শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬

সিন্ডিকেটের কবলে বাংলাদেশ: নাগরিক অধিকার বনাম রাষ্ট্রের দায়

বাজারে ঢুকলেই এখন আর শুধু পণ্য কেনা হয় না; কিনতে হয় অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ আর এক ধরনের অদৃশ্য ভয়ের অনুভূতি। প্রতিদিনের জীবনযাত্রা যেন ধীরে ধীরে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ছে—যার নাম সিন্ডিকেট। চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে পোশাক—সবখানেই কৃত্রিম সংকট আর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ছাপ স্পষ্ট। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে, আর মধ্যবিত্তের হিসাব-নিকাশ ভেঙে পড়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই সামনে এলো রাজধানীর মগবাজারের ‘নবীন ফ্যাশন’কে ঘিরে আলোচিত ঘটনা। এতদিন সিন্ডিকেটের কথা শোনা যেত নিত্যপণ্যের বাজারে। কিন্তু এবার দেখা গেল, উৎসবের পোশাকও সেই একই নিয়ন্ত্রণের শিকার। কম দামে বিক্রি—অপরাধের নতুন সংজ্ঞা ‘নবীন ফ্যাশন’ আলোচনায় আসে একটি সরল কারণে—তারা তুলনামূলক কম এবং ন্যায্য মূল্যে পাঞ্জাবি ও অন্যান্য পোশাক বিক্রি করছিল। যেখানে একটি পাঞ্জাবির দাম সিন্ডিকেট নির্ধারণ করেছে কয়েক হাজার টাকা, সেখানে কম দামে বিক্রি করায় তাদের ওপর নেমে আসে চাপ। অভিযোগ আছে, আশপাশের ব্যবসায়ীরা সংঘবদ্ধভাবে দোকান বন্ধ করে দেয়। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেও এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে শোনা যায়। একপর্যায়ে ব্যবসায়ী এনামুল হাসান নবীন নিজের নিরাপত্তাহীনতায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এই একটি ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—এখন শুধু পণ্য নয়, ‘ন্যায্যতা’ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আপনি যদি কম দামে পণ্য বিক্রি করে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান, তবুও আপনাকে বাধার মুখে পড়তে হবে, যদি না আপনি সেই অদৃশ্য চক্রের নিয়ম মেনে চলেন। রাষ্ট্র কোথায় দাঁড়িয়ে? প্রশ্নটি সহজ, কিন্তু উত্তর জটিল। রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা এবং অসাধু শক্তিকে দমন করা। কথায় আছে— রাষ্ট্রের কাজ সিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমন। কিন্তু বাস্তবতা যেন তার উল্টো প্রতিচ্ছবি। প্রশাসনের একটি অংশ নীরব, আরেক অংশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ফলে যারা নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে চান, তারা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন; আর যারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে,তারা আরও শক্তিশালী হচ্ছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে মুক্তবাজারের নামে এমন অরাজকতা চলতে পারে না। যখন কোনো ব্যবসায়ী নিরাপত্তাহীনতায় দেশ ছাড়েন, তখন তা কেবল একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এটি আইনের শাসনের দুর্বলতার ইঙ্গিত। বাজার মনিটরিং বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই লোকদেখানো হয়ে পড়েছে। সামান্য জরিমানায় বড় ধরনের অনিয়ম বন্ধ হয় না—এটি এখন প্রমাণিত সত্য। দ্রব্যমূল্যের আগুন ও অদৃশ্য হাত নিত্যপণ্যের বাজারে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ভোজ্যতেল, চিনি, ডিম বা মুরগি—সবকিছুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও তার সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। কিন্তু সামান্য বাড়লেই দেশীয় বাজারে তার বহুগুণ প্রভাব পড়ে। এর পেছনে কয়েকটি সুস্পষ্ট কারণ কাজ করছে— কৃত্রিম সংকট তৈরি করা, যেখানে গুদামে পণ্য মজুদ রেখেও বাজারে সংকট দেখানো হয়; মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য, যেখানে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দামের ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়; এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা, যা এসব অনিয়মকে কার্যত উৎসাহিত করে। নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রের দায় এই পরিস্থিতি কেবল অর্থনীতির সংকট নয়; এটি নাগরিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। ন্যায্যমূল্যে পণ্য পাওয়া একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। যখন একটি পরিবার প্রতিদিন হিসাব কষে খাবার কিনতে বাধ্য হয়, যখন আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সমন্বয় থাকে না—তখন সেটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। সিন্ডিকেট শুধু দাম বাড়ায় না, এটি বৈষম্যও বাড়ায়। সমাজে আস্থাহীনতা তৈরি করে, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক দুর্বল করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। উত্তরণের পথ এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর পদক্ষেপ। বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে, অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, এবং সর্বোপরি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অভিযান নয়, কাঠামোগত সংস্কারই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। রাষ্ট্র যদি সত্যিই ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে তাকে নিরপেক্ষ হতে হবে। কোনো গোষ্ঠীর প্রতি তোষণ নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হতে হবে মূল লক্ষ্য। শেষ কথা প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত একটিই—রাষ্ট্র কার জন্য? যদি উত্তর হয় জনগণের জন্য, তবে সেই জনগণের অধিকার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। অন্যথায় আমরা এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোবো, যেখানে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে কিছু গোষ্ঠী, আর সাধারণ মানুষ থাকবে তাদের করুণার ওপর নির্ভরশীল। নবীন ফ্যাশনের ঘটনাটি একটি সতর্কবার্তা। এখনই ব্যবস্থা না নিলে, সামনে হয়তো এমন এক সময় আসবে—যেখানে দুবেলা খাবার জোগাড় করা যেমন কঠিন হবে, তেমনি একটি সাধারণ উৎসবের পোশাক কেনাও বিলাসিতা হয়ে উঠবে।

শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬

ইরান যুদ্ধের আড়ালে ইসরায়েল কি লেবানন দখলের চেষ্টা করছে?

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি কখনোই সরল রেখায় চলে না। এক সংঘাতের আড়ালে আরেকটি সংঘাত, এক যুদ্ধের ছায়ায় আরেকটি কৌশল—এই অঞ্চলের বাস্তবতা প্রায়ই এমনই জটিল। ২০২৬ সালের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ও -এর সরাসরি উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে সীমান্ত। প্রশ্ন উঠছে—এই যুদ্ধ কি কেবল প্রতিরক্ষামূলক, নাকি এর আড়ালে রয়েছে ভূখণ্ড দখলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা? ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী দক্ষিণ লেবাননে একটি “নিরাপদ বাফার জোন” তৈরির কথা বলেছেন। তাদের ভাষ্য—উত্তর ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লিতানি নদী পর্যন্ত এলাকা হিজবুল্লাহমুক্ত করা জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই “বাফার জোন” কতটা সাময়িক? ইতিহাস বলে, নিরাপত্তার অজুহাতে দখল অনেক সময় স্থায়ী রূপ নেয়। ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলের প্রবেশও শুরু হয়েছিল নিরাপত্তার যুক্তিতে, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উপস্থিতিতে রূপ নেয়। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল -বিরোধী অভিযান নয়। বরং একটি বিস্তৃত কৌশল কাজ করছে: অবকাঠামো ধ্বংস: সড়ক, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করে অঞ্চলকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলা; জনশূন্য অঞ্চল তৈরি: “ফ্রি-ফায়ার জোন” বানিয়ে বেসামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনা; দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ: সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে স্থায়ী উপস্থিতির ভিত্তি তৈরি। এই প্রক্রিয়া কার্যত একটি “ডি-ফ্যাক্টো” দখল তৈরি করতে পারে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার না-ও করা হতে পারে। দক্ষিণ লেবাননের দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমারেখা। এই নদী পর্যন্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণ মানে: হিজবুল্লাহর রকেট হামলার পরিসর কমিয়ে আনা; একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা লাইন তৈরি; সীমান্তে নজরদারি সহজ করা তবে এর মানে দাঁড়ায়—লেবাননের সার্বভৌম ভূখণ্ডের একটি অংশ কার্যত অন্য একটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া। ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা এই মুহূর্তে চরমে। ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, নেতৃত্ব সংকট এবং আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বলতা ইসরায়েলের জন্য একটি “উইন্ডো অব অপরচুনিটি” তৈরি করেছে। সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পরিণতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সিরিয়ার ভূখণ্ড বহুদিন ধরেই হিজবুল্লাহ ও ইরানের সরবরাহ লাইনের অংশ ছিল। সেই নেটওয়ার্ক দুর্বল হওয়ায় দক্ষিণ লেবানন এখন তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন। ফলে, ইসরায়েল মনে করতে পারে—এখন আঘাত হানার সময়, যখন প্রতিপক্ষ পুরোপুরি সংগঠিত নয়। কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, দক্ষিণ লেবাননের নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে। ভবিষ্যতে যদি ইরানের সাথে বৃহত্তর কোনো সমঝোতা হয়, তাহলে এই ভূখণ্ড হতে পারে দর-কষাকষির অংশ। অর্থাৎ, যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যকে কূটনৈতিক টেবিলে রূপান্তর করার একটি পরিকল্পনাও এখানে থাকতে পারে। একটি সার্বভৌম দেশের ভূখণ্ডে সামরিক প্রবেশ আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। জাতিসংঘের নীতিমালা অনুযায়ী, আত্মরক্ষার যুক্তি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি দখল বৈধতা পায় না। ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বড় শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে কার্যকর পদক্ষেপ প্রায়ই সীমিত থাকে। যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। দক্ষিণ লেবাননে চলমান সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত; খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সংকট তীব্র; অবকাঠামো ধ্বংসে দীর্ঘমেয়াদি মানবিক বিপর্যয়। এই মানবিক দিকটি অনেক সময় কৌশলগত আলোচনার আড়ালে চাপা পড়ে যায়, কিন্তু বাস্তবতার সবচেয়ে কঠিন অংশ এটি। এই সংঘাত কেবল ইসরায়েল-লেবানন সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। এর ফলে ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়তে পারে; উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে; বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে। একটি সীমান্ত সংঘাত খুব দ্রুতই আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে—এটাই মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের শিক্ষা। ১৯৮২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি ছিল। সেই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামরিকভাবে একটি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করা যতটা সহজ, রাজনৈতিকভাবে তা ধরে রাখা ততটাই কঠিন। আজকের পরিস্থিতি অনেক দিক থেকেই সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে—যদিও প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সব দিক বিবেচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—ইসরায়েলের বর্তমান পদক্ষেপকে একমাত্র প্রতিরক্ষামূলক বলা কঠিন। এর মধ্যে নিরাপত্তা, কৌশল, ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ এবং কূটনৈতিক হিসাব—সবকিছুই জড়িত। লেবাননে একটি স্থায়ী “বাফার জোন” তৈরি হলে তা কার্যত আংশিক দখল হিসেবেই বিবেচিত হবে। আর সেটিই হয়তো এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সত্য প্রায়ই বহুস্তরীয়। তাই এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই—ইসরায়েল কি লেবানন দখল করতে চায়? তবে লক্ষণগুলো বলছে, যুদ্ধের আড়ালে ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬

আগুনের মানচিত্র

রাত তখন গভীর। ঢাকার আকাশে কুয়াশার মতো ঝুলে আছে অদৃশ্য এক উদ্বেগ। মুসা তার ছোট্ট ঘরের ভেতর বসে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে আছে। লাইভ সম্প্রচার চলছে—হোয়াইট হাউসের ক্যাবিনেট মিটিং শেষ হয়েছে মাত্রই। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর মুখ। ঠোঁটে হালকা হাসি। সাংবাদিকদের প্রশ্ন—ইরান যুদ্ধে কারা এগিয়ে? তিনি উত্তর দিলেন এমন স্বরে, যেন যুদ্ধ কোনো খেলার নাম— “ইরানকে আমাদের প্রস্তাব মানতে হবে। না হলে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।” মুসার বুকের ভেতর হালকা একটা ধাক্কা লাগে। একটা দেশ ধ্বংসের কথা এভাবে হাসতে হাসতে বলা যায়? সে চুপ করে থাকে। স্ক্রিনের আলো তার মুখে পড়ে, আর বাইরে শহরটা অস্বাভাবিকভাবে নিশ্চুপ। সে চোখ বন্ধ করল। কিন্তু শব্দটা থেকে গেল। পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার পথে সে লক্ষ্য করল—সবকিছু স্বাভাবিক। রিকশা চলছে, মানুষ বাজার করছে, চায়ের দোকানে আড্ডা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যেন পৃথিবী অন্য এক দিকে ঘুরছে। মুসা কাগজের অফিসে যায়। সহকর্মীরা ফিসফিস করে কথা বলছে। অফিসে পৌঁছেই সে খবর খুলল। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র যেন আগুনে জ্বলছে। হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা। বাব-এল-মান্দেব প্রণালী নিয়েও হুমকি। “যদি এই দুই প্রণালি বন্ধ হয়, বিশ্ব অর্থনীতি থেমে যাবে,” একজন বলে। আরেকজন যোগ করে— “ইউক্রেন আবার রাশিয়ার তেল স্থাপনায় হামলা করেছে।” মুসা চুপচাপ শুনে। তার মনে হয়, পৃথিবী যেন একটা অদৃশ্য দাবার বোর্ড—আর সাধারণ মানুষ শুধু ঘুঁটি। এক সহকর্মী বলল, “এই দুইটা বন্ধ হলে তেল বন্ধ। তেল বন্ধ মানে পৃথিবী থেমে যাওয়া।” এক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বিশ্লেষক বলছেন— “ইরানের সিস্টেম ভাঙা এত সহজ নয়।” আর দূরে হুথি আন্দোলন ঘোষণা দিয়েছে—প্রয়োজনে তারা যুদ্ধে নামবে। মুসা চুপ করে রইল। তার মনে হলো—যুদ্ধ এখন শুধু সীমান্তে না, বাজারের ভেতরেও। দুপুরের দিকে আরেকটা খবর আসে। টোটাল এনার্জি তাদের কর্মীদের সরিয়ে নিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মুসা ভাবল— যারা সবচেয়ে আগে বিপদ বোঝে, তারা আগে পালায়। তাহলে কি সত্যিই কিছু ঘটতে যাচ্ছে? সন্ধ্যায় সে নতুন একটা রিপোর্ট পড়তে শুরু করল। এইবার লেবানন। লেবানন।—ছোট্ট একটা দেশ। কিন্তু সেখানে আগুন জ্বলছে বড় যুদ্ধের মতো। রাইটস ওয়াচ বলছে— দক্ষিণ লেবাননে আবারও সাদা ফসফরাস ব্যবহার করা হয়েছে। মুসা থেমে গেল। সে ধীরে ধীরে পড়তে লাগল। M825 সিরিজের ১৫৫ মিমি আর্টিলারি প্রজেক্টাইল।বিস্ফোরণের পর আকাশে ছড়িয়ে পড়ে সাদা ফসফরাস। জ্বলন্ত ফেল্টের টুকরো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর আকাশে তৈরি হয় গাঁটের মতো ধোঁয়ার এক অদ্ভুত আকৃতি। সে চোখ বন্ধ করে কল্পনা করল— একটা শহর, মানুষ দৌড়াচ্ছে, আর আকাশ থেকে আগুনের বৃষ্টি পড়ছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে— দক্ষিণ লেবাননের ইয়োহমর শহরের আবাসিক এলাকায় এই বিস্ফোরণ দেখা গেছে। ছবি যাচাই করা হয়েছে। ভিডিও এসেছে আরও। কিন্তু সব কিছু কি ধরা পড়েছে? না। কারণ প্রায় আট লাখ মানুষকে ওই এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যারা পালিয়েছে, তারা তো ক্যামেরা নিয়ে দৌড়ায় না। তারা শুধু বাঁচতে চায়। মুসা ভাবল— এই যুদ্ধটা আসলে কী? গাজা, লেবানন, পশ্চিম তীর— সব জায়গায় একই আগুন। প্রতিরোধ করছে। প্রস্তুত। আর অন্যদিকে, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের হিসাব কষছে। রাত নামলে হুসাইন আবার লিখতে বসে। তার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরছে— লেবাননে এই হামলার উদ্দেশ্য কী? সে নিজের কাছে উত্তর খোঁজে। এটা কি শুধু সামরিক লক্ষ্য? না কি আরও বড় কিছু? তার মনে পড়ে পশ্চিম তীরের খবর। বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বাড়ছে। মানুষ বলছে—এখন আর কোথাও নিরাপদ না। তাহলে কি এই সবকিছুর পেছনে একটা কৌশল আছে? সে লিখে— “সম্ভবত লক্ষ্য শুধু যুদ্ধ জেতা না। লক্ষ্য জায়গা খালি করা।” মুসা থামে। কলমের নিব কাগজে ঠেকে থাকে। তার মনে হয়— একটা মানচিত্র ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। মানুষ সরছে, ঘর ফাঁকা হচ্ছে, শহর ধ্বংস হচ্ছে। আর সেই ফাঁকা জায়গাগুলো— দখল করবে নতুন কেউ; যেমন দখল করা হয়েছিল ফিলিস্তিনিদের ভূমি। রাত আরও গভীর হয়। সে আবার স্ক্রিনে চোখ রাখে। খবর আসছে— ইউক্রেন রাশিয়ার তেল স্থাপনায় হামলা করেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ ক্ষতিগ্রস্ত। মুসা হিসাব করে— একদিকে মধ্যপ্রাচ্য, অন্যদিকে রাশিয়া। তাহলে পৃথিবীর জ্বালানি কোথা থেকে আসবে? সে জানালার বাইরে তাকায়। ঢাকা শহর তখনও বেঁচে আছে নিজের মতো করে। কিন্তু তার মনে হয়— এই শহরও সেই আগুনের বাইরে না। কারণ যুদ্ধ এখন সীমান্ত মানে না। যুদ্ধ এখন অর্থনীতি, খাদ্য, জ্বালানি—সবকিছুর ভেতর ঢুকে গেছে। মুসা আবার লিখতে শুরু করে— “যুদ্ধ এখন আর শুধু বন্দুকের না। যুদ্ধ এখন কৌশলের। যেখানে একদিকে বোমা, অন্যদিকে প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া।” সে মনে করে — যেখানে শক্তি থাকলেও জয় আসেনি। শেষ অংশে এসে সে থামে। তার সামনে তিনটা ছবি ভেসে ওঠে— একটা ধোঁয়ায় ভরা লেবাননের আকাশ, একটা উত্তপ্ত প্রণালি, আর একটা হাস্যোজ্জ্বল মুখ, যে বলছে—ধ্বংস করা হবে। এই তিনটা ছবির মধ্যে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক আছে। মুসা শেষ লাইনগুলো লিখে— “এই পৃথিবী এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে যুদ্ধ না করেও যুদ্ধ চালানো যায়। যেখানে শহর ধ্বংস হয়, মানুষ সরে যায়, আর মানচিত্র বদলে যায়। লেবাননের আকাশে সাদা ফসফরাসের ধোঁয়া শুধু আগুনের চিহ্ন না, এটা এক নতুন কৌশলের সংকেত— যেখানে লক্ষ্য শুধু প্রতিপক্ষ না, লক্ষ্য পুরো ভূখণ্ড।” কলম নামিয়ে রাখে মুসা। তার ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা। দূরে ফজরের আজান ভেসে আসে। সে জানে— নতুন একটা দিন শুরু হবে। কিন্তু এই দিনটা আগের দিনের মতো হবে না। কারণ পৃথিবী বদলাতে শুরু করেছে। আর সেই পরিবর্তনের আগুন— এখন সবার ঘর ছুঁয়ে যাচ্ছে।

সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬

মরুর বুকে সত্যের বিজয় (শিশু-কিশোর ঐতিহাসিক অ্যাডভেঞ্চার)

-----------------------------
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
------------------------------





আরবের মরুভূমির মাঝখানে একটি শহর—মদিনা। শহরটি খুব বড় নয়, কিন্তু খুব প্রাণবন্ত। চারদিকে খেজুর গাছ, ছোট ছোট ঘর, আর ব্যস্ত বাজার। ভোর হলেই শহরের মানুষ জেগে ওঠে। ফজরের আজান শোনা যায়। মানুষ নামাজ পড়ে দিনের কাজ শুরু করে।

এই শহরেই বাস করে বারো বছরের এক কিশোর—আবদুল্লাহ। খুব কৌতূহলী ছেলে। সে সব সময় নতুন কিছু জানতে চায়।

তার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে—সালিম এবং আম্মার। তিন বন্ধু প্রায় প্রতিদিনই খেজুর বাগানে দৌড়াদৌড়ি করে, কখনো উটের পেছনে ছুটে, কখনো বাজারে গিয়ে গল্প শোনে।

একদিন দুপুরে তারা বাজারে বসে খেজুর খাচ্ছিল। হঠাৎ তারা দেখল অনেক মানুষ দ্রুত হাঁটছে।

সালিম বলল, —“আজ বাজারটা এত ব্যস্ত কেন?”

আম্মার বলল, —“নিশ্চয়ই বড় কোনো খবর এসেছে।”

আবদুল্লাহ কৌতূহলী হয়ে উঠল। সে দৌড়ে গেল লোকজনের ভিড়ের দিকে।



অদ্ভুত খবর

বাজারের মাঝখানে কয়েকজন লোক উত্তেজিতভাবে কথা বলছিল। একজন বলল, “মক্কার কুরাইশরা বড় বাহিনী নিয়ে বের হয়েছে।”
এই কথা শুনে আবদুল্লাহর বুক ধক করে উঠল। সে দৌড়ে বাড়ি গেল। তার বাবা তখন ঘরের সামনে বসে উটের দড়ি ঠিক করছিলেন। —“আব্বা! বাজারে সবাই বলছে যুদ্ধ হবে!”

বাবা শান্ত গলায় বললেন, “হতে পারে।”

আবদুল্লাহ অবাক হয়ে বলল, —“তুমি কি যুদ্ধে যাবে?”
বাবা একটু হাসলেন। 
“যদি দরকার হয়, অবশ্যই যাব।”

সেদিন বিকেলে শহরের মানুষ জড়ো হলেন মহান নেতা (সা.)-এর চারপাশে। তিনি সবাইকে বললেন,
“আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন।”

এই কথা শুনে মানুষের মুখে সাহসের আলো ফুটে উঠল।



অভিযানের প্রস্তুতি

পরদিন সকাল থেকেই মদিনা শহরে ব্যস্ততা শুরু হলো। কেউ উট প্রস্তুত করছে। কেউ অস্ত্র ঠিক করছে। কেউ পানি ভরছে।
মুসলমানদের সংখ্যা খুব বেশি নয়—মাত্র তিনশতের একটু বেশি। কিন্তু সবাই দৃঢ় মন নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে।

আবদুল্লাহর মনে একটাই ইচ্ছা—সে এই যাত্রায় যাবে। সে বাবার কাছে গিয়ে বলল, —“আব্বা, আমিও যাব।”
বাবা হেসে বললেন, “তুমি তো এখনো ছোট।”
আবদুল্লাহ বলল, —“আমি যুদ্ধ করব না। শুধু সাহায্য করব।”
শেষ পর্যন্ত বাবা রাজি হলেন। তিনি বললেন, “ঠিক আছে। কিন্তু তুমি আমার কাছ থেকে দূরে যাবে না।”

আবদুল্লাহ আনন্দে লাফিয়ে উঠল। সে দৌড়ে বন্ধুদের কাছে গেল।

সালিম বলল, “সত্যি? তুমি যাচ্ছ?”
আম্মার বলল, “তাহলে আমরাও যাব!”

তিন বন্ধুর চোখে তখন নতুন এক অভিযানের উত্তেজনা।



মরুভূমির পথে

অবশেষে যাত্রার দিন এল। ভোরের আলো ফুটতেই ছোট্ট কাফেলা মদিনা ছেড়ে মরুভূমির পথে বেরিয়ে পড়ল। কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন মহান নেতা (সা.)।

সূর্য উঠতেই মরুভূমি গরম হয়ে উঠল। বালুতে হাঁটলে পা জ্বলে যায়। দূরে মরীচিকা দেখা যায়—মনে হয় যেন পানির হ্রদ।

আবদুল্লাহ পানির মশক বহন করছিল। সে মাঝে মাঝে ক্লান্ত সৈন্যদের পানি দিচ্ছিল।
একজন সাহাবি তাকে দেখে বললেন, “তুমি তো ছোট হলেও বড় কাজ করছ।” 
আবদুল্লাহ লজ্জা পেয়ে হাসল।

দুপুরের দিকে সবাই বিশ্রাম নিল।

সালিম বলল, “এই মরুভূমি শেষ হবে তো?”
আম্মার বলল, “শেষ না হলেও আমরা এগিয়ে যাব।”

দূরে সূর্যের আলোয় বালুর পাহাড় ঝিলমিল করছিল। কিন্তু তাদের সামনে অপেক্ষা করছিল ইতিহাসের এক বড় দিন।



তিন বন্ধুর ছোট অভিযান

দুপুরের বিশ্রামের পরে কাফেলা আবার পথ চলা শুরু করল। সূর্য তখন একটু নরম হয়েছে। হালকা বাতাস বইছে মরুভূমির ওপর দিয়ে।

আবদুল্লাহ তার দুই বন্ধু সালিম আর আম্মারের সঙ্গে হাঁটছিল।
হঠাৎ আম্মার দূরে আঙুল তুলে বলল, —“ওদিকে দেখ!”
দূরে দুইজন লোক উট নিয়ে কোথাও যাচ্ছে। তারা যেন খুব সাবধানে চারদিকে তাকাচ্ছিল।

সালিম নিচু স্বরে বলল, —“ওরা নিশ্চয়ই সাধারণ পথিক নয়।”

তিন বন্ধু ধীরে ধীরে তাদের অনুসরণ করল। কিছু দূর গিয়ে তারা শুনতে পেল লোক দুজন কথা বলছে। তাদের কথায় বোঝা গেল—তারা কুরাইশদের জন্য পানি নিয়ে যাচ্ছে।

আবদুল্লাহর বুক ধক করে উঠল। সে বলল, —“চলো, দ্রুত খবর দিই।”

তারা দৌড়ে কাফেলায় ফিরে এল। সাহাবিরা খবর শুনে সতর্ক হয়ে গেলেন।
একজন বললেন, “এর মানে শত্রুরা খুব কাছেই আছে।”

আবদুল্লাহ তখন বুঝল—তাদের ছোট অভিযানটি আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে।



বদরের কূপ

কিছুক্ষণ পরে মরুভূমির দৃশ্য একটু বদলে গেল। দূরে কিছু খেজুর গাছ দেখা গেল। আর একটু এগিয়ে যেতেই দেখা গেল একটি কূপ।

মরুভূমিতে পানি মানেই জীবন। মুসলমানরা কূপের কাছাকাছি অবস্থান নিলেন। সেখানে ছোট ছোট বালুর টিলা ছিল। কেউ তাঁবু গাঁড়ছে, কেউ বিশ্রাম নিচ্ছে, কেউ পানি তুলছে।

আবদুল্লাহ কূপের কাছে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা পানি খাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল—এখানেই কিছু বড় ঘটনা ঘটবে।



যুদ্ধের আগের রাত 

সেই রাতটা ছিল অদ্ভুত। আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছিল। মরুভূমি নিস্তব্ধ। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার ভেতরে লুকিয়ে ছিল উত্তেজনা। দূরে পাহারা দিচ্ছিলেন সাহাবিরা।

আবদুল্লাহ তার বাবার পাশে বসে ছিল। সে জিজ্ঞেস করল, —“আব্বা, তুমি কি ভয় পাচ্ছ?”

বাবা মৃদু হাসলেন। “যুদ্ধের আগে সবার মনেই কিছু ভাবনা আসে। কিন্তু আমরা সত্যের জন্য দাঁড়িয়েছি।”

একটু পরে মহান নেতা (সা.)-কে দেখা গেল আল্লাহর কাছে দোয়া করতে। এই দৃশ্য দেখে অনেকের মন আরও দৃঢ় হয়ে উঠল।

আবদুল্লাহ আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল— “আগামীকাল কী হবে?”



বীরদের দ্বন্দ্ব


পরদিন ভোর। মরুভূমির আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। দূরে ধুলো উড়তে দেখা গেল। কুরাইশদের বিশাল বাহিনী এসে গেছে। তাদের সংখ্যা প্রায় এক হাজার। মুসলমানদের সংখ্যা মাত্র ৩১৩।

আবদুল্লাহর বুক কেঁপে উঠল। কিন্তু সাহাবিদের চোখে দৃঢ়তা।

আরবের নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে তিনজন করে যোদ্ধা সামনে এলেন। মুসলমানদের পক্ষ থেকে এগিয়ে এলেন তিনজন বীর—

আলী ইবনে আবি তালেব
হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব
উবায়দা ইবনে ইবনে আল হারিথ


মরুভূমি যেন নিঃশব্দ হয়ে গেল। হঠাৎ তলোয়ারের ঝলক দেখা গেল। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল মুসলমানদের বীরেরা জয়ী হয়েছেন।

এই দৃশ্য পুরো মুসলিম বাহিনীর মনোবল অনেক বাড়িয়ে দিল।



তুমুল যুদ্ধ 


এরপর শুরু হলো বড় যুদ্ধ। ঘোড়ার খুরের শব্দে বালু উড়তে লাগল। তলোয়ারের ঝনঝন শব্দ মরুভূমি কাঁপিয়ে দিল। আবদুল্লাহ যুদ্ধক্ষেত্রের একটু দূরে দাঁড়িয়ে আহতদের পানি দিচ্ছিল।
তার মনে হচ্ছিল—এ যেন মরুর ঝড়।

সংখ্যায় কম হলেও মুসলমানরা সাহসের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। অনেকক্ষণ ধরে যুদ্ধ চলল।


আবু জাহেলের পতন ও দুই কিশোরের সাহস


যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মরুভূমির বালুতে তলোয়ারের ঝলক, ঢালের শব্দ আর চিৎকারের মধ্যে সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত গর্জন তৈরি করেছে।
মধ্যবয়সী সাহাবিরা লড়ছে, প্রবীণরা সাহস দেখাচ্ছে। 

কিন্তু দুই কিশোর— মুয়াজ ইবনে আমর ইবনে আল জামুহ এবং মুয়ায়িদ ইবনে আফরা —তাদের হৃদয়ে ছিল অদম্য সাহস। দূরে তারা লক্ষ্য করল—, সেই অত্যাচারী নেতা, যিনি বহু বছর ধরে মুসলমানদের কষ্ট দিয়েছেন। মহান নেতা আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছেন। তারা চুপচাপ একে অপরের দিকে তাকাল। তাদের চোখে ছিল দৃঢ় সংকল্প, মুখে হাসি—ভয়ের নয়, প্রতিজ্ঞার।

হঠাৎ তারা একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

আবু জাহেল হতভম্ব হয়ে পিছলে গেল। তার অহংকার আর শক্তি কিছুই কাজে লাগল না। ছোটরা সাহসের সাথে তার দিকে আঘাত করল। 
মাটিতে পড়ে যাওয়া আবু জাহেল চিৎকার করার চেষ্টা করলেও তার শক্তি ছিল কম।
সেই সময় উপস্থিত সাহাবি দ্রুত এগিয়ে গেলেন এবং নিশ্চিত করলেন—অত্যাচারী নেতা আর নেই।

মরুভূমির সেই দিন, দুই কিশোরের সাহস ও দৃঢ়তা ইতিহাসে নাম লিখে গেল।



বিজয়ের মুহূর্ত


মরুভূমির উপর তখন ধুলো উড়ছে। ঘোড়ার খুরের শব্দ, মানুষের ধ্বনি, তলোয়ারের ঝলক—সব মিলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র যেন এক ভয়ংকর ঝড়ে পরিণত হয়েছে।

আবদুল্লাহ একটু দূরে দাঁড়িয়ে আহতদের পানি দিচ্ছিল। তার হাত কাঁপছিল, কিন্তু সে সাহস করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে দেখল—মুসলমানদের সাহস যেন আরও বেড়ে গেছে।

সাহাবিরা দৃঢ়ভাবে লড়াই করছেন। কিছুক্ষণ পর যুদ্ধের আওয়াজ ধীরে ধীরে কমে এল। ধুলো বসে গেলে বোঝা গেল—যুদ্ধ শেষ হয়েছে।

মুসলমানরা বিজয়ী হয়েছেন। সংখ্যায় কম হলেও তারা সাহস আর বিশ্বাসের জোরে জয় লাভ করেছেন।

আবদুল্লাহ বিস্ময়ে চারদিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল—সে যেন ইতিহাসের এক মহান মুহূর্তের সাক্ষী।

মহান নেতা (সা.) তখন সবাইকে শান্ত থাকতে বললেন। তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। সবাই তাঁর সঙ্গে মাথা নত করল।



নতুন শিক্ষা


সেদিন সন্ধ্যায় মরুভূমি আবার শান্ত হয়ে গেল। যুদ্ধের ধুলো বসে গেছে। আকাশে তারা জ্বলছে। আবদুল্লাহ তার বাবার পাশে বসে ছিল। সে ধীরে ধীরে বলল, —“আব্বা, আজ আমি অনেক কিছু দেখলাম।” 

বাবা মৃদু হাসলেন। “কি শিখলে?”
আবদুল্লাহ একটু ভেবে বলল, “সাহস মানে শুধু শক্তি নয়।” “সাহস মানে সত্যের পাশে দাঁড়ানো।”

বাবা তার মাথায় হাত রাখলেন। “তুমি ঠিকই বুঝেছ।”

দূরে সাহাবিরা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কেউ কথা বলছিলেন, কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মরুভূমির বাতাসে তখন এক ধরনের শান্তি। 
আবদুল্লাহ মনে মনে ভাবল— এই দিনের গল্প সে কখনো ভুলবে না।



মদিনায় ফিরে আসা


কয়েকদিন পরে কাফেলা আবার মদিনার পথে রওনা দিল। মরুভূমির সেই দীর্ঘ পথ এবার যেন ছোট মনে হচ্ছিল। কারণ তাদের হৃদয়ে ছিল বিজয়ের আনন্দ।

মদিনার কাছে পৌঁছাতেই মানুষ ছুটে এল। শহরে খবর পৌঁছে গেছে—মুসলমানরা বিজয়ী হয়েছেন। মানুষ আনন্দে একে অপরকে অভিনন্দন জানাচ্ছে।

আবদুল্লাহর বন্ধুরা তাকে ঘিরে ধরল।
সালিম বলল, “তুমি তো সত্যিই বড় অভিযানে গিয়েছিলে!”
আম্মার বলল, “তুমি এখন সত্যিকারের গল্পের নায়ক।”
আবদুল্লাহ হেসে ফেলল। কিন্তু সে জানত—এই বিজয় কোনো এক মানুষের নয়। এটি ছিল সাহস, বিশ্বাস এবং সত্যের বিজয়।

মহান নেতা (সা.) সবাইকে বললেন— “এই বিজয় আমাদের শক্তির কারণে নয়। এটি আল্লাহর সাহায্য।”
মানুষ কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করল।

সেদিন রাতে মদিনার আকাশে তারা আগের মতোই জ্বলছিল। কিন্তু আবদুল্লাহর মনে হচ্ছিল—সে যেন নতুন কিছু শিখেছে। সে বুঝেছে— সত্যের পথে দাঁড়ালে ছোট মানুষও বড় ইতিহাসের অংশ হয়ে যেতে পারে।

মুআল্লাফাতুল কুলুব: মিডিয়া সংকট নিরসনের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন


সমাজ পরিবর্তনের লড়াই শুধু রাজপথে হয় না; তা হয় চিন্তায়, ভাষ্যে, বয়ানে এবং মিডিয়ার পরিসরেও। আধুনিক বিশ্বে মিডিয়া শুধু তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়—এটি জনমত নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। ফলে যারা রাষ্ট্র, সমাজ বা আদর্শিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে, তাদের জন্য মিডিয়া শক্তি অপরিহার্য। কিন্তু ইসলামপন্থী দল ও সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের “মিডিয়া সংকটে”ভুগছ; মূলধারার গণমাধ্যমে উপেক্ষা, নেতিবাচক ফ্রেমিং কিংবা নীতিগত দূরত্ব। এই বাস্তবতায় ইসলামের একটি প্রাচীন অর্থনৈতিক-সামাজিক ধারণা—মুআল্লাফাতুল কুলুব; নতুন প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।


মুআল্লাফাতুল কুলুব কী?


মুআল্লাফাতুল কুলুব (المؤلفة قلوبهم) বলতে ঐসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বোঝায় যাদের অন্তর ইসলামের প্রতি অনুকূল বা নিকটবর্তী করতে অর্থসহায়তা দেওয়া হয়। এর মূল ভিত্তি এসেছে কুরআনের আয়াতে যাকাত বণ্টনের আটটি খাতের একটি হিসেবে -এর উল্লেখ করে— “যাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন… এবং যাদের অন্তর অনুকূল করা প্রয়োজন (মুআল্লাফাতুল কুলুব)...” 

— , সূরা আত-তাওবা ৯:৬০


রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কা বিজয়ের পর বিভিন্ন গোত্রপ্রধানকে অনুদান দিয়েছিলেন, যাতে তারা ইসলাম ও মুসলিম সমাজের প্রতি সদয় থাকে—যা সীরাতগ্রন্থে বিস্তারিত এসেছে, যেমন সীরাতে ইবনে হিশাম-এ। এখানে মূল দর্শন ছিল—সংঘাত নয়, হৃদয় জয়; বিচ্ছিন্নতা নয়, সম্পর্ক নির্মাণ। 


অতএব, এটি কেবল দান নয়—বরং একটি কৌশলগত সামাজিক নীতিমালা (strategic social policy)।


মিডিয়া সংকট: বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট


ইসলামপন্থী রাজনীতি বা সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়, তাদের বক্তব্য মূলধারার মিডিয়ায় যথেষ্ট স্থান পায় না—অথবা পেলেও তা সমালোচনামূলক কাঠামোয় উপস্থাপিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে আদর্শগত দূরত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা পারস্পরিক অবিশ্বাস এর পেছনে কাজ করে। ফলত ইসলামপন্থীরা নিজেদের মিডিয়া তৈরি করতে চাইলেও পুঁজি, পেশাদারিত্ব ও নেটওয়ার্কের অভাবে তা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।


এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন দাঁড়ায়— এই সংকট মোকাবেলায় মুআল্লাফাতুল কুলুব কিভাবে ভূমিকা পালন করতে পারে।


ইসলামপন্থীদের মিডিয়া সংকট নিরসনে 'মুআল্লাফাতুল কুলুব' খাতটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর মাধ্যমে পুঁজি, পেশাদারিত্ব ও নেটওয়ার্কের ঘাটতি এভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব:


১. পুঁজি ও বিনিয়োগ আকর্ষণ: মুআল্লাফাতুল কুলুবের আওতায় যারা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারী, তাদের এই মহৎ কাজের অংশীদার করার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বড় অংকের পুঁজির সংস্থান করা সম্ভব।


২. পেশাদার জনবল ও দক্ষতা বৃদ্ধি: মিডিয়া সেক্টরে যারা ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও দক্ষ কিন্তু আদর্শিক দূরত্বের কারণে মূলধারার বাইরে আছেন, যাকাতের এই খাতের মাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ত করা সম্ভব। তাদের পেশাদারিত্বকে কাজে লাগিয়ে কন্টেন্টের মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা যায়।


৩. প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক তৈরি: মিডিয়া জগতের নীতিনির্ধারক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরিতে এই খাত ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে করে মূলধারার মিডিয়াতে ইসলামবিদ্বেষী বয়ান বা 'ন্যারেটিভ' পরিবর্তন করা সহজ হয়।


৪. সম্পর্কোন্নয়ন: মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, সম্পাদক, কলামিস্ট ও প্রভাবশালী সাংবাদিকদের সঙ্গে নীতিগত ও পেশাগত সম্পর্ক গড়ে তোলা। এটি ঘুষ বা অনৈতিক প্রভাব নয়; বরং গবেষণা-তথ্য সরবরাহ, ব্রিফিং, সংলাপ, কর্মশালা ও বুদ্ধিবিনিময়ের মাধ্যমে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা। 


৫. পেশার মূল্যায়ন  ও পৃষ্ঠপোষকতা: সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে উৎসাহিত সাহিত করা এবং তাদের যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা যাতে নতুনরা এ পেশা গ্রহণ করতে উৎসাহিত হয়। প্রয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতে হবে যাতে তৃণমূল পর্যায়ে হকপন্থী মিডিয়া ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। ইসলামপন্থীদের উচিত মিডিয়াকে “শত্রু” হিসেবে না দেখে “স্টেকহোল্ডার” হিসেবে বিবেচনা করা।


৬. সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন: অমুসলিম বা ভিন্ন মতাদর্শী প্রতিভাবান শিল্পী ও কলাকুশলীদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করলে মিডিয়া কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর না হয়ে সর্বজনীন হয়ে ওঠে, যা জনমনে প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হয়।

এক্ষেত্রে মূলনীতি হতে পারে -সংঘাত বাড়িয়ে সমাধান হবে, নাকি সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে?


৭. নৈতিক সীমারেখা:

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—

মুআল্লাফাতুল কুলুব কি আধুনিক কালে অর্থ দিয়ে মিডিয়া প্রভাবিত করার লাইসেন্স?

ইসলামের মৌলিক নীতি হলো ন্যায় ও স্বচ্ছতা। সুতরাং এই খাতের আধুনিক প্রয়োগ যদি হয় অনৈতিক প্রভাব, প্রোপাগান্ডা বা দুর্নীতির মাধ্যমে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ—তাহলে তা ইসলামের চেতনাবিরোধী হবে। বরং এর সঠিক অর্থ হবে—বৈরিতা কমিয়ে বোঝাপড়া বাড়ানো, ভুল ধারণা দূর করা, সংলাপের দরজা খোলা।


৮. ন্যারেটিভ নির্মাণে পেশাদারিত্ব

মিডিয়া শূন্যস্থান পছন্দ করে না। যে পক্ষ তথ্য, বিশ্লেষণ ও মানবিক গল্প সরবরাহ করতে পারে, তার বক্তব্যই প্রাধান্য পায়। ইসলামপন্থীরা যদি গবেষণা সেল, ডেটা টিম ও প্রশিক্ষিত মুখপাত্র তৈরি করে, তাহলে তাদের বক্তব্য আরও গ্রহণযোগ্য হবে। এখানে মুআল্লাফাতুল কুলুব অর্থ হতে পারে—বিতর্ক নয়, ব্যাখ্যা; উত্তেজনা নয়, প্রজ্ঞা।


ডিজিটাল যুগে নতুন সম্ভাবনা


আজকের বিশ্বে মূলধারার মিডিয়া একমাত্র প্ল্যাটফর্ম নয়। সোশ্যাল মিডিয়া, পডকাস্ট, ইউটিউব চ্যানেল—এসবই বিকল্প জনমত নির্মাণের ক্ষেত্র। ইসলামপন্থীরা যদি দক্ষ কনটেন্ট নির্মাতা, গবেষণাভিত্তিক ভিডিও এবং মানবিক বয়ান উপস্থাপন করতে পারে, তাহলে তারা সরাসরি জনগণের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারবে—যা মুআল্লাফাতুল কুলুবের মূল চেতনার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।


উপসংহার


মিডিয়া সংকট মূলত আস্থার সংকট। আর আস্থার সংকট দূর করার উপায় শক্তি প্রদর্শন নয়—সম্পর্ক ও স্বচ্ছতা। মুআল্লাফাতুল কুলুব আমাদের শেখায়, সমাজ পরিবর্তনের পথে শুধু মতাদর্শ নয়, হৃদয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামপন্থীদের জন্য এটি একটি আর্থিক খাতের সীমাবদ্ধ বিধান নয়; বরং একটি কৌশলগত দর্শন—যেখানে সংলাপ, সহমর্মিতা ও পেশাদারিত্ব মিলিত হয়।


হৃদয় জয় করতে পারলে, বয়ানও জয় করা যায়। আর বয়ান জয় করতে পারলে, জনমতও বদলানো সম্ভব।#



কবি হাসান আলীমের ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নি শিশু’ কবিতা: এক কাব্যিক ম্যানিফেস্টো

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন  

সমকালীন বাংলা কবিতায় এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ আছে, যেগুলো নিছক আবেগের আশ্রয় নয়; বরং সময়ের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহসী উচ্চারণ। শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু তেমনই এক কাব্যিক দলিল। শিরোনামেই যে দ্বন্দ্ব—হিংস্র অরণ্য ও অগ্নিদীপ্ত শিশু—তা আসলে এক গভীর সময়চেতনার প্রতীকী নির্মাণ।

কবি হাসান আলীমের দীর্ঘ কবিতা ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নি শিশু’ এক ধরনের কাব্যিক ম্যানিফেস্টো—স্মৃতি, শাহাদাৎ, সংগ্রাম, আধ্যাত্মিক বিপ্লব এবং সভ্যতার পুনর্গঠনের উচ্চারণ। এই কবিতায় কবি কেবল ব্যক্তিগত অনুভব ব্যক্ত করেন না; তিনি একটি ভগ্ন সামাজিক বাস্তবতার ভেতরে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পুনর্জন্মের সম্ভাবনা খুঁজে দেখেন।

. পিতার প্রতিকৃতি: ইতিহাস ও নবুয়তি উত্তরাধিকার

কবিতার শুরুতেই পিতা কেবল জৈবিক পিতা নন; তিনি এক নির্মাতা, এক নবুয়তি ধারার উত্তরসূরি:

“আমার পিতা ছিলেন একজন শিল্পী, একজন নিপুণ প্রকৌশলী...”

এই নির্মাণ-রূপক পরে আধ্যাত্মিক স্তরে পৌঁছায়—

“আমার পিতা ছিলেন / প্রিয়নেতা মুহাম্মদ (স)-এর / একজন ঘনিষ্ঠ ছাত্র”

এখানে পিতা ব্যক্তিগত নয়, আদর্শিক। “পাথর বৃষ্টিতে সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত হয়ে গেলেও / যার নির্মাণ কৌশল বন্ধ হয়ে যায় নি”—এই পংক্তিতে নবীজির তায়েফ-পর্বের ইঙ্গিতও অনুরণিত হয়। পিতা তাই ধৈর্য, ক্ষমা ও নির্মাণশীলতার প্রতীক।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ লাইনগুলোর একটি:

“...যে পিতৃব্য হন্তারক তাকে তিনি মারাত্মক রকম ক্ষমা করে দিলেন।”

এটি সরাসরি হযরত হামজা (রা.)-এর হত্যাকারী ওহশীকে ক্ষমা করার ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতীকী প্রতিধ্বনি। কবি এখানে ক্ষমাকে শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

. শহীদ-চেতনা ও উত্তরাধিকারী সন্তানের আত্মপরিচয়

দ্বিতীয় অংশে কণ্ঠ বদলে যায়। ব্যক্তিগত শোক রূপ নেয় সামাজিক ক্রোধে।

“আমাদের পেটের ভেতর সহস্র হাভীয়া দাউ দাউ করে জ্বলছে।”

“হাভীয়া”—কোরআনিক জাহান্নামের ইঙ্গিত। ক্ষুধা এখানে শুধু শারীরিক নয়; এটি রাজনৈতিক ও নৈতিক দারিদ্র্যের রূপক।

এক পর্যায়ে কবি সরাসরি ঘোষণা করেন—

“কোরান আমাদের সংবিধান, রাসূল আমাদের নেতা, জেহাদ আমাদের কর্মপদ্ধতি শাহাদাৎ আমাদের কাম্য।”

এটি কেবল স্লোগান নয়; পিতার রক্তের ভাষা। আর কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে তিনি বলেন—

“যারা আল্লার পথে জীবন দিয়েছে মৃত মনে করোনা তোমরা তাদের বরং তারাতো জীবিত।”

এখানে কবিতা শহীদতত্ত্বের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করে।

৩. সভ্যতার সমালোচনা: নৈতিক অবক্ষয়ের নকশা

তৃতীয় ও পঞ্চম অংশে আধুনিকতার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা দেখা যায়।

“ভেনাসের নগ্ন ছবিতে ঢেকে গ্যাছে অমলিন শহর...”
“মোজার্ট, মোনালিসা ভ্যানগগের যাবতীয় শিল্পকর্ম অচল সিকির মত ছুঁড়ে ফ্যালে...”

এই পংক্তিগুলোতে পাশ্চাত্য শিল্প-সভ্যতার বিরুদ্ধে একটি প্রত্যাখ্যানমূলক অবস্থান আছে। কবি একটি বিকল্প সাংস্কৃতিক গৃহ নির্মাণ করতে চান—

“এমন কিছু ‘মুকাদ্দাসে তুয়া’ / যার ছবি বক্ষে ধরলেই মানুষ তার শক্তি ফিরে পাবে।”

এখানে শিল্পের পুনঃসংজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে—শিল্প হবে আত্মশক্তির উৎস, ভোগবাদী সৌন্দর্যের নয়।

৪. কাব্যভাষা: মিথ, কোরআনিক ইঙ্গিত ও ঐতিহাসিক প্রতীক

কবিতাজুড়ে বিস্ময়কর পরিমাণ আন্তঃপাঠ উপস্থিত:

  • “আবু জাহল”, “আবু লাহাব”, “শাদ্দাত”

  • “মুসার বারোটি কওম”

  • “লুত নগরী”

  • “বুনিয়ানুম মারসুস”

  • “কালো পাথর চুম্বন” (হাজরে আসওয়াদ)

  • “দীপ্ত আরাফাতে খোলা আসমান”

এই আন্তঃপাঠ কেবল ধর্মীয় অলঙ্কার নয়; এটি ইতিহাসকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে। সময় এখানে সরলরৈখিক নয়—বদর, কারবালা, মক্কা, আরাফাত—সব মিলেমিশে এক চিরন্তন সংগ্রামের মানচিত্র গড়ে তোলে।

৫. ‘অগ্নিশিশু’ প্রতীকের চূড়ান্ত রূপ

শেষ পর্যন্ত “অগ্নিশিশু” কে?

সে সেই প্রজন্ম—

“আমাদের অধিকার / আমাদেরই ছিনিয়ে নিতে হবে।”

সে সেই কাফেলা—

“আমরা আলোর পথের অযুত কাফেলা / এসেছি প্রত্যক্ষ সংগ্রামে।”

এবং সে সেই আত্মবিশ্বাস—

“পেছনের দিকে আর / ফিরে দেখো না তোমাদের ‘বন্দীদশা’”

অগ্নিশিশু মানে নিষ্পাপ কিন্তু দগ্ধ চেতনা; শ্বাপদ অরণ্যের ভেতর জন্ম নেওয়া বিপ্লবী মানব।

৬. নন্দনতাত্ত্বিক মূল্যায়ন

এই কবিতা প্রচলিত লিরিক নয়। এটি মহাকাব্যিক সুরে রচিত এক দীর্ঘ কাব্য-ঘোষণা। এর শক্তি—

  • প্রতীকের ঘনত্ব

  • ধর্মীয়-ঐতিহাসিক আন্তঃপাঠ

  • আবেগ ও আহ্বানের সংমিশ্রণ

  • নির্মাণ ও ধ্বংসের দ্বৈত রূপক

তবে সমালোচনামূলকভাবে বলতে গেলে, কিছু স্থানে স্লোগানধর্মিতা কাব্যিক সংযমকে ছাপিয়ে গেছে। কিন্তু সেটিই হয়তো কবির সচেতন কৌশল—কবিতাকে ম্যানিফেস্টোতে রূপান্তর করা।

উপসংহার

শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু একাধারে—

  • পিতার স্মৃতিতে রচিত এলিজি,

  • শহীদের রক্তে লেখা ঘোষণাপত্র,

  • সভ্যতার বিরুদ্ধে নৈতিক বিদ্রোহ,

  • এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান।

শ্বাপদের অরণ্য স্থায়ী নয়—অগ্নিশিশু জন্ম নেবে, নির্মাণ করবে, এবং আকাশের সাথে একাত্ম হয়ে যাবে।#


কবি মতিউর রহমান মল্লিকের অনবরত বৃক্ষের গান : অন্ধকারের ভেতর আলোর বৃক্ষ সময়, সমাজ ও আত্মার সম্মিলিত ভাষ্য


কবি মতিউর রহমান মল্লিকের অনবরত বৃক্ষের গান :

অন্ধকারের ভেতর আলোর বৃক্ষ

সময়, সমাজ ও আত্মার সম্মিলিত ভাষ্য

বাংলা কবিতায় এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ আছে, যেগুলো কেবল কবিতার সংকলন নয়—একটি সময়ের দলিল, একটি আত্মার আর্তি, একটি সমাজের গোপন মানচিত্র। কবি মতিউর রহমান মল্লিক–এর ‘অনবরত বৃক্ষের গান’ কাব্যগ্রন্থ তেমনই এক সংকলন। এখানে প্রকৃতি আছে, আছে রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকট, আছে অর্থনৈতিক বাস্তবতার দহন, আছে ঈমানী নির্ভরতা ও ঐতিহ্যচেতনা—সব মিলিয়ে এটি এক বহুমাত্রিক কাব্যভুবন।

১. নৈতিক অন্ধকার ও আত্মবিচ্ছিন্নতার  চিত্র 

“লোকটা এখন” কবিতায় আধুনিক মানুষের বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত মানসিকতা ধরা পড়ে—

“আলোর ভেতর চাক-চাক অন্ধকার দেখে দেখে লোকটা এখন দিনের বেলায় একা একা উল্টো দিকেই হেঁটে যেতে চায়।”

আলো এখানে আলোকিত করে না; বরং অন্ধকারের চাকচিক্যকে প্রকাশ করে। এই বিপরীতধর্মী ইমেজ আধুনিক সভ্যতার ছদ্ম-প্রগতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি আরও তীব্র হয় যখন—

“নিজের হাত নিজেই গুণতে গিয়ে আস্কন্ধ লম্বমান দু'টি কাষ্ঠখণ্ড ছাড়া আর কিছুই প্রত্যক্ষ করতে পারলো না।”

মানুষ নিজের মানবিক অঙ্গ হারিয়ে কাঠে পরিণত—এ এক আত্মবিচ্ছিন্নতার মর্মন্তুদ রূপক।

২. বুদ্ধিবৃত্তিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে দ্রোহ

“ক্রোধ” কবিতায় কবি তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন—

“গোখরো তোমার আত্মার প্রতিবেশ…”
“তুমি কি আসলে লেলিহান কঠোরতা?”

‘গোখরো’ হয়ে ওঠে অন্তর্গত বিষের প্রতীক। কবি দেখান, মানবিকতা হারালে জ্ঞান কেবল হিংস্র নখর হয়ে ওঠে। এই কবিতার ভাষা প্রতীকময় হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য সুস্পষ্ট।

৩. অর্থনৈতিক বাস্তবতার কাব্যিক ভাষ্য

“হিসেব করলেই” কবিতায় দৈনন্দিন জীবনের আর্থিক সংকট এক গভীর মানবিক বেদনায় রূপ নেয়—

“হিসেব করলেই কষ্ট বাড়ে…”
“এক মুঠো মাধ্যাকর্ষণ নাড়াচাড়া করতে করতে…”

মাধ্যাকর্ষণ এখানে জীবনের ভার। হিসেব মানেই দুঃখের উন্মোচন—

“হিসেব করলেই কষ্টের ভেতর থেকে উঠে আসে আরেক কষ্ট!”

এই সরল পুনরুক্তি কবিতাকে দিয়েছে তীব্র অনুরণন।

৪. বিপর্যয়ের ভূগোল ও সামষ্টিক আর্তি

“ভয়াবহতম আর্তনাদের মধ্যে” কবিতায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল যেন এক শোকের মানচিত্র—

“মহেশখালীর হতবাক জোয়ারে জোয়ারে ভেসে আসে অসংখ্য লাশ…”

স্থাননামের ধারাবাহিক উচ্চারণ কবিতাকে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড় করায়।
শেষ পঙ্‌ক্তি—

“আল্লাহ ছাড়া- এখন আর আমাদের কোন দাতাপক্ষ নেই।”

এখানে মানবিক অসহায়ত্ব ঈমানী আশ্রয়ে স্থিতি খুঁজে পায়।

৫. নজরুল-চেতনার পুনর্নির্মাণ

“নজরুলের ভালবাসা” কবিতায় কবি স্মরণ করেন কবি কাজী নজরুল ইসলামকে।

“নজরুলের ভালোবাসায় ছিলো আনন্দের আগে শতাব্দীর কান্না…”
“বিষের বাঁশীর মত অশেষ বিদ্রোহ…”

এখানে ভালোবাসা মানে সংগ্রাম, মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা। নজরুলকে তিনি কেবল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়, এক চলমান চেতনা হিসেবে পুনর্গঠন করেন।

৬. প্রকৃতি, জন্মভূমি ও কৃষিজীবনের নন্দন

“কাশ-শিউলির সময়” ও “হেমন্ত দিন” কবিতায় মল্লিক প্রকৃতির চিত্রকর।

“খেজুর গাছের নতুন নলির লোভে টপ্টপ্ করে…”
“হেমন্ত দিন রঙিন পালক তুলির মত রং এঁকে যায়…”

বাংলার গ্রামীণ জীবন, ফসল, শিশির, নদী—সব মিলিয়ে জন্মভূমির এক স্নিগ্ধ নন্দনচিত্র গড়ে ওঠে।
“মান্না-সাল্ওয়া” প্রসঙ্গ এনে কবি কৃষিজীবনকে ঐশী অনুগ্রহের সঙ্গে যুক্ত করেছেন—

“এবং মান্না-সাল্ওয়া এখন সব চাষীদের…”

৭. আত্মিক ঈদের দর্শন

“একটা ঈদ” কবিতায় ঈদ কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান নয়; এক অস্তিত্বময় অনুভব—

“আজ ক-দিন থেকে একটা ঈদ আমার বাইরে
আজ ক-দিন থেকে একটা ঈদ আমার ভেতরে”

ঈদ হয়ে ওঠে ছায়া ও স্বপ্নের মত এক আধ্যাত্মিক উপস্থিতি। ব্যক্তি ও সমাজ—দুই পরিসরেই তার অনুরণন।

৮. অন্তর্লীন ক্ষয়ের দহন

গ্রন্থের নামের গভীর তাৎপর্য ধরা পড়ে “বৃক্ষ কাটার শব্দ” কবিতায়—

“আমার ভেতরেও কেউ যেন অনবরত বৃক্ষ কেটে যাচ্ছে।”

বাইরের বৃক্ষনিধন ও অন্তরের ক্ষয় একাকার হয়ে যায়। সভ্যতার উন্নয়নের আড়ালে আত্মার বিনাশের ইঙ্গিত স্পষ্ট।

৯. প্রতীকের শুদ্ধ রূপায়ণ

“বোরকাধারয়িতা ও দারুবৃক্ষের স্তোত্র” কবিতায় দারুবৃক্ষ এক পবিত্র প্রতীক—

“পল্লবিত বোরকায়…”
“একটি পূর্ণাংগ দারুবৃক্ষ কি একটি পরিমার্জিত পাহাড়ের সৌসাদৃশ্য?”

এখানে আচ্ছাদন মানে গোপন নয়; বরং মর্যাদা, সৌজন্য ও সহাবস্থানের মহিমা।

উপসংহার

এক বহুমাত্রিক কাব্যগ্রন্থ। এতে—

  • সামাজিক ও নৈতিক সংকটের বিশ্লেষণ আছে,

  • অর্থনৈতিক বাস্তবতার আর্তি আছে,

  • ধর্মীয় ও ঐতিহ্যচেতনার পুনর্পাঠ আছে,

  • প্রকৃতি ও জন্মভূমির নন্দন আছে,

  • এবং সর্বোপরি আত্মার অন্তর্লীন ক্ষয়ের স্বীকারোক্তি আছে।

মল্লিকের কাব্যভাষা দীর্ঘ, প্রবাহমান, উপমা-প্রতীকে ঘন। তিনি গদ্যকবিতার স্বাদে ছন্দের অন্তর্নিহিত সুর তৈরি করেন।

এই কাব্যগ্রন্থ আমাদের শেখায়—বৃক্ষ কেবল প্রকৃতির অংশ নয়; বৃক্ষ আমাদের অন্তরেরও প্রতীক। যখন বৃক্ষ কাটা যায়, তখন কেবল বন উজাড় হয় না—মানুষের ভেতরও এক অনবরত ক্ষয় শুরু হয়।