদ্র ছেলেকে, যে সহপাঠীদের দুষ্টুমির শিকার হলেও প্রতিশোধ নয়, ভালোবাসা ও সহযোগিতার পথ বেছে নেয়। একটি কলম ধার পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাকে এমন শিক্ষা দেয়, যা পরবর্তীতে তাকে সবার প্রিয় করে তোলে। গল্পটি শিশুদের শেখায়, ছোট একটি ভালো কাজও মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ‘রাজকন্যা’ গল্পে উর্মির মানবিকতা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। একজন রিকশাচালকের অসুস্থ পালক কন্যার কথা শুনে সে নিজের পথ বদলে হাসপাতালে ছুটে যায়। শিশুমনের সহানুভূতি ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এখানে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। প্রকৃতি ও জীবনের প্রতি ভালোবাসা গ্রন্থের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী গল্প ‘ইতি অন্তরা’। অন্তরার সঙ্গে চড়ুই পাখিদের বন্ধুত্ব, তাদের জন্য খাদ্য রেখে দেওয়া, বাড়ি বদলের সময় পাখিদের কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হওয়া—এসব দৃশ্য শিশুমনের কোমল অনুভূতিকে অসাধারণভাবে তুলে ধরে। গল্পটি শিশুদের প্রকৃতিপ্রেম ও প্রাণীর প্রতি মমতা শেখায়। ‘হেমন্ত এসেছে’ গল্পে গ্রামীণ বাংলার রূপ, নবান্নের আনন্দ, শিউলি ফুল, ধানক্ষেত, অতিথি পাখি এবং পারিবারিক মিলনমেলার চিত্র জীবন্ত হয়ে উঠেছে। শহুরে শিশুদের কাছে এটি গ্রামবাংলার এক অপূর্ব পরিচয়পত্র। আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের গল্প ‘সেই মেয়েটি’ গল্পের প্রীতি মেহজাবিন অন্তর্মুখী স্বভাবের একটি মেয়ে। সমাজে প্রায়ই নীরব ও লাজুক শিশুদের অবমূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু সংকটময় মুহূর্তে প্রীতির জ্ঞান, সাহস ও উপস্থিত বুদ্ধিই সবাইকে বিস্মিত করে। গল্পটি প্রমাণ করে, নীরবতা দুর্বলতা নয়; প্রতিটি শিশুর মধ্যেই আলাদা প্রতিভা লুকিয়ে থাকে। ‘মিষ্টি পাওয়া যায়’ গল্পে ধর্মীয় শিক্ষা ও শিশুমনের সরলতাকে খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নামাজ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির ধারণা শিশুর উপযোগী ভাষায় গল্পে ফুটে উঠেছে। সামাজিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ ‘তিন বন্ধু’ গল্পে বজ্রপাত প্রতিরোধে তালগাছ রোপণের উদ্যোগ পরিবেশ সচেতনতার একটি চমৎকার উদাহরণ। তিন কিশোরের ছোট উদ্যোগ কীভাবে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হতে পারে, লেখক তা দেখিয়েছেন অনুপ্রেরণামূলক ভঙ্গিতে। ‘সারপ্রাইজ’ গল্পে রওনকের সঞ্চয়ের অভ্যাস, দায়িত্ববোধ ও দূরদর্শিতা শিশুদের অর্থনৈতিক সচেতনতার শিক্ষা দেয়। আবার ‘অন্য রকম গল্প’-এ শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম ও মানবিক সহমর্মিতার চিত্র অত্যন্ত আবেগঘনভাবে উঠে এসেছে। পারিবারিক বন্ধন ও মূল্যবোধ ‘মধুর স্মৃতি’ গল্পে পারিবারিক বৈঠকের মাধ্যমে সন্তানদের সঙ্গে মতবিনিময়, নৈতিক শিক্ষা এবং আন্তরিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমান ব্যস্ত সময়ে পরিবারে পারস্পরিক যোগাযোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, গল্পটি সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘আত্মপরিচয়’ গল্পটি রূপকধর্মী। বাঘশাবকের গল্পের মাধ্যমে লেখক শিশুদের নিজেদের শক্তি, মর্যাদা ও প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে সচেতন হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। শিশুদের প্রতি গল্পকারের ভালোবাসা ‘হলুদ বরণ রোদ’ গল্পগ্রন্থের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শিশুদের প্রতি লেখকের গভীর ভালোবাসা। তিনি শিশুদের কেবল পাঠক হিসেবে দেখেননি; তাদের স্বপ্ন, ভয়, সংকোচ, আনন্দ, কল্পনা ও সম্ভাবনাকে আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করেছেন। এই বইয়ের শিশু চরিত্রগুলো কোনো কাল্পনিক নায়ক নয়। তারা আমাদের চারপাশের পরিচিত ছেলে-মেয়ে। ফাহিম, অন্তরা, প্রীতি, উর্মি, জারিন, রওনক কিংবা জিবরান—প্রত্যেকেই বাস্তব জীবনের প্রতিনিধি। লেখক তাদের চোখ দিয়েই পৃথিবীকে দেখেছেন। শিশুদের ভুলকে তিনি শাস্তির চোখে দেখেন না; বরং তাদের শেখার সুযোগ হিসেবে দেখেন। তাদের প্রশ্নকে গুরুত্ব দেন, কৌতূহলকে উৎসাহ দেন এবং মানবিক গুণাবলিকে লালন করেন। এ কারণেই গল্পগুলোর ভেতরে উপদেশ থাকলেও তা কখনো ভারী বা কৃত্রিম মনে হয় না। উপসংহার ‘হলুদ বরণ রোদ’ শুধু একটি গল্পগ্রন্থ নয়; এটি শিশুদের জন্য মানবিকতা, সৌন্দর্যবোধ, দেশপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম ও নৈতিক শিক্ষার এক উজ্জ্বল পাঠশালা। আহসান হাবীব বুলবুল শিশুদের আনন্দ দিতে দিতে তাদের সুন্দর মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখান। তাঁর গল্পগুলো শিশুদের হৃদয়ে যেমন আলো জ্বালাবে, তেমনি অভিভাবক ও শিক্ষকদেরও ভাবতে শেখাবে। বাংলা শিশুসাহিত্যে ‘হলুদ বরণ রোদ’ নিঃসন্দেহে একটি মূল্যবান সংযোজন, যেখানে শিশুমনের নির্মলতা আর জীবনের ইতিবাচক শিক্ষাগুলো মিশে গেছে হলুদ বরণ সকালের রোদের মতো উজ্জ্বল এক আবেশে।