Muhammad Abul Hussain
সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬
মরুর বুকে সত্যের বিজয় (শিশু-কিশোর ঐতিহাসিক অ্যাডভেঞ্চার)
মুআল্লাফাতুল কুলুব: মিডিয়া সংকট নিরসনের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
সমাজ পরিবর্তনের লড়াই শুধু রাজপথে হয় না; তা হয় চিন্তায়, ভাষ্যে, বয়ানে এবং মিডিয়ার পরিসরেও। আধুনিক বিশ্বে মিডিয়া শুধু তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়—এটি জনমত নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। ফলে যারা রাষ্ট্র, সমাজ বা আদর্শিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে, তাদের জন্য মিডিয়া শক্তি অপরিহার্য। কিন্তু ইসলামপন্থী দল ও সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের “মিডিয়া সংকটে”ভুগছ; মূলধারার গণমাধ্যমে উপেক্ষা, নেতিবাচক ফ্রেমিং কিংবা নীতিগত দূরত্ব। এই বাস্তবতায় ইসলামের একটি প্রাচীন অর্থনৈতিক-সামাজিক ধারণা—মুআল্লাফাতুল কুলুব; নতুন প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মুআল্লাফাতুল কুলুব কী?
মুআল্লাফাতুল কুলুব (المؤلفة قلوبهم) বলতে ঐসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বোঝায় যাদের অন্তর ইসলামের প্রতি অনুকূল বা নিকটবর্তী করতে অর্থসহায়তা দেওয়া হয়। এর মূল ভিত্তি এসেছে কুরআনের আয়াতে যাকাত বণ্টনের আটটি খাতের একটি হিসেবে -এর উল্লেখ করে— “যাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন… এবং যাদের অন্তর অনুকূল করা প্রয়োজন (মুআল্লাফাতুল কুলুব)...”
— , সূরা আত-তাওবা ৯:৬০
রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কা বিজয়ের পর বিভিন্ন গোত্রপ্রধানকে অনুদান দিয়েছিলেন, যাতে তারা ইসলাম ও মুসলিম সমাজের প্রতি সদয় থাকে—যা সীরাতগ্রন্থে বিস্তারিত এসেছে, যেমন সীরাতে ইবনে হিশাম-এ। এখানে মূল দর্শন ছিল—সংঘাত নয়, হৃদয় জয়; বিচ্ছিন্নতা নয়, সম্পর্ক নির্মাণ।
অতএব, এটি কেবল দান নয়—বরং একটি কৌশলগত সামাজিক নীতিমালা (strategic social policy)।
মিডিয়া সংকট: বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট
ইসলামপন্থী রাজনীতি বা সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়, তাদের বক্তব্য মূলধারার মিডিয়ায় যথেষ্ট স্থান পায় না—অথবা পেলেও তা সমালোচনামূলক কাঠামোয় উপস্থাপিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে আদর্শগত দূরত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা পারস্পরিক অবিশ্বাস এর পেছনে কাজ করে। ফলত ইসলামপন্থীরা নিজেদের মিডিয়া তৈরি করতে চাইলেও পুঁজি, পেশাদারিত্ব ও নেটওয়ার্কের অভাবে তা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন দাঁড়ায়— এই সংকট মোকাবেলায় মুআল্লাফাতুল কুলুব কিভাবে ভূমিকা পালন করতে পারে।
ইসলামপন্থীদের মিডিয়া সংকট নিরসনে 'মুআল্লাফাতুল কুলুব' খাতটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর মাধ্যমে পুঁজি, পেশাদারিত্ব ও নেটওয়ার্কের ঘাটতি এভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব:
১. পুঁজি ও বিনিয়োগ আকর্ষণ: মুআল্লাফাতুল কুলুবের আওতায় যারা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারী, তাদের এই মহৎ কাজের অংশীদার করার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বড় অংকের পুঁজির সংস্থান করা সম্ভব।
২. পেশাদার জনবল ও দক্ষতা বৃদ্ধি: মিডিয়া সেক্টরে যারা ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও দক্ষ কিন্তু আদর্শিক দূরত্বের কারণে মূলধারার বাইরে আছেন, যাকাতের এই খাতের মাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ত করা সম্ভব। তাদের পেশাদারিত্বকে কাজে লাগিয়ে কন্টেন্টের মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা যায়।
৩. প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক তৈরি: মিডিয়া জগতের নীতিনির্ধারক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরিতে এই খাত ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে করে মূলধারার মিডিয়াতে ইসলামবিদ্বেষী বয়ান বা 'ন্যারেটিভ' পরিবর্তন করা সহজ হয়।
৪. সম্পর্কোন্নয়ন: মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, সম্পাদক, কলামিস্ট ও প্রভাবশালী সাংবাদিকদের সঙ্গে নীতিগত ও পেশাগত সম্পর্ক গড়ে তোলা। এটি ঘুষ বা অনৈতিক প্রভাব নয়; বরং গবেষণা-তথ্য সরবরাহ, ব্রিফিং, সংলাপ, কর্মশালা ও বুদ্ধিবিনিময়ের মাধ্যমে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা।
৫. পেশার মূল্যায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা: সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে উৎসাহিত সাহিত করা এবং তাদের যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা যাতে নতুনরা এ পেশা গ্রহণ করতে উৎসাহিত হয়। প্রয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতে হবে যাতে তৃণমূল পর্যায়ে হকপন্থী মিডিয়া ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। ইসলামপন্থীদের উচিত মিডিয়াকে “শত্রু” হিসেবে না দেখে “স্টেকহোল্ডার” হিসেবে বিবেচনা করা।
৬. সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন: অমুসলিম বা ভিন্ন মতাদর্শী প্রতিভাবান শিল্পী ও কলাকুশলীদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করলে মিডিয়া কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর না হয়ে সর্বজনীন হয়ে ওঠে, যা জনমনে প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হয়।
এক্ষেত্রে মূলনীতি হতে পারে -সংঘাত বাড়িয়ে সমাধান হবে, নাকি সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে?
৭. নৈতিক সীমারেখা:
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—
মুআল্লাফাতুল কুলুব কি আধুনিক কালে অর্থ দিয়ে মিডিয়া প্রভাবিত করার লাইসেন্স?
ইসলামের মৌলিক নীতি হলো ন্যায় ও স্বচ্ছতা। সুতরাং এই খাতের আধুনিক প্রয়োগ যদি হয় অনৈতিক প্রভাব, প্রোপাগান্ডা বা দুর্নীতির মাধ্যমে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ—তাহলে তা ইসলামের চেতনাবিরোধী হবে। বরং এর সঠিক অর্থ হবে—বৈরিতা কমিয়ে বোঝাপড়া বাড়ানো, ভুল ধারণা দূর করা, সংলাপের দরজা খোলা।
৮. ন্যারেটিভ নির্মাণে পেশাদারিত্ব
মিডিয়া শূন্যস্থান পছন্দ করে না। যে পক্ষ তথ্য, বিশ্লেষণ ও মানবিক গল্প সরবরাহ করতে পারে, তার বক্তব্যই প্রাধান্য পায়। ইসলামপন্থীরা যদি গবেষণা সেল, ডেটা টিম ও প্রশিক্ষিত মুখপাত্র তৈরি করে, তাহলে তাদের বক্তব্য আরও গ্রহণযোগ্য হবে। এখানে মুআল্লাফাতুল কুলুব অর্থ হতে পারে—বিতর্ক নয়, ব্যাখ্যা; উত্তেজনা নয়, প্রজ্ঞা।
ডিজিটাল যুগে নতুন সম্ভাবনা
আজকের বিশ্বে মূলধারার মিডিয়া একমাত্র প্ল্যাটফর্ম নয়। সোশ্যাল মিডিয়া, পডকাস্ট, ইউটিউব চ্যানেল—এসবই বিকল্প জনমত নির্মাণের ক্ষেত্র। ইসলামপন্থীরা যদি দক্ষ কনটেন্ট নির্মাতা, গবেষণাভিত্তিক ভিডিও এবং মানবিক বয়ান উপস্থাপন করতে পারে, তাহলে তারা সরাসরি জনগণের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারবে—যা মুআল্লাফাতুল কুলুবের মূল চেতনার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
উপসংহার
মিডিয়া সংকট মূলত আস্থার সংকট। আর আস্থার সংকট দূর করার উপায় শক্তি প্রদর্শন নয়—সম্পর্ক ও স্বচ্ছতা। মুআল্লাফাতুল কুলুব আমাদের শেখায়, সমাজ পরিবর্তনের পথে শুধু মতাদর্শ নয়, হৃদয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামপন্থীদের জন্য এটি একটি আর্থিক খাতের সীমাবদ্ধ বিধান নয়; বরং একটি কৌশলগত দর্শন—যেখানে সংলাপ, সহমর্মিতা ও পেশাদারিত্ব মিলিত হয়।
হৃদয় জয় করতে পারলে, বয়ানও জয় করা যায়। আর বয়ান জয় করতে পারলে, জনমতও বদলানো সম্ভব।#
কবি হাসান আলীমের ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নি শিশু’ কবিতা: এক কাব্যিক ম্যানিফেস্টো
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
সমকালীন বাংলা কবিতায় এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ আছে, যেগুলো নিছক আবেগের আশ্রয় নয়; বরং সময়ের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহসী উচ্চারণ। শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু তেমনই এক কাব্যিক দলিল। শিরোনামেই যে দ্বন্দ্ব—হিংস্র অরণ্য ও অগ্নিদীপ্ত শিশু—তা আসলে এক গভীর সময়চেতনার প্রতীকী নির্মাণ।
কবি হাসান আলীমের দীর্ঘ কবিতা ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নি শিশু’ এক ধরনের কাব্যিক ম্যানিফেস্টো—স্মৃতি, শাহাদাৎ, সংগ্রাম, আধ্যাত্মিক বিপ্লব এবং সভ্যতার পুনর্গঠনের উচ্চারণ। এই কবিতায় কবি কেবল ব্যক্তিগত অনুভব ব্যক্ত করেন না; তিনি একটি ভগ্ন সামাজিক বাস্তবতার ভেতরে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পুনর্জন্মের সম্ভাবনা খুঁজে দেখেন।
১. পিতার প্রতিকৃতি: ইতিহাস ও নবুয়তি উত্তরাধিকার
কবিতার শুরুতেই পিতা কেবল জৈবিক পিতা নন; তিনি এক নির্মাতা, এক নবুয়তি ধারার উত্তরসূরি:
“আমার পিতা ছিলেন একজন শিল্পী, একজন নিপুণ প্রকৌশলী...”
এই নির্মাণ-রূপক পরে আধ্যাত্মিক স্তরে পৌঁছায়—
“আমার পিতা ছিলেন / প্রিয়নেতা মুহাম্মদ (স)-এর / একজন ঘনিষ্ঠ ছাত্র”
এখানে পিতা ব্যক্তিগত নয়, আদর্শিক। “পাথর বৃষ্টিতে সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত হয়ে গেলেও / যার নির্মাণ কৌশল বন্ধ হয়ে যায় নি”—এই পংক্তিতে নবীজির তায়েফ-পর্বের ইঙ্গিতও অনুরণিত হয়। পিতা তাই ধৈর্য, ক্ষমা ও নির্মাণশীলতার প্রতীক।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ লাইনগুলোর একটি:
“...যে পিতৃব্য হন্তারক তাকে তিনি মারাত্মক রকম ক্ষমা করে দিলেন।”
এটি সরাসরি হযরত হামজা (রা.)-এর হত্যাকারী ওহশীকে ক্ষমা করার ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতীকী প্রতিধ্বনি। কবি এখানে ক্ষমাকে শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
২. শহীদ-চেতনা ও উত্তরাধিকারী সন্তানের আত্মপরিচয়
দ্বিতীয় অংশে কণ্ঠ বদলে যায়। ব্যক্তিগত শোক রূপ নেয় সামাজিক ক্রোধে।
“আমাদের পেটের ভেতর সহস্র হাভীয়া দাউ দাউ করে জ্বলছে।”
“হাভীয়া”—কোরআনিক জাহান্নামের ইঙ্গিত। ক্ষুধা এখানে শুধু শারীরিক নয়; এটি রাজনৈতিক ও নৈতিক দারিদ্র্যের রূপক।
এক পর্যায়ে কবি সরাসরি ঘোষণা করেন—
“কোরান আমাদের সংবিধান, রাসূল আমাদের নেতা, জেহাদ আমাদের কর্মপদ্ধতি শাহাদাৎ আমাদের কাম্য।”
এটি কেবল স্লোগান নয়; পিতার রক্তের ভাষা। আর কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে তিনি বলেন—
“যারা আল্লার পথে জীবন দিয়েছে মৃত মনে করোনা তোমরা তাদের বরং তারাতো জীবিত।”
এখানে কবিতা শহীদতত্ত্বের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করে।
৩. সভ্যতার সমালোচনা: নৈতিক অবক্ষয়ের নকশা
তৃতীয় ও পঞ্চম অংশে আধুনিকতার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা দেখা যায়।
“ভেনাসের নগ্ন ছবিতে ঢেকে গ্যাছে অমলিন শহর...”
“মোজার্ট, মোনালিসা ভ্যানগগের যাবতীয় শিল্পকর্ম অচল সিকির মত ছুঁড়ে ফ্যালে...”
এই পংক্তিগুলোতে পাশ্চাত্য শিল্প-সভ্যতার বিরুদ্ধে একটি প্রত্যাখ্যানমূলক অবস্থান আছে। কবি একটি বিকল্প সাংস্কৃতিক গৃহ নির্মাণ করতে চান—
“এমন কিছু ‘মুকাদ্দাসে তুয়া’ / যার ছবি বক্ষে ধরলেই মানুষ তার শক্তি ফিরে পাবে।”
এখানে শিল্পের পুনঃসংজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে—শিল্প হবে আত্মশক্তির উৎস, ভোগবাদী সৌন্দর্যের নয়।
৪. কাব্যভাষা: মিথ, কোরআনিক ইঙ্গিত ও ঐতিহাসিক প্রতীক
কবিতাজুড়ে বিস্ময়কর পরিমাণ আন্তঃপাঠ উপস্থিত:
“আবু জাহল”, “আবু লাহাব”, “শাদ্দাত”
“মুসার বারোটি কওম”
“লুত নগরী”
“বুনিয়ানুম মারসুস”
“কালো পাথর চুম্বন” (হাজরে আসওয়াদ)
“দীপ্ত আরাফাতে খোলা আসমান”
এই আন্তঃপাঠ কেবল ধর্মীয় অলঙ্কার নয়; এটি ইতিহাসকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে। সময় এখানে সরলরৈখিক নয়—বদর, কারবালা, মক্কা, আরাফাত—সব মিলেমিশে এক চিরন্তন সংগ্রামের মানচিত্র গড়ে তোলে।
৫. ‘অগ্নিশিশু’ প্রতীকের চূড়ান্ত রূপ
শেষ পর্যন্ত “অগ্নিশিশু” কে?
সে সেই প্রজন্ম—
“আমাদের অধিকার / আমাদেরই ছিনিয়ে নিতে হবে।”
সে সেই কাফেলা—
“আমরা আলোর পথের অযুত কাফেলা / এসেছি প্রত্যক্ষ সংগ্রামে।”
এবং সে সেই আত্মবিশ্বাস—
“পেছনের দিকে আর / ফিরে দেখো না তোমাদের ‘বন্দীদশা’”
অগ্নিশিশু মানে নিষ্পাপ কিন্তু দগ্ধ চেতনা; শ্বাপদ অরণ্যের ভেতর জন্ম নেওয়া বিপ্লবী মানব।
৬. নন্দনতাত্ত্বিক মূল্যায়ন
এই কবিতা প্রচলিত লিরিক নয়। এটি মহাকাব্যিক সুরে রচিত এক দীর্ঘ কাব্য-ঘোষণা। এর শক্তি—
প্রতীকের ঘনত্ব
ধর্মীয়-ঐতিহাসিক আন্তঃপাঠ
আবেগ ও আহ্বানের সংমিশ্রণ
নির্মাণ ও ধ্বংসের দ্বৈত রূপক
তবে সমালোচনামূলকভাবে বলতে গেলে, কিছু স্থানে স্লোগানধর্মিতা কাব্যিক সংযমকে ছাপিয়ে গেছে। কিন্তু সেটিই হয়তো কবির সচেতন কৌশল—কবিতাকে ম্যানিফেস্টোতে রূপান্তর করা।
উপসংহার
শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু একাধারে—
পিতার স্মৃতিতে রচিত এলিজি,
শহীদের রক্তে লেখা ঘোষণাপত্র,
সভ্যতার বিরুদ্ধে নৈতিক বিদ্রোহ,
এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান।
শ্বাপদের অরণ্য স্থায়ী নয়—অগ্নিশিশু জন্ম নেবে, নির্মাণ করবে, এবং আকাশের সাথে একাত্ম হয়ে যাবে।#
কবি মতিউর রহমান মল্লিকের অনবরত বৃক্ষের গান : অন্ধকারের ভেতর আলোর বৃক্ষ সময়, সমাজ ও আত্মার সম্মিলিত ভাষ্য
কবি মতিউর রহমান মল্লিকের অনবরত বৃক্ষের গান :
অন্ধকারের ভেতর আলোর বৃক্ষ
সময়, সমাজ ও আত্মার সম্মিলিত ভাষ্য
বাংলা কবিতায় এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ আছে, যেগুলো কেবল কবিতার সংকলন নয়—একটি সময়ের দলিল, একটি আত্মার আর্তি, একটি সমাজের গোপন মানচিত্র। কবি মতিউর রহমান মল্লিক–এর ‘অনবরত বৃক্ষের গান’ কাব্যগ্রন্থ তেমনই এক সংকলন। এখানে প্রকৃতি আছে, আছে রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকট, আছে অর্থনৈতিক বাস্তবতার দহন, আছে ঈমানী নির্ভরতা ও ঐতিহ্যচেতনা—সব মিলিয়ে এটি এক বহুমাত্রিক কাব্যভুবন।
১. নৈতিক অন্ধকার ও আত্মবিচ্ছিন্নতার চিত্র
“লোকটা এখন” কবিতায় আধুনিক মানুষের বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত মানসিকতা ধরা পড়ে—
“আলোর ভেতর চাক-চাক অন্ধকার দেখে দেখে লোকটা এখন দিনের বেলায় একা একা উল্টো দিকেই হেঁটে যেতে চায়।”
আলো এখানে আলোকিত করে না; বরং অন্ধকারের চাকচিক্যকে প্রকাশ করে। এই বিপরীতধর্মী ইমেজ আধুনিক সভ্যতার ছদ্ম-প্রগতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি আরও তীব্র হয় যখন—
“নিজের হাত নিজেই গুণতে গিয়ে আস্কন্ধ লম্বমান দু'টি কাষ্ঠখণ্ড ছাড়া আর কিছুই প্রত্যক্ষ করতে পারলো না।”
মানুষ নিজের মানবিক অঙ্গ হারিয়ে কাঠে পরিণত—এ এক আত্মবিচ্ছিন্নতার মর্মন্তুদ রূপক।
২. বুদ্ধিবৃত্তিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে দ্রোহ
“ক্রোধ” কবিতায় কবি তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন—
“গোখরো তোমার আত্মার প্রতিবেশ…”
“তুমি কি আসলে লেলিহান কঠোরতা?”
‘গোখরো’ হয়ে ওঠে অন্তর্গত বিষের প্রতীক। কবি দেখান, মানবিকতা হারালে জ্ঞান কেবল হিংস্র নখর হয়ে ওঠে। এই কবিতার ভাষা প্রতীকময় হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য সুস্পষ্ট।
৩. অর্থনৈতিক বাস্তবতার কাব্যিক ভাষ্য
“হিসেব করলেই” কবিতায় দৈনন্দিন জীবনের আর্থিক সংকট এক গভীর মানবিক বেদনায় রূপ নেয়—
“হিসেব করলেই কষ্ট বাড়ে…”
“এক মুঠো মাধ্যাকর্ষণ নাড়াচাড়া করতে করতে…”
মাধ্যাকর্ষণ এখানে জীবনের ভার। হিসেব মানেই দুঃখের উন্মোচন—
“হিসেব করলেই কষ্টের ভেতর থেকে উঠে আসে আরেক কষ্ট!”
এই সরল পুনরুক্তি কবিতাকে দিয়েছে তীব্র অনুরণন।
৪. বিপর্যয়ের ভূগোল ও সামষ্টিক আর্তি
“ভয়াবহতম আর্তনাদের মধ্যে” কবিতায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল যেন এক শোকের মানচিত্র—
“মহেশখালীর হতবাক জোয়ারে জোয়ারে ভেসে আসে অসংখ্য লাশ…”
স্থাননামের ধারাবাহিক উচ্চারণ কবিতাকে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড় করায়।
শেষ পঙ্ক্তি—
“আল্লাহ ছাড়া- এখন আর আমাদের কোন দাতাপক্ষ নেই।”
এখানে মানবিক অসহায়ত্ব ঈমানী আশ্রয়ে স্থিতি খুঁজে পায়।
৫. নজরুল-চেতনার পুনর্নির্মাণ
“নজরুলের ভালবাসা” কবিতায় কবি স্মরণ করেন কবি কাজী নজরুল ইসলামকে।
“নজরুলের ভালোবাসায় ছিলো আনন্দের আগে শতাব্দীর কান্না…”
“বিষের বাঁশীর মত অশেষ বিদ্রোহ…”
এখানে ভালোবাসা মানে সংগ্রাম, মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা। নজরুলকে তিনি কেবল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়, এক চলমান চেতনা হিসেবে পুনর্গঠন করেন।
৬. প্রকৃতি, জন্মভূমি ও কৃষিজীবনের নন্দন
“কাশ-শিউলির সময়” ও “হেমন্ত দিন” কবিতায় মল্লিক প্রকৃতির চিত্রকর।
“খেজুর গাছের নতুন নলির লোভে টপ্টপ্ করে…”
“হেমন্ত দিন রঙিন পালক তুলির মত রং এঁকে যায়…”
বাংলার গ্রামীণ জীবন, ফসল, শিশির, নদী—সব মিলিয়ে জন্মভূমির এক স্নিগ্ধ নন্দনচিত্র গড়ে ওঠে।
“মান্না-সাল্ওয়া” প্রসঙ্গ এনে কবি কৃষিজীবনকে ঐশী অনুগ্রহের সঙ্গে যুক্ত করেছেন—
“এবং মান্না-সাল্ওয়া এখন সব চাষীদের…”
৭. আত্মিক ঈদের দর্শন
“একটা ঈদ” কবিতায় ঈদ কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান নয়; এক অস্তিত্বময় অনুভব—
“আজ ক-দিন থেকে একটা ঈদ আমার বাইরে
আজ ক-দিন থেকে একটা ঈদ আমার ভেতরে”
ঈদ হয়ে ওঠে ছায়া ও স্বপ্নের মত এক আধ্যাত্মিক উপস্থিতি। ব্যক্তি ও সমাজ—দুই পরিসরেই তার অনুরণন।
৮. অন্তর্লীন ক্ষয়ের দহন
গ্রন্থের নামের গভীর তাৎপর্য ধরা পড়ে “বৃক্ষ কাটার শব্দ” কবিতায়—
“আমার ভেতরেও কেউ যেন অনবরত বৃক্ষ কেটে যাচ্ছে।”
বাইরের বৃক্ষনিধন ও অন্তরের ক্ষয় একাকার হয়ে যায়। সভ্যতার উন্নয়নের আড়ালে আত্মার বিনাশের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
৯. প্রতীকের শুদ্ধ রূপায়ণ
“বোরকাধারয়িতা ও দারুবৃক্ষের স্তোত্র” কবিতায় দারুবৃক্ষ এক পবিত্র প্রতীক—
“পল্লবিত বোরকায়…”
“একটি পূর্ণাংগ দারুবৃক্ষ কি একটি পরিমার্জিত পাহাড়ের সৌসাদৃশ্য?”
এখানে আচ্ছাদন মানে গোপন নয়; বরং মর্যাদা, সৌজন্য ও সহাবস্থানের মহিমা।
উপসংহার
এক বহুমাত্রিক কাব্যগ্রন্থ। এতে—
সামাজিক ও নৈতিক সংকটের বিশ্লেষণ আছে,
অর্থনৈতিক বাস্তবতার আর্তি আছে,
ধর্মীয় ও ঐতিহ্যচেতনার পুনর্পাঠ আছে,
প্রকৃতি ও জন্মভূমির নন্দন আছে,
এবং সর্বোপরি আত্মার অন্তর্লীন ক্ষয়ের স্বীকারোক্তি আছে।
মল্লিকের কাব্যভাষা দীর্ঘ, প্রবাহমান, উপমা-প্রতীকে ঘন। তিনি গদ্যকবিতার স্বাদে ছন্দের অন্তর্নিহিত সুর তৈরি করেন।
এই কাব্যগ্রন্থ আমাদের শেখায়—বৃক্ষ কেবল প্রকৃতির অংশ নয়; বৃক্ষ আমাদের অন্তরেরও প্রতীক। যখন বৃক্ষ কাটা যায়, তখন কেবল বন উজাড় হয় না—মানুষের ভেতরও এক অনবরত ক্ষয় শুরু হয়।
প্রজন্মান্তরের স্বপ্ন
পারিবারিক শৃঙ্খলার গুরুত্ব
ভূমিকা
পরিবার মানবসমাজের ক্ষুদ্রতম কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—এই তিন স্তম্ভের ভিত্তি নির্মিত হয় পরিবারকে কেন্দ্র করে। ইসলাম পরিবারকে কেবল সামাজিক চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করে না; বরং এটি একটি নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও দায়িত্বপূর্ণ আমানত। এই আমানতের সুরক্ষা ও স্থায়িত্ব নির্ভর করে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহভীতির ওপর।
ইসলামের দৃষ্টিতে পারিবারিক শৃঙ্খলা শুধু পার্থিব শান্তির জন্য নয়; বরং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার পূর্বশর্ত।
পরিবার: আল্লাহপ্রদত্ত একটি আমানত
পবিত্র আল-কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা কর।” — সূরা আত-তাহরীম ৬
এই আয়াত পরিবারপ্রধানের ওপর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক তত্ত্বাবধানের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করে। পরিবার কেবল ভরণ-পোষণের ক্ষেত্র নয়; বরং ঈমান, আমল ও চরিত্র গঠনের ক্ষেত্র।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই রক্ষক এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
এ হাদিস পরিবারকে একটি সুশৃঙ্খল দায়িত্বব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করে।
শৃঙ্খলা: পারিবারিক শান্তির পূর্বশর্ত
ইসলাম পারিবারিক সম্পর্ককে ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাহ) ও দয়া (রহমাহ)-এর ভিত্তিতে স্থাপন করেছে:
“তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও; এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” — , সূরা আর-রূম ২১
ভালোবাসা টেকসই হয় তখনই, যখন তা শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। নিয়মহীন স্বাধীনতা পরিবারে স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না; বরং ভারসাম্যপূর্ণ শৃঙ্খলাই স্থিতি আনে।
পরিবার: একটি সংগঠন
পরিবার সমাজের ক্ষুদ্রতম ইউনিট হলেও এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সংগঠন। আর যে কোনো সংগঠন টিকে থাকে শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের ওপর। নেতৃত্বে শৈথিল্য বা অনুপস্থিতি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
ইসলাম পারিবারিক নেতৃত্বের কাঠামো নির্ধারণ করেছে:
“পুরুষরা নারীদের উপর অভিভাবক (কাওয়াম)…”
— , সূরা আন-নিসা ৩৪
এখানে ‘কাওয়াম’ মানে আধিপত্য নয়; বরং দায়িত্বপূর্ণ অভিভাবকত্ব। স্বামী বা পিতা পরিবারপ্রধান—কিন্তু তার নেতৃত্ব নৈতিক ও আদর্শভিত্তিক।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।”
—
অতএব, পরিবারপ্রধানের শক্তি তার চরিত্রে, ন্যায়পরায়ণতায় ও দায়িত্ববোধে।
পারিবারিক নেতৃত্ব ও নারীর মর্যাদা: একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি
পরিবারে পুরুষকে প্রধান নির্ধারণ করায় কেউ কেউ মনে করতে পারেন—নারীকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। কিন্তু ইসলামে নেতৃত্ব ও মর্যাদা এক বিষয় নয়। দায়িত্বের বণ্টন আলাদা হলেও মর্যাদা ও সম্মানের প্রশ্নে নারী অত্যন্ত উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত।
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন—আমার সদাচরণের সর্বাধিক অধিকারী কে? তিনি বললেন, “তোমার মা।” তিনবার একই উত্তর দিয়ে চতুর্থবার বললেন—“তোমার পিতা।”
এছাড়া সুপরিচিত বাণীতে বলা হয়েছে—“মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।”
অতএব, নারী কন্যা হিসেবে রহমত, স্ত্রী হিসেবে প্রশান্তির উৎস এবং মা হিসেবে জান্নাতের পথপ্রদর্শক।
মাতৃত্ব: চরিত্রগঠনের প্রথম বিদ্যালয়
সন্তান মায়ের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি শেখে। ভাষা, আচরণ, আবেগপ্রকাশ—সবকিছুর প্রাথমিক শিক্ষা মায়ের মাধ্যমে হয়। তাই মায়ের শিক্ষা-দীক্ষা, আচার-আচরণ ও দাম্পত্য আচরণ সন্তানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
যদি মা স্বামীর প্রতি সম্মান দেখান, ভাষা কোমল হয়, আচরণ মার্জিত হয়—তবে সন্তান স্বাভাবিকভাবেই শৃঙ্খলাবোধ ও আনুগত্য শেখে। পক্ষান্তরে, যদি দাম্পত্য সম্পর্কে প্রকাশ্য অবাধ্যতা, কর্কশ ভাষা বা অসম্মান থাকে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব সন্তানের ওপর পড়তে পারে। কারণ শিশু কথার চেয়ে আচরণ থেকে বেশি শেখে।
তবে এখানে স্মরণীয়—স্বামীর আনুগত্য ইসলামে ন্যায় ও শরিয়তের সীমার মধ্যে। এটি অন্ধ অনুসরণ নয়; বরং পারিবারিক ভারসাম্য রক্ষার নৈতিক কাঠামো। একজন দায়িত্বশীল মা তার ব্যক্তিত্ব, ধৈর্য ও শালীনতার মাধ্যমে একটি প্রজন্মের চরিত্র নির্মাণে ভূমিকা রাখেন।
সন্তান প্রতিপালনে শৃঙ্খলার প্রয়োগ
রাসূল (সা.) বলেছেন:
“তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও…”
এ নির্দেশ প্রমাণ করে—নৈতিক ও দ্বীনি শিক্ষায় নিয়মতান্ত্রিক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। শৃঙ্খলা ছাড়া আদর্শ প্রজন্ম গঠন অসম্ভব।
উপসংহার
ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবার একটি ইবাদতের ক্ষেত্র। এখানে নেতৃত্ব আছে, কিন্তু স্বৈরতন্ত্র নেই; আনুগত্য আছে, কিন্তু মর্যাদাহানি নেই; ভালোবাসা আছে, কিন্তু সীমালঙ্ঘন নেই।
যখন পরিবারপ্রধান আদর্শ হন, মা সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত থাকেন, এবং সন্তানরা দায়িত্বশীল শৃঙ্খলায় বেড়ে ওঠে—তখন পরিবার হয়ে ওঠে শান্তির নিবাস, সমাজের ভিত্তি এবং জান্নাতের এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি।
বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
মাহে রমজানের গুরুত্ব ও মর্যাদা
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
বছর ঘুরে আবার আমাদের মাঝে ফিরে এলো সিয়াম সাধনার মাস, আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের সর্বোত্তম মাস মাহে রমজান। পবিত্র এই মাস মুমিনের হৃদয়ে আল্লাহভীতি বৃদ্ধি করে এবং গুনাহ থেকে মুক্ত রাখে। এটি কেবল উপবাস নয়, বরং রোজা, তারাবি, কুরআন তিলাওয়াত ও দান-সদকার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য ও সততা শিক্ষার এক অনন্য মাস। এই মাস রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। তবে এ সবই নির্ভর করে পবিত্র এ মাসটিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ওপর, এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তের সঠিক ব্যবহারের ওপর। আগ থেকেই যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণের ওপর। আর যথাযথ প্রস্তুতি আমরা তখনই নিতে পারবো যখন আমরা এই মাসের মর্যাদা, গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারবো।
রোজা কী?
আরবি ‘সিয়াম’ (صيام) শব্দের অর্থ বিরত থাকা, কোনো কিছু থেকে বেঁচে থাকা, আত্মসংযম করা। ইসলামের পরিভাষায়, সুবহে সাদিক (ভোর) থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, স্ত্রী সহবাস এবং যাবতীয় পাপ কাজ বা নিষিদ্ধ বিষয় থেকে নিজেকে বিরত রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বিশেষ ইবাদতকে সিয়াম পালন বা রোজা রাখা বলা হয়। এটি 'সওম' শব্দের বহুবচন।
রোজা রাখার নিয়ম
রোজা রাখার নিয়ম হল সুবহে সাদিকের আগে ঘুম থেকে উঠে রোজা রাখার সংকল্প বা নিয়ত করে সুবহে সাদিকের পূর্বে সেহরি বা খাওয়া-দাওয়া সম্পন্ন করে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, স্ত্রী সহবাস (যৌনতা) এবং যাবতীয় পাপ কাজ বা নিষিদ্ধ বিষয় থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং সূর্যাস্তের পর ইফতার করা (রোজা ভাঙ্গা)।
রোজার নিয়ত
রোজার নিয়ত হলো মনে মনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখার সংকল্প করা, যা মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক নয়। তবে কেউ ইচ্ছে করলে মুখেও উচ্চারণ করতে পারে। যেমন: নাওয়াইতু আন আছুমা গাদাম মিন শাহরি রমাদানাল মুবারাক; ফারদাল্লাকা ইয়া আল্লাহু, ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নিকা আনতাস সামিউল আলিম।
বাংলা অর্থ:
আমি আগামীকাল রমজানের বরকতপূর্ণ মাসের ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করছি। হে আল্লাহ, তোমার সন্তুষ্টির জন্য আমার পক্ষ থেকে (এই সংকল্প ও প্রচেষ্টা) কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
রোজা উদ্দেশ্য:
রোজা রাখার উদ্দেশ্য হলো মুত্তাকী হওয়া বা তাকওয়ার গুণাবলী অর্জন করা। মুত্তাকী শব্দটি তাকওয়া শব্দ থেকে এসেছে। এটি একটি গুণবাচক নাম। এর অর্থ বেঁচে থাকা, নিরাপদ থাকা, বিরত থাকা। ইসলামী পরিভাষায় তাকওয়া বা পরহেজগারী বলতে বুঝায় আল্লাহকে ভয় করে, তাঁর সন্তুষ্টি ও ক্ষমা লাভের আশায় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা বা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা থেকে বিরত থাকা এবং যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তার নির্দেশ মেনে চলা বা নেক আমল করা। যারা এভাবে তাকওয়া অবলম্বন করে জীবন যাপন করে তাদেরকে মুত্তাকী বলা হয়। সুতরাং রোজার উদ্দেশ্য হল মানুষ রোজা রেখে বা সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নিজের কুপ্রবৃত্তিকে দমন বা নিয়ন্ত্রণ ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার অভ্যাস গড়ে তুলবে এবং আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের চেষ্টা করবে যাতে তার শরীর ও আত্মা পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধতা লাভ করতে পারে। এটি শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার মাস নয়, বরং চিন্তা, কথা ও কাজের পরিশুদ্ধির একটি প্রশিক্ষণ, যা সারা বছর ধরে ভালো অভ্যাস বজায় রাখতে সাহায্য করে। কোন মুমিন মুসলিম ব্যক্তি যখন এইসব গুণাবলী অর্জন করতে সক্ষম হন তখন তাকে মুত্তাকি বলা হয়। মুত্তাকী হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা মাহে রমজানের মূল উদ্দেশ্য।
রোজার গুরুত্ব
প্রথম কথা হল রোজা রাখা ফরজ। সকল মুসলিম যারা বয়সসীমায় পৌঁছেছেন, সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী এবং যাদের স্বাস্থ্য ভালো, তাদের অবশ্যই রমজান মাসে রোজা রাখতে হবে। কেননাআল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বয়ং রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআন মজিদে আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন রোজা রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন - ‘হে মু’মিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়াম (রোজা) ফরজ করা হল, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।’ -[বাকারা : ১৮৩]
একই সূরায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরো বলেছেন– “রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসে রোযা পালন করে।’ -(সূরা বাকারা আয়াত ১৮৫)
উপরোক্ত আয়াত দুটোতে রোজার গুরুত্ব, মর্যাদা, উদ্দেশ্য এবং রোজার সাথে কোরআনের সম্পর্ক বলে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে রোজা পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্যো ফরজ করা হয়েছিল। অর্থাৎ শুধু হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর উম্মতদের উপরে নয় পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতদের উপরও রোজা রাখা ফরজ ছিল। এ থেকেই রোজার গুরুত্ব বোঝা যায়।
এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসের রোজা রাখাকে ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন: পাঁচটি স্তম্ভের উপর ইসলামের বুনিয়াদ স্থাপিত। এগুলো হলো- ১.ঈমান- আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহ’র রাসূল এই প্রত্যয় ব্যক্ত করা; ২. নামাজ কায়েম করা; ৩. যাকাত প্রদান করা; ৪. রমজান মাসের রোজা রাখা এবং ৫. বাইতুল্লা’য় হজ্জ করা।
মাহে রমজানের অনন্য মর্যাদা
রোজাদারের মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “মানুষ যত প্রকার নেক কাজ করে আমি তার সওয়াব ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ বৃদ্ধি করে দিই। কিন্তু রোজার সওয়াবের পুরস্কার স্বয়ং আমি প্রদান করব। অথবা আমি নিজেই রোজার সওয়াবের পুরস্কার।” এ প্রসঙ্গে হাদিস শরিফে আরও উল্লেখ হয়েছে, যে ব্যক্তি এ মাসে কোনো নফল কাজ করল সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করল। আর যে এ মাসে কোনো ফরজ আদায় করল সে যেন অন্য মাসে ৭০টি ফরজ আদায় করল। নবী করিম (সা) আরও ঘোষণা করেছেন, “যারা রমজান মাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত রোজা পালন করবে, তারা ওই দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে যাবে, যেদিন তাদের মা তাদের প্রসব করেছিলেন।”
হযরত সালমান ফারসী (রা.) বলেন, শাবান মাসের শেষ দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের সামনে এরূপ বক্তৃতা প্রদান করতেন: - হে মানবগণ, অত্যন্ত মর্যাদাবান ও কল্যাণকর একটি মাস তোমাদের কাছে সমাগত। এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। আল্লাহ্ এ মাসে রোযা বা সিয়াম পালনকে ফরয করেছেন এবং এ মাসের রাতে তারাবীহ পড়াকে নফল করেছেন। (অর্থাৎ ফরয নয়, বরং সুন্নাত যা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।) এ মাসের একটি নফল আমল অন্য মাসে একটা ফরয আমলের সমান। আর এ মাসের একটি ফরজ আমল অন্য মাসের ৭০ টি ফরজ আমলের সমান।
আত্মশুদ্ধির মাস রমজান
হযরত সালমান ফারসী (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু সালাম আরও বলেছেন, রমজান মাস সবর ও সহিষ্ণুতার মাস। আর সবর ও সহিষ্ণুতার প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত। (মিশকাত)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ঈমান ও এহতেসাবের (আত্মসমালোচনার) সাথে রমযানের রোজা পালন করে, আল্লাহ তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেন। আর যে রমযানের রাতে ঈমান ও এহতেসাবের সাথে তারাবী নামায আদায় করবে, তার অতীতের সব পাপ আল্লাহ্ মাফ করে দেবেন। (বুখারী, মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, রোজা ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ যখন রোযা রাখে, সে যেন মুখ দিয়ে কোন প্রকার অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ না করে এবং অনর্থক চিৎকার ও চেঁচামেচি (ঝগড়া-ফাসাদ) না করে। কেউ যদি তাকে গালমন্দ করে বা তার সাথে ঝগড়া করতে উদ্যত হয়, এক্ষেত্রে তখন সে যেন বলে, আমি রোযাদার। (বুখারী, মুসলিম)
রোজা রেখেও যদি কেউ সংযমী না হয়, মিথ্যা কথা বলে ও প্রতারণা করে এবং উশৃংখল বা নিয়ন্ত্রণহীন জীবন যাপন করে; তাহলে তার রোজা রাখা কোনই কাজে আসবে না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে রোজা রেখেও মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ (প্রতারণা) করা ছাড়তে পারেনি, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এমন অনেক (হতভাগা) রোযাদার রয়েছে যার সিয়াম থেকে পিপাসায় কষ্ট পাওয়া ছাড়া আর কোন লাভ হয় না। আর (রমযানের রাতের) নামায তারাবীতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যেও এমন অনেকেই রয়েছে যাদের তারাবী থেকে বিনিদ্র রজনী অতিবাহিত করা ছাড়া আর কোন উপকার হয় না।
অর্থাৎ রোজার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করা না যায় তাহলে সারাদিন কষ্ট করে উপবাস, আর রাতে তারাবী পড়া কোন পুণ্যের কাজ বলে আল্লাহর কাছে গণ্য হবে না। এ হাদীসে অনেক রোযাদারের তৃষ্ণায় কষ্ট পাওয়া আর তারাবীতে অংশগ্রহণ করার প্রতি ইঙ্গিত প্রদর্শন করে সতর্ক করা হয়েছে।
রোজা রাখতে হবে শুধু আল্লাহকে রাজি খুশি করার জন্য। এক্ষেত্রে লোক দেখানো বা প্রদর্শনী করাথেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, কেউ যখন রোযা পালন করে তখন তার (মুখে) তেল লাগানো উচিত, যেন তার দেহে রোযার লক্ষণ দৃষ্টিগোচর না হয়। (আল-আদাবুল মুফরাদ)
অর্থাৎ- রোযা পালনকারীর উচিত সে যেন লোক দেখানো রোযা না রাখে বা এমনভাব তার দেহে প্রকাশিত না হয়। সে যেন, যথারীতি গোসল করে দেহে তেল মালিশ করে, যেন রোযার কারণে দেহে ফেকাশেভাব দৃষ্টিগোচর না হয়। গোসল এবং তেল মালিশে এসব অবস্থার সৃষ্টি হয় না।
রমজানে ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং প্রবৃত্তির চাহিদা দমন করার মাধ্যমে willpower বা ইচ্ছাশক্তি বাড়ে এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রশিক্ষণ হয়। এ মাসে লোভ, ক্রোধ, দুর্নীতি, অসততা ও সংকীর্ণতার মতো মন্দ গুণগুলো দমন করে ধৈর্য, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়ানোর মাধ্যমে সৎ গুণাবলীর বিকাশ লাভ হয়। গোসলের যেভাবে শরীরকে পবিত্র করা যায়, তেমনি রোজার মাধ্যমে আত্মাকে পাপ ও কলুষতা থেকে পরিষ্কার রাখা যায়। মোটকথা, রমজান মুমিনদের জন্য একটি আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি ও আত্মগঠনের মাস, যা তাদের একটি নতুন ও উন্নত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে।
রমজান মাস আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাস
রমজান মাস আল্লাহর নৈকট্য, রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস। এ মাসে রোজা, তারাবি, কুরআন তিলাওয়াত ও ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে, কারণ এ সময় শয়তান শৃঙ্খলিত থাকে, রহমতের দুয়ার খুলে দেওয়া হয় এবং প্রতিটি নেক কাজের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। পবিত্র এ মাস আত্মশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক উন্নতির পাশাপাশি আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে আসে।
এই মাসকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়: প্রথম ১০ দিন রহমত ও বরকত; দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাতের এবং শেষ ১০ দিন জাহান্নাম থেকে নাজাত বা মুক্তির জন্য নিবেদিত।
এই মাসে আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অশেষ রহমত ও বরকত বর্ষণ করেন। ‘রহমত' শব্দের অর্থ হলো দয়া, করুণা, অনুগ্রহ। রমজান মাসে আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো আল কোরআন, যা সমগ্র মানবজাতির মুক্তি ও এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ ও সফলতার পথ দেখায়। মাহে রমজান হলো সেই মাস যেদিন আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য পবিত্র কুরআন নাজিল করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, যা সুরা বাকারাতে (২:১৮৫) স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। তাই রমজানকে কুরআনের মাস বলা হয়
এ মাসে জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেয়া হয়। তাই এ মাসে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এক পবিত্র ভাবধারা বিরাজ করে। সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এই পবিত্র মাসে ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থেকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন। এ মাসে জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ রাখা হয় এবং প্রধান প্রধান শয়তানগুলোকে বন্দী রাখা হয়। তাই এ মাসে সাধারণভাবে ঈমানদারদের দিল নরম থাকে, তাদের হৃদয়, মন ও আত্মা আল্লাহ’র দিকে, মহান সৃষ্টিকর্তার দিকে রুজু থাকে। এই মাসকে বলা হয় দোয়া কবুলের মাস। এই মাসে রোজাদারের দোয়া, বিশেষ করে ইফতারের সময়ের দোয়া ও লাইলাতুল কদরের দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এই মাসটি বরকতে পরিপূর্ণ থাকে, কেননা এই মাসে যে কোন ভাল কাজ বা নেক আমল যেমন—নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত জিকির আজগার ও দান খয়রাতের সওয়াব ৭০ গুণ বা তার চেয়েও বেশি বৃদ্ধি পায়।
পবিত্র এই মাস অশেষ পূণ্যের মাস। মহানবী (সা.) এই মাসকে এক মহিমান্বিত ও বরকতময় মাস হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এই মাসে এমন এক রাত রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। বলাবাহুল্য, এই রাতটির নাম ক্বদরের রাত। মহানবী জানিয়েছেন, এ মাসের শেষ দশ দিনের বেজোর রাত সমূহের মধ্যেই ক্বদরের রাত নিহিত থাকে। এই শেষ দশদিনে মুসলমানদেরকে এতেকাফে বসার জন্যও তাগিদ দিয়েছেন তিনি। গুনাহ মাফ এবং জাহান্নাম থেকে নাজাতের আশায় এ সময় মুসলমানরা মসজিদে মসজিদে এতেকাফ করে থাকেন। ক্বদরের রাত ছাড়াও এ মাসের প্রতিটি রাত, প্রতিটি দিন এবং প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত বরকতপূর্ণ। মহানবী (সা.) বলেছেন, এই বরকতময় সময়ের একটি মুহূর্তও হেলায় হারানো উচিত নয়। বিশেষ করে ক্বদরের রাত তো নয়ই। মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ক্বদরের রাত থেকে বঞ্চিত হল তার মত হতভাগা আর নেই।