Muhammad Abul Hussain
রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬
স্যার আইজ্যাক নিউটনের ধর্ম বিষয়ক মতামত
এখানে স্যার আইজ্যাক নিউটনের ধর্মীয় চিন্তাভাবনা ও বিশ্বাসের ওপর লেখাটি সহজ, সাবলীল এবং মার্জিত বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা হলো। সাধারণ পাঠকের পড়ার সুবিধার জন্য জটিল ধর্মতাত্ত্বিক শব্দগুলোকে সহজ করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
*(অনুবাদ থেকে অপ্রাসঙ্গিক নম্বর বা কোডগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে)*
## স্যার আইজ্যাক নিউটন: বিজ্ঞানীর অন্তরালে এক গোপন ধর্মবিশ্বাসী
স্যার আইজ্যাক নিউটন একাধারে যেমন ছিলেন একজন একনিষ্ঠ খ্রিস্টান, তেমনি ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম এক ভিন্নপন্থী ধর্মতাত্ত্বিক। তিনি ধর্ম নিয়ে প্রায় ১৩ লাখ শব্দ লিখে গেছেন—যা তাঁর গণিত ও পদার্থবিদ্যার মোট লেখার চেয়েও বেশি। তাঁর জীবদ্দশায় এর বেশিরভাগই প্রকাশিত হয়নি। বর্তমানে এই লেখাগুলো জেরুজালেমের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে 'ইহুদা পাণ্ডুলিপি' (Yahuda manuscripts) হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
### যুক্তিবাদী ও বাইবেল-ভিত্তিক ঈশ্বরবিশ্বাসী
নিউটন প্রকৃতিকে একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র হিসেবে দেখতেন না, বরং একে জীবন্ত ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে মনে করতেন। তাঁর বিখ্যাত বই *অপটিক্স (Opticks)*-এ তিনি প্রশ্ন করেছিলেন: "চোখ কি আলোর বিজ্ঞান না জেনেই তৈরি হয়েছে? কিংবা কান কি শব্দের জ্ঞান ছাড়াই তৈরি হয়েছে?" তিনি নিজেই উত্তর দিয়েছেন—এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বে একজন "অশরীরী, জীবন্ত, বুদ্ধিমান ও সর্বব্যাপী সত্তা" রয়েছেন।
১৭১৩ সালে তাঁর প্রধান গ্রন্থ *প্রিন্সিপিয়া (Principia)*-র পরিশিষ্টে (General Scholium) তিনি এই ধারণার আরও বিস্তার ঘটান:
> "সূর্য, গ্রহ এবং ধূমকেতু নিয়ে গঠিত এই চমৎকার জগৎ কেবল একজন বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী সত্তার পরিকল্পনা ও শাসন থেকেই আসতে পারে।"
> "এই সত্তা সবকিছু শাসন করেন। তবে জগতের আত্মা হিসেবে নয়, বরং সবার প্রভু হিসেবে... ঈশ্বরত্ব মানে নিজের শরীরের ওপর কর্তৃত্ব নয়, বরং তাঁর দাস বা সৃষ্টির ওপর আধিপত্য।"
> "ঈশ্বর চিরন্তন ও অসীম... তিনি কেবল অনন্তকাল বা অসীমতা নন, বরং তিনি নিজেই নিত্য ও সীমাহীন; তিনি কেবল সময় বা স্থান নন, বরং তিনি চিরকাল টিকে থাকেন এবং সর্বত্র বিরাজ করেন।"
>
নিউটনের কাছে ঈশ্বরের সংজ্ঞা ছিল তাঁর আধিপত্যে, কোনো বিমূর্ত তত্ত্বে নয়। এই "শাসনকর্তা ঈশ্বর"-এর ধারণাই নিউটনকে পরম স্থান ও কালের (absolute space and time) বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁর মতে, প্রকৃতির নিয়মগুলো আসলে ঈশ্বরের ইচ্ছেরই বহিঃপ্রকাশ—যা আধুনিক গবেষকেরাও স্বীকার করেন।
ধর্মবিশ্বাসের চেয়েও নিউটনের কাছে সত্য খোঁজার পদ্ধতিটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি অন্ধভাবে কোনো প্রথা মেনে নেওয়া পছন্দ করতেন না। নিজেই বাইবেল পড়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেছিলেন:
> "ধর্মগ্রন্থ নিজে নিজে খুঁটিয়ে পড়ো। বারবার পড়ো, গভীর মনোযোগ দিয়ে ভাবো এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো যেন তিনি তোমার বোঝার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেন।"
>
তিনি বাইবেলকে ল্যাবরেটরির ডেটা বা উপাত্তের মতো করে দেখতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আসল ধর্মমত সেটাই যা "প্রথম যুগের শিক্ষকদের স্পষ্ট কথায় প্রচার করা হয়েছিল এবং একদম শুরু থেকেই শেখানো হতো।" এই সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তিনি খ্রিস্টধর্মের শুরুর দিকের গ্রিক ও ল্যাটিন লেখকদের মূল নথিপত্র পরীক্ষা করতেন।
### ত্রিত্ববাদ-বিরোধী অবস্থান ও অ্যারিয়ান বিশ্বাস
১৬৭২ সালের দিকে নিউটন 'অ্যারিয়ানবাদ' (Arianism)-এর দিকে ঝুঁকে পড়েন। তাঁর বোঝাপড়া অনুযায়ী, এই মতবাদের মূল কথা ছিল—যিশু খ্রিস্ট "মানুষের চেয়ে বড়, কিন্তু ঈশ্বরের চেয়ে ছোট।" অর্থাৎ, তিনি প্রচলিত ত্রিত্ববাদ (Trinity - পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা সমপর্যায়ের, এই বিশ্বাস) স্বীকার করতেন না।
নিজের এই গোপন বিশ্বাসকে তিনি ১২টি যুক্তিতে সাজিয়েছিলেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল:
* "ধর্মগ্রন্থের কোথাও 'ঈশ্বর' শব্দটি দিয়ে একসাথে তিনজনকে (পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা) বোঝানো হয়নি।"
* "সাধারণভাবে যেখানেই 'ঈশ্বর' শব্দটি এককভাবে বসেছে, তা সবসময় 'পিতা'-কে নির্দেশ করে।"
* "পুত্র (যিশু) নিজেই স্বীকার করেছেন যে পিতা তাঁর চেয়ে বড়, এবং পিতাকেই নিজের ঈশ্বর বলে ডেকেছেন।"
বাইবেলের দুটি জায়গার চুলচেরা বিশ্লেষণ তাঁর এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছিল:
১. **১ যোহন ৫:৭ (1 John 5:7):** নিউটন প্রমাণ করে দেখান যে, প্রথম দিকের গ্রিক পাণ্ডুলিপিগুলোতে ত্রিত্ববাদকে সমর্থনকারী একটি নির্দিষ্ট অংশ (Comma Johanneum) ছিলই না। তিনি দাবি করেন, ত্রিত্ববাদকে জোর করে টিকিয়ে রাখার জন্য পরবর্তীকালে ইচ্ছাকৃতভাবে এটি যোগ করা হয়েছিল।
২. **অ্যাথানাসিয়ান ক্রিড (The Athanasian Creed):** চার্চের এই নিয়মের ভাষা ("কেউ কারও চেয়ে বড় বা ছোট নয়") তাঁর কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, "যারা পারে তারা এর যৌক্তিক অর্থ খুঁজে নিক; আমি তো এর কোনো মাথামুণ্ডু পাই না।"
তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ত্রিত্ববাদ "বাইবেল দ্বারা সমর্থিত নয় এবং এটি একটি অযৌক্তিক ধারণা।" এর বদলে তিনি বিশ্বাস করতেন যে পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা সম্পূর্ণ আলাদা তিনটি সত্তা।
### চার্চের ইতিহাস: সত্য বিচ্যুতি ও ভবিষ্যৎ সংস্কার
নিউটন বিশ্বাস করতেন যে আদি খ্রিস্টধর্ম খুব দ্রুতই কলুষিত হয়ে পড়েছিল, বিশেষ করে চতুর্থ শতাব্দীর পর। তিনি লিখেছিলেন, রোমান ক্যাথলিক চার্চ "আবার পৌত্তলিকতায় ফিরে গেছে" এবং প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলনও "যথেষ্ট দূর এগোতে পারেনি।"
বাইবেলের 'বুক অব রেভেলেশন' (Revelation) নিয়ে গবেষণা করে তিনি বলেন:
> "আসল চার্চ একসময় হারিয়ে যাবে এবং তার জায়গায় এক মিথ্যা বা মূর্তিপূজক চার্চ দুনিয়া শাসন করবে।"
>
ধর্মের এই "মহাবিচ্যুতি" দেখে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর যুগে যুগে ধর্মকে সংস্কার করেন। তিনি নূহ, ইব্রাহিম, মুসা এবং যিশুর মাধ্যমে আসা সংস্কারের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে ভবিষ্যদ্বাণী করেন—"আমরা আশা করতে পারি যে ঈশ্বর যথাসময়ে আবার একটি নতুন সংস্কার আনবেন।" বাইবেলের বিভিন্ন ভবিষ্যদ্বাণী ঘেঁটে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ভবিষ্যতে সবকিছু আবার তার মূল ও পবিত্র রূপে ফিরে যাবে।
### সাবধানে যাপন করা এক গোপন বিশ্বাস
নিউটনের এই ধর্মীয় চিন্তাভাবনা তৎকালীন ইংল্যান্ডের আইন অনুযায়ী মারাত্মক অপরাধ বা 'ধর্মদ্রোহিতা' হিসেবে গণ্য হতো। তাই তিনি সমাজে নিজের আসল বিশ্বাস লুকিয়ে রাখতেন।
* ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির ফেলোশিপ ধরে রাখার জন্য তাঁর চার্চের যাজক হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানান। এতে তাঁর চাকরি যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অবশেষে ১৬৭৫ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লসের বিশেষ আদেশে তিনি যাজক না হয়েও লুকাসিয়ান অধ্যাপকের পদে থাকার অনুমতি পান।
* তিনি তাঁর ধর্মতাত্ত্বিক লেখাগুলো গোপন রাখতেন এবং অনেকগুলোর গায়ে লিখে রেখেছিলেন "প্রকাশের যোগ্য নয়।" ১৯৩৬ সালে সোথবি’স (Sotheby's) নিলামের পর এই লেখাগুলো প্রথমবারের মতো পৃথিবীর সামনে আসে।
* ১৭২৭ সালে মৃত্যুর শয্যায় শায়িত অবস্থাতেও তিনি চার্চের শেষকৃত্যের আচার গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
বিজ্ঞান ও ধর্মের পাশাপাশি তিনি 'কিমিয়াবিদ্যা' (Alchemy) এবং বাইবেলের কালানুক্রম নিয়েও গবেষণা করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, এগুলো ঈশ্বরের লেখা দুটি বই পড়ার ভিন্ন মাধ্যম—একটি হলো ধর্মগ্রন্থ (Scripture), অন্যটি প্রকৃতি (Nature)। নিউটনের কাছে কঠোর বিজ্ঞানচর্চা আর গভীর ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল একটাই—চার্চের ভুল নিয়ম ও দুর্নীতির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া আদি সত্যকে পুনরুদ্ধার করা।
১০০ উটের লোভে রাসুলকে ধরতে গেল সুরাকা
মরুভূমির তপ্ত বালু উড়িয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলছে সুরাকা ইবনে মালিক। তার চোখে-মুখে তখন তীব্র উত্তেজনা আর লোভের ঝিলিক। কোরাইশ নেতারা ঘোষণা করেছে— মোহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর সঙ্গী আবু বকর (রা.)-কে জীবিত অথবা মৃত ধরে দিতে পারলে **১০০টি লাল উট** পুরস্কার দেওয়া হবে। আরব সমাজে ১০০ উটের মালিক হওয়া মানে রাতারাতি বিশাল ধনী ও প্রভাবশালী হয়ে যাওয়া।
সুরাকা ছিল একজন দক্ষ পথপ্রদর্শক এবং বীর যোদ্ধা। এক ব্যক্তি এসে তাকে গোপনে খবর দিল, সে মরুভূমির পথে কয়েকজন আরোহীকে যেতে দেখেছে। সুরাকা নিশ্চিত হলো, তাঁরাই আল্লাহর রাসুল (সা.) ও তাঁর সঙ্গী। কাউকে কিছু না জানিয়ে, পুরস্কারের সবটুকু একা পাওয়ার লোভে সুরাকা তার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দ্রুত ঘোড়ায় চড়ে রওনা হলো।
## অলৌকিক ঘটনা ও সুরাকার পঙ্গুত্ব
কিছুক্ষণের মধ্যেই সুরাকা দূর থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং আবু বকর (রা.)-কে দেখতে পেল। সুরাকা তার ধনুক বের করল। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ তার ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল এবং সুরাকাও ছিটকে মাটিতে আছড়ে পড়ল।
আরবদের রীতি অনুযায়ী, সুরাকা তার তূণ থেকে ভাগ্যপরীক্ষার তীর বের করল। তীর বলল, "আগে বাড়বে না।" কিন্তু ১০০ উটের লোভ সুরাকার বিবেককে অন্ধ করে দিয়েছিল। সে তীরের ইশারা অমান্য করে আবার ঘোড়ায় চড়ল এবং রাসুল (সা.)-এর দিকে এগোতে লাগল।
এবার সে এতটাই কাছে পৌঁছে গেল যে, রাসুল (সা.)-এর পবিত্র মুখ থেকে কোরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল। আবু বকর (রা.) বারবার পেছনে তাকিয়ে দেখছিলেন আর চিন্তিত হচ্ছিলেন, কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) ছিলেন সম্পূর্ণ শান্ত, পরম করুণাময়ের ওপর ভরসা রেখে তিনি অবিচলভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
সুরাকা যখনই তাঁর ওপর আক্রমণ করতে যাবে, ঠিক তখনই অলৌকিক ঘটনাটি ঘটল। আচমকা এক বিকট শব্দ হলো এবং **সুরাকার ঘোড়ার সামনের পা দুটি মরুভূমির শক্ত বালুর ভেতর হাঁটু পর্যন্ত দেবে গেল!** সুরাকা ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ল। ঘোড়াটি পা দুটো বালু থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করতেই সেই গর্ত থেকে ধোঁয়ার মতো ধূলিঝড় আকাশের দিকে উঠতে লাগল।
> সুরাকা বুঝতে পারল, এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। কোনো এক অদৃশ্য মহাশক্তি এই মহান মানবকে রক্ষা করছেন। তলোয়ার বা তীর দিয়ে এই মানুষকে স্পর্শ করা অসম্ভব।
>
## অভয়বাণী ও পারস্য সম্রাটের কঙ্কণ
ভয়ে সুরাকার শরীর কাঁপতে লাগল। সে চিৎকার করে বলল, "হে মোহাম্মদ! আমি বুঝতে পেরেছি এটা আপনারই দোয়া ও অলৌকিক ক্ষমতা। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আমার ঘোড়াটি মুক্ত হয়ে যায়। আমি কসম খাচ্ছি, আমি আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না, বরং পেছনের শত্রুদের বিভ্রান্ত করে ফিরিয়ে দেব।"
দয়ার সাগর রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। সাথে সাথে সুরাকার ঘোড়ার পা বালু থেকে মুক্ত হয়ে গেল। সুরাকা তখন রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে ক্ষমা চাইল এবং মক্কার কাফেরদের কুচক্রের নানা তথ্য দিল। বিদায় নেওয়ার সময় আল্লাহর রাসুল (সা.) সুরাকাকে একটি অবিশ্বাস্য ভবিষ্যৎবাণী করলেন। তিনি হাসিমুখে বললেন:
> "হে সুরাকা! কেমন হবে সেদিন, যেদিন তুমি পারস্য সম্রাট কিসরার (খসরু) সোনার কঙ্কণ (বালা) পরিধান করবে?"
>
সুরাকা অবাক হয়ে গেল! পারস্য তখন পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তি। আর মক্কা থেকে পালিয়ে যাওয়া একজন মানুষ বলছেন যে, একদিন পারস্য জয় হবে এবং সেই সম্রাটের সোনার অলঙ্কার পরবে এই সুরাকা! সুরাকা রাসুল (সা.)-এর কাছ থেকে একটি নিরাপত্তা সনদ লিখে নিয়ে মক্কার দিকে ফিরে গেল। এরপর পথে যার সাথেই দেখা হতো, সুরাকা বলত, "আমি এই পথ পুরো খুঁজে দেখেছি, এদিকে কেউ নেই।" ফলে শত্রুরা অন্য পথে চলে যায়।
## গল্পের শেষ পরিণতি
এই ঘটনার বহু বছর পর, মক্কা বিজয়ের পর সুরাকা ইবনে মালিক ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর, দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর আমলে মুসলমানদের হাতে পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ মালামাল যখন মদিনায় নিয়ে আসা হলো, তার মধ্যে পারস্য সম্রাট কিসরার সেই বিখ্যাত সোনার কঙ্কণ, মুকুট ও রাজকীয় পোশাকও ছিল। খলিফা ওমর (রা.) ভরা মজলিসে সুরাকা (রা.)-কে ডেকে পাঠালেন। তিনি সুরাকাকে সম্রাটের সেই রাজকীয় পোশাক ও সোনার কঙ্কণ পরিয়ে দিলেন।
উপস্থিত সাহাবিদের চোখে তখন অশ্রু। ১০০ উটের লোভে যে মানুষটি একদিন রাসুল (সা.)-কে ধরতে গিয়েছিল, আল্লাহর রাসুলের সেই ঐতিহাসিক ভবিষ্যৎবাণী সত্যি করে আজ সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্রাটের সোনার কঙ্কণ হাতে দাঁড়িয়ে আছে!
সাওর গুহার উদ্দেশ্যে যাত্রা
দারুন নাদওয়ার সেই কুখ্যাত চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) যখন হযরত আবু বকর (রা.)-কে সাথে নিয়ে মক্কার সীমানা পেরিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, তখন ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হলো আরেকটি রোমাঞ্চকর অধ্যায়।
মক্কার কাফেররা যখন দেখল তাদের এত নিখুঁত পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে এবং মুহাম্মাদ (সা.) অলৌকিকভাবে মক্কা থেকে বের হয়ে গেছেন, তখন তাদের ক্রোধের সীমা রইল না। তারা ঘোষণা করল:যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ বা আবু বকরকে জীবিত অথবা মৃত ধরে এনে দিতে পারবে, তাকে একশোটি লাল উট পুরস্কার দেওয়া হবে!
পুরস্কারের লোভে মক্কার সেরা ঘোড়সওয়ার এবং মরুভূমির পথপ্রদর্শকেরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এই চরম বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনা কীভাবে কাজ করেছিল, তা নিয়েই আজকের গল্প।
সাওর গুহার উদ্দেশ্যে যাত্রা
হিজরতের চেনা পথ ছিল মদিনার উত্তর দিকে। কিন্তু কাফেরদের বিভ্রান্ত করতে আল্লাহর রাসূল (সা.) এবং আবু বকর (রা.) দক্ষিণ দিকে রওনা হলেন। তিন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তারা এসে পৌঁছালেন দুর্গম 'সাওর' পর্বতের পাদদেশে।
পাহাড়টি ছিল অত্যন্ত খাড়া এবং পাথুরে। রাসূল (সা.)-এর জুতো ছিঁড়ে পা মোবারক ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল। প্রিয় নবীজির এই কষ্ট দেখে হযরত আবু বকর (রা.) ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন এবং সেই অবস্থাতেই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সাওর গুহার মুখে গিয়ে পৌঁছালেন।
### গুহার ভেতর আবু বকর (রা.)-এর আত্মত্যাগ
গুহার মুখে পৌঁছে আবু বকর (রা.) বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আপনি ভেতরে প্রবেশ করবেন না, আগে আমি ঢুকে এটি পরিষ্কার করি। যদি কোনো ক্ষতিকারক জীবজন্তু থাকে, তবে তা যেন আমাকে দংশন করে, আপনাকে নয়।"
আবু বকর (রা.) গুহার ভেতরে ঢুকলেন। চারিদিকের অন্ধকার আর আবর্জনার মধ্যে তিনি বেশ কিছু গর্ত দেখতে পেলেন, যেখানে বিষাক্ত সাপ বা বিচ্ছু থাকতে পারত। তিনি নিজের চাদরটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে একে একে সবকটি গর্ত বন্ধ করলেন। কিন্তু সবশেষে দুটি গর্ত বাকি রয়ে গেল, যা বন্ধ করার মতো আর কোনো কাপড় ছিল না।
তিনি নিজের পায়ের গোড়ালি দুটি সেই গর্ত দুটির ওপর চেপে ধরলেন এবং রাসূল (সা.)-কে ভেতরে আসার অনুরোধ করলেন। দীর্ঘ ক্লান্তির পর আল্লাহর রাসূল (সা.) আবু বকর (রা.)-এর কোলের ওপর মাথা রেখে গভীর ঘুমে মগ্ন হলেন।
ঠিক তখনই একটি গর্তের ভেতর থেকে একটি বিষাক্ত সাপ আবু বকর (রা.)-এর পায়ে দংশন করল। তীব্র বিষের যন্ত্রণায় তাঁর শরীর কেঁপে উঠল, কিন্তু তিনি এতটুকু নড়লেন না—পাছে রাসূল (সা.)-এর ঘুম ভেঙে যায়! তবে যন্ত্রণার তীব্রতায় তাঁর চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল রাসূল (সা.)-এর পবিত্র চেহারা মোবারকে।
রাসূল (সা.)-এর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "আবু বকর, কী হয়েছে তোমার?"
আবু বকর (রা.) বললেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে সাপে কেটেছে।"
আল্লাহর রাসূল (সা.) কালবিলম্ব না করে তাঁর পবিত্র মুখের লালা (উৎসৃষ্ট থুতু) ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন। অলৌকিকভাবে মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত বিষ ও যন্ত্রণা কর্পূরের মতো উড়ে গেল!
## গুহার মুখে শত্রুর পায়ের আওয়াজ
রাসূল (সা.) এবং আবু বকর (রা.) এই গুহায় টানা তিন দিন ও তিন রাত অবস্থান করেন। এদিকে মক্কার কাফেররা খুঁজতে খুঁজতে ঠিক সাওর গুহার প্রবেশদ্বারে এসে হাজির হলো। তাদের পায়ের শব্দ এবং কথাবার্তা গুহার ভেতর থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
শত্রুদের এত কাছে দেখে হযরত আবু বকর (রা.) অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়লেন। তবে তিনি নিজের জন্য ভয় পাননি, তিনি ভয় পাচ্ছিলেন ইসলামের শেষ আশার প্রদীপ—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুরক্ষার জন্য। তিনি ফিসফিস করে বললেন:
> "হে আল্লাহর রাসূল! তারা যদি কেউ নিজের পায়ের দিকে তাকায়, তবেই তো আমাদের দেখে ফেলবে!"
>
পৃথিবীর যেকোনো মানুষ এই পরিস্থিতিতে হয়তো ঘাবড়ে যেত, কিন্তু আল্লাহর ওপর যার অবিচল আস্থা, সেই পরম শান্ত কণ্ঠে রাসূল (সা.) উত্তর দিলেন:
> "লা তাহযান, ইন্নাল্লাহা মা'আনা—ভয় পেও না আবু বকর, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।"
>
তিনি আরও বললেন, "আবু বকর! তুমি সেই দুজনের ব্যাপারে কী ভাবছ, যাদের তৃতীয়জন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা?"
## আসমানি পাহারা এবং কাফেরদের ফিরে যাওয়া
কাফেররা যখন গুহার মুখে দাঁড়ানো, তখন সেখানে এক অবিশ্বাস্য অলৌকিক ঘটনা ঘটল। আল্লাহ তাআলার নির্দেশে মুহূর্তের মধ্যে এক জোড়া বুনো কবুতর গুহার প্রবেশদ্বারে বাসা তৈরি করে ডিম পেড়ে বসল। আর একটি মাকড়সা এসে গুহার মুখজুড়ে এক চমৎকার জালের বুনন তৈরি করে দিল।
কুরাইশদের প্রধান গোয়েন্দা এবং কাফেররা যখন গুহার মুখে একদম কাছে এল, তখন উমাইয়া ইবনে খালাফ বলল, "ভেতরে চলো, দেখে আসি।"
কিন্তু দলের অন্য একজন (কারো মতে আবু জাহেল বা অন্য কেউ) মাকড়সার জাল এবং কবুতরের বাসা দেখে বিরক্ত হয়ে বলল:
> "তুমি কি পাগল হয়েছ? এই মাকড়সার জাল তো মুহাম্মাদের জন্মের আগের তৈরি মনে হচ্ছে! আর ভেতরে মানুষ থাকলে এই বুনো কবুতর কি শান্তিতে ডিম নিয়ে বসে থাকত? তারা অন্য কোথাও গেছে, চলো এখান থেকে।"
>
মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অত্যাধুনিক তল্লাশি দল একটি মাকড়সার সুতোর জালের কাছে পরাজিত হলো! কাফেররা গুহার ঠিক মুখে দাঁড়িয়েও অন্ধের মতো ফিরে গেল। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবীবকে এভাবেই আসমানি পাহারায় রক্ষা করলেন।
## বিদায় সাওর, মদিনার পথে
তিন দিন পর যখন মক্কার কাফেরদের শোরগোল কিছুটা কমে এল, তখন পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত দুটি উট নিয়ে সাওর গুহার পাদদেশে এলেন।
হযরত আবু বকর (রা.) এবং আল্লাহর রাসূল (সা.) সাওর গুহা থেকে বের হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। এরপর তারা মদিনার উদ্দেশ্যে এক নতুন দিগন্তের দিকে রওনা হলেন, যেখানে আনসাররা অধীর আগ্রহে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।
সাওর গুহার এই ঘটনা প্রমাণ করে, চক্রান্তকারী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আল্লাহ যাকে রক্ষা করতে চান, তাকে পৃথিবীর কোনো শক্তি স্পর্শ করতে পারে না।
শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬
তুরাগের তীরে কান্না ভাসে
ঈদের রাত বারোটায় টঙ্গীর তুরাগ ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে রফিক প্রথম বুঝল, চামড়া আর পণ্য নয়, এখন বোঝা।
সে সিজনাল ব্যবসায়ী। সারা বছর রিকশার গ্যারেজে কাজ করে, কোরবানির তিন দিন আগে ধার করে নেমে পড়ে চামড়া কেনায়। এবার চল্লিশটা গরুর চামড়া কিনেছিল, গড়ে সাতশো টাকা করে। ভেবেছিল, সাভারের ট্যানারি অন্তত হাজার বারোশো দেবে। ঈদের দিন দুপুরে ভ্যান ভরে নিয়ে গেল আড়তে।
সন্ধ্যা পর্যন্ত দাম শুধু নামল। আড়তদার বলল, "দুইশো দেব, নিলে দাও।" পাশের আরেকজন বলল, "দেড়শো।" রফিক হিসাব কষল মনে — এক বস্তা লবণ ঈদের আগে ছয়শো ছিল, ঈদের দিন সাতশো হয়ে গেছে। একটা ছেলেকে খাটাতে তিন হাজার টাকা লাগে, ভ্যান ভাড়া আলাদা। চামড়া না বেচলে লবণ দেবে কোথা থেকে?
রাত দশটায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার টিএ রোডে যেমন বহু ব্যবসায়ী সারা রাত দাঁড়িয়ে থেকেও ক্রেতা পায়নি, টঙ্গীতেও একই দৃশ্য। রফিক দেখল, মাদ্রাসার দুই ছাত্র মাথায় করে সত্তরটা ছাগলের চামড়া এনেছে। সারা মহল্লা থেকে কোরবানির চামড়া তারা সংগ্রহ করে, সেই টাকায় এতিমখানার তিন মাসের চাল কেনা হয়। মাদ্রাসার সুপার মাওলানা ইদ্রিস সাহেব ফোনে ফোনে ঘুরছেন, কোনো আড়ত ফোন ধরছে না।
রাত একটায় আড়তদাররা একসাথে দাম নামিয়ে দিল। ব্যবসায়ীরা বলাবলি করছিল, এটা ইচ্ছা করেই করা হচ্ছে, যাতে তারা বাধ্য হয়ে ফেলে দেয়। রফিকের পাশে এক ছেলে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "পাঁচশো টাকায় কেনা চামড়া দুইশোতেও নিচ্ছে না।"
সাভারে সকাল আটটার মধ্যে দুই লাখ বিশ হাজারের বেশি চামড়া পৌঁছেছে, কিন্তু বিক্রেতারা সবাই বলছে দাম প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। সেই খবর শুনে রফিক বুঝল, বড়দের মাল গেছে, ছোটদেরটা আর নেবে না।
দুইটার দিকে মাওলানা ইদ্রিস এসে রফিকের ভ্যানের পাশে বসলেন। বললেন, "চামড়া পচে গেলে গুনাহ হবে, এলাকায় দুর্গন্ধ হবে। কী করি?" রফিক কোনো উত্তর দিল না। তারা দুজন মিলে ভ্যান ঠেলে নিয়ে গেল ব্রিজের ঢালে।
তুরাগ তখন ভাটা। পানিতে আগের দিনের কোরবানির রক্তের হালকা লালচে দাগ। প্রথমে একটা, তারপর দশটা, তারপর পুরো চল্লিশটা চামড়া রফিক নদীতে ফেলে দিল। মাদ্রাসার ছেলেরা তাদের বস্তাগুলো রাস্তার পাশে রেখে দিল, কারণ নদী পর্যন্ত নেওয়ার শক্তিও আর ছিল না। সকালে সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি এসে সেই পচা স্তূপ তুলবে, যেমন চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীরা রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল।
মাওলানা ইদ্রিস পানির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "আমরা ভাবতাম চামড়া বিক্রি মানে এতিমের মুখে ভাত। আজ দেখলাম, চামড়া বিক্রি মানে লবণের দামের কাছে হেরে যাওয়া।"
রফিক বাড়ি ফেরার পথে ভাবছিল না লাভ-লোকসানের কথা। ভাবছিল, যে চামড়ায় একদিন জায়নামাজ হতো, বইয়ের মলাট হতো, সেই চামড়া আজ নদীতে ভাসছে প্লাস্টিকের বোতলের মতো। ঈদের তাকবির তখনও মাইকে বাজছে দূরে, কিন্তু তার ভ্যান খালি, পকেটে ধারের হিসাব, আর তুরাগের বুকে ভেসে যাচ্ছে চল্লিশটা অসমাপ্ত নিয়ত।
ভোরের আলোয় একটা ছোট ছেলে ব্রিজের নিচে নেমে একটা ভেজা ছাগলের চামড়া তুলে নিল। রফিক জিজ্ঞেস করল, "কী করবি?" ছেলেটা হাসল, "আম্মা বলছে, শুকাইলে পাপোশ বানাবে।"
সেই একটুকরো ব্যবহারের আশায় রফিকের বুকটা একটু হালকা হলো। সব চামড়া নদী নেয়নি, কিছু এখনো মানুষের হাতে ফিরছে। 0d7c742b51958822
ধর্ম ও বিবেক : ইসলামী দৃষ্টিকোণ
ভূমিকা
ধর্ম হলো জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত একটি নির্দিষ্ট ধারণা, বোধ বা বিশ্বাস (অথবা অবিশ্বাস), যা কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর কর্ম ও জীবন পদ্ধতির ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। এর মাধ্যমেই একটি নির্দিষ্ট নীতি, আদর্শ, মূল্যবোধ, অনুশীলন ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি গড়ে ওঠে। জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত এই নির্দিষ্ট ধারণা সাধারণত ঐশ্বরিক বা অতীন্দ্রিয় বিষয়কেন্দ্রিক মনে করা হলেও, এটি সেক্যুলার বা জাগতিক বোধ-বিশ্বাসভিত্তিকও হতে পারে। অর্থাৎ, ধর্ম যেমন ঐশ্বরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে হতে পারে, তেমনি অবিশ্বাসের ভিত্তিতেও হওয়া সম্ভব। এ কারণে সেক্যুলার মতাদর্শকেও এক ধরনের ধর্ম বা জীবনদর্শন বলা যেতে পারে।
অন্যদিকে, বিবেক হলো মানুষের মতাদর্শ বা মূল্যবোধের সংরক্ষক, যা ব্যক্তির কর্ম বা জীবনাচারকে তার আদর্শ, নীতি ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে ভালো বা মন্দ বলে বিচার করে। সুতরাং ধর্ম এবং বিবেক দুটি স্বতন্ত্র ধারণা হলেও পরস্পর সম্পর্কিত ও সম্পূরক; একটিকে ছাড়া অন্যটি অচল। বিবেক মানুষকে তার সর্বজনীন মূল্যবোধের ভিত্তিতে কর্মের ভালো-মন্দ বিচার করার সক্ষমতা দেয়। সাধারণত বলা হয় বিবেক সর্বজনীন, তবে তা একান্তই নির্ভর করে ব্যক্তির মতাদর্শ বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর। মানুষের মতাদর্শ বা ধর্ম যে মাত্রায় সর্বজনীন মূল্যবোধ তৈরি করতে পারে, বিবেকও ঠিক সেই মাত্রায় সর্বজনীন মানবিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম। অর্থাৎ, বিবেক সর্বদা মতাদর্শ বা ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত ও জাগ্রত হয়।
ধর্ম ও বিবেক উভয়ই মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে সুরক্ষিত, যার মধ্যে (ধর্মীয় বা ধর্মনিরপেক্ষ যাই হোক না কেন) বিশ্বাস ধারণ এবং তা প্রকাশ করার স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত। এই অধিকার ব্যক্তিকে তার বিশ্বাস বেছে নিতে, তা অনুশীলন করতে এবং গভীরতম বিশ্বাস অনুসারে কাজ করতে অনুমোদন দেয়। তবে জননিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অন্যের অধিকার রক্ষার প্রয়োজনে এই স্বাধীনতা আইনগতভাবে সীমাবদ্ধ হতে পারে।
## ধর্ম
ধর্ম বা 'Religion' বলতে সাধারণত অতিপ্রাকৃত বিষয়, স্রষ্টা বা ঐশ্বরিক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাস, নৈতিক মূল্যবোধ, বিধি-বিধান, প্রথা এবং এসবের অনুশীলনকে বোঝায়। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে ধর্ম মানুষকে এমন এক বিশেষ জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা সাধারণ অবস্থায় মানুষের বস্তুগত জ্ঞান বা বোধগম্যতার অতীত। ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল বিষয়সমূহ মানুষের জাগতিক বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান দ্বারা স্পর্শ করা যায় না। এক অপার্থিব ও অদৃশ্য জগতের সংবাদ বা জ্ঞানের ওপরই ধর্মের মূল ভিত্তি স্থাপিত। বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে একে আপাত অতিপ্রাকৃত এবং যুক্তির অতীত মনে হতে পারে; তাই তর্কের চেয়ে এখানে বিশ্বাস বা 'Faith' বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ইংরেজিতে ধর্মকে অনেক সময় *Faith* বা *Belief System* বলা হয়। বিশ্বকোষে (Encyclopedia) এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে:
> "Religion—sometimes used interchangeably with faith or belief system—is commonly defined as belief concerning the supernatural, sacred, or divine, and the moral codes, practices, values, institutions and rituals associated with such belief."
>
অতিপ্রাকৃত বা অদৃশ্য যাই বলা হোক না কেন, বিশ্বব্যবস্থার অনেক অপরিহার্য নিয়মের মতোই ধর্ম সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে মানুষের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে আসছে। আধুনিক কালে ধর্ম নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বহু বিতর্ক হলেও মানুষ এর প্রভাব, আবেদন ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হতে পারছে না; বরং দিন যতই যাচ্ছে, ধর্মের প্রয়োজনীয়তা ও আবেদন মানুষের জীবনে আরও অনিবার্য হয়ে উঠছে।
## ধর্ম ও দ্বীন
বাংলা ভাষায় আমরা যাকে 'ধর্ম' বলছি, আল-কোরআনের পরিভাষায় তাকে বলা হয়েছে 'দ্বীন'। বাংলা 'ধর্ম' শব্দের অভিধানিক অর্থ শাস্ত্রনির্দিষ্ট বিধি-বিধান, সৎ বা পুণ্যকর্ম, ন্যায়-অন্যায় বা পাপ-পুণ্যের বিচারকর্তা, বিশ্ববিধাতা, মনুষ্যত্ব, কর্তব্য-অকর্তব্য এবং আইন-রীতি।
আরবি ভাষায় আভিধানিকভাবে 'দ্বীন' শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন:
* **শক্তি ও ক্ষমতা:** শাসন, কর্তৃত্ব এবং অপরকে আনুগত্যে বাধ্য করা।
* **দাসত্ব ও আনুগত্য:** সেবা, কারো নিকট বশীভূত হওয়া এবং নির্দেশাধীন কাজ করা। (আরবিতে আনুগত্যপরায়ণ জাতিকে 'কওমুন দাইয়্যেনুন' বলা হয়)।
* **শরিয়ত ও আইন:** পথ-পন্থা, মিল্লাত, রসম-প্রথা বা জীবনপদ্ধতি।
* **কর্মফল ও প্রতিদান:** বিনিময়, ফয়সালা, হিসাব-নিকাশ এবং বিচার।
আল-কোরআনে 'দ্বীন' শব্দটি একটি মৌলিক ও অত্যন্ত ব্যাপক পরিভাষা হিসেবে বিকশিত হয়েছে। কোরআনে এর প্রধানত চার ধরনের ব্যবহার দেখা যায়:
1. স্রষ্টার সর্বোচ্চ, সার্বিক ও সার্বভৌম ক্ষমতার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও আধিপত্য অর্থে।
2. আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার সামনে মাথা নত করা, তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য প্রকাশ অর্থে।
3. আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাঁর নিকট আত্মসমর্পণের ভিত্তিতে গঠিত জীবনবোধ ও জীবনবিধান (আল্লাহর আইন ও বিধান) অর্থে।
4. বিচার, প্রতিফল, পুরস্কার, শাস্তি এবং চূড়ান্ত ফয়সালা অর্থে। *(উৎস: ইসলামের চারটি মৌলিক পরিভাষা, আধুনিক প্রকাশনী)*
সামষ্টিকভাবে আল-কোরআনের পরিভাষায় 'দ্বীন' বলতে একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান বা আল্লাহর আনুগত্যের সার্বিক ব্যবস্থা 'ইসলাম'-কে বোঝায়। কোরআনের পাতায় পাতায় দ্বীন সম্পর্কে যত আলোচনা এসেছে, তার মূলে রয়েছে আল্লাহর সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের ঘোষণা। মানুষকে আহ্বান জানানো হয়েছে আল্লাহর সামনে সম্পূর্ণভাবে আনুগত্যের মস্তক অবনত করতে, কারণ এটিই একমাত্র সঠিক জীবনপথ, যাতে রয়েছে মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন শান্তি ও সফলতা।
এ প্রসঙ্গে আল-কোরআনের কিছু অমিয় বাণী উল্লেখ করা যায়:
> "তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমাদের জন্য জমিনকে বাসস্থান এবং আসমানকে ছাদস্বরূপ করেছেন। তিনি তোমাদের আকৃতি দান করেছেন এবং তা সুষম করেছেন। তিনি পবিত্র বস্তু থেকে তোমাদের রিজিক সরবরাহ করেছেন। সেই আল্লাহই তোমাদের প্রভু—বিশ্বজগতের প্রতিপালক, মহান মর্যাদা ও সমৃদ্ধির মালিক। তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ছাড়া আর কোনো যথার্থ হুকুমকর্তা ও বিধানদাতা নেই। সুতরাং দ্বীনকে (আনুগত্য বা জীবন-ব্যবস্থাকে) একান্তভাবে তাঁর জন্য নিবেদিত করে তোমরা কেবলমাত্র তাঁকেই ডাকো। সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।" (সূরা আল-মুমিন: ৬৪-৬৫)
>
> "বলো, দ্বীনকে একান্তভাবে তাঁর জন্য নির্দিষ্ট করে শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি। সর্ব প্রথম আমাকেই আনুগত্যের মস্তক অবনত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে... বলো, আমার দ্বীনকে আল্লাহর জন্য একান্তভাবে নির্দিষ্ট করে আমি শুধু তাঁরই আনুগত্য-দাসত্ব করব। তোমরা অবশ্য তাকে পরিত্যাগ করে যাকে ইচ্ছা তার গোলামী করতে পারো... (তবে) যারা তাগুতের (অবাধ্য ও সীমালঙ্ঘনকারী) দাসত্ব ত্যাগ করে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ।" (সূরা আজ-জুমার: ১১-১৭)
>
> "আমরা তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং আল্লাহর জন্য দ্বীনকে খাঁটি করে কেবল তাঁরই ইবাদত করো। জেনে রেখো, একনিষ্ঠ দ্বীন কেবল আল্লাহরই জন্য নিবেদিত।" (সূরা আজ-জুমার: ২-৩)
>
> "আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সব তাঁরই এবং আনুগত্য চিরকাল তাঁরই প্রাপ্য। তবুও কি তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করবে?" (সূরা আন-নাহল: ৫২)
>
> "তারা কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন তালাশ করে? অথচ আসমান ও জমিনের প্রতিটি বস্তু ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, আল্লাহরই নির্দেশ মেনে চলছে। আর তাঁরই কাছে সবাইকে ফিরে যেতে হবে।" (সূরা আলে ইমরান: ৮৩)
>
> "বিধান দেওয়ার কর্তৃত্ব আল্লাহ ছাড়া আর কারো নয়। তাঁর নির্দেশ—তিনি ব্যতীত তোমরা আর কারো আনুগত্য বা দাসত্ব করো না। এটাই সত্য-সঠিক দ্বীন।" (সূরা ইউসুফ: ৪০)
>
> "তাদের এছাড়া অন্য কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।" (সূরা আল-বায়্যিনাহ: ৫)
>
একইভাবে, দ্বীন বলতে কোরআনের নির্দিষ্ট আইনি বিধি-বিধানকেও বোঝানো হয়েছে। যেমন:
> "ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী—উভয়কে একশত চাবুক মারো। আল্লাহর দ্বীনের (বিধানের) ব্যাপারে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের প্রভাবিত না করে।" (সূরা আন-নূর: ২)
>
> "তারা কি (আল্লাহর সাথে) এমন কিছু অংশীদার সাব্যস্ত করেছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন আইন রচনা করেছে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?" (সূরা আশ-শূরা: ২১)
>
পবিত্র কোরআনের ভাষায় দ্বীনকে 'হেদায়াত' বা পথনির্দেশ হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে। মানবজাতির সার্বিক কল্যাণের জন্য যুগে যুগে আম্বিয়া কেরাম ও আসমানি কিতাবের মাধ্যমে যেসব বিধান পাঠানো হয়েছে, তা-ই দ্বীন বা হেদায়াত। আল্লাহ প্রদত্ত সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর মাধ্যমে প্রেরিত সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থ আল-কোরআন। ইসলাম ধর্ম বলতে মূলত আল-কোরআনের পথনির্দেশ ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শকেই বোঝায়।
## বিবেক
সাধারণভাবে বিবেক বলতে মানুষের সেই আত্মিক সত্তা, নৈতিক শক্তি বা অনুভূতিকে বোঝায়, যা ব্যক্তিকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ ভালো বা মন্দ বলে বিশ্বাস করতে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে প্ররোচিত করে বা বাধা দেয়। উইকিপিডিয়ায় বিবেকের (Conscience) সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
> "Conscience is generally thought of as a moral faculty, sense or feeling that impels individuals to believe that particular activities are morally right or wrong."
>
১৯১৩ সালের 'Webster Dictionary'-তে আধুনিক ধারণায় বিবেকের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে:
> "বিবেক হচ্ছে একটি নৈতিক ধারণা, একটি নৈতিক শক্তি বা ক্ষমতা, অথবা মানুষের অভ্যন্তরীণ মুখ্য সত্তা; যা তার নিজস্ব কর্মধারার চরিত্র ও কাজের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে, তাকে সমর্থন বা সতর্ক করে, মন্দ কাজের জন্য তিরস্কার করে এবং ভালো কাজের অনুমোদন ও উৎসাহ জোগায়।"
>
বিবেক হলো এমন এক নৈতিক শক্তি, যা মানুষকে আত্মবিচারে অভ্যস্ত করে। বস্তুত, মানুষের স্বভাবের মধ্যে ভালো ও মন্দের পার্থক্য বোঝার একটি স্বাভাবিক বোধ প্রকৃতিগত ও সহজাতভাবেই বিদ্যমান। এই সুপ্রবৃত্তিকেই আমরা বিবেক বলি, যা সবসময় মানুষের সৎবৃত্তির বিকাশ কামনা করে। একে নীতিবোধ বা চৈতন্যও বলা হয়; ইসলাম এরই নাম দিয়েছে 'কালব' বা অন্তর।
### মানব প্রকৃতিতে বিবেক
বিবেক মানুষের একটি জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া, যা নৈতিক দর্শন ও মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এটি আবেগ এবং যুক্তিসঙ্গত চিন্তাভাবনার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। বিবেককে মানুষের আদর্শ ও মূল্যবোধের সংরক্ষক বলা যায়। একটি সচল বিবেক মানুষকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে এবং সমাজের নৈতিক মান উন্নত করতে সহায়তা করে। সমাজে যখন নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়, তখন বিবেকের আহ্বানে সাড়া দিয়েই মানুষ শান্তি, ন্যায়বিচার ও সামাজিক কল্যাণের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত হয়।
## ধর্ম ও বিবেকের সম্পর্ক
বিবেকের সাথে ধর্মের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। মানুষের বিশ্বাস ও জীবনবোধই তার বিবেককে দিকনির্দেশনা দেয়; অর্থাৎ বিবেক দাঁড়িয়ে থাকে বিশ্বাসের ভিত্তির ওপর। বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণে বিবেক বিভিন্ন ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে। যেমন, একজন ব্যক্তি স্বদেশের পক্ষে যুদ্ধে যাওয়াকে নৈতিক কর্তব্য মনে করতে পারেন, আবার অন্য একজন যেকোনো পরিস্থিতিতে যুদ্ধ পরিহার করাকেই তার নৈতিক দায়িত্ব মনে করতে পারেন। যেমনটি বলা হয়েছে:
> "Conscience can prompt different people in quite different directions, depending on their beliefs."
>
অনেক চার্চ বা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেন, আবার অনেকে প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশ পালনকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। কখনো কখনো বিবেক মানুষের মনে এই নৈতিক দ্বিধাও জাগিয়ে তুলতে পারে যে—সে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামরিক কর্তৃপক্ষ বা রাজনৈতিক নেতার আনুগত্য করবে, নাকি নিজের অন্তরের ডাক শুনবে।
এই পর্যায়ে এসে অনেকে ধর্ম ও বিবেকের মধ্যে এক কাল্পনিক বিরোধ আবিষ্কার করে বসেন। তারা মনে করেন ধর্মের কোনো প্রয়োজন নেই, মানুষের বিবেকই তার জন্য যথেষ্ট। এমনকি অনেক বুদ্ধিজীবী বিবেকের দোহাই দিয়ে ধর্মের বিরোধিতাও করেন। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, মানুষের বিবেক তার লালিত বিশ্বাস বা জীবনবোধেরই সমর্থন করে মাত্র।
একজন সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী আর একজন ইসলামী চিন্তাবিদ জীবন ও জগৎ সম্পর্কে এক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন না। যিনি পরকালে বিশ্বাস করেন না, তিনি মনে করেন এই জগতের কোনো স্রষ্টা নেই, দৃশ্যমান জীবনের বাইরে মানুষের আর কোনো অস্তিত্ব নেই এবং স্রষ্টার নির্দেশ মানা বা জবাবদিহিতার কোনো প্রশ্নই আসে না। ফলে তাঁর কাছে ধর্মের অনুশাসন অর্থহীন মনে হতেই পারে।
অন্যদিকে, যিনি বিশ্বাস করেন এই ক্ষণস্থায়ী জীবনই শেষ নয়, বরং এর বাইরেও এক অসীম ও চিরস্থায়ী আখেরাত অপেক্ষা করছে এবং এই মহাবিশ্বের একজন মহান সৃষ্টিকর্তা আছেন যিনি মানুষকে তাঁর 'খলিফা' বা প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছেন—তাঁর জীবনদর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি জানেন, ইহজীবনের সকল কাজের হিসাব স্রষ্টার কাছে দিতে হবে এবং সেই জবাবদিহিতাই মানুষের চূড়ান্ত সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করবে।
এই জীবনবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণেই একজন সেক্যুলার মানুষের কাছে ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘন করা বিবেকহীন কাজ মনে নাও হতে পারে। কিন্তু একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান যখন কোনো ধর্মীয় অনুশাসন পালনে ব্যর্থ হন, তখন তাঁর বিবেক তীব্র দংশন অনুভব করে।
বস্তুত, জীবনদৃষ্টিই মানুষের সমস্ত কাজের নিয়ন্ত্রক—তিনি আস্তিক হোন কিংবা নাস্তিক। দুনিয়াতে যত মত ও পথের মানুষ আছে, সবারই জগৎ সম্পর্কে একটি নিজস্ব ধারণা থাকে এবং প্রত্যেকেই তার নিজের মতকে সঠিক মনে করে। মানুষের বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে এবং বিবেক সবসময় সেই বিশ্বাসের অনুসারী হয়। যারা ধর্ম বিশ্বাস করেন না, তারাও মূলত 'সেক্যুলার জীবনদর্শন' নামক একটি বিশ্বাসকেই ধারণ করেন, যা তাদের মনের মণিকোঠায় আদর্শ হিসেবে কাজ করে। সেই আদর্শের পরিপন্থী কিছু করলে তাদের বিবেকও তাদের তিরস্কার করে।
সুতরাং, বিবেক আসলে মানুষের স্বাধীন বা স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো সত্তা নয়, বরং সে বিশ্বাসের অধীন এবং তার প্রতিনিধি বা পাহারাদার। মানুষের মূল চালিকাশক্তি হলো তার জীবনবোধ ও বিশ্বাস, যাকে ইসলামের পরিভাষায় আমরা 'ঈমান' বা 'প্রত্যয়' বলি। বিবেক হলো এই ঈমানের বডিগার্ড বা সম্পূরক শক্তি মাত্র। জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত মানুষের বিশ্বাস যদি সঠিক ঐশী জ্ঞানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, তবেই তার জীবন সুন্দর ও সুসংহত হয়। অন্যথায় বিভ্রান্ত ও বিক্ষিপ্ত বোধ মানুষকে কখনো প্রকৃত শান্তি এনে দিতে পারে না।
### বিবেক: বোধ ও বিশ্বাসের বন্ধু, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়
মানুষ চলার পথে প্রধানত দুটি শক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়—একটি তার ধর্ম বা বিশ্বাস এবং অন্যটি তার বিবেক। মানুষ যখন তার বিশ্বাসের অনুকূলে কাজ করে তখন বিবেক স্বস্তি পায়, আর বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গেলে বিবেক দংশন করে। কাজেই বিবেক কখনো বিশ্বাসের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অন্ধ সমর্থক বা পরম বন্ধু। জীবন পরিচালনায় বোধ ও বিবেক পরস্পরের সহযোগী ও সম্পূরক।
### বিবেকের প্রতিদ্বন্দ্বী কুপ্রবৃত্তি, ধর্ম নয়
বিবেকের প্রকৃত শত্রু ধর্ম নয়, বরং মানুষের 'কুপ্রবৃত্তি'। একে পশুবৃত্তি, জৈববৃত্তি বা 'নফস' বলা হয়। মানুষের প্রকৃতিতে সুপ্রবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তি দুটিই সহজাত। সুপ্রবৃত্তি যেমন মানুষকে সুনীতি, সৎকর্ম ও আধ্যাত্মিকতার দিকে নিয়ে যায়; কুপ্রবৃত্তি তেমনি দুর্নীতি, দুষ্কর্ম ও ইতরতার দিকে আকৃষ্ট করে। মানব প্রকৃতিতে এই দুই বৃত্তির লড়াই চিরন্তন, আর এই লড়াইয়ে ধর্ম সবসময় বিবেকের পক্ষাবলম্বন করে কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে বিবেককে শাণিত করে তোলে।
ধর্ম মানুষকে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভে উদ্বুদ্ধ করে প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়। ফলে সংকীর্ণ স্বার্থপরতা, লোভ ও ভোগবাদ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। কিন্তু যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না এবং পার্থিব ভোগ-বিলাসকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে করে, তারা কুপ্রবৃত্তির গোলামে পরিণত হয়। বৈধ-অবৈধ উপায়ে সম্পদের পাহাড় গড়া, দস্যুতা ও স্বার্থপরতাই তখন তাদের স্বভাব হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তাদের বিবেক নফসের কাছে পরাস্ত হয়ে একপর্যায়ে মরে যায়।
মনীষীরা বলেন, মানুষের দুটি সত্তা—দেহসত্তা ও নৈতিক সত্তা। নফস বা কুপ্রবৃত্তি মানুষের দেহসত্তার প্রতিনিধিত্ব করে, যা হালাল-হারাম বিচার না করে কেবল জৈবিক চাহিদা ও আরাম-আয়েশ খোঁজে। অন্যদিকে, মানুষের রূহ বা বিবেক এসেছে সরাসরি স্রষ্টার কাছ থেকে। হযরত আদম (আ.)-এর মাটির শরীরে যখন সৃষ্টিকর্তা রূহ ফুঁকে দিলেন, তখনই তিনি সচল মানুষে পরিণত হলেন। তাই মাটির শরীর বস্তুবাদের দিকে ধাবিত হতে চাইলেও, রূহ বা বিবেক সবসময় আধ্যাত্মিকতা ও ধর্মের দিকে যেতে চায়। সুতরাং ধর্ম কখনো বিবেকের প্রতিপক্ষ নয়, বরং অধর্ম ও নীতিহীনতাই বিবেকের আসল প্রতিপক্ষ।
## ধর্ম ও বিবেকের পার্থক্য
ধর্ম ও বিবেকের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বিবেক মানুষের প্রকৃতিতে জন্মগত ও সহজাত, কিন্তু ধর্ম সহজাত নয়; ধর্ম হলো অর্জনসাপেক্ষ একটি বিশিষ্ট জ্ঞান ও বিশ্বাস। মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট জীবনবোধ নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয় না, বরং জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা থেকে তা তৈরি হয়।
অবশ্য মানুষের বিবেক স্বভাবগতভাবেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকৃষ্ট হয়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ইসলামকে 'স্বভাবধর্ম' বা 'ফিতরাতের ধর্ম' বলা হয়েছে, কারণ ইসলামের বিধি-বিধান মানুষের মূল প্রকৃতির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে একটি মধ্যপন্থী জাতি (ওয়াসাত) হিসেবে অভিহিত করেছেন। তা সত্ত্বেও, বিবেক মানুষ জন্মগতভাবে পেলেও, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে সঠিক ঐশী জ্ঞান বা ধর্মবোধ মানুষ জন্মগতভাবে নিজে নিজে লাভ করতে পারে না। এ কারণে যারা বলেন, "ধর্মের প্রয়োজন নেই, বিবেকই যথেষ্ট"—তাদের এই চটকদার বক্তব্যের মূলে কোনো দূরদর্শিতা নেই।
## বিবেক সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
মানব প্রকৃতিতে পাপ ও পুণ্যবোধ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। মহান রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেছেন:
> "কসম মানুষের নফসের (প্রবৃত্তির) এবং কসম সেই সত্তার, যিনি একে যথাযথভাবে গঠন করেছেন। অতঃপর তার ওপর তার পাপ ও পুণ্যবোধ ইলহাম (অনুপ্রেরণা) করেছেন।" (সূরা আস-শামস: ৭-৮)
>
এই বিষয়টি আরও ব্যাখ্যা করে মহানবী (সা.) বলেছেন:
> "যে কাজে তোমার মন স্থিতি লাভ করে এবং তোমার আত্মা স্বস্তি পায়, তা-ই পুণ্য। আর যে কাজে তোমার মন শান্তি পায় না এবং তোমার আত্মা বা বিবেক খটকা অনুভব করে, তা-ই পাপ।"
>
আল-কোরআনে মানুষের নফসের তিনটি রূপের কথা বলা হয়েছে:
1. **নফসে আম্মারা:** যা মানুষকে সবসময় অন্যায় ও দুষ্কৃতির দিকে উস্কানি দেয়।
2. **নফসে লাউয়ামা:** যা কোনো ভুল বা অন্যায় কাজ করলে মানুষকে লজ্জিত, অনুতপ্ত ও ভেতর থেকে তিরস্কার করে। একেই আমরা 'বিবেক' বলতে পারি।
3. **নফসে মুতমায়িন্না:** যা সত্য ও সঠিক পথে চলার মাধ্যমে অন্তরে পরম প্রশান্তি ও নিশ্চয়তা অনুভব করে।
ইসলামী পরিভাষায় 'ইলহাম' হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে অবচেতনে মানুষের মনে নামিয়ে দেওয়া কোনো পুণ্যময় ভাবনা বা বোধ। মানুষের মধ্যে পাপ ও পুণ্যের এই সহজাত বোধ বা নৈতিক মানদণ্ড আল্লাহ সৃষ্টিগতভাবেই রেখে দিয়েছেন, যা প্রতিটি মানুষ কম-বেশি অনুভব করতে পারে।
## বিবেক ও বোধের বিকাশে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা
### ১. জীবনবোধের পূর্ণতায়
ঐশী পথনির্দেশ বা হেদায়াত এমন এক বিশেষ জ্ঞান, যা মানুষ নিজের বুদ্ধি দিয়ে লাভ করতে পারে না। এই জ্ঞানের উৎস মানুষের সাধারণ বোধগম্যতার অতীত। অথচ এই জ্ঞান মানবসত্তার অস্তিত্বের তাৎপর্য বোঝার জন্য অপরিহার্য। তাওহীদের শিক্ষা, পরকাল, হাশর, জান্নাত-জাহান্নামের মতো বিষয়গুলো পরীক্ষাগারে প্রমাণ করা সম্ভব নয়, অথচ এগুলোর ওপর বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের ভিত্তিতেই মানুষের নৈতিক জীবন ও সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। এই পরম জ্ঞান আল্লাহ আমাদের না জানালে মানুষের জীবনবোধ চিরকাল অপূর্ণ থেকে যেত। কোরআন নাজিলের শুরুতেই আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
> "পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ো, আর তোমার রব পরম দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন এমন জ্ঞান, যা সে জানত না।" (সূরা আল-আলাক: ১-৫)
>
কোরআনে আরও বলা হয়েছে:
> "আর যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তঃকরণ—এদের প্রতিটির ব্যাপারে জওয়াবদিহি করতে হবে।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ৩৬)
>
> "আর হে বিবেকসম্পন্নরা! কিসাসের (ন্যায়বিচারের) মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো।" (সূরা আল-বাকারা: ১৭৯)
>
### ২. সব সৃষ্টিকে আল্লাহর পথপ্রদর্শন
আল্লাহ তাআলা শুধু বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তাই নন, তিনি সবার প্রতিপালক ও পথপ্রদর্শক। তিনি তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে তাদের স্বরূপ ও মর্যাদা অনুযায়ী স্বভাবজাত জ্ঞান (ইলহাম) দান করেছেন। যেমন সূরা ত্ব-হা-য় বলা হয়েছে:
> "মুসা বলল, আমাদের রব তিনি, যিনি প্রত্যেক জিনিসকে তার উপযুক্ত আকৃতি প্রদান করেছেন, অতঃপর তাকে পথনির্দেশ করেছেন।" (সূরা ত্ব-হা: ৫০)
>
এই জন্মগত গাইডলাইনের কারণেই মানবেতর প্রাণীকে আলাদা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হয় না। মাছ নিজে নিজেই সাঁতার কাটে, পাখি উড়তে পারে, আর মৌমাছি বা বাবুই পাখি কোনো প্রকৌশল বিদ্যা ছাড়াই চমৎকার মৌচাক ও বাসা তৈরি করে।
মানুষকেও বিভিন্ন পর্যায়ে এই বিশেষ প্রাকৃতিক জ্ঞান দেওয়া হয়েছে। যেমন, মানবশিশু জন্মের পরপরই কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই মায়ের দুধ চুষতে শুরু করে। আবার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী হিসেবে আল্লাহ মানুষকে সভ্যতার শুরু থেকেই প্রতিনিয়ত উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের মানসিক সক্ষমতা দিয়ে চলছেন, যার ফলে মানব সভ্যতার এই ধারাবাহিক বিকাশ সম্ভব হয়েছে।
## ধর্ম মানুষকে মহীয়ান করে
বস্তুবাদী বা সেক্যুলার শিক্ষা-দর্শন মানুষকে নিছক একটি উন্নত বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী মনে করে। ডারউইনের অনুসারীরা মনে করেন মানুষ বিবর্তনের মাধ্যমে বানর থেকে এসেছে। এই তত্ত্ব মানুষকে কোনো উচ্চতর মর্যাদা বা মহৎ জীবনের উদ্দেশ্য প্রদান করে না। ধর্মকে বাদ দিলে আমাদের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিতে মানুষকে পশুর চেয়ে খুব বেশি উন্নত ভাবা কঠিন।
প্রকৃতপক্ষে, ধর্মই মানুষকে মহিমান্বিত করে তুলেছে। ইসলাম মানুষকে সমস্ত সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব বা 'আশরাফুল মাখলুকাত'-এর মর্যাদা দিয়েছে এবং তাকে পৃথিবীতে আল্লাহর 'খলিফা' বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছে। এই বিশাল মহাবিশ্বের সবকিছু আল্লাহ মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে:
> "সেই মহান আল্লাহই তোমাদের পৃথিবীতে তাঁর খলিফা নিযুক্ত করেছেন।" (সূরা আল-আনআম: ১৬৫)
>
> "তোমরা কি দেখতে পাও না, পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার সবই আল্লাহ তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন?" (সূরা আল-হজ্জ: ৬৫)
>
> "আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সব তিনি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য আয়ত্তাধীন করে দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এর মধ্যে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।" (সূরা আল-জাসিয়াহ: ১৩)
>
আল্লাহ নির্ধারিত এই অনন্য পরিচয়ের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বিশ্বমানবতার প্রকৃত ইজ্জত, শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা। মানুষকে এই গুরুদায়িত্ব পালনের উপযোগী করেই তৈরি করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
> "আল্লাহ, যিনি তোমাদের জন্য জমিনকে স্থিতিশীল করেছেন এবং আসমানকে করেছেন ছাদ। আর তিনি তোমাদের আকৃতি দিয়েছেন, অতঃপর তোমাদের আকৃতিকে সুন্দর করেছেন এবং পবিত্র বস্তু থেকে রিজিক দান করেছেন। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব।" (সূরা আল-মুমিন: ৬৪)
>
মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্বের কারণেই তাকে সুন্দরতম শারীরিক অবয়ব দেওয়া হয়েছে। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, *“আমি তো মানুষকে সুন্দরতম গঠনে সৃষ্টি করেছি।”* (সূরা আত-তীন: ৪)। পাশাপাশি তাকে দেওয়া হয়েছে এমন এক উন্নত মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিবৃত্তি, যা অন্য কোনো প্রাণীর নেই; যার মাধ্যমে সে জটিল চিন্তা, বিশ্লেষণ ও প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
পশু সমাজে শিক্ষার কোনো প্রচলন বা প্রয়োজন নেই, কারণ তারা জন্মগত পশুত্ব নিয়েই বাঁচে। মানুষের মধ্যেও একটি পাশবিক সত্তা রয়েছে, যা বিনা পরিশ্রমে অর্জন করা যায়। কিন্তু মানুষের আসল শ্রেষ্ঠত্ব তার 'মনুষ্যত্ব'-এর মধ্যে, যা শিক্ষা, নৈতিকতা, সঠিক জীবনবোধ ও বিবেকের অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।
জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রেও মানুষ পশুর মতো অন্যের গ্রাস কেড়ে নেয় না, বরং সততা ও মর্যাদার সাথে তা উৎপাদন ও উপার্জন করে। সমাজে যারা পশুর মতো জোর-জুলুম বা চুরির মাধ্যমে জীবিকা খোঁজে, তারা মূলত মানুষরূপী পশু হিসেবেই সমাজ ও সৃষ্টিকর্তার কাছে ঘৃণিত হয়।
ধর্ম মানুষকে এই পশুপবৃত্তি থেকে মুক্ত করে প্রকৃত মানুষে রূপান্তরিত করে। স্রষ্টার খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য মানুষের অন্তরে আল্লাহ সহজাতভাবে দয়া, নৈতিকতা ও লজ্জা-শরমের গুণাবলি দিয়ে দিয়েছেন। বুদ্ধি এবং অবচেতন মনের ইলহামী জ্ঞানের পাশাপাশি মানুষের সবচেয়ে বড় রক্ষা কবচ হলো তার নৈতিক সত্তা বা বিবেক এবং আল্লাহর আইন বা ধর্ম পালন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
> "আমি কেবল উত্তম নৈতিক চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্যই আবির্ভূত হয়েছি।" তিনি আরও বলেন, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।"
>
কোরআনে মানুষের দুটি প্রধান পরিচয় পাওয়া যায়—একদিকে সে আল্লাহর 'খলিফা' (প্রতিনিধি), অন্যদিকে সে আল্লাহর 'আবদ' (গোলাম বা বান্দা)। আল্লাহ বলেন: *“আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের (দাসত্বের) জন্যই সৃষ্টি করেছি।”* (সূরা আজ-যারিয়াত: ৫৬)। স্রষ্টার অবাধ্য বা বিদ্রোহী হয়ে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করা অসম্ভব।
একমাত্র আল্লাহর নিরঙ্কুশ দাসত্ব স্বীকার করার মাধ্যমেই মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্বের অবসান ঘটে। এর অর্থ হলো—আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মানুষের অন্যায় প্রভুত্ব মানি না, আবার নিজেও অন্য কোনো মানুষের ওপর অন্যায় কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিই না। এই দর্শনের মধ্যেই মানবতার সার্বিক মুক্তি নিহিত। আজ পৃথিবীতে যত যুদ্ধ, অবিচার ও শোষণ চলছে, তার মূল কারণ মানুষ স্রষ্টাকে ভুলে নিজেই খোদা সেজে বসেছে। এক আল্লাহর দাসত্বের শৃঙ্খল গলায় পরলে পৃথিবীর অন্য সব দাসত্বের শৃঙ্খল আপনা-আপনি খুলে যায়।
আরবের অন্ধকার জাহেলিয়াত আজকের আধুনিক জাহেলিয়াতের চেয়ে কম ভয়াবহ ছিল না। কিন্তু ইসলামের শিক্ষার আলোকেই আল্লাহর রাসূল (সা.) সেই বর্বর, বিশৃঙ্খল ও ব্যর্থ জাতিকে একটি সুশৃঙ্খল, কল্যাণকামী বিশ্ব-সভ্যতায় রূপান্তরিত করেছিলেন। অথচ আজ সংস্কারের নামে সমাজ থেকে ধর্মকে নির্বাসন দিয়ে অধর্ম ও নাস্তিক্যবাদকে জায়গা দেওয়া হচ্ছে, যা মানবতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
জাগতিক বিজ্ঞান দিয়ে আমরা কেবল দৃশ্যমান জগৎ সম্পর্কে জানতে পারি। কিন্তু এর বাইরের বিশাল অদৃশ্য জগতের রহস্য ও সঠিক পথের দিশা পেতে হলে আমাদের অবশ্যই স্রষ্টার বিধানের কাছেই ফিরে যেতে হবে, কারণ স্রষ্টার নির্দেশ ও ওহীর জ্ঞানই হলো পরম সত্য ও আলোর উৎস।
দারুন নাদওয়ার সেই কালো রাত ও আসমানের ফয়সালা
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
ইতিহাসের পাতায় মক্কার দারুন নাদওয়া (কুরাইশদের নগর সংসদ) বহু সভার সাক্ষী হয়ে আছে। কিন্তু নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষের সফর মাসের সেই কালো দিনটিতে সেখানে যে ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছিল, তা ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম চক্রান্ত।
ইসলামের আলো যখন মক্কার সীমানা পেরিয়ে মদিনায় ছড়িয়ে পড়ছিল এবং মক্কার মুসলমানরা একে একে মদিনায় হিজরত করছিলেন, তখন কুরাইশ কাফেরদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তারা বুঝতে পারল, মুহাম্মাদ (সা.) যদি মদিনায় গিয়ে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেন, তবে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নেতৃত্ব চরম হুমকির মুখে পড়বে।
এই সংকট থেকে বাঁচতে কুরাইশদের শীর্ষ নেতারা দারুন নাদওয়ায় এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হলো। সেই ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর ঘটনাপ্রবাহের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
## দারুন নাদওয়ার সেই কুখ্যাত বৈঠক
সেদিন কুরাইশদের বড় বড় সব লিডার—আবু জাহেল, উতবা, শায়বা, উমাইয়া ইবনে খালাফ এবং আবু সুফিয়ানসহ মক্কার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দারুন নাদওয়ায় জড়ো হয়েছিল। ঠিক যখন তারা ভেতরে ঢুকবে, তখন দরজায় এক অদ্ভুত চেহারার বুড়ো এসে দাঁড়াল। গায়ে দামি চাদর।
নেতারা জিজ্ঞেস করল, "আপনি কে?"
বৃদ্ধ উত্তর দিল, "আমি নজদ অঞ্চলের এক শেখ। আপনাদের বৈঠকের খবর শুনে এলাম, যদি কোনো ভালো পরামর্শ দিতে পারি।"
আসলে এই বৃদ্ধ আর কেউ ছিল না, স্বয়ং **ইবলিস শয়তান** মানুষের রূপ ধরে তাদের কুৎসিত পরিকল্পনায় শরিক হতে এসেছিল। কুরাইশরা তাকে ভেতরে আসার অনুমতি দিল।
### তিনটি প্রস্তাব ও আবু জাহেলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
বৈঠক শুরু হতেই আলোচনা উঠল—কীভাবে মুহাম্মাদ (সা.)-এর দাওয়াত বন্ধ করা যায়? একের পর এক প্রস্তাব আসতে লাগল:
1. **দেশান্তর করার প্রস্তাব:** একজন বলল, তাকে মক্কা থেকে বের করে অন্য কোথাও নির্বাসিত করা হোক।
* *নজদি শেখের (শয়তানের) আপত্তি:* "ভুল সিদ্ধান্ত! তোমরা কি তার মিষ্টি কথা এবং জাদু দেখনি? সে অন্য কোনো গোত্রে গিয়ে সবাইকে আপন করে নেবে এবং তোমাদের ওপরই আক্রমণ করবে।"
2. **বন্দি করার প্রস্তাব:** অন্য একজন বলল, তাকে একটি ঘরের ভেতর শিকল দিয়ে বন্দি করে রাখা হোক, যতক্ষণ না সে কবিদের মতো স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে।
* *নজদি শেখের আপত্তি:* "এও অসম্ভব! তার সাহাবিরা এই খবর পেলে যেকোনো উপায়ে তাকে মুক্ত করে নিয়ে যাবে।"
সবশেষে কুরাইশদের প্রধান খলনায়ক **আবু জাহেল** তার কুৎসিত ও চূড়ান্ত প্রস্তাবটি পেশ করল। সে বলল:
> "আমাদের প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী, অভিজাত এবং সাহসী যুবককে বেছে নেওয়া হোক। তাদের প্রত্যেকের হাতে থাকবে ধারালো তলোয়ার। তারা সবাই মিলে একসাথে মুহাম্মাদের ওপর আঘাত করবে এবং তাকে হত্যা করবে। এতে করে তার রক্তের দায় সমস্ত কুরাইশ গোত্রের ওপর ভাগ হয়ে যাবে। বনু আবদে মানাফ (রাসূলের গোত্র) একা পুরো কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সাহস পাবে না। বাধ্য হয়ে তারা রক্তের বিনিময় মূল্য (দিয়াত) মেনে নেবে, আর আমরা সবাই মিলে তা পরিশোধ করে দেব।"
>
এই নির্মম প্রস্তাব শুনে নজদি শেখ (শয়তান) আনন্দে চিৎকার করে উঠল, "হ্যাঁ! এটাই শ্রেষ্ঠ প্রস্তাব। এর বাইরে আর কোনো পথ নেই।"
## আল্লাহর পরিকল্পনা এবং জিবরাঈল (আ.)-এর আগমন
কুরাইশরা যখন মানুষের ইতিহাসে অন্যতম নিখুঁত খুনের পরিকল্পনা সাজাতে ব্যস্ত, তখন আসমানের ওপর মহাবিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা অন্য পরিকল্পনা করছিলেন। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন:
> "আর স্মরণ করো, কাফেররা যখন তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল তোমাকে বন্দি করার, হত্যা করার কিংবা দেশান্তর করার। তারা ষড়যন্ত্র করছিল এবং আল্লাহও পরিকল্পনা করছিলেন। আর আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী।" (সূরা আনফাল: ৩০)
>
আল্লাহ তাআলা তৎক্ষণাৎ জিবরাঈল (আ.)-কে পাঠালেন। জিবরাঈল (আ.) এসে আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে কুরাইশদের সেই গোপন ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দিলেন এবং বললেন, **"আজ রাতে আপনি আপনার বিছানায় ঘুমাবেন না। আজই আপনার মক্কা ছাড়ার রাত।"**
## সেই রোমাঞ্চকর রাত এবং অলৌকিক মুক্তি
রাত গভীর হলো। আবু জাহেলের পরিকল্পনা অনুযায়ী মক্কার কুখ্যাত ঘাতক যুবকেরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলল। তারা অপেক্ষা করতে লাগল রাসুল (সা.) কখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হবেন, আর তারা ঘরে ঢুকে একযোগে আক্রমণ করবে।
এদিকে ঘরের ভেতরে আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর বিশ্বস্ত ও সাহসী ভাই হযরত আলী (রা.)-কে ডেকে বললেন:
> "আলী, তুমি আজ রাতে আমার এই সবুজ চাদরটি গায়ে দিয়ে আমার বিছানায় শুয়ে থাকো। আল্লাহর ইচ্ছায় তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। আর মক্কাবাসীদের যেসব আমানত (টাকা-পয়সা, অলঙ্কার) আমার কাছে জমা আছে, সেগুলো সকালে সবার কাছে ফেরত দিয়ে তুমি মদিনায় চলে এসো।"
>
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও আমানতদারিতার এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল! আলী (রা.) নিজের জীবনের পরোয়া না করে সানন্দে রাসুলের বিছানায় শুয়ে পড়লেন।
### চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেন রাসুল (সা.)
মধ্যরাতে যখন ঘাতকেরা দরজার ফাঁক দিয়ে দেখছিল বিছানায় কেউ একজন শুয়ে আছে, ঠিক তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) ঘর থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। তিনি এক মুঠো ধুলো বা মাটি হাতে নিলেন এবং সূরা ইয়াসীনের প্রথম অংশ থেকে ৯ নম্বর আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:
> "এবং আমি তাদের সামনে প্রাচীর ও পেছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি, অতঃপর তাদেরকে আবৃত করে দিয়েছি, ফলে তারা দেখতে পায় না।"
>
আল্লাহর এক অলৌকিক ক্ষমতায় কুরাইশ যুবকদের চোখ ও মস্তিস্ক সাময়িকভাবে অন্ধ ও অবশ হয়ে গেল। আল্লাহর রাসূল (সা.) সেই ধুলো তাদের মাথার ওপর ছিটিয়ে দিয়ে শান্ত পায়ে তাদের চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। অথচ কেউ তাকে দেখতেই পেল না!
## ব্যর্থ চক্রান্ত এবং কাফেরদের হতাশা
ভোর হওয়ার কিছু আগে এক পথচারী এসে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ঘাতকদের বলল, "তোমরা এখানে কার জন্য অপেক্ষা করছ?"
তারা বলল, "মুহাম্মাদের জন্য।"
পথচারী হেসে বলল, "তোমরা তো বোকার স্বর্গে আছ! মুহাম্মাদ তো তোমাদের মাথায় ধুলো দিয়ে কখন যেন চলে গেছে! বিশ্বাস না হলে নিজেদের মাথায় হাত দিয়ে দেখো।"
ঘাতকেরা চমকে উঠে মাথায় হাত দিয়ে দেখল সত্যিই সেখানে মাটি লেগে আছে। তারা তখনো বিশ্বাস করতে পারছিল না। তারা দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল বিছানায় সবুজ চাদর জড়ানো কেউ একজন শুয়ে আছে। তারা ভাবল, "ঐ তো মুহাম্মাদ শুয়ে আছে।"
সকাল হতেই যখন বিছানার চাদর সরিয়ে হযরত আলী (রা.) উঠে দাঁড়ালেন, তখন কাফেরদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। আবু জাহেল চিৎকার করে উঠল, "মুহাম্মাদ কোথায়?!"
আলী (রা.) শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, "আমি জানি না। তোমরা কি তাকে আমার জিম্মায় রেখে গিয়েছিলে?"
কুরাইশদের এত নিখুঁত, এত বড় চক্রান্ত এবং অহংকার ধুলোয় মিশে গেল। দারুন নাদওয়ার সেই মহাপরিকল্পনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো। আর আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর প্রিয় বন্ধু আবু বকর (রা.)-কে সাথে নিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক হিজরতের যাত্রা শুরু করলেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।
বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬
আকাশের ছাদ
নীলগিরি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছোট্ট একটা গ্রাম। সেই গ্রামে থাকত দুই ভাইবোন—অয়ন আর অমি। অয়ন পড়ে ক্লাস ফোরে, আর অমি সবে টুতে উঠেছে। ওদের প্রিয় সময় হলো রাত। রাতের বেলা ওরা যখন বাড়ির উঠোনে মাদুর পেতে শুয়ে আকাশের দিকে তাকাত, ওদের মনে হতো আকাশটা বুঝি এক মস্ত বড় কালো মখমলের চাদর, যাতে কেউ লাখ লাখ জোনাকি পুঁতি দিয়ে সেলাই করে রেখেছে।
একদিন রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে অমি হঠাৎ বলে উঠল, "আচ্ছা অয়ন ভাইয়া, ওপর থেকে যদি কোনো দুষ্টু রাক্ষস আমাদের দিকে পাথর ছুড়ে মারে, আমাদের কী হবে?"
অয়ন হেসে বলল, "ধুর পাগলী! আকাশে কোনো রাক্ষস নেই। তবে হ্যাঁ, মহাকাশ থেকে কিন্তু প্রতিদিন কোটি কোটি বড় বড় পাথরের টুকরো পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে! সেগুলোকে বলে উল্কা।"
অমির চোখ দুটো ভয়ে গোল গোল হয়ে গেল, "ওরে বাবা! তাহলে সেগুলো আমাদের মাথায় পড়ে না কেন?"
ঠিক তখনই পেছন থেকে চাদর গায়ে জড়িয়ে এগিয়ে এলেন ওদের দাদু। দাদু এসে ওদের পাশে বসলেন এবং বললেন, "সেগুলো আমাদের মাথায় পড়ে না রে দাদুভাই, কারণ আমাদের মাথার ওপরে একজন অদৃশ্য পাহারাদার আছেন। তিনি আমাদের পৃথিবীকে এক জাদুকরী কম্বল দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছেন। সেই কম্বলের নাম—**বায়ুমন্ডল**!"
"জাদুকরী কম্বল?" দুই ভাইবোন একসাথে সোজা হয়ে বসল। দাদুর মুখে গল্প শোনার মজাই আলাদা।
দাদু আকাশের দিকে হাত তুলে বলতে লাগলেন, "হ্যাঁ, জাদুকরীই তো! তোরা কি জানিস, আমাদের ওই সূর্যমামা দিনে আমাদের আলো দেয়, ঠিকই; কিন্তু ওর রাগও খুব বেশি! প্রতিদিন সূর্যমামার পেটের ভেতর হাজার হাজার বড় বড় বোমা ফাটে। আর সেই বোমার আগুনে তৈরি হয় এক ভয়ঙ্কর রাক্ষুসে হাওয়া, যার নাম 'সৌরবায়ু'। এই হাওয়া যদি একবার আমাদের ছুঁয়ে দেয়, তবে পৃথিবীর সব গাছপালা, মানুষ নিমেষেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে, সবার ক্যানসার হবে।"
অমি ভয়ে অয়নের হাত চেপে ধরল, "তাহলে আমরা বেঁচে আছি কী করে দাদু?"
দাদু হাসলেন, "ঐ যে বললাম, আমাদের জাদুকরী কম্বল বা বায়ুমন্ডল! এই বায়ুমন্ডল এক অদ্ভুত ঢাল দিয়ে তৈরি। সূর্যমামার সেই ভয়ঙ্কর রাক্ষুসে হাওয়া যখন তেড়ে আসে, আমাদের বায়ুমন্ডল আর পৃথিবীর চারপাশের এক অদৃশ্য চৌম্বক শক্তি ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। তারা সেই হাওয়াকে কুংফু কারাতের মতো এক চড়ে তাড়িয়ে দেয় পৃথিবীর দুই প্রান্তে, যেখানে কোনো মানুষ থাকে না। আমরা টের পেয়েও পাই না, আমাদের ওপর দিয়ে কত বড় ঝড় বয়ে গেল!"
অয়ন এবার আগ্রহ নিয়ে বলল, "দাদু, তাহলে অমির বলা সেই মহাকাশের পাথরগুলোর কী হয়?"
"সে এক দারুণ কাণ্ড!" দাদু বললেন, "মহাকাশ থেকে প্রতিদিন প্রায় বিশ লাখ পাথরের উল্কা পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে। তারা যখনই আমাদের এই বায়ুমন্ডলের জাদুকরী কম্বলে এসে ঢোকে, অমনি বাতাসের সাথে তাদের প্রচণ্ড ঘষা লাগে। ঘষা লেগে ওগুলোতে আগুন ধরে যায় আর তারা আকাশে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আমরা রাতে মাঝে মাঝে যেটাকে 'তারা খসা' বলি এবং হাত তালি দিই, ওটা আসলে এক একটা দুষ্টু পাথরের ধ্বংস হওয়া!"
অমি এবার হাততালি দিয়ে উঠল, "বাহ্! আমাদের পাহারাদার তো খুব শক্তিশালী!"
দাদু বললেন, "শুধু শক্তিশালীই নয়, সে ভীষণ বুদ্ধিমানও বটে। এই বায়ুমন্ডলকে আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ এমনভাবে বানিয়েছেন যে, সে যেন এক মস্ত বড় ছাঁকনি। সূর্যের ক্ষতিকর আলো ও ওজোন স্তরে আটকে দেয়, কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু আলো আর মিষ্টি ওম (ইনফ্রারেড আলো) দরকার, ঠিক সেটুকুই ভেতরে আসতে দেয়। একটু কম আসলে আমরা শীতে জমে বরফ হয়ে যেতাম, আর একটু বেশি আসলে গরমে পুড়ে যেতাম। এমনকি রাতে যখন সূর্য থাকে না, তখন এই কম্বলটাই দিনের বেলা ধরে রাখা গরমটাকে আটকে রাখে, যাতে পৃথিবীটা অতিরিক্ত ঠান্ডা না হয়ে যায়।"
অয়ন একটু ভেবে বলল, "দাদু, এত বড় পাহারাদার আমাদের ওপরে কাজ করছে, অথচ আমরা চোখেই দেখতে পাই না!"
দাদু অয়নের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "ঠিক বলেছ দাদুভাই। এই যে অদৃশ্য একটা ব্যবস্থা আমাদের ২৪ ঘণ্টা ভালো রাখছে, পরম যত্ন আর দয়া দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে—এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের একজন মহান সৃষ্টিকর্তা আছেন। যিনি এই সুন্দর নিয়ম বানিয়েছেন। পবিত্র কোরআনেও তিনি বলেছেন, তিনি আকাশকে আমাদের জন্য একটা 'সুরক্ষিত ছাদ' বানিয়ে দিয়েছেন। আমরা যেমন এই অদৃশ্য ছাদের সুরক্ষাকে বিশ্বাস করি, তেমনি তাঁর সব অদৃশ্য সুন্দর নিয়ম আর প্রতিশ্রুতিকেও আমাদের বিশ্বাস করা উচিত।"
অমি আকাশের দিকে তাকিয়ে পরম শান্তিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নীলচে অন্ধকারের ওই আকাশটাকে এখন আর তার অচেনা বা ভয়ের মনে হচ্ছে না। তার মনে হলো, ওপরের ওই বিশাল আকাশটা আসলে তাদের ভালোবেসে জড়িয়ে রাখা এক পরম ভরসার চাদর।
দাদু বললেন, "অনেক রাত হলো, এবার চলো ঘুমাতে হবে।"
দুই ভাইবোন দাদুর হাত ধরে ঘরের দিকে পা বাড়াল, আর মনে মনে সেই মহান সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাল, যাঁর রহমতের ছায়ায় প্রতিদিন পৃথিবীতে নতুন সকাল ডানা মেলে।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)





