Muhammad Abul Hussain
শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬
নীল গ্রহের জাদুর লাটিম 🌍✨
অনেক অনেক দিন আগের কথা নয়, এই তো আমাদের আজকের কথা! মহাকাশের এক কোণে ভেসে বেড়ায় আমাদের চেনা, অতি সুন্দর এক নীল গ্রহ—তার নাম পৃথিবী। পৃথিবীতে আছে সবুজ ঘাস, নীল আকাশ, ঝুম বৃষ্টি আর মিষ্টি রোদ। কিন্তু তোমরা কি জানো, পৃথিবীকে এতো সুন্দর আর আমাদের থাকার উপযোগী করে তোলার পেছনে লুকিয়ে আছে এক দারুণ জাদুর খেলা?
চলো আজকে সেই জাদুর গল্পটাই শুনি!
১. পৃথিবীর সেই ম্যাজিক কোণ 📐
আমাদের পৃথিবী কিন্তু মহাকাশে একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঘোরে না। সে একটুখানি হেলে থাকে, ঠিক যেন কোনো লাজুক খুকু! বৈজ্ঞানিকরা বলেন, পৃথিবী তার কক্ষপথের সাথে প্রায় ২৩^\circ কোণ করে হেলে থাকে।
আর এই হেলে থাকাটাই হলো প্রকৃতির আসল যাদুর কাঠি!
ঋতু বদলের খেলা: এই সামান্য একটু হেলে থাকার কারণেই পৃথিবীতে সুন্দর সুন্দর ঋতু আসে—কখনো গ্রীষ্মের গরম, কখনো বর্ষার রিমঝিম বৃষ্টি, আবার কখনো শীতের মিষ্টি সকাল।
যদি হেলে না থাকত?
পৃথিবী যদি একদম সোজা থাকত, তবে এক জায়গায় সারাজীবন শুধু প্রচণ্ড গরম আর অন্য জায়গায় শুধু হাড়কাঁপানো ঠান্ডা থাকত! আমরা পেতাম না কোনো ঋতুর আশীর্বাদ, আর বৃষ্টিও হতো না ঠিকঠাক। পৃথিবীটা হয়ে যেত এক অদ্ভুত আর অচেনা জায়গা!
২. প্রতিবেশী গ্রহদের অদ্ভুত কাণ্ড! 🪐
আমাদের প্রতিবেশী গ্রহদের অবস্থা দেখলে তোমরা আরও অবাক হবে!
ইউরেনাসের অদ্ভুত রাত: ইউরেনাস গ্রহটি অনেক বেশি হেলে থাকার কারণে সেখানে আবহাওয়া বড্ড খামখেয়ালী! আমাদের পৃথিবীতে যেমন মেরু অঞ্চলে কয়েক মাস রাত থাকে, ইউরেনাসে সেখানে একনাগাড়ে **২০টি বছর** শুধু রাতই থাকে! ভাবো একবার, টানা ২০ বছর কোনো সকাল নেই!
মঙ্গল মামার অস্থিরতা: আমাদের ঠিক পাশের বাড়ির প্রতিবেশী মঙ্গল গ্রহের আবহাওয়াও এই হেলে থাকার ভারসাম্যহীনতার কারণে ভীষণ অস্থির!
৩. মহাকাশের এক অদৃশ্য লাটিম 🪵🔄
তোমরা কি কখনো লাটিম ঘুরিয়েছ? লাটিম যখন ঘুরতে ঘুরতে একটু পুরোনো বা ধীর হয়ে আসে, তখন সে নিজের জায়গায় ঘোরার পাশাপাশি তার মাথাটাকেও গোল করে একটুখানি দোলাতে থাকে না?
আমাদের পৃথিবীটাও কিন্তু মহাকাশে ঠিক তেমনি একটা লাটিমের মতো দুলছে! বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে 'অক্ষ ঘূর্ণির অগ্রগমন চক্র' (Precessional Cycle)।
* এই লাটিমের মতো মাথা ঘোরানোর একটা পুরো চক্কর দিতে পৃথিবীর সময় লাগে কত জানো? পুরো **২৬,০০০ বছর**!
* প্রতি ২৬,০০০ বছর পর পর এই চক্রটি আবার নতুন করে শুরু হয়।
> কেন এই দুলুনি জরুরি?
> পৃথিবী মহাকাশে সেকেন্ডে প্রায় ২৯.৮ কিলোমিটার তীব্র গতিতে ছুটে চলছে! এত জোরে ঘোরার পরও এই লাটিমের মতো দুলুনির কারণে পৃথিবী তার নির্দিষ্ট পথ বা 'তল' থেকে ছিটকে যায় না। যদি এই ব্যবস্থা না থাকত, তবে পৃথিবী সূর্যের খুব কাছে চলে গিয়ে পুড়ে ছাই হয়ে যেত, না হয় সূর্য থেকে দূরে গিয়ে বরফ হয়ে জমে যেত! এই অদৃশ্য শক্তির নিখুঁত টালমাটাল ছন্দই আমাদের আবহাওয়াকে লাখ লাখ বছর ধরে একই রকম রাখছে।
৪. চাঁদমামার পাহারা 🌙🛡️
এই জাদুর খেলায় আমাদের রাতের আকাশের প্রিয় চাঁদমামাও কিন্তু বড় এক পাহাদার! চাঁদ তার মহাকর্ষ বল দিয়ে পৃথিবীকে শক্ত করে ধরে রাখে।
যদি চাঁদ না থাকত, তবে পৃথিবীর ২৬,০০০ বছরের এই চমৎকার লাটিম দুলুনির চক্রটি হয়ে যেত **৮১,০০০ বছর**! আর তখন পৃথিবী এত জোরে জোরে কাঁপতে (Oscillate) শুরু করত যে, পুরো আবহাওয়া ধ্বংস হয়ে যেত এবং অন্যান্য গ্রহদের ধাক্কায় পৃথিবী তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলত! কিন্তু চাঁদ তা হতে দেয় না।
এক মহা-কারিগরের গল্প ☝️✨
বন্ধুরা, তাহলে ভাবো একবার! কত হাজার হাজার নিয়ম আর সূক্ষ্ম হিসাবকে একসাথে মিলিয়ে তবেই আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা হয়েছে। এমনি এমনি বা হঠাৎ করে কিন্তু এত সুন্দর একটা ভারসাম্য তৈরি হতে পারে না।
একজন মহাবিজ্ঞ ও পরম দয়ালু স্রষ্টা বা আল্লাহই এত নিখুঁত আর সুষমভাবে পুরো মহাবিশ্বকে সাজিয়েছেন—যাতে আমরা সুখে-শান্তিতে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারি। তাই যখনই আমরা বাইরের চমৎকার আবহাওয়া দেখব বা সুন্দর কোনো ঋতু উপভোগ করব, আমাদের মন যেন সেই অদৃশ্য সুনিপুণ সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে!
পৃথিবীর বাসযোগ্যতা: আল্লাহর অসীম দয়া
ভূমিকা:
মহাবিশ্বের সুবিশাল ও অন্তহীন সীমানায় আমাদের এই পৃথিবী এক পরম বিস্ময়। সৃষ্টির আদি থেকে আজ পর্যন্ত বিজ্ঞান ও দর্শনের নানা বাঁকে মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে—এই মহাবিশ্ব এবং এতে প্রাণের বিকাশ কি কেবলই এক আকস্মিক কাকতালীয় ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো সুনিপুণ মহাপরিকল্পনা? আধুনিক বিজ্ঞানের জয়যাত্রার এই যুগেও যখন আমরা পৃথিবীর নিখুঁত ভারসাম্য ও জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তখন এক বাক্যে স্বীকার করতে হয় যে, এই পৃথিবীর বাসযোগ্যতা কোনো অন্ধ প্রকৃতির খেয়াল নয়; বরং এটি মহান রাব্বুল আলামিনের এক অসীম দয়া, নিখুঁত পরিমাপ ও পরম অনুকম্পার জীবন্ত নিদর্শন।
মহাবিশ্বের সুনিপুণ পরিকল্পনা ও প্রাণের রহস্য:
অণুবীক্ষণ যন্ত্রের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগৎ থেকে শুরু করে দূরবীক্ষণ যন্ত্রে ধরা পড়া সুদূর মহাজাগতিক গ্যালাক্সি—মহাবিশ্বের সর্বত্রই এক সুগভীর শৃঙ্খলা ও নিয়মের রাজত্ব বিদ্যমান। বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত জড় অণু-পরমাণুর সম্মিলনে কীভাবে প্রাণের স্পন্দন তৈরি হলো, তার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। মানুষের অনুভূতি—প্রেম, ভালোবাসা, ভয়, কিংবা জীবনের মূল চালিকাশক্তি 'রুহ' বা প্রাণ আসলে কী, তা বিজ্ঞানীদের কাছে আজও এক পরম বিস্ময়। পবিত্র কোরআনেও স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, প্রাণ সম্পর্কিত জ্ঞান মানুষকে অত্যন্ত সামান্যই দেওয়া হয়েছে।
অনেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টিকে 'অবাধ বিস্তার' বা আকস্মিক ঘটনা বলে চালিয়ে দিতে চান। কিন্তু বিখ্যাত বিজ্ঞানী ফ্রেড হোয়েল এবং স্যার বার্নার্ড লোভেলের গাণিতিক হিসাব দেখায় যে, মহাবিশ্বে একটিমাত্র আমিষ অণু (প্রোটিন) বা এনজাইম নিজে নিজে বা কাকতালীয়ভাবে তৈরি হওয়ার গাণিতিক সম্ভাবনা একেবারেই অসম্ভব (যেমন: 10^{-40,000})। গাণিতিক চার্লস ইউজীন গাই-এর মতো গবেষকদের মতে, যদি কোনো বাহ্যিক স্রষ্টার পরিকল্পনা না থাকত, তবে একটি প্রোটিন অণু তৈরিতে যে সময় ও পদার্থের নড়াচড়ার প্রয়োজন হতো, তা সমগ্র মহাবিশ্বের বয়স ও দৃশ্য-অদৃশ্য পদার্থের তুলনায় লক্ষ-কোটি গুণ বেশি। জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় এই আমিষ অণু তৈরিতে সামান্যতম ব্যতিক্রম ঘটলে তা অমৃতের বদলে বিষে পরিণত হতো। এই জটিল ও নাজুক ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে যে অভাবনীয় সমন্বয় রক্ষা করা হয়েছে, তার কোনো একটি অংশ ব্যর্থ হলে সমস্ত জীবনব্যবস্থা নিমেষেই ধ্বংস হয়ে যেত। সুতরাং, এই মহাজাগতিক হিসাবই প্রমাণ করে যে, একজন মহাশক্তিধর ও মহাজ্ঞানী স্রষ্টা ছাড়া এই বাসযোগ্য পৃথিবীর অস্তিত্ব অসম্ভব।
**পানির অলৌকিকত্ব ও জীবনচক্র:**
পানির সহজলভ্যতার কারণে আমরা হয়তো এর প্রকৃত মূল্য অনুধাবন করি না। কিন্তু পানির রাসায়নিক ও বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করলে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের এক অলৌকিক রূপ ফুটে ওঠে। মেন্ডেলিফের পর্যাবৃত্ত সারণি (Periodic Table) অনুযায়ী, পানির সূত্রাগত ওজন (১৮) হিসেবে সাধারণ তাপমাত্রা ও চাপে এর গ্যাসীয় অবস্থায় থাকার কথা ছিল। হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো উপাদানগুলোর তুলনায় পানির অনেক আগেই বাষ্প হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও, এটি বিশেষ 'হাইড্রোজেন চেইন' ব্যবস্থার কারণে সাধারণ তাপমাত্রায় তরল থাকে এবং ১০০° সেলসিয়াসে ফুটতে শুরু করে। বিজ্ঞানের স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে পানির এই ব্যতিক্রমী আচরণের কারণেই পৃথিবীতে জীবন ধারণ সম্ভব হয়েছে।
পৃথিবীর ৭৫% এবং জীবদেহের প্রায় ৬০% পানি। পানির চমৎকার দ্রবণীয় গুণ এবং বাষ্পীভবন ক্ষমতার মাধ্যমেই পৃথিবীর জলচক্র আবর্তিত হয়, যা শুষ্ক ও মৃত ভূ-ভাগকে বারবার সঞ্জীবিত করে মানুষের জন্য খাদ্যের জোগান দেয়। এছাড়া পানি বরফে পরিণত হওয়ার সময় সুপ্ততাপ ছেড়ে দেয় এবং হালকা হয়ে পানির ওপরে ভেসে থাকে। এই বিশেষ ধর্মের কারণে প্রচণ্ড শীতেও বরফের স্তরের নিচে পানির তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ওপরে থাকে, যা সামুদ্রিক ও জলজ প্রাণীকুলকে বাঁচিয়ে রাখে। পবিত্র কোরআনের সূরা মুমিনুনের ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পানি বর্ষণ ও তা ভূমিতে সংরক্ষণ করার কথা মনে করিয়ে দিয়ে মানবজাতিকে সতর্ক করেছেন যে, তিনি চাইলে এই পানি অদৃশ্য করে দিতে পারেন। সাগরে বিশাল জাহাজ ভেসে থাকা থেকে শুরু করে সুপেয় পানির এই নিখুঁত আবর্তন স্রষ্টার এক অনন্য নিয়ামত।
দিনরাত্রির আবর্তন ও গ্রহসমূহের ঘূর্ণন
দিন ও রাত্রির নিয়মিত আবর্তন পৃথিবীর তাপমাত্রা ও জীবন টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত। আমাদের প্রতিবেশী গ্রহগুলোর দিকে তাকালে এই ভারসাম্য আরও স্পষ্ট হয়। যেমন, বুধ গ্রহ সূর্যের খুব কাছে হওয়া সত্ত্বেও এর ধীর আহ্নিক গতির কারণে এর আলোকিত ও অন্ধকার পৃষ্ঠের তাপমাত্রার ব্যবধান চরম (৩৫০° সে. থেকে -১৭০° সে.)। আবার শুক্র গ্রহের দীর্ঘ দিনের কারণে সেখানে তাপমাত্রা প্রায় ৪৮০° সে.। মঙ্গলের দিন-রাত্রির দৈর্ঘ্য পৃথিবীর সমান হলেও সূর্য থেকে দূরত্বের কারণে সেখানকার তীব্র শীত জীবনের অনুকূল নয়। এমনকি পৃথিবী ও চাঁদ সূর্য থেকে সমান দূরত্বে থাকা সত্ত্বেও চাঁদের আহ্নিক গতি অত্যন্ত কম হওয়ায় চাঁদের আলোকিত অংশ ১১৭° সে. উত্তাপে পুড়ে আর অন্ধকার অংশ -১৬৩° সে. শীতে জমে যায়। পক্ষান্তরে, পৃথিবীর জন্য নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট আহ্নিক ও বার্ষিক গতিই একে একমাত্র বাসযোগ্য গ্রহে পরিণত করেছে।
যদি পৃথিবীর একটি পিঠ সবসময় সূর্যের দিকে মুখ করে থাকত, তবে একপাশে চিরস্থায়ী দিন এবং অপর পাশে চিরস্থায়ী অন্ধকার ও বরফ-শীতল তুষারমৃত্যু নেমে আসত, যা উদ্ভিদের সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে সমস্ত প্রাণীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিত। কোরআন বহু আগেই মানুষকে এই দিন-রাত্রির পরিবর্তনের নিদর্শনের দিকে তাকিয়ে স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করার আহ্বান জানিয়েছে।
ভৌগোলিক ও অবস্থানগত সূক্ষ্ম পরিমাপ:
সমগ্র মহাবিশ্ব এক নিখুঁত গাণিতিক পরিমাপে তৈরি। পৃথিবীর আকার যদি চাঁদের মতো ছোট হতো, তবে মাধ্যাকর্ষণ কমে যাওয়ার কারণে বায়ুমণ্ডল ও পানি ধরে রাখা সম্ভব হতো না। আবার আকার যদি সূর্যের মতো বড় হতো, তবে মাধ্যাকর্ষণ ও বায়ুমণ্ডলের চাপ এতটাই বৃদ্ধি পেত যে মানুষের অস্তিত্বই অসম্ভব হয়ে পড়ত এবং জলচক্র ব্যাহত হতো। সূর্য থেকে পৃথিবীর বর্তমান দূরত্বও একদম নিখুঁত; এর থেকে দ্বিগুণ দূরে থাকলে তীব্র শীতে এবং অর্ধেক দূরত্বে থাকলে প্রচণ্ড গরমে সমস্ত জীবন ও উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে যেত।
পৃথিবীর ভূ-ত্বকের পুরুত্ব ও জলভাগের অনুপাতও এক আশ্চর্য পরিমাপের অধীন। পৃথিবীর ব্যাসার্ধ মাত্র দেড় মাইল ছোট হলে ভূ-অভ্যন্তরের তাপে ভূ-পৃষ্ঠের পানি ফুটতে শুরু করত, আর ভূ-ত্বক বেশি পুরু হলে উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় পানি বরফ হয়ে যেত। জলভাগ বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ হলে অতিরিক্ত বাষ্পীভবন হতো, আর অর্ধেক হলে ক্ষতিকারক রশ্মি ঠেকানো বায়ুমণ্ডলের পক্ষে অসম্ভব হতো। এমনকি চাঁদের বর্তমান আকৃতি ও দূরত্বও সমুদ্রের জোয়ার-ভাটাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যা নদীপথের যোগাযোগ ও চাষাবাদকে সচল রাখে।
**মহাজাগতিক সুরক্ষাকবচ ও বায়ুমণ্ডলের ছাঁকুনি:**
আমাদের এই পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে মহান আল্লাহ বায়ুমণ্ডল ও ভূ-চৌম্বকত্বের এক অদৃশ্য ও সুদৃঢ় সুরক্ষাবলয় তৈরি করে দিয়েছেন। সূর্য থেকে প্রতি মুহূর্তে যে ধ্বংসাত্মক সৌরবায়ু (Solar Wind) সেকেন্ডে ৫০০ মাইল বেগে ছুটে আসে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল তাকে প্রতাপে ফিরিয়ে দেয়। প্রতিদিন মহাশূন্য থেকে ধেয়ে আসা প্রায় ২০ লাখ বিধ্বংসী উল্কা বায়ুমণ্ডলের সুদীর্ঘ স্তর ও বাতাসের ঘর্ষণে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর আগেই ভস্মে পরিণত হয়। ওজোন স্তর, স্ট্রেটোস্ফিয়ার ইত্যাদি ক্ষতিকর এক্স-রে ও মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয় রশ্মিকে পুরোপুরি শোষণ করে নেয়, অথচ জীবনের জন্য অপরিহার্য অবলোহিত রশ্মি (Infrared) এবং দৃশ্যমান আলোকে একটি গাণিতিক মাত্রায় পৃথিবীতে প্রবেশ করতে দেয়। এছাড়া, এই বায়ুমণ্ডলের অনন্য গ্রিনহাউস ব্যবস্থার কারণে দিনের বেলার সূর্যতাপের ২০% অংশ রাতে ওজোন স্তরে আটকে থাকে, যার ফলে পৃথিবী রাতের বেলা হিমাঙ্কের নিচে চলে যায় না। ১৪০০ বছর আগে যখন আধুনিক বিজ্ঞান ছিল না, তখন আল-কোরআনে আকাশকে "সুরক্ষিত ছাদ" (৪০:৬৪) হিসেবে বর্ণনা করে মূলত এই বায়ুমণ্ডলেরই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
**অক্ষ-তির্যকতা ও আদি বায়ুমণ্ডলের রূপান্তর:**
সূর্যকে পরিভ্রমণকালে পৃথিবীর অক্ষ তার বার্ষিক গতির কক্ষের সঙ্গে যে ২৩.৫ ডিগ্রি কোণ (তির্যকতা) করে ঘুরে, তা মূলত এক জাদুর খেলার মতো। এই তির্যকতার কারণেই পৃথিবীতে ঋতুচক্রের আশীর্বাদ নেমে আসে, যা না থাকলে পৃথিবীর এক অংশে প্রচণ্ড উত্তাপ আর অন্য অংশে চরম ঠাণ্ডা থাকত। এই অক্ষের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিবর্তনকে সংশোধন করার জন্য রয়েছে 'অক্ষ ঘূর্ণির অগ্রগমন চক্র' (Precessional Cycle), যা লাটিমের মতো আবর্তিত হয়ে প্রতি ২৬,০০০ বছরে পৃথিবীর কক্ষতলের মান ঠিক রাখে। চাঁদের প্রভাবময় ঘূর্ণি এবং এই অদৃশ্য শক্তির কারণেই পৃথিবী তার কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয় না।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, সৃষ্টির জন্মলগ্নে পৃথিবীর এই বসবাস উপযোগী বায়ুমণ্ডল ছিল না এবং সেখানে কোনো মুক্ত অক্সিজেনও ছিল না। আজ থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে আসা আদি অণুকোষী জীব ও কৈশিক উদ্ভিদরা দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় কার্বন-ডাই-অক্সাইড ভেঙে বায়ুমণ্ডলে মুক্ত অক্সিজেন তৈরি করে আমাদের জন্য এই বাসযোগ্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।
**বংশধারা রক্ষা ও পরিবর্তন নিরোধী ছাতা:**
জীবজগতের হাজারো বিস্ময়ের মধ্যে অন্যতম হলো বংশ পরম্পরায় মানুষের শিশু অবিকৃত মানুষ হিসেবে এবং অন্যান্য প্রাণী তাদের নিজস্ব প্রজাতি অনুযায়ী অবিকৃতভাবে জন্মগ্রহণ করছে। মানুষের ক্রোমোজোমে জীনের বিন্যাসে পরিবর্তনের সম্ভাবনা এত বিশাল যে, তা গাণিতিক সংখ্যায় লিখতে গেলে মানুষের জীবনের বহু বছর কেটে যাবে। তা সত্ত্বেও হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের জিনগত কোনো বড় বিকৃতি ঘটছে না। বিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে কাজ করছে এক বিস্তীর্ণ পরিবর্তনবিরোধী 'বস্তু-কণিকা-বিস্তার' বা 'অ্যান্টিমিউটাজেনিক আমব্রেলা' (Anti-mutagenic Umbrella)। ভিটামিন সি, টোকোফেরলসহ প্রায় ২০০টিরও বেশি জ্ঞাত-অজ্ঞাত এজেন্ট জীবদেহের ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তনের হার কমিয়ে দিয়ে ক্যান্সারসহ মারাত্মক রোগ থেকে জীবজগৎকে রক্ষা করছে এবং আল্লাহর বাণী—"আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নাই" (৩০:৩০)-এর সত্যতা প্রমাণ করছে।
**প্রকৃতির ভারসাম্য ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা:**
উদ্ভিদের বংশ বিস্তারের দিকে তাকালে দেখা যায়, লক্ষ লক্ষ পরাগ রেণু বাতাসে অবাধে ছড়িয়ে পড়ার পর মাত্র দু-একটি পরাগ রেণু ফুলের আঠালো গর্ভকেশরে প্রতিস্থাপিত হয়ে নিষিক্তকরণ সম্পন্ন করে। এই পরাগ রেণু বহনের জন্য শত শত মাইল দূরের সমুদ্রে সৃষ্ট নিম্নচাপের ধীর বাতাস কাজ করে, যা প্রকারান্তরে উদ্ভিদের ফলন সচল রাখে। একইভাবে, কীটপতঙ্গরা নিজেদের অজান্তেই ফুল থেকে ফুলে ঘুরে পরাগায়ন ঘটিয়ে জীবজগতের খাদ্যের ভাণ্ডার নিশ্চিত করছে।
প্রকৃতির এই ভারসাম্য রক্ষার আরেকটি চমৎকার উদাহরণ হলো সালোক-সংশ্লেষণ (Photosynthesis)। প্রাণীকুল শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে যে ক্ষতিকর কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করছে, উদ্ভিদ তা গ্রহণ করে নিজের খাদ্য তৈরি করছে এবং সমপরিমাণ জীবনদায়ী অক্সিজেন বাতাসে ফিরিয়ে দিচ্ছে। ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল দূরের সূর্য, উদ্ভিদের ক্লোরোফিল, জলচক্র এবং মাটির নাইট্রোজেন চক্র—সবকিছু মিলে এক পরম নিখুঁত আবর্তন তৈরি করেছে। মানুষ যখনই বনের গাছপালা নিধন করে বা প্রকৃতির এই স্পর্শকাতর ভারসাম্যে হস্তক্ষেপ করে, তখনই বিপর্যয় নেমে আসে, যেমনটি ঘটেছিল অস্ট্রেলিয়ায় কৃত্তিম উপায়ে খরগোশ আমদানির পর মেষ শিল্পের বিপর্যয়ের মাধ্যমে।
**উপসংহার:**
পরিশেষে বলা যায়, এই বাসযোগ্য পৃথিবীর সুবিশাল জলভাগ, মৎস্য ও উদ্ভিদের প্রাচুর্য, মহাজাগতিক তরঙ্গের উপস্থিতি এবং গ্রহ-নক্ষত্রের পারস্পরিক প্রভাবের যে 'চেইন ওয়ার্ক' বা শৃঙ্খলিত ব্যবস্থা—তার কোনোটিই উদ্দেশ্যহীন বা অপ্রয়োজনীয় নয়। সৃষ্টির প্রতিটি ধূলিকণা ও অদৃশ্য সুরক্ষাবলয় মূলত মানুষের সেবায় নিয়োজিত। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ আজ চিন্তাশীল মানুষকে পুনরায় সেই মহান প্রতিপালকের দিকেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যিনি সমস্ত সৃষ্টিকে যথাযথ অনুপাতে পরিমিত করেছেন। এই অসীম সুন্দর ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ পৃথিবী মহান আল্লাহর এক অসীম দয়া ও করুণারই জীবন্ত মহাকাব্য, যার প্রতি আমাদের চিরন্তন কৃতজ্ঞতা ও নিরবচ্ছিন্ন আনুগত্য প্রকাশ করা একান্ত কর্তব্য।
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬
বিস্ময়কর বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা
নিকোলা টেসলা ছিলেন বিজ্ঞানের জগতের এমন এক 'পাগলাটে জাদুকর', যার কাহিনী শুনলে মনে হবে কোনো সায়েন্স ফিকশন মুভির গল্প পড়ছ। চলো, আজ আমরা টেসলার জীবনের সেইসব অদ্ভুত, মজার আর অবিশ্বাস্য ঘটনার গভীরে ডুব দিই।
১. বজ্রপাতের রাতে জন্ম
গল্পটা শুরু হয় ১৮৫৬ সালের এক ভয়ংকর ঝড়ের রাতে। বর্তমান ক্রোয়েশিয়ায় তখন আকাশ ফেটে বজ্রপাত হচ্ছিল। মাঝরাতে যখন টেসলা জন্ম নিলেন, ধাত্রী ভয় পেয়ে বলেছিলেন, "এই শিশু হবে অন্ধকারের সন্তান।" কিন্তু টেসলার মা গর্জে উঠে বলেছিলেন, "না, সে হবে আলোর সন্তান।" সত্যিই, বড় হয়ে টেসলা সারা পৃথিবীকে বৈদ্যুতিক আলোয় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন।
২. সেই বিড়াল আর বিদ্যুতের প্রথম পাঠ
ছোট্ট টেসলার সেরা বন্ধু ছিল তাঁর পোষা বিড়াল 'ম্যাকাক'। একদিন সন্ধ্যায় টেসলা যখন ম্যাকাকের পিঠে হাত বোলাচ্ছিলেন, হঠাৎ দেখলেন বিড়ালের লোমের ওপর দিয়ে নীল রঙের ছোট ছোট স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে বেরোচ্ছে! তিনি অবাক হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন এটা কী। বাবা বললেন, "এটা বিদ্যুৎ, যা আমরা বজ্রপাতের সময় আকাশে দেখি।" টেসলা সেদিনই ঠিক করেছিলেন, তিনি সারাজীবন এই বিদ্যুৎ নিয়ে খেলা করবেন।
৩. মাথায় আস্ত একটা ল্যাবরেটরি
টেসলার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল। তিনি কোনো যন্ত্রের কথা চিন্তা করলে সেটা তাঁর চোখের সামনে ত্রিমাত্রিক (3D) ছবির মতো দেখতে পেতেন। তাঁকে কোনো নকশা কাগজে আঁকতে হতো না। তিনি মনের ভেতর যন্ত্রটা চালাতেন এবং দেখতেন কোথায় সমস্যা হচ্ছে। একবার তো তিনি মনে মনেই একটা ইঞ্জিন চালিয়ে কয়েক সপ্তাহ রেখে দিয়েছিলেন, শুধু দেখার জন্য যে সেটার কোনো পার্ট ক্ষয়ে যায় কি না!
৪. এডিশন বনাম টেসলা: লড়াই যখন চরমে
তরুণ টেসলা যখন আমেরিকায় এলেন, তাঁর পকেটে ছিল মাত্র ৪ সেন্ট আর একটা সুপারিশপত্র। তিনি কাজ শুরু করলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিশনের কোম্পানিতে। এডিশন ব্যবহার করতেন 'ডিসি' (Direct Current) বিদ্যুৎ, যা খুব দূরে পাঠানো যেত না। টেসলা প্রস্তাব দিলেন 'এসি' (Alternating Current) বিদ্যুতের, যা মাইলের পর মাইল পাঠানো সম্ভব।
এডিশন তাঁকে চ্যালেঞ্জ করে বললেন, "যদি তুমি আমার জেনারেটর উন্নত করতে পারো, তবে তোমাকে ৫০ হাজার ডলার দেবো।" টেসলা দিনরাত এক করে কাজটা সফলভাবে করলেন। কিন্তু যখন টাকা চাইলেন, এডিশন হেসে বললেন, "টেসলা, তুমি আমেরিকান কৌতুক বোঝো না!" অপমানিত টেসলা সাথে সাথে চাকরি ছেড়ে দিলেন। শুরু হলো 'কারেন্ট ওয়ার' বা বিদ্যুতের যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত টেসলার 'এসি' বিদ্যুৎই জয়ী হলো, যা আজও আমাদের ঘরে ঘরে জ্বলে।
৫. পকেটে ভূমিকম্প!
নিউইয়র্কে টেসলার একটা ল্যাবরেটরি ছিল। একদিন তিনি একটা ছোট্ট যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন যা কম্পন তৈরি করে। তিনি যন্ত্রটা চালু করে একটা লোহার পিলারের সাথে লাগিয়ে দিয়ে কাজে মন দিলেন। কিছুক্ষণ পর পুরো বিল্ডিং কাঁপতে শুরু করল! আশেপাশের মানুষ ভাবল ভূমিকম্প হচ্ছে। পুলিশ আসার আগেই টেসলা একটা হাতুড়ি দিয়ে যন্ত্রটা ভেঙে ফেললেন। পরে তিনি মজা করে বলেছিলেন, "আমি চাইলে এই ছোট্ট যন্ত্র দিয়ে আস্ত একটা সেতু বা এমনকি এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংও ধসিয়ে দিতে পারতাম!"
৬. তার ছাড়াই বিদ্যুৎ পাঠানো
টেসলার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল 'ওয়ারলেস পাওয়ার'। তিনি চেয়েছিলেন কোনো তার ছাড়াই সারা পৃথিবীর মানুষ বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পাবে। এজন্য তিনি কলোরাডোতে বিশাল এক টাওয়ার বানিয়েছিলেন। সেখানে তিনি কৃত্রিম বজ্রপাত তৈরি করতেন যা ১৩৫ ফুট দূর পর্যন্ত যেত। সেই বজ্রপাতের শব্দে ১৫ মাইল দূরের মানুষ পর্যন্ত চমকে উঠত! যদিও টাকার অভাবে তাঁর এই প্রজেক্ট শেষ হয়নি, কিন্তু আজ আমরা যে ওয়াই-ফাই (Wi-Fi) বা রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার করি, তার মূলে ছিল টেসলার সেই চিন্তা।
৭. অদ্ভুত সব স্বভাব আর সংখ্যা '৩'
টেসলা মানুষটা যেমন মেধাবী ছিলেন, তেমনি ছিলেন খ্যাপাটে। তাঁর কিছু অদ্ভুত নিয়ম ছিল:
* তিনি যে কোনো বিল্ডিংয়ে ঢোকার আগে সেটাকে তিনবার প্রদক্ষিণ করতেন।
* খাওয়ার সময় তিনি ১৮টি রুমাল ব্যবহার করতেন প্লেট আর চামচ মুছতে।
* তিনি তিন দিয়ে ভাগ করা যায় না এমন কোনো রুমে থাকতেন না (যেমন হোটেল রুম নম্বর ৩০৩)।
* তিনি মুক্তার গয়না একদম সহ্য করতে পারতেন না। কেউ মুক্তার দুল পরে থাকলে তিনি তাঁর সাথে কথাই বলতেন না!
৮. পায়রাদের সাথে মিতালী
জীবনের শেষ দিকে টেসলা খুব একা হয়ে গিয়েছিলেন। মানুষের চেয়ে তিনি পায়রাদের বেশি ভালোবাসতেন। প্রতিদিন পার্কে গিয়ে পায়রাদের খাওয়াতেন। এমনকি একটি বিশেষ সাদা পায়রাকে তিনি এতটাই ভালোবাসতেন যে বলতেন, "আমি যেমন পায়রাটিকে ভালোবাসি, সেও আমাকে তেমন ভালোবাসে।" যখন সেই পায়রাটি মারা যায়, টেসলা বলেছিলেন যে তাঁর জীবনের আলো নিভে গেছে।
৯. দূরদ্রষ্টা টেসলা
১৯২৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে টেসলা বলেছিলেন, "ভবিষ্যতে এমন একটা যন্ত্র আসবে যা আমরা পকেটে নিয়ে ঘুরব এবং সারা বিশ্বের মানুষের সাথে ভিডিও কলে কথা বলতে পারব।" তখনকার মানুষ এটা শুনে হেসেছিল, কিন্তু আজ আমাদের হাতের স্মার্টফোনটি ঠিক তেমনই, যা টেসলা ১০০ বছর আগেই কল্পনা করেছিলেন!
আজকের ডিজিটাল যুগে আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যা কিছু করি, তার প্রায় প্রতিটা পদক্ষেপে নিকোলা টেসলার ছোঁয়া রয়েছে। আমরা হয়তো অনেক সময় তাঁর নাম নিই না, কিন্তু তাঁর তৈরি প্রযুক্তি ছাড়া আমাদের আধুনিক জীবন এক মুহূর্তও চলবে না।
চলো দেখে নিই, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টেসলার কোন কোন আবিষ্কার আমরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছি:
১. ঘরের এসি, ফ্রিজ আর ফ্যান (অল্টারনেটিং কারেন্ট বা AC)
তুমি যখনই ঘরের কোনো সুইচে চাপ দিয়ে ফ্যান, এসি, ফ্রিজ কিংবা কম্পিউটার চালাচ্ছ, তখনই তুমি টেসলার সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটি ব্যবহার করছ। একে বলে “AC বা অল্টারনেটিং কারেন্ট”। টেসলার এই আবিষ্কারের ফলেই শত শত মাইল দূর থেকে পাওয়ার গ্রিডের মাধ্যমে খুব সহজে এবং কম খরচে আমাদের ঘরে বিদ্যুৎ চলে আসে। যদি টেসলা এটি আবিষ্কার না করতেন, তবে প্রতি এক কিলোমিটার পর পর একটা করে বড় পাওয়ার স্টেশন বসাতে হতো!
২. স্মার্টফোন ও ওয়াই-ফাই (তারবিহীন যোগাযোগ)
আমরা যে পকেটে স্মার্টফোন নিয়ে ঘুরি, মেসেজ পাঠাই কিংবা তার ছাড়াই ওয়াই-ফাই (Wi-Fi) ব্যবহার করে ইন্টারনেট চালাই—এর মূল আইডিয়াটা ছিল টেসলার। ১৯০১ সালেই তিনি বলেছিলেন, এমন একটা দিন আসবে যখন মানুষ তার ছাড়াই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছবি, গান আর কথা পাঠাতে পারবে। রেডিও তরঙ্গের (Radio Wave) ওপর তাঁর করা গবেষণাই আজকের মোবাইল নেটওয়ার্কের ভিত্তি।
৩. রিমোট কন্ট্রোল (টিভি ও খেলনা গাড়ি)
সোফায় শুয়ে রিমোট টিপে টিভির চ্যানেল বদলানো কিংবা রিমোট দিয়ে ড্রোন ও খেলনা গাড়ি ওড়ানো—এসবই সম্ভব হয়েছে টেসলার কারণে। ১৮৯৮ সালে তাঁর সেই 'জাদুর নৌকা'র গল্প তো আগেই শুনেছ! দূর থেকে কোনো তার ছাড়া যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার এই প্রযুক্তি তিনিই প্রথম পৃথিবীকে দেখিয়েছিলেন।
৪. নিয়ন ও এলইডি লাইট (আধুনিক আলো)
দোকানের বাইরে বা রাস্তায় আমরা যে সুন্দর সুন্দর নিয়ন সাইনবোর্ড বা ফ্লুরোসেন্ট লাইট জ্বলতে দেখি, তা টেসলার ল্যাবরেটরিতেই প্রথম তৈরি হয়েছিল। তিনি প্রচলিত বাল্বের চেয়ে অনেক কম বিদ্যুতে কীভাবে বেশি আলো তৈরি করা যায়, সেই রাস্তা দেখিয়েছিলেন, যা আজ আমাদের এলইডি (LED) লাইটের যুগে নিয়ে এসেছে।
৫. এক্স-রে (X-Ray)
আমাদের শরীরে কোথাও চোট লাগলে বা হাড় ভেঙে গেলে ডাক্তাররা যে এক্স-রে করতে বলেন, সেই এক্স-রে প্রযুক্তির শুরুর দিকের গবেষণায় টেসলার বড় অবদান ছিল। তিনি নিজের হাতের এক্স-রে ছবি তুলেছিলেন এবং এই রশ্মিটি যে শরীরের ভেতরের ছবি তুলতে পারে, তা নিয়ে বিজ্ঞানী রন্টজেনকে সাহায্য করেছিলেন।
৬. হাইড্রো-ইলেকট্রিক পাওয়ার (পানি থেকে বিদ্যুৎ)
নায়াগ্রা জলপ্রপাতের নাম নিশ্চয়ই শুনেছ? সেই বিশাল জলপ্রপাতের পানির স্রোতকে কাজে লাগিয়ে পৃথিবীর প্রথম বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করেছিলেন নিকোলা টেসলা। আজ কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সারা বিশ্বে পানি থেকে যে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ তৈরি হয়, তার শুরুটা টেসলাই করেছিলেন।
৭. টেসলা গাড়ি (বৈদ্যুতিক মোটর)
আজকাল রাস্তায় যে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ি (Electric Cars) চলছে—যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত কোম্পানির নামই 'Tesla'—তা কিন্তু টেসলার তৈরি “ইন্ডাকশন মোটর (Induction Motor)” দিয়ে চলে। টেসলা ১০০ বছরেরও বেশি সময় আগে যে মোটরের নকশা করেছিলেন, আজ আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়িগুলো সেই একই নিয়মে চলে!
একটি মজার তথ্য: আজ আমরা ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য যে “ওয়্যারলেস চার্জার” (প্যাডের ওপর ফোন রাখলেই চার্জ হয়) ব্যবহার করি, তা কিন্তু টেসলার সেই তারবিহীন বিদ্যুৎ পাঠানোর স্বপ্নেরই একটা ছোট্ট রূপ!
নিকোলা টেসলা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে আমাদের হাতের স্মার্টফোন, ড্রোন আর বৈদ্যুতিক গাড়ি দেখে নিশ্চয়ই মুচকি হাসতেন আর বলতেন, “দেখেছ? আমি তো ১০০ বছর আগেই তোমাদের এই ভবিষ্যতের কথা বলেছিলাম!”
বিদায় এক মহান বিজ্ঞানীর
১৯৪৩ সালে নিউইয়র্কের একটি হোটেল রুমে এই মহান বিজ্ঞানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর কাছে কোনো টাকা ছিল না, কারণ তিনি তাঁর সব পেটেন্ট বা আবিষ্কারের স্বত্ব মানুষকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন যাতে বিদ্যুৎ সস্তা হয়। তিনি টাকার পেছনে ছোটেননি, ছুটেছেন জ্ঞানের পেছনে।
উপসংহার:
নিকোলা টেসলা আমাদের শিখিয়েছেন যে, লোকে পাগল বললেও নিজের স্বপ্নের ওপর বিশ্বাস রাখা উচিত। আজ আমরা যে বাল্ব জ্বালাই, যে রিমোট দিয়ে টিভি চালাই বা যে স্মার্টফোনে কথা বলি—তার প্রতিটা স্পন্দনে মিশে আছে এই 'বিদ্যুতের জাদুকর'-এর ছোঁয়া।
শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬
আবার কি আসিলো ফিরে সেই অদ্ভুত আঁধার এক
আবার কি আসিলো ফিরে জীবনানন্দের সেই ‘অদ্ভুত আঁধার’;
নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো আকাশের বুক জুড়ে
কোনো এক অচেনা বিষণ্নতা ঝুলে আছে আজ;
শহরের ভাঙা রাস্তায় হাঁটে নীরব মানুষের ছায়া।
ধানক্ষেতে আর শোনা যায় না রাখালের গান,
বকুলের গন্ধে মেশে এক অদৃশ্য ক্লান্তি;
দূরের নদীটি যেন ভুলে গেছে তার স্রোত—
জলের ভেতর কেবল জমে আছে কালো নিঃশ্বাস।
আমি কি তবে ফিরে এসেছি সেই চেনা পৃথিবীতে—
যেখানে রোদ মানে কেবলই ছায়ার দীর্ঘশ্বাস,
আর পাখিরা উড়ে যায় অজানা ভয়ের দিকে
ডানার ভেতর লুকিয়ে রাখে রাতের অশ্রু?
একদিন এই পথেই হেঁটেছিলাম একা,
পায়ের তলায় মাটির ছিল উষ্ণ স্পন্দন;
আজ সেই মাটি যেন আবেগহীন নিথর শরীর
মনে হয় কেউ সব স্বপ্ন তুলে নিয়ে গেছে গোপনে।
তবু কি ফিরবো আবার, সেই নীল ধানের দেশে?
যেখানে শিশির ভেজা ঘাসে লেগে থাকে জীবনের ঘ্রাণ,
যেখানে অন্ধকারও ছিল মমতার মতো কোমল—
ভয় নয়, ছিল শুধু নিঃশব্দ এক স্নেহের ছায়া।
হায়, আজ যেন এই আঁধার অন্যরকম;
এখানে ফিরে আসা মানে হারিয়ে যাওয়া আরও গভীরে,
এখানে প্রতিটি নিশ্বাসে জমে ওঠে অচেনা শূন্যতা।
আবার কি আসিলো ফিরে সেই অদ্ভুত আঁধার এক
অচেনা ভয়ে কেউ কথা বলে না
শুধু রাত বাড়ে, আর দূরে কোথাও
একটি পাখি ডেকে ওঠে
তার ডানায় লেগে থাকে অচেনা আঁধারের
দাগ।
আবু লাহাবের পরিণাম
আবু লাহাব ছিল আল্লাহর রাসূল (সা)-এর আপন চাচা, কিন্তু তার অন্তর ছিল হিংসা ও শত্রুতায় পুড়ছিল। সে ছিল **হুযুরের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রতিবেশী**। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বাড়ির দরজায় ময়লা-আবর্জনা ও নাড়িভুঁড়ি ফেলে রাখা ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। শুধু তাই নয়, তার ইন্ধনে **তার স্ত্রী উম্মে জামিল** বুনো কাঁটা সংগ্রহ করে এনে রাতের অন্ধকারে আল্লাহর রাসূল (সা) যে পথ দিয়ে হাঁটতেন, সেখানে বিছিয়ে রাখত। কিন্তু এত কষ্টের মাঝেও রহমতুল্লিল আলামিনের ধৈর্যের কোনো কমতি ছিল না।
দাওয়াতি কাজে আবু লাহাবের বৈরিতা ছিল সব সীমা ছাড়ানো। যখনই আল্লাহর রাসূল (সা) মক্কার বাজারে বা দূর থেকে আসা হাজীদের তাঁবুতে গিয়ে তাওহীদের দাওয়াত দিতেন, আবু লাহাব পেছন পেছন গিয়ে চিৎকার করে বলত, *"হে লোকসকল! ও তো উন্মাদ, ও মিথ্যাবাদী! তোমরা ওর কথা শুনো না।"* আপন চাচার মুখে এমন কথা শুনে আরবরা দ্বিধায় পড়ে যেত। তারা ভাবত, ঘরের মানুষই যখন মানছে না, তখন নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে। **ইসলামী দাওয়াতের কাজে তার এই বিরোধিতা এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল**, যা নবাগতদের মনে সন্দেহের বীজ বুনে দিত।
আবু লাহাবের শত্রুতা শুধু মক্কার অলিতে-গলিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা আঘাত করেছিল রাসূল (সা)-এর পারিবারিক জীবনেও। আল্লাহর রাসূল (সা)-এর দুই কন্যা, হযরত রুকাইয়্যা (রা) ও হযরত উম্মে কুলসুম (রা)-এর বিয়ে হয়েছিল আবু লাহাবের দুই ছেলে উতবা ও উতাইবার সাথে। ইসলাম প্রচার শুরু হতেই আবু লাহাব চরম ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং **তার কন্যাদের তালাক দিতে নিজের পুত্রদের বাধ্য করে**। সে বলেছিল, *"মুহাম্মদের কন্যাদের বিদায় না করলে তোমাদের সাথে আমার সম্পর্ক শেষ।"*
তার নিষ্ঠুরতা এখানেই থেমে থাকেনি। যখন আল্লাহর রাসূল (সা)-এর শিশুপুত্র কাসেম ও আবদুল্লাহ একে একে ইন্তেকাল করেন, তখন পুরো মক্কা যখন স্তব্ধ, আবু লাহাব তখন আনন্দে মেতে ওঠে। **নবী পুত্রের মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ করে** সে মক্কার কাফেরদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে, *"মুহাম্মদ তো নির্বংশ (আবতার) হয়ে গেছে! তার নাম নেওয়ার আর কেউ রইল না।"*
এমনকি যখন গোটা কুরাইশ বংশ বনু হাশিমকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করে **'শিয়াবে আবি তালেব' নামক গিরিসঙ্কটে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল**, তখনো আবু লাহাবের রক্ত চাঙ্গা হয়ে ওঠেনি। ক্ষুধার তাড়নায় যখন অবরুদ্ধ শিশুরা গাছের পাতা চিবিয়ে কাঁদছিল, তখন আবু লাহাব মক্কার বাজারে গিয়ে ব্যবসায়ীদের বলত, *"তোমরা খাবারের দাম এত বাড়িয়ে দাও যেন মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীরা তা কিনতে না পারে। তোমাদের যা ক্ষতি হবে, তা আমি পুষিয়ে দেব।"* আপন গোত্রের এই চরম বিপদে সে কাফেরদের সাথে হাত মিলিয়েছিল।
### ঐশ্বরিক ঘোষণা ও অবমাননাকর পরিণতি
আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর এই সীমাহীন অত্যাচারের জবাব স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অবতীর্ণ করলেন। সূরা লাহাব (আল-মাসাদ) নাজিল হলো:
> *"আবু লাহাবের হাত ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও... শীঘ্রই সে প্রবেশ করবে লেলিহান আগুনে এবং তার স্ত্রীও—যে লাকড়ি বহনকারী, তার গলায় থাকবে খেজুর পাতার পাকানো রশি।"*
>
এই সূরা নাজিল হওয়ার পর আবু লাহাবের অহংকার আরও বেড়ে যায়, কিন্তু আল্লাহর বাণী তো অমোঘ। বদর যুদ্ধের সময় আবু লাহাব নিজে যুদ্ধে না গিয়ে তার পরিবর্তে অন্য একজনকে পাঠায়। কিন্তু বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের শোচনীয় পরাজয় এবং আবু জাহেলসহ মক্কার বড় বড় নেতাদের মৃত্যুর খবর যখন মক্কায় পৌঁছাল, আবু লাহাবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
ঠিক তার পরপরই আবু লাহাব এক মারাত্মক ও সংক্রামক চর্মরোগে (عدسة - এক ধরণের প্লেগ বা গুটিবসন্তের মতো রোগ) আক্রান্ত হলো। তার পুরো শরীর পচতে শুরু করল এবং গা থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হতে লাগল। রোগটি ছড়ানোর ভয়ে তার নিজের সন্তান ও পরিবারের লোকেরাও তাকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করল। মক্কার এক কোণে একাকী, ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে অত্যন্ত পৈশাচিক ও অবমাননাকরভাবে তার মৃত্যু হলো।
তার মৃত্যুর পর তিন দিন পর্যন্ত তার লাশ ঘরেই পড়ে রইল, কেউ ছুঁতেও সাহস পেল না। তীব্র দুর্গন্ধে যখন পুরো এলাকা অতিষ্ঠ হয়ে উঠল, তখন লোকলজ্জার ভয়ে তার ছেলেরা কিছু হাবশী গোলাম ভাড়া করল। তারা দূর থেকে লাঠি দিয়ে ঠেলে ঠেলে আবু লাহাবের লাশটিকে একটি গর্তে ফেলল এবং দূর থেকে পাথর ছুড়ে ছুড়ে লাশটি মাটি ও পাথরের নিচে চাপা দিল।
### উপসংহার
যে আবু লাহাব নিজেকে মক্কার প্রভাবশালী ও সম্পদশালী ভাবত, যার অহংকারে আল্লাহর জমিন কেঁপে উঠত, দুনিয়াতেই তার পরিণতি হয়েছিল চরম অসম্মানজনক ও ঘৃণ্য। আর তার স্ত্রী উম্মে জামিলও একদিন গলায় রশি পেঁচানো অবস্থায় পাহাড়ের পাথরে দম আটকে মারা যায়।
আবু লাহাবের এই গল্প ইতিহাসের পাতায় চিরকাল এই সাক্ষ্যই দেয় যে—সত্যের আলো নেভানোর চেষ্টা যারাই করবে, ক্ষমতা বা বংশমর্যাদা তাদের বাঁচাতে পারবে না; বরং তাদের কপালে জুটবে দুনিয়া ও আখিরাতের চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা।
রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬
দারুল আরকামের প্রদীপ
সাফা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মক্কার অন্ধকার রাতটি আজ অন্যরকম শান্ত। মূর্তিপূজা, অন্যায় আর কুসংস্কারে নিমজ্জিত মক্কার বুকে তখন এক নতুন ভোরের প্রস্তুতি চলছে অত্যন্ত গোপনে। পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত তরুণ আরকামের বাড়ি—**'দারুল আরকাম'**।
চারিদিকে নিস্তব্ধতা। মক্কার কুরাইশ নেতারা যখন মদের আসরে কিংবা কাবা ঘরের সামনে আড্ডায় মত্ত, তখন এই ছোট ঘরটিতে প্রদীপ জ্বলছে। ঘরের ভেতরে কয়েকজন মানুষ গোল হয়ে বসে আছেন। তাঁদের চোখ-মুখ থেকে এক অপার্থিব নূর ঝরে পড়ছে। তাঁদের সামনে বসে আছেন মানবতার মুক্তির দূত, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি পরম মমতায় তিলাওয়াত করছেন নতুন নাজিল হওয়া আল্লাহর বাণী।
এই যে আজ মক্কার বুকে গোপনে আল্লাহর দ্বীনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হচ্ছে, এর পেছনে রয়েছে দুটি অনন্য বিশ্বাসের গল্প। দুটি এমন হৃদয়, যারা কোনো অলৌকিক মোজেজা দেখার আগেই শুধু ‘চরিত্রের সত্যতা’ দেখে ইসলামের আলোয় নিজেদের সঁপে দিয়েছিলেন।
## প্রথম প্রদীপ: হযরত খাদিজা (রা.)-এর অটুট বিশ্বাস
গল্পের শুরুটা আরও তিন বছর আগের এক থমথমে রাতের। জাবালে নূরের হেরা গুহা থেকে যখন এক কাঁপানো শরীর আর ব্যাকুল হৃদয় নিয়ে আল্লাহর রাসুল ঘরে ফিরলেন, তখন মক্কার সেই অভিজাত বাড়িতে এক অভাবনীয় দৃশ্য তৈরি হয়েছিল। প্রচণ্ড ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নবীজি বললেন, *"আমাকে কম্বল দিয়ে আবৃত করো, খাদিজা! আমার জীবনের আশঙ্কা হচ্ছে।"*
হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন তাঁর দীর্ঘ ১৫ বছরের সুখ-দুঃখের সাথি। তিনি স্বামীকে খুব কাছ থেকে চিনেছিলেন। তিনি জানতেন, তাঁর স্বামী কোনো সাধারণ মানুষ নন। বিয়ের আগে যখন নবীজি তাঁর ব্যবসায়ের কাফেলা নিয়ে সিরিয়া গিয়েছিলেন, তখন দাস মাইসারা এসে অলৌকিক মেঘের ছায়া দেওয়ার গল্প শুনিয়েছিল। সিরিয়ার পাদ্রী নাসতুরা স্পষ্ট বলেছিল, *"ইনিই শেষ নবী।"* এছাড়া খাদিজার চাতাতো ভাই, তাওরাত-ইঞ্জিলের পণ্ডিত ওরাকা বিন নওফেলও বারবার এমন একজন নবীর আগমনের আভাস দিয়েছিলেন।
তাই স্বামী যখন হেরা গুহার কাঁপানো অভিজ্ঞতা শোনালেন, খাদিজা (রা.) বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলেন না। তিনি স্বামীকে জড়িয়ে ধরে পরম মমতায় বললেন:
> *"কখনোই নয়! আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনোই লাঞ্ছিত করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখেন, অসহায়-দরিদ্রদের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বদের উপার্জন করে দেন, মেহমানদারী করেন এবং হকের পথে আপতিত বিপদে মানুষকে সাহায্য করেন।"*
>
যিনি মানুষের সাথে জীবনে কোনোদিন একটাও মিথ্যা বলেননি, সৃষ্টিকর্তা তাঁকে কখনো একা ছেড়ে দিতে পারেন না—এই অকাট্য বিশ্বাস থেকে খাদিজা (রা.) তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করলেন। তিনি শুধু প্রথম মুসলিমই হলেন না, বরং নিজের সমস্ত সম্পদ আর সামাজিক মর্যাদা দিয়ে ইসলামের প্রথম ও শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হলেন।
## দ্বিতীয় প্রদীপ: বন্ধু আবু বকরের তাৎক্ষণিক সাড়া
খাদিজা (রা.)-এর পর যার নাম আসে, তিনি হযরত আবু বকর (রা.)। নবীজির বাল্যকালের বন্ধু, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং সুখ-দুঃখের ছায়াসঙ্গী। আবু বকর (রা.) মক্কার অন্য দশটা মানুষের মতো ছিলেন না। তিনি মূর্তিপূজাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন, কখনো মদের পাত্র ছুঁয়েও দেখেননি। তিনি মনে মনে একজন সত্যের দিশারীর খোঁজ করছিলেন।
কিছুদিন আগেই তিনি ইয়ামেন সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে এক বৃদ্ধ কিতাবধারী পাদ্রী তাঁর চেহারা ও বংশের পরিচয় পেয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, *"মক্কায় খুব শীঘ্রই একজন নবী আসবেন, আর তুমি হবে তাঁর প্রধান উজির।"* মক্কায় ফিরে এসে তিনি লক্ষ্য করলেন, তাঁর প্রিয় বন্ধু মুহাম্মদ (সা.) মক্কার কোলাহল ছেড়ে হেরা গুহায় গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকছেন। আবু বকরের সূক্ষ্ম মন বুঝতে পেরেছিল, তাঁর বন্ধুর জীবনে মহান কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
নবুয়ত পাওয়ার পর একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু বকরের মুখোমুখি হলেন। নবীজি আল্লাহর একত্ববাদ আর নিজের নবুয়তের বার্তা তাঁর সামনে তুলে ধরলেন।
সাধারণত মানুষ নতুন কোনো আদর্শের কথা শুনলে একটু ভাবার সময় নেয়। কিন্তু আবু বকরের মনে কোনো সংশয় ছিল না, কোনো প্রশ্ন ছিল না। তিনি জানতেন, মক্কার পুরো সমাজ যখন জাহেলিয়াত আর মিথ্যায় ডুবে ছিল, তখন এই একটি মানুষ ‘আল-আমিন’ বা পরম বিশ্বস্ত হিসেবে বেঁচে ছিলেন। যে মানুষ মানুষের সাথে ৪০ বছর মিথ্যা বলেনি, সে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলতে পারে না।
নবীজির কথা শেষ হতে না হতেই আবু বকর (রা.) বলে উঠলেন, *"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর সত্য রাসুল।"* রাসুলুল্লাহ (সা.) পরবর্তীতে নিজেই বলেছিলেন, *"আমি যাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, তার মধ্যেই কিছু না কিছু দ্বিধা দেখেছি; একমাত্র আবু বকর ছাড়া।"*
ইসলাম গ্রহণ করেই আবু বকর (রা.) শান্ত হয়ে বসে থাকেননি। তিনি তাঁর প্রভাবশালী বন্ধুদের কাছে গেলেন। কাফেরদের চোখে ধুলো দিয়ে অত্যন্ত সাবধানে দাওয়াত দিতে লাগলেন। তাঁরই হাত ধরে এই গোপন আলোয় আলোকিত হলেন উসমান বিন আফফান, আবদুর রহমান বিন আউফ আর সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসের মতো তরুণেরা, যারা পরবর্তীতে ইসলামের একেকটি স্তম্ভে পরিণত হয়েছিলেন।
## গিরিপথের গোপন ইবাদত ও দারুল আরকামের রাতগুলো
প্রথম দুই বছর পার হয়ে তিনে পড়ল। মুসলিমদের সংখ্যা এখন প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি। মক্কার কাফেরদের চোখ এড়িয়ে সবাই এসে জড়ো হন দারুল আরকামে। সেখানে কোনো জাঁকজমক নেই, নেই কোনো পার্থিব লোভ। আছে শুধু একে অপরের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্য।
সেখানে আরবের ধনী ব্যবসায়ী উসমান (রা.) বসে আছেন হাবশার কৃষ্ণকায় দাস বেলালের পাশে। কোনো ভেদাভেদ নেই, কোনো অহংকার নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের শেখাচ্ছেন কীভাবে ধৈর্য ধরতে হয়, কীভাবে গোপনে রাতের আঁধারে আল্লাহর সামনে চোখের জল ফেলতে হয়।
একদিন রাতের শেষ প্রহরে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের দৃঢ়চেতা মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন:
> *"তোমরা ধৈর্য ধরো। আল্লাহর কসম, এই দ্বীন পূর্ণতা পাবেই। এমন একদিন আসবে যখন একজন আরোহী সান'আ থেকে হাদরামাউত পর্যন্ত একা ভ্রমণ করবে, অথচ আল্লাহ ছাড়া সে কাউকেই ভয় পাবে না।"*
>
সাহাবিদের চোখে তখন অশ্রু, কিন্তু হৃদয়ে এক অপরাজেয় বিশ্বাস। খাদিজা (রা.)-এর ত্যাগ আর আবু বকর (রা.)-এর নিখাদ বিশ্বাসে গড়া সেই কাফেলা জানত, মক্কার এই অন্ধকার কেটে যাবে।
## বর্তমান উম্মাহর জন্য প্রেরণা
আজকের পৃথিবীতে যখন মুসলিম উম্মাহ নানা সংকটে জর্জরত, তখন নবুয়তের প্রথম তিন বছরের এই গোপন দাওয়াত, হযরত খাদিজা ও আবু বকর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ আমাদের জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
* **চরিত্রই ইসলামের সবচেয়ে বড় দাওয়াত:** নবীজির সত্যবাদী চরিত্র দেখেই খাদিজা ও আবু বকর (রা.) ইসলাম এনেছিলেন। আজ আমাদেরও সমাজে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরতে হলে সবার আগে নিজেদের চরিত্রকে নিষ্কলঙ্ক করতে হবে।
* **সংখ্যার চেয়ে ঈমানের জোর বড়:** সেদিনের সেই গুটি কয়েক মানুষ পুরো পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন, কারণ তাঁদের ঈমান ছিল পাহাড়ের চেয়েও দৃঢ়। আজ কোটি কোটি মুসলিমের মাঝে সেই একনিষ্ঠ ঈমানের বড় প্রয়োজন।
* **দারুল আরকামের শিক্ষা জীবিত করা:** আমাদের পরিবার ও সমাজকে আজ একেকটি 'দারুল আরকাম' বানাতে হবে, যেখানে আমাদের সন্তানরা স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েও দ্বীন শিখবে এবং নিজেদের চরিত্রকে খাঁটি সোনার মতো গড়ে তুলবে।
মক্কার সেই ৩ বছরের গোপন ত্যাগ আর এই মহান ব্যক্তিত্বদের আত্মনিবেদনই আজকের কোটি কোটি মুসলিমের ইবাদতের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। ভিত্তি যত গোপনে আর গভীরে রোপণ করা হয়, ঈমানের বৃক্ষ ততটাই বিশাল আর ফলদায়ক হয়—দারুল আরকামের রাতগুলো আমাদের এই শিক্ষাই দিয়ে যায়।
শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬
আকাশের কত রূপ!
স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শুরুর আগ থেকেই দেশের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বখতিয়ারের মনটা আনচান করছিল। সময় যেন আর কাটতেই চায় না। নচ্ছার পরীক্ষাটা কবে শেষ হবে আর কবে সে দাদীর কাছে যেতে পারবে, এই অস্থিরতার যেন শেষ নেই। আলীর অবস্থাও প্রায় একই। দাদী আর তুপ্পির জন্য তার ছোট্ট মনটাও কেমন যেন আকুলি-বিকুলি করে। সে বারবার আব্বুকে জিজ্ঞেস করে, “আব্বু, আমরা কবে দেশে যাব?”
আব্বু যতই বলেন, “এই তো বাবা, পরীক্ষাটা আগে শেষ করো, তারপরই আমরা দেশে যাব”, ততই যেন তার ছেলেমানুষি অস্থিরতা বেড়ে যায়। দাদীর জন্য আর বিশেষ করে তুপ্পির জন্য দুই ভাইয়ের মনই কেবল ছটফট করে।
এখানে বলে রাখা ভালো, আলী-বখতিয়ারের ‘তুপ্পি’ মানে তাদের ফুপু। ছোটবেলায় বখতিয়ার তার ফুপুকে ‘তুপ্পি’ বলে ডাকত। পরে তার দেখাদেখি আলীও সেই ডাক শুরু করে। এখন তারা অনেকটাই বড় হয়েছে, কিন্তু সেই আদুরে ডাকটি আর বদলাতে রাজি নয়। তাদের কাছে ‘তুপ্পি’ ডাকটাই সবচেয়ে আপন। আর তাদের ফুপু সায়মাও এই ডাক শুনে ভীষণ খুশি হন। ছোট্ট ভাইপোদের কচি মুখের সেই স্মৃতিমাখা ডাকটি তিনি ধরে রাখতে চান। তাই কেউ তাদের সংশোধন করতে গেলে তিনিও আপত্তি করেন।
শহরের বৈচিত্র্যহীন নাগরিক জীবনে বন্দী থাকতে থাকতে বড়রাই হাঁপিয়ে ওঠে, সেখানে ওরা তো ছোট মানুষ! গ্রামের মেঠোপথ, খোলা মাঠ, প্রাণভরে দৌড়ঝাঁপ আর সতেজ বাতাসে নিশ্বাস নেওয়ার জন্য স্কুল বন্ধের এই সময়টাতে তারা অস্থির হয়ে ওঠে। তাই বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই তিন ভাইয়ের চলছিল বাড়ি যাওয়ার হিসাব-নিকাশ। পারলে যেন তখনই উড়াল দেয়!
কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পরীক্ষা। বখতিয়ারের তো পরীক্ষার ওপর রীতিমতো রাগই হচ্ছিল। নচ্ছার পরীক্ষাটা যেন কিছুতেই শেষ হতে চায় না!
আর আলীর কাছে এটি ছিল একপ্রকার গায়ের জ্বরের মতো। যত দ্রুত এই জ্বর কাটে, ততই যেন সে বাঁচে। রাইয়ানের অবশ্য পরীক্ষা নিয়ে তেমন কোনো চিন্তাই নেই।
দাদী আর তুপ্পির মায়াবী মুখের মতো গ্রামের শ্যামল-সবুজ রূপও বখতিয়ার ও আলীকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ, সবুজ বৃক্ষের সারি, নদীর বুকে পালতোলা নৌকা, ছায়াঘেরা পাখিডাকা মেঠোপথ, পথের ধারে ঝলমলে সরিষাফুলের ঢেউ, কলাই-কলমি লতার নীলাভ-সাদা ফুল, পুকুরভরা শাপলা, এমনকি কচুরিপানার ফুলও তাদের মুগ্ধ করে। এসব তো শহরের একঘেয়ে পরিবেশে কল্পনাও করা যায় না।
আর পুকুরে সাঁতার কাটা, মাছ ধরা, নৌকা চালানো কিংবা মাঠে-মেঠোপথে ছুটে বেড়ানোর আনন্দও তো বছরের এই কটা দিন ছাড়া তারা পায় না।
গ্রামের বাড়ি যেতে দুই ভাইয়ের সবচেয়ে প্রিয় বাহন হলো স্টিমার আর পালতোলা নৌকা। আজকাল সড়কপথেও দেশে যাওয়া যায়, কিন্তু সড়কপথের কোলাহল, যানজট আর কালো ধোঁয়া তাদের একেবারেই অপছন্দ। তাই প্রতি বছরই দেশে যাওয়ার সময় নদীপথে যাওয়ার জন্য তারা আগেভাগেই আব্বুকে বলে রাখে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বলা যায়, তাদের আগাম নোটিশ পেয়েই আব্বুকে স্টিমারের টিকিট কাটতে হয়েছে।
আসলে নদীপথে ভ্রমণের মজাই আলাদা। একদিকে সড়কপথের নানা বিড়ম্বনা থেকে বাঁচা যায়, অন্যদিকে নদীপথে ভ্রমণে উপভোগ করা যায় প্রকৃতি ও জীবনের অপার বৈচিত্র্য। নদীর তীরে গড়ে ওঠা হাট-বাজার, শহর-বন্দর, গ্রাম, জনপদ একের পর এক যেন চলমান চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
জেলেদের মাছ ধরা, ধানক্ষেতে কৃষকের ব্যস্ততা, নদীর ঘাটে কলসিতে পানি ভরতে আসা গ্রামীণ নারীরা, উঠোনে ধান শুকানো, ইটভাটা, কলকারখানার কর্মচাঞ্চল্য, ঘাটে মালামাল ওঠানামা, গয়না নৌকায় পণ্য পরিবহন, পালতোলা নৌকায় মাঝি-মাল্লাদের গান—সব মিলিয়ে যেন পুরো নদীমাতৃক রূপসী বাংলাকে একসঙ্গে দেখে ফেলা যায়।
আর গাঙচিলের উড়াউড়ির কথা তো বলাই হয়নি! জেলে নৌকায় ধরা জ্যান্ত ইলিশ যখন লাফিয়ে ওঠে আর তার রুপালি গায়ে সোনালি রোদের ঝিলিক পড়ে, তখন যে চোখধাঁধানো দৃশ্যের সৃষ্টি হয়, তা নদীভ্রমণ না করলে বোঝা যায় না।
সকালের বা দুপুরের নদীভ্রমণের আনন্দ একরকম। কিন্তু বিকেলে স্টিমার যখন মাঝনদীতে পৌঁছে যায়, তখন সৃষ্টি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতি। যতদূর চোখ যায়, শুধু জল আর জল। দূরের গ্রামগুলোকে মনে হয় দিগন্তে টানা কোনো কাজলরেখা। আকাশ যেন এসে মিশেছে নদীর তটরেখায়। উপরের বিশাল নীলাকাশ আর নিচের বিস্তৃত জলরাশি একাকার হয়ে গেছে। বিকেলে স্টিমার যখন মাঝনদীতে পৌঁছে যায়, তখন সৃষ্টি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতি। যতদূর চোখ যায়, শুধু জল আর জল। দূরের গ্রামগুলোকে মনে হয় দিগন্তে টানা কোনো কাজলরেখা। আকাশ যেন এসে মিশেছে নদীর তটরেখায়। উপরের বিশাল নীলাকাশ আর নিচের বিস্তৃত জলরাশি একাকার হয়ে গেছে। প্রকৃতির এই অপূর্ব রূপ ও রহস্য নদীপথে ভ্রমণ না করলে কি সত্যিই উপলব্ধি করা যায়?
বিকেলে চা-নাস্তা শেষে রাইয়ান, বখতিয়ার ও আলী যখন আব্বুর সঙ্গে স্টিমারের ডেকে রেলিং ধরে দাঁড়াল, তখন আকাশের রূপ দেখে তারা মুগ্ধ হয়ে গেল। বখতিয়ার তো তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইল পশ্চিম আকাশের দিকে।
সূর্য তখন ধীরে ধীরে হেলে পড়ছে। সাদা মেঘগুলো সুনীল আকাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সূর্য ডুবতে শুরু করতেই শুরু হলো রঙের এক অপূর্ব খেলা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাদা মেঘগুলো হলুদ ও কমলার মিশ্রণে নতুন রূপ ধারণ করল। এরপর সেই রঙ গাঢ় হয়ে লাল-কমলার আবেশে ছড়িয়ে পড়ল আকাশজুড়ে। তারপর ধূসর মেঘের গায়ে যেন কেউ লালচে রঙের প্রলেপ বুলিয়ে দিল। রহস্যময় রঙের জাদু ছড়িয়ে সূর্য ধীরে ধীরে দিগন্তের বুকে ডুবে যেতে লাগল।
নদীর বুকে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের সেই দৃশ্য দেখে দুই ভাইয়ের মুখ থেকে একসঙ্গে বেরিয়ে এল একটি শব্দ—“অপূর্ব!”
আলী বলল, “ঠিকই বলেছ ভাইয়া। আকাশের গায়ে রঙের এত নিপুণ আলপনা দেখে আমার মনে হচ্ছে, এ যেন কোনো মহান শিল্পীর আঁকা এক অনুপম শিল্পকর্ম।”
আব্বু মৃদু হেসে বললেন, “সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি তাঁর সৃষ্টিজগতকে আমাদের জন্য এত সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছেন।”এই সংস্করণে পুনরাবৃত্ত অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে, বানান ও যতিচিহ্ন সংশোধন করা হয়েছে, বাক্যপ্রবাহ মসৃণ করা হয়েছে এবং শিশুতোষ গল্পের আবেগ ও প্রকৃতিবর্ণনার সৌন্দর্য আরও উজ্জ্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)




