Muhammad Abul Hussain
শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬
হলুদ বরণ রোদ
আহসান হাবিব বুলবুল
ফাহিমের দু'টি কলম
ব ড় মানুষের ছোটবেলার স্কুল পালানোর গল্পও অনেক সময় মহান হয়ে ওঠে। এখন আর স্কুল পালানোর সুযোগ নেই। সন্তানদের ক্লাসে ঢুকিয়ে দিয়ে মায়েরা বাইরে বসে থাকেন। ফাহিম অনেক দিনই চেয়েছে স্কুল পালাতে। প্রথম প্রথম স্কুলে যাওয়ার প্রচুর উৎসাহ ছিল তার। সে উৎসাহে ভাটা পড়েছে অনেকটা। এর কারণ হলো, ক্লাসের দুষ্টু ছেলেরা বড্ড বিরক্ত করে তাকে। ফাহিম খুব শান্তশিষ্ট প্রকৃতির ছেলে। তার এই ভদ্রতার সুযোগ নেয় ওরা।
যেদিন ফাহিম বেঞ্চের এক প্রান্তে বসে সেদিন দুষ্টুরা ওকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কখনো ওর খাবার পানি এঁটো করে দেয়, কলম লুকিয়ে রাখে। ফাহিম ভাবে ক্লাসে স্যার এলে অভিযোগ দিবে, পরে আর দেয় না। ও কোনো ঝামেলা পছন্দ করে না। বাড়ি গিয়ে মাকে বলে এসব কথা। মা বলেন, ফাহিম সোনা। শোন, ক্লাসে দুষ্টু ছেলের সংখ্যা হাতেগোনা ক'জন। অন্যরা কিন্তু সবাই ভালো। তুমি ভালো ছেলেদের সঙ্গে ভাব করবে। ভালো ছেলেরা তোমার বন্ধু হয়ে গেলে দুষ্টুরা আর সাহস করবে না তোমাকে জ্বালাতে। মায়ের কথা ওর খুব মনে ধরে।
'মা ঠিকই বলেছেন। ভালো ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে। কিন্তু কীভাবে। ওরাও তো দুষ্টুদের ভয় করে।'
ফাহিম ভাবে, ভয়। লে চলবে না। ও ভালো ছেলেদের। করতে নেই। আমরা সবাই তো বন্ধু সহপাঠী। সঙ্গে নিয়ে ওদের বোঝাবে দুষ্টামি
ওর ভাবনা- ক্যাভাবে সবার সাথে বন্ধুত্ব শিক্ষকের প্রশংসা কুড়াতে হবে। তাহলে ফাহিম এখন আর স্কুল পালানোর কথা ভাবে না। এ ভালো রেজাল্ট করে সম্ভাব গড়ে তোলা যায়। 'হ্যাঁ। তাকে গুনবে ওপর। সবাই সবার দৃষ্টি পড়বে তার।
করেন। বাদাল ফাহিমের আব্বু। তাদের। ফাহিম স্কুল। ক্লাসে ফার্স্ট, এমনি ভাবান্তর ওে সরকারি চাকরি লির কারণে নতুন উপজেলায় আসতে হয়েছে বদল করে ভর্তি হয়েছে এই স্কুলে। তাই তার রোল নম্বরটা অনেক পিছনে। বার্ষিক পরীক্ষায় ওদের উপকানো কি সম্ভব হবে। সেকেন্ড ও থার্ড বয় রয়েছে বান্তর ওকে আচ্ছন্ন করে। কোনো কিছুই অসম্ভব নয় বলে ও পড়াশোনায় মন দেয়।
প্রতিদিন ক্লাসে মন খারাপের মতো দু-একটি ঘটনা ঘটেই। কিন্তু ফাহিম কিছু মনে করে না। বরং সহপাঠীদের একটা খারাপের জবাব একটা ভালো দিয়ে দেয়। এটা ওকে কেউ শিখিয়ে দেয়নি। ও নিজে থেকেই এমনটা করে। এতে দুষ্টু ছেলেরা লজ্জা পেয়ে আর ওর সাথে দুষ্টামি করে না। যারা আগে ওকে উত্ত্যক্ত করতো তারা এখন ওর কাছের মানুষ হয়ে উঠছে।
সেদিন ক্লাস পরীক্ষা ছিল। সবাই মনোযোগ দিয়ে লিখছে। ফাহিমও লিখছে। লিখতে লিখতে মাঝপথে ওর কলমের কালি ফুরিয়ে যায়। এখন কী করবে। ও ঘামছে। কাউকে কিছু বলছে না। শিক্ষককে বলবে। তবে যে সহপাঠীরা হাসাহাসি করবে। টিপ্পনী কাটবে। ফাহিম তাই নিশ্চুপ। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
পাশের সারিতে বসা মৌমিতা। একটুখানি একটা মেয়ে। ওর দৃষ্টিতে পড়ে ফাহিম।
: কী হয়েছে, লিখছ না কেন?
: কলমে কালি নেই।
: একটু সবুর করো। আমার লেখা প্রায় শেষ। আমার কলম দিয়ে লিখবে।
ফাহিম লেখা শেষ করে। মৌমিতাকে কলম ফিরিয়ে দিতে গিয়ে ধন্যবাদ জানায়। মৌমিতাও অদ্রতার সুরে বলে ওয়েলকাম।
বাসায় গিয়ে ফাহিম মাকে সব বলে। মা বলেন, "মৌমিতা অনেক ভালো কাজ করেছে। ওকে ধন্যবাদ দিয়ে তুমিও ভালো করেছ। এখন থেকে তুমি ব্যাগে দুটো কলম রাখবে। ক্লাসে কেউ যদি তোমার মতো সমস্যায় পড়ে, তবে তুমি তাকে একটি কলম দিয়ে সাহায্য করতে পারবে।"
মায়ের পরামর্শটা ফাহিমের খুব পছন্দ হয়।
-"গুড আইডিয়া আম্মু!"
সেই থেকে ফাহিম দুটো কলম রাখে। ক্লাসে কেউ কলম হারিয়ে ফেললে বা লিখতে গিয়ে কালি শেষ হয়ে গেলে ও কলম দিয়ে তাকে সাহায্য করে। আর এ রকম প্রায়ই ঘটে। অল্প দিনের মধ্যেই জানাজানি হয়ে যায় যে, ফাহিমের কাছে দুটো কলম আছে। তাই কেউ বিপদে পড়লে ফাহিমের কাছে আসে কলমের জন্য। ফাহিমও তাকে কলম দিয়ে সহযোগিতা করতে পেরে আনন্দ বোধ করে। একদিন শিক্ষকও ফাহিমের কাছে কলম চেয়ে বসেন। এভাবেই ফাহিম কলমের জন্য সবার কাছে প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠে।
ফাহিম এখন অনেক বড় হয়েছে। নামকরা একটি উচ্চবিদ্যালয়ে মাধ্যমিকে পড়ছে। সেদিন ছিল স্কুলে বার্ষিক সাহিত্য সংস্কৃতি ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা। নির্ধারিত বক্তৃতা পর্বে সবাইকে জীবনের স্মরণীয় ঘটনা নিয়ে কথা বলতে হবে। এক এক করে বন্ধুরা বক্তৃতা করছে। এবার ফাহিমের পালা। ফাহিম ছোটবেলায় স্কুলজীবনে মৌমিতার কলম দিয়ে সহযোগিতার গল্প করলো। আরো বললো, তার পকেটে দুটো কলম রাখার গল্প। ফাহিমের বক্তৃতায় প্রচুর করতালি পড়লো। শিক্ষকরাও উচ্ছ্বসিত হলেন।
ইতি অন্তরা
সকালবেলা এক চিলতে রোদ এসে পড়ে অন্তরাদের বেলকুনিতে। হাঁটি-হাঁটি-পা-পা করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় অন্তরা। দু'টি চড়ুই পাখি কিচিরমিচির শব্দ তোলে। শিক গলিয়ে ভেতরে এসে আবার ফুরুৎ করে উড়ে যায়। পাখিদের ডানার ছোঁয়ায় টবের লতানো গাছগুলো দুলে ওঠে। অন্তরা ভেবে পায় না কোন ভাষায় ডাকলে ওরা আবার আসবে। মুহূর্তেই আবার আসে। সেই চিরচেনা শব্দ ঝঙ্কার। ঘুম ভাঙানোর গান। 'কিচিরমিচির'- অন্তরা ওঠো। বেলা হয়েছে। ভোরের ফুরফুরে হাওয়ায় গা ভাসাবে। শিশির ভেজা ঘাসে পা ভিজাবে। শিউলি তলায় ফুলের মেলায় হলদে রোদে গা মাখাবে। কিচিরমিচির।'
অন্তরা এবার ওদের ভাষা বোঝে। মিষ্টি মিষ্টি হাসে। 'ও' প্রতিদিন ভোরে এক মুঠো শস্যদানা ছিটিয়ে দেয় বেলকুনিতে। পাখিরা এসে খেয়ে যায়। 'ও' মুগ্ধ হয়ে দেখে। এভাবে পাখিদের সাথে ওর সখ্য গড়ে ওঠে।
ফিরোজ সাহেব এ বাসায় আজ অনেকদিন। অন্তরার জন্ম এ বাড়িতেই। মেয়েকে নিয়ে তাদের অনেক স্বপ্ন সুখ জড়িয়ে আছে এ বাড়ির প্রকৃতিতে। দেখতে দেখতে সাতটি বছর কেটে যায়। অন্তরা বড় হয়েছে। স্কুলে যায়। 'ও' এতদিন জানতো এটা তাদের বাড়ি। এখন বুঝতে পারে ভাড়াবাড়ি আর নিজের বাড়ির মধ্যে পার্থক্য। তারপরও ওর কাছে এ বাড়িটি খুব নিজের মনে হয়। জানালা দিয়ে নীল আকাশ দেখা যায়। পাশের বাড়ির নারিকেল গাছটা পাখনা মেলে বাতাস করে। অদূরে পেয়ারা গাছটায় চড়ুই আর টুনটুনিদের আড্ডা। অন্তরার বেশ ভালো লাগে।
বাড়ির মালিক খান সাহেব খুব ভালো মানুষ। উনি ওপর তলায় থাকেন। অন্তরার সাথে খুব ভাব। সকাল-সন্ধ্যায় মসজিদে যেতে আসতে অন্তরাকে ডেকে যান। 'ও' নানুভাই নানুভাই বলে সাড়া দেয়।
রাজধানী ঢাকা শহরের একটি উন্নয়নশীল ওয়ার্ড সবুজবাগ। সবুজবাগে আর সবুজ নেই। দালান-কোঠায় ভরে গেছে। ব্যস্ত সড়ক, বাজার-ঘাট। নগর জীবনের কোলাহলের ঢেউ এসে লেগেছে এখানেও। ফিরোজ সাহের ঢাকায় এসে কর্মজীবন শুরু করেন একটি জাতীয় দৈনিকে যোগদানের মধ্যদিয়ে। তারপর বাসা যেন এখানে। পরপর বাসা পরিবর্তন করেছেন কয়েকটি। তবে এ বাসাতে রয়ে গেছেন অনেক দিন। ফিরোজ সাহেবের স্ত্রী মিসেস জেরিন একজন আদর্শ গৃহিণী। স্বামীর স্বল্প রোজগারেই সংসার সাজিয়েছেন সুন্দরভাবে। তবে সাধ থাকলেও সাধ্যের সীমানার বাইরে যান না। মেয়েকে ভালো স্কুলে ভর্তি করেছেন। তিনি নিজেই মেয়েকে স্কুলে আনা-নেয়া করেন। মায়ের সাথে স্কুলের পথে চলতে চলতে শহুরে জীবনের অনেক কিছুই চেনা-জানা হয়ে উঠছে অন্তরার। মাসের শেষে শহরের রাস্তার একটি দৃশ্য ওকে খুব ভাবায়। যখন দেখে পুরো একটি সংসারের সরঞ্জাম ভ্যানগাড়িতে বা মিনি ট্রাকে তুলে নিয়ে কেউ যাচ্ছে কেউ আসছে। বাড়ি বদলের এই দৃশ্য খুব করুণ লাগে ওর কাছে। 'ও' আম্মুকে জিজ্ঞেস করে, ওরা বাড়ি বদল করে কেন? উত্তরে আম্মু বলেন, সমস্যার কারণে বাড়ি বদল করতে হয়। আমাদেরও একদিন অন্য বাসায় যেতে হবে।
অন্তরা ভাবে, বাসা বদল করলে পাখিদের কি হবে। ওরা কি আসবে। ঘুম ভাঙানোর গান গাইবে। নতুন যারা আসবে তারা কি টুনীদের খেতে দিবে। ভাবতে ভাবতে সেদিনের মতো পথ শেষ হয়ে যায়।
অন্তরা আঁকিবুকিতে খুব ভালো। ওর আঁকা অনেক ছবি পত্রিকায় ছোটদের পাতায় ছাপা হয়েছে। 'ও' আজ স্কুল থেকে ফিরে খুব মনোযোগ দিয়ে কি যেন আঁকছে। আম্মুর দৃষ্টি কাড়ে। জিজ্ঞেস করেন, কি আঁকা হচ্ছে। ও বলে, আঁকা হোক দেখবে।
আর্ট পেপারে যেশ বড়সড়ো করে আঁকা ছবি। বেশ বর্ণাঢ্য। প্রথম দর্শনেই ভালো লাগার মতো। ছিমছাম একটি বাড়ি। সামনে ফুলের বাগান। দখিনা জানালা দিয়ে নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে। পাখিরা ডানা মেলছে দিগন্তে। গাছ-পালায় ছায়া সুর্নিবিড় মায়াবি 'আবেশ'।
অন্তরা ছবিটি ড্রয়িং রুমের দেয়ালে টাঙ্গিয়ে দেয়। আম্মু দেখে খুব প্রশংসা করেন। 'ও' অপেক্ষায় আছে আব্বু দেখে কি বলেন তিনি কি তার ইচ্ছা বুঝতে পারবেন।
ফিরোজ সাহেব সন্ধ্যায় বাসায় ফেরেন। প্রথমেই ছবিটির দিকে নজর পড়ে। তিনি অবাক হয়ে দেখেন আর দেখেন। মেয়ের অভিপ্রায় বুঝতে আর বাকি থাকে না। তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন। বলেন, "মা-মণি দেখো তোমার ছবির মতো আমাদেরও একটি বাড়ি হবে।" অন্তরা বলে, "আমাদের নিজের বাড়ি হবে।" খুশিতে ভরে ওঠে ওর মন। মিসেস জেরিন বাবা-মেয়ের খুশি দেখে আশায় বুক বাঁধেন।
মেয়ের স্কুল ও অফিসের যাতায়াতের সুবিধার কথা ভেবে বাসাটা ছাড়ার কথা ভাবছেন ফিরোজ সাহেব। বর্ষাকাল আসার আগেই বাসা পরিবর্তন করবেন। দেখতে দেখতে সময় ঘনিয়ে আসে। বাসা ছাড়ার প্রস্তুতি চলছে। অন্তরা বন্ধুদের কাছে বিদায় নিচ্ছে। নতুন বাসায় যাবার কথা বলছে। নানাভাইকেও বলেছে, "আমরা তো চলে যাচ্ছি। আমাদের জন্য দোয়া করো।"
আগামীকালই চলে যেতে হবে। রাতে অন্তরার আর ঘুম হয় না। 'ও' একটি কাগজে লিখে রাখে “তোমরা যারা নতুন আসবে, তোমরা নিশ্চয়ই পাখিদের ভালোবেসো। টুনটুনিদের খেতে দিও। ও তাহলে ভাববে তোমরা আমাদের আত্মীয়। ইতি অন্তরা।"
সেই মেয়েটি
এ কটি ক্লাসে দশজন ছাত্র-ছাত্রী থাকলে 'দশজন দশ রকমের হয়। কেউ একটু বেশি চঞ্চল, পুরো ক্লাস মাতিয়ে রাখে। কেউবা একটু অন্তর্মুখী- নীরব থাকতে পছন্দ করে। আবার কেউ খুব মেধাবী, আলাদা একটা গাম্ভীর্য নিয়ে থাকে। শিশু মনের এই বিচিত্র ভাবধারা স্রোষ্টারই সৃষ্টি। মহান আল্লাহ তার সৃষ্টিকে রূপময় করে তুলতে এই বৈচিত্র্য দান করেছেন।
একজন আদর্শ শিক্ষক বিষয়টি জানেন। তাই তিনি সবার মধ্যে ভাব বিনিময় মতবিনিময়ের পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। যাতে ক্লাসে সবার অংশগ্রহণ সমান হয়। কিন্তু সমস্যা হয়ে যায় অন্তর্মুখী ছেলে-মেয়েদের নিয়ে। এদের সহজে মেলে ধরা যায় না। কবি হয়তো তাই বলেছেন,
"করিতে পারি না কাজ সদা ভয় সদা লাজ, সংশয়ে সংকল্প সদা টলে পাছে লোকে কিছু বলে।
আড়ালে আড়ালে থাকি
নীরবে আপনা ঢাকি, সম্মুখে চরণ নাহি চলে পাছে লোকে কিছু বলে।"
অন্তর্মুখীদের কেউ লাজুক বলে। কেউবা বলে সুবোধ বালক। আবার কেউ বলে লক্ষ্মী মেয়ে। কেউবা আবার তাদের নিয়ে হতাশ। যারা এর বিপরীত, সমাজে তাদের সফলতা বেশি। নিজেকে তুলে ধরার বা প্রেজেন্ট করার যোগ্যতা সমাজ জীবনে ইতিবাচক ফল বয়ে আনে। অন্তর্মুখীরা সেটা পারে না। তাই তাদের পরিচিতি নেই। নাম নেই। যশ নেই।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া প্রীতি মেহজাবিন সে রকমই একজন মেয়ে। 'ও' বেশ মেধাবী। প্রাথমিকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। সে তার সমস্যার কথা বোঝে। সে অনেক চেষ্টা করেছে তার এই চুপচাপ নীরব বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু পারেনি। অন্তর্মুখিতা তাকে বেশি টানে। তার এই স্বভাবের জন্যে দু'-একজন শিক্ষকের ভৎসনাও শুনতে হয়েছে তাকে। একদিন তো অংকের টিচার বলেই বসলেন, “এ্যাই মেয়ে তুমি এত চুপচাপ থাকো কেন, তুমি গোয়েন্দা নাকি? সেদিন ক্লাসে সবাই হেসেছিল। প্রীতি লজ্জা পেয়ে দু'দিন স্কুলেই আসেনি।
শিক্ষিকা মিসেস নাসরিন জাহান অবশ্য প্রীতিকে নিয়ে হতাশ নন। তিনি প্রীতির অন্তর্মুখিতা (Introversion) বেশ উপভোগ করেন। তিনি ওর চোখে মুখে একটা মেধার দীপ্তি দেখতে পান। তিনি ভাবেন, সবার সহযোগিতা পেলে 'ও' একদিন ওর অন্তর্মুখী বলয় থেকে বের হয়ে আসতে পারবে।
প্রীতি লেখাপড়ায় খুব ভালো। ক্লাসে বেশ নিয়মিত। অপরের প্রতি সহানুভূতিশীলও।
প্রতি বছর স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কোনো বিষয়ে প্রীতিকে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় না। এবারই প্রথম সে অংশগ্রহণ করেছে, তাও আবার নির্ধারিত বিষয়ে রচনা প্রতিযোগিতায়। বিষয়বস্তু ছিল "ছাত্রজীবনে প্রেজেন্টশন ক্লাসের গুরুত্ব।"
আজ সকালে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। মেঘ ভেঙে রোদ্দুর বেরিয়েছে। নরম রোদ। হলুদ বরণ রোদ। বৃষ্টি ভেজা দখিনা মৃদুমন্দ বাতাস ছেলে-মেয়েদের চুল ছুঁয়ে যাচ্ছে। ছেলে-মেয়েদের হৈ হুল্লা আর ছোটাছুটিতে জেগে উঠেছে স্কুল আঙ্গিনা। রঙ বে-রঙের বেলুন ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে চারপাশ। স্কুলে আজ বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। সবাই পুরস্কার নিবে। যে কোনো ইভেন্টেই ভালো করতে পারেনি সেও পাবে সান্ত্বনা পুরস্কার। তাই সবার মনেই আনন্দ।
প্রতিযোগিতার ফল ঘোষণা হলো। প্রীতি প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে। কী আশ্চর্য?। যে কি না ক্লাসে দাঁড়িয়ে কথা বলে না। কোনো প্রেজেন্টেশন দেয় না সেই আবার সেই বিষয়েই প্রথম। ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। অভিভাবকদের আগ্রহের শেষ নেই। চারদিকে গুঞ্জন শুরু হয়-"চুপচাপ সেই মেয়েটি।"
বছরের প্রথম দু'মাস হৈচৈ করেই কেটে গেল। এখন পুরোদমে ক্লাস চলছে। এপ্রিলের শেষে বেশ গরম পড়েছে। হঠাৎ সেদিন একটা বিপত্তি ঘটলো প্রীতিদের স্কুলে। অ্যাসেম্বলি চলছিল। এমন সময় অষ্টম শ্রেণির একটি মেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আরো কয়েকজন ছাত্রী জ্ঞান হারায়। শিক্ষকরা কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না (কিংকর্তব্যবিমূঢ়)। এ সময় প্রীতি চিৎকার করে বলতে থাকে, সবাই সরে পাঁড়াও ভীড় করবে না। মুক্ত বাতাস আসতে দাও আমি এর প্রাথমিক চিকিৎসা (First Aid) জানি। ওদের একদিকে কাত করে দাও, যাতে মুখে ও গলায় যে লালা বা নিঃসরণ আছে তা বেরিয়ে আসতে পারে। জুতা খুলে দাও। পায়ের দিকট একটু উঁচু করে ধরো। ম্যাডাম দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স কল করুন, ট্রিপল নাইন-এ ফোন দিন।"
সবাই প্রীতির সেবা দেখে হতবাক হয়ে যায়। দূর থেকে কে যেন বলে ওঠে, "এ্যাই সেই মেয়েটি।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে স্কুল আঙ্গিনায় ঢোকে। সাইরেনের বিকট শব্দে চারদিকে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। খুব দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়া ছাত্রীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয় হয়।
সাধারণভাবে এটাকে অজ্ঞাত রোগ বলে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় "ম্যাস সাইকোলজিক্যাল ডিজিজ” বা গণহিস্টিরিয়া। সাধারণত ছাত্রীরাই এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয় আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে একজন থেকে আরেক জনে এ রোগ ছড়ায়। বয়ঃসন্ধিকালে এ সমস্য বেশি হয়। বিষণ্ণতা উৎকণ্ঠা ব্যক্তিত্বের বিকার প্রভৃতি মানসিক রোগ থেকে এ সমস্যা হতে পারে।
প্রীতিকে বন্ধুরা ঘিরে ধরেছে। সবাই বাহবা দিচ্ছে। শিক্ষকরাও প্রীতির প্রশংসা করছে একজন অভিভাবক বললেন, তুমি এতকিছু কিভাবে জানলে। প্রীতি বললো, সে পত্র-প্রত্রিকায় স্বাস্থ্য পাতার বিভিন্ন আর্টিক্যাল পড়ে এসব জেনেছে।
কারণ নেই। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ভালো খবর এলো, অসুস্থ মেয়েরা সুস্থ হয়ে উঠছে। ভয়ের কোনে
দু'দিন স্কুল বন্ধ থাকার পর আজ আবার খুলেছে। অসুস্থ ছাত্রীরা ঘরে ফিরেছে। আজ অ্যাসেম্বলি খুব সংক্ষিপ্ত করা হলো। হেড ম্যাডাম ঘোষণা করলেন, এখন থেকে প্রতিদিন অ্যসেম্বলি-তে তোমরা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা (Helth tips) করবে। এ ব্যাপারে তোমরা পড়াশোনা করে আসবে। তিনি সেদিনের ঘটনায় প্রীতির ভূমিকার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিলেন সাধুবাদ জানালেন।
প্রীতির মুখটা লজ্জায়, গর্বে কৃতজ্ঞতায় রক্তিম হয়ে উঠলো।
তিন বন্ধু
গ্রামটি ছবির মতো। রহমতপুর। একপাশ দিয়ে বয়ে গেছে করতোয়া নদী। মেঠোপথ ফসলের মাঠ স্কুল-মাদরাসা মসজিদ-মক্তব সব মিলে ছিমছাম একটি গ্রাম। গ্রামের মাঝে সুউচ্চ একটি তালগাছ গ্রামটির অবস্থান জানান দেয়। তালগাছ আরও ছিল, এক এক করে সব হারিয়ে গেছে। এখন ওই একটিই টিকে আছে। দূর থেকে তালগাছটি চোখে পড়লে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত সেই কবিতাটি মনে পড়ে যায়-তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে। মনে সাধ কালো মেঘ ফুঁড়ে যায় একেবারে উড়ে যায় কোথা পাবে পাখা সে!
সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার একটি গ্রাম রহমতপুর। রবীন্দ্রনাথের কাছারি বাড়ি এই শাহজাদপুরেই। সেখানে কবিতায় লেখা সেই তালগাছ আছে একটি নয়, দু'টি।
কিছু দিন আগে এই গ্রামে এক বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটে যায়। বজ্রপাতে তিনজন লোক মারা যায়। এদের মধ্যে একজন শিশুও ছিল। গ্রামের সবার চোখে-মুখে শোকের ছায়া নেমে আসে। মৃতদের জানাজা, দোয়া অনুষ্ঠান, প্রশাসনের লোকজনের ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সাহায্য প্রদান-এসব কাজ নিয়েই কেটে যায় মাসটি।
রতন, আশিক ও ফরহাদ-ওরা তিন বন্ধু। গ্রামের হাইস্কুলে একই ক্লাসে পড়ে। গত মাসটা ওরা এসব কাজে সময় দিয়ে কাটিয়েছে। শোক প্রকাশ করতে স্কুলও দু'দিন বন্ধ ছিল। আজ বিকালে ওরা এসে বসেছে স্কুল মাঠে। আলাপচারিতায় একটু সময় কাটাতে। ঘুরে ঘুরে সেই একই কথা উঠে আসে ওদের আলাপনে।
"কীভাবে বজ্রপাত প্রতিরোধ করা যায়। প্রশাসনের লোকজন তো বলে গেল বেশি বেশি তালগাছ লাগাতে। কিন্তু তালগাছ কীভাবে বজ্রপাত ঠেকায় তা তো জানা হলো না। এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা কী।" রতন বলে-
: বিষয়টি নিয়ে স্কুলের বিজ্ঞান স্যারের সাথে কথা বলা যেতে পারে।
: ঠিক বলেছিস। আশিক জবাব দেয়।
: প্রয়োজনে আমরাই উদ্যোগ নেবো। ঘরে ঘরে গিয়ে তালের আঁটি (বীজ) সংগ্রহ করবো। রাস্তার দু-ধারে বপন করবো। ফরহাদ বলে।
: শুনেছি একসময় গ্রামে প্রচুর তালগাছ ছিল। সেসব কোথায় গেল? রতনের প্রশ্ন।
: কোথায় আবার যাবে। মানুষ তো এখন সর্বভুক হয়ে পড়েছে। দেখিস না, ইটভাটার
জ্বালানি হচ্ছে গাছ। জমির উপরিভাগের মাটি (Topsoil) যা নাকি খুব উর্বর, তা যাচ্ছে ভাটায়। মানুষ সামান্য ক'টা টাকা বেশি পাবে বলে মূল্যবান বৃক্ষ, জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছে। বলল আশিক।
: প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেন হয় জানিস। আমরা যখন গাছ কাটি, নদী ভরাট করি, যত্রতত্র আবর্জনা ফেলি তখন পরিবেশ দূষিত হয়। এর জের ধরে যত দুর্যোগ-মসিবত নেমে আসে। এই ধর বজ্রপাত, অতিবন্যা, রোগ-ব্যাধি ইত্যাদি। -কথাগুলো বলে থামে রতন।
: দোস্ত। তুই ভালো বলেছিস। আজ ওঠা যাক, সন্ধ্যা হয়ে এলো। -ফরহাদ বলল।
ভূমির মাটির মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে যে প্রক্রিয়ায় বজ্রপাত হয়, তাকে লাইটনিং স্ট্রোক বলে। লাইটনিং স্ট্রোকগুলো এর আশপাশের নিকটতম টার্গেটে আঘাত হানে। তালগাছ অনেক লম্বা হওয়ায় এটি উক্ত স্ট্রোকের নিকটবর্তী হয়ে থাকে। তাই ফসলের ক্ষেতে তালগাছ লাগানো হয়। যাতে বজ্রপাত হলেও কৃষক ও অন্য যারা মাঠে কাজ করে, তারা যেন ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারে। তোমরা শুনে আশ্চর্য হবে যে, বজ্রপাত যে শুধু ক্ষতি করে তা নয়, আমাদের উপকারও করে। তা হলো, বৃষ্টিপাতের সময় যে বজ্রপাত হয় তাতে এক প্রকার রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে বাতাসের নাইট্রোজেন মাটিতে প্রবেশ করে, এতে মাটির গুণগত পরিবর্তন হয়। মাঠির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পায়। ফসলের ফলন বাড়ে। তাই তো বলা হয়, মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা কোনো কিছুই নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। শুধু আমরা যদি আমাদের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারি তবে ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।
ফরহাদ বলল, স্যার আমরা গ্রামের মাঠে-ঘাটে তালগাছ লাগাতে পারি।
স্যার বললেন, অবশ্যই সেটা করা যেতে পারে। তোমরা তরুণ, সে উদ্যোগটা তোমরাই নিবে বৈকি।
আজ আবার স্কুলমাঠে আড্ডা জমিয়েছে তিন বন্ধু। স্যারের লেকচারটা ওদের কানে বাজছে। রতন বলল, তাহলে বল কীভাবে আমরা উদ্যোগটা নিতে পারি। আশিক বলল, এখন ভাদ্র মাস চলছে। এ মাসেই তাল পাকে। ঘরে ঘরে তালের রস, তালের পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তালের আঁটি সংগ্রহ করবো। তারপর মুরুব্বিদের পরামর্শে কোথায় কোথায় বীজ বপন করা যায়, সেটা ঠিক করবো। ফরহাদ বলল, চমৎকার আইডিয়া। তেমনটাই হবে। তাহলে কাল থেকেই কাজ শুরু করা যাক। শুরু হয়ে গেল তিন বন্ধুর তাল বীজ সংগ্রহের কাজ। প্রথম বীজ বপনের কাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলো। উদ্বোধন করলেন, তাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনসুর আলী খান।
তিন বন্ধুর এই কাজের কথা শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকল না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলো। পৌঁছে গেল উপজেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তির কাছেও। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একদিন এলেন গ্রামে। তিন বন্ধুর কাজ দেখতে। তিনি তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলেন। তিনি তিন বন্ধুর সঙ্গে আরো ক'জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি নিয়ে একটি কমিটি করে দিলেন। বললেন, শুধু বীজ বপন করলেই হবে না। গাছের পরিচর্যাও করতে হবে। তিনি তাদের কাজের জন্য একটা আর্থিক অনুদান দিলেন। বছরখানেকের মধ্যেই বপনকৃত বীজ থেকে চারাগাছ অঙ্কুরিত হয়ে সবুজ বৃক্ষে পরিণত হলো। তিন বন্ধু এখন প্রতিদিন বিকালে স্কুল মাঠে খেলাধুলা শেষে, সারা গ্রাম ঘুরে গাছগুলো দেখে, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করে বাড়ি ফেরে।
আজ স্কুলে তিন বন্ধু বিজ্ঞান ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করছে। স্যারের কাছ থেকে আজ তারা জানবে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি রোধে তালগাছ এত প্রয়োজন কেন। বিজ্ঞান শিক্ষক ক্লাসে নিজ থেকেই প্রসঙ্গটা উঠালেন। স্যার বললেন, বজ্রপাত রোধে তালগাছ রোপণের জন্য সরকারিভাবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কেন। তোমরা কি জান?
রতন বলল, না স্যার। সেটাই তো আমরা জানতে চাই। স্যার বললেন, শোন, মেঘ ও ভূমির মাটির মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে যে প্রক্রিয়ায় বজ্রপাত হয়, তাকে লাইটনিং স্ট্রোক বলে। লাইটনিং স্ট্রোকগুলো এর আশপাশের নিকটতম টার্গেটে আঘাত হানে। তালগাছ অনেক লম্বা হওয়ায় এটি উক্ত স্ট্রোকের নিকটবর্তী হয়ে থাকে। তাই ফসলের ক্ষেতে তালগাছ লাগানো হয়। যাতে বজ্রপাত হলেও কৃষক ও অন্য যারা মাঠে কাজ করে, তারা যেন ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারে। তোমরা শুনে আশ্চর্য হবে যে, বজ্রপাত যে শুধু ক্ষতি করে তা নয়, আমাদের উপকারও করে। তা হলো, বৃষ্টিপাতের সময় যে বজ্রপাত হয় তাতে এক প্রকার রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে বাতাসের নাইট্রোজেন মাটিতে প্রবেশ করে, এতে মাটির গুণগত পরিবর্তন হয়। মাঠির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পায়। ফসলের ফলন বাড়ে। তাই তো বলা হয়, মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা কোনো কিছুই নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। শুধু আমরা যদি আমাদের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারি তবে ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।
ফরহাদ বলল, স্যার আমরা গ্রামের মাঠে-ঘাটে তালগাছ লাগাতে পারি।
স্যার বললেন, অবশ্যই সেটা করা যেতে পারে। তোমরা তরুণ, সে উদ্যোগটা তোমরাই নিবে বৈকি।
আজ আবার স্কুলমাঠে আড্ডা জমিয়েছে তিন বন্ধু। স্যারের লেকচারটা ওদের কানে বাজছে। রতন বলল, তাহলে বল কীভাবে আমরা উদ্যোগটা নিতে পারি। আশিক বলল, এখন ভাদ্র মাস চলছে। এ মাসেই তাল পাকে। ঘরে ঘরে তালের রস, তালের পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তালের আঁটি সংগ্রহ করবো। তারপর মুরুব্বিদের পরামর্শে কোথায় কোথায় বীজ বপন করা যায়, সেটা ঠিক করবো। ফরহাদ বলল, চমৎকার আইডিয়া। তেমনটাই হবে। তাহলে কাল থেকেই কাজ শুরু করা যাক। শুরু হয়ে গেল তিন বন্ধুর তাল বীজ সংগ্রহের কাজ। প্রথম বীজ বপনের কাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলো। উদ্বোধন করলেন, তাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনসুর আলী খান।
তিন বন্ধুর এই কাজের কথা শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকল না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলো। পৌঁছে গেল উপজেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তির কাছেও। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একদিন এলেন গ্রামে। তিন বন্ধুর কাজ দেখতে। তিনি তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলেন। তিনি তিন বন্ধুর সঙ্গে আরো ক'জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি নিয়ে একটি কমিটি করে দিলেন। বললেন, শুধু বীজ বপন করলেই হবে না। গাছের পরিচর্যাও করতে হবে। তিনি তাদের কাজের জন্য একটা আর্থিক অনুদান দিলেন। বছরখানেকের মধ্যেই বপনকৃত বীজ থেকে চারাগাছ অঙ্কুরিত হয়ে সবুজ বৃক্ষে পরিণত হলো। তিন বন্ধু এখন প্রতিদিন বিকালে স্কুল মাঠে খেলাধুলা শেষে, সারা গ্রাম ঘুরে গাছগুলো দেখে, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করে বাড়ি ফেরে।
রাজকন্যা
না দির আলী রিকশায় উঠলেই রিকশাওয়ালার সাথে গল্প জুড়ে দেন। এটা তার অভ্যাস বলতে পারেন। রিকশাওয়ালাদের জীবনের অনেক গল্পই তার জানা। ভেবেছেন, এসব খেটে খাওয়া মানুষের সুখ-দুঃখ নিয়ে কখনো কিছু একটা লিখবেন। স্কুলজীবন থেকেই তার লেখালেখির একটা ন্যাক আছে। কর্মজীবনে এসে তাতে কিছুটা ভাটা পড়লেও মাঝে মধ্যে লেখেন। পত্র-পত্রিকায় ছাপাও হয়। নাদির আলীর এমনও হয়েছে, রিকশাওয়ালার কষ্টের কথা শুনতে শুনতে নেমে যাবার সময় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দশ-বিশ টাকা বেশি দিয়ে চলে গেছেন।
নাদির আলী খিলগাঁও রেলগেট থেকে রিকশায় চেপেছেন। আজ তিনি চুপচাপ। অন্যদিনের মতো চালকের সঙ্গে কথা বলার প্রসঙ্গ টানছেন না। তার কারণ হলো, মেয়ে সঙ্গে আছে।
নিজে থেকেই কথা শুরু করলেন। ষাটোর্ধ্ব এই চালক বয়সের ভারে, জীবন যন্ত্রণার চাপে কিছুটা মেয়েকে কলেজ গেটে নামিয়ে দিয়ে তিনি অফিসে যাবেন। কিছুদূর অগ্রসর হতেই রিকশাচালক হলেও নুয়ে পড়েছেন। নাদির আলী ভাবলেন, ভালোই হলো আমাকে প্রসঙ্গ টানতে হয়নি। তে উনি বললে শুনতে আপত্তি কী?
নাদির আলীর মেয়ের নাম উর্মি।
উর্মি বলল, চাচা এত কথা বললে তো অ্যাক্সিডেন্ট করবেন। মনোযোগ দিয়ে রিকশা চালান। রিকশাওয়ালা মেয়েটার কথায় কোনো কর্ণপাত করলেন না। কথা বলোই চললেন। কথা তো নয় যেন জীবনের গল্প। নাদির আলী এবার মাঝে মধ্যে অনুসন্ধানী দু-একটি প্রশ্নও করছেন।
'স্যার। বড় ইচ্ছা ছিল পোলাডারে লেখাপড়া শিখায়্যা মানুষ করব। তা আর হইল না। হে বছর নদী-ভাঙনে জমি-জিরাত ঘর-বাড়ি সব যমুনায় গ্যালো। পেটের দায়ে গেরাম ছাইড়া ঢাকায় আইলাম। রিকশার প্যাডেলে পা উঠলো। পোলাডা গাড়ির কারখানায় কাম করে। অল্প বয়সেই বিয়া করচে। যা কামাই-রোজগার করে তাতে তাগোরেই চলে না। আমাগো কী দ্যাখবো। বিয়ার এক বছর না যাইতই আলাদা থাকে, আলাদা খায়। আমরা বুড়া-বুড়ি শুধু চাইয়া থাকি-কখখন একটু আইসা চোখের দ্যাখা দিয়া যাইবো। বুড়ির সময় কাটে না। তাই একডা মাইয়া সন্তান 'পালক' নিছে। হে নাকি বড় হইয়া তারে দ্যাখবো। প্রথম প্রথম আমার মত ছিল না। পরে মত দিছি। কয়েকদিন হইল মাইয়া ডার জ্বর। ডাক্তার বলচে ডেঙ্গুতে ধরচে। মা মাইয়্যা দুনোজনই এহুন হাসপাতালে। আমি রিকশা নিয়া নামচি ওষুধ-পত্তরের পয়সা তো জোগাড় করতে হইবো।" সামনে ঈদ মাইয়াডার জন্য একটা নতুন জামাও কিনতে হইবো।
কলেজগেট আসতেই উর্মি বলে, চাচা রিকশা ঘুরান। মেডিক্যালে যাবো। আপনার মেয়েকে দেখতে যাবো।"
রিকশাওয়ালা এই প্রথম পিছন ফিরে উর্মিকে দেখল; 'কী কন মা। না, আফনের দেরি হইয়া যাইবো। আফনে ইস্কুলে যান।
: চাচা রিকশা ঘুরান।
- উর্মির কণ্ঠে এক কলস মমতা ঢেলে পড়ে।
নাদির আলী হকচকিয়ে যান। একি উর্মি কথা বলছে; তার মেয়ে উর্মি।
তিনি মেয়েকে না বলতে পারেন না। তিনি মেয়ের জন্য গর্ববোধ করেন। এই না হলে আমার মেয়ে।
পথিমধ্যে রিকশা থামিয়ে কিছু ফল কিনে নেয় উর্মি। হাসপাতাল বেডে খুকিকে দেখে ফেরার সময় উর্মি রিকশাওয়ালা চাচার হাতে এক হাজার টাকার একটা নোেট তুলে দেয়। রিকশাওয়াল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে উর্মির দিকে। তার মুখে কোনো ভাষা নেই, শুধু মাথার গামছ দিয়ে দু'চোখ মুছতে থাকেন।
নাদির আলী বলেন, মা উর্মি আজ থেকে আমি আমার ভুবনের রাজা, তুমি রাজকন্যাl
কুসুমের স্বপ্ন
প্র জাপতির সাত রঙা পাখায় ভর করে পরীরা নেমে আসে আকাশের সিঁড়ি বেয়ে। নীল পরী, লাল পরী। কী নরম তুলতুলে। ওরা আদর করে। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয় কপোলখানি। ঘুম পাড়ানি গান গায়। উষ্ণতায় দু'চোখ জুড়ে ঘুম আসে কুসুমের।
কুয়াশার চাদর জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে রাজধানী ঢাকা শহর। এখন গভীর রাত।
মধ্য পৌষে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বইছে। কনকনে হিম। রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো ঘন কুয়াশায় ঘোলাটে দেখাচ্ছে।
কোথাও কোনো সাড়া শব্দ নেই। একজন হকার চায়ের কাপে টুং টাং শব্দ তুলে রাতের নিস্তব্ধতা ভাঙছে। পলিথিন কাগজের ঝুপড়ির ভেতর দু-একজন নারী-পুরুষ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে শীতকে ভ্রুকুটি করছে। সায়েদাবাদ-মালিবাগ বাইপাস সড়কের প্রশস্ত ফুটপাথে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে এই ছিন্নমূল মানুষগুলো।
ঘন কুয়াশা ভেদ করে এগিয়ে আসে একটি জিপগাড়ি আধো লাইট জ্বেলে। ধীরে শব্দে সন্তর্পণে এসে থামে। গাড়ির ভেতর থেকে ক'জন কর্মী নেমে আসে। তারা বড় একটা প্যাকেট থেকে হাতে হাতে রঙবেরঙের কম্বল নিয়ে ঘুমন্ত মানুষগুলোর ওপর ছড়িয়ে দেয়। হয়তো মহানুভব কোনো খেয়ালি মানুষের অনবদ্য এ দান। যাকে কেউ চিনবে না। জানবে না। নিরন্ন-বিবস্ত্র মানুষগুলো শুধু বিস্ময়ে উষ্ণতার পরশ নেবে।
কিছুক্ষণ পর অন্য একটি ভ্যানগাড়ি একই পথে এসে থামে। কালো ধোঁয়ার গন্ধ মিশছে বাতাসে। গাড়ির ভেতর থেকে একজন ঘাড় বাড়িয়ে বলে এ্যাই বুইড়া ব্যাডা, কম্বলডা দিয়া দে দেড় শ' টাকা পাবি।
: পাঁচশ' ট্যাহার কম্বল দেড় শ' ট্যাহায় দিমু! এ্যা কেমুন কতা কন।
: বেশ তো দুইশ'ই দিমু।
: কই আগে ট্যাহা দ্যান।
: সত্য কইরা কম্বলডা তুমি বেইচ্যা দিলা। মাইয়াডা আমার উম পাইয়া কী সুন্দর ঘুম
আইচে!
: এ্যাই নতুন দামি কম্বল দিয়া আমরা কী করুম। দুইশ' ট্যাহা হইলে সক্কাল বেলা গরম ভাত খাইবা। মাইয়াডারে একডা নতুন ফরগ কিনা দিমুনে।
কুসুমের মা মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নেয়।
কাকডাকা ভোরে উঠে পড়ে ছমিরন বিবি। লোকে ডাকে কুসুমের মা। কাজে ছুটতে হবে এক্ষুনি তাকে। কুসুমের বাপ তখনো ছেঁড়া একটা কাঁথায় নিজেকে মুড়িয়ে পড়ে আছে।
খুক খুক করে কাশছে। কুসুম ঘুম ভেঙে যায়। ছমিরন বিবি এক অজানা আশঙ্কায় মেয়ের দিকে চেয়ে থাকে। কুসুমের মায়ের চোখে চোখ রাখে।
: কী খোঁজোস মা!
: কিছু না। আইজ রাতে আমি একডা সপন দ্যাখছি। সপনডা খুব ভালা।
ছমিরন বিবি মেয়ের দিকে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
একদা হেমন্তে
হে মন্ত এসেছে, শুভ্র সকাল শিউলি ঝরেছে বাগানে, চিক চিক করছে শিশির দূর্বাঘাসে।
-থামলে কেন।
-না- এই তিন লাইনই লিখেছি।
-শেষ করো; সুন্দর হয়েছে তো!
-আচ্ছা আব্বু, তুমি না বলেছিলে এই হেমন্তে দেশের বাড়ি যাবে। এক বছর হয়ে এলো বাড়ি যাওয়া হয় না। সাদিয়া আপু, সৌরভ ভাইয়া ওদের কত না মিস করছি!
হ্যাঁ যাবো মা। শীত একটু কমলেই যাবো ইন্শাআল্লাহ্।
জারিনের মনে আনন্দ খেলে যায়। সেই যে গত বছর ওরা হেমন্তে বাড়ি গিয়েছিল, কত না আনন্দ করে এসেছে। সেসব টুকরো টুকরো স্মৃতির রোমন্থনে 'ও' হারিয়ে যায় গ্রামের মেঠোপথে।
জারিন মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে; "আম্মু জান, আব্বু এই হেমন্তে গ্রামে যেতে রাজি হয়েছে। তুমি যাবে তো। তোমার তো আবার স্কুল। ছুটি ম্যানেজ করতে পারবে।”
- হ্যাঁ মা, ছুটি পাব। এবার আমরা গ্রামের বাড়ি গিয়ে অনেক মজা করব, আনন্দ করব। -আমার সোনা মামণি- জারিন মায়ের কপালে একটা মিষ্টি করে চুমু এঁকে দেয়।
আশরাফ জামান আর শিউলী আফরোজার ছোট্ট সংসার। জামান সাহেব খবরের কাগজে চাকরি করেন। সাংবাদিকতা। মিসেস শিউলী একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। বিয়ের পরই তারা ঢাকা চলে আসেন। জীবিকার তাগিদে। সেই থেকে তাদের প্রবাস জীবন। গ্রামের টানটা তারা সব সময়ই অনুভব করেন। কিন্তু বাড়ি যাওয়া আর হয়ে ওঠে না। বিয়ের দু'বছরের মাথায় এক কন্যাসন্তান আসে তাদের ঘর আলো করে। তারা মেয়ের নাম রাখেন 'জারিন'। অর্থ- সোনালি তার। এই তারেই যেন তারা বাঁধা পড়েছেন। সব স্বপ্ন তাদের এখন জারিনকে নিয়ে। তাই তারা কোনো চাওয়াই অপূর্ণ রাখেন না জারিনের।
গ্রামের বাড়িতে জারিনের দাদ-দাদী, চাচা-চাচী আর চাচাতো ভাই-বোন থাকে। সাদিয়া জারিনের সমবয়সী, সৌরভ ওদের বড়। বাড়িতে গেলে ওদের নিয়েই যত হইচই, যত খুনসুটি। বাড়ি যাওয়ার কথা শোনার পর থেকেই জারিন খুব আনন্দে আছে। বান্ধবী তাবাসসুমকে ফোন করা হয়ে গেছে। ওকে জানিয়েছে বাড়ি যাবার কথা। দাওয়াতও করেছে- "যাবি নাকি আমাদের সাথে। গ্রাম দেখে আসবি, খুব মজা হবে। হেমন্তে গ্রামে কত আয়োজন।"
তাবাসসুম হু-হ্যাঁ করে সায় দেয় 'ও' জানে ওরা নিরেট শহুরে পরিবার। আব্বু-আম্মু কি একা ছাড়বে তাকে। তাবাসসুম জানায়, তারাও একবার গ্রাম দেখতে যাবে, তাদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় আছে গ্রামে। তারা প্রায়ই দাওয়াত করে ওদের গ্রামে আসতে। আব্বু-আম্মু কথা দিয়েছে একবার গ্রাম দেখিয়ে আনবে তাকে।
জারিন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সব সময় নিজে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করে। কেউ ওর 'হবি'র কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, 'লেখালিখি'। বন্ধুরা হাসে বলে, লেখালিখি একটা 'হবি' হয়। বাগান করা, পাখি পোষা, টিকিট সংগ্রহ, গান শোনা, ঘুরতে যাওয়া- এসব হলো 'হবি'। আর তোর কি না লেখালিখি তা কী লিখিস একটু বল, দেখা দেখি।
জারিন তার হেমন্তের ওপর লেখা অসমাপ্ত কবিতাটা পড়ে শোনায়-
হেমন্ত এসেছে, শুভ্র সকাল শিউলি ঝরেছে বাগানে চিক চিক করছে শিশির দুর্বাঘাসে।
এতদিনে বুঝি ধানকাটা হলো সারা খন্দ তুলতে ব্যস্ত বাড়ির গৃহিণী ভরবে গোলা নতুন ধানে, সে যে সোনার ধান।
এটা কবিতা হলো। মিল নাই ছন্দ নাই। তার চেয়ে বল গদ্য রচনা।
- ঠিক আছে বাবা, আমি গদ্যই লিখেছি। হলো তো!
বন্ধুরা উৎসাহ না দিলেও জারিনের আব্বা কিন্তু সবসময় ওকে লেখালিখিতে উৎসাহ দেন। বলেন, মা জারিন, তুমি পড়ো এবং লেখো। যা মনে আসে তাই লেখো। সারাদিন তোমার কেমন কাটলো লিখে ফেলো। পদ্য ফর্মে হোক আর গদ্য ফর্মে হোক, লিখে যাও। হাতের কাছে পড়ার মতো কিছু না থাকলে পুরনো কোনো পঞ্জিকাই পড়। এভাবে পড়তে পড়তে লিখতে লিখতে তোমার ভেতর একটা নতুন ভুবন সৃষ্টি হবে। তখন তুমি সহজে লিখতে পারবে এবং তা অর্থবহ হয়ে উঠবে।
বাবার কথাটা জারিন মনে গেঁথে রেখেছে। তাই পড়াশোনার ফাঁকে অবসর পেলেই জারিন একটু লেখালিখি একটু আঁকিঝুঁকি করে।
শরতের স্নিগ্ধ সকাল। মেঘমুক্ত আকাশ। ঝির ঝির বাতাসে দুলে উঠছে জানালার পর্দাটা। কী এক মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে ভোরের বাতাস। জারিন জানালার পাশে পড়ার টেবিলে বসে ভাবছে, এখানে দৃষ্টি আটকে যায় দালান-কোঠায় আর গ্রামে অবারিত মাঠ, দৃষ্টি হারায় দূর সীমানায়। গ্রামে শিউলি ঝরে, শিশিরে পা ভিজে আর শহর জীবনে আমরা কতকাল আকাশ দেখি না। এমনই হাজারো ভাবান্তরে জারিন কিছু একটা লেখায় মন দেয়- "ষড় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ঋতু বৈচিত্র্যে, রূপ-রসে, মায়া মমতায় ঘেরা এই দেশটি, এই দেশে জন্মগ্রহণ করে আমি ধন্য। গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত ও বসন্ত। এ ছয়টি ঋতু কারো থেকে কেউ কম নয়। প্রতিটি ঋতুই স্ব-স্ব মহিমায় ভাস্বর-উজ্জ্বল। কার্তিক-অগ্রহায়ণ দুই মাস হেমন্তকাল। শরতের হাত ধরে আসে হেমন্ত। এ ঋতুতে কৃষকের ঘরে নতুন ধান ওঠে। এই উৎসবকে বলে নবান্ন। নবান্নকে ঘিরে পিঠা-পুলির আয়োজন করা হয়। আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত করা হয়। রাতে আয়োজন করা হয় গানের আসর। জারি সারি বাউল গানে মেতে ওঠে পুরো গ্রাম।
গত বছর যখন গ্রামে গেলাম তখন আমি আরো ছোট ছিলাম। সেই হেমন্তে ছিল কত আয়োজন। খালা ফুফুরা এলেন। তাদের ছেলে-মেয়েরা এলো। আমার ডজন খানেক ভাই-বোন হয়ে গেল। আনন্দ আর ধরে না। একদিন সকালে উত্তরের বাতাসে পিঠা পুলির মৌ-মৌ গন্ধ ভেসে এলো। আমরা তখনো ঘুমিয়ে। একটু-একটু শীত পড়ছে বলে উঠতে ইচ্ছে করছিল না। ফুপি এসে সবাইকে জাগিয়ে দিলেন- "ওঠো ওঠো পিঠা খাবে না।" আমরা হুড়মুড় করে উঠে পড়লাম। তারপর আমরা সবাই উননের চারপাশ ঘিরে বসলাম। কুসুম কুসুম ওম পেয়ে আমরা সতেজ হয়ে উঠলাম। চলল রকমারি সব পিঠা খাওয়ার ধুম। দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেলে আমরা গ্রামময় ঘুরে বেড়ালাম। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা। দেখলাম পাখিরাও আমাদের সাথে ঘরে ফিরছে। নীল আকাশে মেঘের ভেলা। আলোর খেলা। -কীসব হাবিজাবি লিখলাম। যা: কিচ্ছু হলো না। থাক এখন। কাল তো রওনা দিতে হবে। আজ সব প্রস্তুতি শেষ করতে হবে। কত কাজ। আম্মুটা যে কখন আসবে।
ঢাকা থেকে আমরা সকাল সকাল রওনা দিলাম। ছয় ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের বাস দিনাজপুর এসে পৌঁছল। এখান থেকে ভ্যানগাড়িতে আমাদের গ্রাম উদয়পুরে যেতে আরও এক ঘণ্টা লাগল। চাচা-চাচী সাদিয়া সৌরভ ভাইয়া বহির্বাটীতে এসে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জন্য। কী আনন্দ। সাদিয়া এসে জড়িয়ে ধরলো আমাকে। চাচা-চাচাকে সালাম করে আমরা ঘরে ঢুকলাম। চাচী বললেন তোমরা সব ফ্রেশ হয়ে এসো, আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি। চাচী দিনাজপুরের বিখ্যাত কাটারীভোগ চালের খিচুড়ি আর গরুর গোশত রান্না করেছেন। জিভে পানি এসে গেল।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে একটা লম্বা ঘুম দিলাম সবাই। জার্নির ক্লান্তি অনেকটাই কেটে গেছে। বিকালে চা পর্ব সেরে সৌরভ ভাইয়া সাদিয়া আর আমি বেরিয়ে পড়লাম গ্রাম ঘুরে দেখতে। গতবারের দেখা স্মৃতিময় স্থানগুলো ঘুরে ঘুরে বেড়ালাম। দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে লাল শাপলা দেখার আনন্দটাই আলাদা। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট করতোয়া নদী। শীতকে সামনে রেখে অতিথি পাখির আগমন ঘটেছে। আকাশে বালি হাঁসের ঝাঁক উড়তে দেখা গেল। সৌরভ ভাইয়া বলল, এই আর কিছুদিনের মধ্যেই নদীতীর অতিথি পাখির সমাগমে কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠবে। ইতোমধ্যে শীতের অতিথি পাখি আসতে শুরু করেছে। সারস, পাতিহাঁস বালিহাঁস বক গাংচিল কত না নাম না জানা পাখি। একদিন তোকে দেখাতে নিয়ে যাবো। আমরা আল পথ ধরে হাঁটছি দুই ধারে জমির ধান কাটা চলছে। কোনো কোনো ক্ষেতে ধান কাটা প্রায় শেষ। রাশি রাশি ধান কেটে ঘরে তুলছে কৃষক। সুগন্ধি ধানের মৌ মৌ গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ একটি সদ্য ধান কাটা ক্ষেতে কয়েকজন ছেলে মেয়েকে দেখা গেল। ওরা কী যেন খুঁজছে, সংগ্রহ করছে। জিজ্ঞেস করতেই সাদিয়া জানায়, ওরা অতি সাধারণ ঘরের ছেলে-মেয়ে। ধান কাটা ক্ষেতে কিছু ধান ঝরে যায়, ইঁদুরের গর্তেও ধান থাকে সেসব ধান কুড়িয়ে নেয় ওরা। বেশ ধান পায় ওরা। তাতে ওদের লাভ হয়। ওদের কেউ কিছু বলে না। আমি হাঁটতে হাঁটতে ওদের কাছে চলে যাই। খুব কাছ থেকে ওদের দেখি। শত আনন্দের মাঝেও একটা দুঃখ ছুঁয়ে যায় আমাকে। দু'টি মেয়ে কতই বা বয়স। পরনে ফ্রক, কী যে রঙ ছিল তা বোঝার উপায় নেই। কোঁকড়ানো ঝাঁকড়া চুলে কতকাল যত্নের হাত পড়েনি, কে জানে। আমাকে দেখে একটু চমকে উঠলো। বললাম, কী নাম তোমার, বেশ ধান পেয়েছ তো। শেফালীরা হাসে, কুড়ানো ধান দেখায়। ফোকলা হাসি আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এ যে সোনার ধান, সোনামুখ ওদের।
বসেছি। দাদী এবার রূপকথার গল্প না বলে এ সময়ের গল্প শুনালেন। দাদী বললেন, "তোমরা এবার রাতে ঘুমানোর আগে দাদীর গল্প শোনার পালা। আমরা বোনেরা সব দাদীকে ঘিরে তো বই পুস্তকে পড়েছ, গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছ। এ দৃশ্য এখন আর নেই গ্রামে। এখন আর নদীতে পাল তোলা নৌকা দেখা যায় না। নববধূর পালকি তো হারিয়েই গেছে। ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দও আর শোনা যায় না। এসবের স্থান দখল করেছে তোমাদের আধুনিক সব যন্ত্রপাতি।
আচ্ছা দাদু, এবার নবান্ন হবে না।" হবে তো দাদু! কালই পিঠা পুলির আয়োজন করা হবে।
সবাইকে দাওয়াত করা হয়েছে। এবার তবে সবাই ঘুম দাও। কাল কিন্তু খুব ভোরে উঠতে হবে, সেই কাকডাকা ভোরে। দেখব কে আগে উঠতে পারে।
ক'দিন হলো আমরা ঢাকায় ফিরেছি। আজ হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলে শুধু শেফালীর ফোকলা হাসি খুব করে মনে পড়ছে।
সন্ধ্যায় জামান সাহেব ঘরে ফেরেন। হাতে মিষ্টির প্যাকেট। জারিন বলে, কী ব্যাপার 'আব্বু মিষ্টি হাতে এতগুলো পত্রিকা।
: তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে। তোমার আম্মুকে ডাকো। কই কোথায় তুমি। তোমা মেয়ের লেখা গল্প ছাপা হয়েছে!
জারিন বিশ্বাস করতে পারে না। আব্বুর হাত থেকে পত্রিকা নিয়ে বিস্ময়ে আনন্দে আব্বুলে জড়িয়ে ধরে। মা তখন বাবা-মেয়ের আনন্দঘন মুহূর্ত উপভোগ করতে থাকেন।
মধুর স্মৃতি
মেহমান আসার কথা শুনে জবার মায়ের আজ ব্যস্ত সময় কাটছে। ঘর গোছানো, রান্না-বান্না কত কাজ। ছেলে-মেয়েরাও সাধ্যমতো মাকে সাহায্য করছে। । দুপুরের আগেই ঘরদোর ঝকঝকে তকতকে পরিপাটি হয়ে উঠলো। মেহমান আসরের পরপরই এসে পৌঁছলেন। মেহমান আর কেউ নন। জবার বাবার ছোট বেলার বন্ধু আব্দুল করিম। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি ঢাকা এলে বন্ধুর বাড়িতেই ওঠেন। এবারও তার ব্যত্যয় হয়নি। তবে অনেক দিন পর এলেন। ঢাকা এসেছেন চিকিৎসার কাজে।
মাস্টার সাহেব একটু ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে বন্ধুর সাথে বসেছেন আলাপচারিতায়। এমন সময় আব্দুর রহমান সাহেবের মেঝ ছেলে সুজন এসে বললো,
: আব্বু আজ কি আমাদের বৈঠক হবে?
: কেন হবে না।
: চাচা যে এসেছেন।
: তাতে কি। তোমাদের চাচা আজকে আমাদের বৈঠকে মেহমান হিসেবে থাকবেন। উনিও তোমাদের উদ্দেশে কথা বলবেন। তুমি সভার আলোচনার বিষয় (এজেন্ডা) সাজিয়ে ফেল।
জনাব রহমান খেয়াল করলেন তার বন্ধুর চোখেমুখে উৎসুক ভাব। তা হবারই কথা। এ ধরনের প্র্যাক্টিস ক'জনের পরিবারেই বা আছে। তিনি বিষয়টি খুলে বললেন- 'শোন মাস্টার, আমরা সপ্তাহে একদিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে এক টেবিলে বসি। সদস্যদের কার কি সমস্যা, লেখা-পড়া, চরিত্র গঠন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলি। মতবিনিময় পরামর্শ এই আর কি। পারিবারিক আড্ডাও বলতে পারো। আমার সাপ্তাহিক ছুটির দিন বসা হয়। ব্যস্ততার কারণে কোনো সপ্তাহে আবার বসাও হয় না। আজ তুমি আছো, সন্ধ্যার পর আমাদের আড্ডা জমবে ভালো'।
আব্দুল করিম মাস্টার এই প্রথম এমন আড্ডার কথা শুনলেন। বেশ আগ্রহ প্রকাশ করলেন।
সন্ধ্যার পর যথারীতি বৈঠক শুরু হলো।
রহমান সাহেবের দুই ছেলে এক মেয়ে। ওরা স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে। মেয়ে বড় জারিন আফরোজ জবা- কলেজে ফার্স্ট ইয়ার, মেঝ ছেলে আহমদ শাব্বির সুজন, নাইনে। সবার ছোট শাকিল আহমদ শুভ ক্লাস সেভেনে পড়ে।
সুজন অনুষ্ঠানের আলোচ্যসূচি সাজিয়েছে। একান্ত পারিবারিক বিষয় নেই। মেহমানের কথা ভেবে হয়তো এমনটা করা হয়েছে। সূচিটা পড়ে শোনানো যাক:
সঞ্চালক- আহমদ শাব্বির সুজন
পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত-শুভ
আলোচনা-
পারিবারিক বৈঠকের গুরুত্ব- বড় আপা
প্রশ্নোত্তর পর্ব- উত্তর দিবেন আব্বু
মেহমানের কথা- চাচা (আব্দুল করিম)
মুনাজাত
আলোচ্যসূচি দেখে রহমান সাহেব খুব খুশি হলেন, মনে মনে ভাবলেন, ছেলের বুদ্ধি আছে বলতে হয়। যা হোক, আলোচনার এক ফাঁকে মিসেস রহমান (সুজনের মা) চা আর ঝালমুড়ি পরিবেশন করলেন। মাস্টার সাহেব বললেন, ভাবী এবার আলোচনা আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। আপনি বসুন।"
রহমান সাহেবের ছোট ছেলে শুভ প্রশ্নোত্তর পর্বে হাত উঠিয়ে অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন করলো-
আচ্ছা আব্বু, আল্লাহ তো তার বান্দাকে খুব ভালোবাসেন; কিন্তু কতটুকু ভালোবাসেন?
রহমান সাহেব ভাবলেন, এক কথায় এ প্রশ্নের উত্তর দিলে, ছেলেকে সন্তুষ্ট করা যাবে না। তবে কী উদাহরণ টেনে বলা যায়।
রহমান সাহেবের ইতঃস্তত ভাব দেখে মাস্টার সাহেব বললেন, দোস্ত তুমি অনুমতি দিলে আমি এ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলার চেষ্টা করতে পারি। রহমান সাহেব বললেন, অবশ্য অবশ্যই, তুমি শিক্ষক মানুষ, তুমি ভালো বলতে পারবে।
মাস্টার সাহেব: "বাবাজিরা শোন-আল্লাহ মানুষকে কতটা ভালোবাসেন তা পরিমাপ কর খুবই কঠিন। সন্তানকে বেশি ভালোবাসে কে নিশ্চয়ই বাবা-মা। আল্লাহ মা-বাবার চেয়েও তার বান্দাকে অনেক বেশি ভালোবাসেন। বাবা-মা'র অন্তরে এই ভালোবাসা আল্লাহই দান করেছেন। একটা উদাহরণ দেয়া যাক, দুরন্ত ডানপিটে কোনো সন্তানকে তার দুষ্টুমির জন্য মা খুব বকা দিলেন। ছেলে রাগ করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। ছেলে আর ঘরে ফেরে না। মা'র মনে কুডাকে। বুকটা দুরুদুরু করে। মা পথ পানে চেয়ে থাকেন। উঁকিঝুকি দেন। কখন ছেলে ঘরে ফিরবে। অপেক্ষা যেন মৃত্যুর কষ্টের মতো মনে হয়। হঠাৎ ঘরের দরজায় টোকা শোনা যায়। মা দৌড়ে গিয়ে দরজা খোলেন। ছেলেকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরেন। চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেন। চোখের পানিতে ভাসেন। বুঝতেই পারছ, এই মায়ের ভালোবাসা থেকেও আল্লাহ তার বান্দাকে শত কোটি গুণে বেশি ভালোবাসেন, বান্দা যখন তাঁকে স্মরণ করে বা তাঁর দুয়ারে ধর্ণা দেয়।"
পরিবেশটা একটু ভারী হয়ে উঠলো। মিসেস রহমান একটু হালকা করতে বললেন, ভাইজান আপনি খুব ভালো বলেছেন। সন্তানরা, তোমরা এ আলোচনা থেকে শিক্ষা নিবে- মা-বাবা সন্তানদের নিয়ে কতটা ভাবেন। তার চেয়েও বেশি ভাবেন মহান আল্লাহ, যদি তোমরা সৎপথে থাকো। তাকে স্মরণ করো, তাহলে আল্লাহর সাহায্য সবসময় তোমাদের সাথে থাকবে।
: জবার মা, আমার চা তো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। মাস্টার ভাইয়ের কথা শুনতে-শুনতে আমি আমার শৈশবে হারিয়ে গিয়েছিলাম।
: অসুবিধা নেই। আমি চা আবার গরম করে দিচ্ছি।
: জানো মাস্টার, আমি ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। আমার জীবনটা ছিল ছন্নছাড়া। খুব দুরন্ত ছিলাম। একবার হলো কি-বর্ষার নতুন পানি এসেছে। বিলে পানি থৈ-থৈ করছে। আমি বন্ধুদের সাথে সাঁতরে বিল পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করলাম। বন্ধুরা কিছুদূর এসেই ফিরে গেল। আমি ফিরলাম না। আরো কিছুটা যেতেই ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। তখন জেগে থাকা একটা উচ্চ জায়গায় গিয়ে উঠলাম। অনেকটা দ্বীপের মতো। চারদিকে পানি আর পানি। আমি আর সাহস করছি না ফিরে যাবার। ততক্ষণে মায়ের কানে খবরটা পৌঁছে গেছে। মা' একটা ডিঙ্গি নৌকা সংগ্রহ করে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলেন। সেদিন শুধু মায়ের চোখে কান্না দেখেছি। সেই মাও আজ আর নেই।
-পরিবেশটা আবারো ভারী হয়ে উঠলো। মিসেস রহমান একটু হালকা করতে বললেন, আমি একটা ধাঁধা বলব- দেখি কে উত্তর দিতে পারে। "হরি'র উপর হরি, তার উপর হরি। হরিকে দেখিয়া হরি হরিতে লুকায়।” পারছো না কেউ!
জবা বললো, আম্মু একটু আভাস-ইঙ্গিত (Clue) দাও।
জবার মা বললেন, এই ধর তোমাদের আব্বু যে বিল-ঝিলের কথা বললো, এটা তার সাথে সম্পৃক্ত। সবাই আমতা আমতা করছে।
: আচ্ছা বলে দিচ্ছি, হরি মানে পানি। হরি মানে পদ্ম। হরি মানে ব্যাঙ। হরি মানে সাপ। এবার মিলিয়ে দেখ।
-এবার হাসির রোল পড়ে যায়।
: আচ্ছা বন্ধু! তোমার ছেলে-মেয়েরা কি সাঁতার জানে?
: জানবে কিভাবে। গ্রামে গেলে তো বেশিদিন থাকা হয় না। তারপর আবার পুকুরগুলোতে সব মাছ চাষ হয়। গোসল করার কোনো উপায় নেই। মাছের কৃত্রিম খাবারের গন্ধে পানি বিবর্ণ হয়ে থাকে। আমার ইচ্ছে হয় কি দোস্ত! আমার যদি অনেক অর্থ সম্পদ থাকতো, আমি গ্রামে একটা দীঘি কেটে দিতাম। সেটা গোসল আর সন্তানদের সাঁতার শেখার জন্য উন্মুক্ত থাকতো।
: তোমার নেক ইচ্ছা আল্লাহ পূরণ করুন।
ক'দিন হলো মাস্টার সাহেব গ্রামে ফিরে এসেছেন। সাথে নিয়ে এসেছেন একটি পরিবারের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, মিলে মিশে থাকার ভালোবাসার এক মধুর স্মৃতি। সেই কথাই আজ তিনি ক্লাসে তার ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে শেয়ার করছিলেন। তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরাও অনুপ্রাণিত হয় তার গল্পে।
অন্য রকম গল্প
গাজীপুর জেলার ধীরাশ্রম গ্রাম। পাশ দিয়ে চলে গেছে সিটি করপোরেশনের পাকা রাস্তা।
জায়গাটা উন্নয়নশীল। নগরায়ণ হচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে গড়ে উঠছে শিল্প-কারখানা। রাস্তার একপাশে ইটভাঙার শ্রমিকরা কাজ করছেন। এই সাতসকালে খট্ খট্ শব্দ চার দিকের নীরবতা ভাঙছে। আজ চৈত্রের কত তারিখ নয়ন তা জানে না। তবে সকালটা তেতেছে তা খুব আঁচ করতে পারে।
: মা! ছাতাটা টাঙ্গায়্যা দাও। সকাল বেলাতেই সূর্যির তেজটা কেমুন দ্যাখছ।
: হ বাবা দিতাছি।
সাবিহা খাতুন একটি লম্বা লাঠির সাথে ছাতাটা বেধে সূর্যের দিকে মুখ করে টাঙিয়ে দেয়। একটা শীতল ছায়া নয়নের কপালে এসে পড়ে। নয়নের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। বাঁ হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে, ছাতার দিকে এক নজর তাকিয়ে নয়ন আবার ইটের ওপর হাতুড়ির খট্ খট্ শব্দ তোলে। মায়ের সাথে ইট ভাঙার কাজটা নয়ন এখনও রপ্ত করে উঠতে পারেনি। কচি হাতের আঘাতে ইটের দু'-একটি টুকরা ওকে কখনও কখনও পাল্টা আঘাত করে বসে। তাতে 'ও' বিচলিত হয় না। 'ও' জানে এ থেকেও মায়ের মনের আঘাত অনেক বেশি।
একটু অন্যমনস্ক হতেই হাতুড়ির একটা আঘাত সজোরে বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির ওপর এসে
পড়ে।
'উহ্ মা গো মরছি!'- আর্তনাদটা দিগন্তে না মিলাতেই একটা লাল রঙের সুবারু গাড়ি ওদের সামনে এসে থামে। ভেতর থেকে একজন ভদ্রলোক বেরিয়ে আসেন।
: একি! ছেলেটির আঙুল কেটে রক্ত ঝরছে, আর তুমি মা হয়ে দেখছ!
: ভদ্রলোকের কথায় সাবিহা খাতুনের সম্বিত ফেরে।
মা কাঁদতে শুরু করে-হায়! হায়! আমার পোলাডা শেষ হইয়া গ্যাল। নয়ন হাতটা উঁচু করে ধরে আছে। টপ্ টপ্ করে রক্ত ঝরে পড়ছে কালো পাথরের ওপর। মা শাড়ির আঁচলের কিছুটা ছিঁড়ে নয়নের হাতটা বেঁধে দেয়। ভদ্রলোক মা ও ছেলেকে গাড়িতে তুলে নিয়ে রওনা দেন হাসপাতালের দিকে।
ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল কোনো একদিন। সেদিন তিনি তার জীবনের গল্প বলেছেন আমাকে। অনুরোধ করেছেন আমি যেন তার নাম প্রকাশ না করি। আমি তার অনুরোধ রাখবো। এসো আমরা তার একটা ছদ্মনাম দেই; 'আকাশ'
আকাশ সাহেব তখন খুব ছোট। তাঁর বাবা গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি করতেন। গার্মেন্টস দুর্ঘটনায় তাঁর বাবা মারা যান। চল্লিশ দিন না যেতেই চাচারা বললেন, এ বাড়িতে তোমাদের কোনো অধিকার নেই। মায়ের মাথায় তখন বাজ ভেঙে পড়লো।
অথচ বাবা তার ছোট ভাইদের নিয়ে একটি ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তুলেছিলেন বাড়িতেই। সেই আয়ে তাদের পরিবার চলতো স্বাচ্ছন্দ্যে। বাবার অবর্তমানে চাচাদের সংসারে ঠাঁই হলো না তাদের। নিরুপায়-অসহায় মা শিশু আকাশকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন অজানার উদ্দেশ্যে। দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে তাদের আশ্রয় মিললো। এর পরের কাহিনি অনেক বেদনার, অনেক বঞ্চনার। সেসব কথা নাই বা বললাম।
তবে একটি ঘটনা না বললেই নয়। আকাশের মা প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে। কোলে সন্তান দেখে কেউ কাজ দিতে চায় না। সবাই কোলের সন্তানের দিকে তাকিয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায়। এটা তার সম্মানে লাগে। তার মন সায় দেয় না এভাবে জীবন ধারণ করতে। তিনি মনস্থির করেন সন্তানকে বাড়িতে রেখেই কাজে বেরুবেন। কিন্তু কে সন্তান দেখবে, কে সামলাবে তার শিশু সন্তানকে। ভাবেন, আশ্রয়দাতার এক মেয়ে রয়েছে কিশোরী
বয়সের। ওকে বলে দেখবেন।
সত্যি সত্যি একদিন তাই হলো। কিশোরী মেয়েটি তার সন্তান দেখতে রাজি হলো। আকাশের মা আকাশকে খাওয়ায়ে ঘুম পাড়িয়ে সকাল সকাল কাজে বেড়িয়ে পড়লেন। ঘণ্টা দুই পরই শিশু আকাশ ঘুম থেকে জেগে উঠলো। মাকে না দেখে জুড়ে দিলো ভীষণ কান্না। কিশোরী মেয়েটি অনেক চেষ্টা করেও সে কান্না থামাতে পারছিল না। বাড়ির অন্যরাও অনেক চেষ্টা করলো কিছুতেই কিছু হলো না। মা কোথায় গেছে কেউ কিছু জানে না। বলেও যায়নি।
অবস্থা বেগতিক আঁচ করতে পেরে বাড়ির কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করা শুরু করে দিলো। একপর্যায়ে কুকুরটি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো। খুঁজে বের করলো আকাশের মা'কে। কুকুরটি তাকে ঘেউ ঘেউ করে লেজ নেড়ে নেড়ে বাড়ির পথ দেখাতে চাইল। তিনি কুকুরটিকে চিনতে পারলেন; কিন্তু কিছু বুঝে উঠতে পারলেন না। পরে কুকুরটা যখন পথ পানে একবার চলে যায় আবার ফিরে আসে, তাকে বোঝাতে চায় তুমি আমার পিছু নাও তখন মায়ের মনটা আঁতঙ্কে ওঠে। তিনি কালবিলম্ব না করে, কাজ ফেলে রেখে কুকুরের পিছু পিছু বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এসে দেখেন তার সন্তান অঝরে কাঁদছে। তিনি সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। কুকুরটি তার পাশে দাঁড়িয়ে আনন্দে লেজ নাড়তে থাকে। বাড়ির সবাই বিস্ময়ে কুকুরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এরপর কেটে গেছে অনেক বছর। অনেক ত্যাগ আর অধ্যবসায়ের পর শিশু আকাশ এখন আকাশ সাহেব হয়েছেন। মায়ের দুঃখ ঘুচিয়েছেন। বাবার ব্যবসা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। কোনো মায়ের কোনো শিশুর কষ্ট দেখলে আকাশ সাহেবের মনটা তাই কাঁদে। আকাশ সাহেব সাবিহা ও তার ছেলে নয়নকে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন। কাজ দিয়েছেন। নয়ন এখন স্কুলে পড়ে।
আজ ১লা মে। মে দিবস। শ্রমিক দিবস। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন। সাভারের রানা প্লাজার সামনে সকাল থেকেই ভিড় জমে উঠেছে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির কথা তোমরা জান। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে দু'হাজার তেরো সালের চব্বিশে এপ্রিল রাজধানীর পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলখ্যাত সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় সহস্রাধিক গার্মেন্টস শ্রমিক নিহত ও শত শত শ্রমিক আহত হন। ধ্বংসস্তূপের বেদিতে ফুল দিয়ে ভালোবাসা নিবেদন করতে এসেছেন নিহতদের স্বজনরা। নয়নের হাত ধরে সাবিহা খাতুনও এসেছেন। হাতে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা।
ধ্বংসস্তূপের মাটি ছুঁয়ে দেখতে চান সাবিহা। শুনতে চান তার স্বামীর হৃৎপিণ্ডের শব্দ, পায়ের আওয়াজ। নয়ন মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখে। অদূরে লাল গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন আকাশ সাহেব। তার দু'চোখে তখন অশ্রুধারা।
মিষ্টি পাওয়া যায়
জিবরানের বয়স তখন দেড় কি দুই বছর। কেবল হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে। বাবা নামাজ পড়তে দাঁড়ালে পাশে জায়নামাজে গিয়ে দাঁড়ায়। বাবার সাথে রুকু সিজদাহ করে। কখনো রুকুর আগেই সিজদাহ দিয়ে বসে। কখনো তার গায়ে জামা-কাপড় কিছুই থাকে না। দিব্যি নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। ওর নামাজ পড়ার এই দৃশ্য দেখে অন্যরা সবাই হেসে কুটিকুটি হয়। তবে কেউ কোনো শব্দ করে না। যাতে ওর ছন্দপতন না ঘটে।
জিবরান বেড়ে ওঠে। এখন শিশুশ্রেণিতে পড়ে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে অনেক কিছু জানতে চায়। ওর যেন জিজ্ঞাসার শেষ নেই। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা আম্মু নামাজ পড়লে কী হয়? মা আগে পিছে কিছু না ভেবেই বলে বসেন, মিষ্টি পাওয়া যায়। জিবরান বলে, তাহলে আমি এখন থেকে নিয়মিত নামাজ পড়বো।
মা ভাবেন, বলে তো ফেললাম, এখন কী হবে। নামাজ পড়ে জিবরান যদি মিষ্টি না পায় তবে তো হতাশ হবে। আমিও মিথ্যাবাদী হয়ে যাবো। আল্লাহ রাসূলের (সা.) প্রতিও ওর ভালোবাসা কমে যাবে।
মা করলেন কী প্রতি ওয়াক্ত নামাজের আগে জায়নামাজের নিচে বাতাসা (চিনির এক প্রকার শুকনো সাদা মিষ্টি) রেখে আসতেন। জিবরান নামাজ শেষে বাতাসা পেয়ে খুব খুশি হতো। মজা করে খেতো আর বলতো, এগুলো বুঝি ফেরেস্তারা দিয়ে যায়। মা বলতেন, হয়তো বা। বাবা-মা একদিন জিবরানকে সাথে নিয়ে আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে গেলেন।
সেটা ছিল জিবরানের খালার বাড়ি। খালাতো বোনকে নামাজ পড়তে দেখে ওর আগ্রহের শেষ নেই। ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে বলে, মিস্টি পেয়েছ।
: কীসের মিষ্টি ভাইয়া।
: কেন নামাজ পড়লে যে। আমি নামাজ পড়লে প্রতিদিন মিষ্টি পাই আর মজা করে খাই।
খালাতো বোন মিথিলা হেসে কুটিকুটি। ও বিষয়টি সিরিয়াসলি নেয় না। ও তো পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, অনেক কিছু বোঝে। মিথিলা জিবরানকে বুঝিয়ে বলে, শোনো ভাইয়া নামাজ পড়তে হবে শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তাহলে আমরা পরকালে বেহেশত পাব। আর সেখানে অ-নে-ক মিষ্টি অ-নে-ক ফলমূল খেতে পারবো। তুমি যা চাইবে তাই পাবে। জিবরান বলে, তাই বুঝি। তাহলে আজ থেকে আমিও শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়বো।
জিবরানরা বেড়ানো শেষে বাসায় ফিরে আসে। মাগরিবের ওয়াক্তে বাপ-বেটা নামাজে দাঁড়ায়। কাকতালীয়ভাবে ঐদিন মা মিষ্টি রাখতে ভুলে যান। জিবরান নামাজ শেষে মিষ্টির খোঁজ করে না। তারপরও জায়নামাজ তুলে একবার দেখে মিষ্টি আছে কি না। মিষ্টি না দেখে ভাবে, ঠিকই তো আমি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়েছি, মিষ্টি আসবে কেন। আমি বেহেশতে অনেক অনেক মিষ্টি পাব। জিবরানের মুখে হাসি ফোটে। মা বিষয়টি লক্ষ্য করেন। ভেবে পান না কি হলো। ছেলে তো কিছু বলছে না। মুখটাও হাসি-খুশি। তবে কি ছেলে সব রহস্য জেনে গেল।
জিবরান মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, জানো আম্মু মিথিলা আপু বলেছে, নামাজ শুধু দিবেন। আমিও আজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়েছি। তাই ফেরেস্তারা মিষ্টি দিয়ে যায়নি। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পড়তে হবে। তবে পরকালে আল্লাহ বেহেশতে আমাদের অনেক মিষ্টি মায়ের চোখে আনন্দ অশ্রু। অধর রেখায় হাসির ঝিলিক খেলে যায়। মা ছেলেকে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেন।
আত্মপরিচয়
একদিন এক শিকারি বনের ভেতর একটি আস্তানায় বাঘের বাচ্চা দেখতে পেল। সম্ভবত তখন বাঘিনী শিকারে বেরিয়েছিল। তাই তার বাচ্চা দুটো অরক্ষিত অবস্থায় ছিল। এই সুযোগে শিকারি একটি বাচ্চা ধরে বাড়িতে নিয়ে এলো। চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল। গ্রামের সবাই দেখতে ভিড় জমালো। এতক্ষণে শিকারি বুঝতে পারলো, কাজটি ঠিক হয়নি। এই মাসুম বাচ্চাকে কী খাওয়াবে। বাচ্চার চোখ দু'টি নীরবে বলছে, “আমি ক্ষুধার্ত আমাকে খেতে দাও।”
শিকারির বাড়িতে ছিল ছাগল। তার তিনটি ছানাাও ছিল। শিকারি দেখল, ছাগ ছানারা কী সুন্দর মনের সুখে ছাগীর দুধ খাচ্ছে। শিকারি ভাবলো, ব্যাঘ্র শিশুকে ছাগলের দুধ খাওয়ালে কেমন হয়। যে কথা সেই কাজ। বাঘের বাচ্চা দিব্যি ছাগলের ওলানের বাট চুষে দুধ খেয়ে জীবন ধারণ করতে লাগল। বাঘের সন্তান আর ছাগলের সন্তানরা এক সঙ্গে বড় হতে লাগল। এক বছর যেতে না যেতেই ছাগল ছানাদের মাথায় শিং গজালো। স্বভাবগত কারণেই ছাগল ছানারা বাঘের সন্তানকে শিং দিয়ে গুঁতাতে শুরু করলো। বাঘের সন্তান খুব বিরক্ত হতো। কিন্তু করার কিছুই ছিল না। তার তো আর শিং নেই। সে তার নরম তুলতুলে শরীরে ছাগলের গুঁতো খেয়েই চলল। ছাগলরাও তাকে গুঁতিয়ে খুব মজা পেত। বাঘের সন্তান শুধু সৃষ্টিকর্তার কাছে তারও যেন শিং গজায়- এই প্রার্থনা করতে থাকলো। এ অবস্থায় একদিন ছাগলের সন্তানরা ঘাস খেতে মাঠে গেল। বাঘের সন্তাও তাদের সঙ্গী হলো। মাঠের দূর প্রান্তে বন থেকে শিকার খুঁজতে আসা একটি বাঘ দেখল, ছাগলরা ঘাস খাচ্ছে আর তারই স্বজাতি (ব্যাঘ্র ছানা) একজনকে গুঁতাচ্ছে। বাঘ আর ঠিক থাকতে পারলো না। বীর বিক্রমে ছুটে এলো। পাহাড় কাঁপানো গর্জন তুলল। বাঘের গর্জন বলে কথা। ছাগলরা সব ছুটে পালালো। মা বাঘ শিশু ব্যাঘ্রটিকে বলল, তোর এ অবস্থা কেন?
চল আমার সাথে। বাঘ তার স্বজাতির শিশুটিকে নিয়ে বনের ভেতর চলে গেল। এরপর একটি জলাশয়ে পানি খেতে পাঠালো। ব্যাঘ্র শিশুটি পানি দেখে ভয় পেল। কেননা ততদিনে তার মধ্যে ছাগলের স্বভাব ঢুকে পড়েছে। পেছন থেকে মা বাঘের শাসনে শিশুটি পানির ধারে গেল এবং পানির মধ্যে নিজের চেহারা (ছবি) দেখতে পেল। ভাবলো, 'তাহলে আমি ছাগল নই, আমি তো ওই বড় বাঘের মতো।'
--ব্যাঘ্র শিশু পানি খেয়ে বুক টান করে সগর্বে ফিরে আসতে লাগল। মা বাঘ বলল,
কী দেখলে?
: দেখলাম আমি তো তোমার মতো, আমি তো তোমারই জাত।
: তবে এতদিন দুর্বল ছাগ হয়েছিলি কেন? এবার একসঙ্গে গর্জন তোল। হা-লু-মহা-লু-মা।
সারপ্রাইজ
: আম্মু---! পেস্ট নেই। আব্বুকে টুথপেস্ট আনতে বলবে।
: আজকে কোনো রকমে কাজ চালিয়ে নাও বাবা।
রওনক টিউব টিপে টিপে কিছুটা পেস্ট বের করে কাজ চালিয়ে নেয়। দ্বিতীয় দিন সকালে ওয়াশ রূমে ঢুকে রওনক নতুন পেস্ট না দেখে বলতে থাকে- 'আম্মু পেস্ট আননি। কি দিয়ে ব্রাশ করবো!"
: বলেছিলাম বাবা, তোর আব্বু আনতে ভুলে গেছে।
রওনক আজো টিউব টিপে অনেক কসরত করে কিছুটা পেস্ট বের করে দাঁত ব্রাশ করে।
তৃতীয় দিনেও একই ঘটনা ঘটে। পেস্ট নেই। আম্মু বলেন, তোর আব্বু তো পেস্ট না পেলে নিমের ডাল দিয়ে মেছওয়াক করে। তাই তার তাগাদা নেই। যত সমস্যা আমাদের। আজকে
তুমি স্কুলে যাবার সময় টাকা নিয়ে যাবে; ফেরার পথে টুথপেস্ট কিনে আনবে। রত্তনক ভাবে, আজ আর চেষ্টা করে লাভ হবে না। কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। তারপরও সে শক্তি খাটিয়ে টিপে টিপে একটুখানি পেস্ট বের করে।
'ও' ব্রাশ করে আর ভাবে, প্রথম দিনেই টিউবটা ফেলে দিলে তিন দিন কাজ চালানোর মতো পেস্ট অপচয় করা হতো। প্রতিদিন এক টাকা হিসাবে তিন দিনে তিন টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
এভাবে আমরা সাশ্রয়- সঞ্চয় করতে পারলে মাস শেষে বছর অন্তে ভালো একটা কিছু করা সম্ভব হতে পারে।
রওনক। পুরো নাম রওনক জাহান। 'ও' অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছে 'ও'। ছোটবেলা থেকেই 'ও' দেখে আসছে অভাব কি জিনিস। অভাব সামাল দেয়া, ধৈর্য ধারণ করা-এসব পরিবার থেকে শিখেই বড় হচ্ছে 'ও'।
সেদিন স্থানীয় একটি ব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল ওদের বিদ্যালয়ে এসেছিল; স্কুল ব্যাংকিং বিষয়ে ক্যাম্পেয়িং (Campaign) করতে। রওনক তাদের কথা বেশি মনোযোগ দিয়ে শোনেনি। ভেবেছে, এ বিষয়টি তার জন্য নয়। যে পরিবারে 'নুন আনতে পান্তা ফুরায়' সে পরিবারের সন্তান হয়ে কিভাবে সঞ্চয় করবো। আবার ব্যাংকিং! এটা তার কাছে মনে হয়েছে বড়লোকদের ব্যাপার-স্যাপার।
রওনক ব্রাশ করে আর ভাবে, সঞ্চয় করা তাদের পক্ষেও সম্ভব। সেদিন স্কুল ব্যাংকিং-এর বিষয়ে অমনোযোগী হওয়াটা ঠিক হয়নি। সে আজই বন্ধু কাউসারের সাথে কথা বলে বিস্তারিত জানবে। কাউসার সেদিন স্কুল ব্যাংকিং এর ব্যাপারে বেশ সাড়া দেয়। এবং হাতে-কলমে শিখে নেয় হিসাব খোলার ফরম কিভাবে পূরণ করতে হয়। কাউসার নিশ্চয়ই তাকে সহযোগিতা করবে।
রওনক আজ টিফিন আওয়ারে কাউসারকে বলে, দোস্ত! 'স্কুল ব্যাংকিং' বিষয়ে আমাকে একটু বিস্তারিত বল তো। কাউসার বলে, ওই দিন তো তোর কোনো সাড়াশব্দ দেখলাম না। আজ আবার বলছিস বলতে! রওনক বলে! আমার ভুল হয়েছে দোস্ত। আমাদের সবারই সঞ্চয় করার প্রয়োজন রয়েছে।
কাউসার বলে, শোন তাহলে- ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করে। এর উদ্দেশ্য হলো, শিক্ষার্থীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা এবং তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে শিক্ষিত করে তোলা। এই কার্যক্রমের লক্ষ্য হলো, ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে টাকা জমানোর অভ্যাস গড়ে তোলা। এর আরো একটি উদ্দেশ্য হলো, শৈশব থেকেই আধুনিক ব্যাংকিং প্রযুক্তির সাথে ছাত্রদের পরিচিত করানো। ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ব্যাংকিং অনুমোদন করো। কাউসার আরো বলে, এর সুবিধাগুলো কি জানিস-তোর জমানো টাকা নিরাপদে থাকবে; জমানো টাকার ওপর মুনাফা বা লাভ যোগ হবে: বৃত্তি/উপবৃত্তির টাকা গ্রহণ করা যাবেঃ স্কুলের বেতন/ফি পরিশোধ করা যাবে: প্রয়োজনে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করা যাবে। আর একটি সুবিধা কি- তোকে একটা এটিএম কার্ড দেয়া হবে। সেই কার্ড দিয়ে তুই যে কোনো স্থানের এটিএম ব্যুথ থেকে টাকা উঠাতে পারবি।
রত্তনক মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, সে স্কুল ব্যাংকিং করবে। হিসাব খুলবে। সঞ্চয় গড়ে তুলবে। সে সঞ্চয়ের পিছনে প্রেরণার সেই টুথপেস্ট ঘনঘটার গল্পটা লজ্জায় নীরবে চেপে যায়। কাউসারকে বুঝতে দেয় না। 'ও'-মনের অজান্তেই ভাব সম্প্রসারণের দু'টি পঙক্তি বিরবির করে আবৃতি করে-
ছোট ছোট বালুকণা বিন্দু বিন্দু জল
গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল
রওনক এখন টিফিনের খরচ বাচিয়ে, বিভিন্ন সময় বাবা-মা'র দেয়া হাতখরচ সাশ্রয় করে, ঈদ-জন্মদিনের উপহারের টাকা জমিয়ে সঞ্চয় গড়ে তুলতে থাকে। স্কুল ব্যাংকিং এর কথা 'ও' পরিবারের কাউকে জানায় না। ওর ইচ্ছা একদিন 'ও' বাবা-মা-ভাইবোনদের সারপ্রাইজ দিবে।
রত্তনকের বাবা শওকত আলী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। মা সুরাইয়া বেগম গৃহিনী। ওরা দু'ভাই এক বোন। 'ও' মেঝ। বড়ভাই ফারুক হাসান, কলেজে পড়ে। ছোট বোন তিন্নী স্কুলে যায় না। সামনে বছর যাবে। রওনক ভাবুক টাইপের একটি ছেলে। ওর চোখের সামনে কিছু ঘটলে বা কিছু দেখলে তা নিয়ে 'ও' ভাবতে থাকে। একটা অর্থ খুঁজে বের করে; একটা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দাঁড় করায়। এ জন্য বন্ধুদের মধ্যে কেউ ওকে পছন্দ করে আবার কেউ অপছন্দও করে।
সেদিন এক সহপাঠী বিচিত্র এক ফ্যাশন-এ চুল কেটে ক্লাসে আসে। রত্তনক দেখে অবাক।
: কি-রে, তোর চুলের এ অবস্থা! স্যার দেখলে তোকে আস্ত রাখবে ভেবেছিস্।
ইদানীং তো সবাই ফ্যাশন করে। আমিও করেছি, সমস্যা কি!
: আমার কোনো সমস্যা নেই, সমস্যা তোর।
শিক্ষক-যথারীতি ক্লাসে এলেন। পাঠদান করলেন। ঘণ্টা বাজলে চলেও গেলেন। কিন্তু তকে কিছুই বললেন না। রওনক আরেকবার আশ্চর্য হলো। যে শিক্ষক এত নীতির কথা বলেন; আমাদের শিষ্টাচার সভ্যতা-ভব্যতা শিখান, তিনি আজ কিছুই বললেন না। স্যারের এ আচরণ তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হলো। রত্তনক ভাবতে লাগলো। স্যারের এ আচরণের পেছনে সাম্ভাব্য কিছু কারণ খুঁজে বের করলো। এবং তা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করলো। বন্ধুরা ওর কথায় সায় দিলো। "পৌর কমিশনারের ছেলে বলে কথা। ওকে কিছু বলে স্যার বিপদে পড়বে নাকি।" রত্তনক বলে, শিক্ষকরা যদি হেরে যান, তবে আমরা ভরসা পাব কার কাছে। রওনক আসর নামাজের আগেই স্কুল থেকে বাসায় ফেরে। আজ বাসায় ঢুকেই দেখে সবকিছু ঝকঝকে-তকতকে, সাজানো-গুছানো, পরিপাটি পরিবেশ। মায়ের সাথে রওনকের খুব ভালো সম্পর্ক। খুনসুটি থেকে শুরু করে হাস্যরস সবই চলে। রত্তনক বলে, আম্মু! "চকচক করলেই সোনা হয় না"। তা বলো, কে আসছেন। মেহমান নিশ্চয়ই।
: হুম! তোর আব্বার ছোটবেলার বন্ধু। চিকিৎসার কাজে ঢাকায় আসছেন। একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, একটু সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখলে কত ভালো লাগে দেখ। তোদের জ্বালায় তো কিছুই পারি না। সেই কবে থেকে বলছি, বড় বাসা নাও। সংসার বড় হয়েছে। একটা আলমিরা করো। তোর আব্বা কেনার কথাই বলে না। রাখার ব্যবস্থা না থাকলে তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবেই। মেহমান আসার কথা শুনলেই শুরু হয়ে যায় আমার গোঁজাগুঁজি।" রওনক বলে, এত হতাশ হচ্ছো কেন, দেখো একদিন সব হবে।
সমস্যা হয়ে যায় রওনকের বাবার।
নামাজের সময় টুপিটা খুঁজে পান না। গোসলের সময় গামছাটা। ধোয়া লুঙ্গিটা বা কোথায়! চেঁচামেচিও করতে পারেন না, ঘরে মেহমান। আড়চোখে ইশারা করলেও গিন্নির সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। তিনি মেহমানদারিতে ব্যস্ত। শওকত সাহেবের খুব রাগ হয়। রাগগুলো ফুলের টবে পুঁতে রেখে ফুলগাছে পানি দিতে থাকেন তিনি।
: বন্ধু! তুমি খুব সৌখিন মানুষ। তুমি আর সেই আগের মতো নেই। ঢাকায় এসে বদলে গেছ। খুব পরিপাটি হয়েছ।
: না, তেমন কিছু না। ফুলগাছগুলোর একটু পরিচর্যা করছি আর কি।
: ভালো মনের মানুষরাই তো ফুল ভালোবাসে। আর ভাবীও তো খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে সংসারটা।
: তুমিও কম কিসে। স্কুলজীবনে তুমি ছিলে বইয়ের পোকা। তোমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিটা এতদিনে হয়তো অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে।
এভাবেই দুই বন্ধুর মধ্যে আলাপচারিতা চলে কিছুক্ষণ।
আজ ক'দিন হলো মেহমান চলে গেছে। ধীরে ধীরে সব আগের অবস্থায় ফিরে আসছে। আবার সেই অগোছালো ভাব। এলোমেলো সব। রওনক চায় সবকিছু গুছিয়ে রাখতে। মাকেও সে এ কাজে সাধ্যমতো সাহায্য করে। কিন্তু বড়ভাইয়া আর ছোট বোন তিন্নীর জন্য পেরে ওঠে না। তিন্নী সবার আদরের। ওর সাতখুন মাফ। বেডরুমের দেয়াল তো তিন্নীর আঁকিবুঝিতে ভরা। দেখলে মনে হবে প্রাচীন কোনো পাহাড়ের গুহার চিত্রকর্ম। তিন্নী সেদিন চা খেতে গিয়ে হাত থেকে ফেলে পিরিচ ভেঙে বসলো। টি-সেটটা কানা হয়ে গেল দেখে মা খুব হতাশ হলেন। তিন্নী তো কেঁদেই একশেষ। রওনক বললো, আম্মু তুমি চিন্তা করো না। আমি সেটটা পূরণ করে দেবো। সেট ভেঙে কি কেউ বিক্রি করবে। তাছাড়া তুমি টাকা পাবে কোথায়।
: আমার টাকা আছে। আমি সঞ্চয় করি না!
রওনক শুধু এতটুকুই বললো। ঠিকই একদিন রওনক বাজার ঘুরে অনুরূপ একটা কাপ-পিরিচ কিনে আনলো। মা তো দেখে অবাক। ভাঙলো পিরিচ, আর পেলাম পিরিচের সাথে কাপও। ভালোই হলো।
: রওনক সোনা। সত্যি করে বল তো, টাকা পেলি কোথায়।
: কেন তোমরা দাওনা, তা থেকে একটু একটু করে বাঁচিয়ে সঞ্চয় করি।
মায়ের মুখে হাসি দেখে রওনকের মনটা আনন্দে ভরে ওঠে।
তিন বছর পর
! ফাল্গুনের শেষে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। আজকের সকালটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। বসন্তের মৃদুমন্দ বাতা বাতাস ছেলে-মেয়েদের রাদে সবাই এসে লে-মেয়েদের চুল ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে। হলুদ বরণ রোদে। ভিড় জমিয়েছে স্কুল আঙ্গিনায়। গত রাতেই এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট ঘোষণা করা হয়েছে। আজ স্কুলের নোটিশ বোর্ডে তা টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়েছে। রওনক ও তার বন্ধুরা সবাই এসেছে।
আনন্দ ও শঙ্কার দোলাচলে সবার উৎসুক্য দৃষ্টি বোর্ডের দিকে। ভিড় ঠেলে এগোনো সামনে যারা রেজাল্ট দেখছে, তাদের কেউ কেউ আনন্দে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। লে ভার করে ফিরছে। রত্তনক রেজাল্ট দেখে আনন্দে ফেটে পড়ে। আল্লাহর শুকরিয়া আম বন্ধুরাও ভালো করেছে। ওরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে নেচে গেয়ে আনন্দ-উল্লাস
রওনক দ্রুত বাসায় ফিরে আসে। প্রথমে মাকে খবরটা দেয়। রওনক গোল্ডেন পেয়েছে। একে একে সবাই আনন্দের খবরটা জানো বড়ভাই ফারুক ছোট ভাইয়ের আনন্দিত। মা ও ভাইয়াদের খুশি দেখে ছোট বোন তিন্নীও আনন্দে নাচতে থাকে।
শওকত সাহেব আজ অপরাহ্নের আগেই বাসায় ফিরলেন। হাতে মিষ্টির প্যাকেট মিষ্টিমুখ করালেন। মিষ্টি প্রতিবেশীর ঘরে ঘরে পাঠানো হলো।
রাতে শতকত মাহেব ও তার স্ত্রী দু'জনকেই খুব চিন্তিত মনে হলো। স্বামী-স্ত্রী শলাপরামর্শ করছেন। খুব সতর্কতার সাথে, যাতে ছেলে-মেয়েদের কানে না যায়।। খেয়াল করলো, আব্বা-আম্মাকে বেশ চিন্তামগ্ন লাগছে। 'খুশির দিনে তাঁরা কেন এভহবে। এমন কি হতে পারে। রওনক ভাবতে থাকে--। "হ্যাঁ চিন্তিত হবারই কথা কৈ বছরই তিন্নীকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। বড় ভাইয়ার ইন্টার এর ফরম ফিলআপ হতে আব্বুকে অনেক টাকা যোগান দিতে হয়েছে। এখন আবার আমার ভালো একটা কলেজে পালা।-চিন্তা না করে কি উপায় আছে!"
রওনক ভাবে, সারপ্রাইজটা দেয়ার এটাই উপযুক্ত সময়। রওনক আব্বু-আম্মুর পানে বসে।
: তোমরা এত কি ভাবছ তোমাদের খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে।
: কিসের চিন্তা সোনা। আজ আমাদের খুশির দিন। তুমি আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছন
বাবা ছেলের কাছ থেকে নিজেকে একটু লুকাতে চাইলেন।
: আব্বু-আম্মু! আজ আমি তোমাদের একটা সারপ্রাইজ দিব। তোমাদের তো বলা আমি ক্লাস এইটে থাকতে স্কুল ব্যাংকিং প্রকল্পে সঞ্চয় হিসাব খুলেছিলাম। গত তিন লাভসহ প্রায় ৩৫ হাজার টাকার মতো জমেছে। এছাড়া আমার জুনিয়র বৃত্তির টাকার একটা এ হিসাবে যোগ হবে। আমার কলেজে ভর্তির জন্য যে খরচটা লাগবে তা আমি এ থেকে চা নিতে পারবো। তোমাদের কোনো চাপ নিতে হবে না।
-মা বলেন, এসব কথা আগে বলিসনি কেন বাবা। আমার ছেলে যে এত বুদ্ধিমানন্দ আমাদের জানতে হবে না।'
-মা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেয়। ওদিকে বাবা'র দু'চোখের কেন ভি ওঠে। তিনি টিসু পেপার নিয়ে চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করেন।
বাবা তুমি কাঁদছ!
: না বাবা এ কান্না নয়।
মানুষ মানুষের জন্য
য খন প্রথম করোনা আপদ দেখা দেয়, সে সময়ের কথা। মাসখানেকের মধ্যেই রাজধানী ঢাকা শহর ফাঁকা হয়ে গেল। দিনের বেলায়ও ঢাকা শহর ভুতুড়ে নগরী। দু-একটি রিকশার টুং টাং শব্দে নীরবতা ভাঙতো কেবল।
প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর আসতে লাগলো। স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেল। সবাই লকডাউনে। কোয়ারেন্টিনে। আমাকে বের হতেই হতো। খবরের কাগজে চাকরি। নিউজ ডেস্কের ছুটি নেই। রীতিমতো পিপিই পরে অফিসে যাতায়াত করি। একদিন এক রিকশাওয়ালা অফিসে নামিয়ে দিয়ে বলল, স্যার কয়েকটা টাকা বেশি দিবেন। প্যাসেঞ্জার নেই। আয়-রোজগার কম, সংসার আর চলে না। ঠিকই তো। সেদিনই বুঝলাম পরিস্থিতি ভয়াবহের দিকে যাচ্ছে। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। মানুষের কাজ নেই, ক্ষুদ্র ব্যবসা সব বন্ধ। মানুষ কী খাবে, কীভাবে চলবে।
সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরছি। দেখলাম মহল্লার রাস্তার পাশে 'লালচান' দাঁড়িয়ে আছে। হ্যাঁ লালচান। উনি জুতো সেলাই করেন- মুচি। আমাকে দেখে সালাম ঠুকলো। কী ব্যাপার লালচান। এখানে যে; দোকান বন্ধ বুঝি। লালচান ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু বলতে পারছে না। আমার বুঝতে বাকি থাকলো না। পকেট থেকে একশ' টাকা বের করে হাতে দিলাম। লালচানের ঠোঁটের রেখায় হরিষে-বিষাদ ধরনের একটি হাসি খেলে গেল।
বাসায় ঢুকতেই সবাই আমাকে ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে দিলো। গিন্নি দূরে দূরে। ছেলে-মেয়েরা রুম থেকে বের হচ্ছে না। কী আশ্চর্য! আপনজনও পর হয়ে যাচ্ছে। ওদিকে আবার মসজিদে যেতেও মানা। আমার রোজ হাশরের কথা মনে হলো। সেদিন কেউ কারো থাকবে না। সবাই নিজেকে বাঁচাতে ব্যাকুল হয়ে পড়বে। আল্লাহ কী আমাদের সেই নিশানাই দেখাচ্ছেন।
: তুমি তো কোনো বাজার-ঘাট করলে না। পাশের বাড়ির ভাবীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র বেশি বেশি করে কিনে রাখছে। সংকট নাকি হতে পারে।
: মজুদদারির কথা বলছ। আমি তা করবো না। সাধারণ মানুষের যা হবে আমাদেরও তাই হবে। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।
আমার ছোট মেয়ে তিন্নি বললো, আব্বু। করোনা তো আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ না করে আমরা করোনাকে ভয় পাচ্ছি কেন? আমি মেয়ের কথায় সায় দিলাম। মনে মনে ভাবলাম এতটুকু একটা মেয়ের ঈমানের কাছে আমরা পানসে হয়ে যাচ্ছি।
রাতে আর ভালো ঘুম হলো না। শুধুই ভাবছি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য কী করা যায়। কিছু একটা করতে হবে। সকালে স্থানীয় ক্লাবের সদস্য হিসেবে সভাপতিকে ফোন দিলাম। এ বিষয়ে মতবিনিময় করলাম। তিনি একমত হলেন। শিগগির একটা উদ্যোগ নিবেন বলে জানালেন।
দেখতে দেখতে রোজার ঈদ এসে পড়লো। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ড্রয়িং রুমে সন্তাদের আনাগোনা। গিন্নিকে জিজ্ঞেস করলাম, ওদিকে কী হচ্ছে।
: গিয়েই দেখে এসো।
রুমের দরজায় দাঁড়াতেই চোখ ছানাবড়া! আমার দুই ছেলে-মেয়ে তামিম ও তিন্নি। সাথে ওদের বন্ধুরা। ওদের অনেকেই আমার চেনা। সবার মুখে মাস্ক, চোখে চশমা। কেউ আবার পিপিই পরেছে। সবাই বসেছে দূরে দূরে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে। বললাম, এসব কী হচ্ছে। তামিম বললো, আব্বু! আমরা বন্ধুরা একটু বসেছি। সামনে ঈদ আসছে। আমরা গরিব দুস্থ শিশুদের জন্য কিছু একটা করতে চাই। করোনার জন্য তো সবার অবস্থাই খারাপ।
: আমিও তোমাদের সাথে থাকতে চাই: আমাকে নিবে?
: অবশ্যই নিব। তোমার পরামর্শ আমাদের খুব প্রয়োজন।
সেদিন আমার বিশ্বাস আরো বেড়ে গেল; এই আপদ বেশি দিন থাকবে না। এই পরীক্ষার একদিন শেষ হবে। যখন মানুষ মানুষের জন্য এগিয়ে আসে তখন আল্লাহর রহমত নেমে আসে।
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু: বিশ্বাসী মনন ও বৈপ্লবিক চেতনার নান্দনিক ইশতেহার
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
কবি হাসান আলীমের ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’ কেবল সমকালীন অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এক শাণিত প্রতিবাদ নয়; এটি বাংলা কবিতার ঐতিহ্যগত দ্রোহ এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের ধারার এক দীপ্ত, আধুনিক এবং আপসহীন উত্তরসূরি। মহাকবি কায়কোবাদ, কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ এবং কবি মতিউর রহমান মল্লিকের বিশ্বাস ও নান্দনিকতার যে ধারা—হাসান আলীম সেই ধারারই এক আধুনিক রূপকার।
নিচে কবিতাটির একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো:
১.
ইসলামী অলৌকিকতা ও মোজেজার বৈপ্লবিক রূপান্তর
এই কবিতার একটি বড় শক্তি হলো, কবি ইসলামের সোনালী ইতিহাস ও অলৌকিক মোজেজাকে সরাসরি শোষকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আত্মিক হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তর করেছেন:
>চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার রূপক:
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আঙুলের ইশারায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার অলৌকিক ঘটনাকে কবি স্রেফ একটি ঐতিহাসিক বিশ্বাস হিসেবে রেখে দেননি। তিনি একে শোষকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করার সৎসাহস হিসেবে দেখিয়েছেন:
>"চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনাকে যারা বিশ্বাস করেছে— / কেবল তারাই দগদগে রাজপথ থেকে বিপরীত উচ্চারণ করতে পারে..."
>মুসার লাঠি ও নুহের কবুতর: ‘গৃহের অধিবাসীরা যখন’ অংশে কবি অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শান্তির আবহ তৈরিতে দুটি চিরন্তন মিথ ব্যবহার করেছেন। একদিকে জালিমের দম্ভ গ্রাস করতে তাঁর হাত হয়ে ওঠে মুসার লাঠি, অন্যদিকে বিপ্লবোত্তর পৃথিবীতে শান্তি ছড়াতে তিনি বেছে নেন নুহের প্লাবন-পরবর্তী শান্তির প্রতীক কবুতরকে:
>"আমার সাহসী হাত দুটো তখন মূসার কুদরতী লাঠির মত গিলে ফেললো সবকিছু। / শান্তির আয়াত ঠোঁটে করে নূহের কবুতরের মত সমস্ত পৃথিবী ঘুরে আমার সন্তানদের সাথে গোল হয়ে বসে পড়লাম।"
>
২. পুঁজিবাদের অবসান ও বৈশ্বিক আধিপত্যবাদ-বিরোধী চেতনা
এই কবিতা কেবল স্থানীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং তা বৈশ্বিক পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও বস্তুবাদের বিরুদ্ধে এক বজ্রকণ্ঠ। কবি শোষকদের জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ ও পুঁজিপতিদের ইতিহাসখ্যাত খলনায়কদের সাথে তুলনা করে তা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ডাক দিয়েছেন:
>"এইসব বস্তুবাদী সভ্যতা ভেঙে ফ্যালো বণ্টন করে দাও কারুনের ধন চুরমার করে ফ্যালো সাদ্দাতের বেহেস্ত।"
>
এখানে ‘কারুনের ধন’ এবং ‘সাদ্দাতের বেহেস্ত’ ভেঙে ফেলার আহ্বান মূলত আধুনিক করপোরেট শোষণ ও ভোগবাদী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইশতেহার। কবি স্পষ্ট করেছেন যে, মার্ক্সবাদ বা অন্য কোনো মানবঘটিত বস্তুবাদী মতাদর্শ নয়, বরং ইসলামের বিপ্লবী কাঠামোর মাধ্যমেই কেবল এই বৈশ্বিক জালিমের শাসনব্যবস্থাকে ভাঙা সম্ভব।
৩. প্রেম, কাম ও দ্রোহের নান্দনিক রূপান্তর
হাসান আলীমের কবিতার অন্যতম অভিনব ও সাহসী দিক হলো প্রেম এবং কামের অনুষঙ্গকে বৈপ্লবিক ও আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত করা। তিনি দৈহিক মিলন বা শরীরী প্রেমকে কেবল জৈবিক আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; একে দেখিয়েছেন বৈপ্লবিক শক্তির জন্মদাত্রী হিসেবে। ‘একটি শিশুর আগ্নেয় প্রসব’ কবিতায় কবি শরীরকে উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান এক বৃহত্তর সৃষ্টির উদ্দেশ্যে:
>"তোমার সোনার শরীর তামাম খুলে ফ্যালো পাথরের বুকে থেকে যেভাবে পাহাড়ী ঝর্ণারা নির্দ্বিধায় উলঙ্গ হয়ে যায়..."
>
এই দৈহিক উষ্ণতা ও মিলনের তীব্রতা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত সুখে আটকে থাকে না, তা রূপান্তরিত হয় ‘জালিমের সর্বনাশ’ করার এক যৌথ মরণাস্ত্র বা প্রলয়ংকারী ঝড়ে:
>"হে বন্ধু, আমাকে তুমি আলিঙ্গন কর, আমার শরীরে এনে দাও আগ্নেয় প্রপাত / আমার ঔরস থেকে বের হোক জালিমের সর্বনাশ পৃথিবী জুড়ে শুরু হোক প্রচণ্ড ঝড়।"
> এখানে ‘ঘনিষ্ঠ শরীরের খণ্ডিত সুখ’ কবির বুকের ভেতর জন্ম দেয় ‘রক্তাক্ত শিশুর বলিষ্ঠ প্রতিবাদ’। কাম ও দ্রোহের এই নান্দনিক মেলবন্ধন বাংলা কবিতায় অত্যন্ত বিরল ও শক্তিশালী।
৪. দেশজ প্রকৃতি ও মৃত্তিকাসংলগ্নতা: মাটির কেলাস থেকে সবুজ জায়নামাজ
হাসান আলীমের প্রকৃতিচেতনা কেবল নিসর্গশোভা নয়; তা কবির আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক ভাবনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একদিকে পদ্মা-মেঘনার উত্তাল স্রোত যেমন জলচর হিংস্র হায়েনার থাবা থেকে মুক্ত হতে চায়, অন্যদিকে বাংলার মাটিকে কবি রূপান্তর করেন ইবাদতের অনুষঙ্গে। ‘মাটির কেলাস থেকে’ কবিতায় শ্রম, ঘাম এবং মাটিকে একাকার করে কবি লিখেন:
>"যতক্ষণ পারো এই লবণাক্ত অঙ্গের ভেতর তোমার সমস্ত শ্রম রুয়ে দাও, / মাটির কেলাস থেকে বেড়ে যাক সবুজ জায়নামাজ।"
> এখানে ‘সবুজ জায়নামাজ’ হলো বাংলার শাশ্বত সবুজ প্রকৃতি এবং ঐশ্বরিক বিশ্বাসের এক অভূতপূর্ব নান্দনিক মেলবন্ধন। শ্রম যেখানে প্রার্থনায় রূপ নেয়।
>
৫. সমকালীন শহীদী স্মৃতি ও ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের মেলবন্ধন
কবিতায় ত্যাগের মহিমাকে তুলে ধরতে কবি সমকালীন বেদনা এবং ইসলামের সোনালী ইতিহাসের এক চমৎকার কোলাজ তৈরি করেছেন:
হানযালা (রা.)-এর প্রেম: ওহুদের যুদ্ধে বাসর ঘর ছেড়ে জিহাদের ময়দানে ছুটে যাওয়া এবং ফেরেশতাদের দ্বারা গোসলপ্রাপ্ত সাহাবী হযরত হানযালা (রা.)-এর ঘটনাকে কবি আধুনিক বিপ্লবীদের প্রেরণার উৎস হিসেবে দেখিয়েছেন:
> "যারা সিংহ পুরুষ, মৃত্যুর ভয় করে না তাদের হৃদয়ে বেহেস্তেরই কলকল শব্দ হানযালা-প্রেম শেখায়..."
> শাব্বিরের (ইমাম হোসেন) কলিজা:কারবালার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি কবিকে কতটা আলোড়িত করে, তা প্রকাশ পায় যখন নিজের অসাবধানতাবশত দরজায় আঙুল চেপে যাওয়ার যন্ত্রণাকে তিনি ইমাম হোসেন (রা.)-এর আত্মত্যাগের সাথে তুলনা করেন:
> "কি আর করব হৃদয়ে ব্যথায় ভরে যায়, দরোজা বন্ধ করার সময় কখনও আঙুলে চাপ লাগলে আঁতকে উঠি—আহা! সাবলীল ছুরি, তুই কিভাবে শাব্বিরের কলিজা পর্যন্ত ঢুকে গেলি!"
৬. প্রতীকের নতুন বিন্যাস ও সংযোজন
পিতা: কেবল জন্মদাতা নন, প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্যের সমাজ বিনির্মাণের এক ‘আদর্শিক প্রকৌশলী’।
হীরামন পাখি / আলোর পাখি: মানুষের ভেতরের খাঁটি বিবেক, পবিত্র আত্মা এবং সত্যের দিশারীর প্রতীক।
আঁধার গাঁ / লুত নগরী: সমকালীন নৈতিক স্খলন, পতন, বেশ্যালয় সংস্কৃতি এবং শোষণে জর্জরিত আধুনিক পতনোন্মুখ সমাজ।
রাইফেল ও বাউলের কণ্ঠ:আধুনিক মারণাস্ত্রের শক্তির সাথে দেশজ মরমী বাউল সুরের (লালনের খাঁচার অচিন পাখি) এক অভূতপূর্ব যুগলবন্দী, যা প্রমাণ করে কবির লড়াইটি কেবল বলপ্রয়োগের নয়, এটি মূলত গভীর সাংস্কৃতিক ও আত্মিক রূপান্তরের লড়াই।
উপসংহার
কবি হাসান আলীমের ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’ কেবল একটি দীর্ঘ কবিতাই নয়, এটি বিশ্বাসকে কবিতার প্রধান শক্তি বানিয়ে দেশজ প্রকৃতির উপাদানে রূপায়িত করা এক অবিনাশী শৈল্পিক ইশতেহার। তাঁর ‘অগ্নিশিশু’রাই মূলত কবির কাঙ্ক্ষিত আগামীর এক মুক্ত, ইনসাফভিত্তিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে বলীয়ান পৃথিবীর আসল দিশারী।
রূহের সফর
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
**ভূমিকা:**
মানুষের আত্মার যাত্রা এক মহাসড়কের মতো বিস্তৃত, যার কোনো বিরাম নেই। এই নিরন্তর ছুটে চলার পথটি শুরু হয় ‘আলম-ই-আরওয়াহ’ বা রুহের জগত থেকে। এরপর সেই আত্মা ক্রমান্বয়ে অবস্থান নেয় মাতৃগর্ভের নিভৃত আঁধারে, সেখান থেকে পাড়ি জমায় এই দৃশ্যমান পার্থিব জীবনে (দুনিয়ায়)। দুনিয়ার পাঠ চুকিয়ে তাকে প্রবেশ করতে হয় ‘আলম-ই-বারজাখ’ বা কবর নামক অন্তর্বর্তীকালীন জগতে। এরপর কিয়ামত ও পুনরুত্থানের মহালগ্ন পেরিয়ে, হাশরের ময়দানে বিচার দিবসের মুখোমুখি হয়ে অবশেষে আত্মা প্রবেশ করবে তার চূড়ান্ত ও অনন্ত আবাসে—জান্নাত অথবা জাহান্নামে। এই অন্তহীন অভিযাত্রায় আত্মাকে যে বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় ধাপ অতিক্রম করতে হয়, তা অত্যন্ত বিস্ময়কর ও চমৎকার। এর একেকটি ধাপ যেন একেকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগত।
এই যাত্রার সবচেয়ে বড় রহস্য হলো, আত্মা যখন যে জগতে অবস্থান করে, তখন সে তার পরবর্তী জগত সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা করতে পারে না। যেমন—মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় কোনো মানব শিশু কল্পনাই করতে পারে না যে বাইরে এক সুবিশাল দুনিয়া রয়েছে। যদি তাকে বলা হতো যে তার সামনে সূর্য, চাঁদ, সমুদ্র, পাহাড় ও নক্ষত্রভরা এক বিশাল জগৎ অপেক্ষা করছে, তবে তার সীমিত অভিজ্ঞতা দিয়ে সে তা কখনোই উপলব্ধি করতে পারত না।
ঠিক তেমনি, দুনিয়ার মানুষও তার চেনা পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে মৃত্যুর পরের জীবন কিংবা পরজগতের বাস্তবতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে না; অথচ প্রতিটি জগতই পরম বাস্তব। এক জগত থেকে আরেক জগতে প্রবেশ করতে মানুষকে বা আত্মাকে তার দেহ বা অবয়ব পরিবর্তন করতে হয়, যা অনেকটা পোশাক পরিবর্তন করার মতো।
**উপযোগিতার সার্বজনীন নিয়ম ও পার্থিব দেহ**
মানুষের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি আজ তাকে পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে মহাকাশের অসীমতায় নিয়ে গেছে। মানুষ চাঁদে পা রেখেছে, মহাকাশ স্টেশনে দীর্ঘদিন অবস্থান করছে। কিন্তু এই মহাজাগতিক যাত্রার একটি পরম সত্য হলো—পৃথিবীর বাইরে কোথাও মানুষ তার বর্তমান স্বাভাবিক দেহ নিয়ে এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে পারে না। চাঁদে যেতে হলে নভোচারীদের বিশেষ স্পেসস্যুট বা পোশাক পরতে হয়। কারণ, মানুষের বর্তমান শরীর কেবল পৃথিবীর পরিবেশ ও বায়ুমণ্ডলের জন্য উপযোগী করে তৈরি। চাঁদ তো আসলে পৃথিবীরই একটি উপগ্রহ এবং আমাদের অতি নিকটবর্তী একটি মহাজাগতিক স্থান; তাতেই যদি মানুষের পার্থিব দেহ অচল হয়ে পড়ে, তবে সৃষ্টির অনন্য রহস্য জান্নাত কিংবা স্রষ্টার সান্নিধ্যে যাওয়ার জন্য এই ভঙ্গুর ও সীমাবদ্ধ দেহ নিয়ে পাড়ি দেওয়া কীভাবে সম্ভব? স্পেসস্যুট কেবল একটি উপমা; পরকালের জন্য দরকার সম্পূর্ণ নতুন অস্তিত্বগত কাঠামো।
পৃথিবীর জীবজগতের দিকে তাকালেও আমরা উপযোগিতার এই সার্বজনীন নিয়ম দেখতে পাই। মাছ পানিতে বেঁচে থাকে, কিন্তু স্থলে নয়। পাখি আকাশে উড়তে পারে, কিন্তু পানির গভীরে শ্বাস নিতে পারে না। মরুভূমির প্রাণী ও মেরু অঞ্চলের প্রাণীর দেহকাঠামোর মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। অর্থাৎ, প্রকৃতির নিয়মই হলো—প্রতিটি পরিবেশ তার উপযোগী সুনির্দিষ্ট অস্তিত্ব ও অবয়ব দাবি করে। পৃথিবী থেকে মাত্র কয়েক লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাঁদে মানুষের শরীরকে টিকিয়ে রাখতে যে স্পেসস্যুটের প্রয়োজন হয়, তা মূলত পৃথিবীর পরিবেশেরই একটি কৃত্রিম ক্ষুদ্র সংস্করণ, যা নভোচারী তার শরীরের চারপাশে বহন করেন।
**অনন্তের যাত্রা: পোশাক নাকি মৌলিক রূপান্তর?**
এখন প্রশ্ন আসে, মানুষ যখন এমন কোনো জগতে প্রবেশ করে যার প্রকৃতি বর্তমান মহাবিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যেখানে সময়, স্থান ও পদার্থের নিয়ম আমাদের চেনা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র মানে না; সেখানে কি শুধু একটি কৃত্রিম পোশাক যথেষ্ট হবে? অবশ্যই না। সেখানে প্রয়োজন হবে অস্তিত্বের এক আমূল এবং মৌলিক রূপান্তর।
এখানেই মৃত্যুকে দেখার একটি নতুন ও ইতিবাচক দিগন্ত উন্মোচিত হয়। আমরা সাধারণত মৃত্যুকে জীবনের নির্মম সমাপ্তি বা এক অন্ধকার অবসান হিসেবে দেখি। কিন্তু প্রকৃতির গভীর নিয়মের দিকে তাকালে দেখা যায়, সমাপ্তি বলে যা মনে হয়, তা আসলে এক নতুন ও বৃহত্তর রূপান্তরের সূচনা মাত্র। একটি বীজ মাটির নিচে পচে গিয়ে বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু সেখান থেকেই জন্ম নেয় এক বিশাল মহীরুহ। একটি শুঁয়োপোকা কোকুনের বা গুটির ভেতরে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে গুটিয়ে নেয়, যা দেখে মনে হতে পারে তার জীবন শেষ; কিন্তু কিছুদিন পর সেখান থেকেই ডানা মেলে এক বর্ণিল প্রজাপতি। প্রকৃতির এই রূপান্তরই প্রমাণ করে যে, রূপ বা অবয়বের পরিবর্তন মানেই বিনাশ নয়।
**ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি: পরকালের প্রস্তুতি ও নতুন দেহ**
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, মৃত্যু কোনো বিনাশ নয়, বরং এটি এক জগত থেকে অন্য জগতে স্থানান্তরের একটি তোরণদ্বার। ইসলাম আমাদের স্পষ্ট করে জানায়, পৃথিবীর এই নশ্বর, ক্ষয়িষ্ণু এবং সীমাবদ্ধ দেহ নিয়ে পরকালের জীবনে পাড়ি দেওয়া অসম্ভব। সে কারণে পার্থিব দেহকেই এ দুনিয়ায় ছেড়ে দিয়ে আত্মাকে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হয় এবং আলমে বারজাখসহ অন্যান্য ধাপগুলো অতিক্রম করতে হয়।
পরকাল হলো চিরস্থায়ী—সেখানে জান্নাতের নিয়ামত যেমন সীমাহীন, তেমনি জাহান্নামের শাস্তিও তীব্র। বর্তমান মানবদেহ সামান্য আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, সামান্য অসুখ বা আঘাতে অচল পড়ে। এই ভঙ্গুর শরীর নিয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকা পরকালের জগতের নিয়মের পরিপন্থী। তাই মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে, মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের দিনে তিনি মানুষকে এক নতুন সৃষ্টিতে পরিণত করবেন এবং এক নতুন দেহ দান করবেন, যা হবে পরকালের নতুন জগতের উপযোগী। সূরা আল-ওয়াকিয়াহ-তে আল্লাহ বলেন:
> *"আমি তোমাদের স্থানে তোমাদের মতো অন্য লোক নিয়ে আসতে পারি এবং তোমাদের এমন এক রূপে সৃষ্টি করতে পারি যা তোমরা জানো না।" (সূরা ওয়াকিয়াহ: ৬১)*
>
হাদিসের বর্ণনা থেকেও জানা যায়, জান্নাতিদের শরীর হবে রোগ-শোকহীন, বার্ধক্যহীন, নিখুঁত এবং চিরযৌবনা। সেখানে ক্ষুধা-পিপাসা বা মলমূত্র ত্যাগের মতো পার্থিব শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকবে না। অর্থাৎ, চাঁদে যাওয়ার জন্য যেমন বিশেষ পোশাকের (স্পেসস্যুট) প্রয়োজন, ঠিক তেমনি পরকালের অতিপ্রাকৃতিক জগতে টিকে থাকার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ 'নতুন দেহ' অপরিহার্য।
**বিজ্ঞান ও দর্শনের সীমারেখা**
বাস্তবতা হলো, বিজ্ঞান মূলত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষাগারের প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল। যা কিছু পঞ্চেন্দ্রিয় ও যন্ত্রের সীমানার বাইরে, সে বিষয়ে বিজ্ঞান নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। তাই পরকাল বা আত্মার এই অদৃশ্য যাত্রা সম্পর্কে বিজ্ঞানের এই নীরবতা কোনোভাবেই তার'অসত্যতা'র প্রমাণ নয়; বরং এটি কেবল বিজ্ঞানের পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার পরিচয় দেয়। বিজ্ঞান বলে কীভাবে, দর্শন প্রশ্ন করে কেন; আর ওহি জানায় কোন উদ্দেশ্যে।
যেখানে বিজ্ঞানের সীমানা শেষ, সেখান থেকেই দর্শনের গভীর যাত্রা শুরু। দর্শন প্রশ্ন করে—মানুষের এই বিপুল মেধা, চেতনা ও ন্যায়বিচারের আকঙ্ক্ষার শেষ পরিণতি কী? পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ আজীবন অন্যায়ের শিকার হয়েও বিচার পায় না, আবার বহু অপরাধী বুক ফুলিয়ে পার পেয়ে যায়। যদি মৃত্যুর মাধ্যমেই সব শেষ হয়ে যেত, তবে এই মহাবিশ্ব হতো চরমতম অবিচারের এক রঙ্গমঞ্চ। কিন্তু পরকালের ধারণা ও ঐশ্বরিক আদালত সেই অতৃপ্ত প্রশ্নের এক যৌক্তিক সমাধান দেয়। পরকাল আমাদের শেখায়, পার্থিব জীবন হলো একটি পরীক্ষাক্ষেত্র, আর মৃত্যু হলো সেই পরীক্ষার খাতা জমা দিয়ে ফলাফল ও নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মহালগ্ন। "বিজ্ঞান বলে কীভাবে, দর্শন প্রশ্ন করে কেন; আর ওহি জানায় কোন উদ্দেশ্যে।"
**উপসংহার**
চাঁদে যাওয়ার আগে মানুষ যেমন দীর্ঘ প্রস্তুতি নেয় এবং স্পেসস্যুট পরিধান করে, ঠিক তেমনি অনন্তকালের অন্তহীন যাত্রার আগেও মানুষের এক মহান প্রস্তুতির প্রয়োজন। পার্থিব জীবনে নেক আমল, নৈতিকতা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে মানুষ মূলত পরকালের সেই দীর্ঘ যাত্রার পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মৃত্যু হলো সেই মহান রূপান্তরকামী প্রক্রিয়া, যা মানুষের আত্মাকে তার জীর্ণ, সীমাবদ্ধ ও নশ্বর খোলস থেকে মুক্ত করে এক চিরন্তন, অবিনশ্বর এবং জ্যোতির্ময় অস্তিত্বের দিকে নিয়ে যায়। অতএব, মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; "মৃত্যু হলো এক নশ্বর জগত থেকে মহিমান্বিত অন্য জগতে প্রবেশের এক অনিবার্য, যৌক্তিক ও সুন্দর তোরণদ্বার।"
মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
হেরা গুহায় নূরের জ্যোতি:
চারিদিকে নিশ্ছিদ্র, জমাট বাঁধা অন্ধকার। মক্কার আকাশচুম্বী পাহাড়গুলো যেন এক একটি মৌন প্রহরী, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরবের বুকে বয়ে যাওয়া অবক্ষয়, হাহাকার আর পঙ্কিলতার নীরব সাক্ষী। মানবতা সেখানে ডুকরে কাঁদছিল। যে পবিত্র কাবা গৃহ নির্মিত হয়েছিল এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য, তা তখন অবদমিত ছিল তিনশো ষাটটি জড় প্রতিমার পাথুরে শৃঙ্খলে। গোত্রে গোত্রে সামান্য কারণে বছরের পর বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার নিষ্ঠুরতা, আর নৈতিকতার চরম দেউলিয়াত্ব—সব মিলিয়ে আরব ভূখণ্ড যেন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা ছিল এক বিস্মৃত, গাফেল জাতি, যাদের পূর্বপুরুষদের কাছে দীর্ঘকাল কোনো ঐশী আলোর দিশারী আসেনি, কোনো সতর্ককারী তার হাত বাড়িয়ে দেয়নি।
কিন্তু এই ঘোর অমাবস্যার বুকেই নিভৃতে তৈরি হচ্ছিল এক মহাজাগতিক ভোরের পটভূমি। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং মহাবিশ্বের মহান স্রষ্টার সেই চিরন্তন নিয়মেরই ধারাবাহিকতা, যা তিনি যুগে যুগে মূসার কিতাব কিংবা ঈসার বাণীর মাধ্যমে মানবজাতিকে উপহার দিয়েছিলেন।
মক্কার এই চরম কোলাহল, মূর্তিপূজার উৎসব আর নৈতিক পচনের আবহ যাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারেনি, তিনি হলেন আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ (সা)। তাঁর বয়স যখন চল্লিশের কোঠায় পৌঁছাল, তখন এক অদ্ভুত, স্বর্গীয় নির্জনতাপ্রিয়তা ভর করল তাঁর অন্তরে। শহরের জৌলুস আর কোলাহল থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে তিনি আশ্রয় খুঁজলেন জাবালে নূরের চূড়ায় অবস্থিত অন্ধকার, সংকীর্ণ **হেরা গুহায়**। সামান্য কিছু ছাতু আর পানি সম্বল করে তিনি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত সেই পাথুরে গুহায় কাটিয়ে দিতেন। তাঁর দুই চোখ চেয়ে থাকত মহাশূন্যের নক্ষত্ররাজির দিকে, আর অন্তর ব্যাকুল হয়ে খুঁজত মহাবিশ্বের সেই পরম সত্যকে, যিনি এই সৃষ্টিজগতের একমাত্র নিয়ন্তা।
সেদিন ছিল রমজান মাসের এক শান্ত, মহিমান্বিত রাত। পুরো পৃথিবী তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। হেরা গুহার ভেতরে ধ্যানে মগ্ন মুহাম্মাদ (সা)। হঠাৎ পুরো গুহা এক অপার্থিব, স্বর্গীয় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বাতাসে স্পন্দন জাগিয়ে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন এক অতিপ্রাকৃতিক, জ্যোতির্ময় সত্তা—আল্লাহর প্রধান ফেরেশতা হযরত জিব্রাইল (আ)।
ফেরেশতা গম্ভীর, বজ্রকঠিন অথচ সুমধুর কণ্ঠে আদেশ করলেন: **"ইকরা! (পড়ুন!)"**
মুহাম্মাদ (সা) এই অতর্কিত ও অলৌকিক উপস্থিতিতে শিউরে উঠলেন। ভয় আর বিস্ময়ে কাঁপতে কাঁপতে তিনি উত্তর দিলেন: "আমি তো পড়া জানি না।"
তখন সেই জ্যোতির্ময় সত্তা এগিয়ে এসে মুহাম্মাদ (সা)-কে সজোরে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সেই আলিঙ্গনের চাপ এতটাই তীব্র ছিল যে, মনে হচ্ছিল তাঁর প্রাণবায়ু বুঝি ওষ্ঠাগত হবে। ফেরেশতা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে দ্বিতীয়বার বললেন: "পড়ুন!"
নবীজী আবারও একই উত্তর দিলেন, "আমি তো পড়া জানি না।"
জিব্রাইল (আ) দ্বিতীয়বার এবং অতঃপর তৃতীয়বার তাঁকে বুকে চেপে ধরে ছেড়ে দিলেন। এবার আর কোনো মানবিক ভয় রইল না, জিব্রাইলের সেই আধ্যাত্মিক স্পর্শে মুহাম্মাদ (সা)-এর অবচেতন মন খুলে গেল। ফেরেশতা তখন আবৃত্তি করলেন সেই অমর বাণী, যা শোনার জন্য আসমান-জমিন যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করছিল:
> *"পড়ো তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়ো, আর তোমার রব মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে এমন বিষয় যা সে জানত না।"*
>
ঐশী বাণীর গুরুভারে হেরা গুহা তখন কাঁপছে। জিব্রাইল (আ) অদৃশ্য হয়ে গেলেন, কিন্তু সেই পাঁচটি আয়াত চিরতরে খোদাই হয়ে গেল মুহাম্মাদ (সা)-এর পবিত্র অন্তরে।
নবুয়তের এই প্রচণ্ড ভার এবং প্রথম অভিজ্ঞতার ধাক্কায় নবীজীর শরীর তখন কাঁপছিল। তিনি পাহাড় থেকে নেমে সোজা নিজের বাড়ির দিকে ছুটলেন। তাঁর হৃদপিণ্ড তখন দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে, কপাল বেয়ে ঝরছে ঘাম। ঘরে ঢুকেই মহিয়সী স্ত্রী খাদীজার বুকে যেন শান্তি খুঁজে পেলেন। কম্পিত কণ্ঠে তিনি কেবল বলতে পারলেন: **"আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও! আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও!"**
হযরত খাদীজা (রা) কোনো প্রশ্ন না করে পরম মমতায় স্বামীকে চাদর দিয়ে জড়িয়ে দিলেন। দীর্ঘক্ষণ পর যখন নবীজীর শরীরের কাঁপন থামল এবং মনের ভীতি দূর হলো, তখন তিনি হেরা গুহার সেই রোমহর্ষক ঘটনা বিস্তারিত খুলে বললেন। নিজের জীবনের আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, "খাদীজা, আমার নিজের জীবনের ওপর বড্ড ভয় হচ্ছে।"
আরবের সেই দুঃসময়ে হযরত খাদীজা (রা) যে জবাব দিয়েছিলেন, তা কোনো সাধারণ নারীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় ও প্রত্যয়ী কণ্ঠে বললেন:
> *"আল্লাহর কসম! কখনো নয়; আল্লাহ আপনাকে কখনো লজ্জিত বা অপদস্থ করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখেন, অসহায়-দরিদ্রদের সাহায্য করেন, নিঃস্ব মানুষের দায়িত্ব বহন করেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করেন এবং প্রকৃত সত্য ও হকের বিপদে মানুষকে সাহায্য করে থাকেন।"*
>
খাদীজার এই আশ্বাসবাণী নবীজীর অন্তরে এক প্রশান্তির হাওয়া এনে দিল। কিন্তু খাদীজা কেবল মুখে সান্ত্বনা দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না। এই অলৌকিক ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য তিনি নবীজীকে নিয়ে গেলেন তাঁর বৃদ্ধ চাচাতো ভাই **ওরাকা বিন নওফেল**-এর কাছে। ওরাকা ছিলেন প্রাচীন কিতাবসমূহের এক অগাধ পণ্ডিত, যিনি তৎকালীন মূর্তিপূজা ত্যাগ করে একত্ববাদের সন্ধান করছিলেন।
অন্ধ, জরাজীর্ণ ওরাকার সামনে যখন রসূলুল্লাহ (সা) হেরা গুহার পুরো ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করলেন, তখন সেই বৃদ্ধ পণ্ডিতের শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। তিনি তাঁর লাঠিতে ভর দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন এবং আবেগঘন কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন:
> *"ইনি তো সেই পরম বিশ্বস্ত রাজদূত (নামূস), যাঁকে আল্লাহ তায়ালা ইতিপূর্বে মূসা (আ)-এর কাছে পাঠিয়েছিলেন! আপনিই এই যুগের শেষ নবী!"*
>
ওরাকা সেখানেই থেমে গেলেন না। তিনি নবীজীর দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, *"হায়! আফসোস! আপনার দাওয়াতের যুগে যদি আমি যুবক থাকতাম! আফসোস, আপনার জাতি যখন আপনাকে এই মক্কা নগরী থেকে বের করে দেবে, তখন যদি আমি জীবিত থাকতাম!"*
শান্ত, পরোপকারী মুহাম্মাদ (সা) জীবনে কখনো কারও ক্ষতি করেননি, মক্কাবাসী তাঁকে ‘আল-আমীন’ বা বিশ্বাসী বলে জানত। তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, *"তারা কি সত্যিই আমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে?"*
ওরাকা অত্যন্ত গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন, *"হ্যাঁ, ইতিহাসে এমন কোনো মানুষ আসেনি যিনি আপনার মতো এই সত্যের বাণী নিয়ে এসেছেন, আর তাঁর আপন জাতি তাঁর চরম শত্রু বনে যায়নি। আপনার সেই কঠিন দিনে আমি যদি বেঁচে থাকি, তবে আপনাকে সর্বাত্মক সাহায্য করব।"*
ওরাকার এই ভবিষ্যদ্বাণী আরবের আসন্ন এক মহাবিপ্লবের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। এর কিছুদিন পরই ওরাকা ইন্তেকাল করেন এবং মহান আল্লাহর এক বিশেষ হেকমতের কারণে বেশ কিছুদিনের জন্য অহী অবতরণ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। এই নীরবতার সময়টুকুতে নবীজী নিজেকে মানসিকভাবে আরও দৃঢ় করে গড়ে তোলেন, আর মক্কার আকাশে তখন জমা হতে থাকে এক নতুন ভোরের আলো, যা খুব শীঘ্রই তিন বছরের এক নিভৃত, গোপন দাওয়াতের মধ্য দিয়ে আরবের বুক চিরে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছিল।
সত্যকে সমুন্নত করার সংগ্রাম
মক্কার তপ্ত মরুভূমির বুক চিরে তখন কেবলই দুপুরের খরতাপ নামেনি, নেমেছিল এক বিশ্বাসের অগ্নিপরীক্ষা। আরবের কুরাইশদের শতাব্দী প্রাচীন মূর্তিপূজা আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে যখন আল্লাহর রাসূল (সা.) হকের বাণী—"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"—উচ্চস্বরে ঘোষণা করলেন, তখন থেকেই মক্কার আকাশ-বাতাস যেন এক লহমায় বদলে গেল। শান্তি ও সত্যের সুশীতল বার্তার জবাবে নেমে এলো নির্মমতার এক কাল অধ্যায়।
### কাবার চত্বরে বিশ্বাসের অবিচলতা
এক বিকেলে আল্লাহর রাসূল (সা.) কাবার চত্বরে সেজদায় অবনত ছিলেন। পরম প্রভুর দরবারে তিনি যখন নিমগ্ন, ঠিক তখনই কুরাইশদের কুখ্যাত নেতা আবু জেহেল এবং তার সহযোগীরা এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল। আগের দিন জবাই করা একটি উটের পচা, দুর্গন্ধযুক্ত নাড়িভুঁড়ি এনে তারা সেজদারত রাসূল (সা.)-এর পবিত্র পিঠ ও ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দিল।
ভারী এবং নোংরা সেই বোঝার নিচে রাসূল (সা.) আটকে রইলেন, কিন্তু সেজদা থেকে মাথা তুললেন না। কাফেররা তা দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল, একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল বিদ্রূপে। অবশেষে খবর পেয়ে ছোট্ট ফাতেমা (রা.) চোখের জল মুছতে মুছতে ছুটে এলেন এবং নিজ হাতে সেই ময়লা সরিয়ে বাবাকে মুক্ত করলেন।
নির্যাতন কেবল সেখানেই থেমে থাকেনি। কখনো কাবা প্রাঙ্গণে নামাজরত অবস্থায় উকবা ইবনে আবি মুআইত তার চাদর দিয়ে রাসূল (সা.)-এর গলায় পেঁচিয়ে এমনভাবে টান দিয়েছিল যে তাঁর শ্বাসরোধ হয়ে আসছিল। আবু বকর (রা.) ছুটে এসে তাকে রক্ষা করেন এবং কেঁদে বলেন, *"তোমরা কি এমন একজন মানুষকে হত্যা করতে চাও, যিনি বলেন আমার রব আল্লাহ?"* শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত চলত জাদুকর, পাগল কিংবা কবি বলে মানসিক কটূক্তি এবং একপর্যায়ে তাঁকে হত্যার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র।
### তপ্ত বালুকারাশির ওপর 'আহাদ' ধ্বনি
রাসূল (সা.)-এর ওপর নির্যাতনের পাশাপাশি তাঁর অনুসারী সাহাবিদের ওপর নেমে এসেছিল অমানুষিক টর্চার সেল। উমাইয়া ইবনে খালাফ তার ক্রীতদাস হযরত বিলাল (রা.)-কে ইসলামের অপরাধে মক্কার দুপুরের ফুটন্ত বালুর ওপর শুইয়ে দিত। এখানেই শেষ নয়, বুক ফেটে যাওয়ার মতো এক বিশাল ভারী পাথর তাঁর বুকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো, যাতে তিনি নড়াচড়া করতে না পারেন। উমাইয়া চিৎকার করে বলত, *"মুহাম্মদের ধর্ম ত্যাগ কর, নয়তো এভাবেই মরবি!"*
কিন্তু সেই মরুভূমির উত্তাপ আর পাথরের চাপকে তুচ্ছ করে বিলালের শুষ্ক ও ফাটা ঠোঁট বেয়ে কেবল একটি শব্দই উচ্চারিত হতো—**"আহাদ! আহাদ!"** (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক)।
নিকটেই অন্য এক গলিতে কামার হযরত খাব্বাব (রা.)-কে কাফেররা জ্বলন্ত লাল অঙ্গারের (কয়লা) ওপর খালি পিঠে শুইয়ে রাখত। একজন কাফের তার বুকের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে রাখত যাতে তিনি উঠতে না পারেন। খাব্বাব (রা.)-এর পিঠের চর্বি ও রক্ত গলে গলে যখন সেই আগুন নিভে যেত, তখন কেবল তিনি রেহাই পেতেন। পরবর্তী জীবনেও তাঁর পিঠের সেই সাদা দাগগুলো সাহাবিদের চোখ ভিজিয়ে দিত।
### ইসলামের প্রথম রক্তের দাগ
মক্কার অলিগলি তখন কাঁপছিল ইয়াসির পরিবারের আর্তনাদে। বনু মাখজুম গোত্র হযরত ইয়াসির (রা.), তাঁর স্ত্রী হযরত সুমাইয়া (রা.) এবং পুত্র আম্মার (রা.)-কে লোহার বর্ম পরিয়ে মক্কার রোদে দাঁড় করিয়ে রাখত। রাসূল (সা.) যখন তাদের পাশ দিয়ে যেতেন, ব্যথায় তাঁর বুক ফেটে যেত। তিনি বলতেন, *"হে ইয়াসির পরিবার, ধৈর্য ধরো! তোমাদের জন্য জান্নাতের ওয়াদা রয়েছে।"*
এক সন্ধ্যায় আবু জেহেল ক্ষিপ্ত হয়ে বৃদ্ধা হযরত সুমাইয়া (রা.)-কে চরম অপমান করতে শুরু করল। কিন্তু সুমাইয়ার ঈমানি দৃঢ়তার সামনে আবু জেহেলের অহংকার চূর্ণ হয়ে গেল। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পিশাচ আবু জেহেল তার হাতের বর্শা দিয়ে সুমাইয়া (রা.)-এর লজ্জাস্থানে আঘাত করল। মক্কার তপ্ত বালু লাল হয়ে উঠল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম শহীদের রক্তে। কিছুদিনের মধ্যে নির্যাতনে শহীদ হলেন তাঁর স্বামী বৃদ্ধ ইয়াসির (রা.)-ও।
ধনী ও সম্ভ্রান্ত ঘরের যুবকদেরও রেহাই ছিল না। মক্কার সবচেয়ে সুবেশ ও আদুরে যুবক মুস'য়াব ইবনে উমাইর (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তাঁর মা-ই তাঁকে অনাহারে রেখে ঘরের কোণে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখল। হযরত উসমান (রা.)-কে তাঁর চাচা খেজুর পাতার চাটাইয়ে মুড়িয়ে ধোঁয়া দিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করত।
### শি'বে আবু তালিবের অবরুদ্ধ জীবন
যখন কোনো নির্যাতনেই মুসলমানদের ঈমান টলানো গেল না, তখন কুরাইশরা মেতে উঠল এক দীর্ঘমেয়াদি ও নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রে। তারা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের সাথে সমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার চুক্তিপত্র কাবার দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিল।
রাসূল (সা.) এবং তাঁর পরিবারসহ মুসলমানদের আশ্রয় নিতে হলো 'শি'বে আবু তালিব' নামক একটি সংকীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকায়। দীর্ঘ তিনটি বছর (৭ম হিজরি পূর্ব থেকে ১০ম হিজরি পূর্ব) তারা সেখানে অবরুদ্ধ রইলেন। মক্কায় কোনো খাবার ঢুকলে কাফেররা তা চড়া দামে কিনে নিত যেন মুসলমানরা তা কিনতে না পারে।
ক্ষুধার জ্বালায় অবুঝ শিশুদের কান্নায় মক্কার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, হযরত খাদিজা (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবিরা বন্য গাছের পাতা আর শুকনো চামড়া পানিতে ফুটিয়ে চিবিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতেন। এই তিন বছরের অবর্ণনীয় কষ্ট ও অনাহার রাসূল (সা.)-এর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিবের শরীরকে এতটাই ভেঙে দিয়েছিল যে, বয়কট প্রত্যাহারের কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা দুজনে ইন্তেকাল করেন।
> মক্কার সেই নির্মম দিনগুলো ছিল এক চরম অন্ধকার আর ত্যাগের মহাকাব্য। কিন্তু শত চাবুকের আঘাত, উত্তপ্ত পাথর, জ্বলন্ত কয়লা আর তিন বছরের ক্ষুধা—কোনো কিছুই সাহাবায়ে কেরামের বুক থেকে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা আর ঈমানের আলো নিভিয়ে দিতে পারেনি। তাঁদের এই অমানুষিক আত্মত্যাগ আর রক্তের বিনিময়েই আজ পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইসলাম।
>
সোমবার, ১ জুন, ২০২৬
আঁধারে ফোটা পদ্ম
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
আরব্য মরুভূমির বুক চিরে তখন তপ্ত হাওয়া বইছে। ধূ ধূ বালুকারাশির মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন শহর মক্কা। সেই শহরেরই এক সম্ভ্রান্ত কুরাইশ পরিবারে, ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে, যখন এক শিশু পৃথিবীর আলো দেখল, চারপাশটা যেন এক অলৌকিক শান্তিতে ভরে উঠল। মা আমেনা তাঁর সদ্যোজাত সন্তানের নাম রাখলেন 'মুহাম্মদ' (সা.)।
কিন্তু এই আনন্দের আলোয় মিশে ছিল এক গভীর বিষাদের ছায়া। শিশু মুহাম্মদের জন্মের আগেই তাঁর পিতা আবদুল্লাহ পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। পৃথিবীর বুকে আসার আগেই তিনি হারিয়েছেন পিতৃস্নেহ।
বনু সাদ গোত্রে অলৌকিক দিনগুলো
মক্কার তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী, কোলাহলমুক্ত পরিবেশ, বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষা এবং সুস্থ শারীরিক গঠনের জন্য শিশু মুহাম্মদকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো মরুভূমির বনু সাদ গোত্রে। তাঁর দায়িত্ব নিলেন এক ভাগ্যবতী নারী—দুধমাতা হালিমা। বনু সাদ গোত্রে পা রাখার পর থেকেই ঘটতে লাগল একের পর এক অলৌকিক ঘটনা। হালিমা যখন মক্কায় এসেছিলেন, তখন তাঁর স্তনে দুধ ছিল না, তাঁদের সওয়ারির গাধাটি ছিল দুর্বল আর খিটখিটে। কিন্তু শিশু মুহাম্মদকে কোলে তুলে নেওয়ার সাথে সাথেই হালিমার স্তন দুধে ভরে উঠল। দুর্বল গাধাটি এত দ্রুত ছুটতে শুরু করল যে কাফেলার অন্য সবাই অবাক হয়ে গেল। শুধু তাই নয়, মুহাম্মদের উপস্থিতিতে হালিমার শুষ্ক চারণভূমি সবুজ হয়ে উঠল, ছাগলগুলো ওলন্দা ভরা দুধ নিয়ে ফিরতে লাগল। অভাবের সংসারে ফিরল অলৌকিক সচ্ছলতা। মরুভূমির উন্মুক্ত বাতাস আর সাদাসিধে জীবনযাত্রার মাঝে কাটতে লাগল মুহাম্মদের শৈশব। অন্য শিশুদের সাথে খেলতে খেলতেই কেটে গেল জীবনের প্রথম পাঁচটি বছর।
এতিমত্বের তীব্র আঘাত ও চাচার আশ্রয়
পাঁচ বছর বয়সে মুহাম্মদ (সা.) আবার ফিরে এলেন মক্কায়, মায়ের কোলে। কিন্তু মায়ের স্নেহের আঁচল বেশিদিন তাঁর কপালে জুটল না। মাত্র ৬ বছর বয়সে মা আমেনাও মদিনা থেকে ফেরার পথে 'আবওয়া' নামক স্থানে ইন্তেকাল করলেন। মরুভূমির সেই নিঝুম প্রান্তরে মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মুহাম্মদ (সা.)-এর চোখের পানি যেন মরুভূমির বালুকেও কাঁদিয়েছিল। তিনি হয়ে পড়লেন সম্পূর্ণ পিতৃ-মাতৃহীন, এক পরম এতিম। মায়ের মৃত্যুর পর পরম স্নেহে নাতিকে বুকে টেনে নিলেন দাদা আবদুল মুত্তালিব। কিন্তু মুহাম্মদের (সা.) বয়স যখন মাত্র ৮ বছর, তখন দাদাও দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। একের পর এক আপনজনকে হারিয়ে ছোট্ট মুহাম্মদের মন যখন নিদারুণ কষ্টে ভেঙে পড়েছে, তখন তাঁর দায়িত্ব নিলেন আপন চাচা আবু তালিব। চাচার আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে ছিল ভাতিজার জন্য উজাড় করা ভালোবাসা।
সিরিয়া সফর ও পাদ্রি বহিরার ভবিষ্যৎবাণী
চাচা আবু তালিবের ঘরে এসে মুহাম্মদের (সা.) কৈশোরকাল শুরু হলো। ১২ বছর বয়সে এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন তিনি। চাচা আবু তালিব ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। প্রিয় ভাতিজাকে মক্কায় একা রেখে যেতে মন চাইছিল না তাঁর। তাই মুহাম্মদকেও (সা.) সাথে নিলেন। দীর্ঘ মরু পথ পাড়ি দিয়ে কাফেলা যখন সিরিয়ার 'বুসরা' নামক স্থানে পৌঁছাল, তখন সেখানে 'বহিরা' নামে এক খ্রিষ্টান পাদ্রি থাকতেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, একটি মেঘখণ্ড দূর আকাশ থেকে এসে কাফেলার ওপর ছায়া দিচ্ছে, আর মুহাম্মদ যে গাছের নিচে বসেছেন, তার ডালগুলো ঝুঁকে তাঁকে রোদ থেকে আড়াল করছে। বহিরা কাফেলাকে নিমন্ত্রণ করলেন এবং কিশোর মুহাম্মদকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। তিনি তাঁর হাত ও পিঠের মোহরে নবুওয়াত দেখে চিনে ফেললেন। বহিরা আবু তালিবকে ডেকে বললেন, "এই বালক সাধারণ কোনো শিশু নয়। ও শেষ জামানার নবী। একে মক্কার ইহুদিদের হাত থেকে সাবধানে রাখুন। চাচার মন এক অজানা বিস্ময় ও শ্রদ্ধায় ভরে উঠল। তিনি ব্যবসা দ্রুত শেষ করে মক্কায় ফিরে এলেন।
কৈশোরের কর্মজীবন ও সততার পরীক্ষা
মক্কার তপ্ত বালুকাভূমির উপর সূর্যের প্রখর তাপ মরুভূমির হাওয়াকে যখন আরও উত্তপ্ত করে তুলছিল, তখন কিশোর মুহাম্মদ (সা.) নিজের কর্মদক্ষতা ও সততার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। তিনি চাচার সংসারে সচ্ছলতা আনতে এবং নিজের দায়িত্ববোধ থেকে ব্যবসার কাজে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। একবার এক বাণিজ্যিক কাফেলা যখন মরুভূমির কঠিন পথ পাড়ি দিচ্ছিল, তখন ক্লান্তি ও তৃষ্ণা মেটাতে একটি স্থানে সবাই যাত্রাবিরতি নেন। চারদিকে যখন বণিকদের ব্যস্ততা আর উটের কোলাহল, ঠিক তখনই কাফেলার একজন বয়োবৃদ্ধ বণিক আবিষ্কার করলেন যে, তাঁর অত্যন্ত মূল্যবান অলংকার ও অর্থ ভর্তি চামড়ার ব্যাগটি কোথাও হারিয়ে গেছে। মরুভূমির এই অন্তহীন বালুকারাশির মাঝে সেই ব্যাগ খুঁজে পাওয়া ছিল একপ্রকার অসম্ভব। বণিক যখন নিরাশ হয়ে বিলাপ করছিলেন, তখন কিশোর মুহাম্মদ (সা.) তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং পরম মমতায় তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন। তপ্ত রোদে গা ঘেমে নেয়ে উঠলেও মুহাম্মদ (সা.) ক্লান্তিহীনভাবে মরুভূমির ধূলিময় বালুর প্রতিটি কোণ ও পাথরের আড়াল খুঁজতে শুরু করলেন। তাঁর এই অসাধারণ নিষ্ঠা দেখে কাফেলার অভিজ্ঞ বণিকরাও বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। দীর্ঘ সময় নিখুঁতভাবে খোঁজার পর একটি বড় পাথরের আড়ালে বালুচাপা পড়ে থাকা সেই মূল্যবান ব্যাগটি তিনি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন। তিনি ব্যাগটি এনে সেই বৃদ্ধ বণিকের হাতে তুলে দিলে, বণিক পরীক্ষা করে দেখলেন তাঁর একটি মুদ্রাও খোয়া যায়নি। কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে বণিক তাঁকে বড় অঙ্কের পুরস্কার দিতে চাইলেন, কিন্তু কিশোর মুহাম্মদ (সা.) মৃদু হেসে তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, "আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি, এর জন্য কোনো প্রতিদানের প্রয়োজন নেই।"
এই ঘটনা কাফেলার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে তাঁর প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করেছিল।
জাহিলিয়াতের মাঝে এক টুকরো আলো
তৎকালীন মক্কার সমাজ ডুবে ছিল জাহিলিয়াত বা চরম অন্ধকারের সাগরে। জুয়া, মদ্যপান, ব্যভিচার, লুটতরাজ আর তুচ্ছ কারণে গোত্রীয় মারামারি ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। কিন্তু কিশোর মুহাম্মদ (সা.) এই পাপাচারের পঙ্কিলতার মাঝেও ছিলেন পদ্মফুলের মতো পবিত্র। তিনি কখনো কোনো মূর্তির সামনে মাথা নত করেননি, কখনো কোনো পাপকাজে অংশ নেননি। মক্কার যুবকেরা যখন আমোদ-প্রমোদে মেতে থাকত, তিনি তখন শান্ত মনে চিন্তা করতেন প্রকৃতির সৃষ্টি রহস্য নিয়ে। চাচার সংসারের হাল ধরতে তিনি মাঝে মাঝে মাঠে মেষ চড়াতেও যেতেন। নির্জন প্রান্তর আর প্রকৃতির মাঝে একা কাটাতে কাটাতে তাঁর মন হয়ে উঠেছিল আরো কোমল ও সংবেদনশীল।
পরম বিশ্বাসী 'আল-আমিন'
শৈশব ও কৈশোর থেকেই মুহাম্মদ (সা.)-এর মুখে কখনো কেউ একটিও মিথ্যা কথা শোনেনি। তিনি কারো সাথে কখনো কোনো প্রতারণা করেননি, কাউকে কষ্ট দেননি এবং কারো আমানতের খেয়ানত করেননি। মরুভূমির সেই হারিয়ে যাওয়া ব্যাগ ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাসহ তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের অতুলনীয় সততা, বিনয় আর পরম আমানতদারিতার কারণে মক্কার শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সমাজের সবাই এক নামে তাঁকে 'আল-আমিন' বা 'পরম বিশ্বাসী' উপাধিতে ভূষিত করেছিল। মানুষ নিজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ নিশ্চিন্তে এই কিশোরের কাছে এনে গচ্ছিত বা আমানত রাখত।
ফিজার যুদ্ধ ও হিলফুল ফুজুল গঠন
কিশোর পেরিয়ে মুহাম্মদ (সা.) যখন তারুণ্যের শুরুতে (১৫ থেকে ২০ বছর বয়সের মাঝে), তখন মক্কায় এক ভয়াবহ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল, যার নাম 'ফিজার যুদ্ধ' বা অন্যায় সমর। পবিত্র মাসে নিষিদ্ধ জেনেও কুরাইশ ও কায়েস গোত্রের মাঝে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ প্রায় চার বছর ধরে চলেছিল। কিশোর মুহাম্মদ (সা.) তার চাচাদের সাথে এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তবে তিনি নিজে কারো ওপর অস্ত্র তোলেননি; শুধু শত্রুর ছুঁড়ে দেওয়া তীরগুলো কুড়িয়ে চাচাদের হাতে তুলে দিতেন। যুদ্ধের এই নিষ্ঠুরতা, লাশের স্তূপ আর নিরপরাধ মানুষের আর্তনাদ তাঁর কোমল হৃদয়কে গভীরভাবে ব্যথিত করল। তিনি ভাবলেন, এভাবে একটি সমাজ চলতে পারে না। যুদ্ধ শেষ হলে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি সমমনা ও পরোপকারী যুবকদের একত্রিত করলেন। তাঁদের নিয়ে তিনি গঠন করলেন একটি শান্তি সংঘ, যার নাম 'হিলফুল ফুজুল'। এই সংঘের মূল শপথ ছিল:
* সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা।
* মজলুম ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষা করা।
* কোনো অন্যায়কারীকে মক্কায় প্রশ্রয় না দেওয়া এবং বহিরাগত পথিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
কোনো ধরনের বিলাসিতা বা অহংকার ছাড়াই, তীব্র এতিমত্ব আর কষ্টের মাঝে বড় হওয়া এই কিশোরের হাত ধরেই মক্কার অন্ধকার সমাজে শান্তির প্রথম আলো জ্বলে উঠেছিল—যা পরবর্তীতে পুরো পৃথিবীর ইতিহাসকে বদলে দেওয়ার মূল ভিত্তি তৈরি করেছিল।
মদিনার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ
১.মদিনার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ
মদিনার ইতিহাসে এমন উৎসবের দিন আর কখনো আসেনি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মক্কার কাফেরদের সমস্ত নির্যাতন ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আল্লাহর রাসুল (সা.) এবং তাঁর সঙ্গী হযরত আবু বকর (রা.) মদিনার সীমানায় এসে পৌঁছেছেন।
চারিদিকে আনন্দ-উল্লাস। মদিনার আনসার (সাহায্যকারী) মুসলমানেরা তাঁদের প্রিয় নবীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। বনু নাজ্জার গোত্রের ছোট ছোট মেয়েরা দফ (এক ধরণের বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে সমস্বরে গেয়ে উঠল সেই অমর পঙক্তিমালা:
> *"তালাআল বাদরু আলাইনা, মিন ছানিয়্যাতিল ওয়াদা,*
> *ওয়াজাবাশ শুকরু আলাইনা, মা দাআ লিল্লাহি দা..."*
> *(আমাদের ওপর পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে ‘ওয়াদা’ উপত্যকা থেকে। আমাদের ওপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা ওয়াজিব হয়েছে, যতদিন কোনো আহ্বানকারী আল্লাহকে আহ্বান করবে।)*
>
আনসারদের প্রতিটি পরিবার চাইছিল আল্লাহর রাসুল (সা.) যেন তাদের বাড়িতে মেহমান হন। সবাই তাঁর উটের লাগাম ধরে টানাটানি করছিল এবং বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছিল, "হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের এখানে অবস্থান করুন। এখানে নিরাপত্তা এবং লোকবল দুই-ই আছে।"
রাসুলুল্লাহ (সা.) কারও মনে কষ্ট দিতে চাইলেন না। তিনি মৃদু হেসে এক ঐতিহাসিক ফয়সালা দিলেন। তিনি বললেন:
> "তোমরা কাসওয়াকে (রাসুলের উটের নাম) ছেড়ে দাও। একে আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি যেখানে গিয়ে বসবে, সেখানেই আমার বাসস্থান হবে।"
>
সবাই উটের পেছনে পেছনে হাঁটতে লাগল। কাসওয়া ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বনু নাজ্জার গোত্রের একটি খালি জায়গায় গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। জায়গাটি ছিল দুজন এতিম শিশু— সাহল ও সুহাইলের। পাশেই ছিল হযরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর বাড়ি। রাসুল (সা.) বললেন, "এখানেই হবে আমাদের মসজিদ ও আবাস।" তিনি আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর বাড়িতে মেহমান হিসেবে উঠলেন।
## ২. মসজিদে নববীর ভিত্তিপ্রস্তর: ঐক্যের প্রথম ধাপ
রাসুল (সা.) মদিনায় পা রেখেই বুঝতে পেরেছিলেন, একটি শক্তিশালী সমাজ গঠনে প্রথম প্রয়োজন একটি কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে সবাই দিনে পাঁচবার একত্রিত হবে। তিনি এতিম দুই ভাইয়ের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য দিয়ে সেই জমিটি কিনে নিলেন।
শুরু হলো **মসজিদে নববী** নির্মাণের কাজ। এটি কেবল ইবাদতের জায়গা ছিল না, বরং এটি ছিল একাধারে সংসদ ভবন, আদালত এবং মুসলমানদের মিলনমেলা।
মসজিদ নির্মাণে কোনো রাজকীয় জাঁকজমক ছিল না। কাঁচা ইট, খেজুরের ডাল আর গাছের খুঁটি দিয়ে তৈরি হচ্ছিল এই ঐতিহাসিক স্থাপনা। সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিল— স্বয়ং আল্লাহর রাসুল (সা.) সাধারণ শ্রমিকদের মতো মাথায় করে ভারী ভারী পাথর আর ইট বহন করছিলেন। তাঁর গা থেকে ঘাম ঝরে পড়ছিল।
তাঁকে এভাবে কাজ করতে দেখে আনসার ও মুহাজিরদের (মক্কা থেকে হিজরতকারী) ক্লান্তি উবে গেল। তাঁরা দ্বিগুণ উৎসাহে গান গেয়ে গেয়ে কাজ করতে লাগলেন:
> *"হে আল্লাহ! পরকালের কল্যাণই আসল কল্যাণ,*
> *তুমি আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি দয়া করো।"*
>
মসজিদটি যখন সম্পন্ন হলো, তখন সেটি মদিনার বুকে এক টুকরো জান্নাতে পরিণত হলো। কিন্তু রাসুল (সা.) জানতেন, কেবল ইটের দেয়াল দিয়ে সমাজ গড়া যায় না; সমাজ গড়তে হলে মানুষের অন্তরের দেয়ালগুলো ভাঙতে হয়।
## ৩. আনসারদের ত্যাগ ও মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভ্রাতৃত্ববন্ধন
মক্কা থেকে আসা মুহাজিররা ছিলেন রিক্তহস্ত। কাফেরদের ভয়ে তাঁরা ঘরবাড়ি, ব্যবসা, সম্পদ— সব মক্কাতেই ফেলে শুধু নিজের প্রাণ আর ইমান বাঁচিয়ে মদিনায় এসেছিলেন। তাঁদের না ছিল থাকার জায়গা, না ছিল জীবিকার উপায়। এই সংকট নিরসনে আল্লাহর রাসুল (সা.) এক অতুলনীয় ও অলৌকিক সামাজিক পদক্ষেপ নিলেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে "মুআখাত" বা ভ্রাতৃত্ববন্ধন নামে পরিচিত।
তিনি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বাড়িতে আনসার এবং মুহাজিরদের এক সমাবেশের ডাক দিলেন। সেখানে রাসুল (সা.) একজন মুহাজির ও একজন আনসারকে ডেকে বললেন, "আজ থেকে তোমরা একে অপরের ভাই।"
মক্কার মুহাজিরদের প্রতি মদিনার আনসারদের এই অগাধ ভালোবাসা ও ত্যাগ ছিল মূলত আল্লাহর প্রতি তাদের আন্তরিক ভালোবাসারই এক পরম বহিঃপ্রকাশ। তবে এর পেছনে আরেকটি গভীর কারণও ছিল— তা হলো মক্কার মুহাজিরদের এক অনন্য ও মহান বিশেষত্ব।
এই মুহাজিররা ছিলেন সরাসরি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতে গড়া ও সুপ্রশিক্ষিত মানুষ, যাঁরা দীর্ঘ ১৩ বছর মক্কার কাফেরদের অমানুষিক ও নিষ্ঠুর অত্যাচার সহ্য করেও ইমানের ওপর পাহাড়ের মতো অটল ছিলেন। তাঁরা সরাসরি আল্লাহর রাসুলের পবিত্র সান্নিধ্য থেকে দ্বীনের প্রকৃত তালিম বা শিক্ষা পেয়েছিলেন এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের আত্মগঠন করেছিলেন। শুধুমাত্র আল্লাহর দ্বীন ও সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার খাতিরে তাঁরা নিজেদের পরম মায়ার ঘরবাড়ি, চেনা পরিবেশ ও সমস্ত সহায়-সম্পদ এক পলকে ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেছিলেন।
এই কারণেই মুহাজিরদের প্রতি আনসারদের অন্তরে ছিল এক গভীর ও বিশেষ শ্রদ্ধা। আনসাররা সবসময় এই মুখলেস মুহাজির ভাইদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। কারণ, তাঁদের সাথে থাকলে, তাঁদের সান্নিধ্যে বসলে দ্বীন সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানা যেত এবং রাসুলের সরাসরি ছাত্রদের দেখে নিজেদের চরিত্র ও জীবনকে আদর্শ রূপ দেওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি হতো।
এই আত্মিক টানের কারণেই ঘোষণা হওয়া মাত্রই আনসাররা তাঁদের মুহাজির ভাইদের শুধু মুখে আপন বলেননি, বরং তাঁদের অন্তরের গভীরে জায়গা দিয়েছিলেন।
উদাহরণস্বরূপ, মদিনার ধনী আনসার সাহাবি হযরত সাদ ইবনুর রাবি (রা.)-কে মক্কার মুহাজির সাহাবি হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর ভাই বানিয়ে দেওয়া হলো। সাদ (রা.) তাঁর ভাইকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন, "ভাই আবদুর রহমান! আমি মদিনার অন্যতম ধনী ব্যক্তি। এই নাও আমার সমস্ত সম্পত্তি, একে সমান দুই ভাগে ভাগ করো। এক ভাগ তোমার, অন্য ভাগ আমার।"
আনসারদের এই অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগ দেখে মুহাজিররা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তবে তাঁরাও কোনো পরজীবী বা অলস লোক ছিলেন না। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) চোখের পানি মুছে বললেন, "ভাই সাদ! আল্লাহ তোমার পরিবার ও সম্পত্তিতে বরকত দিন। আমার এসবের প্রয়োজন নেই। তুমি শুধু আমাকে মদিনার বাজারের পথটা দেখিয়ে দাও।" (পরবর্তীতে আবদুর রহমান ইবনে আউফ নিজের পরিশ্রমে মদিনার বড় ব্যবসায়ী হয়েছিলেন)।
যাঁদের চাষের জমি ছিল, তাঁরা মুহাজির ভাইদের অর্ধেক জমি লিখে দিলেন। যাঁদের খেজুর বাগান ছিল, তাঁরা বললেন, "শ্রম আমরা দেব, কিন্তু ফল কাটার পর অর্ধেক তোমার ঘরে যাবে।" মদিনার আনসারদের এই নিঃস্বার্থ ও পবিত্র ভালোবাসার কথা পবিত্র কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সুরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে অবিনশ্বর করে রেখেছেন:
"তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত।"
## ৪. এক নতুন সভ্যতার জন্ম
মসজিদে নববী নির্মাণ এবং এই অভূতপূর্ব ভ্রাতৃত্ববন্ধনের মাধ্যমে মদিনায় এমন এক মজবুত ভিত্তি তৈরি হলো, যা আরবের হিংসা, গোত্রবাদ আর অহংকারকে চিরতরে মিটিয়ে দিল। মক্কার কুরাইশ, মদিনার আওস ও খাজরাজ গোত্র এবং দাস-মনোভাবাপন্ন সমাজ ভেঙে সবাই এক দেহে পরিণত হলো।
আনসারদের সেই উদারতা ও মুহাজিরদের আত্মমর্যাদাবোধের ওপর ভর করেই মদিনা হয়ে উঠল পৃথিবীর বুকে ইসলামের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণ রাষ্ট্র। যেখানে ভালোবাসা জয় করেছিল সমস্ত অভাবকে, আর ত্যাগ প্রতিষ্ঠা করেছিল এক অপরাজেয় সভ্যতাকে।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)



