বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬

আকাশের ছাদ

নীলগিরি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছোট্ট একটা গ্রাম। সেই গ্রামে থাকত দুই ভাইবোন—অয়ন আর অমি। অয়ন পড়ে ক্লাস ফোরে, আর অমি সবে টুতে উঠেছে। ওদের প্রিয় সময় হলো রাত। রাতের বেলা ওরা যখন বাড়ির উঠোনে মাদুর পেতে শুয়ে আকাশের দিকে তাকাত, ওদের মনে হতো আকাশটা বুঝি এক মস্ত বড় কালো মখমলের চাদর, যাতে কেউ লাখ লাখ জোনাকি পুঁতি দিয়ে সেলাই করে রেখেছে। একদিন রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে অমি হঠাৎ বলে উঠল, "আচ্ছা অয়ন ভাইয়া, ওপর থেকে যদি কোনো দুষ্টু রাক্ষস আমাদের দিকে পাথর ছুড়ে মারে, আমাদের কী হবে?" অয়ন হেসে বলল, "ধুর পাগলী! আকাশে কোনো রাক্ষস নেই। তবে হ্যাঁ, মহাকাশ থেকে কিন্তু প্রতিদিন কোটি কোটি বড় বড় পাথরের টুকরো পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে! সেগুলোকে বলে উল্কা।" অমির চোখ দুটো ভয়ে গোল গোল হয়ে গেল, "ওরে বাবা! তাহলে সেগুলো আমাদের মাথায় পড়ে না কেন?" ঠিক তখনই পেছন থেকে চাদর গায়ে জড়িয়ে এগিয়ে এলেন ওদের দাদু। দাদু এসে ওদের পাশে বসলেন এবং বললেন, "সেগুলো আমাদের মাথায় পড়ে না রে দাদুভাই, কারণ আমাদের মাথার ওপরে একজন অদৃশ্য পাহারাদার আছেন। তিনি আমাদের পৃথিবীকে এক জাদুকরী কম্বল দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছেন। সেই কম্বলের নাম—**বায়ুমন্ডল**!" "জাদুকরী কম্বল?" দুই ভাইবোন একসাথে সোজা হয়ে বসল। দাদুর মুখে গল্প শোনার মজাই আলাদা। দাদু আকাশের দিকে হাত তুলে বলতে লাগলেন, "হ্যাঁ, জাদুকরীই তো! তোরা কি জানিস, আমাদের ওই সূর্যমামা দিনে আমাদের আলো দেয়, ঠিকই; কিন্তু ওর রাগও খুব বেশি! প্রতিদিন সূর্যমামার পেটের ভেতর হাজার হাজার বড় বড় বোমা ফাটে। আর সেই বোমার আগুনে তৈরি হয় এক ভয়ঙ্কর রাক্ষুসে হাওয়া, যার নাম 'সৌরবায়ু'। এই হাওয়া যদি একবার আমাদের ছুঁয়ে দেয়, তবে পৃথিবীর সব গাছপালা, মানুষ নিমেষেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে, সবার ক্যানসার হবে।" অমি ভয়ে অয়নের হাত চেপে ধরল, "তাহলে আমরা বেঁচে আছি কী করে দাদু?" দাদু হাসলেন, "ঐ যে বললাম, আমাদের জাদুকরী কম্বল বা বায়ুমন্ডল! এই বায়ুমন্ডল এক অদ্ভুত ঢাল দিয়ে তৈরি। সূর্যমামার সেই ভয়ঙ্কর রাক্ষুসে হাওয়া যখন তেড়ে আসে, আমাদের বায়ুমন্ডল আর পৃথিবীর চারপাশের এক অদৃশ্য চৌম্বক শক্তি ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। তারা সেই হাওয়াকে কুংফু কারাতের মতো এক চড়ে তাড়িয়ে দেয় পৃথিবীর দুই প্রান্তে, যেখানে কোনো মানুষ থাকে না। আমরা টের পেয়েও পাই না, আমাদের ওপর দিয়ে কত বড় ঝড় বয়ে গেল!" অয়ন এবার আগ্রহ নিয়ে বলল, "দাদু, তাহলে অমির বলা সেই মহাকাশের পাথরগুলোর কী হয়?" "সে এক দারুণ কাণ্ড!" দাদু বললেন, "মহাকাশ থেকে প্রতিদিন প্রায় বিশ লাখ পাথরের উল্কা পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে। তারা যখনই আমাদের এই বায়ুমন্ডলের জাদুকরী কম্বলে এসে ঢোকে, অমনি বাতাসের সাথে তাদের প্রচণ্ড ঘষা লাগে। ঘষা লেগে ওগুলোতে আগুন ধরে যায় আর তারা আকাশে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আমরা রাতে মাঝে মাঝে যেটাকে 'তারা খসা' বলি এবং হাত তালি দিই, ওটা আসলে এক একটা দুষ্টু পাথরের ধ্বংস হওয়া!" অমি এবার হাততালি দিয়ে উঠল, "বাহ্! আমাদের পাহারাদার তো খুব শক্তিশালী!" দাদু বললেন, "শুধু শক্তিশালীই নয়, সে ভীষণ বুদ্ধিমানও বটে। এই বায়ুমন্ডলকে আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ এমনভাবে বানিয়েছেন যে, সে যেন এক মস্ত বড় ছাঁকনি। সূর্যের ক্ষতিকর আলো ও ওজোন স্তরে আটকে দেয়, কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু আলো আর মিষ্টি ওম (ইনফ্রারেড আলো) দরকার, ঠিক সেটুকুই ভেতরে আসতে দেয়। একটু কম আসলে আমরা শীতে জমে বরফ হয়ে যেতাম, আর একটু বেশি আসলে গরমে পুড়ে যেতাম। এমনকি রাতে যখন সূর্য থাকে না, তখন এই কম্বলটাই দিনের বেলা ধরে রাখা গরমটাকে আটকে রাখে, যাতে পৃথিবীটা অতিরিক্ত ঠান্ডা না হয়ে যায়।" অয়ন একটু ভেবে বলল, "দাদু, এত বড় পাহারাদার আমাদের ওপরে কাজ করছে, অথচ আমরা চোখেই দেখতে পাই না!" দাদু অয়নের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "ঠিক বলেছ দাদুভাই। এই যে অদৃশ্য একটা ব্যবস্থা আমাদের ২৪ ঘণ্টা ভালো রাখছে, পরম যত্ন আর দয়া দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে—এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের একজন মহান সৃষ্টিকর্তা আছেন। যিনি এই সুন্দর নিয়ম বানিয়েছেন। পবিত্র কোরআনেও তিনি বলেছেন, তিনি আকাশকে আমাদের জন্য একটা 'সুরক্ষিত ছাদ' বানিয়ে দিয়েছেন। আমরা যেমন এই অদৃশ্য ছাদের সুরক্ষাকে বিশ্বাস করি, তেমনি তাঁর সব অদৃশ্য সুন্দর নিয়ম আর প্রতিশ্রুতিকেও আমাদের বিশ্বাস করা উচিত।" অমি আকাশের দিকে তাকিয়ে পরম শান্তিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নীলচে অন্ধকারের ওই আকাশটাকে এখন আর তার অচেনা বা ভয়ের মনে হচ্ছে না। তার মনে হলো, ওপরের ওই বিশাল আকাশটা আসলে তাদের ভালোবেসে জড়িয়ে রাখা এক পরম ভরসার চাদর। দাদু বললেন, "অনেক রাত হলো, এবার চলো ঘুমাতে হবে।" দুই ভাইবোন দাদুর হাত ধরে ঘরের দিকে পা বাড়াল, আর মনে মনে সেই মহান সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাল, যাঁর রহমতের ছায়ায় প্রতিদিন পৃথিবীতে নতুন সকাল ডানা মেলে।

দিন-রাত্রির রহস্য: পৃথিবীর লাটিম আর চাঁদের দেশ

টিনটিন আর তার ছোট বোন টুনি প্রতিদিন বিকেলে ছাদে এসে খেলা করে। কিন্তু আজকের বিকেলটা একটু অন্যরকম। সূর্য মামা যখন লাল টোপর পরে পশ্চিম আকাশে ডুব দিচ্ছে, ঠিক তখনই পূর্ব আকাশে গোল থালার মতো রুপোলি চাঁদ মামা উঁকি দিল। টুনি হাততালি দিয়ে বলে উঠল, "ভাইয়া, দেখো দেখো! সূর্য মামা ঘুমাতে যাচ্ছে আর চাঁদ মামা ডিউটি করতে চলে এসেছে। আচ্ছা, এই দিন আর রাত কেন হয় বলো তো?" টিনটিন ক্লাস ফাইভে পড়ে, সে একটু বিজ্ঞের মতো গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, "উঁহু টুনি, সূর্য কিন্তু কোথাও যায় না। আমাদের পৃথিবীটা লাটিমের মতো নিজের জায়গায় বনবন করে ঘোরে। যেদিকটা সূর্যের সামনে আসে সেদিকটা দিন, আর উল্টো দিকটায় রাত!" ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা চেনা গলা শোনা গেল, "একদম ঠিক বলেছিস টিনটিন! কিন্তু তোরা কি জানিস, এই দিন-রাতের খেলাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে?" ঘুরে তাকিয়ে বাচ্চারা দেখল তাদের দাদুভাই হাতে দুটো গরম জিলিপি নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। দাদুভাই এসে ওদের পাশে বসলেন। টুনি জিলিপিতে কামড় দিয়ে বলল, "দিন-রাতের খেলা আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে? কীভাবে দাদুভাই?" দাদুভাই আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন এক রূপকথার মতো সত্যি গল্প: ### মহাকাশের আজব রাজ্য দাদুভাই বললেন, "শোন টুনি, আমাদের এই মহাবিশ্বটা একটা মস্ত বড় রাজ্য। আর সূর্য মামার পরিবারে আমাদের পৃথিবীর আরও অনেক ভাইবোন আছে। যেমন—বুধ, শুক্র, আর মঙ্গল। কিন্তু তারা কেউ পৃথিবীর মতো লক্ষ্মী নয়! সবচেয়ে কাছে থাকা **বুধ ভাইয়া** এত অলস যে, নিজের জায়গায় ঘুরতেই চায় না! তার একটা দিন হতে আমাদের পৃথিবীর প্রায় ২৭ দিন লেগে যায়। ভাব তো একবার! একটানা ২৭ দিন শুধু রোদ আর রোদ! গরমে বুধের একপাশ ৩৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পুড়ে কয়লা হয়ে যায়, আর অন্যপাশে সূর্য পৌঁছায় না বলে মাইনাস ১৭০ ডিগ্রি শীতে বরফ হয়ে যায়! সেখানে কি কেউ বাঁচতে পারবে?" টুনি চোখ বড় বড় করে বলল, "বাপরে! ২৭ দিন ধরে দুপুরবেলা? আমি তো রোদে কালো ভূত হয়ে যাব!" টিনটিন বলল, "আর শুক্র গ্রহের কী অবস্থা দাদুভাই?" দাদুভাই হাসলেন, "ওরে বাবারে, **শুক্র বোনটি** আরও অদ্ভুত! সে এত আস্তে ঘোরে যে তার একটা দিন হতেই ১২১ দিন পার হয়ে যায়! সেখানে এত গরম যে লোহাও গলে জল হয়ে যাবে। আর আমাদের পাশের বাড়ির **মঙ্গল দাদু**? মঙ্গলের দিন-রাত আমাদের পৃথিবীর মতোই। কিন্তু সে সূর্য থেকে এত দূরে থাকে যে, দিনেই কনকনে ঠাণ্ডা, আর রাতে মাইনাস ৮৬ ডিগ্রি শীত! রক্ত জমে আইসক্রিম হয়ে যাবে!" ### আমাদের রূপসী চাঁদ ও জাদুকরী পৃথিবী টুনি তখন আকাশের চাঁদের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, "দাদুভাই, তাহলে আমাদের এই মিষ্টি চাঁদ মামার বাড়ি কেমন?" দাদুভাই বললেন, "চাঁদকে দূর থেকে দেখতেই সুন্দর রে দিদিভাই! চাঁদ আর পৃথিবী কিন্তু সূর্য থেকে একই দূরত্বে আছে। কিন্তু চাঁদের কোনো বাতাস নেই, আর সে ঘোরেও খুব আস্তে। তাই চাঁদের যেদিকে রোদ পড়ে, সেদিকটা ফুটন্ত জলের চেয়েও বেশি গরম হয়ে যায়—১১৭ ডিগ্রি! আর উল্টো পিঠের অন্ধকার দিকটা মাইনাস ১৬৩ ডিগ্রি জমে পাথর! চাঁদের একপাশে গেলে তুই পুড়ে যাবি, আর অন্যপাশে গেলে জমে যাবি!" টিনটিন অবাক হয়ে বলল, "তার মানে দাদুভাই, আমাদের পৃথিবী যদি ওই গ্রহগুলোর মতো খুব আস্তে ঘুরত, তাহলে আমাদেরও একপাশ পুড়ে ছাই হয়ে যেত আর অন্যপাশ বরফ হয়ে যেত?" "একদম তাই!" দাদুভাই টিনটিনের পিঠ চাপড়ে বললেন, "আল্লাহ তায়ালা আমাদের পৃথিবীকে ঠিক ততটুকুই গতি দিয়েছেন, যাতে ১২ ঘণ্টায় দিন আর ১২ ঘণ্টায় রাত হয়। দিন ভরে আমরা কাজ করি আর সূর্য মামার আলো থেকে শক্তি নিই, আর রাত হলেই পৃথিবীটা ঠাণ্ডা হয়ে যায়, আমরা শান্তিতে ঘুমোতে পারি। এই নিখুঁত নিয়মের জন্যই পৃথিবীতে গাছপালা, ফুল-ফল আর আমরা মানুষরা বেঁচে আছি। কোরআন শরীফেও আল্লাহ বারবার বলেছেন, এই দিন আর রাতের পরিবর্তন হলো বুদ্ধিমান মানুষদের জন্য একটা মস্ত বড় নিদর্শন, যাতে আমরা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হই।" ### যদি রাত না ফুরোত? টুনি জিলিপি শেষ করে বলল, "দাদুভাই, এমন কোনো জায়গা আছে যেখানে শুধুই দিন থাকে, কখনো রাত হয় না?" দাদুভাই বললেন, "মহাকাশে এমন অনেক জায়গা আছে টুনি। আমাদের তো একটাই সূর্য। কিন্তু মহাকাশে এমন অনেক গ্রহ আছে যাদের দুটো বা তিনটে করে সূর্য আছে! ওদের বলা হয় 'বাইনারি সিস্টেম'। সেখানে একটা সূর্য ডুবলে আরেকটা সূর্য উঠে পড়ে। ফলে সেখানে কখনোই রাত হয় না, শুধুই দিন! ভাব তো, যদি কখনো রাত না হতো, আমরা ঘুমোতাম কখন? আমাদের শরীর তো একদম নষ্ট হয়ে যেত! তাই আল্লাহ আমাদের ভালোবেসে রাত বানিয়েছেন বিশ্রামের জন্য।" টিনটিন বলল, "আর যদি শুধুই রাত থাকত?" "তাহলে গাছপালা আলো পেত না, কোনো খাবার তৈরি হতো না। তীব্র শীতে পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত। তাই তো দিন আর রাত একে অপরের পেছনে চোরের মতো দৌড়ায়, কেউ কাউকে ছাড়িয়ে যায় না।" ছাদে তখন হালকা ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। দাদুভাইয়ের গল্প শেষ হতে না হতেই চারপাশটা বেশ অন্ধকার হয়ে এল। আকাশের তারাগুলো যেন মিটিমিটি করে হেসে দাদুভাইয়ের কথার সাক্ষ্য দিল। টুনি আর টিনটিন দুজনে মিলে আকাশ পানে হাত জোড় করে বলল, "ধন্যবাদ আল্লাহ, আমাদের এত সুন্দর একটা পৃথিবী আর মিষ্টি দিন-রাত উপহার দেওয়ার জন্য!" দাদুভাই বললেন, "চলো এবার নিচে চলো, লক্ষ্মী সোনাদের এখন পড়তে বসার 'দিন', তারপর আসবে ঘুমের 'রাত'!" দুই ভাইবোন হাসতে হাসতে দাদুভাইয়ের হাত ধরে ছাদ থেকে নেমে গেল।

মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬

পৃথিবীটা যদি অন্যরকম হতো তাহলে কী হতো?

ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা কি কখনো ভেবে দেখেছ—আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীটা যদি একটুখানি বদলে যেত, তাহলে কী হতো? ধরো, পৃথিবীটা যদি চকোলেটের মতো গোল না হয়ে একটা মস্ত বড় ফুটবল বা পুতুলের মতো ছোট হতো? চলো আজকে একটা দারুণ গল্প বলি। এই গল্পটা কোনো রূপকথার গল্প নয়, আমাদের নিজেদের থাকার ঘর, অর্থাৎ এই পৃথিবীর এক জাদুকরী গল্প! ## জাদুকরের নিখুঁত পরিমাপ অনেক অনেক বছর আগে, এক পরম দয়ালু ও মহাজ্ঞানী জাদুকর (যাঁকে আমরা সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ বলি) এই সুন্দর মহাবিশ্ব তৈরি করলেন। তিনি যখন পৃথিবী বানালেন, তখন সাথে একটা অদৃশ্য জাদুর স্কেল বা পরিমাপক রাখলেন। তিনি ঠিক করে দিলেন পৃথিবীর আকার কত বড় হবে, সূর্য থেকে এটা কত দূরে থাকবে, আর এখানে কতটুকু পানি থাকবে। সব কিছু একদম মেপে মেপে পারফেক্ট করা হলো! কেন এমন করলেন জানো? কারণ একটু এদিক-ওদিক হলেই কিন্তু মস্ত বিপদ ঘটে যেত! ## যদি পৃথিবীটা একটু ছোট বা বড় হতো? * **যদি পৃথিবী চাঁদের মতো ছোট হতো:** তাহলে পৃথিবীর কোনো জোর বা মাধ্যাকর্ষণ শক্তি থাকত না। ফলে নদীর জল, সাগরের জল সব উধাও হয়ে যেত! বাতাসও থাকত না। আর বাতাস না থাকলে সূর্যের ক্ষতিকর আলো এসে আমাদের একদম পুড়িয়ে ছাই করে দিত। * **যদি পৃথিবী সূর্যের মতো মস্ত বড় হতো:** ওরে বাবা! তাহলে পৃথিবীর টান বা ওজন এত বেড়ে যেত যে আমরা সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারতাম না! আমাদের শরীরটা ছোট হয়ে একটা কাঠবিড়ালির মতো হয়ে যেত। আর প্রতিদিন আকাশ থেকে লাখ লাখ পাথর (উল্কা) এসে ধপাধপ আমাদের মাথায় পড়ত! কারণ বড় পৃথিবীর পাতলা বাতাস আমাদের রক্ষা করতে পারত না। ## সূর্য মামার সাথে লুকোচুরি পৃথিবী সূর্য মামা থেকে ঠিক যতটুকু দূরে থাকার, ঠিক ততটুকুই দূরে আছে। * যদি পৃথিবী আরেকটু দূরে চলে যেত, তবে সারাবছর এত ঠান্ডা পড়ত যে সব জল জমে কঠিন বরফ হয়ে যেত! চকলেট আইসক্রিমের মতো আমরা সবাই জমে কুলফি হয়ে যেতাম! * আর যদি সূর্যের খুব কাছে চলে আসত? তাহলে গরমে নদীর জল টগবগ করে ফুটতে শুরু করত। মনে হতো পুরো পৃথিবীটাই একটা গরম চায়ের কেতলি! সেখানে কি কেউ বাঁচতে পারে? ## সাগরের জল আর চাঁদের ম্যাজিক আমাদের পৃথিবীতে যতটুকু জল আর মাটি আছে, তাও জাদুকর মেপে দিয়েছেন। সাগর যদি এখনকার চেয়ে দ্বিগুণ বড় হতো, তবে সারাদিন শুধু বৃষ্টি আর মেঘ থাকত, মানুষের বুদ্ধিই বাড়ত না! আবার আমাদের আকাশের রূপালি চাঁদ মামার কথাও ধরা যাক। চাঁদটা যদি পৃথিবীর খুব কাছে চলে আসত, তবে সাগরের জল এত ওপরে লাফিয়ে উঠত যে রোজ মস্ত বড় বন্যা হতো। সব বাড়িঘর, মাঠ-ঘাট তলিয়ে যেত! ## আমাদের জন্য শিক্ষা তাহলে বুঝতেই পারছ, আমাদের এই পৃথিবীটা এমনি এমনি এত সুন্দর হয়নি। সেই মহান জাদুকর নিজের হাতে হাত দিয়ে মেপে মেপে আমাদের জন্য এই চমৎকার ও নিরাপদ ঘরটি বানিয়েছেন। পবিত্র কোরআনেও তিনি বলেছেন—**"আমি সব কিছু একদম সঠিক মাপে ও নিয়মে তৈরি করেছি।"** তাই যখনই আমরা সবুজ ঘাস, নীল আকাশ আর সুন্দর নদী দেখব, আমাদের মন যেন সেই মহান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। আমরা যেন চোখ-কান খোলা রেখে এই সুন্দর পৃথিবীর নিয়মগুলোকে বোঝার চেষ্টা করি!

সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

অদ্ভুত সুন্দর পৃথিবী

ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা কি কখনো রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ভেবেছ—এই যে কোটি কোটি তারা মিটিমিটি জ্বলছে, আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীটা গোল হয়ে সূর্যের চারপাশে ঘুরছে, এসব কীভাবে একা একা এত সুন্দর করে চলছে? চল, আজ আমরা একটা জাদুকরী আর অদ্ভুত সুন্দর সত্যি গল্প শুনি! ### এক অদ্ভুত সুন্দর পৃথিবী মনে করো, তোমার কাছে এক বাক্স রঙিন লেগো ব্লক আছে। তুমি যদি বাক্সটা ঝাঁকিয়ে মেঝেতে ঢেলে দাও, সেগুলো কি নিজে নিজেই একটা সুন্দর দোতলা বাড়ি হয়ে যাবে? নিশ্চয়ই না! তার জন্য একজন বুদ্ধিমান মানুষের দরকার, যে হাত দিয়ে একটা একটা করে ব্লক জোড়া লাগাবে। আমাদের এই পৃথিবীটাও ঠিক তেমনই। এখানে আছে নদী, নীল আকাশ, সবুজ গাছপালা আর হরেক রকমের পশুপাখি। বিজ্ঞানীরা যখন অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে ছোট পানির ফোঁটা দেখেন, কিংবা দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দূরের নক্ষত্র দেখেন, তাঁরা অবাক হয়ে যান! সবকিছু এত নিয়মের মধ্যে চলছে যে, মনে হয় কেউ একজন খুব যত্ন করে এই পুরো পৃথিবীটাকে সাজিয়ে রেখেছেন। ### 'প্রাণ' নামের এক গোপন রহস্য আচ্ছা বলতো, আমাদের ভেতরে যে 'প্রাণ' বা জীবন আছে, যার জন্য আমরা হাসতে পারি, কাঁদতে পারি, বন্ধুদের ভালোবাসতে পারি—সেই প্রাণটা আসলে কী? পৃথিবীর বড় বড় বিজ্ঞানীরা অনেক চেষ্টা করেও আজ পর্যন্ত ল্যাবরেটরিতে আসল 'প্রাণ' তৈরি করতে পারেননি। এমনকি বিজ্ঞানীদের কাছেও এর কোনো সঠিক উত্তর নেই। পবিত্র কোরআনেও বলা হয়েছে, এই প্রাণের রহস্য কেবল আমাদের সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন, মানুষকে এর খুব সামান্য জ্ঞান দেওয়া হয়েছে। ### গণিতের এক মজার ধাঁধা কিছু মানুষ ভাবত, কোটি কোটি বছর আগে এমনিতে একটার সাথে আরেকটা উপাদান লেগে বুঝি পৃথিবীতে প্রাণ তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু ফ্রেড হোয়েল নামের একজন খুব বড় বিজ্ঞানী খাতা-কলম নিয়ে হিসাব করতে বসলেন। তিনি হিসাব করে দেখলেন, নিজে নিজে বা ভাগ্যের জোরে পৃথিবীতে প্রাণের উপাদান তৈরি হওয়া এতটাই অসম্ভব যে—একটা '১' লিখে তার পিঠে ৪০,০০০টি শূন্য বসালে যে বিশাল সংখ্যা হয়, ততবারের মধ্যে মাত্র একবার এমনটা হতে পারে! অর্থাৎ, কোনো জাদুকর ছাড়া এটা কোনোভাবেই নিজে নিজে হওয়া সম্ভব নয়। আরেকজন বিজ্ঞানী হিসাব করে দেখলেন, প্রাণের জন্য যে প্রোটিন বা আমিষ দরকার, তা যদি কোনো নিয়ম ছাড়া নিজে নিজে তৈরি হতে যেত, তবে পুরো পৃথিবীর সমান উপাদান নিয়ে কোটি কোটি বছর ধরে নাড়াচাড়া করলেও তা তৈরি হতো না। আর যদি একটুও ভুল হতো, তবে তা ভালো জিনিস না হয়ে উল্টো বিষ হয়ে যেত! ### আসল জাদুকর কে? তাহলে ভাবো, আমাদের এই পৃথিবীতে আমরা কত সহজে বেঁচে আছি! আমরা ঠিকমতো অক্সিজেন পাচ্ছি, সূর্য আমাদের আলো দিচ্ছে, পৃথিবী আমাদের খাবার দিচ্ছে। এই যে এত নিখুঁত একটা ব্যবস্থা, যেখানে সামান্য একটু ভুল হলেই সব ধ্বংস হয়ে যেত, তা কিন্তু একা একা হয়নি। এই পুরো মহাবিশ্বের একজন মহা-কারিগর আছেন। তিনি হলেন মহান আল্লাহ। তিনি কত আদর আর ভালোবাসা দিয়ে আমাদের জন্য এই পৃথিবীকে একদম পারফেক্ট বা আমাদের থাকার উপযোগী করে বানিয়েছেন। আর তাই তো রাতের আকাশের দিকে তাকালে কিংবা ভোরের পাখির গান শুনলে আমাদের মনটা এক অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে ওঠে!

রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

মহিমা ও মুখোশ

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
গ্রামের নাম শান্তিপুর হলেও কুরবানির ঈদ আসার মাসখানেক আগে থেকেই সেখানে এক অশান্ত লড়াই শুরু হয়। এই লড়াইয়ের প্রধান দুই নায়ক হলেন ‘হাজী ভিলা’র মালিক আলহাজ্ব মতিন সাহেব এবং তাঁরই খালাতো ভাই, শহরফেরত ব্যবসায়ী আনিস চৌধুরী। তাঁদের লড়াইটা ঠিক শত্রুতার নয়, বরং ‘কার চেয়ে কার দাপট বেশি’ তা প্রমাণের। ঈদের সাত দিন আগে আনিস চৌধুরী ঢাকা থেকে ট্রাকে করে এক বিশাল ‘ব্রাহমা’ জাতের গরু নিয়ে এলেন। গরুর গলায় ঝোলানো হলো লাল রঙের এক ডিজিটাল বোর্ড, যেখানে তার ওজন এবং দামের অংকটা লাল আলোয় জ্বলজ্বল করছে। গ্রামের মানুষ সেই গরু দেখতে ভিড় জমাল। আনিস চৌধুরী ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে দামি চুরুট টানতে টানতে বললেন, “বুঝলে মতিন, ত্যাগের কাজে কোনো কার্পণ্য করতে নেই। সাড়ে দশ লাখ টাকা দিয়ে আনলাম। আল্লাহর রাস্তায় সেরাটা না দিলে কি আর কুরবানি হয়?” মতিন সাহেবের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, ‘আমি গ্রামের বনেদি গৃহস্থ, আমার ইজ্জত কি ওই শহরের নব্য ধনীর কাছে ধুলোয় মিশবে?’ পরদিন ভোরেই তিনি বিশ্বস্ত লোক নিয়ে কুষ্টিয়ার নামকরা খামারে ছুটলেন। অনেক দরদামের পর বারো লাখ টাকায় এক কালো কুচকুচে পাহাড়সম গরু কিনে তবেই শান্ত হলেন। গরুর নাম দিলেন ‘শান্তিপুরের রাজা’। ঈদের দুই দিন আগে থেকে দুই বাড়িতেই উৎসবের আমেজ। আলোকসজ্জা হয়েছে এমনভাবে যেন ঈদ নয়, বিয়েবাড়ি। সারাদিন মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে দুই গরুর গুণগান। কিন্তু এই শোরগোলের ঠিক মাঝখানেই গ্রামের শেষ সীমানার এক জীর্ণ কুঁড়েঘরে বসে কাঁদছিলেন জমিলা বেওয়া। তাঁর একমাত্র নাতি কালু জ্বরে ধুঁকছে সাত দিন ধরে। হাতে কোনো টাকা নেই। কুরবানি তো দূরের কথা, নাতির মুখে দুমুঠো ভাতের চাল জোগাড় করাই দায়। জমিলা বেওয়া অনেক আশা নিয়ে মতিন সাহেবের কাছে গেলেন। মতিন সাহেব তখন তাঁর ‘রাজা’কে আপেল খাওয়াচ্ছিলেন। জমিলা কাতর হয়ে বললেন, “হাজী সাব, নাতিটা আমার মইরা যাইতেছে। চিকিৎসার লাইগা কয়েকটা টাকা যদি ধার দিতেন, আমি আপনার ক্ষেতে কাম কইরা শোধ দিয়া দিমু।” মতিন সাহেব বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকালেন, “দেখো জমিলা, এখন যজ্ঞের সময়। সামনে কুরবানি, কত খরচ বুঝতেই পারছো। আর এই সময়ে ওসব অলুক্ষুণে কথা বলো না তো! যাও, ঈদের পরে আসো।” জমিলা বেওয়া এরপর গেলেন আনিস চৌধুরীর কাছে। আনিস সাহেব তখন ব্যস্ত গরুর সাথে সেলফি তুলতে। জ্যামিতিক হিসাব আর লৌকিকতার ভিড়ে জমিলার কথা তাঁর কানেই পৌঁছাল না। দারোয়ান দিয়ে বের করে দিলেন তাঁকে। ঈদের দিন সকালে যখন দুই বাড়িতে রাজকীয় কুরবানি চলছে, তখন গ্রামের হাসপাতালের বারান্দায় একলা বসে ছিলেন জমিলা বেওয়া। তাঁর সেই ছোট্ট নাতি কালু চিরতরে শান্ত হয়ে গেছে। চিকিৎসার অভাবে নয়, বরং তার চেয়েও বড় ‘অভাবের’ বলি হয়েছে সে। এদিকে মতিন সাহেব আর আনিস সাহেবের বাড়ির সামনে তখন গোশতের পাহাড়। কয়েক শ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেখানে চলছে হাড় আর চর্বি দেওয়ার মহোৎসব। ভালো গোশতগুলো প্যাকেট হয়ে বড় বড় ফ্রিজে চলে যাচ্ছে রাতের বড় ভোজের জন্য। সন্ধ্যায় দুই ভাই একসাথে বসে ডিনার করছিলেন। আনিস চৌধুরী বললেন, “ভাইজান, এবারের কুরবানিটা কিন্তু জমল। সবাই আমার গরুর কথাই বলছে।” মতিন সাহেব তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বললেন, “ঠিকই বলেছো। তবে আমার ‘রাজা’র গোশতটা কিন্তু বেশি নরম হয়েছে। তৃপ্তিই আলাদা!” ঠিক তখনই জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মতিন সাহেব দেখলেন, দূরে হাসপাতালের দিক থেকে একটা ছোট খাটিয়া অন্ধকার রাস্তা দিয়ে গোরস্তানের দিকে যাচ্ছে। পেছনে শুধু একজন বুড়ি কুঁজো হয়ে হাঁটছেন। হঠাৎ করে কেন জানি মতিন সাহেবের গলায় দামী গোশতটা আটকে গেল। তাঁর মনে পড়ল জমিলার সেই করুণ মুখটা। তিনি তাকিয়ে দেখলেন ড্রয়িংরুমে সাজানো সেই গরুর শিং আর ঝকঝকে আলোকসজ্জা। তাঁর মনে হলো, এই ঝকমকে আলো আর দানবীয় পশুর ভিড়ে প্রকৃত ত্যাগের আত্মাটা অনেক আগেই শ্বাসরোধ হয়ে মারা গেছে। আনিস চৌধুরী আবার হাসিমুখে গোশতের টুকরো এগিয়ে দিলেন, কিন্তু মতিন সাহেব আর হাত বাড়াতে পারলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি আজ পশুকে কুরবানি দেননি, বরং পশুর মাংস আর নিজের অহংকারের উৎসবে মেতে উঠেছেন মাত্র। ত্যাগ নয়, এ কেবল এক মুখোশধারী বিজয়োল্লাস।

বুধবার, ২০ মে, ২০২৬

দুর্বল ঈমান মুনাফিকির আলামত

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
ইসলামের দৃষ্টিতে মুনাফিকি দুই প্রকার: বড় মুনাফিকি (Nifaq al-I'tiqadi): এটি হলো অন্তরে কুফর গোপন করা কিন্তু মুখে ইসলামের দাবি করা। এটি মানুষকে ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ খারিজ করে দেয়। ছোট মুনাফিকি (Nifaq al-'Amali): এটি হলো এমন কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যা মুনাফিকদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এটি মূলত ঈমানের দুর্বলতা থেকে জন্ম নেয়। ছোট মুনাফিকি বনাম দুর্বল ঈমান ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে 'দুর্বল ঈমান' এবং 'মুনাফিকি'—এই দুইয়ের মধ্যে অত্যন্ত গভীর ও সতর্কতামূলক সম্পর্ক রয়েছে। সব দুর্বল ঈমানদারই মুনাফিক নন, তবে ঈমান দুর্বল হলে মানুষের মধ্যে মুনাফিকি বৈশিষ্ট্যগুলো বাসা বাঁধে। সাহাবী হানজালা (রা.)-এর ঘটনাটি এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি যখন রাসূল (সা.)-এর কাছ থেকে দূরে সরে এসে পার্থিব কাজে ব্যস্ত থাকতেন, তখন তার মনে হতো যে তিনি 'মুনাফিক' হয়ে গেছেন। রাসূল (সা.) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, এটি মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা, কিন্তু সবসময় একই অবস্থায় থাকা সম্ভব নয়। ২. ঈমানের দুর্বলতা যেভাবে মুনাফিকির পথ প্রশস্ত করে কুরআন মাজিদে মুনাফিকদের প্রধানতম পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মানসিক দোদুল্যমানতা ও ভীতু স্বভাব। সূরা আনকাবুতের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখেছি, যারা নির্যাতনের ভয়ে ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন করে কাফেরদের সাথে আপস করছিল, তাদের সেই ভীরুতাই ছিল মূলত ঈমানের দুর্বলতা। আল্লাহ তাআলা তাদের এই অবস্থাকে মুনাফিকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সূরা আল-আনকাবুত মক্কায় মুসলমানদের ওপর চরম নির্যাতনের সেই সময়ে নাযিল হয়েছিল যখন তারা হাবশায় হিজরতের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তৎকালীন কঠিন পরিস্থিতিতে মুমিনদের ঈমানের দৃঢ়তা পরীক্ষার জন্য এবং তাদের ধৈর্য ধারণে উৎসাহিত করার জন্য এই সূরাটি নাযিল হয়। এতে পূর্ববর্তী নবীদের সময়কার ভয়াবহ নির্যাতন ও সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে, যাতে মুসলমানরা বুঝতে পারে যে—আল্লাহর সাহায্য আসার আগে পরীক্ষার সময়কাল পার হওয়া অপরিহার্য। সূরার শুরুতেই (২-৩ আয়াতে) আল্লাহ বলেন— "মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছি। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন (ঈমানের দাবিতে) কারা সত্যবাদী, আর অবশ্যই জেনে নেবেন কারা মিথ্যাবাদী।" একই সূরার ১০-১১ আয়াতে আল্লাহ বলেন— "মানুষের মধ্যে এমনও আছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি’, কিন্তু আল্লাহর পথে কষ্ট পেলে তারা মানুষের নির্যাতনকে আল্লাহর আযাবের মতো মনে করে... আল্লাহ কি সৃষ্টিকুলের অন্তরে যা আছে তা সবচেয়ে ভালো জানেন না? আর আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করবেন কারা ঈমানদার, আর অবশ্যই প্রকাশ করবেন কারা মুনাফিক।" এখানে ধাপগুলো দেখুন: ১. মুখে ঈমানের দাবি ২. কষ্ট এলে ভেঙে পড়া ৩. আল্লাহ তাকে ‘দুর্বল মুমিন’ বলেননি, বলেছেন *মুনাফিক*। এই দুর্বল ঈমান মানে কম জানা নয়, এর মানে হলো মানুষের ভয়কে আল্লাহর ভয়ের উপরে রাখা। ভয়ের এই উল্টে যাওয়াকেই কুরআন মুনাফিকি বলে। অন্য সূরাগুলোতেও একই লক্ষণ দেখা যায়: ক) অন্তরের রোগ নিয়ে ঈমানের দাবি আল-বাকারা : ৮-১০: "মানুষের মধ্যে এমন আছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করি’, অথচ তারা মুমিন নয়... তাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, ফলে আল্লাহ তাদের ব্যাধি বাড়িয়ে দিয়েছেন।" এই ব্যাধি হলো সন্দেহ, সরাসরি কুফর নয়। নিজেকে বারবার মিথ্যা বলার কারণে রোগ বাড়ে। খ) অলসতা ও দোদুল্যমানতা আন-নিসা : ১৪২-১৪৩: "নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দিতে চায়... তারা যখন নামাজে দাঁড়ায়, অলসভাবে দাঁড়ায়, লোক দেখানোর জন্য, আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে। তারা দোদুল্যমান, না এদের দিকে, না ওদের দিকে।" আল্লাহর স্মরণ কম, লোক দেখানো নামাজ, সিদ্ধান্তহীনতা— এগুলোকে ‘ঈমান কম’ বলা হয়নি, এগুলোকে মুনাফিকের লক্ষণ বলা হয়েছে। গ) আল্লাহর রাস্তায় ত্যাগ (Sacrifice) এড়াতে অজুহাত চাওয়া আত-তাওবা : ৪৫: "তোমার কাছে অনুমতি চায় কেবল তারাই যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না এবং যাদের অন্তর সন্দেহে ভরা, তাই তারা সন্দেহে দুলছে।" আত-তাওবা:৫৪ তে একই অলসতা: "তারা নামাজে আসে না অলসতা ছাড়া।" ঘ) প্রতিশ্রুতি অঙ্গীকার/শপথ ভঙ্গের কারণে অন্তরে মুনাফিকি বসে যাওয়া: আত-তাওবা :৭৭: "ফলে তিনি তাদের অন্তরে মুনাফিকি স্থায়ী করে দিলেন সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত, কারণ তারা আল্লাহর সাথে করা ওয়াদা ভঙ্গ করেছে এবং মিথ্যা বলত।" ঙ) ঈমান এনে পরে ফিরে যাওয়া আল-মুনাফিকুন ৬৩:৩: "এটা এজন্য যে তারা ঈমান এনেছিল, তারপর কুফরি করেছে, তাই তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়েছে, ফলে তারা বোঝে না।" কুরআন বারবার উল্লেখ করেছে যে,, যে ঈমান পরীক্ষায় টেকে না, যে দুনিয়ার জন্য সত্যকে ছেড়ে দেয়, তার অন্তর সিল হয়ে যায় — এটাই মুনাফিকের চিহ্ন, শুধু গুনাহগার মুমিনের নয়। ৩. হাদিসে মুনাফিকের বাস্তব চিহ্ন রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন কিছু অভ্যাসের কথা বলেছেন যাতে দুর্বল, মুনাফিকি ঈমানকে শক্ত হওয়ার আগেই চেনা যায়: তিনটি আলামত: "মুনাফিকের আলামত তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন প্রতিশ্রুতি দেয় ভঙ্গ করে, যখন আমানত রাখা হয় খিয়ানত করে।" — সহিহ বুখারি চারটি বৈশিষ্ট্য: "যার মধ্যে চারটি থাকবে সে খাঁটি মুনাফিক... ১. আমানত রাখলে খিয়ানত করে। ২. কথা বললে মিথ্যা বলে। ৩. চুক্তি করলে বিশ্বাসঘাতকতা করে। ৪. ঝগড়া করলে অশ্লীল গালি দেয়।" — সহিহ বুখারি এগুলো একবার ক্লান্ত হয়ে ইবাদতে ঢিল দেওয়া নয়। এগুলো এমন অভ্যাস যা এমন অন্তর থেকে আসে যে আল্লাহর চেয়ে মানুষকে বেশি ভয় পায়, নিজের ইমেজ রক্ষা করে, আল্লাহর হুকুমকে দরকষাকষির বিষয় মনে করে — ঠিক যেমন আল-আনকাবুত (২৯):১০ এ বলা হয়েছে, মানুষের ফিতনাকে আল্লাহর আযাব মনে করা। ৪. দুর্বল ঈমান কেন নিফাকের দরজা ১. সত্যিকারের ঈমান আনুগত্যে বাড়ে, গুনাহে কমে, কিন্তু তার ভিত্তি থাকে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও ভয়। স্বর্ণের মত অগ্নি পরীক্ষায় পুড়ে পুড়ে তা আরো বেশি খাঁটি হয়। ২. দুর্বল, মুনাফিকি ঈমান ভিত্তিটাই উল্টে দেয়: মানুষের ভয়, প্রশংসার লোভ, দুনিয়ার হিসাব প্রধান হয়ে যায়। ৩. কুরআন আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা গুনাহগারকে কখনো মুনাফিক বলেনি। বরং যারা বিজয়ের পর বলে ‘আমরা তোমাদের সাথেই ছিলাম’ (২৯:১০), পার্থিব স্বার্থকে সত্যের উপরে বেছে নেয়, তাদেরকেই মুনাফিক বলেছে। সূরার নামের মতো ভাবুন — মাকড়সার জাল দেখতে নিরাপদ মনে হয়, কিন্তু প্রথম বাতাসেই ছিঁড়ে যায়। আল্লাহ ২৯:৪১ এ বলেন, সবচেয়ে দুর্বল ঘর মাকড়সার ঘর — এটাই মানুষের/ জাগতিক স্বার্থের উপর ভরসা করা দুর্বল ঈমানের নিখুঁত ছবি। তাই আল-আনকাবুত ও অন্যান্য সূরা ও হাদিসের আলোকে বলা যায়, যে দুর্বল ঈমান পরীক্ষায় ভেঙে পড়ে, লোক দেখানোকে ভালোবাসে, আমানত নষ্ট করে, আল্লাহ ও দুনিয়ার মাঝে দ্বিধায় দোলে — তা কোনো নিরপেক্ষ আধ্যাত্মিক ঘাটতি নয়। এটি কুরআনে বর্ণিত মুনাফিকির চিহ্ন। আর এর পরপরই সমাধান দেওয়া হয়েছে তাওবা, দৃঢ়তা ও ইখলাস — যেমন আন-নিসা ৪:১৪৬ এ বলা হয়েছে: “অবশ্য তারা এদের মধ্যে শামিল নয়, যারা তাওবা করে নিজদেরকে শুধরে নেয়, আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে এবং আল্লাহর জন্য নিজদের দীনকে খালেস করে, তারা মুমিনদের সাথে থাকবে। আর অচিরেই আল্লাহ মুমিনদেরকে মহাপুরস্কার দান করবেন।”

সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

যখন আল্লাহর সাহায্য এসে যায় (বদরের অলৌকিক উপাখ্যান)

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
১৭ই রমজান, ২ হিজরি। আরবের তপ্ত মরুভূমির বুকে বদর নামক প্রান্তরে ইতিহাস এক নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে। একদিকে মক্কার সুসজ্জিত, অহংকারী এক হাজার কুরাইশ সৈন্য—যাদের পরনে চকচকে বর্ম, হাতে ধারালো তলোয়ার, আর অহংকারের উত্তাপে তাদের চোখগুলো জ্বলছে। অন্যদিকে মাত্র ৩১৩ জন মুসলমান। তাদের অনেকের হাতে ঠিকমতো অস্ত্রও নেই, ভাঙা তলোয়ার আর খেজুরের ডালই তাদের ভরসা। আত্মরক্ষার বর্ম বলতে প্রায় কিছুই নেই। মানবীয় যুক্তির সব হিসাব-নিকাশ বলছিল, এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই শেষ। কিন্তু সেই তপ্ত বালুচরে যা ঘটতে যাচ্ছিল, তা মানব ইতিহাসের কোনো যুদ্ধবিদ্যায় লেখা ছিল না। সেখানে নেমে আসতে যাচ্ছিল আসমানী ফয়সালা, যার প্রতিটি পরতে পরতে মিশে ছিল অলৌকিকতার ছোঁয়া। ১. প্রশান্তির ঘুম এবং রহমতের বৃষ্টি যুদ্ধের আগের রাত। মুসলিম শিবিরে এক অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ। সংখ্যার এই বিশাল ব্যবধান আর নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেকোনো সাধারণ মানুষের বুক কেঁপে ওঠার কথা। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটল প্রথম অলৌকিক ঘটনা। এক গভীর, অলৌকিক তন্দ্রাচ্ছন্নতা নেমে এল মুসলিম শিবিরে। যুদ্ধের আগের রাতে যেখানে সেনাদের চোখ থেকে ঘুম উড়ে যাওয়ার কথা, সেখানে ৩১৩ জন মুজাহিদ এমন এক শান্তিতে ঘুমাতে লাগলেন, যেন তারা কোনো পরম নিরাপদ আশ্রয়ে আছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ প্রশান্তি (তন্দ্রা)। একই রাতে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠল। মরুভূমিতে বৃষ্টি নামল। কিন্তু এই বৃষ্টি দুই শিবিরের জন্য দুই রকম বার্তা নিয়ে এলো। কুরাইশদের তাবুর দিকে বৃষ্টি রূপ নিল এক কাদাময় মরণফাঁদে। তাদের ঘোড়া আর উটগুলো পিছলে যেতে লাগল, মাটি নরম হয়ে তাদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটাল। অথচ মুসলিম শিবিরে সেই বৃষ্টি ঝরল আশীর্বাদ হয়ে। মরুভূমির আলগা, উড়ন্ত বালু বৃষ্টির ছোঁয়ায় জমে শক্ত হয়ে গেল, যাতে মুসলিম সেনারা শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে পারেন। শুধু তাই নয়, এই পানি দিয়ে তারা অজু এবং গোসল সেরে নিজেদের পবিত্র করলেন। ২. আরিশের কান্না এবং আসমানের দরজা যুদ্ধের দিন সকালে নবী মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জন্য তৈরি করা ছোট খেজুর পাতার তাঁবুতে (আরিশ) সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। তাঁর দুই হাত আসমানের দিকে তোলা। তিনি এত আকুল হয়ে কাঁদছিলেন যে, তাঁর কাঁধ থেকে চাদর মোবারক নিচে পড়ে যাচ্ছিল। তিনি বারবার বলছিলেন: > *"হে আল্লাহ! আজ যদি এই ছোট্ট দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে এই পৃথিবীতে তোমার ইবাদত করার মতো আর কেউ বেঁচে থাকবে না। হে আল্লাহ! তোমার দেওয়া বিজয়ের ওয়াদা পূরণ করো।"* > বিশ্বস্ত সঙ্গী আবু বকর (রা.) পরম মমতায় চাদরটি টেনে তাঁর কাঁধে তুলে দিলেন এবং বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, যথেষ্ট হয়েছে। আপনার রব নিশ্চয়ই আপনার ডাক শুনেছেন।" ঠিক তখনই নবীজি (সা.)-এর পবিত্র মুখমণ্ডলে এক স্বর্গীয় আলো জ্বলে উঠল। তিনি তাঁবু থেকে বের হয়ে সাহাবিদের বললেন, "তোমরা সুসংবাদ নাও! জিবরাইল এসে গেছেন, তাঁর ঘোড়ার লাগাম ধরে, যুদ্ধের পোশাকে!" ৩. সাদা পাগড়ির অশ্বারোহী বাহিনী যুদ্ধ শুরু হলো। তরবারির ঝনঝনানি, ধুলোবালি আর রণহুঙ্কারে চারপাশ কেঁপে উঠল। কিন্তু যুদ্ধের মাঝপথেই কুরাইশরা এক অদ্ভুত কাণ্ড লক্ষ করল। মুসলিমদের পেছন থেকে হঠাৎ এক তীব্র ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে লাগল। সেই হাওয়ার সাথে ভেসে আসতে লাগল অগণিত ঘোড়ার খুরের আওয়াজ, অথচ ধুলোর মেঘ ভেদ করে কোনো সাধারণ ঘোড়া দেখা যাচ্ছিল না। সাহাবিরা দেখতে পেলেন, শুভ্র পোশাক পরা, মাথায় সাদা ও হলুদ পাগড়ি বাঁধা একদল অশ্বারোহী আকাশ থেকে নেমে আসছেন। তারা কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না, তারা ছিলেন স্বয়ং ফেরেশতাদের বাহিনী! এক হাজার, তিন হাজার, এবং পরবর্তীতে পাঁচ হাজার ফেরেশতার এক অদৃশ্য ও দৃশ্যমান দল সেদিন বদরের প্রান্তরে নেমে এসেছিল মুসলমানদের সাহায্যার্থে। রণাঙ্গনে এক সাহাবি এক কুরাইশ সৈন্যকে তাড়া করছিলেন। তিনি তরবারি আঘাত করার আগেই এক অদ্ভুত চাবুকের শব্দ শুনতে পেলেন—*‘হায়জুম! সামনে বাড়ো!’* (হায়জুম হলো জিবরাইল আলাইহিস সালামের ঘোড়ার নাম)। পলকের মধ্যে সেই কুরাইশ সৈন্যের মাথা কেটে মাটিতে পড়ে গেল, অথচ সাহাবির তরবারি তখনও বাতাসে ঝুলছিল! আসমানী তরবারি সেদিন কাফেরদের অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছিল। ৪. খেজুরের ডাল যখন জাদুকরী তলোয়ার যুদ্ধের তীব্রতায় সাহাবি উকাশা ইবনে মিহসান (রা.)-এর তলোয়ারটি হঠাৎ ভেঙে দু টুকরো হয়ে গেল। নিরস্ত্র উকাশা দিশেহারা হয়ে নবীজি (সা.)-এর কাছে দৌড়ে এলেন। নবীজি (সা.) এদিক-ওদিক তাকিয়ে মাটি থেকে একটি শুকনো খেজুরের ডাল তুলে নিলেন। তিনি সেটি উকাশার হাতে দিয়ে বললেন, "উকাশা, এটি দিয়েই যুদ্ধ করো।" উকাশা (রা.) যখনই ডালটি হাতে নিলেন, এক পরম বিস্ময় অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য। সামান্য কাঠের ডালটি মুহূর্তের মধ্যে এক চকচকে, সুদীর্ঘ এবং অত্যন্ত ধারালো ইস্পাতের তলোয়ারে রূপান্তরিত হয়ে গেল! এই অলৌকিক তলোয়ারটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘আল-আউন’ (সাহায্য)। উকাশা (রা.) আজীবন, এমনকি পরবর্তী যুগের যুদ্ধগুলোতেও এই অলৌকিক তলোয়ারটি ব্যবহার করেছিলেন। ৫. এক মুঠো ধুলো এবং কুরাইশদের অন্ধত্ব যুদ্ধের একপর্যায়ে কুরাইশদের আক্রমণ যখন প্রচণ্ড রূপ নিল, তখন আল্লাহ তাআলা নবীজি (সা.)-কে এক বিশেষ নির্দেশ দিলেন। নবীজি (সা.) যুদ্ধের ময়দান থেকে এক মুঠো ধুলো আর কঙ্কর নিজের হাতে তুলে নিলেন। এরপর কুরাইশ বাহিনীর দিকে তাকিয়ে সেই ধুলো ছুঁড়ে মারলেন এবং বললেন: > *"শাহাতিল উজুহ!" (এই মুখগুলো বিকৃত হয়ে যাক!)* > মানুষের হাত থেকে ছিটকে যাওয়া এক মুঠো ধুলো বড়জোর কয়েক গজ দূরে গিয়ে পড়ার কথা। কিন্তু এখানেই ঘটল প্রকৃতির নিয়ম ভাঙার খেলা। সেই এক মুঠো ধুলো এক প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়ার রূপ নিল। অলৌকিকভাবে, সেই ধুলোর প্রতিটি কণা মক্কার এক হাজার সৈন্যের প্রত্যেকের চোখে, নাকে এবং মুখে গিয়ে আঘাত করল। কুরাইশ সৈন্যরা আচমকা অন্ধের মতো হয়ে গেল। তারা চোখ রগড়াতে লাগল, দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে নিজেদের মধ্যে ধাক্কা খেতে লাগল। সুসজ্জিত এক বিশাল বাহিনী মুহূর্তের মধ্যে এক বিশৃঙ্খল মরণস্তূপে পরিণত হলো। পবিত্র কুরআনে এই ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে: > *"আর আপনি যখন ধুলো ছুঁড়েছিলেন, তখন আপনি ছোঁড়েননি, বরং আল্লাহই ছুঁড়েছিলেন।" (সূরা আনফাল: ১৭)* > সমাপ্তি: ইতিহাসের মহাকাব্য বিকেলের সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ছে, বদরের প্রান্তর তখন শান্ত। আবু জাহেলসহ মক্কার ৭০ জন শীর্ষ নেতা ও যোদ্ধা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, আরও ৭০ জন বন্দী। আর মুসলমানরা? মাত্র ১৪ জন শহীদের বিনিময়ে তারা ছিনিয়ে এনেছে এক অভাবনীয়, অলৌকিক বিজয়। বদরের যুদ্ধ কেবল তরবারি আর শক্তির যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল বিশ্বাসের সাথে অহংকারের, সত্যের সাথে মিথ্যার চিরন্তন লড়াই। মরুভূমির সেই তপ্ত বালুচরে ৩ isolation৩ জন মানুষের নিখাদ বিশ্বাস আর আল্লাহর অদৃশ্য শক্তির মিলন ঘটেছিল। বদর প্রমাণ করে দিয়েছিল, সংখ্যা বা অস্ত্র দিয়ে নয়, ইতিহাস নির্ধারিত হয় আসমানের ফয়সালায় এবং ইমানের অজেয় শক্তিতে।