সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

আঁধারে ফোটা পদ্ম

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন আরব্য মরুভূমির বুক চিরে তখন তপ্ত হাওয়া বইছে। ধূ ধূ বালুকারাশির মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন শহর মক্কা। সেই শহরেরই এক সম্ভ্রান্ত কুরাইশ পরিবারে, ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে, যখন এক শিশু পৃথিবীর আলো দেখল, চারপাশটা যেন এক অলৌকিক শান্তিতে ভরে উঠল। মা আমেনা তাঁর সদ্যোজাত সন্তানের নাম রাখলেন 'মুহাম্মদ' (সা.)। কিন্তু এই আনন্দের আলোয় মিশে ছিল এক গভীর বিষাদের ছায়া। শিশু মুহাম্মদের জন্মের আগেই তাঁর পিতা আবদুল্লাহ পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। পৃথিবীর বুকে আসার আগেই তিনি হারিয়েছেন পিতৃস্নেহ। বনু সাদ গোত্রে অলৌকিক দিনগুলো মক্কার তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী, কোলাহলমুক্ত পরিবেশ, বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষা এবং সুস্থ শারীরিক গঠনের জন্য শিশু মুহাম্মদকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো মরুভূমির বনু সাদ গোত্রে। তাঁর দায়িত্ব নিলেন এক ভাগ্যবতী নারী—দুধমাতা হালিমা। বনু সাদ গোত্রে পা রাখার পর থেকেই ঘটতে লাগল একের পর এক অলৌকিক ঘটনা। হালিমা যখন মক্কায় এসেছিলেন, তখন তাঁর স্তনে দুধ ছিল না, তাঁদের সওয়ারির গাধাটি ছিল দুর্বল আর খিটখিটে। কিন্তু শিশু মুহাম্মদকে কোলে তুলে নেওয়ার সাথে সাথেই হালিমার স্তন দুধে ভরে উঠল। দুর্বল গাধাটি এত দ্রুত ছুটতে শুরু করল যে কাফেলার অন্য সবাই অবাক হয়ে গেল। শুধু তাই নয়, মুহাম্মদের উপস্থিতিতে হালিমার শুষ্ক চারণভূমি সবুজ হয়ে উঠল, ছাগলগুলো ওলন্দা ভরা দুধ নিয়ে ফিরতে লাগল। অভাবের সংসারে ফিরল অলৌকিক সচ্ছলতা। মরুভূমির উন্মুক্ত বাতাস আর সাদাসিধে জীবনযাত্রার মাঝে কাটতে লাগল মুহাম্মদের শৈশব। অন্য শিশুদের সাথে খেলতে খেলতেই কেটে গেল জীবনের প্রথম পাঁচটি বছর। এতিমত্বের তীব্র আঘাত ও চাচার আশ্রয় পাঁচ বছর বয়সে মুহাম্মদ (সা.) আবার ফিরে এলেন মক্কায়, মায়ের কোলে। কিন্তু মায়ের স্নেহের আঁচল বেশিদিন তাঁর কপালে জুটল না। মাত্র ৬ বছর বয়সে মা আমেনাও মদিনা থেকে ফেরার পথে 'আবওয়া' নামক স্থানে ইন্তেকাল করলেন। মরুভূমির সেই নিঝুম প্রান্তরে মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মুহাম্মদ (সা.)-এর চোখের পানি যেন মরুভূমির বালুকেও কাঁদিয়েছিল। তিনি হয়ে পড়লেন সম্পূর্ণ পিতৃ-মাতৃহীন, এক পরম এতিম। মায়ের মৃত্যুর পর পরম স্নেহে নাতিকে বুকে টেনে নিলেন দাদা আবদুল মুত্তালিব। কিন্তু মুহাম্মদের (সা.) বয়স যখন মাত্র ৮ বছর, তখন দাদাও দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। একের পর এক আপনজনকে হারিয়ে ছোট্ট মুহাম্মদের মন যখন নিদারুণ কষ্টে ভেঙে পড়েছে, তখন তাঁর দায়িত্ব নিলেন আপন চাচা আবু তালিব। চাচার আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে ছিল ভাতিজার জন্য উজাড় করা ভালোবাসা। সিরিয়া সফর ও পাদ্রি বহিরার ভবিষ্যৎবাণী চাচা আবু তালিবের ঘরে এসে মুহাম্মদের (সা.) কৈশোরকাল শুরু হলো। ১২ বছর বয়সে এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন তিনি। চাচা আবু তালিব ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। প্রিয় ভাতিজাকে মক্কায় একা রেখে যেতে মন চাইছিল না তাঁর। তাই মুহাম্মদকেও (সা.) সাথে নিলেন। দীর্ঘ মরু পথ পাড়ি দিয়ে কাফেলা যখন সিরিয়ার 'বুসরা' নামক স্থানে পৌঁছাল, তখন সেখানে 'বহিরা' নামে এক খ্রিষ্টান পাদ্রি থাকতেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, একটি মেঘখণ্ড দূর আকাশ থেকে এসে কাফেলার ওপর ছায়া দিচ্ছে, আর মুহাম্মদ যে গাছের নিচে বসেছেন, তার ডালগুলো ঝুঁকে তাঁকে রোদ থেকে আড়াল করছে। বহিরা কাফেলাকে নিমন্ত্রণ করলেন এবং কিশোর মুহাম্মদকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। তিনি তাঁর হাত ও পিঠের মোহরে নবুওয়াত দেখে চিনে ফেললেন। বহিরা আবু তালিবকে ডেকে বললেন, "এই বালক সাধারণ কোনো শিশু নয়। ও শেষ জামানার নবী। একে মক্কার ইহুদিদের হাত থেকে সাবধানে রাখুন। চাচার মন এক অজানা বিস্ময় ও শ্রদ্ধায় ভরে উঠল। তিনি ব্যবসা দ্রুত শেষ করে মক্কায় ফিরে এলেন। কৈশোরের কর্মজীবন ও সততার পরীক্ষা মক্কার তপ্ত বালুকাভূমির উপর সূর্যের প্রখর তাপ মরুভূমির হাওয়াকে যখন আরও উত্তপ্ত করে তুলছিল, তখন কিশোর মুহাম্মদ (সা.) নিজের কর্মদক্ষতা ও সততার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। তিনি চাচার সংসারে সচ্ছলতা আনতে এবং নিজের দায়িত্ববোধ থেকে ব্যবসার কাজে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। একবার এক বাণিজ্যিক কাফেলা যখন মরুভূমির কঠিন পথ পাড়ি দিচ্ছিল, তখন ক্লান্তি ও তৃষ্ণা মেটাতে একটি স্থানে সবাই যাত্রাবিরতি নেন। চারদিকে যখন বণিকদের ব্যস্ততা আর উটের কোলাহল, ঠিক তখনই কাফেলার একজন বয়োবৃদ্ধ বণিক আবিষ্কার করলেন যে, তাঁর অত্যন্ত মূল্যবান অলংকার ও অর্থ ভর্তি চামড়ার ব্যাগটি কোথাও হারিয়ে গেছে। মরুভূমির এই অন্তহীন বালুকারাশির মাঝে সেই ব্যাগ খুঁজে পাওয়া ছিল একপ্রকার অসম্ভব। বণিক যখন নিরাশ হয়ে বিলাপ করছিলেন, তখন কিশোর মুহাম্মদ (সা.) তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং পরম মমতায় তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন। তপ্ত রোদে গা ঘেমে নেয়ে উঠলেও মুহাম্মদ (সা.) ক্লান্তিহীনভাবে মরুভূমির ধূলিময় বালুর প্রতিটি কোণ ও পাথরের আড়াল খুঁজতে শুরু করলেন। তাঁর এই অসাধারণ নিষ্ঠা দেখে কাফেলার অভিজ্ঞ বণিকরাও বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। দীর্ঘ সময় নিখুঁতভাবে খোঁজার পর একটি বড় পাথরের আড়ালে বালুচাপা পড়ে থাকা সেই মূল্যবান ব্যাগটি তিনি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন। তিনি ব্যাগটি এনে সেই বৃদ্ধ বণিকের হাতে তুলে দিলে, বণিক পরীক্ষা করে দেখলেন তাঁর একটি মুদ্রাও খোয়া যায়নি। কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে বণিক তাঁকে বড় অঙ্কের পুরস্কার দিতে চাইলেন, কিন্তু কিশোর মুহাম্মদ (সা.) মৃদু হেসে তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, "আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি, এর জন্য কোনো প্রতিদানের প্রয়োজন নেই।" এই ঘটনা কাফেলার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে তাঁর প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করেছিল। জাহিলিয়াতের মাঝে এক টুকরো আলো তৎকালীন মক্কার সমাজ ডুবে ছিল জাহিলিয়াত বা চরম অন্ধকারের সাগরে। জুয়া, মদ্যপান, ব্যভিচার, লুটতরাজ আর তুচ্ছ কারণে গোত্রীয় মারামারি ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। কিন্তু কিশোর মুহাম্মদ (সা.) এই পাপাচারের পঙ্কিলতার মাঝেও ছিলেন পদ্মফুলের মতো পবিত্র। তিনি কখনো কোনো মূর্তির সামনে মাথা নত করেননি, কখনো কোনো পাপকাজে অংশ নেননি। মক্কার যুবকেরা যখন আমোদ-প্রমোদে মেতে থাকত, তিনি তখন শান্ত মনে চিন্তা করতেন প্রকৃতির সৃষ্টি রহস্য নিয়ে। চাচার সংসারের হাল ধরতে তিনি মাঝে মাঝে মাঠে মেষ চড়াতেও যেতেন। নির্জন প্রান্তর আর প্রকৃতির মাঝে একা কাটাতে কাটাতে তাঁর মন হয়ে উঠেছিল আরো কোমল ও সংবেদনশীল। পরম বিশ্বাসী 'আল-আমিন' শৈশব ও কৈশোর থেকেই মুহাম্মদ (সা.)-এর মুখে কখনো কেউ একটিও মিথ্যা কথা শোনেনি। তিনি কারো সাথে কখনো কোনো প্রতারণা করেননি, কাউকে কষ্ট দেননি এবং কারো আমানতের খেয়ানত করেননি। মরুভূমির সেই হারিয়ে যাওয়া ব্যাগ ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাসহ তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের অতুলনীয় সততা, বিনয় আর পরম আমানতদারিতার কারণে মক্কার শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সমাজের সবাই এক নামে তাঁকে 'আল-আমিন' বা 'পরম বিশ্বাসী' উপাধিতে ভূষিত করেছিল। মানুষ নিজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ নিশ্চিন্তে এই কিশোরের কাছে এনে গচ্ছিত বা আমানত রাখত। ফিজার যুদ্ধ ও হিলফুল ফুজুল গঠন কিশোর পেরিয়ে মুহাম্মদ (সা.) যখন তারুণ্যের শুরুতে (১৫ থেকে ২০ বছর বয়সের মাঝে), তখন মক্কায় এক ভয়াবহ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল, যার নাম 'ফিজার যুদ্ধ' বা অন্যায় সমর। পবিত্র মাসে নিষিদ্ধ জেনেও কুরাইশ ও কায়েস গোত্রের মাঝে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ প্রায় চার বছর ধরে চলেছিল। কিশোর মুহাম্মদ (সা.) তার চাচাদের সাথে এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তবে তিনি নিজে কারো ওপর অস্ত্র তোলেননি; শুধু শত্রুর ছুঁড়ে দেওয়া তীরগুলো কুড়িয়ে চাচাদের হাতে তুলে দিতেন। যুদ্ধের এই নিষ্ঠুরতা, লাশের স্তূপ আর নিরপরাধ মানুষের আর্তনাদ তাঁর কোমল হৃদয়কে গভীরভাবে ব্যথিত করল। তিনি ভাবলেন, এভাবে একটি সমাজ চলতে পারে না। যুদ্ধ শেষ হলে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি সমমনা ও পরোপকারী যুবকদের একত্রিত করলেন। তাঁদের নিয়ে তিনি গঠন করলেন একটি শান্তি সংঘ, যার নাম 'হিলফুল ফুজুল'। এই সংঘের মূল শপথ ছিল: * সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। * মজলুম ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষা করা। * কোনো অন্যায়কারীকে মক্কায় প্রশ্রয় না দেওয়া এবং বহিরাগত পথিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো ধরনের বিলাসিতা বা অহংকার ছাড়াই, তীব্র এতিমত্ব আর কষ্টের মাঝে বড় হওয়া এই কিশোরের হাত ধরেই মক্কার অন্ধকার সমাজে শান্তির প্রথম আলো জ্বলে উঠেছিল—যা পরবর্তীতে পুরো পৃথিবীর ইতিহাসকে বদলে দেওয়ার মূল ভিত্তি তৈরি করেছিল।

মদিনার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ

১.মদিনার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ মদিনার ইতিহাসে এমন উৎসবের দিন আর কখনো আসেনি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মক্কার কাফেরদের সমস্ত নির্যাতন ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আল্লাহর রাসুল (সা.) এবং তাঁর সঙ্গী হযরত আবু বকর (রা.) মদিনার সীমানায় এসে পৌঁছেছেন। চারিদিকে আনন্দ-উল্লাস। মদিনার আনসার (সাহায্যকারী) মুসলমানেরা তাঁদের প্রিয় নবীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। বনু নাজ্জার গোত্রের ছোট ছোট মেয়েরা দফ (এক ধরণের বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে সমস্বরে গেয়ে উঠল সেই অমর পঙক্তিমালা: > *"তালাআল বাদরু আলাইনা, মিন ছানিয়্যাতিল ওয়াদা,* > *ওয়াজাবাশ শুকরু আলাইনা, মা দাআ লিল্লাহি দা..."* > *(আমাদের ওপর পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে ‘ওয়াদা’ উপত্যকা থেকে। আমাদের ওপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা ওয়াজিব হয়েছে, যতদিন কোনো আহ্বানকারী আল্লাহকে আহ্বান করবে।)* > আনসারদের প্রতিটি পরিবার চাইছিল আল্লাহর রাসুল (সা.) যেন তাদের বাড়িতে মেহমান হন। সবাই তাঁর উটের লাগাম ধরে টানাটানি করছিল এবং বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছিল, "হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের এখানে অবস্থান করুন। এখানে নিরাপত্তা এবং লোকবল দুই-ই আছে।" রাসুলুল্লাহ (সা.) কারও মনে কষ্ট দিতে চাইলেন না। তিনি মৃদু হেসে এক ঐতিহাসিক ফয়সালা দিলেন। তিনি বললেন: > "তোমরা কাসওয়াকে (রাসুলের উটের নাম) ছেড়ে দাও। একে আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি যেখানে গিয়ে বসবে, সেখানেই আমার বাসস্থান হবে।" > সবাই উটের পেছনে পেছনে হাঁটতে লাগল। কাসওয়া ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বনু নাজ্জার গোত্রের একটি খালি জায়গায় গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। জায়গাটি ছিল দুজন এতিম শিশু— সাহল ও সুহাইলের। পাশেই ছিল হযরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর বাড়ি। রাসুল (সা.) বললেন, "এখানেই হবে আমাদের মসজিদ ও আবাস।" তিনি আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর বাড়িতে মেহমান হিসেবে উঠলেন। ## ২. মসজিদে নববীর ভিত্তিপ্রস্তর: ঐক্যের প্রথম ধাপ রাসুল (সা.) মদিনায় পা রেখেই বুঝতে পেরেছিলেন, একটি শক্তিশালী সমাজ গঠনে প্রথম প্রয়োজন একটি কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে সবাই দিনে পাঁচবার একত্রিত হবে। তিনি এতিম দুই ভাইয়ের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য দিয়ে সেই জমিটি কিনে নিলেন। শুরু হলো **মসজিদে নববী** নির্মাণের কাজ। এটি কেবল ইবাদতের জায়গা ছিল না, বরং এটি ছিল একাধারে সংসদ ভবন, আদালত এবং মুসলমানদের মিলনমেলা। মসজিদ নির্মাণে কোনো রাজকীয় জাঁকজমক ছিল না। কাঁচা ইট, খেজুরের ডাল আর গাছের খুঁটি দিয়ে তৈরি হচ্ছিল এই ঐতিহাসিক স্থাপনা। সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিল— স্বয়ং আল্লাহর রাসুল (সা.) সাধারণ শ্রমিকদের মতো মাথায় করে ভারী ভারী পাথর আর ইট বহন করছিলেন। তাঁর গা থেকে ঘাম ঝরে পড়ছিল। তাঁকে এভাবে কাজ করতে দেখে আনসার ও মুহাজিরদের (মক্কা থেকে হিজরতকারী) ক্লান্তি উবে গেল। তাঁরা দ্বিগুণ উৎসাহে গান গেয়ে গেয়ে কাজ করতে লাগলেন: > *"হে আল্লাহ! পরকালের কল্যাণই আসল কল্যাণ,* > *তুমি আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি দয়া করো।"* > মসজিদটি যখন সম্পন্ন হলো, তখন সেটি মদিনার বুকে এক টুকরো জান্নাতে পরিণত হলো। কিন্তু রাসুল (সা.) জানতেন, কেবল ইটের দেয়াল দিয়ে সমাজ গড়া যায় না; সমাজ গড়তে হলে মানুষের অন্তরের দেয়ালগুলো ভাঙতে হয়। ## ৩. আনসারদের ত্যাগ ও মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভ্রাতৃত্ববন্ধন মক্কা থেকে আসা মুহাজিররা ছিলেন রিক্তহস্ত। কাফেরদের ভয়ে তাঁরা ঘরবাড়ি, ব্যবসা, সম্পদ— সব মক্কাতেই ফেলে শুধু নিজের প্রাণ আর ইমান বাঁচিয়ে মদিনায় এসেছিলেন। তাঁদের না ছিল থাকার জায়গা, না ছিল জীবিকার উপায়। এই সংকট নিরসনে আল্লাহর রাসুল (সা.) এক অতুলনীয় ও অলৌকিক সামাজিক পদক্ষেপ নিলেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে "মুআখাত" বা ভ্রাতৃত্ববন্ধন নামে পরিচিত। তিনি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বাড়িতে আনসার এবং মুহাজিরদের এক সমাবেশের ডাক দিলেন। সেখানে রাসুল (সা.) একজন মুহাজির ও একজন আনসারকে ডেকে বললেন, "আজ থেকে তোমরা একে অপরের ভাই।" মক্কার মুহাজিরদের প্রতি মদিনার আনসারদের এই অগাধ ভালোবাসা ও ত্যাগ ছিল মূলত আল্লাহর প্রতি তাদের আন্তরিক ভালোবাসারই এক পরম বহিঃপ্রকাশ। তবে এর পেছনে আরেকটি গভীর কারণও ছিল— তা হলো মক্কার মুহাজিরদের এক অনন্য ও মহান বিশেষত্ব। এই মুহাজিররা ছিলেন সরাসরি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতে গড়া ও সুপ্রশিক্ষিত মানুষ, যাঁরা দীর্ঘ ১৩ বছর মক্কার কাফেরদের অমানুষিক ও নিষ্ঠুর অত্যাচার সহ্য করেও ইমানের ওপর পাহাড়ের মতো অটল ছিলেন। তাঁরা সরাসরি আল্লাহর রাসুলের পবিত্র সান্নিধ্য থেকে দ্বীনের প্রকৃত তালিম বা শিক্ষা পেয়েছিলেন এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের আত্মগঠন করেছিলেন। শুধুমাত্র আল্লাহর দ্বীন ও সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার খাতিরে তাঁরা নিজেদের পরম মায়ার ঘরবাড়ি, চেনা পরিবেশ ও সমস্ত সহায়-সম্পদ এক পলকে ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। এই কারণেই মুহাজিরদের প্রতি আনসারদের অন্তরে ছিল এক গভীর ও বিশেষ শ্রদ্ধা। আনসাররা সবসময় এই মুখলেস মুহাজির ভাইদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। কারণ, তাঁদের সাথে থাকলে, তাঁদের সান্নিধ্যে বসলে দ্বীন সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানা যেত এবং রাসুলের সরাসরি ছাত্রদের দেখে নিজেদের চরিত্র ও জীবনকে আদর্শ রূপ দেওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি হতো। এই আত্মিক টানের কারণেই ঘোষণা হওয়া মাত্রই আনসাররা তাঁদের মুহাজির ভাইদের শুধু মুখে আপন বলেননি, বরং তাঁদের অন্তরের গভীরে জায়গা দিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, মদিনার ধনী আনসার সাহাবি হযরত সাদ ইবনুর রাবি (রা.)-কে মক্কার মুহাজির সাহাবি হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর ভাই বানিয়ে দেওয়া হলো। সাদ (রা.) তাঁর ভাইকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন, "ভাই আবদুর রহমান! আমি মদিনার অন্যতম ধনী ব্যক্তি। এই নাও আমার সমস্ত সম্পত্তি, একে সমান দুই ভাগে ভাগ করো। এক ভাগ তোমার, অন্য ভাগ আমার।" আনসারদের এই অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগ দেখে মুহাজিররা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তবে তাঁরাও কোনো পরজীবী বা অলস লোক ছিলেন না। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) চোখের পানি মুছে বললেন, "ভাই সাদ! আল্লাহ তোমার পরিবার ও সম্পত্তিতে বরকত দিন। আমার এসবের প্রয়োজন নেই। তুমি শুধু আমাকে মদিনার বাজারের পথটা দেখিয়ে দাও।" (পরবর্তীতে আবদুর রহমান ইবনে আউফ নিজের পরিশ্রমে মদিনার বড় ব্যবসায়ী হয়েছিলেন)। যাঁদের চাষের জমি ছিল, তাঁরা মুহাজির ভাইদের অর্ধেক জমি লিখে দিলেন। যাঁদের খেজুর বাগান ছিল, তাঁরা বললেন, "শ্রম আমরা দেব, কিন্তু ফল কাটার পর অর্ধেক তোমার ঘরে যাবে।" মদিনার আনসারদের এই নিঃস্বার্থ ও পবিত্র ভালোবাসার কথা পবিত্র কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সুরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে অবিনশ্বর করে রেখেছেন: "তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত।" ## ৪. এক নতুন সভ্যতার জন্ম মসজিদে নববী নির্মাণ এবং এই অভূতপূর্ব ভ্রাতৃত্ববন্ধনের মাধ্যমে মদিনায় এমন এক মজবুত ভিত্তি তৈরি হলো, যা আরবের হিংসা, গোত্রবাদ আর অহংকারকে চিরতরে মিটিয়ে দিল। মক্কার কুরাইশ, মদিনার আওস ও খাজরাজ গোত্র এবং দাস-মনোভাবাপন্ন সমাজ ভেঙে সবাই এক দেহে পরিণত হলো। আনসারদের সেই উদারতা ও মুহাজিরদের আত্মমর্যাদাবোধের ওপর ভর করেই মদিনা হয়ে উঠল পৃথিবীর বুকে ইসলামের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণ রাষ্ট্র। যেখানে ভালোবাসা জয় করেছিল সমস্ত অভাবকে, আর ত্যাগ প্রতিষ্ঠা করেছিল এক অপরাজেয় সভ্যতাকে।

উম্মে মা'বাদের ছাগল

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ইতিহাসের পাতায় **উম্মে মা’বাদ (রা.)** এবং তাঁর দুর্বল ছাগলটির ঘটনা এক অবিস্মরণীয় অলৌকিক বা মোজেজা হয়ে আছে। মরুভূমির তীব্র খরা আর ক্লান্তির মাঝে আল্লাহর পক্ষ থেকে নেমে আসা এক অপূর্ব বরকতের গল্প এটি। ### মরুভূমির সেই ক্লান্তিকর যাত্রা ৬২২ খ্রিস্টাব্দ। মহানবী (সা.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। সাথে আছেন তাঁর পরম বিশ্বস্ত সঙ্গী **হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)**, পথপ্রদর্শক আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত এবং খাদেম আমের ইবনে ফুহাইরা। কুরাইশদের চোখ ফাঁকি দিতে তাঁরা চেনা পথ ছেড়ে মরুভূমির এক দুর্গম ও অচেনা পথ ধরে এগোচ্ছিলেন। তীব্র রোদ আর মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে দিনের পর দিন পথ চলায় তাঁরা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। সাথে থাকা খাবার এবং পানিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। ### উম্মে মা’বাদের তাঁবুতে আগমন চলতে চলতে তাঁরা ‘কাদিদ’ নামের একটি মরু এলাকায় এসে পৌঁছালেন। সেখানে একটি একাকী তাঁবু ছিল। তাঁবুটি ছিল এক মেষপালক বেদুইন নারীর, যাঁর নাম ছিল আতিকা বিন্তে খালেদ। তবে সবাই তাঁকে **উম্মে মা’বাদ** নামেই চিনত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও অতিথি পরায়ণ। তাঁবুর সামনে বসে আসা-যাওয়ার পথে ক্লান্ত পথিকদের খাবার ও পানি দিয়ে সাহায্য করাই ছিল তাঁর আনন্দ। রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেনার মতো কোনো মাংস বা খেজুর উম্মে মা’বাদের কাছে আছে কি না। উম্মে মা’বাদ খুব আফসোস করে বললেন, *"আল্লাহর কসম! আমাদের কাছে যদি বিন্দুমাত্র খাবার থাকত, তবে আপনাদের তা চেয়ে নিতে হতো না। তীব্র খরায় চারপাশ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, আমাদের ঘরের সব খাবার শেষ।"* ### সেই দুর্বল ও বন্ধ্যা ছাগলটি ঠিক তখনই আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁবুর এক কোণে একটি জীর্ণ-শীর্ণ, দুর্বল ছাগল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। > নবীজী (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, *"হে উম্মে মা’বাদ! ওই কোণে ওটা কোন ছাগল?"* > উম্মে মা’বাদ উত্তর দিলেন, *"ওটা এতই দুর্বল ও অসুস্থ যে অন্য ছাগলদের সাথে মাঠে চড়তে পর্যন্ত যেতে পারেনি।"* > নবীজী (সা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, *"ও কি কোনো দুধ দেয়?"* > উম্মে মা’বাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, *"দুধ দেবে কী করে! ওর শরীরে এক ফোঁটা দুধও নেই।"* > তখন নবীজী (সা.) মৃদু হেসে বললেন, *"তুমি কি আমাকে ওটার ওলন্দ (দুধের স্থান) থেকে দুধ দোহন করার অনুমতি দেবে?"* > উম্মে মা’বাদ অবাক হলেন, তবে বিনীতভাবে বললেন, *"আমার বাবা-মা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন! আপনি যদি মনে করেন ওর শরীরে দুধ পাবেন, তবে অবশ্যই দোহন করতে পারেন।"* > ### অলৌকিক বরকতের ছোঁয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) পরম মমতায় সেই দুর্বল ছাগলটির কাছে গেলেন। তিনি তাঁর বরকতময় হাত দিয়ে ছাগলটির ওলন্দ স্পর্শ করলেন এবং আল্লাহর নাম (**বিসমিল্লাহ**) স্মরণ করে বরকতের দোয়া করলেন। সাথে সাথেই সেখানে এক অভাবনীয় অলৌকিক ঘটনা ঘটল: * ছাগলটির শুকনো ওলন্দ মুহূর্তের মধ্যে দুধে ভরে ওজনে ভারী হয়ে উঠল। * যে ছাগলটি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না, সেটি সুস্থ-সবল হয়ে পরম শান্তিতে জাবর কাটতে শুরু করল। নবীজী (সা.) একটি বড় পাত্র চাইলেন, যা দিয়ে কয়েকজন মানুষের তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব। তিনি দুধ দোহন করতে শুরু করলেন এবং পাত্রটি ঘন, সাদা দুধে একদম উপচে পড়ল। নেতা হিসেবে নবীজী (সা.) কিন্তু নিজে আগে পান করেননি। তিনি প্রথমে সেই দুধের পাত্রটি **উম্মে মা’বাদ**কে দিলেন। উম্মে মা’বাদ পেট ভরে তৃপ্তি সহকারে সেই দুধ পান করলেন। এরপর নবীজী (সা.) তাঁর সঙ্গীদের দিলেন এবং তাঁরাও মন ভরে পান করলেন। সবার শেষে আল্লাহর রাসূল (সা.) নিজে পান করলেন এবং বললেন: *“যিনি মানুষকে খাওয়ান বা পান করান, তিনি সবার শেষেই পান করবেন—এটাই নিয়ম।”* সবাই তৃপ্ত হওয়ার পর নবীজী (সা.) দ্বিতীয়বার আবার সেই ছাগলটির দুধ দোহন করলেন এবং পুরো পাত্রটি দুধে পূর্ণ করে উম্মে মা’বাদের কাছে উপহার হিসেবে রেখে দিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে আবার যাত্রা শুরু করলেন। ### স্বামীর বিস্ময় ও নবীজীর রূপ বর্ণনা সন্ধ্যাবেলায় উম্মে মা’বাদের স্বামী **আবু মা’বাদ** তাঁর হাড্ডিসার, ক্ষুধার্ত ছাগলের পাল নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। ঘরে এসে দুধের বড় পাত্রটি উপচে পড়া তাজা দুধে ভরা দেখে তিনি তো অবাক! তিনি বিস্ময় নিয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, *"উম্মে মা’বাদ, এই দুধ তুমি কোথায় পেলে? আমাদের ছাগলগুলো তো মাঠেই ছিল, আর ঘরে তো দুধ দেওয়ার মতো কোনো ছাগলই নেই!"* উম্মে মা’বাদ তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, *"আল্লাহর কসম! আজ আমাদের এখানে একজন অত্যন্ত বরকতময় মানুষ এসেছিলেন এবং এই অলৌকিক ঘটনাটি ঘটেছে।"* আবু মা’বাদ কৌতুহলী হয়ে বললেন, *"আমাকে একটু বলো তো, কেমন দেখতে ছিলেন তিনি?"* তখন উম্মে মা’বাদ নবীজী (সা.)-এর এমন এক অপরূপ ও নিখুঁত বর্ণনা দিলেন, যা ইসলামের ইতিহাসে নবীজীর সৌন্দর্যের সবচেয়ে সুন্দর বর্ণনাগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হয়। তিনি বলেছিলেন: * "তিনি ছিলেন এক দীপ্তিময় চেহারার অধিকারী, যাঁর স্বভাব ছিল অসম্ভব সুন্দর। * তাঁর চোখ দুটো ছিল গভীর কালো, আর চোখের পাপড়িগুলো ছিল দীর্ঘ ও আকর্ষণীয়। * তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত মিষ্টি এবং গলার গড়ন ছিল চমৎকার। * তিনি যখন চুপ থাকতেন, তখন তাঁর মাঝে এক গম্ভীর মর্যাদা প্রকাশ পেত; আর যখন তিনি কথা বলতেন, তখন যেন চারপাশ মুগ্ধ হয়ে যেত। * দূর থেকে দেখলে তাঁকে সবচেয়ে সুন্দর ও উজ্জ্বল দেখাত, আর কাছ থেকে দেখলে মনে হতো তিনি কত আপন।" সব শুনে আবু মা’বাদ আবেগপ্লুত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন, *"আল্লাহর কসম! ইনিই তো কুরাইশদের সেই মহামানব, যাঁকে মক্কার লোকেরা হন্যে হয়ে খুঁজছে। আমার তীব্র ইচ্ছা ছিল ওঁর সঙ্গী হওয়ার। আমি যদি কোনোদিন সুযোগ পাই, তবে অবশ্যই ওঁর কাছে চলে যাব।"* ### গল্পের শেষ অংশ নবীজী (সা.) চলে যাওয়ার পরও এই অলৌকিক বরকত শেষ হয়ে যায়নি। ইসলামের ইতিহাসে উল্লেখ আছে যে, উম্মে মা’বাদের সেই ছাগলটি এরপর অনেক বছর বেঁচে ছিল। পরবর্তীতে যখন মদিনায় তীব্র দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, তখনও এই ছাগলটি প্রচুর দুধ দিত, যা উম্মে মা’বাদের পুরো পরিবারের অভাব দূর করেছিল। এই ঘটনার কিছুদিন পর, উম্মে মা’বাদ এবং তাঁর স্বামী আবু মা’বাদ মদিনায় গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আজীবন অনুগত ও প্রিয় সাহাবি হিসেবে ধন্য হন।

রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

স্যার আইজ্যাক নিউটনের ধর্ম বিষয়ক মতামত

এখানে স্যার আইজ্যাক নিউটনের ধর্মীয় চিন্তাভাবনা ও বিশ্বাসের ওপর লেখাটি সহজ, সাবলীল এবং মার্জিত বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা হলো। সাধারণ পাঠকের পড়ার সুবিধার জন্য জটিল ধর্মতাত্ত্বিক শব্দগুলোকে সহজ করে উপস্থাপন করা হয়েছে। *(অনুবাদ থেকে অপ্রাসঙ্গিক নম্বর বা কোডগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে)* ## স্যার আইজ্যাক নিউটন: বিজ্ঞানীর অন্তরালে এক গোপন ধর্মবিশ্বাসী স্যার আইজ্যাক নিউটন একাধারে যেমন ছিলেন একজন একনিষ্ঠ খ্রিস্টান, তেমনি ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম এক ভিন্নপন্থী ধর্মতাত্ত্বিক। তিনি ধর্ম নিয়ে প্রায় ১৩ লাখ শব্দ লিখে গেছেন—যা তাঁর গণিত ও পদার্থবিদ্যার মোট লেখার চেয়েও বেশি। তাঁর জীবদ্দশায় এর বেশিরভাগই প্রকাশিত হয়নি। বর্তমানে এই লেখাগুলো জেরুজালেমের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে 'ইহুদা পাণ্ডুলিপি' (Yahuda manuscripts) হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। ### যুক্তিবাদী ও বাইবেল-ভিত্তিক ঈশ্বরবিশ্বাসী নিউটন প্রকৃতিকে একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র হিসেবে দেখতেন না, বরং একে জীবন্ত ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে মনে করতেন। তাঁর বিখ্যাত বই *অপটিক্স (Opticks)*-এ তিনি প্রশ্ন করেছিলেন: "চোখ কি আলোর বিজ্ঞান না জেনেই তৈরি হয়েছে? কিংবা কান কি শব্দের জ্ঞান ছাড়াই তৈরি হয়েছে?" তিনি নিজেই উত্তর দিয়েছেন—এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বে একজন "অশরীরী, জীবন্ত, বুদ্ধিমান ও সর্বব্যাপী সত্তা" রয়েছেন। ১৭১৩ সালে তাঁর প্রধান গ্রন্থ *প্রিন্সিপিয়া (Principia)*-র পরিশিষ্টে (General Scholium) তিনি এই ধারণার আরও বিস্তার ঘটান: > "সূর্য, গ্রহ এবং ধূমকেতু নিয়ে গঠিত এই চমৎকার জগৎ কেবল একজন বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী সত্তার পরিকল্পনা ও শাসন থেকেই আসতে পারে।" > "এই সত্তা সবকিছু শাসন করেন। তবে জগতের আত্মা হিসেবে নয়, বরং সবার প্রভু হিসেবে... ঈশ্বরত্ব মানে নিজের শরীরের ওপর কর্তৃত্ব নয়, বরং তাঁর দাস বা সৃষ্টির ওপর আধিপত্য।" > "ঈশ্বর চিরন্তন ও অসীম... তিনি কেবল অনন্তকাল বা অসীমতা নন, বরং তিনি নিজেই নিত্য ও সীমাহীন; তিনি কেবল সময় বা স্থান নন, বরং তিনি চিরকাল টিকে থাকেন এবং সর্বত্র বিরাজ করেন।" > নিউটনের কাছে ঈশ্বরের সংজ্ঞা ছিল তাঁর আধিপত্যে, কোনো বিমূর্ত তত্ত্বে নয়। এই "শাসনকর্তা ঈশ্বর"-এর ধারণাই নিউটনকে পরম স্থান ও কালের (absolute space and time) বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁর মতে, প্রকৃতির নিয়মগুলো আসলে ঈশ্বরের ইচ্ছেরই বহিঃপ্রকাশ—যা আধুনিক গবেষকেরাও স্বীকার করেন। ধর্মবিশ্বাসের চেয়েও নিউটনের কাছে সত্য খোঁজার পদ্ধতিটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি অন্ধভাবে কোনো প্রথা মেনে নেওয়া পছন্দ করতেন না। নিজেই বাইবেল পড়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেছিলেন: > "ধর্মগ্রন্থ নিজে নিজে খুঁটিয়ে পড়ো। বারবার পড়ো, গভীর মনোযোগ দিয়ে ভাবো এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো যেন তিনি তোমার বোঝার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেন।" > তিনি বাইবেলকে ল্যাবরেটরির ডেটা বা উপাত্তের মতো করে দেখতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আসল ধর্মমত সেটাই যা "প্রথম যুগের শিক্ষকদের স্পষ্ট কথায় প্রচার করা হয়েছিল এবং একদম শুরু থেকেই শেখানো হতো।" এই সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তিনি খ্রিস্টধর্মের শুরুর দিকের গ্রিক ও ল্যাটিন লেখকদের মূল নথিপত্র পরীক্ষা করতেন। ### ত্রিত্ববাদ-বিরোধী অবস্থান ও অ্যারিয়ান বিশ্বাস ১৬৭২ সালের দিকে নিউটন 'অ্যারিয়ানবাদ' (Arianism)-এর দিকে ঝুঁকে পড়েন। তাঁর বোঝাপড়া অনুযায়ী, এই মতবাদের মূল কথা ছিল—যিশু খ্রিস্ট "মানুষের চেয়ে বড়, কিন্তু ঈশ্বরের চেয়ে ছোট।" অর্থাৎ, তিনি প্রচলিত ত্রিত্ববাদ (Trinity - পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা সমপর্যায়ের, এই বিশ্বাস) স্বীকার করতেন না। নিজের এই গোপন বিশ্বাসকে তিনি ১২টি যুক্তিতে সাজিয়েছিলেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল: * "ধর্মগ্রন্থের কোথাও 'ঈশ্বর' শব্দটি দিয়ে একসাথে তিনজনকে (পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা) বোঝানো হয়নি।" * "সাধারণভাবে যেখানেই 'ঈশ্বর' শব্দটি এককভাবে বসেছে, তা সবসময় 'পিতা'-কে নির্দেশ করে।" * "পুত্র (যিশু) নিজেই স্বীকার করেছেন যে পিতা তাঁর চেয়ে বড়, এবং পিতাকেই নিজের ঈশ্বর বলে ডেকেছেন।" বাইবেলের দুটি জায়গার চুলচেরা বিশ্লেষণ তাঁর এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছিল: ১. **১ যোহন ৫:৭ (1 John 5:7):** নিউটন প্রমাণ করে দেখান যে, প্রথম দিকের গ্রিক পাণ্ডুলিপিগুলোতে ত্রিত্ববাদকে সমর্থনকারী একটি নির্দিষ্ট অংশ (Comma Johanneum) ছিলই না। তিনি দাবি করেন, ত্রিত্ববাদকে জোর করে টিকিয়ে রাখার জন্য পরবর্তীকালে ইচ্ছাকৃতভাবে এটি যোগ করা হয়েছিল। ২. **অ্যাথানাসিয়ান ক্রিড (The Athanasian Creed):** চার্চের এই নিয়মের ভাষা ("কেউ কারও চেয়ে বড় বা ছোট নয়") তাঁর কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, "যারা পারে তারা এর যৌক্তিক অর্থ খুঁজে নিক; আমি তো এর কোনো মাথামুণ্ডু পাই না।" তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ত্রিত্ববাদ "বাইবেল দ্বারা সমর্থিত নয় এবং এটি একটি অযৌক্তিক ধারণা।" এর বদলে তিনি বিশ্বাস করতেন যে পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা সম্পূর্ণ আলাদা তিনটি সত্তা। ### চার্চের ইতিহাস: সত্য বিচ্যুতি ও ভবিষ্যৎ সংস্কার নিউটন বিশ্বাস করতেন যে আদি খ্রিস্টধর্ম খুব দ্রুতই কলুষিত হয়ে পড়েছিল, বিশেষ করে চতুর্থ শতাব্দীর পর। তিনি লিখেছিলেন, রোমান ক্যাথলিক চার্চ "আবার পৌত্তলিকতায় ফিরে গেছে" এবং প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলনও "যথেষ্ট দূর এগোতে পারেনি।" বাইবেলের 'বুক অব রেভেলেশন' (Revelation) নিয়ে গবেষণা করে তিনি বলেন: > "আসল চার্চ একসময় হারিয়ে যাবে এবং তার জায়গায় এক মিথ্যা বা মূর্তিপূজক চার্চ দুনিয়া শাসন করবে।" > ধর্মের এই "মহাবিচ্যুতি" দেখে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর যুগে যুগে ধর্মকে সংস্কার করেন। তিনি নূহ, ইব্রাহিম, মুসা এবং যিশুর মাধ্যমে আসা সংস্কারের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে ভবিষ্যদ্বাণী করেন—"আমরা আশা করতে পারি যে ঈশ্বর যথাসময়ে আবার একটি নতুন সংস্কার আনবেন।" বাইবেলের বিভিন্ন ভবিষ্যদ্বাণী ঘেঁটে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ভবিষ্যতে সবকিছু আবার তার মূল ও পবিত্র রূপে ফিরে যাবে। ### সাবধানে যাপন করা এক গোপন বিশ্বাস নিউটনের এই ধর্মীয় চিন্তাভাবনা তৎকালীন ইংল্যান্ডের আইন অনুযায়ী মারাত্মক অপরাধ বা 'ধর্মদ্রোহিতা' হিসেবে গণ্য হতো। তাই তিনি সমাজে নিজের আসল বিশ্বাস লুকিয়ে রাখতেন। * ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির ফেলোশিপ ধরে রাখার জন্য তাঁর চার্চের যাজক হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানান। এতে তাঁর চাকরি যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অবশেষে ১৬৭৫ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লসের বিশেষ আদেশে তিনি যাজক না হয়েও লুকাসিয়ান অধ্যাপকের পদে থাকার অনুমতি পান। * তিনি তাঁর ধর্মতাত্ত্বিক লেখাগুলো গোপন রাখতেন এবং অনেকগুলোর গায়ে লিখে রেখেছিলেন "প্রকাশের যোগ্য নয়।" ১৯৩৬ সালে সোথবি’স (Sotheby's) নিলামের পর এই লেখাগুলো প্রথমবারের মতো পৃথিবীর সামনে আসে। * ১৭২৭ সালে মৃত্যুর শয্যায় শায়িত অবস্থাতেও তিনি চার্চের শেষকৃত্যের আচার গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। বিজ্ঞান ও ধর্মের পাশাপাশি তিনি 'কিমিয়াবিদ্যা' (Alchemy) এবং বাইবেলের কালানুক্রম নিয়েও গবেষণা করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, এগুলো ঈশ্বরের লেখা দুটি বই পড়ার ভিন্ন মাধ্যম—একটি হলো ধর্মগ্রন্থ (Scripture), অন্যটি প্রকৃতি (Nature)। নিউটনের কাছে কঠোর বিজ্ঞানচর্চা আর গভীর ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল একটাই—চার্চের ভুল নিয়ম ও দুর্নীতির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া আদি সত্যকে পুনরুদ্ধার করা।

১০০ উটের লোভে রাসুলকে ধরতে গেল সুরাকা

মরুভূমির তপ্ত বালু উড়িয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলছে সুরাকা ইবনে মালিক। তার চোখে-মুখে তখন তীব্র উত্তেজনা আর লোভের ঝিলিক। কোরাইশ নেতারা ঘোষণা করেছে— মোহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর সঙ্গী আবু বকর (রা.)-কে জীবিত অথবা মৃত ধরে দিতে পারলে **১০০টি লাল উট** পুরস্কার দেওয়া হবে। আরব সমাজে ১০০ উটের মালিক হওয়া মানে রাতারাতি বিশাল ধনী ও প্রভাবশালী হয়ে যাওয়া। সুরাকা ছিল একজন দক্ষ পথপ্রদর্শক এবং বীর যোদ্ধা। এক ব্যক্তি এসে তাকে গোপনে খবর দিল, সে মরুভূমির পথে কয়েকজন আরোহীকে যেতে দেখেছে। সুরাকা নিশ্চিত হলো, তাঁরাই আল্লাহর রাসুল (সা.) ও তাঁর সঙ্গী। কাউকে কিছু না জানিয়ে, পুরস্কারের সবটুকু একা পাওয়ার লোভে সুরাকা তার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দ্রুত ঘোড়ায় চড়ে রওনা হলো। ## অলৌকিক ঘটনা ও সুরাকার পঙ্গুত্ব কিছুক্ষণের মধ্যেই সুরাকা দূর থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং আবু বকর (রা.)-কে দেখতে পেল। সুরাকা তার ধনুক বের করল। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ তার ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল এবং সুরাকাও ছিটকে মাটিতে আছড়ে পড়ল। আরবদের রীতি অনুযায়ী, সুরাকা তার তূণ থেকে ভাগ্যপরীক্ষার তীর বের করল। তীর বলল, "আগে বাড়বে না।" কিন্তু ১০০ উটের লোভ সুরাকার বিবেককে অন্ধ করে দিয়েছিল। সে তীরের ইশারা অমান্য করে আবার ঘোড়ায় চড়ল এবং রাসুল (সা.)-এর দিকে এগোতে লাগল। এবার সে এতটাই কাছে পৌঁছে গেল যে, রাসুল (সা.)-এর পবিত্র মুখ থেকে কোরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল। আবু বকর (রা.) বারবার পেছনে তাকিয়ে দেখছিলেন আর চিন্তিত হচ্ছিলেন, কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) ছিলেন সম্পূর্ণ শান্ত, পরম করুণাময়ের ওপর ভরসা রেখে তিনি অবিচলভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সুরাকা যখনই তাঁর ওপর আক্রমণ করতে যাবে, ঠিক তখনই অলৌকিক ঘটনাটি ঘটল। আচমকা এক বিকট শব্দ হলো এবং **সুরাকার ঘোড়ার সামনের পা দুটি মরুভূমির শক্ত বালুর ভেতর হাঁটু পর্যন্ত দেবে গেল!** সুরাকা ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ল। ঘোড়াটি পা দুটো বালু থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করতেই সেই গর্ত থেকে ধোঁয়ার মতো ধূলিঝড় আকাশের দিকে উঠতে লাগল। > সুরাকা বুঝতে পারল, এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। কোনো এক অদৃশ্য মহাশক্তি এই মহান মানবকে রক্ষা করছেন। তলোয়ার বা তীর দিয়ে এই মানুষকে স্পর্শ করা অসম্ভব। > ## অভয়বাণী ও পারস্য সম্রাটের কঙ্কণ ভয়ে সুরাকার শরীর কাঁপতে লাগল। সে চিৎকার করে বলল, "হে মোহাম্মদ! আমি বুঝতে পেরেছি এটা আপনারই দোয়া ও অলৌকিক ক্ষমতা। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আমার ঘোড়াটি মুক্ত হয়ে যায়। আমি কসম খাচ্ছি, আমি আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না, বরং পেছনের শত্রুদের বিভ্রান্ত করে ফিরিয়ে দেব।" দয়ার সাগর রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। সাথে সাথে সুরাকার ঘোড়ার পা বালু থেকে মুক্ত হয়ে গেল। সুরাকা তখন রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে ক্ষমা চাইল এবং মক্কার কাফেরদের কুচক্রের নানা তথ্য দিল। বিদায় নেওয়ার সময় আল্লাহর রাসুল (সা.) সুরাকাকে একটি অবিশ্বাস্য ভবিষ্যৎবাণী করলেন। তিনি হাসিমুখে বললেন: > "হে সুরাকা! কেমন হবে সেদিন, যেদিন তুমি পারস্য সম্রাট কিসরার (খসরু) সোনার কঙ্কণ (বালা) পরিধান করবে?" > সুরাকা অবাক হয়ে গেল! পারস্য তখন পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তি। আর মক্কা থেকে পালিয়ে যাওয়া একজন মানুষ বলছেন যে, একদিন পারস্য জয় হবে এবং সেই সম্রাটের সোনার অলঙ্কার পরবে এই সুরাকা! সুরাকা রাসুল (সা.)-এর কাছ থেকে একটি নিরাপত্তা সনদ লিখে নিয়ে মক্কার দিকে ফিরে গেল। এরপর পথে যার সাথেই দেখা হতো, সুরাকা বলত, "আমি এই পথ পুরো খুঁজে দেখেছি, এদিকে কেউ নেই।" ফলে শত্রুরা অন্য পথে চলে যায়। ## গল্পের শেষ পরিণতি এই ঘটনার বহু বছর পর, মক্কা বিজয়ের পর সুরাকা ইবনে মালিক ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর, দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর আমলে মুসলমানদের হাতে পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ মালামাল যখন মদিনায় নিয়ে আসা হলো, তার মধ্যে পারস্য সম্রাট কিসরার সেই বিখ্যাত সোনার কঙ্কণ, মুকুট ও রাজকীয় পোশাকও ছিল। খলিফা ওমর (রা.) ভরা মজলিসে সুরাকা (রা.)-কে ডেকে পাঠালেন। তিনি সুরাকাকে সম্রাটের সেই রাজকীয় পোশাক ও সোনার কঙ্কণ পরিয়ে দিলেন। উপস্থিত সাহাবিদের চোখে তখন অশ্রু। ১০০ উটের লোভে যে মানুষটি একদিন রাসুল (সা.)-কে ধরতে গিয়েছিল, আল্লাহর রাসুলের সেই ঐতিহাসিক ভবিষ্যৎবাণী সত্যি করে আজ সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্রাটের সোনার কঙ্কণ হাতে দাঁড়িয়ে আছে!

সাওর গুহার উদ্দেশ্যে যাত্রা

দারুন নাদওয়ার সেই কুখ্যাত চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) যখন হযরত আবু বকর (রা.)-কে সাথে নিয়ে মক্কার সীমানা পেরিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, তখন ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হলো আরেকটি রোমাঞ্চকর অধ্যায়। মক্কার কাফেররা যখন দেখল তাদের এত নিখুঁত পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে এবং মুহাম্মাদ (সা.) অলৌকিকভাবে মক্কা থেকে বের হয়ে গেছেন, তখন তাদের ক্রোধের সীমা রইল না। তারা ঘোষণা করল:যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ বা আবু বকরকে জীবিত অথবা মৃত ধরে এনে দিতে পারবে, তাকে একশোটি লাল উট পুরস্কার দেওয়া হবে! পুরস্কারের লোভে মক্কার সেরা ঘোড়সওয়ার এবং মরুভূমির পথপ্রদর্শকেরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এই চরম বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনা কীভাবে কাজ করেছিল, তা নিয়েই আজকের গল্প। সাওর গুহার উদ্দেশ্যে যাত্রা হিজরতের চেনা পথ ছিল মদিনার উত্তর দিকে। কিন্তু কাফেরদের বিভ্রান্ত করতে আল্লাহর রাসূল (সা.) এবং আবু বকর (রা.) দক্ষিণ দিকে রওনা হলেন। তিন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তারা এসে পৌঁছালেন দুর্গম 'সাওর' পর্বতের পাদদেশে। পাহাড়টি ছিল অত্যন্ত খাড়া এবং পাথুরে। রাসূল (সা.)-এর জুতো ছিঁড়ে পা মোবারক ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল। প্রিয় নবীজির এই কষ্ট দেখে হযরত আবু বকর (রা.) ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন এবং সেই অবস্থাতেই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সাওর গুহার মুখে গিয়ে পৌঁছালেন। ### গুহার ভেতর আবু বকর (রা.)-এর আত্মত্যাগ গুহার মুখে পৌঁছে আবু বকর (রা.) বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আপনি ভেতরে প্রবেশ করবেন না, আগে আমি ঢুকে এটি পরিষ্কার করি। যদি কোনো ক্ষতিকারক জীবজন্তু থাকে, তবে তা যেন আমাকে দংশন করে, আপনাকে নয়।" আবু বকর (রা.) গুহার ভেতরে ঢুকলেন। চারিদিকের অন্ধকার আর আবর্জনার মধ্যে তিনি বেশ কিছু গর্ত দেখতে পেলেন, যেখানে বিষাক্ত সাপ বা বিচ্ছু থাকতে পারত। তিনি নিজের চাদরটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে একে একে সবকটি গর্ত বন্ধ করলেন। কিন্তু সবশেষে দুটি গর্ত বাকি রয়ে গেল, যা বন্ধ করার মতো আর কোনো কাপড় ছিল না। তিনি নিজের পায়ের গোড়ালি দুটি সেই গর্ত দুটির ওপর চেপে ধরলেন এবং রাসূল (সা.)-কে ভেতরে আসার অনুরোধ করলেন। দীর্ঘ ক্লান্তির পর আল্লাহর রাসূল (সা.) আবু বকর (রা.)-এর কোলের ওপর মাথা রেখে গভীর ঘুমে মগ্ন হলেন। ঠিক তখনই একটি গর্তের ভেতর থেকে একটি বিষাক্ত সাপ আবু বকর (রা.)-এর পায়ে দংশন করল। তীব্র বিষের যন্ত্রণায় তাঁর শরীর কেঁপে উঠল, কিন্তু তিনি এতটুকু নড়লেন না—পাছে রাসূল (সা.)-এর ঘুম ভেঙে যায়! তবে যন্ত্রণার তীব্রতায় তাঁর চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল রাসূল (সা.)-এর পবিত্র চেহারা মোবারকে। রাসূল (সা.)-এর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "আবু বকর, কী হয়েছে তোমার?" আবু বকর (রা.) বললেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে সাপে কেটেছে।" আল্লাহর রাসূল (সা.) কালবিলম্ব না করে তাঁর পবিত্র মুখের লালা (উৎসৃষ্ট থুতু) ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন। অলৌকিকভাবে মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত বিষ ও যন্ত্রণা কর্পূরের মতো উড়ে গেল! ## গুহার মুখে শত্রুর পায়ের আওয়াজ রাসূল (সা.) এবং আবু বকর (রা.) এই গুহায় টানা তিন দিন ও তিন রাত অবস্থান করেন। এদিকে মক্কার কাফেররা খুঁজতে খুঁজতে ঠিক সাওর গুহার প্রবেশদ্বারে এসে হাজির হলো। তাদের পায়ের শব্দ এবং কথাবার্তা গুহার ভেতর থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। শত্রুদের এত কাছে দেখে হযরত আবু বকর (রা.) অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়লেন। তবে তিনি নিজের জন্য ভয় পাননি, তিনি ভয় পাচ্ছিলেন ইসলামের শেষ আশার প্রদীপ—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুরক্ষার জন্য। তিনি ফিসফিস করে বললেন: > "হে আল্লাহর রাসূল! তারা যদি কেউ নিজের পায়ের দিকে তাকায়, তবেই তো আমাদের দেখে ফেলবে!" > পৃথিবীর যেকোনো মানুষ এই পরিস্থিতিতে হয়তো ঘাবড়ে যেত, কিন্তু আল্লাহর ওপর যার অবিচল আস্থা, সেই পরম শান্ত কণ্ঠে রাসূল (সা.) উত্তর দিলেন: > "লা তাহযান, ইন্নাল্লাহা মা'আনা—ভয় পেও না আবু বকর, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।" > তিনি আরও বললেন, "আবু বকর! তুমি সেই দুজনের ব্যাপারে কী ভাবছ, যাদের তৃতীয়জন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা?" ## আসমানি পাহারা এবং কাফেরদের ফিরে যাওয়া কাফেররা যখন গুহার মুখে দাঁড়ানো, তখন সেখানে এক অবিশ্বাস্য অলৌকিক ঘটনা ঘটল। আল্লাহ তাআলার নির্দেশে মুহূর্তের মধ্যে এক জোড়া বুনো কবুতর গুহার প্রবেশদ্বারে বাসা তৈরি করে ডিম পেড়ে বসল। আর একটি মাকড়সা এসে গুহার মুখজুড়ে এক চমৎকার জালের বুনন তৈরি করে দিল। কুরাইশদের প্রধান গোয়েন্দা এবং কাফেররা যখন গুহার মুখে একদম কাছে এল, তখন উমাইয়া ইবনে খালাফ বলল, "ভেতরে চলো, দেখে আসি।" কিন্তু দলের অন্য একজন (কারো মতে আবু জাহেল বা অন্য কেউ) মাকড়সার জাল এবং কবুতরের বাসা দেখে বিরক্ত হয়ে বলল: > "তুমি কি পাগল হয়েছ? এই মাকড়সার জাল তো মুহাম্মাদের জন্মের আগের তৈরি মনে হচ্ছে! আর ভেতরে মানুষ থাকলে এই বুনো কবুতর কি শান্তিতে ডিম নিয়ে বসে থাকত? তারা অন্য কোথাও গেছে, চলো এখান থেকে।" > মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অত্যাধুনিক তল্লাশি দল একটি মাকড়সার সুতোর জালের কাছে পরাজিত হলো! কাফেররা গুহার ঠিক মুখে দাঁড়িয়েও অন্ধের মতো ফিরে গেল। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবীবকে এভাবেই আসমানি পাহারায় রক্ষা করলেন। ## বিদায় সাওর, মদিনার পথে তিন দিন পর যখন মক্কার কাফেরদের শোরগোল কিছুটা কমে এল, তখন পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত দুটি উট নিয়ে সাওর গুহার পাদদেশে এলেন। হযরত আবু বকর (রা.) এবং আল্লাহর রাসূল (সা.) সাওর গুহা থেকে বের হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। এরপর তারা মদিনার উদ্দেশ্যে এক নতুন দিগন্তের দিকে রওনা হলেন, যেখানে আনসাররা অধীর আগ্রহে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। সাওর গুহার এই ঘটনা প্রমাণ করে, চক্রান্তকারী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আল্লাহ যাকে রক্ষা করতে চান, তাকে পৃথিবীর কোনো শক্তি স্পর্শ করতে পারে না।

শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬

তুরাগের তীরে কান্না ভাসে

ঈদের রাত বারোটায় টঙ্গীর তুরাগ ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে রফিক প্রথম বুঝল, চামড়া আর পণ্য নয়, এখন বোঝা। সে সিজনাল ব্যবসায়ী। সারা বছর রিকশার গ্যারেজে কাজ করে, কোরবানির তিন দিন আগে ধার করে নেমে পড়ে চামড়া কেনায়। এবার চল্লিশটা গরুর চামড়া কিনেছিল, গড়ে সাতশো টাকা করে। ভেবেছিল, সাভারের ট্যানারি অন্তত হাজার বারোশো দেবে। ঈদের দিন দুপুরে ভ্যান ভরে নিয়ে গেল আড়তে। সন্ধ্যা পর্যন্ত দাম শুধু নামল। আড়তদার বলল, "দুইশো দেব, নিলে দাও।" পাশের আরেকজন বলল, "দেড়শো।" রফিক হিসাব কষল মনে — এক বস্তা লবণ ঈদের আগে ছয়শো ছিল, ঈদের দিন সাতশো হয়ে গেছে। একটা ছেলেকে খাটাতে তিন হাজার টাকা লাগে, ভ্যান ভাড়া আলাদা। চামড়া না বেচলে লবণ দেবে কোথা থেকে? রাত দশটায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার টিএ রোডে যেমন বহু ব্যবসায়ী সারা রাত দাঁড়িয়ে থেকেও ক্রেতা পায়নি, টঙ্গীতেও একই দৃশ্য। রফিক দেখল, মাদ্রাসার দুই ছাত্র মাথায় করে সত্তরটা ছাগলের চামড়া এনেছে। সারা মহল্লা থেকে কোরবানির চামড়া তারা সংগ্রহ করে, সেই টাকায় এতিমখানার তিন মাসের চাল কেনা হয়। মাদ্রাসার সুপার মাওলানা ইদ্রিস সাহেব ফোনে ফোনে ঘুরছেন, কোনো আড়ত ফোন ধরছে না। রাত একটায় আড়তদাররা একসাথে দাম নামিয়ে দিল। ব্যবসায়ীরা বলাবলি করছিল, এটা ইচ্ছা করেই করা হচ্ছে, যাতে তারা বাধ্য হয়ে ফেলে দেয়। রফিকের পাশে এক ছেলে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "পাঁচশো টাকায় কেনা চামড়া দুইশোতেও নিচ্ছে না।" সাভারে সকাল আটটার মধ্যে দুই লাখ বিশ হাজারের বেশি চামড়া পৌঁছেছে, কিন্তু বিক্রেতারা সবাই বলছে দাম প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। সেই খবর শুনে রফিক বুঝল, বড়দের মাল গেছে, ছোটদেরটা আর নেবে না। দুইটার দিকে মাওলানা ইদ্রিস এসে রফিকের ভ্যানের পাশে বসলেন। বললেন, "চামড়া পচে গেলে গুনাহ হবে, এলাকায় দুর্গন্ধ হবে। কী করি?" রফিক কোনো উত্তর দিল না। তারা দুজন মিলে ভ্যান ঠেলে নিয়ে গেল ব্রিজের ঢালে। তুরাগ তখন ভাটা। পানিতে আগের দিনের কোরবানির রক্তের হালকা লালচে দাগ। প্রথমে একটা, তারপর দশটা, তারপর পুরো চল্লিশটা চামড়া রফিক নদীতে ফেলে দিল। মাদ্রাসার ছেলেরা তাদের বস্তাগুলো রাস্তার পাশে রেখে দিল, কারণ নদী পর্যন্ত নেওয়ার শক্তিও আর ছিল না। সকালে সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি এসে সেই পচা স্তূপ তুলবে, যেমন চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীরা রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল। মাওলানা ইদ্রিস পানির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "আমরা ভাবতাম চামড়া বিক্রি মানে এতিমের মুখে ভাত। আজ দেখলাম, চামড়া বিক্রি মানে লবণের দামের কাছে হেরে যাওয়া।" রফিক বাড়ি ফেরার পথে ভাবছিল না লাভ-লোকসানের কথা। ভাবছিল, যে চামড়ায় একদিন জায়নামাজ হতো, বইয়ের মলাট হতো, সেই চামড়া আজ নদীতে ভাসছে প্লাস্টিকের বোতলের মতো। ঈদের তাকবির তখনও মাইকে বাজছে দূরে, কিন্তু তার ভ্যান খালি, পকেটে ধারের হিসাব, আর তুরাগের বুকে ভেসে যাচ্ছে চল্লিশটা অসমাপ্ত নিয়ত। ভোরের আলোয় একটা ছোট ছেলে ব্রিজের নিচে নেমে একটা ভেজা ছাগলের চামড়া তুলে নিল। রফিক জিজ্ঞেস করল, "কী করবি?" ছেলেটা হাসল, "আম্মা বলছে, শুকাইলে পাপোশ বানাবে।" সেই একটুকরো ব্যবহারের আশায় রফিকের বুকটা একটু হালকা হলো। সব চামড়া নদী নেয়নি, কিছু এখনো মানুষের হাতে ফিরছে। 0d7c742b51958822