ড. মুরাত কায়া
অনুবাদ: মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
সূচি:
ভূমিকা
ক. মানুষ, মহাবিশ্ব এবং স্রষ্টা
খ. মানুষ ও ধর্ম
প্রথম অধ্যায়:
ইসলামের মৌলিক বৈশিষ্ট্য সমূহ:
আল্লাহর একত্ববাদ (তাওহিদ)
প্রাকৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধর্ম
আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক, কোন পুরোহিত/ মধ্যস্থতাকারির প্রয়োজন হয় না
ইসলাম দুনিয়া ও আখেরাত, বস্তুগত ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে
ইসলাম শিক্ষাকে উৎসাহিত করে যা বিজ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং ধর্মকে অন্তর্ভুক্ত করে
ইসলাম ন্যায়বিচারকে প্রধান গুণ বলে মনে করে
ইসলাম একটি সার্বজনীন ধর্ম
সাম্য-মৈত্রীর ধর্ম ইসলাম
ইসলাম ধর্ম ও বিবেকের স্বাধীনতাকে সর্বোত্তম বিবেচনা করে
সহজ হওয়া ইসলামের অন্যতম মূলনীতি
আশাবাদ
সামাজিক সংহতি
ইসলাম মানুষের মর্যাদাকে সমুন্নত করে
দ্বিতীয় অধ্যায়:
ঈমান ও আমল
(ধর্মবিশ্বাস, ইবাদত-উপাসনা ও পার্থিব বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত বিধান-মুআ’মালাত)
ক. ঈমান (ইসলামে বিশ্বাসের বিষয় সমূহ)
১. আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস
২. ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস
৩. ঐশ্বরিক গ্রন্থ সমূহের প্রতি বিশ্বাস যা রাসূলগণের উপর নাযিল হয়েছে
৪. আল্লাহর নবী ও রসূলদের প্রতি বিশ্বাস
৫. পরকালে বিশ্বাস
৬. ভাগ্যে (তক্বদির) বিশ্বাস
খ. ইসলামে উপাসনার (ইবাদাত) ধরন এবং এর পিছনের প্রজ্ঞা
১. নামাজের তাৎপর্য
২. রোজা এবং এর প্রজ্ঞা
৩.বাধ্যতামূলক দান (যাকাত), সাধারণ দান ও সাহায্য এবং তাদের তাৎপর্য
৪. হজের হিকমত
গ. ইসলামে নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ এবং তাদের অপকারিতা:
১. সুদ
২. মদ পান
৩. অবৈধ যৌন সম্পর্ক
ঘ. ইসলামে পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও পানি:
১. পরিবেশ
২. পবিত্রতা বা পরিচ্ছন্নতা
৩. পানি
তৃতীয় অধ্যায়:
পবিত্র কুরআন
১. অবতরণ ও সংরক্ষণ
২. আল কুরআনের অলৌকিক বৈশিষ্ট্য:
ক. অজানা সম্পর্কে জানায়
খ. আল কুরআনে বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা
চতুর্থ অধ্যায়:
রহমতের নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স.)
১. শৈশব ও যৌবন
২. নবুওয়াতি জিন্দেগির বিভিন্ন পর্যায়
৩. মাদানী যুগ
৪. তাঁর অতুলনীয় নৈতিকতার উদাহরণ
৫. মানুষের প্রতি তাঁর অন্তহীন ভালবাসার নিদর্শন
৬. তাঁর অলৌকিক ঘটনা
উপসংহার
তথ্যসূত্র
অনুবাদকের কথা
‘ইসলাম: শাশ্বত মুক্তির পথ’ বইটিতে সংক্ষেপে ইসলামের মৌলিক পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। বইটি তুর্কি ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে ইস্তাম্বুলে। এর মূল নাম EBEDİ KURTULUŞ YOLU. যার বাংলা করলে দাঁড়ায় শ্বাশত মক্তির পথ। তবে ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকার বহু দেশে এটি ISLAM The Final Divine Riligion নামে প্রকাশিত হয়।
আমরা বিষয়বস্তুর আলোকে বাংলায় এর সহজ সরল নাম দিয়েছি ‘ইসলাম: জীবনের প্রকৃত সফলতার পথ’। বইটিতে আধুনিক শিক্ষিত সমাজের সামনে ইসলামের মৌলিক পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। আশা করি তারা এর মাধ্যমে জীবনের প্রকৃত সফলতা ও মুক্তির পথ খুঁজে পাবেন এবং কেবলমাত্র তখনি লেখক ও অনুবাদকের পরিশ্রম সার্থক হবে।
মুরাত কায়া ১৯৭৭ সালে তুরস্কের কাতাহা’য় (Kütahya) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯৪ সালে কাতাহিয়া ইমাম-হাতিপ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবং ১৯৯৯ সালে মারমারা বিশ্ববিদ্যালয় ধর্মতত্ত্ব অনুষদ থেকে স্নাতক হন। ২০০১ সালে, তিনি "Printed Turkish Qur'an Translation and Interpretations from Tanzimat Until The II. Meşrutiyet (1839-1908)". শীর্ষক থিসিস লিখে তাফসির শাস্ত্রে তাঁর মাস্টার্স প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেন। তিনি ২০০৭ সালে "The Magnificient Statements Of Allah In The Qur’an -Their Analysis and Verification as Original Miracle-". শিরোনামে থিসিস লিখে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। তাফসীর, হাদিস এবং সিরাত বিষয়ে তাঁর কয়েকটি প্রকাশিত বই এবং বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ রয়েছে।
ভূমিকা:
ক. মানুষ, মহাবিশ্ব এবং স্রষ্টা
আপনার হাতে যদি একটু সময় থাকে তাহলে আসুন না একটু চিন্তা করি; আমরা আমাদের নিজেদের সম্পর্কে একটু জানার চেষ্টা করি; আত্মসন্ধান করি যে, আমরা কোথা থেকে এসেছি এবং কোথায় যাচ্ছি? আসুন আমরা সেই অনুযায়ী আমাদের জীবন গঠন করি।
সবকিছুর আগে আমাদের উচিত হবে আমাদের নিজেদের সৃষ্টি, দৈহিক ও আধ্যাত্মিক রূপ, আমাদের যে উন্নত বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং এই যে মহাবিশ্বটা বিদ্যমান; সে সম্পর্কে চিন্তা করা ও অন্বেষণ করা। তাহলে আমাদের জীবন আরো অর্থবহ হবে বলে আশা করি।
উদাহরণ স্বরূপ, আসুন আমাদের এই গ্রহটা সম্পর্কেই চিন্তা করি। এখানে আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদ জন্মাচ্ছে যারা ভিন্ন ভিন্ন আকার-আকৃতি বাবিশিষ্ট এবং তারা বিভিন্ন রঙ, রূপ, গন্ধ ও আকারের ফল, ফুল এবং শাক-সবজি সরবরাহ করে; অথচ তারা একই পানিতে পুষ্ট। তারা অত্যন্ত নিখুঁত গঠন ও নিয়মে এটি করে। এটা কি অসাধারণ নয় যে একই জমিতে বেড়ে ওঠা ও একই পানিতে পুষ্টি পাওয়া উদ্ভিদ বা বৃক্ষ-লতার রঙ, রূপ, ফুল, ফল, শাক-সবজি এবং তাদের আকার-আকৃতি ও স্বাদ একে অপর থেকে ভিন্ন ও উন্নত হয়ে থাকে?
আসুন, এবার আমাদের দৃষ্টিকে আকাশের দিকে ফিরাই, এর বিষ্ময়কর ও দুর্দান্ত ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চিন্তা করি। সূর্যের কথাই ধরুন। সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে দূরত্ব ১৫০ মিলিয়ন কিলোমিটার। সূর্য মাঝারি আকারের নক্ষত্রগুলোর মধ্যে একটি, যেটি পৃথিবী-আকারের ১৩ লক্ষ গ্রহ ধারণ করার জন্য যথেষ্ট বড়। এর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৬ হাজার ডিগ্রী সেলসিয়াস, অভ্যন্তরের তাপমাত্রা ২ কোটি ডিগ্রী সেলসিয়াস। এর কক্ষপথের গতি প্রতি ঘণ্টায় ৭ লক্ষ ২০ হাজার কিলোমিটার। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সূর্য দিনে প্রায় ১৭ কোটি ২৮০ কিলোমিটার পথ পরিভ্রমণ করে।
সূর্যে প্রতি সেকেন্ডে ৫৬৪ মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন ৫৬০ মিলিয়ন টন হিলিয়ামে রূপান্তরিত হয়। চার মিলিয়ন টন গ্যাসের পার্থক্য শক্তি আকারে বিকিরিত হয়। অন্য কথায়, সূর্য প্রতি সেকেন্ডে চার মিলিয়ন টন পদার্থ হারায়, বা প্রতি মিনিটে ২৪০ মিলিয়ন টন। যদি সূর্য তিন বিলিয়ন বছরেরও বেশি সময় ধরে এই হারে শক্তি উৎপাদন করে থাকে, তাহলে আজ পর্যন্ত হারিয়ে যাওয়া বস্তুর পরিমাণ প্রতি লক্ষ মিলিয়ন টনের তুলনায় ৪ লক্ষ মিলিয়ন গুণ, যা আজও সূর্যের মোট ভরের প্রায় ৫ হাজার ভাগের এক ভাগ।
আমাদের বিশ্বকে শক্তির এই প্রচণ্ড ও বিপুল উৎস থেকে এত সূক্ষ হিসেব করা দূরত্বে স্থাপন করা হয়েছে যে, আমরা এর জ্বলন্ত এবং ধ্বংসাত্মক প্রভাবগুলো থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ; আবার এর উৎপাদিত অতি প্রয়োজনীয় শক্তি থেকেও বঞ্চিত নই। সূর্যকে তার প্রচণ্ড তাপ ও শক্তির সাথে এমন একটি নিখুঁত শক্তি ও আয়তন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে যে, এটি পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর জন্য অত্যন্ত উপকারী, সর্বোপরি মানুষের জন্য। আশ্চর্য লাগে সূর্য তার রশ্মি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে পৃথিবীতে প্রেরণ করে চলেছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে!
পৃথিবী থেকে ১৩ লক্ষ গুণ বড় যে সূর্যটির কথা আমরা উল্লেখ করছি তা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের প্রায় ২০০ বিলিয়ন নক্ষত্রের মধ্যে একটি মাত্র। একইভাবে, মিল্কিওয়েও কয়েকশো বিলিয়ন ছায়াপথের একটি মাত্র যা আধুনিক টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা যায়। এবং এই মিল্কিওয়ের একপাশ থেকে অন্য পাশে যেতে সময় লাগে ১০০ হাজার বা ১ লক্ষ আলোকবর্ষ। (আলো প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার বেগে ভ্রমণ করে।) পৃথিবী থেকে আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে যেতে একজনকে অবশ্যই তিন লক্ষ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার ভ্রমণ করতে হবে।
কোন ব্যক্তি যদি তার পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে এভাবে দীর্ঘক্ষণ চিন্তা করে, তাহলে সে বুঝতে পারবে যে, এর পেছনে একজন সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান স্রষ্টা আছেন এবং মানুষকে নিরর্থকভাবে সৃষ্টি করা হয়নি, বরং আমাদেরকে সৃষ্টির পেছনে অবশ্যই কোন কারণ রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, আদিম সমাজ থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত সব ধরনের ধর্মই এক সর্বশক্তিমান সত্তার প্রতি বিশ্বাসকে সমর্থন করে।
এমন অনেক নিদর্শন রয়েছে যা স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করে। কিছু নিদর্শনের দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যেগুলো প্রত্যেকে লক্ষ্য করতে পারেন:
✓ একটি শিশুর গঠন, তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা, তার বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান লাভ, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ - তাকে কী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সে কী-তে রূপান্তরিত হয়েছে তা।
✓ বজ্রপাত যা ভয় দেখায় আবার আশাও জাগায়; আকাশ থেকে বৃষ্টিপাত হওয়া ও ফিরে যাওয়া; এবং মৃত মাটিতে প্রাণের সঞ্চার।
✓ বাতাসের প্রবাহ যা বৃষ্টির সূচনা করে ও মেঘকে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায়, হ্রদ ও সমুদ্রের গঠন, হাজার হাজার টন ওজনের পাহাড়ের মতো জাহাজের সমুদ্রে দ্রুত গতিতে ভেসে চলা; যেগুলোর একেকটা ছোট শহরের মত; যেখানে শত শত প্লেন অবতরণ ও উড্ডয়ন করে।
✓ জমিন ও আসমানের সকল প্রাণীর রিযিকের বিধান।
মনীষী মাওলানা জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি তাঁর বিখ্যাত মসনবী গ্রন্থে মহান স্রষ্টার সৃষ্টিকর্মের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, “হে আমার বৎস, এটা ভাবা কি বেশি অর্থবহ নয় যে, যে লেখাটি লিখিত হয়েছে তার একজন লেখক থাকা উচিত; নাকি এটি নিজেই লিখিত হয়েছে?” (মসনবী, খন্ড ৬, পংক্তি: ৩৬৮)
“হে অনভিজ্ঞ মানুষ, আমাকে বলো, এটা মনে করা কি বেশি অর্থপূর্ণ নয় যে, একটি নির্মিত বাড়ির একজন নির্মাতা থাকা উচিত – এমন একজন স্থপতি যিনি বাড়িটি তৈরি করেছেন? নাকি কোনও নির্মাতা ও পরিকল্পনা ছাড়াই বাড়িটি নিজেই অস্তিত্বে এসেছে? একটি সুন্দর শিল্পকর্ম কি একজন অন্ধ ব্যক্তির দ্বারা সৃজিত হওয়া সম্ভব? নাকি এমন একজন দক্ষ শিল্পীর পক্ষেই তা সৃজিত হওয়া সম্ভব যিনি দেখতে ও অনুভব করতে পারেন তার শিল্পকর্মটি কেমন হবে? (মসনবী, খন্ড ৬, পংক্তি: ৩৬৯-৩৭১)
এমব্রয়ডারি ও পেইন্টিং সম্পর্কে যার কোনই ধারণা নেই সে কি তার মত নিপুণ প্রোডাক্ট তৈরি করতে পারবে যে এ সম্পর্কে ভালভাবে জানে ও বুঝে?
একজন পাত্র-নির্মাতা যিনি নিজেকে পাত্র তৈরিতে ব্যস্ত রাখেন; তিনি পাত্রটির রূপ, আকৃতি ভেঙে পুনরায় তৈরি করেন, এটিকে আকার দেন এবং একটি চমৎকার পাত্র তৈরি করেন। একটি পাত্র কি নির্মাতা ছাড়া আকার পেতে পারে?
একটি কাঠ কতটা চমৎকার রূপ লাভ করবে তা একজন দক্ষ ছুতারের নিপুণ হাতের উপর নির্ভর করে। যদি এমনটি না হয়, যদি কোন কারিগর না থাকে, তাহলে কাঠ থেকে কীভাবে আসবাবপত্র তৈরি হওয়া সম্ভব? একজন দর্জি ছাড়া কি নিজে নিজেই কাপড় কাটা ও সেলাই করা সম্ভব? হে বুদ্ধিমান ব্যক্তি, পানির বাহক না থাকলে কিভাবে পানির বোতল খালি হয়ে নিজে নিজেই ভরে যাবে? একইভাবে চিন্তা করুন, আপনি প্রতি মুহূর্তে কীভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করে আপনার বুককে খালি ও ভরাট করছেন? অতএব, হে জ্ঞানী মানুষ, তুমি এক মহান স্রষ্টার সুনিপুণ হাতে গড়া সৃষ্টি! একদিন যদি তোমার চোখের পর্দা সরে যায়, তখন তুমি দেখবে সব রহস্যের জট খুলে গেছে, তুমি উপলব্ধি করতে পারবে কীভাবে এক মহান শিল্পীর হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় শিল্পকর্ম এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় বদলে যাচ্ছে!” (মসনবী, খণ্ড ৬, পঙক্তি: ৩৩৩২-৩৩৪১)
সুতরাং একটি নিখুঁত সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থাপনার মধ্যে বিদ্যমান সৃষ্টির অস্তিত্ব এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে একটি "কাকতালীয়" ঘটনা হিসাবে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।
প্রিন্সটনের শীর্ষস্থানীয় জীববিজ্ঞানী ও প্রাণিবিদ এডউইন কনক্লিন (১৮৬৩-১৯৫২) বলেছেন: "দুর্ঘটনা থেকে জীবনের উদ্ভবের সম্ভাবনা একটি মুদ্রণ দোকানে বিস্ফোরণের ফলে বিক্ষিপ্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে নিজে নিজেই একটি অভিধান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনার সাথে তুলনীয়।"
ভূমকিা: খ
মানুষ ও ধর্ম
ধর্ম হল মানুষের জন্য সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত পথ-নির্দেশ, শিক্ষা বা উপদেশাবলী যার মধ্যে মানুষের মৃত্যুর আগের ও পরের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় তথ্যসমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকে। ধর্ম মানুষকে তার এই পার্থিব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে যাতে সে অন্যের ক্ষতি না করেই বেঁচে থাকতে পারে। এটি তার জন্য কিছু অধিকার ও কর্তব্যের প্রতিও গুরুত্ব প্রদান করে যাতে সে পৃথিবীর এই স্বল্প সময়ের জীবনটা শান্তিতে কাটাতে পারে এবং তার পরকালের জীবনের জন্যও কোন ঝুঁকি না থাকে।
সর্বশক্তিমান আল্লাহ মহাবিশ্বে বিভিন্ন বস্তু ও প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। তা সত্তেও সকল সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে একটি বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। মানুষকে এমন অনেক উচ্চতর গুণ-বৈশিষ্ট্য দেয়া হয়েছে যা অন্যান্য সৃষ্টিকে দেয়া হয়নি। যেমন মানুষের বুদ্ধি, ইচ্ছা, প্রজ্ঞা, বোধগম্যতা, অধিকারী হওয়া এবং আয়ত্ত করার ক্ষমতা।
যদিও এই গুণ বা সক্ষমতাগুলো দ্বি-ধারী তরবারির মতো। যদি এই গুণগুলোর ইতিবাচক ব্যবহার করা হয়, তবে তারা মানবতার জন্য কল্যাণ, সৌভাগ্য এবং প্রাচুর্য নিয়ে আসে। অন্যদিকে মানুষ যখন মেধা বা গুণ বৈশিষ্ট্যগুলোর নেতিবাচক ব্যবহার করে, তখন সেগুলো অপ্রত্যাশিত ও মারাত্মক পরিণতি নিয়ে আসে এবং পৃথিবীতে ভয়ঙ্কর নৈরাজ্য শুরু হয়। তারা ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা এবং যুদ্ধের মত ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটায়। মানুষের এই বৈশিষ্ট্য ও ক্ষমতাকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য আমাদের আরেকটি শক্তি প্রয়োজন। আর সেই শক্তি হল সত্য ধর্ম বা সঠিক জীবনবোধ ও জীবনব্যবস্থা। তবে, এটা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, আমাদের ধার্মিক হওয়া সৃষ্টিকর্তার নিজের জন্য কোন প্রয়োজন নেই এবং আমাদের ধর্মীয় আদেশের অনুশীলন সৃষ্টিকর্তার জন্য কোন উপকার বয়ে আনে না। কারণ তিনি মুখাপেক্ষিহীন। বরং ধর্মীয় আদেশ বা স্রষ্টার উপদেশ মানা আসলে আমাদের নিজেদের জন্যই প্রয়োজন। শুধুমাত্র পরকালের মুক্তির জন্যই নয়; এই দুনিয়াতে সুখী হওয়ার জন্যও আমাদের ধর্মীয় আদেশ মানা উচিত।
মূলতঃ এ কারণেই সমস্ত ঐশ্বরিক ধর্ম এ সত্যটা প্রকাশ করে যে, মানুষকে তার স্রষ্টাকে জানার জন্য এবং তাঁর উপাসনা করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
যারা মানুষের কাছে সৃষ্টিকর্তার বার্তা পৌঁছে দেন তারাই নবী। ইসলাম সকল নবীকে স্বীকার করে এবং মুসলমান হওয়ার জন্য নবীদের প্রতি ঈমান আনা অপরিহার্য করে তোলে। ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে, নবীদের মধ্যে সম্পূর্ণতা এবং ধারাবাহিকতা রয়েছে। নবীগণ পূর্ববর্তী নবীগণকে স্বীকার করতেন এবং পরবর্তী নবীগণের সুসংবাদ ঘোষণা করতেন। অতএব, যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর বাণীবাহক হযরত মুহাম্মদের (সা.) নবুওয়াত গ্রহণ করে, সে আসলে পূর্ববর্তী সকল নবীকেও গ্রহণ করে। হাতিব ইবন আবি বালতায়া (রাঃ) (মৃত্যু ৩০ হিজরি) যখন মিসরের গভর্নরের (মুকাকিস) কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চিঠি নিয়ে এলেন, তখন তাঁকে বললেন:
“আমরা আপনাকে ইসলামের প্রতি আমন্ত্রণ জানাই, যে ধর্ম আল্লাহ মানুষের জন্য মনোনীত করেছেন। মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুধু আপনাকেই আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন না; সমগ্র মানবজাতিকেই আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। হযরত মূসা (আঃ) যখন হযরত ঈসা মসিহের (আঃ) আগমনের সুসংবাদ ঘোষণা করেছিলেন, তখন খ্রিস্টানরা তাঁর সাথে সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেছিল। একইভাবে হযরত ঈসা মসিহ (আঃ) হযরত মুহাম্মদের (সা.) আগমনের ঘোষণা করেছিলেন। আপনাকে কুরআনের প্রতি আমাদের আমন্ত্রণ আসলে বাইবেলের প্রতি তাওরাতের লোকদের আমন্ত্রণের মতো। প্রত্যেক ব্যক্তি তার সময়ের নবীর অধীন হতে বাধ্য। আপনি তাদের মধ্যে একজন যারা নবী মুহাম্মদের (সা.) যুগে পৌঁছেছেন, তাই আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে আমরা আপনাকে হযরত (মহামান্য) ঈসা (আঃ)-এর ধর্ম থেকে বিচ্যুত করছি না; বরং, আমরা আপনাকে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”
টরেন্টোর ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির নও মুসলিম প্রফেসর টিমোথি জিয়ানোত্তি, ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়ে তার পুরনো ধর্ম খ্রিস্টধর্মকে উপেক্ষা করছেন না বলে জোর দেওয়ার পরে এবং কীভাবে তার পুরনো ধর্ম মুসলিম হওয়ার জন্য একটি রূপান্তর পর্যায়ে ছিল এবং ইসলাম কীভাবে একটি সর্বাঙ্গীণ ধর্ম যা খ্রিস্টধর্মের লক্ষ্যগুলোকে পূরণ করে তা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, "ইসলামের ভূমিকা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে আল্লাহর দৃষ্টিতে মূল্যবান মানুষে রূপান্তরিত করা নয়; বরং সমগ্র মানবতাকেই বিকশিত করা।"
একটি হাদিসে বলা হয়েছে, নবীরা সবাই একই আদি পিতা-মাতার সন্তান। এই সাধারণ পিতামাতা এটা নির্দেশ করে যে, সমস্ত সত্য ধর্মের একই সাধারণ নীতি রয়েছে। অন্য কথায়, বিশ্বাসের মৌলিক বিষয় এবং প্রধান নৈতিক মূল্যবোধের দিক থেকে প্রথম নবী থেকে শেষ নবী পর্যন্ত সবারই সত্য ধর্ম একই ছিল, তবে কিছু উপাসনা পদ্ধতি ও নিয়ম পরিবর্তন করা হয়েছিল।
যেহেতু একই উৎস থেকে এসেছে, তাই ঐশ্বরিক ধর্মগুলোর মধ্যে কিছু মিল দেখা খুবই স্বাভাবিক। উদাহরণ স্বরূপ, ইসলাম যে নামাজ আদায় করার নির্দেশ দেয়; বাইবেলের নিম্নলিখিত শ্লোকগুলো থেকে সে ধরনের প্রার্থনা করার নিয়ম সমূহের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন : এসো, উপাসনা করি; এসো, আমরা আমাদের সৃষ্টিকর্তা প্রভুর সামনে নতজানু হই" (সামস্, ৯৫:৬)
"এবং মূসা ও হারুন তাদের মুখের উপর (সিজদায়) পড়ে রইল।" (সংখ্যা ১৬:২০-২২)
"মূসা তৎক্ষণাৎ মাটিতে সিজদা করে প্রার্থনা করলেন।" (যাত্রা, ৩৪:৮)
"যীশু তার মুখের উপর (সিজদায়) পড়লেন... এবং প্রার্থনা করলেন।" (ম্যাথু, ২৬:৩৯)
"যখন শিষ্যরা এই কথা শুনল, তারা সিজদাহ করল..." (ম্যাথু, ১৭:৬)
ইসলাম ধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য সমূহ:
১. স্রষ্টার একত্ব: ইসলাম ধর্মের মূল বৈশিষ্ট্য
সমস্ত ঐশ্বরিক ধর্ম সৃষ্টিকর্তার একত্ব শিক্ষা দেয় যে, তাঁর সমতুল্য আর কিছু নেই। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তার পিতা আজারকে আল্লাহর একত্ব ব্যাখ্যা করেছিলেন। ইহুদি ধর্ম যে মৌলিক নীতির উপর জোর দেয় তা হল আল্লাহর একত্ব। তাওরাত অনুসারে প্রথম মানুষ আদম, তাঁর সন্তান নূহ, ইব্রাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব এবং ইউসুফ (আঃ) সকলেই মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। মূসাকে (আঃ)-কে তাওরাত ও অন্য যে দশটি আদেশ দেওয়া হয়েছিল তাতে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া বিষয় হল স্রষ্টার একত্ব। ডেভিডের (দাউদ আঃ) কাছে নাযিল হওয়া সাম সমূহ (Psalms) হল এক ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা৷ হযরত ঈশা (আঃ)ও (মহামান্য যীশু) জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, ধর্মের প্রথম আদেশ হল ঈশ্বরের একত্ব।
পরবর্তীতে ইহুদি ধর্মে ঈশ্বরের নৃতাত্ত্বিক বর্ণনা এবং মানব যীশুকে ঈশ্বরে রূপান্তরিত করা ছিল তাদের সীমালঙ্ঘনের ফল যা ঈশ্বরের একত্বকে ত্রিত্বের বিকৃতিতে পরিণত করে। ইসলাম আবারও ঈশ্বর তথা আল্লাহর একত্বকে সুস্পষ্ট করে যা সময়ের সাথে সাথে জমে থাকা অজ্ঞতার অন্ধকারে (জাহেলিয়াত) অস্পষ্ট হয়ে পড়েছিল। ইসলাম অজ্ঞতার অন্ধকারে জন্ম নেয়া ভ্রান্ত ধারণাগুলোকেও দূর করে এবং ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মকেও ঈশ্বরের একত্ব (তাওহিদ) নিশ্চিত করার জন্য তার সাথে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়।
স্রষ্টার যৌক্তিক এবং মহাজাগতিক প্রমাণ স্পষ্ট করে যে তিনি এক ও অদ্বিতীয়। পবিত্র কুরআন বলে: “আল্লাহ কোন সন্তান জন্ম দেননি, তার সাথে আর কোন উপাস্যও নেই; যদি অনেক উপাস্য থাকত, তাহলে তোমরা দেখতে, প্রত্যেক উপাস্য তার সৃষ্ট জিনিস পৃথক করে নিত এবং কেউ কেউ অন্যের উপর কর্তৃত্ব করত! আল্লাহ মহান। তিনি সেসব ধারণা থেকে পবিত্র যা তারা তাঁর প্রতি আরোপ করে থাকে।"
“যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ব্যতীত অন্য উপাস্য থাকত, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত। সুতরাং তারা যা বলে, আরশের অধিপতি আল্লাহ তা থেকে পবিত্র, মহান।"
যেহেতু একাধিক ঈশ্বরের অস্তিত্ব অসম্পূর্ণতার বৈশিষ্ট্য সমূহকে বুঝায়; যেমন কর্তৃত্বহীনতা, ঘাটতি এবং সৃষ্টি হওয়া, তাই সৃষ্টিকর্তার একত্ব আবশ্যক।
সৃষ্টির প্রতি লক্ষ্য করলেই স্রষ্টার একত্ব বোঝা যায়। আকাশ থেকে যে বৃষ্টির ফোটা পড়ে, মাটি থেকে যে টমেটো বা মরিচ হয়, গাছে জন্মে যে আপেল ও নাশপাতি সবই একই আকার ও বর্ণের। তাদের মধ্যে দূরত্ব যতই হোক না কেন, তারা এমনভাবে কাজ করে যেন একে অপরকে চেনে। এসব দৃষ্টান্ত মানুষের সামনে এই সত্যকে তুলে ধরে যে, সমস্ত সৃষ্টি-জগৎ একই স্রষ্টার নিপুন হাত থেকে অস্তিত্ব লাভ করেছে এবং তারই বিধান ও নিয়ন্ত্রণ মেনে চলছে। এ কারণে ইসলাম ধর্ম মতে সবচেয়ে বড় পাপ হল আল্লাহকে অস্বীকার করা, তাঁর সত্তার সাথে শরীক করা, তাঁর গুণাবলী ও কর্তৃত্বের সাথে অন্যকাউকে অংশীদার করা এবং তাঁকে ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি দেবত্ব আরোপ করার মত সীমালংঘন করা। এই পাপটিকে বলা হয় "শিরক বা শরিক করা" এবং এটি সমস্ত বড় পাপের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাপ। কারণ এর মাধ্যমে স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শিরক করা বা পৌত্তলিকতাকে "সর্বোচ্চ অন্যায় কাজ" এবং "সত্যিকার অর্থে সবচেয়ে জঘন্য পাপের পরিকল্পনা করা" হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, তিনি ইচ্ছে করলে অন্য যেকোন পাপকে ক্ষমা করবেন, তবে যারা শিরক করে এবং অনুতপ্ত না হয়ে মারা যায় তাদের তিনি কখনো ক্ষমা করবেন না। শিরকের পাপ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় তা ত্যাগ করে তাওহিদকে গ্রহণ করা এবং অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়া।
২. ইসলাম একটি প্রাকৃতিক ধর্ম, যুক্তির সাথে এর কোন বিরোধ নেই
ইসলামের আহবান সমগ্র মানবতার প্রতি। এর বিধানও মানুষের আদি ও প্রাকৃতিক প্রবণতা ও চাহিদা অনুসারে নির্ধারিত হয়েছে; কোন আনুষঙ্গিক, ক্ষণস্থায়ী বা আংশিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে নয়। মানুষের প্রতি স্রষ্টার এই পথনির্দেশনা বা হেদায়াত পৃথিবীতে তার যাত্রার পথ নির্ধারাণ থেকেই চলে এসেছে । এই কারণে, ইসলাম একটি প্রাকৃতিক ও কালোত্তর ধর্ম এবং এটি পুরানো হয়ে যায় না। এর ধর্মবিশ্বাস ও নীতি সমূহ বিস্ময়কর বিষয় সমূহের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং বুদ্ধি ও সুস্পষ্ট বাস্তব-সম্মত বিষয় সমূহের উপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ কারণেই ইসলাম কখনই বৈজ্ঞানিক সত্যের বিরোধিতা করে না। যদি ইসলামের ইবাদত- উপাসনা ও জীবন পদ্ধতির অনুশীলন সম্পর্কিত আদেশগুলো পরীক্ষা করা হয়, তাহলে সহজেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সেই আদেশগুলো মানব প্রকৃতির সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যেহেতু বুদ্ধিমত্তা মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, তাই কুরআন বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাভাবনা ব্যবহার করার উপর বিশেষভাবে জোর দেয়। আল কুরআনের প্রায় ৭৫০টি আয়াতে সর্বোত্তম উপায়ে মানুষকে চিন্তা, গবেষণা এবং বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার জন্য উপদেশ দেয়া হয়েছে।
যখন আল্লাহর রসূলকে (সাঃ) অবিশ্বাসী লোকেরা বলল: “আমাদেরকে কিছু অলৌকিক ঘটনা দেখান যাতে আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনি ও আপনাকে নবী হিসাবে স্বীকার করি,” তখন আল্লাহ তাদের প্রস্তাব পছন্দ করেননি; তিনি বরং তাদেরকে পৃথিবী ও আকাশের দিকে তাকাতে উৎসাহিত করলেন এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করার জন্য অলৌকিক ঘটনা দেখতে চাওয়ার চেয়ে তাদের নিজেদের সম্পর্কে চিন্তা করতে বললেন।
যেহেতু ইসলাম বুদ্ধিমত্তাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়, তাই এটি এমন বস্তুকে নিষিদ্ধ করে যা মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। যেমন অ্যালকোহল বা মাদকদ্রব্য। আমাদের সাধারণ বুদ্ধিমত্তাও স্বীকার করবে যে, মানুষের জন্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হওয়ার চেয়ে সতর্ক থাকা ভাল এবং অলসতা বা মাতালতা কোনও উপকার করে না।
প্রাকৃতিক ধর্ম হওয়ার কারণেই ইসলাম সর্বদা বাস্তবসম্মত নিয়ম-কানুন পেশ করে। ইসলামে এমন কোন আদেশ নেই যা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব; মানব প্রকৃতির জন্য কষ্টকর বা কঠিন কোন আইন-বিধান ইসলামে নেই। কিছু উদাহরণ দেয়া যাক:
• অযু (ওজু) করার জন্য পানি না থাকলে বা কেউ স্বাস্থ্যগত কারণে পানি ব্যবহার করতে না পারলে তাকে পরিষ্কার মাটি দিয়ে শুকনো ওযু (তায়াম্মুম) করতে বলা হয়েছে।
• যদি কেউ দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে না পারে, তবে তা বসে, শুয়ে বা এমনকি মাথা নত করে ও সংকেত দিয়েও করা যেতে পারে।
• যদি স্বাস্থ্যগত কারণে রোজা রাখা না যায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে করা যেতে পারে বা রোজা না রেখে গরীবদের অর্থ দান করা যেতে পারে।
• বাধ্যতামূলক দান (যাকাত); হজ করা শুধুমাত্র যথেষ্ট ধনী ব্যক্তিদের জন্য ফরজ (অত্যাবশ্যক)।
৩. ইসলামে কোন পাদ্রী, পুরোহিত বা মধ্যস্থতা শ্রেণী নেই
ইসলামের একজন মনীষী (আলেম) বলেছেন, "আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ তাঁর সৃষ্টির নিঃশ্বাসের সমান।" অন্য কথায়, প্রত্যেকেরই স্রষ্টার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করার সুযোগ ও স্বাধীনতা রয়েছে। প্রত্যেকে আল্লাহকে স্মরণ করার মাধ্যমে সরাসরি তাঁর নিকট প্রার্থনা করতে পারে এবং ক্ষমা চাইতে পারে। যখন কেউ আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, তখন সে অবশ্যই তাঁকে তার সামনে পায়।
এ সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ বলেন:
وَ اِذَا سَاَلَكَ عِبَادِیۡ عَنِّیۡ فَاِنِّیۡ قَرِیۡبٌ ؕ اُجِیۡبُ دَعۡوَۃَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ ۙ فَلۡیَسۡتَجِیۡبُوۡا لِیۡ وَ لۡیُؤۡمِنُوۡا بِیۡ لَعَلَّهُمۡ یَرۡشُدُوۡنَ০
‘যখন আমার বান্দা আমার সম্পর্কে তোমার নিকট জিজ্ঞেস করে, আমি তো (তার) নিকটেই, প্রার্থনাকারী যখন আমাকে ডাকে আমি তার আহবানে সাড়া দেই; সুতরাং তাদের উচিত আমার নির্দেশ মান্য করা এবং আমার প্রতি ঈমান আনা, যাতে তারা সরলপথ প্রাপ্ত হয়।’ (বাকারা: আয়াত ১৮৬)
আল কোরআনে আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে প্রার্থনা করতে এবং ক্ষমা চাইতে বলেছেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, তিনি অত্যন্ত করুণাময়, তাই তিনি প্রার্থনার উত্তর দিয়ে পাপ ক্ষমা করেন। প্রার্থনার উত্তর দেওয়া ও গুনাহ মাফ করা একমাত্র আল্লাহর এখতিয়ার। কারণ তিনিই একমাত্র সর্বশক্তিমান। কোন সৃষ্টিই তাঁর কর্তৃত্ব ব্যবহার করতে পারে না। কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহর মালিকানাধীন। তাই তাঁর কর্তৃত্বে কোনো কর্তৃপক্ষের বা অন্য কোনো সত্তার অংশ আছে মনে করাকে "শিরক" বলে গণ্য করা হয়।
ইসলামে নামাজ, রোজা বা বিবাহের মতো বিষয়ে পাদ্রীর প্রয়োজন নেই। প্রত্যেক মুসলমানের ধর্ম পালনের জন্য ন্যূনতম যতটুকু জ্ঞান অর্জন প্রয়োজন ততটুকু জ্ঞান অর্জন করা ফরজ বা বাধ্যতামূলক। মুসলমানরা যখন নামাজ পড়ার জন্য একত্রিত হয়, তখন তারা তাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিকে নামাজে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য (ইমাম) বেছে নেয়। ইসলামিক স্কলারদের ভূমিকা শুধুমাত্র দ্বীনের মূলনীতি ব্যাখ্যা করা ও শিক্ষা দেওয়া এবং অন্যদেরকে বক্তৃতা ও উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে আলোকিত ও সঠিক পথ দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাদের পাপ ক্ষমা করার ক্ষমতা নেই বা স্রষ্টা ও তাঁর বান্দাদের মধ্যে মধ্যস্থতা করে প্রার্থনার উত্তর দেওয়ার এখতিয়ার নেই।
মূর্তি পূজা শুরু হয়েছিল যখন লোকেরা সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর সৃষ্টির মধ্যে মধ্যস্থতা করতে শুরু করেছিল তখন থেকে। মক্কার মুশরিকরা যুক্তি দিয়েছিল যে, তারা মূর্তি পূজা করত যাতে মূর্তিগুলি তাদের ঈশ্বরের নিকটবর্তী করে দেয়। সময়ের সাথে সাথে তারা ঐ মধ্যস্থতাকারীদের উপর ঐশ্বরিক ক্ষমতার দায় চাপাতে শুরু করে।
৪. ইসলাম দুনিয়া ও আখেরাত, বস্তুগত ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে
ইসলাম মধ্যপন্থা ও ভারসাম্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। মানব জীবনের এই বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক সমস্যার একটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে অন্যটিকে উপেক্ষা করে না। যেহেতু আল্লাহ উভয়টিই সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের উভয়টিই প্রয়োজন তাই একটিকেও অবহেলা করা ঠিক হবে না। এটি ন্যায়সঙ্গত হতে হবে এবং উপযুক্ত হিসাবে প্রতিটি দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যায়, আখেরাতের জন্য উপার্জনের পুঁজি হিসেবে এই দুনিয়া একটি অতি মূল্যবান উপহার। মানুষকে অবশ্যই এই উপহারটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যবহার করতে হবে। পরকালই আসল লক্ষ্য এবং এটা কখনই ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি যেমন শুধুমাত্র এই দুনিয়ার প্রতি মনোযোগ দেয়, তেমনি খ্রীষ্টীয় যাজকীয় দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র পরকালের জন্য উদ্বিগ্ন যা মানুষের চাহিদা পূরণ করে না। তাদের একটিকে অন্যটির জন্য ত্যাগ করা উচিত নয়; বরং উভয়ের মধ্যেই সঠিক ভারসাম্য বজায় রেখে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
মানব সত্তা আত্মা ও দেহের সমন্বয়ে গঠিত; যদিও আত্মা অপরিহার্য উপাদান, তবে আত্মাকে ধারণ করে দেহ। তাই শুধু আত্মার প্রতি মনোযোগ দেওয়া ও দেহকে উপেক্ষা করা ঠিক নয়। আমাদের নবী আমাদেরকে যা বলেছেন, আখেরাতে মানুষকে প্রথম যে বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে তা হল- তারা কীভাবে তাদের জীবন ও যৌবনকে ব্যবহার করেছিল। ইসলাম আমাদেরকে এমনকি নামাজ, রোজা এবং দরিদ্রদের পাওনা যাকাতের মতো ইবাদতের ক্ষেত্রেও যথাযথ ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। এটি দুনিয়াত্যাগি বৈরাগ্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করে যা মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলে।
৫. ইসলাম শিক্ষাকে উৎসাহিত করে যা বিজ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ধর্মকে অন্তর্ভুক্ত করে
ইসলাম ও বিজ্ঞানের মধ্যে কোন মতবিরোধ বা দ্বন্দ্ব নেই। ইসলাম তার সমস্ত ইতিহাসে কখনো বিজ্ঞানকে নিষিদ্ধ করেনি বরং অত্যন্ত জোরালোভাবে জ্ঞান অর্জন করাকে উত্সাহিত করেছে এবং নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য জ্ঞান অর্জন করাকে বাধ্যতামূলক (ফরজ) ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সমূহ কখনও ইসলামের সত্যতাকে নাকচ করেনি বরং বিজ্ঞান ক্রমাগতভাবে ইসলামের শিক্ষাকে নিশ্চিত করেছে। বিজ্ঞান কেন ও কীভাবে ইসলামের সত্যতাকে অস্বীকার করবে? বিজ্ঞান তো সৃষ্টি জগতের মধ্যে বিদ্যমান আল্লাহ প্রদত্ত নিয়মগুলোই পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কার করার চেষ্টা করে। ইসলাম একটি ঐশ্বরিক ধর্ম যা আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ এবং তিনিই এর মূল রূপ সংরক্ষণ করেছেন। তাই ইসলাম ও বিজ্ঞানের উৎস একই। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং বিজ্ঞানের বিকাশের সাথে সাথে স্রষ্টার মহিমা, শক্তি এবং তাঁর জ্ঞানের অসীমতা আরও ভালভাবে জানা যায় এবং তাঁর প্রতি মানুষের বিশ্বাস আরও গভীর হয়। এ কারণে, বিজ্ঞান ইসলামের একটি অন্তর্নিহিত অংশ।
আল্লাহর সুন্দর নামগুলোর মধ্যে অনেকগলো রয়েছে যা প্রকাশ করে যে, আল্লাহ গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানেন এবং তিনি কীভাবে সবকিছু জানেন তাও প্রকাশ করা হয়েছে।
কুরআন ও হাদীসে মানুষকে জ্ঞান অন্বেষণে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
فَتَعٰلَی اللّٰهُ الۡمَلِكُ الۡحَقُّ ۚ وَ لَا تَعۡجَلۡ بِالۡقُرۡاٰنِ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ یُّقۡضٰۤی اِلَیۡكَ وَحۡیُهٗ ۫ وَ قُلۡ رَّبِّ زِدۡنِیۡ عِلۡمًا
আল্লাহ অতি মহান, প্রকৃত অধিপতি। তোমার প্রতি কুরআনের আয়াত সম্পূর্ণ হবার পূর্বে তুমি তাড়াহুড়ো করো না। এবং বলঃ হে আমার রাব্ব! আমার জ্ঞানকে বৃদ্ধি করুন। (তা-হা, ২০:১১৪)
كُمۡ تَفَسَّحُوۡا فِی الۡمَجٰلِسِ فَافۡسَحُوۡا یَفۡسَحِ اللّٰهُ لَكُمۡ ۚ وَ اِذَا قِیۡلَ انۡشُزُوۡا فَانۡشُزُوۡا یَرۡفَعِ اللّٰهُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡكُمۡ ۙ وَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡعِلۡمَ دَرَجٰتٍ ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ ﴿۱۱﴾
"তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উন্নীত করবেন।" (আল-মুজাদিলা, ৫৮:১১)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যদি কেউ জ্ঞান অর্জনের ইচ্ছা নিয়ে পথ চলা শুরু করে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করেন এবং ফেরেশতারা তার পথের উপর তাদের ডানা প্রসারিত করে। আসমান-জমিনের সবকিছু, এমনকি পানির নিচের মাছও জ্ঞানীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। জ্ঞানহীন উপাসকদের উপর জ্ঞানীদের শ্রেষ্ঠত্ব তেমন, যেমনটা আমরা পূর্ণিমার রাতে তারাদের উপর চাঁদের ঔজ্বল্য উদ্ভাসিত হতে দেখি। জ্ঞানীরা নবীদের উত্তরাধিকারী। নবীরা স্বর্ণ ও রৌপ্য অসিয়ত করেন না; তারা জ্ঞান দান করেন। যে কেউ এই উত্তরাধিকার গ্রহণ করে সে অনেক বড় অনুগ্রহ গ্রহণ করে।" (সুনান আবু দাউদ:৩৬৪১; সুনান তিরমিজি: ২৬৮২)।
"জ্ঞান হল মুমিনের হারিয়ে যাওয়া সম্পদ: সে যেখানেই এটি পায় সেখান থেকেই তা ফিরে পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।" (সুনান তিরমিজি: ২৬৮৭; সুনান ইবনু মাজাহ: ১৫)
"একজন বিশ্বাসীর জ্ঞানের তৃষ্ণা কখনই মেটানো যায় না যতক্ষণ না সে তার চূড়ান্ত মঞ্জিল - জান্নাত লাভ করে।" (সুনান তিরমিযী: ২৬৮৬)
এ কারণে মুসলমানরা বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করে। খ্রিস্টিয় অষ্টম শতাব্দিতে আহমদ এন-নাহাওয়ান্দি জ্যোতির্বিদ্যা পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। পরবর্তীকালে, তারা বিশাল মানমন্দির তৈরি করেছিলেন। এছাড়া জ্যোতির্বিদ্যার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র অ্যাস্ট্রোল্যাব তৈরি করেছিলেন, যা দিয়ে তারা সূর্য, নক্ষত্র এবং অন্যান্য গ্রহের জ্যোতির্বিদ্যাগত উচ্চতা, মহাজাগতিক সময়, পাহাড়ের উচ্চতা এবং কূপের গভীরতা পরিমাপ করেতেন। এই কাজের ফলস্বরূপ, পুরানো ধ্রুবকগুলো সংশোধন করা সম্ভব হয়েছিল এবং নতুন তারকা সমূহের ক্যাটালগ বা শ্রেণিবিন্যাসকৃত তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল। মুসলমানদের অবদানের কারণেই অনেক নতুন নক্ষত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, গ্রহের প্রবণতার মাত্রা আবার পরিমাপ করা হয়েছে, সূর্যের সর্বোচ্চ গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে এবং স্থিতিশীল নক্ষত্রের সাথে সম্পর্কিত ও গ্রহের গতিবিধির সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোও তখন হয়েছিল।
মুসলমানরা জ্যোতির্বিদ্যায় গণিতের প্রয়োগে নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। "অবিচ্ছিন্ন রশ্মি" (continuous beams) এর পরিবর্তে তারা ত্রিকোণমিতি এবং সাইনাস গণনা ব্যবহার করেতেন এবং অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট পরিমাপ পেতে সক্ষম হয়েছিলেন। তারা গ্রহের গতিবিধি পরিমাপের সাথে সম্পর্কিত কৌশল উদ্ভাবন ও ব্যবহারে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেছিলেন।
একইভাবে, মুসলমানরা ভূতত্ত্ব, খনিজবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, গণিত-বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসাবিদ্যা এবং ফার্মেসি বিজ্ঞানে অনেক নতুন নতুন আবিষ্কার করেন এবং বিজ্ঞানের এই শাখা গুলোর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭ খ্রিঃ) একাই ২৯টি বিভিন্ন বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্কলার ছিলেন। তার একক গবেষণা ও আবিষ্কার সমূহ জ্ঞান বিজ্ঞানে ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের পথ প্রশস্ত করেছিল। তাঁর 'আল-কানুন ফিত-তিব'-কে ইউরোপে বলা হতো 'দ্য ক্যানন ইন মেডিসিন', যা ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যপুস্তক হিসাবে ৬০০ বছর ধরে পড়ানো হয়েছিল।
চোখের রেটিনা লেয়ারের কার্যকারিতার বিষয়ে যিনি প্রথম অবহিত করেন তিনি ছিলেন ইবনে রুশদ (১১২৬-১১৯৮ খ্রিঃ)। চক্ষু বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ গবেষক ছিলেন আলী বিন ঈসা (একাদশ শতাব্দী), তাঁর রচিত ‘‘তাজকিরাতুল কাহ-হালিন’’ (Tazkiratu’l Kah-halin) বহু শতাব্দী ধরে দৃষ্টিবিজ্ঞানের একমাত্র পাঠ্যপুস্তক হিসাবে রয়ে গেছে এবং ল্যাটিন, জার্মান এবং ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। আম্মার বিন আলী (দ্বাদশ শতাব্দী) নয় শতাব্দী আগে চোখের অস্ত্রোপচার করেছিলেন এবং তিনি তার বই আল মুনতাখাব ফি 'ইলাজিল আইন'-এ ছানি অপসারণ কীভাবে করেছিলেন তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই বইটিও তৎকালীন প্রধান ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। ইবনে হাইথাম (আলহাজেন) (৯৬৫-১০৫১ খ্রিস্টাব্দ) চশমা আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ পদার্থবিদ এবং চক্ষুবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা।
আলী বিন আব্বাস (৯৬৪ খ্রিস্টাব্দ) ক্যান্সারের অস্ত্রোপচার করেছিলেন যা আজকের আধুনিক অস্ত্রোপচারের কৌশলগুলিকে পথ দেখিয়েছিলো। তাঁর অমর গ্রন্থ "কিতাবুল-মালিকি" একটি ওষুধের বিশ্বকোষ, যা আজও প্রশংসার সাথে মূল্যায়ন করা হয়। আবুল কাশেম আজ জাহরাভি (৯৬৩-১০১৩ খ্রিঃ) সার্জারিকে একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক শাখায় পরিণত করেছেন। তিনি অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত প্রায় ২০০টি টুলের ছবি আঁকেন এবং তাঁর ‘‘তাসরিফ’’ নামক বইতে সেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন।
হৃদযন্ত্রের মাইক্রো-সার্কুলেশন সিস্টেম আবিষ্কার করেছিলেন ইবনে আল-নাফিস, যিনি ১২১০ থেকে ১২৮৮ সালের মধ্যে বিদ্যমান ছিলেন এবং তিনি ইবনে সিনার কানুন-এর একটি ভাষ্যতে এটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
মধ্যযুগের মুসলিম বিজ্ঞানী আকশেম সেদ্দিন (১৩৮৯-১৪৫৯) তার ‘‘মাদ্দেত আল-হায়াত’’ নামক বইতে জীবাণু সম্পর্কে বলেছিলেন: “এটা ভাবা ভুল যে অসুস্থতা স্বাধীনভাবে মানুষের মধ্যে ঘটে। অসুস্থতা ছোঁয়াচে। এর বিস্তার ঘটে জীবিত বীজের কারণে যা এত ছোট যে সেগুলি মানুষের চোখে দেখা যায় না।"
গণিত শাস্ত্রের ইতিহাসে যিনি শূন্য সংখ্যার ব্যবহার চালু করেছিলেন তিনি মুসলিম গণিতজ্ঞ হারিজমি (৭৮০-৮৫০ খ্রিঃ)। তিনি বীজগণিতের (আল জাবরা) ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং তাঁর বই আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা’র সাথে মিলিয়ে এটির নামকরণ করেছিলেন।
নবম শতাব্দীর বনু মুসা বা মুসার পুত্ররা নামে খ্যাতি পাওয়া ভ্রাতৃত্রয় খুব ছোটখাটো ত্রুটি থাকলেও গোটা পৃথিবীর পরিধি পরিমাপ করেছিলেন।
আল বেরুনি-Beyrûnî (৯৭৩-১০৫১ খ্রিঃ), যিনি বিভিন্ন বিষয়ে আবিষ্কার করে গেছেন; প্রমাণ করেছেন যে পৃথিবী নিজের এবং সূর্য উভয়েরই চারপাশে ঘুরছে, এবং তিনি ভারতের নেন্দেন নামক শহরের চারপাশে পরিচালিত গবেষণার মাধ্যমে সফলভাবে পৃথিবীর ব্যাস পরিমাপ করেছেন। এই বিষয়ে তার সূত্র ইউরোপে "বেইরুনি সূত্র" নামে পরিচিত।
আল বাত্তানি (আলবাতেগনি)- Battani (Albategni) মাত্র ২৪ সেকেন্ডের একটি ত্রুটি সহ সৌর বছর গণনা করেছিলেন।
ইসমাইল জাওহারী (৯৫০-১০১০ খ্রিঃ) প্রথমবারের মতো উড়তে চেষ্টা করেছিলেন। ইবনে-ই ফিরনাস ৮৮০ সালে বিমানের আবিষ্কারের পথপ্রদর্শক। তিনি পাখির পালক এবং কাপড় দিয়ে বিমান তৈরি করেছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে বাতাসে ভেসে ছিলেন এবং খুব সহজভাবে অবতরণ করেছিলেন।
আল রাজী-Razi (৮৬৪-৯২৫) সর্ব প্রথম অভিকর্ষের কথা উল্লেখ করেন। ক্রিস্টোফার কলম্বাস (১৪৪৬-১৫০৬) বলেছিলেন যে তিনি আমেরিকার অস্তিত্বের কথা মুসলমানদের কাছ থেকে শিখেছিলেন, বিশেষ করে ইবনে রুশদের (১১২৬-১১৯৮) বই থেকে। আল ইদ্রিসি-Idrisi (১১০০-১১৬৬) আট শতাব্দী আগে বিশ্বের মানচিত্র আঁকেন যা আজকের বিশ্বের মানচিত্রের মতো।
ইতিহাস জুড়ে অনেক জায়গায় বিভিন্ন সভ্যতার আবির্ভাব ঘটেছে এবং তারা সকলেই পারস্পরিক প্রভাব ও অবদানের মাধ্যমে বিজ্ঞানের বিকাশে সাহায্য করেছেন। মুসলমানরাও পূর্ববর্তী সভ্যতার জ্ঞান থেকে উপকৃত হয়েছিলেন। তারা কৃতজ্ঞতার সাথে এটি প্রকাশ করেছিলেন এবং ফলস্বরূপ, নিজেদের অগ্রগতির মাধ্যমে বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। পূর্ববর্তী সভ্যতার সময়ে রচিত গ্রন্থগুলো ইসলামী পণ্ডিতরা অনুবাদ করেছিলেন তবে বিষয়বস্তুগুলি নির্বিচারে নেওয়া হয়নি। সেগুলি প্রথমে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং ভুল অংশগুলো অপসারণ করে জ্ঞানকে আরও উন্নত করা হয়েছিল।
৬. ন্যায়বিচার: ইসলামের প্রধান অন্তর্নিহিত শক্তি
সৃষ্টিকর্তা পরম ন্যায়বিচারক। তিনি অন্যায় আচরণ করেন না। তাঁর সুন্দর নামগুলোরর মধ্যে একটি হল আল-আদল, পরম ন্যায়বিচারক। এই কারণে, তিনি তাঁর বান্দাদের কাছ থেকে ন্যায়বিচার ও ন্যায়পরায়ণতা প্রত্যাশা করেন।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন বলেন: “হে ঈমানদারগণ! ন্যায়ের প্রতি সুপ্রতিষ্ঠ ও আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হও যদিও তা তোমাদের নিজেদের কিংবা মাতা-পিতা এবং আত্মীয়গণের বিরুদ্ধে হয়। কেউ ধনী হোক বা দরিদ্র হোক; আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। অতএব প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না যাতে তোমরা ন্যায়বিচার করতে পার এবং যদি তোমরা বক্রভাবে কথা বল কিংবা সত্যকে এড়িয়ে যাও তবে নিশ্চয় তোমরা যা করছ, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত।”(আন-নিসা', ৪:১৩৫)
ইসলাম মুসলমানদেরকে তাদের শত্রুদের প্রতিও ন্যায়পরায়ণ হতে আদেশ করে। আল্লাহ বলেন, “হে মু’মিনগণ! তোমরা ন্যায়ের সাক্ষ্যদাতা হিসেবে আল্লাহর পথে দৃঢ়ভাবে দন্ডায়মান থাক, কোন সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা তোমাদেরকে যেন এতটা উত্তেজিত না করে যে তোমরা ইনসাফ করা ত্যাগ করবে। সুবিচার কর, এটা তাক্বওয়ার নিকটবর্তী। তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্পূর্ণ ওয়াকিফহাল।" (আল-মায়িদা ৫:৮)
আল্লাহর রসূল রাগান্বিত কিংবা শান্ত - সব অবস্থাতেই ন্যায় আচরণ করার উপদেশ দিয়েছেন এবং যারা সেই বৈশিষ্ট্যটি অর্জন করতে পারে তাদের জন্য অনেক পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ইসলামে মৌলিক দ্বন্দ্ব বা মতানৈক্য হল তাদের মধ্যে যারা অত্যাচারী বা নিপীড়নকে সমর্থন করে এবং যারা ন্যায়পরায়ণ এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে।
পবিত্র কোরানে বলা হয়েছে, "যারা নিপীড়ন করে তাদের ছাড়া আর কারও সাথে কোনো শত্রুতা করো না।" মুসলিমদের পক্ষে একই সমাজে এমন কারো সাথে বসবাস করা সম্ভব যে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সে ব্যক্তি মুসলিম হোক বা না হোক। তবে কোনো মুসলমান যদি অত্যাচার করে এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করে, তবে তার বিরোধিতা করা কর্তব্য। অতএব, সামাজিক স্তরে, "আমাদের" এবং "অপরের" মধ্যে নির্ধারক মাপকাঠি হল নিপীড়ন এবং ন্যায়বিচার।
এই কারণে, ইসলামী সমাজ সব সময়ই ন্যায়বিচারের প্রতি অত্যন্ত মনোযোগ দেয়। এর অনেক প্রমাণ ইতিহাসে বিদ্যমাণ। মুসলিমরা বাইজেন্টাইন সামাজ্যের কাছ থেকে সিরিয়ার ইহুদী অধ্যুষিত হিমস শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর বাসিন্দাদের নিরাপত্তা দেয়ারোল বিনিময়ে একটি যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ কর ধার্য করে। কিন্তু সে সময় বাইজেন্টিয়ামের রাজা হেরাক্লিয়াস তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে ইয়ারমুকে মুসলমানদের আক্রমণ করার জন্য অগ্রসর হন। তখন হিমেসের মুসলমানরা চিন্তিত হয়ে পড়ল যখন তারা জানল যে কাছে আসা সৈন্যদল অনেক বড়। তখন তারা হিমসের লোকদেরকে তাদের দেওয়া ট্যাক্স ফিরিয়ে দিয়েছিল এবং বলেছিল: “যেহেতু আমরা আক্রমণের মুখে আছি, এবং আপনাদেরকে রক্ষা করার জন্য আমাদের কাছে সংস্থানের অভাব রয়েছে, তাই আমরা আপনাদেরকে যেহেতু রক্ষা করতে পারছি না, আপনারা এখন আপনাদের করণীয় ব্যাপারে স্বাধীন এবং আপনারা আপনাদের ইচ্ছামত কাজ করতে পারেন।" হিমসের লোকেরা তখন যে উত্তর দিয়েছিল তা হলো: “আমরা ঈশ্বরের শপথ করে বলছি, আপনাদের শাসন ও ন্যায়বিচার আমাদের পূর্বের নিপীড়ন ও স্বৈরাচারী অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি পছন্দনীয়। আমরা আপনাদের গভর্নরের সাথে মিলে হেরাক্লিয়াসের বিরুদ্ধে শহর রক্ষা করব।" ইহুদিরা আরও বলেছিল: "আমরা তোরাতের শপথ করে বলছি যে, হেরাক্লিয়াসের গভর্নর প্রথমে আমাদের পরাজিত ও ধ্বংস না করে হিমস শহরে প্রবেশ করতে পারবেন না।" শহরের দরজা বন্ধ করে তারা শত্রুর হাত থেকে শহরকে রক্ষা করেছিল। অন্যান্য শহরের খ্রিস্টান বা ইহুদি জনগণ যাদের সাথে শান্তি চুক্তি করা হয়েছিল তারাও একই কাজ করেছিল এবং বলেছিল: “রোমানরা এবং তাদের অধীনস্থ লোকেরা যদি মুসলমানদেরকে পরাজিত করে তবে আমরা নিপীড়ন ও স্বৈরাচারের পুরানো যুগে ফিরে যাব এবং আমাদেরকে আরও অনেক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। আমরা চাই মুসলমানরা এই যুদ্ধে জয়ী হোক, আমরা আমাদের পূর্বের চুক্তি অনুযায়ী তাদের সাথে সহযোগিতা করব।’’
আল্লাহর ইচ্ছায় যখন রোমান সাম্রাজ্য পরাজিত হলো ও মুসলমানরা বিজয় লাভ করলেন, তখন সিরিয়ার রোমানরা মুসলমানদের জন্য তাদের দরজা সমূহ খুলে দেয়, তাদের ক্রীড়াবিদদের উৎসবের আহবান জানায় এবং তাদের কর প্রদান করে।
৭. ইসলাম একটি সার্বজনীন ধর্ম
ইসলামের আহবান সমগ্র মানুষ ও জ্বিন জাতির প্রতি। গোত্র, বর্ণ, লিঙ্গ বা জাতি নির্বিশেষে প্রত্যেকে মুসলমান হতে পারে। ইসলাম মানবতাকে তাদের দায়িত্ব ও অধিকার অনুসারে শ্রেণিবদ্ধ করে এবং এটি বিবেচনা করে যে মানব জাতির মধ্যে শুধুমাত্র দুটি ধারার অস্তিত্ব রয়েছে: বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী।
এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয় যে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির সুখ ও পরিত্রাণের জন্য প্রেরিত একটি ব্যবস্থা মুষ্টিমেয় কিছু লোকের জন্য বরাদ্দ করা হবে আর বাকিরা এই অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত থাকবে; অথচ তাঁর রহমত সমস্ত সৃষ্টিকে বেষ্টন করে আছে; এই অবস্থা আল্লাহর রহমান ও রহীমের গুণাবলীর সাথে বেমানান। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“যারা (আল্লাহর) সৃষ্টির প্রতি দয়া করে তাদের প্রতি সর্বশক্তিমান আল্লাহ দয়া করেন। পৃথিবীতে যারা আছে তাদের প্রতি দয়া কর যাতে আসমানে যারা আছে তারা তোমাদের প্রতি দয়া করেন।" (সুনান আবু দাউদ: ৪৯৪১; সুনান তিরমিযী: ১৯২৪)
এ হাদীসটি কোন বিশেষ জাতিকে বোঝায় না। বা এটি "শুধু মুসলমানদের" বুঝায় না। এটি আমাদের সকলকে, সমস্ত মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রতি দয়াশীল হতে আদেশ করে। পবিত্র কোরানে মহানবীকে নিম্নোক্তভাবে সমস্ত মানুষকে ইসলামের দিকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়:
قُلۡ یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اِنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰهِ اِلَیۡکُمۡ جَمِیۡعَۨا الَّذِیۡ لَهٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ۚ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ یُحۡیٖ وَ یُمِیۡتُ ۪ فَاٰمِنُوۡا بِاللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهِ النَّبِیِّ الۡاُمِّیِّ الَّذِیۡ یُؤۡمِنُ بِاللّٰهِ وَ کَلِمٰتِهٖ وَ اتَّبِعُوۡهُ لَعَلَّکُمۡ تَهۡتَدُوۡنَ
"বল, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রসূল, (সেই আল্লাহর) যিনি আকাশসমূহ আর পৃথিবীর রাজত্বের মালিক, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তিনিই জীবিত করেন আর মৃত্যু আনেন। কাজেই তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর প্রেরিত সেই উম্মী বার্তাবাহকের প্রতি যে নিজে আল্লাহর প্রতি ও তাঁর যাবতীয় বাণীর প্রতি বিশ্বাস করে, তোমরা তাঁর অনুসরণ কর যাতে তোমরা সঠিক পথ পেতে পার।" (আল-আরাফ ৭:১৫৮)
وَ مَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ اِلَّا رَحۡمَۃً لِّلۡعٰلَمِیۡنَ
“(আর আমি তো তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি। ', ২১:১০৭)
ইসলামের নির্দেশনা নির্দিষ্ট কোন সময় ও অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সর্বশেষ এই ঐশ্বরিক ধর্ম সারা বিশ্বের সকল যুগের মানুষের জন্য পথনির্দেশ। এই কারণে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কেবল আরবদেরকেই ইসলামের আমন্ত্রণ জানিয়ে বসে থাকেননি; বরং তাঁর সময়ের বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান), ইথিওপিয়ান, মিশরীয় এবং অন্যান্য সম্রাট ও বাদশাহদের কাছেও প্রতিনিধি এবং চিঠি পাঠিয়ে ইসলাম ধর্মের প্রতি আহবান করেছিলেন।
আজ, দেখা যায় পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে এবং প্রতিটি জাতির থেকে, বিশেষ করে হজের সময়, সকলে একত্রিত হয়ে কাবার চারপাশে এক আল্লাহর উপাসনা করছে, যেমনটি আল্লাহ আদেশ করেছেন। এটি একটি প্রশংসনীয় ইসলামী সম্প্রদায় (মুসলিম উম্মাহ) ও ভ্রাতৃত্ববোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইসলামের এমন একটি কাঠামো রয়েছে যা মানুষের সকল চাহিদা মেটাতে সক্ষম। ইসলাম একটি জীবন ও বিশ্বাস-ব্যবস্থা যা মানুষের আধ্যাত্মিক, জাগতিক, ব্যক্তিগত ও সামাজিক অধিকারের উপর দৃষ্টিপাত করে; জীবন ও মৃত্যু, অমরত্ব, নবী, ফেরেশতা, শয়তান, ইহকাল, পরকাল, পুরস্কার, শাস্তি, জান্নাত, জাহান্নাম সবকিছুর অর্থ ব্যাখ্যা করে যার ব্যাখ্যা অন্য কোনো ধর্ম প্ররোচিত নয় বা অন্য কোন ধর্ম এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারে না।
এই পরিস্থিতিটি আরও ভালভাবে বোঝার জন্য, নিম্নলিখিতগুলি বিষয়গুলোর স্মরণ যথেষ্ট হবে: ইসলামী জীবন ব্যবস্থা হিসেবে আল কুরআন মুসলমানদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত প্রয়োজনীয় সমস্ত বিধি-বিধান ও সিদ্ধান্তের উৎস।
ইসলামের প্রাথমিক সময় থেকে, যখন নিপীড়িত জনগণের মধ্যে একটি ছোট ইসলামী সম্প্রদায় গঠিত হয়েছিল, তখন থেকে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিশাল অঞ্চল জুড়ে তার সময়ে সবচেয়ে বিশাল ও মহান ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা পর্যন্ত এই সম্প্রদায়টি তার ধর্ম ও বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত সবকিছু- ইবাদত-উপাসনা, সামাজিক নিয়ম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সবকিছু খুঁজে পেয়েছিল ঐশ্বরিক গ্রন্থ কুরআন মজীদ থেকে ।
৮. সাম্য ও মৈত্রীর ধর্ম ইসলাম
ইসলামে মানুষের মধ্যে গোত্র, বর্ণ বা জাতিগত উৎসের মত অনিবার্য বা পূর্বনির্ধারিত কোন বিষয়ের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপ করা হয় না। বরং ইসলামে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হল তাক্বওয়া বা সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা; যা মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জন করে। একইভাবে, সম্পদ, সৌন্দর্য, শক্তি বা ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে ওঠার মতো বিষয়গুলোও শ্রেষ্ঠত্বের উপায় নয়। এগুলো আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহ এবং সেসবের জন্য সৃষ্টিকর্তাকে সর্বোত্তম পদ্ধতিতে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত, প্রতিটি অনুগ্রহ তার নিজস্ব ধরনের অনুরূপ ধন্যবাদ প্রাপ্য।
এই পৃথিবীতে মানুষকে যেসব অনুগ্রহ দেওয়া হয়েছে তা আসলে প্রশ্নপত্রের মত যা পরীক্ষার সময় একজন ছাত্রকে দেয়া হয়। একজন শিক্ষার্থী তাকে দেয়া প্রশ্নগুলোর জন্য গর্বিত হওয়ার কথা ভাবে না, বরং সে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার কথাই ভাবে এবং সঠিক উত্তর দেয়ার মাধ্যমে প্রাপ্ত গ্রেড নিয়েই খুশি হয়। যেহেতু পরীক্ষার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত সুযোগ ও অনুগ্রহ ব্যবহার করে বিশ্বাসীরা যে পুরষ্কার অর্জন করে তা কেবল পরকালেই দৃশ্যমান হবে, তাই সেগুলো নিয়ে দুনিয়াতে বড়াই করার কোন মানে হয় না। এই ধরনের অহংকার একটি বিরাট ভুল। তাই, একজন বিজ্ঞ মুসলিম পণ্ডিত আবু হাজিম বলেছেন: "যদি কোন অনুগ্রহ মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করাতে ব্যর্থ হয় তাহলে তা কষ্টে পরিণত হয়।"
মহানবী (সাঃ) অহঙ্কার করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, আল্লাহর দৃষ্টিতে, একজন মুমিন যখন তার কর্তব্য সম্পর্কে মনোযোগী হয় তখন সে গাফিলদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ হয়। আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বিদায়ী ভাষণে বলেছেন:
“হে মানুষ! মনে রেখো: তোমাদের প্রভু এক; তোমার পিতা (আদম) একজন। সাবধান হও! কোন অনারব থেকে আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, অনারবের কোন আরবের উপর কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, না লাল চামড়ার থেকে কালো চামড়ার, না কালো চামড়ার থেকে লাল চামড়ার। শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ার কারণে হতে পারে।" (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান: ৫১৩৭)
৯. ইসলাম ধর্মীয় ও বিবেকের স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গণ্য করে
সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন মানুষকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতা বা বিবেক দিয়েছেন। সেই সাথে তিনি তাদেরকে সঠিক ও ভুল পথের নির্দেশনাও (হেদায়েত) প্রদান করেছেন। পাশাপাশি তাদেরকে তিনি চিন্তা ও ইচ্ছার স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তিনি কখনই তাদের স্বাধীন ইচ্ছায় হস্তক্ষেপ করেন না। প্রত্যেকে তাদের ইচ্ছার স্বাধীনতাকে ব্যবহার করে ভাল বা মন্দ কাজের সিদ্ধান্ত নির্বাচন করবে এবং তারপর তাকে তার সেই কাজের পরিণতি ভোগ করতে হবে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
وَ لَوۡ شَآءَ رَبُّکَ لَاٰمَنَ مَنۡ فِی الۡاَرۡضِ کُلُّهُمۡ جَمِیۡعًا ؕ اَفَاَنۡتَ تُکۡرِهُ النَّاسَ حَتّٰی یَکُوۡنُوۡا مُؤۡمِنِیۡنَ
"আর যদি তোমার রব চাইতেন, তবে যমীনের সকলেই ঈমান আনত। তবে কি তুমি মানুষকে বাধ্য করবে, যাতে তারা মুমিন হয়? (ইউনুস, ১০:৯৯)
وَ قُلِ الۡحَقُّ مِنۡ رَّبِّکُمۡ ۟ فَمَنۡ شَآءَ فَلۡیُؤۡمِنۡ وَّ مَنۡ شَآءَ فَلۡیَکۡفُرۡ ۙ اِنَّاۤ اَعۡتَدۡنَا لِلظّٰلِمِیۡنَ نَارًا ۙ
"আর বলে দাও, ‘সত্য এসেছে তোমাদের রব্বের নিকট হতে, কাজেই যার ইচ্ছে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছে সত্যকে অস্বীকার করুক।’ আমি যালিমদের জন্য আগুন প্রস্তুত করে রেখেছি" (আল-কাহফ, ১৮:২৯)
اِنۡ تَکۡفُرُوۡا فَاِنَّ اللّٰهَ غَنِیٌّ عَنۡکُمۡ ۟ وَ لَا یَرۡضٰی لِعِبَادِهِ الۡکُفۡرَ ۚ وَ اِنۡ تَشۡکُرُوۡا یَرۡضَهُ لَکُمۡ ؕ وَ لَا تَزِرُ وَازِرَۃٌ وِّزۡرَ اُخۡرٰی ؕ ثُمَّ اِلٰی رَبِّکُمۡ مَّرۡجِعُکُمۡ فَیُنَبِّئُکُمۡ بِمَا کُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ ؕ اِنَّهٗ عَلِیۡمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوۡرِ
“তোমরা যদি কুফুরী কর তবে (জেনে রেখ), আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। তিনি তাঁর বান্দাহদের জন্য অকৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন না। তোমরা যদি কৃতজ্ঞ হও, তবে তোমাদের জন্য তা তিনি পছন্দ করেন। একের (পাপের) বোঝা অন্যে বহন করবে না। শেষমেষ তোমাদেরকে তোমাদের পালনকর্তার কাছেই ফিরে যেতে হবে, তখন তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন তোমরা যা করছিলে। তিনি তো অন্তরের খবর পর্যন্ত জানেনো" (আজ-জুমার,৩৯:৭)
জাহেলিয়াতের যুগে, যেসব কুরাইশ মহিলার শিশুরা শৈশবে কঠিন অসুস্থতার সম্মুখীন হ’ত, তখন তারা এই মানত করতেন, "আমার সন্তান বেঁচে থাকলে আমি তাকে ইহুদি বানাবো।" এ কারণে বনু নাদির ইহুদি গোত্রকে যখন মহানবীর সাথে চুক্তি ভঙ্গ করার কারণে মদিনা শহর থেকে নির্বাসিত করা হচ্ছিল, তখন তাদের মধ্যে নতুন মুসলমানদের ইহুদি সন্তানরাও ছিল। তখন এই শিশুদের মুসলিম আত্মীয়রা বলছিলেন: "আমরা আমাদের সন্তানদের ছেড়ে দেব না (আমরা তাদের জোর করে ধরে রাখব এবং মুসলিম হতে বাধ্য করব)।" এর ফলশ্রুতিতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ এই আয়াতটি নাযিল করেন -
لَاۤ اِکۡرَاهَ فِی الدِّیۡنِ ۟ۙ قَدۡ تَّبَیَّنَ الرُّشۡدُ مِنَ الۡغَیِّ ۚ فَمَنۡ یَّکۡفُرۡ بِالطَّاغُوۡتِ وَ یُؤۡمِنۡۢ بِاللّٰهِ فَقَدِ اسۡتَمۡسَکَ بِالۡعُرۡوَۃِ الۡوُثۡقٰی ٭ لَا انۡفِصَامَ لَهَا ؕ وَ اللّٰهُ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ০
দীন গ্রহণের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হিদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে। অতএব, যে ব্যক্তি তাগূতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, অবশ্যই সে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে, যা ছিন্ন হবার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (২:২৫৬)
ইসলাম নিজেকে জোর করে মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে চায় না। এই কারণে, এটি সব ধরনের জজবরদস্তি এড়িয়ে চলে। এমনকি এটি বুদ্ধিবৃত্তিক জবরদস্তি থেকেও দূরে থাকে। উদাহরণ স্বরূপ, অলৌকিক ঘটনা ইসলামের প্রসারের অন্যতম প্রধান উপায় ছিল না। মহানবীর কাছে বিস্ময়কর ঘটনা ভিত্তিক অলৌকিক ঘটনার দাবিকে স্বাগত জানানো হয়নি। যেহেতু ইসলাম এমন এক যুগের সাথে মিলেছিল যখন মানবজাতি ছিল পরিপক্ক, তখন ইসলাম মানুষের বুদ্ধি এবং মনের সাথে কথা বলেছিল কুরআনের বাচনিক অলৌকিকতার দ্বারা। এটি যুক্তিবাদী নিয়ম এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে মানুষকে নিজের সাথে আবদ্ধ করে। এই কারণে এটি কখনই বস্তুগত শক্তিকে উপায় হিসাবে ব্যবহার করেনি।
বিখ্যাত ইংরেজ ইতিহাসবিদ ফিলিপ মার্শাল ব্রাউন লিখেছেন, "যদিও তারা বড় বড় বিজয় অর্জন করেছিল, তুর্কিরা সদয়ভাবে বিজিত দেশ সমূহের জনগণকে তাদের নিজস্ব রীতিনীতি এবং ঐতিহ্য অনুসারে স্ব-প্রশাসনের অধিকার দিয়েছিল।"
১৭৯৮-১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যখন অটোমান সাম্রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন, তখন তিনি ফিলিস্তিন এবং সিরিয়ায় বসবাসকারী আর্মেনীয়দের বিদ্রোহী করতে চেয়েছিলেন। তখন ইস্তাম্বুলে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত সেবাস্তিয়ানি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানিয়েছিলেন: "আর্মেনিয়ানরা এখানে তাদের জীবন নিয়ে এতটাই সন্তুষ্ট যে তাদেরকে বিদ্রোহী করে তোলা অসম্ভব।"
১০. সহজতা (ধর্মীয় কর্তব্যে) ইসলামের অন্যতম মূলনীতি
আমাদের পরম করুণাময় প্রভু সর্বদা তাঁর বান্দাদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করেন এবং এজন্য তিনি ইসলামের প্রতিটি দিককে সহজ করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন বলেছেন:
لَا یُکَلِّفُ اللّٰهُ نَفۡسًا اِلَّا وُسۡعَهَا ؕ لَهَا مَا کَسَبَتۡ وَ عَلَیۡهَا مَااکۡتَسَبَتۡ ؕ
“আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে তার সম্ভাবনার বাইরে দায়িত্ব দেন না। সে যা অর্জন করে তা তারই জন্য এবং সে যা অর্জন করে তা তারই উপর বর্তাবে।”[সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬]
یُرِیۡدُ اللّٰهُ بِکُمُ الۡیُسۡرَ وَ لَا یُرِیۡدُ بِکُمُ الۡعُسۡرَ ۫
“আল্লাহ তোমাদের কাজ সহজ করতে চান; কঠিন করতে চান না।’’ (আল-বাকারা ২:১৮৫)
هُوَ اجۡتَبٰىکُمۡ وَ مَا جَعَلَ عَلَیۡکُمۡ فِی الدِّیۡنِ
"তিনি তোমাকে মনোনীত করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে তোমার উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেননি।" (আল-হজ,২২:৭৮)
یُرِیۡدُ اللّٰهُ اَنۡ یُّخَفِّفَ عَنۡکُمۡ ۚ وَ خُلِقَ الۡاِنۡسَانُ ضَعِیۡفًا
"আল্লাহ তোমাদের (বোঝা) হালকা করতে চান: কারণ মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।" (আন-নিসা',৪:২৮)
আল্লাহর রাসূল (সা.) ইসলামের সহজতার একটি নীতি সম্পর্কে বলছেন: "সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদেরকে নিম্নরূপ আদেশ দেন: 'আমার বান্দা যদি একটি খারাপ কাজ করতে চায়, তবে সে তা না করা পর্যন্ত তা রেকর্ড করবে না। যখন সে এটা করে, তখন তার বিরুদ্ধে এটি পাপ হিসেবে লিপিবদ্ধ কর। যদি সে আমার জন্য (তওবা করে) এটি ছেড়ে দেয়, তবে এটি আমার অনুগ্রহে ঐশ্বরিক পুরস্কার (সওয়াব) হিসাবে রেকর্ড করো। আমার বান্দা যদি কোন নেক কাজ করতে চায় তবে তার জন্য একটি প্রতিদান (সওয়াব) লিপিবদ্ধ কর যদিও সে তা না করে। যদি সে এগিয়ে যায় এবং নেক কাজ করে, তবে তার জন্য কমপক্ষে দশ গুণ থেকে শুরু করে সাতশত গুণ পর্যন্ত সওয়াব লিখবে।’’ (সহিহ মুসলিম: ২০৩, ২০৫)
মহান সাহাবীগণ বর্ণনা করেন যে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) একজন সদয় ব্যক্তি ছিলেন যিনি সহজে মানুষের সাথে মিশতেন এবং তিনি সবসময় অন্যদের জন্য কাজ সহজ করে দিতেন।
আসুন কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক যা থেকে দেখা যাবে যে, ইসলাম একটি সহজসাধ্য দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থা:
✓ মানুষ তার সম্ভাবনা ও সামর্থ্যের জন্য দায়ী। তার সম্ভাবনা ও সামর্থ্যের অতিরিক্ত কোন কিছু তার কাছ থেকে চাওয়া হবে না এবং যা অনিবার্য ছিল বা তার সক্ষমতার বাইরে ছিল তার জন্য তাকে দায়বদ্ধ করা হবে না।
✓ ইসলাম ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার পন্থাকে গুরুত্ব দেয়। মদ্যপান, সুদে লিপ্ত হওয়া এবং ব্যভিচারের মতো পাপগুলো তিন থেকে চার পর্যায়ে ধীরে ধীরে নিষিদ্ধ হয়েছিল।
✓ নামায আদায় করার পূর্বে পানি দিয়ে ওযু করা ওয়াজিব। তবে যখন পানি পাওয়া যায় না বা যখন পানি খুব ঠান্ডা থাকে, গরম করারও সুযোগ নাথাকে এবং অসুস্থ হওয়ার আশংকা থাকে তখন পরিষ্কার মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করার অনুমতি আছে।
✓ যাত্রীদের ক্লান্তি এবং সময়ের অভাবের কারণে ফরজ নামাজের মূল চার রাকায়াত কমিয়ে দুই রাকাতে সংক্ষিপ্ত করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
✓ নামাজে (কিয়াম) দাঁড়ানো ওয়াজিব। তবে যাদের দাঁড়ানোর সামর্থ্য নেই তারা বরং তাদের অবস্থা অনুযায়ী বসে, শুয়ে বা চোখের ইশারায় নামায পড়তে পারে।
✓ নামাজের জন্য বিশেষ কোনো স্থানের প্রয়োজন নেই। যে কোনও পরিষ্কার জায়গায় যে কোনও ব্যক্তি নামাজ পড়তে পারেন। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ "সমস্ত পৃথিবী আমাকে একটি পবিত্র জায়নামাজ হিসাবে দান করা হয়েছে, তাই আমার জাতির একজন বিশ্বাসীর নামাজের সময় হওয়ার সাথে সাথে নামাজ পড়া উচিত, সে যেখানেই থাকুক না কেন।" (সহিহ বুখারী, ৪৩৮)
✓ যারা অসুস্থ বা যারা এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তাদের জন্য রোজা কঠিন হতে পারে। এ কারণে রমজানে রোজা রাখার ব্যাপারে তাদের মুক্ত রাখা হয়। যদি তারা রোজা না রাখে, তবে তারা সুস্থ হয়ে উঠলে বা সফর থেকে ফিরে এসে তা পূরণ করে দেয়।
✓ যদি সংক্রামক অসুস্থতা বা যুদ্ধ ইত্যাদির কারণে হজের যাওয়ার পথে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ থাকে, তাহলে যে মুসলমানদের উপর হজ পালন করা ফরজ হয়েছে তারা হুমকির উপশম না হওয়া পর্যন্ত তা বিলম্বিত করতে পারে।
আমাদের প্রিয়নবী বলেছেন, "আল্লাহর প্রশংসা যিনি দ্বীনের সহজতা দিয়েছেন!" (আহমদ ইবনে হাম্বল: ১৬৭)।
১১.ইসলাম মানুষকে আশাবাদী ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে
ইসলাম চায় মানুষ আশাবাদী হোক। সর্বশক্তিমান আল্লাহর ঘোষণা - "আমার রহমত সব কিছুর উপর প্রসারিত"। সূরা আরাফ, ১৫৬
আল্লাহর রসূল (সা.) বলেছেন: "যখন সর্বশক্তিমান আল্লাহ সমস্ত জগত ও তার মধ্যকার সবকিছু সৃষ্টি করেন, তখন তিনি তাঁর আরশের উপরে থাকা কিতাবে লিখে রাখেন, 'আমার রহমত আমার ক্রোধকে জয় করে'" (সহিহ বুখারি, ৭৪৫৩)।
মুসলমানদের আশাবাদী হওয়ার জন্য এই বিশ্বাসসমূহই যথেষ্ট। অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য যা মুসলমানদের জীবনে সান্ত্বনা দেয় তার মধ্যে রয়েছে ক্ষমা, করুণা, ধৈর্য, তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর দৃঢ় আস্থা এবং নির্ভরতা), আত্মসমর্পণ, প্রতিটি পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট থাকা এবং মানুষের সম্পর্কে সুধারণা করা। একজন মুসলিমের দৃঢ় বিশ্বাস যে তিনি যে সমস্যা ও অসুস্থতার সম্মুখীন হন তা তার পাপমোচন করে দেয় এবং আধ্যাত্মিক স্তরকে উন্নীত করে - যা জীবনের বোঝা হালকা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একজন মুসলমানের পক্ষে দুঃখিত হওয়া অসম্ভব; যখন তিনি তার সাধ্য মত সবকিছু করেন এবং তারপর বাকিটা তকদিরের কাছে সমর্পণ করে, আল্লাহর কাছ থেকে যা আসে তাতে সন্তুষ্ট হয়। এই ধরনের একজন মুসলমান পৃথিবীতে যাই হোক না কেন; নির্বিঘ্ন ও প্রশান্তিময় জীবন লাভ করেন।
অবিশ্বাসী ও পাপীদের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা থাকে। একজন ব্যক্তি বিশ্বাসের ছায়াতলে আসতে পারে বা অনুতপ্ত হতে পারে যতক্ষণ না সে মৃত্যুর চিহ্ন বা বিচার দিবসের আলামত দেখতে পায়। যাই হোক, যেহেতু মৃত্যু ও বিচারের দিন একজন ব্যক্তিকে আকস্মিকভাবে ধরে ফেলবে, তাই সুযোগ না হারিয়ে সৃষ্টিকর্তার দিকে ফিরে যাওয়া আবশ্যক। সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন:
قُلۡ یٰعِبَادِیَ الَّذِیۡنَ اَسۡرَفُوۡا عَلٰۤی اَنۡفُسِهِمۡ لَا تَقۡنَطُوۡا مِنۡ رَّحۡمَۃِ اللّٰهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ یَغۡفِرُ الذُّنُوۡبَ جَمِیۡعًا ؕ اِنَّهٗ هُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ০ وَ اَنِیۡبُوۡۤا اِلٰی رَبِّکُمۡ وَ اَسۡلِمُوۡا لَهٗ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّاۡتِیَکُمُ الۡعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنۡصَرُوۡنَ
"বলে দাও, হে আমার বান্দারা যারা নিজেদের আত্মার উপর অবিচার করেছো! আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। কারণ আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেন, কারণ তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমাদের প্রভুর কাছে অনুতপ্ত হও এবং তোমাদের উপর আযাব আসার আগেই তাঁর ইচ্ছার কাছে মাথা নত কর, এরপর তোমাদের আর কোন সাহায্য করা হবে না।" (আজ-জুমার:৫৩-৫৪)
আল্লাহর রসূল (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষকে কোন জিনিসের জন্য দুর্ভাগ্যকে দায়ী করতে নিষেধ করেছেন; তিনি আমাদের সবকিছুকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে দেখতে এবং ইতিবাচকভাবে, কল্যাণকর মনে করে ব্যাখ্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইসলাম মানুষের সম্পর্কে মন্দ ধারণা পরিহার করার উপদেশ দেয়। বরং আমাদের উচিত মানুষকে সুধারণার সাথে দেখা। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اجۡتَنِبُوۡا کَثِیۡرًا مِّنَ الظَّنِّ ۫ اِنَّ بَعۡضَ الظَّنِّ اِثۡمٌ وَّ لَا تَجَسَّسُوۡا وَ لَا یَغۡتَبۡ بَّعۡضُکُمۡ بَعۡضًا ؕ اَیُحِبُّ اَحَدُکُمۡ اَنۡ یَّاۡکُلَ لَحۡمَ اَخِیۡهِ مَیۡتًا فَکَرِهۡتُمُوۡهُ ؕ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ تَوَّابٌ رَّحِیۡمٌ
“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা সাধারণভাবে অন্যের ব্যাপারে আন্দাজ-অনুমান করা থেকে বিরত থাকো। আন্দাজ-অনুমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুনাহের কাজ। অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি কোরো না। কারো অনুপস্থিতিতে গীবত অর্থাৎ পরনিন্দা কোরো না। তোমরা কি মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে চাও? না, তোমরা তো তা ঘৃণা করো (গীবত করা মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সমান)। তোমরা সবসময় আল্লাহ-সচেতন থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরমদয়ালু।" -(আল-হুজুরাত:১২)
উপরন্তু, বিশ্বাসীদের মধ্যে "স্রষ্টার জন্য সমস্ত সৃষ্টিকে সহ্য করার" মানসিকতা প্রবল। সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি তারা যে ভালোবাসা অনুভব করেন, তার কারণে তারা অনুরাগের সাথে তাঁর সৃষ্টির কাছে যান; তারা সবকিছুকে মহান সৃষ্টিকর্তার আস্থা হিসেবে দেখেন। তাঁর কাছ থেকে আসা সবকিছুই তারা তৃপ্তির সাথে গ্রহণ করেন।
১২. ইসলাম সব সময় সামাজিক সংহতির পক্ষে
সৃষ্টিগতভাবেই মানুষ সামাজিক জীব। সে একা থাকতে পারে না। পারস্পারিক প্রয়োজনেই তারা পরস্পর ঘনিষ্ঠ হয় এবং বন্ধন স্থাপন করে। সর্বোপরি, মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সে একা তার সমস্ত চাহিদা মেটাতে সক্ষম নয়। সুতরাং, মানুষের উচিত সমাজবদ্ধ হয়ে একসাথে বসবাস করা, একে অপরকে সাহায্য করা এবং একসাথে সৃষ্টিকর্তার প্রতি তাদের কর্তব্য পালন করা। আল্লাহর রসূল (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “আল্লাহর হাত (সহায়তা) সমাজের (সংঘবদ্ধ জীবন) সাথে। যে ব্যক্তি সমাজ ত্যাগ করবে সে জাহান্নামের পথে যাবে।” (সুনান তিরমিযী: ২১৬৭)
"সমাজবদ্ধতার মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর রহমত, আর দলে-উপদলে বিভক্তি বা বিচ্ছিন্নতার মধ্যে রয়েছে যন্ত্রণা।" (মুসনাদে আহমদ: ৪,২৭৮)
সমস্ত ইবাদত-উপাসনা যেমন জামায়াতে নামাজ পড়া, জুমার নামাজ, ঈদের নামাজ, হজ্ব, যাকাত, সদকা বা মানুষের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করা, কুরবানি এবং মানবিক সম্পর্ক যেমন জানাজা অনুষ্ঠান, বিবাহ, অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক মজবুত করা, অভাবীদের যত্ন নেওয়া সবসময়ই সামাজিক হতে উৎসাহিত করে। অবশ্যই, কিছু সমস্যা আছে যা মানুষের সাথে যোগাযোগ করার সময় দেখা দেয়। ধৈর্য এবং সহনশীলতা মূল বিষয়। ইসলাম এমন মুসলিমদের জন্য বিরাট পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয় যারা সমাজে বসবাস করেন এবং মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আল্লাহর রাসূল সকলের সাথে সদয় আচরণ করতেন এবং অভদ্র বা নির্বোধ লোকদের দ্বারা বিরক্ত হলেও কখনো তাদের হৃদয় ভাঙতেন না। তাঁর চাচা ‘আব্বাস (রাঃ) নবীর অবস্থার জন্য সমবেদনা অনুভব করে বললেন:
“হে আল্লাহর রাসূল! আমি দেখছি যে লোকেরা আপনাকে বিরক্ত করছে, তারা যে ধুলো তুলছে তা দিয়ে তারা আপনাকে বিরক্ত করছে। কেন আপনি একটি বিশেষ তাঁবু স্থাপন করেন না এবং সেখানে অবস্থান করেই কেন লোকদের সাথে কথা বলেন না? প্রিয়নবী (সাঃ), যিনি সমস্ত বিশ্বের জন্য রহমত হিসাবে প্রেরিত হয়েছিলেন; উত্তরে বললেন: “না! যতক্ষণ না আল্লাহ তাদের মধ্য থেকে আমাকে প্রশান্তির দিকে নিয়ে যান আমি তাদের সাথেই থাকব। এটা কোন ব্যাপার না, তারা আমার পায়ের পাতার উপর পা রাখুক, আমার জামাকাপড় টানুক বা তারা যে ধুলো তুলছে তাতে আমাকে বিরক্ত করুক!” (সুনান দারিমি, মুকাদ্দিমা: ১৪)
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর অনুসারীদেরকে এই উপদেশ দিয়েোছিলেন: "যে মুসলমান মানুষের সাথে থাকে এবং তাদের সৃষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করে সে সেই মুসলমানের চেয়ে উত্তম যে তাদের সাথে থাকে না এবং যে কষ্ট সহ্য করা এড়িয়ে যায়।" (সুনান তিরমিযী: ২৫০৭)।
ইসলাম মানুষকে একটি গতিশীল জীবন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের নির্দেশ দেয়। আমাদেরকে জীবিকা অর্জনের জন্য কাজ করার, বিবাহ ও সন্তান ধারণ, মানুষের জীবিকা নির্বাহে সাহায্য করতে, দান করতে, সময়কে ভালোভাবে কাজে লাগাতে, দুনিয়াকে পরকাল উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে নির্দেশ দেয়। সর্বোপরি, সমস্ত মানবতার কাছে সত্যকে তুলে ধরুন ও তাদের অন্যায় থেকে দূরে রাখুন, বস্তুগত দ্রব্য, জীবন, পবিত্রতা, প্রজন্মের স্বাস্থ্য এবং দেশকে রক্ষা করুন… এই উদ্দেশে যে "যে একটি ভাল কাজ করবে সে তার প্রতিফল দেখতে পাবে এবং যে খারাপ কাজ করবে সে তার প্রতিদান পাবে। প্রতিটি কাজের জন্য প্রতিদান রয়েছে যদিও কাজটি একটি পরমাণুর আকারেরও হয়।” এভাবে ইসলাম জীবনকে আরও যত্ন, সক্রিয় এবং সতর্কতার সাথে সহজতর করে তোলে।
১৩. ইসলাম মানুষের মর্যাদাকে সমুন্নত করে
ইসলাম সব সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে একটি বিশিষ্ট স্থান ও মর্যাদা দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-
لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ فِیۡۤ اَحۡسَنِ تَقۡوِیۡمٍ
"নিশ্চয়ই আমি মানুষকে উৎকৃষ্ট কাঠামোতে সৃষ্টি করেছি।" (আত-তীন:৪)
وَ لَقَدۡ کَرَّمۡنَا بَنِیۡۤ اٰدَمَ وَ حَمَلۡنٰهُمۡ فِی الۡبَرِّ وَ الۡبَحۡرِ وَ رَزَقۡنٰهُمۡ مِّنَ الطَّیِّبٰتِ وَ فَضَّلۡنٰهُمۡ عَلٰی کَثِیۡرٍ مِّمَّنۡ خَلَقۡنَا تَفۡضِیۡلًا
“আমি আদাম সন্তানকে সম্মানিত করেছি, তাদের জন্য জলে স্থলে যানবাহনের ব্যবস্থা করেছি, তাদেরকে পবিত্র রিযক দিয়েছি আর আমি তাদেরকে আমার অধিকাংশ সৃষ্টির উপর মর্যাদায় শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।" (আল-ইসরা:৭০)
একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে দিয়ে একটি কফিন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আল্লাহর রসূল (সা.) উঠে দাঁড়ালেন। তাকে বলা হল: “আল্লাহর রসূল! এটা একটা ইহুদীর লাশ!” রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: সেও কি মানুষ নয়? (সহিহ মুসলিম: ৯৬০)
দেখা যায়, আমাদের মহানবী একজন মৃত মানুষের সামনে সম্মানের সাথে দাঁড়িয়েছিলেন, যাকে মহান আল্লাহ অত্যন্ত যত্ন সহকারে সৃষ্টি করেছেন। এইভাবে, তিনি দেখিয়েছিলেন যে, সমস্ত মানুষ, শুধু জীবিত নয়, মৃত ব্যক্তিরাও সম্মানের যোগ্য।
ইয়ালা ইবনে মুররা (রাঃ) বলেন, “আমি অনেক সামরিক অভিযানে আমাদের আল্লাহ'র রসূলের সাথে ছিলাম। আল্লাহর রসূল (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন কোন মানুষের লাশ দেখতে যেতেন, তিনি অবিলম্বে লাশ দাফন করার নির্দেশ দিতেন, মৃতব্যক্তি মুসলিম না কাফের তা জিজ্ঞেস করতেন না। (মুস্তাদরাক হাকিম:১৩৭৪)
একজন মানুষের জীবন ও আত্মা কতটা মূল্যবান যার মৃতদেহকে এত সম্মান দেওয়া হয়? পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
"...যদি কেউ একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে - যদি তা হত্যার দায়ে বা দেশে বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর অপরাধে না হয় - তবে সে যেন সমগ্র মানব জাতিকে হত্যা করলো; এবং যদি কেউ একজন মানুষের জীবন বাঁচায়, তবে সে যেন সমগ্র মানব জাতির জীবন রক্ষা করলো। " (আল-মায়িদা, ৫:৩২)
এই কারণে, নিজেকে বা অন্য কাউকে হত্যা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং যারা তা করে তাদের জন্য অত্যন্ত কঠোর শাস্তির সতর্কতা রয়েছে।
হযরত মাওলানা জালালাউদ্দিন রুমি বলেছেন: “আমাকে যদি একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য ঘোষণা করতে হয়, তবে আমি এবং পৃথিবী উভয়ই পুড়ে যাব! দুর্ভাগ্যবশত, মানুষ তাদের নিজস্ব মূল্য চিনতে পারেনি এবং নিজেদেরকে কম মূল্যে বিক্রি করছে। মানুষ যখন প্রকৃতপক্ষে একটি সবচেয়ে মূল্যবান কাপড় ছিল, তখন সে নিজেকে একটি সোয়েটারের প্যাচ বানিয়েছে।" (মসনবী, খণ্ড ৩, পংক্তি ১০০০-১০০১)
ইসলাম মানবতাকে তার সম্মান ও মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অধিকারের সঠিক উত্তরাধিকারী হিসাবে দেখে। ইসলামের মতে, একজন মানুষের নিছক অস্তিত্বই তার মৌলিক মানবাধিকার পাওয়ার জন্য যথেষ্ট শর্ত। ইসলামি আইনের পণ্ডিতরা মানবতা-মানুষ হওয়ার বৈশিষ্ট্যকে মানবাধিকারের সারমর্ম হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে তারা একটি সর্বজনীন পন্থা অবলম্বন করেছেন এবং ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ, শ্রেণী এবং জাতীয়তার ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে কখনও বৈষম্য করেননি।
দ্বিতীয় অধ্যায়
ধর্মীয় বিশ্বাস, ইবাদত-উপাসনা ও পার্থিব বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত বিধান (মুআ’মালাত)
ক. ইসলামে বিশ্বাসের (ঈমান) বিষয় সমূহ
ইসলামে ধর্মবিশ্বাসের বিষয়টি নির্ভর করে ঐশী প্রত্যাদেশ বা আল্লাহর কালাম (ওহী)'র উপর; মানুষের ধারণা বা ব্যক্তিগত উপলব্ধির উপর নয়। ঈমানের অপরিহার্য বিষয়গুলো পবিত্র কুরআনে এবং আল্লাহর নবীর বাণী হাদীসে দ্ব্যর্থহীনভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। নিম্নলিখিতভাবে এগুলোকে সংক্ষেপে বিন্যস্ত করা যায়:
১. আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস
সর্বশক্তিমান আল্লাহ বিরাজমান, তিনি এক, তাঁর অস্তিত্বের কোন শুরু বা শেষ নেই, তিনি সৃষ্টির কারো সাথে সাদৃশ্য রাখেন না এবং সৃষ্টির কোন কিছুর সাথে তার সাদৃশ্য নেই। তার অস্তিত্ব অন্য কোনো সত্তার ওপর নির্ভর করে না; তিনি তার নিজের গুণে বিদ্যমান। তার অস্তিত্ব আত্মপ্রয়োজনীয়। তিনি জন্মগ্রহণ, জন্মদান, পিতা বা পুত্র হওয়া এবং সময় বা স্থানের প্রেক্ষাপটে প্রেরিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তার সীমাবদ্ধতা থেকে অনেক উর্ধে। তিনি অনাদিকাল থেকে বিদ্যমান। কোন উপায়ের প্রয়োজন ছাড়াই তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
“তিনি জানেন যা কিছু ভূমিতে অন্তর্ভুক্ত হয় ও যা কিছু এর থেকে উত্থিত হয়; যা কিছু আকাশ থেকে নেমে আসে এবং যা কিছু তাতে আরোহণ করে। তিনি পরম করুণাময়, ক্ষমাশীল। অবিশ্বাসীরা বলে, “আমাদের কাছে কখনই কেয়ামত আসবে না”। বল, “না! আমার পালনকর্তার কসম, এটা অবশ্যই তোমাদের উপর আসবে। তিনি অবশ্যই এটি সংঘটিত করবেন যিনি অদৃশ্য জানেন, যাঁর কাছ থেকে মহাকাশ বা পৃথিবীতে ক্ষুদ্রতম পরমাণু কিংবা তার চেয়ে ছোট বা বড় কিছুই লুকানো নেই: বরং সবকিছু অত্যন্ত স্পষ্টভাবে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে: যাতে তিনি তাদেরকে পুরষ্কৃত করেন যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও ভাল কাজ করে। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা এবং জীবিকার প্রাচুর্য। (সূরা সাবা: ২-৪)
“আল্লাহ জানেন যা প্রতিটি নারী গর্ভে ধারণ করে এবং গর্ভাশয়ে যা কমে ও বাড়ে। আর তাঁর দৃষ্টির সামনে প্রতিটি বস্তু যথাযথ অনুপাতে রয়েছে। তোমাদের মধ্যে কেউ তার কথা গোপন করুক বা প্রকাশ করুক তা তাঁর জন্য সমান। সে রাতে গোপন স্থানে লুকিয়ে থাকুক বা দিনে অবাধে ঘুরে বেড়াক, উচ্চস্বরে কথা বলুক কিংবা অনুচ্চ স্বরে তাতে কিছু যায় আসে না; কারণ তিনি গোপন ও অতি গোপন বিষয় জানেন।’ (আর-রাদ: ৮-১০)
পরম ও অসীম জ্ঞান থাকার পাশাপাশি সর্বশক্তিমান আল্লাহ পরম ক্ষমতারও মালিক। অন্যথায়, তিনি এমন সৃষ্টি করতে সক্ষম হতেন না যা আমরা চারপাশে দেখি এবং তাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতেও পারতেন না। সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদের কাছে তাঁর মহান সত্তাকে এইভাবে পরিচয় করিয়ে দেন:
✓ তিনিই নভোমন্ডল ও পৃথিবীর আদি উৎস (স্রষ্টা); তিনি যখন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন, তখন শুধু বলেন: “হও” আর তা হয়ে যায়। (আল-বাকারা: ১১৭)
✓ তোমাদের সৃষ্টি ও পুনরুত্থান একটি মাত্র প্রাণীর সৃষ্টি ও পুনরুত্থানের চেয়ে বেশি কিছু নয়। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন। (লুকমান:২৮)
✓ আর আসমানসমূহ ও যমীনে গায়েবী বিষয় আল্লাহরই। এবং কিয়ামতের ব্যাপারটি শুধু চোখের পলকের ন্যায়; কারণ আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। (আন-নাহল: ৭৭)
সর্বশক্তিমান আল্লাহ নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও পরম ইচ্ছার এএকমাত্র মালিক। তাঁর ইচ্ছা ও কর্মের ব্যাপারে তিনি নিরঙ্কুশভাবে স্বাধীন। তিনি কণ্ঠ বা অক্ষরের প্রয়োজন ছাড়াই কথা বলেন। তিনি তাঁর রসূলদের মাধ্যমে মানবতার পথ-নির্দেশের জন্য মহাগ্রন্থ পাঠিয়েছেন।
সর্বশক্তিমান আল্লাহ হলেন মহাবিশ্বের অতুলনীয় স্রষ্টা; কোন অংশীদার ছাড়াই তিনিই বিশ্ব জগৎ সৃষ্টি করেছেন, জীবন ও মৃত্যু দিয়েছেন, পুণরুত্থান দিবসে মৃতদের আবার জীবন দিবেন, যিনি তাঁর পূণ্যবান বান্দাদের সেদিন অনুগ্রহ ও পুরষ্কৃত করবেন এবং পাপীদরে শাস্তি প্রদান করবেন। আল্লাহর গুণাবলী সমূহ তাঁর পরিপূর্ণতার তথ্য প্রকাশ করে; কেন না তিনি সমস্ত ঘাটতি ও দুর্বলতা থেকে মুক্ত, পবিত্র।
২. ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস
ফেরেশতারা হলেন মহৎ সত্তা। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টির পূর্বেই তাদেরকে নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন। ফেরেশতাদের কোন পুরুষত্ব বা নারীত্ব নেই এবং তারা কখনই আল্লাহর আনুগত্য থেকে বিরত থাকে না। তারা আল্লাহর নির্দেশের অধীন এবং তাঁর সাথে কথা বলেন। তারা কখনই আল্লাহর অবাধ্য হন না এবং আল্লাহর হুকুম যথাযথভাবে পালন করেন। তারা মানবিক চাহিদা যেমন খাওয়া, পান করা, ঘুমানো, ক্লান্ত হওয়া, বিরক্ত হওয়া থেকে মুক্ত। তাদের কোন জাগতিক ইচ্ছা নেই। তাদের মধ্যে কোন অন্যায় বা পাপ বোধও নেই। তারা অত্যন্ত শক্তিশালী, তেজস্বী এবং ক্ষীপ্রভাবে চলতে পারেন। দায়িত্ব যতই ভারী হোক না কেন, তারা তা পালনে সক্ষম। আল্লাহর হুকুম ও নির্দেশে তারা বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারেন। তারা কেবলমাত্র ততটুকুই জানতে পারেন যতটুকু আল্লাহ তাদের নির্দেশ দেন। এর বাইরে আর কিছুেই তারা জানে না যার জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে।
অন্যদিকে জিন হল এমন এক ধরনের সত্তা যা আমাদের শারীরিক ইন্দ্রিয় দ্বারা সনাক্ত করা যায় না। তারা মানুষের মতই চেতনা ও স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী, তারা আল্লাহর আদেশ মানতে বাধ্য এবং বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী দুই দলে বিভক্ত। শয়তান জিনদের একজন।
৩. ঐশ্বরিক গ্রন্থ (আসমানি কিতাব) সমূহের প্রতি বিশ্বাস যা রাসূলগণের উপর নাযিল হয়েছে
সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর বার্তাবাহকদের কাছে যেসব গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন সেগুলোতে বিশ্বাস স্থাপন করা যাতে ইবাদত-উপাসনা, নৈতিকতা এবং এই পার্থিব জীবনের জন্য পথ নির্দেশ রয়েছে।
"পূর্বেকার ঐশী প্রত্যাদেশ সমূহ (السحوف العلا)" যা আল্লাহ ইব্রাহীম (আঃ), মূসা (আঃ), ঈশা (আঃ) -এর প্রতি অবতীর্ণ করেছিলেন যেমন তাওরাত, সামস (Psalms) ও বাইবেলে এবং সর্বশেষ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) -এর প্রতি অবতীর্ণ আল কুরআন আল্লাহ প্রদত্ত ঐশ্বরিক গ্রন্থ বা আসমানি কিতাব। এসবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন মুসলমান হওয়ার জন্য অপরিহার্য।
৪. আল্লাহর নবী ও রসূলদের প্রতি বিশ্বাস
হযরত আদম ছিলেন প্রথম নবী, আর হযরত মুহাম্মদ ছিলেন সর্বশেষ নবী ও রাসূল। (তাঁদের উপর আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক)। তাঁদের মধ্যবর্তী সময়ে অনেক নবী প্রেরিত হয়েছিলেন, যাদের কারও কারও সম্পর্কে আমরা জানি এবং বাকিদের সম্পর্কে জানি না। আমরা আমাদের বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতায় নবীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না। সকল নবীই ছিলেন আল্লাহর অনুগত, বিশ্বস্ত, অত্যন্ত বুদ্ধিমান ব্যক্তি যারা ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁরা ছিলেন নিষ্পাপ এবং মহৎ চরিত্রের অধিকারী। তাঁদের কোন ঐশ্বরিক গুণাবলী ছিল না বা তাঁরা কেউ অতিমানব ছিলেন না; কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় তারা অলৌকিক কাজ করতে পারতেন।
৫. পরকালে বিশ্বাস
শেষ দিন (কিয়ামত, বিচারের দিন বা পুনরুত্থান) আসবে, সেই সময়ে এই দুনিয়ার জীবন শেষ হবে এবং পরকাল শুরু হবে। মানুষ তাদের মৃত্যুর পর আবার পুনরুত্থিত হবে এবং তারা এই পৃথিবীতে যা করেছে তার জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য হবে। বিশ্বাসীরা জান্নাতে যাবে আর অবিশ্বাসীরা জাহান্নামে যাবে।
যারা ঈমান এনেছে কিন্তু পাপ করেছে তারা হয় তাদের পাপের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি ভোগের পর জান্নাতে যাবে অথবা যদি তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করেন তাহলে তারা সরাসরি জান্নাতে যাবে।
৬. ভাগ্যে (তক্বদির) বিশ্বাস
সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের দ্বারা সংঘটিত সব ঘটনা এবং অন্যান্য সমস্ত প্রাণীর সাথে সম্পর্কিত যা ইতিমধ্যেই ঘটেছে বা ভবিষ্যতে ঘটবে তা সবই জানেন। নির্ধারিত সময় এলে সবকিছুই সংঘটিত হয়, যেমনটি আল্লাহ আগে থেকেই জানতেন। কিছু লোকের ভুল ধারণা অনুসারে এখানে জবরদস্তি নেই। এর কারণ হলো, আল্লাহতায়ালাকে তাঁর ঐশ্বরিকতার কারণেই জানতে হয় তাঁর বান্দারা ভবিষ্যতে কী করবে এবং তাঁর রাজত্বে কী ঘটবে। অন্যথায়, তাঁর মধ্যে একটি ঘাটতি থেকে যেতো।
আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি প্রদান করেছেন। ফলে সে তার ইচ্ছা অনুসারে কাজ করে এবং এক্ষেত্রে তাকে কোন জবরদস্তি করা হয় না। একইভাবে আল্লাহ তাঁর অশেষ জ্ঞানের কারণে অতীত ও ভবিষ্যৎ জানেন, তাই তিনি যা ঘটবে তা লিখে রেখেছেন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তিনি তাঁর ইচ্ছা অনুসারে কাজ করতে মানুষকে বাধ্য করছেন। জানা ও করা কিন্তু এক নয়। সূর্যগ্রহণের সঠিক ঘন্টা এবং মিনিট আগে থেকেই গণনা করা যেতে পারে, কিন্তু এর মানে তো এটা নয় যে বিজ্ঞানীদের পূর্বজ্ঞানের কারণে সূর্যগ্রহণ ঘটছে। সূর্যগ্রহণ ঘটতে বাধ্য, তা বিজ্ঞানীরা আগে থেকে জানুক অথবা না জানুক। মানুষের ইচ্ছা অনুসারে কাজ করা এবং স্রষ্টার আগে থেকে তা জানতে পারা দুটি আলাদা বিষয়। মূল কথা হলো, আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করতে চান বিধায় তাকে ইচ্ছা অনুসারে কাজ করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। তিনি দেখতে চান তার বান্দারা স্বেচ্ছায় কতটা আদেশ মেনে চলে বা মানুষ তাঁর স্বাধীন ইচ্ছাকে ত্যাগ করে কতটা স্রষ্টার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পন করে। সে কারণেই পৃথিবীতে মানুষ যা করতে চায় আল্লাহ তাকে তাই করার সুযোগ দেন। তবে, আল্লাহও মানুষকে ঐশী গ্রন্থ ও নবীদের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি ভালো ও সঠিক কাজে সন্তুষ্ট হলেও মন্দ কাজে সন্তুষ্ট নন।
খ. ইসলামে ইবাদত-উপাসনার ধরন এবং এর পেছনের প্রজ্ঞা
এ পর্যন্ত, আমরা সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছি আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর গুণাবলী, কীভাবে তিনি মানুষকে অত্যন্ত যত্ন সহকারে সর্বোত্তম আকারে সৃষ্টি করেছেন। তাতে এই সত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তিনি মানুষ সৃষ্টির পরিকল্পনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন, তাদেরকে সর্বাধিক সুযোগ প্রদান করেছেন এবং অনুগ্রহ করেছেন। এতকিছু দেয়ার পরও এটা ভাবা কি সঙ্গত যে, এই সৃষ্টি জগতে মানুষের কোন দায়িত্ব ও কর্তব্য নেই? আমরা কি এটা ভাবতে পারি যে, বুদ্ধিমত্তা ও নৈতিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্বোধ ও বিবেকহীন পশুদের তুলনায় আলাদা নয়? আমরা কীভাবে ভাবতে পারি যে মানুষকে শুধুমাত্র খাওয়া, পান করা, বিয়ে ও বংশবৃদ্ধির চক্রের মধ্যে আটকে থাকা এবং এভাবে একটি সময় পরে, মৃত্যুর করাল গ্রাসে হারিয়ে যাওয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে? অথচ মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন:
وَ مَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَ الۡاِنۡسَ اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡنِ
"আমি জ্বীন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার দাসত্ব করতে পারে।" (আয-যারিয়াত, (৫১:৫৬);
وَ اعۡبُدۡ رَبَّکَ حَتّٰی یَاۡتِیَکَ الۡیَقِیۡنُ
"এবং তোমার প্রভুর দাসত্ব করো যতক্ষণ না তোমার কাছে নিশ্চিত কেয়ামত আসে।" (আল-হিজর, ১৫:৯৯)
ইবাদত মানে অধীন হওয়া, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের দায়িত্ব পালন করা। এর বিস্তৃত অর্থ হলো- মানুষ স্বস্ফূর্তভাবে তার সমস্ত আবেগ, অনুভূতি, চিন্তাভাবনা এবং কথা ও কাজকে তার প্রভু আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পন করে জীবনযাপন করার চেষ্টা করবে। মূলত, ইবাদত বা উপাসনা হল আল্লাহ প্রদত্ত অফুরন্ত অনুগ্রহ ও অধিকারের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর প্রতি বান্দার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি অভিব্যক্তি মাত্র।
প্রকৃতপক্ষে মানুষ আল্লাহ তা'আলার যে ইবাদত-উপাসনা (স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং নির্দেশ পালন) করে থাকে সেগুলো আসলে সে করে তার নিজের উপকারের জন্যই। এর কারণ হল, উপাসনা মানুষকে বস্তু বা পার্থিবতার সাথে মগ্ন বা অভিভূত হওয়া থেকে বাঁচায় এবং তাদের আকাঙ্খা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে উচ্চতর লক্ষ্যে উন্নীত করে। উপাসনা মানুষের মনোদিগন্তকে প্রসারিত করে।
তাছাড়া ইবাদত শুধু পরকালের জন্য নয়। আধ্যাত্মিক উপকারিতা ছাড়াও, ইবাদত-উপাসনার পার্থিব শান্তি ও শারীরিক-মানসিক উপকারিতাও রয়েছে। এর কারণ হল, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা যা মানুষের জীবনের কোনো ক্ষেত্রকে উপেক্ষা করে না বরং জীবনের সমস্ত দিককে সমন্বয় করে। একইভাবে ইসলাম মানুষের কর্মক্ষেত্রের মধ্যে সুসংগত ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে। এই কারণে, যখন পার্থিব কাজগুলো ঐশ্বরিক নির্দেশনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করে সম্পাদনা করা হয়, তখন সেগুলোও ইবাদত বলে গণ্য হয় এবং আআল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার বা রহমত প্রাপ্ত হয়। এছাড়াও ইবাদত অনেক পার্থিব ও শারীরিক উপকারও রয়েছে। যদিও এর মধ্যে কিছু প্রজ্ঞা ও সূক্ষ্মতা মানুষের বুদ্ধি দ্বারা বোঝা যায়, তবে বেশিরভাগই তা উপলব্ধি করা যায় না। যাই হোক না কেন, ইবাদতের সারমর্ম হল আল্লাহর বান্দা হিসাবে আন্তরিকতা ও বিশুদ্ধতার সাথে বান্দা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা, পার্থিব সুবিধা অর্জন করা নয়। তবে, অনুপ্রেরণার খাতিরে, ইবাদত আমাদের জন্য যেসব পার্থিব উপকারিতা নিয়ে এসেছে সেগুলো সম্পর্কেও কথা বলতে চাই।
নামাজের তাৎপর্য
নামাজ হল ইবাদতের এমন একটি রূপ যা তাকবীর দিয়ে শুরু হয় ("আল্লাহু আকবার" অর্থাৎ, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ) এবং সালাম বা অভিবাদন দিয়ে শেষ হয়। এর মধ্যে কিছু কাজ ও কথা রয়েছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ মানুষকে নামাজ আদায় করার পূর্বে অজু করার, শরীর, পোশাক নামাজের স্থান ও পরিবেশকে পবিত্র বা পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। যখন আমরা ওযু (এবং ফরজ গোসল) করার মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করার বিষয়গুলো অনুসন্ধান করি, তখন আমরা দেখতে পাই যে ইসলাম আধ্যাত্মিক বিশুদ্ধতার পাশাপাশি শারীরিক পরিচ্ছন্নতার উপর কতটা জোর দেয়। এই কারণে, প্রাথমিক এবং উন্নত ইসলামী আইনশাস্ত্রের গ্রন্থগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিভাগ দিয়ে শুরু হয়। সুতরাং, নামাজের একটি উপকারিতা হল যে এটি মানুষকে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনে অভ্যস্ত করে। মানুষের জীবনে পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে বলার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
অধিকন্তু, নামাজ মানুষকে সকল প্রকার খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। এটি লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে আত্বস্বার্থ চরিতার্থ করার প্রবণতা বা প্রবৃত্তির অন্ধ অনুসরণে বাধা দেয়। যেহেতু এটি দিনে পাঁচবার পুনরাবৃত্তি করা হয়, এটি দৈহিক আকাঙ্ক্ষার বা প্রবৃত্তি পূজার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ। কেননা প্রবৃত্তি মানুষকে তার প্রভুর স্মরণে বাধা দেয়। নামাজ মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে ক্রমাগতভাবে ব্যক্তিকে তার ভুল সংশোধন করার সুযোগ করে দেয়, তাকে পরিশুদ্ধতার দিকে অগ্রসর করে এবং প্রতিটি বিষয়ে তাকে সঠিক ও সহজ-সরল পথে চলার নির্দেশনা প্রদান করে। এভাবে, মুমিন যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়ে, তখন সে একই সাথে তার পার্থিব জীবন ও আখেরাতের জীবন উভয়েরই উন্নতি করে এবং কুপ্রবৃত্তি বা মন্দ কামনা-বাসনা থেকে রক্ষা পায়। নামাজ মানুষের মনের মধ্যে এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে যে, জগতের একচ্ছত্র আধিপত্য একমাত্র আল্লাহর এবং মানুষ যাতে সবসময় এই সত্যটি অনুভব করে; তার নিশ্চয়তা বিধান করে নামাজ।
দিনে পাঁচবার নামাজ আদায় মানুষকে তাদের দৈনন্দিন রুটিনের একঘেয়েমি থেকে বাঁচায় এবং তাদের মানসিক প্রশান্তি দেয়। নামাজ মানুষকে ক্ষণিকের জন্য হলেও তাদের সমস্ত জাগতিক উদ্বেগ থেকে রেহাই দেয়। পাশাপাশি এর মাধ্যমে মানুষ তাদের প্রভুর প্রতি নিজেদের বশ্যতা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার সুযোগ পায়। একই সময়ে, বিশেষ করে সিজদার সময়, মানুষ নিজের মুখোমুখি হয় এবং তার আত্মসত্তাকে উপলব্ধির সুযোগ পায়। আমেরিকান নওমুসলিম ম্যাট সেলসম্যান, যিনি একজন প্রাক্তন খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক, তিনি নামাজ সম্পর্কে নিজের উপলব্ধি সম্পর্কে বলেন: “নামাজ পড়ার মাধ্যমে আমি নির্মলতা ও প্রশান্তি লাভ করি – বিশেষ করে শুক্রবারের নামাজে! মসজিদে থাকা সময়গুলো আমার জন্য বিশেষ সময় যা আমার আত্মাকে প্রশান্তি দেয়।
টরন্টোর ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির নওমুসলিম প্রফেসর টিমোথি গিয়ানোটি বলেছেন: “সেজদা করলে মনে হয় যেন শান্তি পাই। যেন আমি আরও নিরাপদ বোধ করি। যেন শান্তির দেশে আছি। আমি যখন সেজদা করি তখন মনে হয় আমি দূর থেকে বাড়ি ফিরে এসেছি। হয়তো আল্লাহর কাছে পৌঁছে গেছি। এই অভিব্যক্তি আমি ভাষায় বর্ণনা করে শেষ করতে পারব না। আসলে প্রার্থনা নির্মল আনন্দও প্রশান্তির একটি অনুভূতি।"
নামাজ একদিকে যেমন আত্মার খোরাক, তেমনি এটি দৈহিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। এটি সর্বজন বিদিত যে নামাজ বিবিধ অঙ্গগুলোকে নড়াচড়া করার, রুকু-সিজদার মাধ্যমে শরীরকে সামনের দিকে বাঁকানো ও নতজানু করানো এবং জয়েন্টগুলোকে সচল করা ও পেশীগুলোকে শক্ত ও শিথিল করার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে শরীরকে সক্রিয় করে তোলে। নামাজ মুসলমানদের জীবনে ভারসাম্যের একটি উপাদান। নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে সম্পাদিত এই ইবাদত একজন মানুষকে সুশৃঙ্খল ও নিয়মানুবর্তিতার জীবনে অভ্যস্ত করে তোলে।
মুসলমানরা যেখানে খুশি তাদের নামাজ এককভাবে আদায় করতে পারে, কিন্তু ইসলাম তাদেরকে জামাত গঠন করে একসঙ্গে নামাজ পড়তে উৎসাহিত করে। এর কারণ হল, জামায়াতে সম্পাদিত ইবাদত আমাদেরকে জাতি, বর্ণ, ভাষা, অবস্থান বা পদমর্যাদার ভিত্তিতে বৈষম্য ছাড়াই আল্লাহর অধীন হতে একত্রিত হতে শেখায়। আমরা এমন পরিবেশে একে অপরকে একীভূত করি এবং সাহায্য করি যেখানে সামাজিক সম্পর্ক এক সম্প্রদায় (উম্মাহ) হওয়ার চেতনাকে শক্তিশালী করে। একটি সম্প্রদায়ের পরিবেশে যেখানে সবাইকে একই ধারণা এবং লক্ষ্যের অংশীদার করা হয়। এর ফলে তারা পরস্পরের মধ্যে বিরাজমান মতপার্থক্য সমূহের বেশিরভাগই কাটিয়ে উঠতে পারে; সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং একটি ধর্মীয় আবেগ বিরাজ করে।
প্রকৃতপক্ষে, দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া মানুষের জন্য কঠিন কোন কাজ নয় বরং এটি একটি সামান্য ও সহজ কর্তব্য। সারাদিনে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে একজন মানুষ তার পার্থিব সম্পর্ক ত্যাগ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার জন্য মাত্র ২৪টি মিনিট ব্যয় করে। এই ক্ষুদ্র ত্যাগের বিনিময়ে তারা বিপুল বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক সুবিধা লাভ করে।
২. রোজার তাৎপর্য
রোজা (fasting) হল ইসলাম ধর্মের অন্যতম মৌলিক উপাসনা বা ইবাদত যা ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়-কালে সব ধরনের খাদ্য, পানীয় ও যৌন কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে পালন করা হয়। এই উপাসনা প্রতি বছর রমজান মাসে ২৯ বা ৩০ দিন ধরে পালন করা হয়।
রোজা (আরবিতে সিয়াম) আমাদেরকে ধৈর্য, আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ও দৈহিক আকাঙ্ক্ষা থেকে দূরে থাকার গুণাবলী অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়। আর এসব গুণাবলী জীবন সংগ্রামে অপরিহার্য; যা আমাদের নৈতিক মানকে পরিপূর্ণ করে। এটি এমন একটি ঢাল যা মানুষকে তার খাদ্য, পানীয় ও জৈবিক তারণা থেকে আত্মরক্ষা করার শক্তি প্রদান করে তার সম্মান ও মর্যাদাকে সমুন্নত করে। যারা রোজা পালন করে তাদেরকে এটি দৃঢ়তা, অধ্যবসায়, সন্তুষ্টি, সংকল্প এবং ধৈর্যের মতো নৈতিক সৌন্দর্যে পৌঁছাতে সহায়তা করে। রোজা বা সিয়াম সাধনা আমাদেরকে অভাব এবং ক্ষুধার অভিজ্ঞতা অনুভব করার সুযোগ করে দিয়ে অভাবগ্রস্থ ও ক্ষুধার্ত মানুষের সেবায় দান করার গুরুত্ব বা মূল্য মনে করিয়ে দেয়।
এরফলে, রোজা আমাদের হৃদয়কে আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতাবোধে সিক্ত করার পাশাপাশি আল্লাহর বান্দাদের প্রতি দয়া ও সহানুভূতিপূর্ণ করে তোলে। সুতরাং, ক্রোধ, ঈর্ষা ও হিংসার মতো অসামাজিক নেতিবাচকতাকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য রোজা হল সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ।
এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে, রোজা শুধু এ জাতির জন্যই নয়, পূর্ববর্তীদের ওপরও ফরজ ছিল। মহান আল্লাহর ঘোষণা:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الصِّیَامُ کَمَا کُتِبَ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা আত্মসংযম শিখতে পার।"
(আল-বাকারা, ২:১৮৩)
রোজা থেকে আধ্যাত্মিক ফায়দা লাভ করতে হলে বা রোজাকে সার্থক করে তুলতে হলে রোজাদারকে সব ধরণের খারাপ কাজ ও পাপ থেকে কঠোরভাবে বেঁচে চলতে হবে। যেমন: মিথ্যা, অপবাদ, গীবত, বাহুল্য কথা বলা, গালমন্দ করা এবং অভিশাপ দেওয়া ও ঝগরা-ফাসাদ করা। এছাড়াও আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রোজাদার মুমিনকে যে কোন অভদ্রতা বা উস্কানির মুখে শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। এভাবে রোজা রাখলে রোজাদার খারাপ আচরণ থেকে দূরে থাকতে পারে।
আধ্যাত্মিক উন্নতির পাশাপাশি রোজা মানুষের দৈহিক স্বাস্থের উন্নতিও নিশ্চিত করে এবং তাকে আরও বেশি কর্মক্ষম করে তোলে। আমরা প্রকৃতিতে বা বৃক্ষলতায় এটি পর্যবেক্ষণ করতে পারি। শীতকালে বৃক্ষগুলো ঘুমিয়ে পড়ে, তাদের সমস্ত পাতা ঝরে পড়ে পরে; এমনকি বসন্ত এসে বরফ গলে না যাওয়া পর্যন্ত তারা তাদের শিকড়ে পানিও গ্রহণ করে না। এই কয়েক মাস উপবাসের পরে যখন বসন্ত আসে, বৃক্ষগুলো আরও বেশি উত্পাদনশীলতা অর্জন করে যা তাদের পাতা ও ফুলের প্রাচুর্য থেকে লক্ষ্য করা যায়। দীর্ঘক্ষণ কাজ করার পর ইঞ্জিন ও মেশিনও বন্ধ হয়ে যায়। এই বিশ্রাম বা বিরতি তাদের আগের মত শক্তি ফিরে পেতে সাহায্য করে।
চিকিৎসক সম্প্রদায়ের গবেষণা থেকে আমরা জানতে পারি, ত্রিশ দিনের কম রোজা কার্যকর নয়; আবার চল্লিশ দিনের বেশি রোজা রাখা অভ্যাস হয়ে যাবে এবং তাতে ততটা উপকার পাওয়া যাবে না যতটা পাওয়া যায় একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খাওয়া ও পান করারবিরতি দেওয়ার মাধ্যমে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমে নতুন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি চালু হয়েছ; যেখানে ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থ রোগীদের সুস্থ করে তুলতে উপবাসকে বেছে নেয়া হয়েছে; সেখানে রোগীর অবস্থার উপর নির্ভর করে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদী উপবাসের ব্যবস্থা দেয়ার মাধ্যমে রোগিকে নিরাময় করা হয়। একইভাবে দৈহিক চিকিৎসার পাশাপাশি রোজা মানসিক এবং আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে সঠিকভাবে কাজ করতেও সহায়তা করে।
আসলে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, রোজার উদ্দেশ্য শরীরকে অত্যাচার করা নয়; কিংবা এর উপর অযথা বোঝা চাপিয়ে দেয়াও নয়। এ কারণেই আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রোযা রাখার সময় প্রভাত-পূর্ব সময়ে খাবারের (সাহুর) জন্য ঘুম থেকে ওঠার ও সূর্যাস্তের পর দ্রুত ইফতার করার পরামর্শ দিয়েছেন।
সুতরাং, রোজার আসল লক্ষ্য হল আল্লাহর অধীন বা বান্দা হওয়ার দায়িত্ব পালন করা, জাগতিক সত্তাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করা এবং ব্যক্তি ও সমাজের উন্নতির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পরিবেশ তৈরি করা।
৩.যাকাত বা বাধ্যতামূলক দান, সাধারণ দান ও সাহায্য এবং তাদের তাৎপর্য
ইসলামে বাধ্যতামূলক দান (যাকাত) ধনী ব্যক্তিদের তরফ থেকে আদায় করতে হয় যাদের সম্পদ একটি নির্দিষ্ট সীমার উপরে। যাকাতের পরিমাণ বা নিসাব হলো মোট সম্পদের ২.৫% এবং এটি ফকীর, মিসকীন, যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী, নও মুসলিম বা ইসলামের প্রতি অন্যদের আকৃষ্ট করার কাজে; দাসত্বের শৃংখল থেকে যারা মুক্ত হতে চায়, যারা ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর রাস্তায় নিয়োজিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং মুসাফিরদের মধ্যে বিতরণ করতে হয়। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।
যাকাত সামাজিক জীবনকে রক্ষা করে এবং লোকদের পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসার বন্ধন তৈরি করে। কেননা এটি ধনীদেরকে সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত মোহ বা অন্ধভাবে এর পিছনে ছুটে চলা থেকে রক্ষা করে। এছাড়া এটি অভাবগ্রস্তদেরকে ক্রোধ ও হিংসার মতো নেতিবাচক প্রবণতা থেকে দূরে রাখে। এটা ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে আনে, দারিদ্র্য প্রায় নির্মূল করে এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য জনিত অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধ করে।
খলিফা ওমর বিন আব্দুল আজিজ একবার তার যাকাত কর্মকর্তাদেরকে আফ্রিকার দেশগুলোতে পাঠান। কিন্তু যাকাতের মালামাল বিতরণ করতে না পেরে কর্মকর্তারা তাদের মালামাল ফিরিয়ে আনেন। এর কারণ তারা দান গ্রহণের জন্য কাউকে খুঁজে পাননি। পরে, খলিফা এই অর্থ দিয়ে অনেক ক্রীতদাস ক্রয় করে তাদের মুক্ত করে দেন।
যাকাত সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য দূর করে তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করে যা সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “যাকাত হল ইসলামের সেতু।” (হযরত আবুদ-দারদা থেকে রাসূলুল্লাহ (সা) সূত্রে বর্ণিত। তাবরানীর 'আওসাত' ও 'কাবীর' গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে।)
যাকাতের কল্যাণে যারা দান গ্রহণ করে তারা খুশি হয়, কিন্তু যারা তা দেয় তাদের খুশি আরও বেশি। প্রকৃতপক্ষে, যাকাত, যার অর্থ "পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধতা, বৃদ্ধি, প্রাচুর্য" ব্যক্তিকে আধ্যাত্মিক অসুস্থতা ও মলিনতা থেকে পরিশুদ্ধ করে; সেই সাথে তার সম্পত্তির পবিত্রতা ও বরকতও নিশ্চিত করে। সুতরাং, হৃদয় ও আত্মার পরিশুদ্ধি, এবং জাগতিক স্বার্থ-সত্তার সংস্কার হল এমন একটি প্রজ্ঞা যা নবীদের মিশনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। যাকাত এমন একটি ইবাদত যা একজন মানুষের অধিকার ও স্বার্থপরতার অনুভূতিকেও শৃঙ্খলাবদ্ধ করে।
যাকাত হল কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি অভিব্যক্তি যা ধনীদেরকে তাদের অর্জিত ঐশ্বরিক অনুগ্রহের প্রতিক্রিয়া হিসাবে সম্পাদন করতে হয়। সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেছেন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে অনুগ্রহ বৃদ্ধি পাবে এবং অকৃতজ্ঞতার ক্ষেত্রে শাস্তি হবে কঠোর।
যাকাত না দিলে এসব থেকে বঞ্চিত হয়ে বিপরীত অবস্থা তৈরি হয় এবং ব্যক্তি ও সমাজের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের অবহিত করেছেন যে, যখন সমাজে যাকাতকে একটি ভারী বোঝা হিসাবে দেখা শুরু হবে এবং এক সময়ে যখন এটি সম্পূর্ণরূপে অবহেলিত হবে, তখন মানুষের সমাজে বিপর্যয় নেমে আসবে।
একবার তিনি বলেন: "যে জাতি যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত থাকবে তারা অবশ্যই রহমতের বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত থাকবে। আর যদি তাদের মধ্যে পশুপাখি না থাকত, তবে বৃষ্টি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যেত।" (সুনান ইবনে মাজাহ: ৮৬২৩)
৪. হজ এবং এর হিকমত
হজ হল এমন এক ধরনের ইবাদত যা আর্থিক ও শারীরিকভাবে সক্ষম (যাদের হজ্ব করতে যাওয়ার মত প্রয়োজনীয় সম্পদ ও স্বাস্থ্য আছে) মুসলমানরা জীবনে একবার নির্দিষ্ট দিনে মক্কায় পবিত্র কাবা পরিদর্শন করে নির্দিষ্ট কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। মুসলমানরা হজে প্রচুর ইবাদত, প্রার্থনা এবং আল্লাহর স্মরণ করে। তারা তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহকে স্মরণের মাধ্যমে তাদের অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা স্থাপন করে। তারা নম্রতা, অসহায়ত্ব, ধৈর্য, বশ্যতা, আন্তরিকতা, সময় ও কর্মের শৃঙ্খলা, মৃত্যু ও বিচার দিবসের জন্য প্রস্তুতি, কোন উদ্ভিদ বা জীবের ক্ষতি না করা এবং কারো সম্পর্কে খারাপ চিন্তা না করার মতো ভাল বৈশিষ্ট্যগুলোও অর্জন করে। এর কারণ হজ্জ, যা বাহ্যিকভাবে নির্দিষ্ট কিছু প্রতীকের চারপাশে প্রদক্ষিণ করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ নিয়ে গঠিত যা বিভিন্ন আধ্যাত্মিক অনুশীলনকে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রত্যেকেই এর বিভিন্ন দিক থেকে উপকৃত হয়।
হজ একজন বিশ্বাসীকে সম্পূর্ণরূপে আধ্যাত্মিক জীবনের দিকে নিয়ে যায়। কারণ এই সংবেদনশীল ধরনের ইবাদত সহানুভূতি, করুণা ও ভালোবাসার প্রকাশে পরিপূর্ণ। যেমন শিকার না করা, এমনকি একটি মাছিও না মারা, এমনকি একটি সবুজ পাতাও টেনে না নেওয়া এবং আল্লাহর সৃষ্টিকে আঘাত না করা।
হজে যাওয়া মুসলমানরা একই সময়ে এবং স্থানে একত্রিত হয়ে একই ধরণের পোশাক পরে আধ্যাত্মিক ঐক্যে অবস্থান করে। সেখানে দেশ, জাতি, বর্ণ, পোশাকের ভিন্নতার মতো ধারণাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়। তার পরিবর্তে অন্তরে প্রতিস্থাপিত হয় ইসলামী ভ্রাতৃত্বের চেতনা। সেখানে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও কর্মী, ধনী-গরিব, জ্ঞানী-অজ্ঞ, শাসক-প্রজা সবাই একসঙ্গে, একই পোশাকে, একই চত্বরে, একই সারিতে অবস্থান করে। মুসলমানরা সেখানে একে অপরের কষ্ট ও সমস্যার কথা শোনে এবং দূরের ভাইদের কাছে বার্তা পাঠায়।
আমরা সংক্ষেপে ইসলামের যে ইবাদত-উপাসনার ধরনগুলোকে আমাদের উপলব্ধিতে আনার চেষ্টা করেছি সেগুলোর দিকে তাকালে আমরা যা দেখতে পাই তা হলো, ইসলাম মূলত একটি জীবনযাপন প্রণালী (life-style)। এটি সপ্তাহের একদিনের জন্য একটি ধর্মীয় কার্যকলাপ নয়। এটি জন্ম থেকে মৃত্যু এবং তার পরের জীবনের সমস্ত দিককে অন্তর্ভুক্ত করে। টরন্টোর ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির নওমুসলিম প্রফেসর টিমোথি জিয়ানোটি বলেছেন: “যখন আমি ইসলামকে বেছে নিয়েছিলাম, তখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, এই ধর্মের লক্ষ্য সমস্ত পৃথিবীকে উপাসনালয়ে পরিণত করা। অর্থাৎ, দৈনন্দিন জাগতিক বিষয়গুলোকে একপাশে রেখে, মঠে থাকার প্রয়োজন নেই। উদাহরণ স্বরূপ, প্রত্যেকের জন্য যেকোন সময় আল্লাহকে স্মরণ করার সবচেয়ে সহজ এবং বাস্তবসম্মত উপায় হল নামাজ।"
গ. ইসলামে নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ এবং তাদের অপকারিতা
পবিত্র কুরআনে সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদের জন্য ভাল ও পবিত্র জিনিস থেকে উপকৃত হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন এবং যারা সেগুলো নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল তাদের তিরস্কার করেছেন। অতঃপর, নির্দেশ করেন যে, তিনি মানবতার জন্য উপকারী জিনিসগুলোকে নিষিদ্ধ করেন না; কেবলমাত্র যেগুলো ক্ষতিকর সেগুলোকেই তিনি নিষিদ্ধ করেছেন। আল্লাহ বলেন:
قُلۡ اِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّیَ الۡفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَ مَا بَطَنَ وَ الۡاِثۡمَ وَ الۡبَغۡیَ بِغَیۡرِ الۡحَقِّ وَ اَنۡ تُشۡرِکُوۡا بِاللّٰهِ مَا لَمۡ یُنَزِّلۡ بِهٖ سُلۡطٰنًا وَّ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا عَلَی اللّٰهِ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ০
“বলো, আমার পালনকর্তা যে জিনিসগুলোকে নিষেধ করেছেন তা হল: লজ্জাজনক কাজ, তা প্রকাশ্য হোক বা গোপন; পাপ ও সীমালঙ্ঘন যা সত্য বা যুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।" (আল-আরাফ, ৭:৩৩)
পাপ ও সীমালঙ্ঘন হলো বিষের মতো যা মানুষকে বস্তুগত এবং আধ্যাত্মিক উভয় ক্ষেত্রেই ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। যদিও শয়তান ও মানুষের জাগতিক সত্তা সেগুলোকে আকর্ষণীয় লোভাতুল করে তোলে যাতে লোকেরা এর দ্বারা প্রতারিত হয় এবং তারা শেষ পর্যন্ত তাদের বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক জীবনকে ধ্বংস করে দেয়।
ইসলামে নিষিদ্ধ বস্তুর সংখ্যা অনেক কম; অধিকাংশ জিনিসই অনুমোদিত। নিষিদ্ধ বস্তুগুলো ব্যতিক্রমের মত এবং সেগুলো মাত্র কয়েকটি। যাইহোক, কেন কে জানে, আদম সন্তানেরা অনুমোদিত জিনিসগুলোকে দূরে ঠেলে সীমিত সংখ্যক নিষিদ্ধ জিনিসের জন্যই বেশি আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে!
১. সুদ
যদিও সুদ (যা মূল্য পরিশোধ না করে পণ্য প্রাপ্তির নীতির উপর নির্ভর করে) বাহ্যিকভাবে মানুষের জন্য একটি সহায়ক ও সুবিধাজনক উপায় বলে মনে হয়, বাস্তবে এটি লোকদের অসহায়ত্বকে শোষণ করা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য পূরণ করে না। এ কারণে এটা আল্লাহর বান্দাদের অধিকারের চরম লঙ্ঘন। এটি একটি মারাত্মক টিউমারের মতো, যা অর্থনীতিকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে এবং ধর্মীয় ও নৈতিক অনুভূতিকে দমন করে। এর ফলে ধনীরা আরও ক্ষমতা লাভ করে এবং দরিদ্ররা আরও শোষিত হয়। যেমন, এটি সামাজিক স্তরগুলির মধ্যে গভীর ব্যবধান সৃষ্টি করে, যেমনটা বিখ্যাত অর্থনীতিবিদরা এটিকে বলে থাকেন, অর্থনৈতিক স্তরের দিক থেকে সর্বোত্তম সমাজ হল যারা মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হার শূন্যে স্থির করতে পারে।
উপরন্তু, সুদ অন্যান্য অনেক অকল্যাণ নিয়ে আসে। যেমন: এটি কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ঘটায়, পরোপকার, সহযোগিতা, সংহতি, প্রেম, করুণা ও সহানুভূতির মতো নৈতিক অনুভূতিগুলিকে দমিয়ে রাখে; স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা বৃদ্ধি করে; এবং যে কোনো মূল্যে অর্থ ও প্রভাব অর্জনের জন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উদ্দীপিত করে।
সুদ মানুষকে কাজ ও উপার্জন থেকে দূরে রাখে এবং ফল লাভে ব্যস্ত রাখে। যারা উপার্জনের মৌলিক উপায়গুলোর প্রতি আগ্রহী তারা সাধারণত কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য বা ক্রয়-বিক্রয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু যারা সুদের কারবার করে তারা অর্থ দিয়ে অর্থ উপার্জন করে এবং এটি একটি ক্ষতিকারক পরিস্থিতি যা উত্পাদন হ্রাস করে।
তদুপরি, দীর্ঘমেয়াদে, যেহেতু সুদ একটি সমাজে শ্রম-পুঁজির সম্পর্ককে উল্টে দেয়, এটি শেষ পর্যন্ত সুদ দাতা লোকদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন যারা সুদের জন্য ব্যস্ত:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ وَ ذَرُوۡا مَا بَقِیَ مِنَ الرِّبٰۤوا اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ০ فَاِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلُوۡا فَاۡذَنُوۡا بِحَرۡبٍ مِّنَ اللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ ۚ وَ اِنۡ تُبۡتُمۡ فَلَکُمۡ رُءُوۡسُ اَمۡوَالِکُمۡ ۚ لَا تَظۡلِمُوۡنَ وَ لَا تُظۡلَمُوۡنَ
"হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না কর তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও, আর যদি তোমরা তাওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা যুলম করবে না এবং তোমাদের যুলম করা হবে না।" (২: ২৭৮, ২৭৯)
আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে:
اَلَّذِیۡنَ یَاۡکُلُوۡنَ الرِّبٰوا لَا یَقُوۡمُوۡنَ اِلَّا کَمَا یَقُوۡمُ الَّذِیۡ یَتَخَبَّطُهُ الشَّیۡطٰنُ مِنَ الۡمَسِّ ؕ ذٰلِکَ بِاَنَّهُمۡ قَالُوۡۤا اِنَّمَا الۡبَیۡعُ مِثۡلُ الرِّبٰوا ۘ وَ اَحَلَّ اللّٰهُ الۡبَیۡعَ وَ حَرَّمَ الرِّبٰوا ؕ فَمَنۡ جَآءَهٗ مَوۡعِظَۃٌ مِّنۡ رَّبِّهٖ فَانۡتَهٰی فَلَهٗ مَا سَلَفَ ؕ وَ اَمۡرُهٗۤ اِلَی اللّٰهِ ؕ وَ مَنۡ عَادَ فَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ هُمۡ فِیۡهَا خٰلِدُوۡنَ০
"যারা সুদ ভক্ষণ করে তারা শাইতানের স্পর্শে মোহাভিভূত ব্যক্তির অনুরূপ কিয়ামাত দিবসে দন্ডায়মান হবে; এর কারণ এই যে, তারা বলে, ব্যবসা সুদের অনুরূপ বৈ তো নয়; অথচ আল্লাহ তা‘আলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন; অতঃপর যার নিকট তার রবের পক্ষ হতে উপদেশ সমাগত হয়, ফলে সে নিবৃত্ত হয়; সুতরাং যা অতীত হয়েছে তার কৃতকর্ম আল্লাহর উপর নির্ভর; এবং যারা পুনরায় সুদ গ্রহণ করবে তারাই হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানেই চিরকাল অবস্থান করবে।" (আল-বাকারা, ২:২৭৫)
এ কারণেই আমাদের প্রিয় নবীর দৃষ্টিতে, মানুষের অর্জিত উপার্জনের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ উপার্জন হলো সুদের মাধ্যমে উপার্জন। এই জঘন্য পাপ থেকে মুসলিম জাতিকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যারা সুদ গ্রহণ করে বা মানুষকে সুদ দিতে কিংবা নিতে বাধ্য করে; যেসব কর্মকর্তা সুদের লেনদেন সম্পাদনের সাথে সম্পৃক্ত এবং এই ধরনের চুক্তির যারা সাক্ষী হয় তাদের সবাইকে অভিসম্পাত করেছেন। তিনি বলেছেন যে, পাপের ক্ষেত্রে তারা সবাই একই স্তরের।
আমাদের প্রিয় নবীর সূদী লেন-দেনে সহায়তাকারী সকলকে এই অভিশাপ দেয়া মূলত স্পষ্টভাবে এটা স্পষ্ট করার উদ্দেশ্যে যে, ইসলামী সমাজে সুদের কোন স্থান নেই এবং কাউকে এর ধারে কাছেও আসতে হবে না। এইভাবে মন্দ ও অকল্যাণের সমস্ত পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সুদ এমন একটি পাপ যা সব ধর্মেই নিষিদ্ধ। কারণ এর ক্ষতি সুস্পষ্ট। পবিত্র কুরআনের আয়াতে বলা হয়েছে যে সুদ ইহুদিদের জন্যও নিষিদ্ধ ছিল।
সুদমুক্ত অর্থনীতি আজ অসম্ভব ভাবা ভুল। সুদমুক্ত অর্থনীতি খুব ভালোভাবেই সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে, এমন সমাজ আছে যারা এটি সম্পন্ন করেছে। ইসলাম সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু পরিবর্তে এটি ব্যবসায় অংশীদার হিসাবে কাজ করার এবং এর মাধ্যমে পুঁজি বৃদ্ধির সুপারিশ করে। কারণ এই পদ্ধতি (method) সবার জন্য প্রয়োজন। এ ছাড়াও ইসলাম আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য (কর্জে হাসানা) যতটা উপায় অনুমতি দেয় ততটুকু ঋণ প্রদানকে উৎসাহিত করে এবং যারা সংকটে আছে তাদের দেওয়া ঋণকে উচ্চতর দানের চেয়েও বেশি পুণ্য বলে মনে করে। অন্যদিকে, বাধ্যতামূলক দান বা যাকাত ও অতিরিক্ত দান (সদকা) আদেশের মাধ্যমে ইসলাম সমাজকে একটি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা প্রদান করে।
২. মদ পান
অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় হলো ক্ষতিকারক পানীয় যা মানব প্রকৃতির সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। প্রকৃত অবস্থা হলো মানুষ সংযমী ও সজাগ। এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না যে, মানুষ তার নিয়ন্ত্রণ হারাবে, তন্দ্রাচ্ছন্ন ও অলস হবে। সতর্কতা ত্যাগের স্বাভাবিক পরিণতিই হলো বিচ্যুতির মধ্যে পড়া। যারা অ্যালকোহল পান করাকে স্বাভাবিক হিসাবে দেখেন তাদের জন্য পরবর্তী কার্যপরম্পরা অনিবার্য হয়ে পড়ে।
মদ্যপান ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের অনিষ্টের একটি বড় কারণ। এটি মানসিক সক্ষমতা নষ্ট করে, অথচ পার্থিব ও পরকালিন যাবতীয় বিষয় শুধুমাত্র এই মানসিক সক্ষমতা বা বুদ্ধিমত্তা দিয়েই পরিচালিত হয়ে থাকে। যখন মানসিক ক্ষমতা হারিয়ে যায়, একজন ব্যক্তি অবিশ্বাস্য রকমের ভুল করে। স্পিরিটের মধ্য স্ফুলিঙ্গ পড়ার মুহূর্তে যেমন সেটা জ্বলে ওঠে, তেমনি মদ্যপানের অশুভ আসক্তি মন ও হৃদয়কে আগুনের মত সহজেই ধ্বংস করে ফেলে।
মদ ও জুয়ার মাধ্যমে শয়তান মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ও শত্রুতা জাগিয়ে তোলে, তাদেরকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। মোটকথা, শয়তান মানুষকে এই হারাম বস্তুর দিকে প্রলুব্ধ করে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ, নামাজ ও ইবাদত বিমুখ করে তোলে। ফলস্বরূপ তাদের দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই ধ্বংস হয়।
এ প্রসঙ্গে রাশিয়ান অধ্যাপক রাচিনস্কি নিম্নলিখিত জ্ঞানগর্ভ মন্তব্য করেছেন: “শয়তান বোতলের মধ্যে অপেক্ষা করে এবং মদ আসক্তদের কাছ থেকে তাদের যা আছে তা কেড়ে নেয়। সেএমনকি তাদের কাছে থাকা শেষ শার্টটি এবং শিশুর হাতে ধরে রাখা খাবারের শেষ লোকমাটি পর্যন্ত কেড়ে নেয়। উপরন্তু, শয়তান ব্যক্তি ও পরিবারগুলোর যাদেরকে সে তার দাসে পরিণত করে, তাদের স্বাস্থ্য, সতীত্ব, বিবেক, উল্লাস ও আনন্দ, প্রশান্তি ও সুখও কেড়ে নেয়। সে যেমন মানুষের কাজ করার ইচ্ছা ও অনুভূতি নষ্ট করে দেয়, তেমনি সব ধরণের উপার্জন থেকেও তাদের বঞ্চিত করে। সবার আগে দয়া করে ভেবে দেখুন, মদ ও পানীয় উৎপাদনে কতটা মধ্যস্থতাকারীর শ্রম বৃথা যাচ্ছে। এই অনেক ধরণের অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় তৈরি করতে অযথা কত খাদ্য, পানীয় ও শ্রম নষ্ট হয় তা অনুগ্রহ করে হিসাব করে দেখুন। কোটি কোটি কিলোগ্রাম রুটি, বরই, ডুমুর ও আঙ্গুর যা মানুষ বেপরোয়াভাবে অ্যালকোহলের জলাভূমিতে নষ্ট করে সেগুলো যোগ করা হলে পৃথিবীতে কখনোই ক্ষুধা থাকত না বা খাবারের দামও এত বেশি হত না। মানুষ ছাড়াও; এমনকি পশুদের খাওয়ানোর জন্য পর্যাপ্ত হরেক রকমের খাবার পাওয়া যেত!"
“বোতলের শয়তানের বাজেট সম্পূর্ণরূপে জানা যাবে না। এর কারণ হল যারা শয়তানকে অনুসরণ করে তারা অ্যালকোহল ব্যবহারের মাধ্যমে শয়তানের কর সম্পূর্ণরূপে পরিশোধ করে। কিন্তু একই লোকেরাই অন্য লোকেদের পাওনা পরিশোধ করতে পিছপা হয়। শয়তান সর্বদা সম্পূর্ণরূপে তার প্রাপ্য নগদ আদায় করে নেয়। এমনকি যদি এই লোকদের দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ না থাকে, তারা হয় চুরি করে বা হত্যা করে কিংবা নিজের অথবা তাদের পরিবারের ইজ্জত ও সতীত্ব বিক্রি করে করে হলেও শয়তানের পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করে।
“অ্যালকোহলের কারণে অনেক মূল্যবান এবং বিশিষ্ট মানুষের জীবন ধ্বংস হয়েছে। এই লোকেরা সবসময় তাদের মূল্যবোধ হারিয়েছেন। এলকোহল ও মদ্যপান লক্ষ লক্ষ মহান মানুষের স্বাস্থ্য নষ্ট করেছে। জলাভূমির উপরে যেমন মজবুত ও বড় বড় অট্টালিকা তৈরি করা যায় না, তেমনি মদ্যপায়ী ও মাতালদের দেশে স্থায়ী শৃঙ্খলা ও শান্তিময় জীবন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এই কারণে, প্রথমে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে এই জাতিকে জাগিয়ে উন্নতির কার্যক্রম শুরু করতে হবে।”
সম্প্রতি ত্রিশটি দেশে জরিপ পরিচালনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশগুলোর ৮৫% নরহত্যা (যার প্রায় ৬০-৭০% শিকার ছিল নিজের পরিবারে), ৫০% যৌন নিপীড়ন, ৫০% সহিংস ঘটনা, ৭০% গার্হস্থ্য সহিংসতা, ৬০% কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং ৪০-৫০% মানসিক রোগ মদ পানের কারণে সংঘটিত হয়। এছাড়া মদ্যপানকারীদের মধ্যে জন্ম নেওয়া শিশুদের মানসিক সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা অন্যদের তুলনায় প্রায় ৯০% বেশি। একজন মদ্যপ নারীর প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি ৩৫% বেশি। এর কারণ হল অ্যালকোহল মায়ের গর্ভে শিশুর বৃদ্ধি ও জন্মের পরের বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করে। এছাড়াও এটি মানসিক প্রতিবন্ধকতা, খর্বাকার হওয়া ও আচরণগত সমস্যা সৃষ্টি করে। যেহেতু মদ্পানকারীর বাচ্চারা ক্রমাগত ঝগড়া ও সহিংসতাজনিত অসুস্থ পারিবারিক পরিবেশে বাস করে, তাই তাদের মানসিক অবসন্নতা ও আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই, এই শিশুদের অধিকাংশই স্কুলে ও কর্মজীবনে ব্যর্থ হয়।
ইংরেজ সরকারের একটি অফিসিয়াল রিপোর্ট অনুসারে, ইংল্যান্ডের অর্থনীতিকে মদপান জনিত মারামারি, আঘাত, হাসপাতালের খরচ এবং এই ধরনের অনর্থের কারণে বার্ষিক ২০ বিলিয়ন স্টার্লিং পাউন্ডের বোঝা (প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বহন করতে হয়।
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, “কখনও মদ পান করবে না কারণ এটি সমস্ত পাপ ও বিপর্যয়ের জননী”। (হুনান ইবনে মাজাহ:৩৩৭১)। তিনি আরো বলেন, "যদি কোনো কিছুর বেশি ভোগ-ব্যবহার কাউকে মাতাল করে, তবে তার সামান্য পরিমাণও নিষিদ্ধ।" (হুনান আবু দাউদ: ৩৮৬১; সুনান তিরমিজি:১৮৬৫)।
এই কারণে, সেসব লোকের কথায় কারও বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয় যারা বলে "অল্প পান করলে ও মাতাল না হলে কিছুই হয় না।" মাপকাঠিটি বেশ পরিষ্কার, যে বস্তু বেশি পান করলে মাতাল হওয়ার কারণ হয়, তবে তার অল্প পান করাও নিষিদ্ধ।
ইসলাম গুনাহের সকল পথ রুদ্ধ করে সর্বোত্তম পন্থায় মন্দ কাজ প্রতিরোধ করতে চায়। এটি সেসব তাত্ত্বিক সমাধানগুলোকে উপেক্ষা করে যা জীবনের অনুশীলনের সাথে ভাল কিছু না। ইসলাম নিষেধাজ্ঞাগুলোকে অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে প্রতিষ্ঠা করে যাতে তাদের নিবৃত্ত করা যায় এবং যারা এই নিষেধাজ্ঞাগুলো লঙ্ঘন করে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়। এই পরিস্থিতি এটা স্পষ্ট করে যে আমাদের ধর্ম মানুষকে কতটা মূল্য দেয় এবং অসীম মমতা ও সহানুভূতির সাথে তাদের আলিঙ্গন করে।
৩. অবৈধ যৌন সম্পর্ক
অবৈধ যৌন সম্পর্ক বা যিনা-ব্যভিচার, পরকিয়া, লাম্পট্য, পতিতাবৃত্তি, পশুকামিতা, ধর্ষণ, অজাচার ও সমকামিতাকে সর্বদাই মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি, নৈতিকতা, আইনি ব্যবস্থা এবং সমস্ত ঐশ্বরিক ধর্মে একটি ভুল ও অসামাজিক আচরণ হিসেবে দেখা হয়েছে। পরকিয়া রক্তের পরিচয় নষ্ট করে, পরিবারগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে দেয় এবং আত্মীয়তা, প্রতিবেশী ও বন্ধুত্বের মতো বন্ধনগুলোকে বিলীন করে দেয়। সেইসাথে এটি সমাজে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধের শিকড়কে দুর্বল করে। এই ধরনের অনাচার মানুষকে জৈবিক কামনার দাসে পরিণত করে, মানুষের সম্মান ও মর্যাদাকে ভুলুণ্ঠিত করে।
অবৈধ যৌনাচার মানব স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ক্ষতিকর পরিণতি ডেকে আনে। যারা এগুলোকে প্রশ্রয় দেয় তারা সিফিলিস ও গনোরিয়ার মতো মারাত্মক সংক্রামক যৌনবাহিত রোগে (এসটিডি) আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এছাড়াও এইডস'র মত মারাত্মক অ্যান্টি-ইমিউন রোগও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অবৈধ যৌন মিলনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে; যা আজ ওষুধও নিরাময় করতে পারে না।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যিনি তাঁর বান্দাদেরকে খুব ভালোবাসেন, তিনি চান না যে তারা এমন জঘন্য, কুৎসিত ও নির্লজ্জতার মধ্যে নিজেদেরকে নিমজ্জিত করুক। এ কারণে তিনি আমাদেরকে এমনকি অবৈধ যৌনাচারের ধারে-কাছে যেতেও নিষেধ করেছেন, তিনি যৌনাচার করার কথা উল্লেখ না করেই বলেছেন-
ۚ وَ لَا تَقۡرَبُوا الۡفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَ مَا بَطَنَ ۚ০
“আর লজ্জাজনক কাজের ধারে কাছেও যেও না, তা প্রকাশ্য হোক বা গোপন।" (আল-আন'আম, ৬:১৫১)
وَ لَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّهٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَ سَآءَ سَبِیۡلًا০
"ব্যভিচারের ধারে কাছেও যেও না, কারণ এটি লজ্জাজনক (কাজ) ও পাপ যা অন্যান্য পাপের পথ খুলে দেয়।" (আল-ইসরা', ১৭:৩২)
অর্থাৎ, ব্যভিচারের সুযোগ তৈরি করে এমন সব উপায় থেকে দূরে থাকতে হবে। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে বুঝানোর জন্য দৃষ্টি সংযত করার নির্দেশনা দিয়ে জানিয়েছেন তা অন্তরের জন্য কতটা ক্ষতিকারক: “নিষিদ্ধ (নারীর) দিকে তাকানো শয়তানের বিষাক্ত তীরগুলোর একটি। যে ব্যক্তি আল্লাহর সম্মানের কারণে তা থেকে বিরত থাকে আল্লাহ তাকে এমন বিশ্বাস দান করেন যার মাধুর্য সে তার অন্তরে অনুভব করে।" (মুসতাদরাক হাকিম: ৭৮৭৫)।
এ কারণেই ইসলাম আগে থেকে সংযম অবলম্বন করার নির্দেশনা প্রদান করে। যেমন পুরুষ ও নারী উভয়কেই ধর্ম নির্ধারিত পোশাক পরিধান করা, একে অপরের প্রতি অযথা দৃষ্টি আকর্ষণ করে এমন আচরণ থেকে দূরে থাকা, নারী-পুরুষের একত্রে নির্জনে অবস্থান না করা; (এমনকি পরস্পর নিকটাত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও) এবং পরস্পর ও সমাজে অশ্লীলতা প্রতিরোধ করা। এই কারণেই যেসব কথা, দৃষ্টিভঙ্গি বা সম্পর্ক যা মানুষের চিন্তাভাবনাকে পাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে সেগুলোকে ব্যভিচারের পথ প্রশস্ত করার কাজ হিসেবে নিন্দা করা হয়। ইসলাম এসবের মধ্যেও থেমে থাকে না; বরং পরিবার ও সমাজকে দায়িত্ব দেয় সন্তানদের শিক্ষিত করার। এছাড়া অযথা বিয়ের বয়স বিলম্ব না করা, বিয়েকে সহজ করা এবং সমাজে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে বাঁচিয়ে রাখার নির্দেশনাও দেয়।
এই ধরনের নির্দেশনা থেকে বুঝা যায়, ইসলামের লক্ষ্য মানুষকে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেওয়া নয় বরং সমাজে অপরাধের পরিবেশ তৈরি হওয়া রোধ করা যাতে তারা নিরাপদ ও শান্তিতে বসবাস করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, ইসলামের ইতিহাসে ব্যভিচারের ঘটনা সংঘটিত হওয়া ও তার জন্য শাস্তি পাওয়ার ঘটনা খুব কমই দেখা গেছে।
উপরে আলোচিত নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর পাশাপাশি ইসলাম আরও কিছু বড় বড় পাপকেও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে। যেমন: হত্যা, জাদু, নিপীড়ন, পিতামাতার অবাধ্যতা, মিথ্যা বলা, বিশ্বাসঘাতকতা, গীবত (কারও অনুপস্থিতে বদনাম করা যা সামনা-সামনি শুনলে সে অসন্তুষ্ট হতো), এতিমের সম্পত্তি বা পণ্য আত্মসাত, অপবাদ, অপদস্ত, চুরি এবং জুয়া খেলা।
ঘ. ইসলামে পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও পানি
পরিবেশ:
আমাদের মহান প্রভু আল্লাহ রব্বুল আ'লামীন বলেছেন, তিনি আমাদের চারপাশের পরিবেশ এবং আকাশ ও পৃথিবীর যা কিছু সৃষ্টি করেছেন ও যা কিছু সরবরাহ করছেন - এসবই মানুষের কল্যাণের জন্য করা হয়েছে। সুতরাং সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমাদের যথাযথভাবে কৃতজ্ঞ থাকা প্রয়োজন এবং পরিবেশের সাথে আমাদের সম্পর্ক গড়তে হবে সচেতনতার সাথে; যে সচেতনতা তৈরি হবে আমাদের বিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ থেকে। ঘৃণা ও বিদ্বেষবশত পরিবেশ নষ্ট করা বা অপচয় করা অকৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের নামান্তর এবং এর ফলে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষতি হয় আমাদেরই। সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ প্রসঙ্গে বলেছেন:
ظَهَرَ الۡفَسَادُ فِی الۡبَرِّ وَ الۡبَحۡرِ بِمَا كَسَبَتۡ اَیۡدِی النَّاسِ لِیُذِیۡقَهُمۡ بَعۡضَ الَّذِیۡ عَمِلُوۡا لَعَلَّهُمۡ یَرۡجِعُوۡنَ
"জলে, স্থলে যা কিছু বিপর্যয় তার সবই মানুষের হাতের কামাই; আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কিছু স্বাদ আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা অন্যায় থেকে ফিরে আসতে পারে।" (আর-রুম,৩০:৪১)
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন চান মানুষ শৃঙ্খলা মেনে চলার মাধ্যমে তাদের জীবনে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করুক, যাতে তাদের মর্যাদা সমুন্নত হয়: "তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং তাতে ভারসাম্য স্থাপন করেছেন, যাতে তোমরা ভারসাম্যের সীমা লঙ্ঘন না কর।"
একজন প্রকৃত মুসলিম সব সময় অন্যান্য মানুষ, প্রাণী, গাছপালা এমনকি নির্জীব বস্তুর সাথেও ভাল আচরণ করেন যা আসলে তার হৃদয়ের প্রশান্তি ও সৌন্দর্যকেই প্রতিফলিত করে। তার দ্বারা কেউ যাতে আঘাতপ্রাপ্ত না হয় সে ব্যাপারে তিনি সতর্ক থাকেন। একদিন, বআল্লাহর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাশ দিয়ে (কিছু লোক) একটি কফিন নিয়ে চলে যাওয়ার সময় তিনি (কফিনটি সম্পর্কে) বলেন: "হয় সে স্বস্তি পেয়েছে, নয়তো অন্যরা তার থেকে মুক্তি পেয়েছে।" সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন: "হে আল্লাহর রসূল, 'হয় সে স্বস্তি পেয়েছে, না হয় অন্যরা তার থেকে স্বস্তি পেয়েছে' দ্বারা আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন?" রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: “যখন আল্লাহর কোন বিশ্বাসী ও অনুগত বান্দা মারা যায়, তখন সে দুনিয়ার ক্লান্তি ও দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা পায় এবং সে আল্লাহর রহমত লাভ করে। অন্যদিকে যখন কোন পাপী বা মন্দ লোক মারা যায়, তখন মানুষ, মাটি, বৃক্ষ ও প্রাণীরাও তার থেকে মুক্তি ও স্বস্তি পায় ।" (মুসনাদ আহমাদ: ২৯৬, ৩০২, ৩০৪)
মানুষকে অবশ্যই সব সময়, সব জায়গায় এবং সব পরিস্থিতিতে সেসব কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে যা অন্যদেরকে বিরক্ত করতে পারে। যে শহর, যে নগর এবং যে গ্রামে আমরা বাস করি সেখানকার মাটি, পানি, বাতাস এবং সুন্দর দৃশ্যগুলোকে দুষিত ও নোংরা করা এমন কাজ যা আসলে মানুষের সম্মান এবং মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি আমাদের সকলের বিবেচনায় রাখা উচিত।
মুসলমানদের বিবেচনা করতে শেখানো হয় যে, তাদের ময়লা ফেলার কারণে অন্যরা কষ্ট পেতে পারে এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য নষ্ট হতে পারে। একজন পরিপূর্ণ মু'মিন হওয়ার জন্য এটিকে তাদের একটি কর্তব্য বলে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় যে, সড়ক, পথ, খেলার মাঠ, পার্ক, কিংবা পিকনিক এলাকায় খাওয়ার পরে ফলের বীজ, বাদামের খোসা; বোতল, ক্যান, কাগজ, প্যাকেজ ও অন্যান্য জিনিস যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা এড়িয়ে চলা উচিত; কেননা, তা মানুষ ও প্রাণীদের বিরক্ত করে।
আমাদের নবী রাস্তায় পড়ে থাকা ক্ষতিকর বস্তু; যেমন একটি ডাল বা কাঁটা ঝোপ যা পথচারীদের ক্ষতি করতে পারে; সরানোকে ঈমানের একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেতেন। তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে, যারা অন্যদের কষ্ট দেয় আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন না। মুয়াজ বিন আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন: “আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে একটি সামরিক অভিযানে ছিলাম। সৈন্যরা ক্যাম্পিং এলাকা সংকুচিত করে ফেলে এবং পথ বন্ধ করে দেয়। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন ঘোষণাকারীকে পাঠিয়ে সৈন্যদের কাছে নিম্নলিখিত নির্দেশ ঘোষণা করতে বলেন:
"যে ব্যক্তি কাউকে চলাচল পথে বাধা দেয় বা পথ অবরুদ্ধ করে (অথবা কোন মুমিনকে কষ্ট দেয়), সেই ব্যক্তির জন্য জিহাদের কোন পুরষ্কার নেই।" (সুনান আবু দাউদ: ২৬২৯)
এখানে আমাদের পথ প্রদর্শক মহান নবী ঘোষণা করেছেন যে, অপ্রয়োজনীয়ভাবে স্থান ও রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ করা বা যে কোন কারণে আল্লাহর বান্দাদের হয়রানি করা খুবই অন্যায় এবং যারা এটা করবে তারা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে।
এ কারণে প্রত্যেককে এমন সব কাজ এড়িয়ে চলতে হবে যা মানুষকে কষ্ট দিতে কিংবা বিরক্ত করতে পারে। যেমন- যযত্রতত্র ময়লা ফেলা, পাবলিক প্লেসে থুতু/কফ ফেলা, নির্বিচারে পার্কিং করা বা রাস্তায় এমন জিনিস স্থাপন করা যা পাশকাটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ওসমানী খেলাফতের সময় মুসলমানরা শুধুমাত্র অন্যান্য মানুষকে হয়রানি না করার ব্যাপারেই সতর্ক ছিলেন তা নয়; বরং তারা আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে অন্যান্য সকল প্রাণীর সেবায়ও যত্নবান ছিলেন। বিখ্যাত ফরাসি লেখক মন্টেইন উল্লেখ করেছেন যে "মুসলিম তুর্কিরা এমনকি পশুদের জন্যও দাতব্য সংস্থা (foundations) ও হাসপাতাল তৈরি করেছিল।" ফরাসি আইনজীবী গুয়ার (Guer) যিনি ১৭ শতকে অটোমান সাম্রাজ্য পরিদর্শন করেছিলেন, তিনি দামেস্কে অসুস্থ বিড়াল ও কুকুরদের জন্য একটি হাসপাতালের কথাও উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের দাতব্য সংস্থার বিষয়ে প্রফেসর ডঃ সিবাই আমাদের এভাবে অবহিত করেছেন: “ঐতিহ্যবাহী সেসব ফাউন্ডেশনে অসুস্থ প্রাণীদের চিকিত্সা ও খাদ্যের জন্য পৃথক জায়গা রয়েছে। গ্রিন ফিল্ড (আজকের দামেস্কের শহরের মাঠ) হল একটি সবুজ মাঠ যা দান করা হয়েছিল বয়স্ক পশুদের চারণভূমি হিসেবে; যে পশুগুলোর শ্রমশক্তি কমে যাওয়ার কারণে তাদের মালিকরা মুক্ত করে দিয়েছিল। সেসব প্রাণী মারা না যাওয়া পর্যন্ত সেখানে চারণ করতো। দামেস্ক ফাউন্ডেশনগুলোর মধ্যে এমন জায়গাও ছিল যেখানে বিড়ালরা খেতে, বিশ্রাম করতে এবং ঘুরে বেড়াতে পারতো। সেখানে প্রতিদিন শত শত বিড়াল থাকতো এবং তাদের প্রতিদিনের খাবার খুঁজে পেতে কোন সমস্যা হতো না।"
ইসলাম ধর্ম যা প্রাণীদের উপর এত গুরুত্ব দেয় তা স্বাভাবিকভাবেই বৃক্ষ ও সবুজ মাঠের প্রতিও সর্বোচ্চ যত্ন নেয়ার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: "যদি কেয়ামতও শুরু হয়ে যায় আর তোমাদের কারও হাতে একটি বীজও থাকে, তবে সে যদি পারে তাহলে যেন পৃথিবীর ধ্বংস হওয়ার আগেই রোপণ করে দেয়!" (মুসনাদ আহমদ: ৩/ ১৯১ ও ১৮৩)
হযরত আবু দারদা (রাঃ) যিনি সম্মানিত সাহাবীদের অন্যতম ছিলেন, একদিন তিনি একটি বৃক্ষ রোপণ করছিলেন, এমন সময় কেউ একজন তার কাছে এসে বিস্ময় প্রকাশ করে বলল: “আপনি মহানবী (সা.)-এর একজন সাহাবী, অথচ আপনি নিজেকে গাছ লাগানোর কাজে ব্যস্ত রাখছেন? আবু দারদা তাকে উত্তরে বললেন: “শান্ত হও, এত তাড়াতাড়ি বিচার করো না! আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, "যদি কেউ একটি গাছ লাগায় এবং আল্লাহর কোন সৃষ্টি সেই গাছের ফল খায়, তাহলে তা হবে তার জন্য সদকা।" (মুসনাদ আহমদ: ৬/ ৪৪৪, সহীহ মুসলিম, মুসাকাত, ৭)। আবার আরেকটি বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: "যে ব্যক্তি (সঙ্গত কারণ ছাড়াই) একটি সিডর (ছায়াযুক্ত) গাছ কাটে, আল্লাহ তার মাথা জাহান্নামে টেনে নিয়ে যাবেন।" (হুনান আবু দাউদ: ৫২৩৯)
আল্লাহর রাসূল মক্কা সহ মদিনা এবং তায়েফকে হারেম (নিষিদ্ধ) ঘোষণা করে তাঁর সেনাবাহিনীকে গাছ কাটা, উদ্ভিদের বর্ধন-প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্থ করা ও শিকার করা নিষেধ করেছেন। আবার বনু হারিথা গোত্রের বাগানের বিষয়ে তিনি বলেন: "যে ব্যক্তি এই বাগান থেকে একটি গাছ কেটে ফেলবে সে যেন তা প্রতিস্থাপনের জন্য আরেকটি গাছ লাগায়!"
এভাবে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতিনিয়ত পরিবেশ ও প্রাকৃতিক শোভা রক্ষার উপদেশ দেয়ার মধ্য দিয়ে সকল সৃষ্টির প্রতি সদয় ও শ্রদ্ধাশীল একটি সমাজ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর সেই শিক্ষার ধারাবাহিকতা দেখা যায় তাঁর অনুসারিদের মধ্যেও। প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) একবার একটি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির সময় তাঁর সৈন্যদের উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা থেকেও পরিবেশ রক্ষায় তিনি কতটা গুরুত্ব দিতেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়:
‘‘বিশ্বাসঘাতকতা করো না, যুদ্ধের মাল লুট করো না, অত্যাচার করো না, কান বা নাকের মতো শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছেদ করে নির্যাতন করো না; শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের হত্যা করবে না! খেজুর গাছ ভূপাতিত করবে না ও পুড়িয়ে ফেলবে না। ফলবতী বৃক্ষ কাটবে না; খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা ছাড়া ভেড়া, গরু ও উট বা অন্য কোন প্রাণি হত্যা করবে না। যদি এমন লোকদের মুখোমুখি হও যারা নিজেদেরকে মঠের মধ্যে আটকে রাখে ও উপাসনায় ব্যস্ত থাকে: তাহলে তাদের উপাসনা করার জন্য ছেড়ে দিবে।..." (মুসনাদ আহমাদ: ২৭২৮)।
ফরাসী সামরিক কর্মকর্তা কাউন্ট ডি বোনেভাল (Comte de Bonneval) মুসলমানদের মধ্যে এই সংবেদনশীলতা লক্ষ্য করেছিলেন এবং বিস্ময়ের সাথে বলেছিলেন, "এটা এমনকি ওসমানি সাম্রাজ্যের তুর্কিদের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায় যারা নিষ্ফলা বৃক্ষকেও বিলুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করার প্রাণপণ চেষ্টা করে, তাপের কারণে শুকিয়ে মরে যাওয়া থেকে গাছগুলোকে রক্ষা করার জন্য সেগুলোকে প্রতিদিন পানি দেওয়ার জন্য লোক নিয়োগ করে সেগুলোর পিছনে অর্থ ব্যয় করে। "
২. পবিত্রতা বা পরিচ্ছন্নতা
ইসলাম দৈহিক ও নৈতিক পরিচ্ছন্নতাকে উৎসাহিত করে এবং কিভাবে সেগুলো অর্জন করতে হয় তা আমাদের শিক্ষা দেয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্রতা (পরিচ্ছন্নতা) পছন্দ করেন।" (তিরমিযী, আদাব, ৪১/২৭৯৯)।
স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন পবিত্র কুরআনে বলেছেন: "নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে।" (বাকারা, ২:২২২)
মহানবী (সাঃ)’র জীবনের দিকে তাকালে লক্ষ্য করা যায়, তিনি সারা জীবন সব ধরনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, তিনি যখন মসজিদে যেতেন, জনসমক্ষে যেতেন বা বন্ধুর সাথে দেখা করতেন, তখন তিনি সুন্দর পোশাক পরার দিকে মনোযোগ দিতেন, সুন্দর আতর ব্যবহার করতেন এবং অন্যদের বিরক্ত করতে পারে এমন দুর্গন্ধযুক্ত খাবার যেমন পেঁয়াজ বা রসুন খেতেন না। আবু কুরসাফাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন: “আমার মা, আমার খালা এবং আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আনুগত্যের অঙ্গীকার করার জন্য গিয়েছিলাম। যখন আমরা তার কাছ থেকে ফিরে আসছিলাম, তখন আমার মা ও খালা আমাকে বললেন: “আমার সন্তান, আমরা এই ব্যক্তির মতো কাউকে দেখিনি, যার চেহারা এত বেশি সুন্দর, কাপড় এত পরিষ্কার আর যার কথা এত নরম। তার মুখ থেকে যেন আলো বেরোচ্ছিল।” (হাইথামি-আবু আল-হাসান আল-হাইথামি), অষ্টম খণ্ড,২৭৯-২৮০)
ইসলাম এমন একটি জীবন ব্যবস্থা যা পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধতা ও সৌজন্যতার নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। মমহানবী (সঃ) বলেছেন, পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক। হাদিস ও ইসলামী আইনশাস্ত্রের প্রায় সব গ্রন্থই শুরু হেয়েছে পবিত্রতার বিষয় দিয়ে। মূলত এটি আমাদের ধর্মের একটি মৌলিক নীতি হওয়ার কারণে শরীর পরিচ্ছদ ও ইবাদতের স্থানের পবিত্রতা ছাড়া কোন কোন ইবাদত যেমন- নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত অনুমোদিত ও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয় না। এ কারণেই বাথরুমে যাওয়ার নিয়মের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কোনো মুসলমানের কাপড়ে যেন কোনো অপবিত্রতা না থাকে এবং সেগুলো যেন ভালোভাবে পরিষ্কার হয়। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সাহাবীদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, "কবরের বেশিরভাগ আযাব প্রস্রাব থেকে যথাযথভাবে পরিষ্কার না হওয়ার কারণে হয়।" (বুখারী: ২১৮)
একজন মুসলিমকে দিনে কমপক্ষে পাঁচবার বাধ্যতামূলকভাবে (ফরজ) নামাজ পড়তে হয়। আর নামাজের আগে অজু (ও প্রয়োজন সাপেক্ষে ফরজ গোসল) বাধ্যতামূলক। অজু করার কারণে প্রতিদিন শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন হাত, মুখ-গহ্বর, মুখমণ্ডল, মাথা, কান, ঘাড় ও পা যা ময়লা জীবাণুর সবচেয়ে বেশি সংস্পর্শে আসে; সেগুলি কমপক্ষে পাঁচবার ধৌত করতে হয়। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “জান্নাতের চাবি হল নামায, আর নামাযের চাবি হল অজু (পরিচ্ছন্নতা)।” (সুনান আবু দাউদ: ৬১)
এভাবে ইসলাম পবিত্রতা বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে ইবাদতের অংশে পরিণতে করেছে যাতে প্রত্যেকে এটি ইবাদতের অনুভূতি নিয়ে সম্পন্ন করে। ইবাদতের অনুভূতি (নিয়্যত) মনের পবিত্রতা নিশ্চিত করে।
আল্লাহর রাসূল (সা.) আরেকটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন, আর তা হল মুখগহ্বরের পরিচ্ছন্নতা (oral hygiene)। এ কারণে তিনি বিভিন্ন সময়ে এবং বিশেষ করে ওযু করার আগে মিসওয়াক ব্যবহার করার উপদেশ দিয়েছেন। এর উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি মুসলমানদেরকে খাবারের আগে ও পরে হাত ধুয়ে খাবারের বরকত বাড়ানোর উপদেশও দিয়েছেন।
আমাদের প্রকৃতির কয়েকটি চাহিদা যেমন খৎনা করানো, নাভির নীচের ও বগলের লোম মুণ্ডন করা, দাড়ি পরিপাটি করে রাখা এবং গোঁফ ছোট করা হল সদাচার ও পরিচ্ছন্নতার কিছু নিয়ম যা আল্লাহর রাসূল শিখিয়েছেন।
রাসূল (সা.) শুধু যে কাপড়-চোপড়ের পরিচ্ছন্নতার প্রতি মনোযোগী ছিলেন তা নয়; তিনি পোশাকের পাশাপাশি চেহারা-সুরত তথা চুল ও দাড়ি সুবিন্যস্ত ও পরিপাটিতার দিকেও সমান মনোযোগী ছিলেন। একবার যখন তিনি মসজিদে ছিলেন, তখন চুল-দাড়ি এলোমেলো অবস্থায় এক মুসল্লি ভিতরে এলেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে তার চুল ও দাড়ি পরিপাটি করার জন্য হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলেন।
আল্লাহর রসূল পোশাকে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তবে তিনি উত্কট গন্ধ পছন্দ করতেন না। মা আয়েশা জানিয়েছেন, আল্লাহর নবী মিষ্টি সুগন্ধি পছন্দ করতেন।
মহানবীর সম্মানিত সাহাবীরা ছিলেন এমন ধরনের মানুষ যারা পরনির্ভরশীলতা পছন্দ করতেন না। তারা স্বাবলম্বি হওয়া পছন্দ করতেন। এ কারণে তারা কঠোর পরিশ্রম করতেন। জুমার দিনও নামাযের (সালাত আল-জুমুআ) সময় না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজ করতেন এবং সময় হলেই কাজ ফেলে নামাযে চলে আসতেন। অনেক সময় গোসল না করেই চলে আসতেন। তখন তাদের গা থেকে ঘামের গন্ধ বের হত। তাই হুজুর (সা.) তাদেরকে জুমার দিন গোসল করে আসার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহিত করতেন। (বুখারী, জুমুআ: ১৬, সহীহ মুসলিম, জুমুআ: ৬)
মুসলমানরা "পরিচ্ছন্নতা অর্ধেক ঈমান" লেখা সম্বলিত পবিত্র হাদিসটি ক্যালিগ্রাফিক মাস্টারপিস আকারে ফ্রেমবন্দি করে তাদের বাড়ি ও মসজিদের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখেন। তারা হাদিসটির নির্দেশনা নিজেদের জীবনে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করেন।
ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের প্রখ্যাত স্থপতি মিমার সিনান (Mimar Koca Sinan-Great Architect Sinan) মুসলিম সমাজের কল্যাণ, স্বাচ্ছন্দ্য, পরিচ্ছন্নতা সুবিধার জন্য অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতিটি কোণে গণ মুসাফিরখানা, রন্ধনশালা, ওয়াটারবেড, পানির ফোয়ারা ও গণ সৌচাগার ও গোসলখান নির্মাণ করেছিলেন। মুসলিম সমাজে সর্বোত্তম পরিচ্ছন্নতার জন্য গণ সৌচাগার ও গণ গোসলখানাকে গ্রামসহ সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।
তিনি আরও জানান, মুসলমানদের ঘরবাড়ি অত্যন্ত পরিষ্কার। তারা জুতা পরে কোনো বাড়িতে প্রবেশ করে না। তারা তাদের ঘরের প্রতিটি কোণ এত পরিষ্কার রাখে যাতে সেখানে নামাজ পড়া যায়। তবে তারা বাড়িতে ‘পোষা প্রাণী’ রাখতো না। এমনকি তারা বাড়িতে পাখিও পালন করতো না। প্রখ্যাত পরিব্রাজক এম. ডি থেভেনট (Monsieur De Thevenot) মুসলিম সমাজে পরিচ্ছন্নতা ও সৌজন্যতা সম্পর্কে লিখেছেন: “তুর্কিরা সুস্থ থাকে ও খুব কমই অসুস্থ হয়। আমাদের দেশে যে কিডনির সমস্যাসহ আরও অনেক বিপজ্জনক অসুখ দেখা যায় তার কোনটাই এখানে দেখা যায় না, এই অসুখগুলোর নামও তারা জানে না। আমি অনুমান করি যে তাদের চমৎকার স্বাস্থ্যের কারণ হল বার বার অজু করা এবং খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমিত হওয়া। তারা খুব কম খায়। খ্রিস্টানরা যেমন অনেকগুলো ভিন্ন জিনিসের সমন্বয়ে তৈরি খাবার খায় মুসলমানরা তা খায় না।"
আল্লাহর রাসূল (সা.) মানুষের যাতায়াতের পথে, গাছের নীচে; যেখানে মানুষ শীতল হয়, দেয়ালের পাশে এবং যেসব জায়গায় মানুষ বিশ্রাম ও আরাম করার জন্য বসে সেখানে আবর্জনা ফেলতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। একদিন তিনি মসজিদে মক্কার দিকে মুখ করা দেওয়ালে থুতু দেখতে পান। তিনি ব্যক্তিগতভাবে এটি পরিষ্কার করেন, যদিও তাঁর পবিত্র মুখে এ ধরনের কাজের বিরুদ্ধে বিরক্ত স্পষ্ট ছিল। হুজুর (সা.) আরেকটি হাদিসে বলেছেন: “আমার অনুসারীদের পূণ্য ও পাপ কাজগুলো আমাকে দেখানো হয়েছে। ভালো কাজের মধ্যে আমি দেখেছি পথ থেকে ক্ষতিকর বস্তু সরিয়ে দেওয়া আর পাপ কাজের মধ্যে আমি দেখেছি মসজিদে থুথু ফেলতে ও তা পরিষ্কার না করতে।"
এই হাদীসে মসজিদে থুথু ফেলার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। মসজিদ হলো যতটা সম্ভব আল্লাহর ইবাদত করার জায়গা। এছাড়াও সেখানে লোকেরা একত্রিত হয়। এই পবিত্র স্থানগুলোর পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে ঈমানদারদের সতর্ক ও সর্বাধিক যত্নবান হওয়া উচিত। পাশাপাশি মানুষে চলাচল, সমাগম ও বসার স্থানকে ক্ষতিকর জিনিসমুক্ত করা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ইসলামের অন্যতম নির্দেশ। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ বিষয়টির প্রতি অনেক জোর দিয়েছেন। এছাড়া হযরত ওমর (রা.) যখন আবু মুসা আল-আশরিকে বসরার গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন, তখন তিনি তার দায়িত্বের মধ্যে রাস্তা পরিষ্কার রাখাকে তালিকাভুক্ত করেছিলেন।
একটি বর্ণনা থেকে জানা যায়, ইমামে আজম হযরত আবু হানিফার এক জরথুস্ট্রিয়ানের নিকট কিছু অর্থ পাওনা ছিল। তিনি তা সংগ্রহ করতে জরথুস্ত্রীর বাড়িতে গেলেন। দরজার কাছে এসে লক্ষ্য করলেন তার নিজের জুতা জোরা নোংরা। তিনি জুতা ঝাঁকি দিলে জুতার ময়লা জরথুষ্ট্রের দরজার দেওয়ালে লেগে গেল। তিনি বিব্রত হলেন এবং কি করবেন বুঝতে পারছিলেন না। এমতাবস্থায় আবু হানিফা নিজেকে বললেন: "যদি আমি এইভাবে দেয়াল ছেড়ে যাই, আমার কারণে জরথুষ্ট্রিয়ানের দেয়ালটি খারাপ দেখাব; কিন্তু আমি যদি এটি পরিষ্কার করার চেষ্টা করি তবে দেয়ালের আস্তরণ উঠে যাবে!"
তারপর তিনি দরজায় টোকা দিলেন এবং চাকরকে বললেন: “দয়া করে আপনার মনিবকে জানান যে আবু হানিফা দরজায় অপেক্ষা করছেন। এ কথা শুনে লোকটি দরজায় হাজির হলো এবং আবু হানিফা ঋণ চাইবে ভেবে ক্ষমা চাইতে লাগলো। কিন্তু হযরত আবু হানিফা তাকে বললেন: "এই মুহুর্তে এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়।" তিনি দেয়ালে যা ঘটেছে তা ব্যাখ্যা করার পরে জানতে চাইলেন কীভাবে প্রাচীরটি পরিষ্কার করা যায়। জরথুষ্ট্রিয়ান, হযরতের এই সুন্দর মহানুভবতায় অত্যন্ত প্রভাবিত হলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি বললেন: "আপনি বরং প্রথমে আমার আত্মাকে শুদ্ধ করার কাজ শুরু করতে দিন!" এ কথা বলে তিনি সেই মুহূর্তে মুসলমান হয়ে যান।
৩. পানি
পরিচ্ছন্ন ও উন্নত পরিবেশের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ হল পানি। তার চেয়েও বড় কথা, পৃথিবীতে বেঁচে থাকা নির্ভর করে পানির ওপর। পানি হল জীবন ও সমস্ত জীবের মূল উপাদান। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: "আমি প্রত্যেক জীবন্ত বস্তুকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছি।" আন নূর, ২৪:৪৫; "যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখে না যে, আসমানসমূহ ও যমীন ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম, আর আমি সকল প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?" (আল আম্বিয়া, ২১:৩০)
সর্বশক্তিমান আল্লাহ তার বান্দাদের ব্যবহারের জন্য পানিকে কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন যা মূলত সৃষ্টি জগতের প্রতি বিশেষ করে মানব জাতির প্রতি তাঁর অপরিসীম দয়া ও মাহাত্ম্যের অপূর্ব নিদর্শন। এ বৈশিষ্ট্যগুলো মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে:
১. পানির বিপরীতমুখি বৈশিষ্ট্যের কারণে, এটি অনেক জৈব এবং অজৈব যৌগ দ্রবীভূত করার ক্ষমতা রাখে।
২. অন্যান্য যৌগগুলোর বিপরীতে, পানির সবচেয়ে তীব্র রূপটি তার কঠিন রূপ বরফ বরং +৪ সেন্টিগ্রেডেও এটি তরল রূপে বিরাজ করে। এই কারণে, সমুদ্র, হ্রদ এবং মহাসাগরগুলোতে পানি জমাট বেঁধে বরফ হতে থাকে উপর থেকে নীচের দিকে; তলদেশ থেকে উপরে নয়। আর পৃষ্ঠের বরফের কারণে পানিতে বসবাসকারী জীব সমূহ জমাট হওয়া থেকে রক্ষা পায়।
৩. পানির সবচেয়ে কাছের যৌগ হল হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S), এবং এটি পানির চেয়ে দ্বিগুণ ভারী হলেও সাধারণ তাপমাত্রাতেই এটি গ্যাসীয় রূপ ধারণ করে। সে হিসেব পানিরও তো একই তাপমাত্রায় গ্যাসীয় রূপে বিরাজ করার কথা; কিন্তু একশো ডিগ্রী তাপমাত্রায় ফুটানো ছাড়া পানি বায়ুবীয় রূপ ধারণ করে না। অন্যদিকে হাইড্রোজেন সালফাইড একটি দুর্গন্ধযুক্ত এবং বিষাক্ত গ্যাস হলেও প্রায় সমগোত্রীয় যৌগ পানি (H₂O) গন্ধহীন, সুপেয় ও জীবনরক্ষাকারী।
পবিত্র কোরানে বার বার পানির কথা বলা হয়েছে। কীভাবে বৃষ্টি হয়, মেঘ কীভাবে বৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয় তার পর্যায় সমূহ, কীভাবে একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাপের সাথে পৃথিবীতে বৃষ্টি নামানো হয় এবং মৃত মাটি পুনর্জীবন লাভ করে, ভূগর্ভস্থ পানি ও নোংরা পানি কিভাবে পরিষ্কার করা হয় এসব দৃষ্টান্তের মাধ্যমে আসলে সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার দয়ার গুরুত্ব নির্দেশ করা হয়েছে, বৃষ্টিকে আল্লাহর "রহমত" হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মুসলমানরা, যারা পানিকে স্রষ্টার অশেষ দয়া বলেে উপলব্ধি করতে পারেন, তারা পানি সেবাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেন, যারা তাদের পানি সরবরাহ করেন তাদের জন্য দোয়া করেন যাতে তারা "পানির মতো পবিত্র হতে পারেন!" এ কারণেই কাবার আশেপাশে যারা হজে আগতদের পানি ও শরবত উপহার দেন তাদের এই সেবাকে অত্যন্ত সম্মানজনক, মর্যাদাপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য পালন বলে বিবেচিত হত।
একদিন আল্লাহর রাসূল (সা.) পবিত্র কাবা এলাকায় এলেন যেখানে বিনামূল্যে পানি ও শরবত পরিবেশন করা হচ্ছে; তখন তিনিও পানি পান করতে চাইলেন। আব্বাস (রাঃ) তার ছেলেকে বললেন, "ফাদল! তোমার মায়ের কাছে যাও, রাসূলুল্লাহ (সা.)'র জন্য (একটি বিশেষ পানীয়) নিয়ে আস!
হুজুর (সা.) বললেন: "বরং, আমাকে এই পানীয় থেকেই দাও যা অন্য সবাই পান করছে!"
হযরত আব্বাস (রাঃ) বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল, কখনও কখনও মানুষের হাত এই পানীয় স্পর্শ করে”।
হুজুর (সা.) বললেন: "সমস্যা নেই, অন্য সবাই যেখান থেকে পান করেছে আমাকেও সেখান থেকে দাও!"
আল্লাহর রাসূল সেখানে পানি পান করার পর যমযম কূপের কাছে গেলেন। হযরত আব্বাসের পরিবার এখান থেকে পানি টেনে হাজীদের পরিবেশন করছিলেন। আল্লাহর রসূল (সা.) তাদের প্রশংসা করে বললেন: “হে আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানগণ, পানি উঠাও! তোমরা একটি যথার্থ কাজ করছো!” তারপর তিনি হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বললেন: “যদি আমি জানতাম যে লোকেরা আপনার চারপাশে জড়ো হবে না এবং একই কাজ করার চেষ্টা করবে না আমি এইভাবে কূপের দড়ি ধরে রাখতাম (তার পবিত্র কাঁধের দিকে ইশারা করে) এবং আপনারা যেভাবে উঠাচ্ছেন সেভাবে আমিও পানি উঠাতাম। " (সহীহ বুখারি, হজ অধ্যায়:৭৫)।
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষকে পানি দেওয়ার ফজিলত ব্যাখ্যা করে বলেছেন:
"বিচারের দিন জাহান্নাম নির্ধারিত হয়ে গেছে এমন এক ব্যক্তি জান্নাতের ফয়সালা প্রাপ্ত একজন ব্যক্তির সাথে দেখা হবে। তখন সে জান্নাতগামি ব্যক্তিকে বলবে: “ও তাই তো! তোমার কি মনে আছে তুমি আমার কাছে পানি চেয়েছিলে আর আমি তোমাকে দিয়েছিলাম?" এর বিনিময়ে সেদিন সে সুপারিশ প্রার্থনা করবে। অন্য একজন এমন একজন ব্যক্তির সাথে দেখা করবে যে জান্নাতে যাবে। তখন সেও জান্নাতগামি ব্যক্তিকে বলবে, 'তোমার কি মনে আছে যেদিন আমি তোমাকে ওযুর পানি দিয়েছিলাম?" তখন সেও সুপারিশ প্রার্থনা করবে এবং তা গ্রহণ করা হবে। এভাবে জাহান্নামগামি আরেক ব্যক্তি জান্নাতগামি এক ব্যক্তিকে বলবে: “ও তাই তো! তোমার কি মনে আছে আমাকে অমুক অমুক কাজের দেখাশোনা করতে পাঠিয়েছিলে? আর আমি সেদিন তোমার জন্য সেখানে গিয়েছিলাম।" তখন জান্নাতগামি ব্যক্তি তার জন্য সুপারিশ করবে। (ইবনে মাজাহ, আদাব অধ্যায়: ৮)
আল্লাহর রসূল (সা.) পরিষ্কার ও মিষ্টি পানি পান করার প্রতি মনোযোগী ছিলেন। তিনি মিষ্টি পানির কূপ পছন্দ করতেন এবং দূষিত কুপের পানি ব্যবহার করতে নিষেধ করতেন।
একইভাবে, ইসলাম ওযু শুদ্ধ হওয়ার জন্য বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে বলে। যে পানির স্বাদ, রঙ বা গন্ধ পরিবর্তিত হয়ে গেছে তা পান করা বা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। যেহেতু পানি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই এটি ব্যবহার করার সময় আমাদের সচেতন হতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সকল মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা, পরিবেশ, সংক্ষেপে সমগ্র বিশ্বের প্রতি ভালোবাসা এবং সবকিছুর প্রতি ভালো ব্যবহার করা।
আরেকটি বিষয় যা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন; তা হল প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানির অপচয় না করা। সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন:
یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّ کُلُوۡا وَ اشۡرَبُوۡا وَ لَا تُسۡرِفُوۡا ۚ اِنَّهٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ০
"হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ গ্রহণ কর, আর খাও ও পান কর; কিন্তু বারাবাড়ি করে অপচয় করো না। কারণ আল্লাহ অপচয় পছন্দ করেন না।" (আল আরাফ)৭ঃ৩১
اِنَّ الۡمُبَذِّرِیۡنَ کَانُوۡۤا اِخۡوَانَ الشَّیٰطِیۡنِ ؕ وَ کَانَ الشَّیۡطٰنُ لِرَبِّهٖ کَفُوۡرًا
"নিশ্চয়ই অপচয়কারি শয়তানের ভাই; আর শয়তান তার প্রভুর প্রতি অকৃতজ্ঞ।" (আল ইশরা, ১৭:২৭)
وَ هُوَ الَّذِیۡۤ اَنۡشَاَ جَنّٰتٍ مَّعۡرُوۡشٰتٍ وَّ غَیۡرَ مَعۡرُوۡشٰتٍ وَّ النَّخۡلَ وَ الزَّرۡعَ مُخۡتَلِفًا اُکُلُهٗ وَ الزَّیۡتُوۡنَ وَ الرُّمَّانَ مُتَشَابِهًا وَّ غَیۡرَ مُتَشَابِهٍ ؕ کُلُوۡا مِنۡ ثَمَرِهٖۤ اِذَاۤ اَثۡمَرَ وَ اٰتُوۡا حَقَّهٗ یَوۡمَ حَصَادِهٖ ۫ۖ وَ لَا تُسۡرِفُوۡا ؕ اِنَّهٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ০
"আর তিনি (আল্লাহ) যিনি লতাগুল্ম বিশিষ্ট আর লতা-বিশিষ্ট নয় এমন উদ্যানরাজি, খেজুর গাছ ও বিভিন্ন স্বাদের খাদ্যশস্য, একই ধরনের ও আলাদা ধরনের যায়তুন ও ডালিম সৃষ্টি করেছেন। যখন ফল ধরে তখন ফল খাও, আর ফসল তোলার দিন (নির্ধারিত ওশর ও অনির্ধারিত দানের মাধ্যমে) হক আদায় কর, অপচয় করো না, নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।" (আল আন'আম, ৬:১৪১)
প্রিয় নবী (সাঃ) বলেছেন: তোমরা খাও, পান কর, পরিধান কর এবং দান কর, তবে অপচয় ও অহংকার করো না। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, যা ইচ্ছা খাও, যা ইচ্ছা পরিধান কর, যতক্ষন না দু’টো জিনিস তোমাকে বিভ্রান্ত করে- অপব্যয় ও অহংকার। (সহীহ বুখারী, লেবাস: ১)
পানি অপচয়ের পক্ষে কোনো অজুহাত থাকতে পারে না। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর অন্যতম সাহাবী হযরত সাদকে অযু করার সময় থামিয়ে দিয়েছিলেন। কেননা সা'দ নামাজের জন্য ওযু করার সময় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করছিলেন। আল্লাহর রাসূল তাকে বললেন, "কেন এই অপচয় করছো?"
সা'দ (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন: "ওজু করার ক্ষেত্রেও কি অপচয় বিবেচ্য?"
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: "হ্যাঁ, এমনকি প্রবাহিত নদীর ধারে দাঁড়ালেও!" (হুনান ইবনে মাজাহ, তাহারাত অধ্যায়: ৪৮)।
সুবহানাল্লাহ। যদি আল্লাহর ইবাদত করার জন্য অযু করার সময়ও পানির অপচয় না করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে এটা স্পষ্ট যে, অন্য অবস্থায় অপচয় কখনই বরদাস্ত করা হবে না।
আল কুরআন: পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
অবতরণ ও সংরক্ষণ
মহান আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন তাঁর সর্বশেষ পথ-নির্দেশ পবিত্র কুরআনকে সম্পূর্ণভাবে একবারে অবতীর্ণ (নাযিল) করেননি। তিনি একে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) -এর প্রতি অল্প অল্প করে নাজিল করেছেন। মানুষ যাতে সহজে ও স্বাচ্ছন্দের সাথে ঐশী নির্দেশনাকে গ্রহণ ও উপলব্ধি করতে পারে এবং আল্লাহর নির্দেশকে সহজে মেনে চলে কল্যাণ লাভ করতে পারে সেজন্যেই তিনি এই পদ্ধতিতে কুরআন (ওহী) নাজিল করেছেন। সর্ব শক্তিমান আল্লাহ তাঁর বাণী বা ওহী ফেরেশতা জিবরাইল (আঃ)-এর মাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)'র নিকট নাজিল করতেন। মহানবীর(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনেক লিপিকর সাহাবী ছিলেন যারা তাঁর নির্দেশ অনুসারে তাঁর উপর নাজিলকৃত ওহী সমূহ লিপিবদ্ধ করে রাখতেন।
কোন কোন হিসাবে এই লিপিকরদের সংখ্যা ৬৫তে পৌঁছেছিল। যখন পবিত্র কুরআনের কিছু অংশ অবতীর্ণ হতো, তখন তিনি লেখকদের মধ্যে যাদের সহজে পাওয়া যেতো তাদের ডেকে পাঠাতেন এবং নাযিলকৃত ওহী লিখিত আকারে লিপিবদ্ধ করাতেন। তারা সেই সময়ের লেখার সরঞ্জাম দিয়ে নাজিল হওয়া আয়াতগুলো লিখে রাখতেন, তারপর তারা সেই লেখাগুলো আবার আল্লাহর রসূলকে (সা.) পাঠ করে শুনিয়ে পরীক্ষা করাতেন।
আল্লাহর রাসূল (সঃ) নাযিলকৃত আয়াতগুলো প্রথমে পুরুষদের এবং তারপর নারী সাহাবীদের কাছে পাঠ করতেন। মুসলমানরাও ওহী মুখস্থ করতেন এবং তাদের কেউ কেউ ওহীকে লিখে রাখতেন। দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে কোরআনের নাজিলকৃত আয়াত সমূহ পাঠ করা হতো। রমজান মাসে রাসুলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও জিব্রাইল (আঃ) পরস্পর পরস্পরকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। নবীজীর জীবনের শেষ বছরে তাঁরা দুবার এ কাজ করেছিলেন। এই আদান-প্রদানের সময় কিছু সাহাবীও উপস্থিত থাকতেন এবং কুরআন তিলাওয়াত অনুসরণ করতেন। মহানবী ও জিব্রাইলের (আঃ) চূড়ান্ত আদান-প্রদানের পর, হুজুর (সা.), যায়েদ বিন সাবিত ও উবাই বিন কাব (রাঃ) একে অপরের কাছে কুরআন পুনঃ উদ্ধৃত করতেন। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উবাই বিন কা’বকে দুবার পাঠ করে শুনিয়েছিলেন।
সর্বোপরি, আল্লাহর রাসূল (সা.) এবং তাঁর সাহাবীগণ কুরআন অনুশীলন, শিক্ষা ও প্রচারের জন্য নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। এভাবে, পবিত্র কুরআনকে গ্রন্থাকারে উপস্থাপনে জন্য সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল, যার প্রতিটি আয়াতের যাচাই (verified) সম্পন্ন করা হয়।
আল কুরআনের অলৌকিক বৈশিষ্ট্য
প্রত্যেক নবী তাঁর যুগের চাহিদা অনুযায়ী অনেক অলৌকিক কাজ করেছেন। হযরত ঈশা (আ.) সময়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিজ্ঞান ছিল চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিরা ছিলেন চিকিৎসক। এ কারণে, হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিকিৎসা বিষয়ক এমন সব অলৌকিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল যা এমনকি চিকিৎসকদেরকেও হতবাক করে দিয়েছিল। যেমন অন্ধদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা এবং মৃতদের জীবিত করা। হযরত মূসা (আঃ)-এর সময়ে যাদুবিদ্যার মাধ্যমে অসাধারণ কীর্তি সম্পন্ন করা হত; তাই তাকে যাদুবিদ্যায় এমন অলৌকিকতা দেওয়া হয়েছিল যা দেখে যাদুকররাও থ হয়ে গিয়েছিল। শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সময়ে আরবি ভাষা ও সাহিত্য দারুণ উৎকর্ষমণ্ডিত ও জনপ্রিয় হয়েছিল। এই কারণে, পবিত্র কুরআনকে ভাষাশৈলি, আরবি উচ্চারণ ও শৈল্পিক মাধুর্যতায় এমন অলৌকিকতা প্রদান করা হয় যা আরবি ভাষা ও সাহিত্যের সর্বকালের সেরা নিদর্শন হিসেবে গ্রাহ্যতা পায়। এছাড়া বাগ্মিতা ও সাবলীলতা, আইন প্রণয়ন, এতে থাকা তথ্য ও অজানা বিষয় প্রকাশের অনেক দিক দিয়ে আল কুরআন এক মহা বিষ্ময়কর অলৌকিক ঘটনা। পৌত্তলিকরা যখন কুরআনে বিশ্বাস করেনি, তখন আল্লাহতায়ালা তাদের চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তিনি তাদের সাহায্যের জন্য সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা তাকে ডাকতে বলেছিলেন এবং এর অনুরূপ একটি গ্রন্থ রচনা করার অথবা নিদেনপক্ষে একটি অংশ রচনার আহবান জানিয়ে ছিলেন:
وَ اِنۡ کُنۡتُمۡ فِیۡ رَیۡبٍ مِّمَّا نَزَّلۡنَا عَلٰی عَبۡدِنَا فَاۡتُوۡا بِسُوۡرَۃٍ مِّنۡ مِّثۡلِهٖ ۪ وَ ادۡعُوۡا شُهَدَآءَکُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ﴿۲۳﴾ فَاِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلُوۡا وَ لَنۡ تَفۡعَلُوۡا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِیۡ وَقُوۡدُهَا النَّاسُ وَ الۡحِجَارَۃُ ۚۖ اُعِدَّتۡ لِلۡکٰفِرِیۡنَ ﴿۲۴﴾
“আর আমি আমার বান্দার প্রতি যা নাযিল করেছি সে ব্যাপারে যদি তোমাদের সন্দেহ থাকে, তাহলে অনুরূপ একটি সূরা আন। এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের সাক্ষী বা সাহায্যকারীদের (যদি কেউ থাকে) ডাক, যদি তোমাদের (সন্দেহ) সত্য হয়। কিন্তু যদি তোমরা তা না পারো - এবং নিশ্চিতভাবে কখনো পারবে না - তাহলে সেই আগুনকে ভয় কর যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রত্যাখ্যানকারীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।" (আল-বাকারা, ২:২৩-২৪)
"এবং নিশ্চিতভাবে তোমরা পারবে না" অভিব্যক্তিটি এমন আশ্বাস এবং নিশ্চিততার অনুভূতিকে নির্দেশ করে যে এই ধরনের রায় কেবল একজন সম্পূর্ণ ও ত্রুটিহীন সত্তাই করতে পারেন যার জ্ঞান এবং ক্ষমতা সীমাহীন, তিনি হলেন আল্লাহ। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ ভবিষ্যতের সাথে সম্পর্কিত এমন কিছুর বিচার করতে পারেন না যা মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে অজানা, অর্থাৎ অনিশ্চিত ও দুঃসাধ্য।
অবিশ্বাসীরা আল্লাহর এই বাণী শুনেছিল যা তাদের অক্ষমতাকে প্রকাশ করে এবং এই কথগুলো তাদের তাড়িত করতো, তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দিত, কিন্তু তারা কিছুই করতে পারেনি। এই আয়াতটি তাদের দুর্বলতার কথা কণ্ঠ থেকে কণ্ঠে এবং দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে দিয়েছে, তাদের অক্ষমতাকে চূড়ান্তভাবে তুলে ধরেছে এবং কার্যত তাদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
যেহেতু পৌত্তলিকরা কুরআনের চ্যালেঞ্জে সাড়া দিতে পারেনি, তাই পরিবর্তে তারা আক্রমণাত্মক উপায় অবলম্বন করেছিল। যেমন বাধা প্রদান, উস্কানি দেয়া, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ও অপবাদ দেয়া। তারা বলতো -
وَ قَالَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَا تَسۡمَعُوۡا لِهٰذَا الۡقُرۡاٰنِ وَ الۡغَوۡا فِیۡهِ لَعَلَّکُمۡ تَغۡلِبُوۡنَ ﴿۲۶﴾
"এই কুরআন শুনবে না, বরং এটি পাঠের সময় শোরগোল করবে, যাতে তোমরা জয়ী হতে পার!" (ফুসসিলাত, ৪১:২৬)
মূলত এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা আল্লাহর কুতরতের কাছে আবারও তাদের নৈতিক পরাজয়ের পূর্ণতার বার্তা প্রকাশ করেছিল।
মহামহিম আল্লাহ তায়ালার বাণী পবিত্র কুরআন কোন কবিতাও নয় বা গদ্যও নয়। বরং এর একটি অতুলনীয় নিজস্ব ভাষাশৈলী রয়েছে যা কবিতা ও গদ্য উভয়ের সৌন্দর্য ও সক্ষমতাকে সমন্বিত করে। এর এমন একটি সৌন্দর্য রয়েছে যা কবিতা বা সঙ্গীতে পাওয়া যায় না; এটি সম্পূর্ণ আলাদা। এ কারণেই এটি বারবার আবৃত্তি করলেও কোন একঘেয়েমি অনুভূত হয় না, বরং পাঠক ও শ্রোতাদের প্রত্যেকে এর ধ্বনি মাধুর্য থেকে সমান প্রশান্তি ও অনুগ্রহ লাভ করে যা ক্রমাগত পরিবর্তিত এবং সতেজ হয়ে ওঠে।
কুরআন মানুষের হৃদয়কে প্রভাবিত করে। এমনকি যে পাষণ্ড পৌত্তলিক কুরাইশ নেতারা মানুষকে কুরআন শুনতে বাধা দিত তারাও একে অপরকে না জানিয়ে রাতের আঁধারে গোপনে আল্লাহর রসূল (সা.)'র কণ্ঠে কুরআন আবৃত্তি শুনতে আসতো; যখন তিনি সালাত আদায় ও কুরআন তিলাওয়াত করতেন। ঐ কুরাইশ নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল আবু সুফিয়ান, আবু জাহেল এবং আহনেস বিন শারিক।
যখন তারা একে অপরের সাথে মুখোমুখি হত তখন তারা পরষ্পরকে নিন্দা করত ও এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি না করার অঙ্গীকার করতো। কিন্তু তারপরও তিন রাত পর্যন্ত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। অবশেষে তারা পরষ্পরকে বলল: “আচ্ছা, আমরা আমাদের এই ঘটনা কাউকে বলব না। মানুষ যদি আমাদের অবস্থা জানতে পারে, তাহলে আল্লাহর কসম, আমরা চরমভাবে লাঞ্ছিত হব! এর পরে, আমরা কখনই এই বিষয়ে কাউকে প্রভাবিত করতে পারব না! .." তারা যা করেছিল তার নিন্দা করার পর তারা নিজেদের মধ্যে সম্মত হয়েছিল যে তারা আর কখনো আড়ি পেতে কুরআন আবৃত্তি শুনতে আসবে না।
পবিত্র কোরান সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থ, তাই এর আহবান স্থান কাল নির্বিশেষে সব ধরনের মানুষের প্রতি, যদিও তারা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ও স্থানে বাস করে এবং তাদের সামর্থের স্তর অনুসারে জ্ঞানের মাত্রাও অনেক আলাদা। কিন্তু পবিত্র কুরআন এই ভিন্ন ভিন্ন সময়, স্থান ও উপলব্ধির সব মানুষকে স্রষ্টার বাণীকে নিজ নিজ পরিস্থিতি ও উপলব্ধির মাত্রা অনুসারে উপলব্ধির জন্য জায়গা করে দেয়। একটি আয়াত যেমন প্রথম প্রজন্মের মানুষেরা তাদের পরিস্থিতি অনুসারে বুঝতে পারে, তেমনি পরবর্তী প্রজন্মও উন্নত বৈজ্ঞানিক স্তরে পৌঁছে তাদের উপলব্ধির মাত্রা অনুসারে এই মহান ঐশ্বরিক নিদর্শনকে উপলব্ধি করতে পারে। এই বিষয়ে, মহান আরব লেখক মুস্তফা সাদিক আর-রাফী বলেছেন: "পবিত্র কুরআনের একটি অলৌকিকতা হল এটি প্রতিটি ঐতিহাসিক যুগের পরিচিত শব্দের মধ্যে, প্রতিটি যুগের কাছে অজানা সত্য সমূহ সংরক্ষণ করে; যা তাদের উপযুক্ত সময়কে আলোকিত করে।’’ (Wahy ul Kalem, Kuwait ts., II, 66)
ক. অজানা সম্পর্কে জানায়:
পবিত্র কুরআন আমাদেরকে সেসব তথ্য সম্পর্কে অবহিত করে যে সম্পর্কে আমরা জানতাম না। এই তথ্যটি আমাদেরকে যা অবহিত করে সেটি একটি স্পষ্ট অলৌকিক ঘটনা। যদিও এটি ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে ভবিষ্যতে ঘটবে এমন অনেক ঘটনার পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং বৈজ্ঞানিক বিষয়কেও স্পর্শ করে। এ বিষয়গুলোকে গত ১৪ শ' বছরের কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই খণ্ডন করতে পারেনি। যদিও বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত এনসিক্লোপিডিয়াগুলোকেও সময় সময় অতিরিক্ত ভলিউম সংযুক্ত করে এবং পুরানোগুলোকে সংশোধন করে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও পুনর্লিখন করতে হয়েছে।
পবিত্র কুরআন নাযিল হওয়ার সময়কালে আদ ও সামুদ জাতির ধ্বংসের এবং নূহের বন্যার তথ্যের অংশ সমূহ শুধুমাত্র মিথের আকারে ছিল। যদিও পবিত্র কুরআন এই সত্যগুলো মানুষের কাছে এমন একটি আকারে উপস্থাপন করেছে যাকে বর্তমান ঐতিহাসিক জ্ঞান ও ইতিহাসের দর্শন স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছে। আল কুরআন ভবিষ্যত সম্পর্কিত সংবাদও অবহিত করেছিল যা পরবর্তী কালে সত্য বলে প্রমাণিত হয়। আসুন এর মধ্যে কয়েকটি উদ্ধৃত করা যাক:
রোমান ও জরথুষ্ট্রীয়দের মধ্যে একটি যুদ্ধ হয়েছিল যাতে জরথুষ্ট্ররা জিতেছিল। পৌত্তলিকরা যারা এই সুযোগটি কাজে লাগাতে চেয়েছিল তারা মুসলমানদের বলল, “তোমরা ভেবেছিলে ঐশী কিতাবের কারণে তোমরা বিজয়ী হবে? দেখো, জরথুষ্ট্রিয়ানরা কিতাবধারী রোমানদেরকে পরাজিত করেছে।” এভাবে পৌত্তলিকরা মুসলিমদের বিশ্বাস ও দৃঢ়তা ভাঙার চেষ্টা করেছিল। তখন মহান আল্লাহ নিম্নলিখিত আয়াত সমূহ নাজিল করেন, যা বিশ্বাসীদের আনন্দিত করেছিল ও পৌত্তলিকদের মুখকে মলিন করেছিল:
"আলিফ লাম মীম। রোমান সাম্রাজ্য কাছাকাছি একটি ভূখণ্ডে পরাজিত হয়েছে; কিন্তু এই পরাজয়ের পর তারা শীঘ্রই কয়েক বছরের মধ্যে বিজয়ী হবে। অতীত ও ভবিষ্যতের ফয়সালা আল্লাহর হাতে: সেদিন মুমিনগণ আল্লাহর সাহায্যে আনন্দিত হবে। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন, তিনি পরাক্রমশালী, পরম করুণাময়।" (আর-রুম , ৩০:১-৫)
অবশেষে মহান আল্লাহ তাঁর ওয়াদা পূরণ করলেন। ইতিহাসবিদদের সর্বসম্মত বর্ণনা মতে, নয় বছরেরও কম সময়ের মধ্যে রোমানরা পারস্য সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে। একই দিনে, পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে বদর যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে মুসলমানরাও আনন্দিত হয়েছিল।
সেই সময়ে বাইজেন্টিয়াম শহর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে, এমন বিধ্বংসী পরাজয়ের পর তাদের আবার জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কেউ খুঁজে পেত না। কিন্তু পবিত্র কুরআন দৃঢ়ভাবে বলেছে:
“(এটি) আল্লাহর ওয়াদা। আল্লাহ কখনো তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যান না, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ বোঝে না।” (আর-রুম, ৩০:৬)
ফেরাউনের লাশের কথা তো বলাইবাহুল্য, কুরআন সে সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করেছিল ১৪ শ বছর আগে। লোহিত সাগরে নিমজ্জিত হওয়ার পর যখন সে বুঝতে পারল যে বাঁচার আর কোন উপায় নেই, তখন সে বলে যে সে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে। তখন মহান আল্লাহ ডুবে যাওয়া ফেরাউনকে বললেন - “আজ আমরা তোমার লাশকে সংরক্ষণ করব, যাতে তুমি তোমার পরের লোকদের জন্য নিদর্শন হতে পার! কিন্তু নিঃসন্দেহে মানবজাতির মধ্যে অনেকেই আমার নিদর্শন সমূহ সম্পর্কে গাফেল!” (ইউনুস, ১০:৯১-৯২)
সম্প্রতি তার লাশ আবিষ্কৃত হয়েছে। এখন লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ৯৪ তম হলে এই মৃতদেহ শায়িত আকারে, এর চুল ও ত্বক অক্ষত অবস্থায় পরিদর্শন করা যায়।
খ. আল কুরআন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের উপর আলোকপাত করে:
পবিত্র কুরআনে অনেক আয়াত রয়েছে যা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও আবিষ্কারের উপর আলোকপাত করে। এই আয়াতগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও অবহিত করে। ইসলামের প্রধান লক্ষ্য হল মানুষের অন্তরে আল্লাহর একত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদেরকে সঠিক পথের দিশা দেয়া। প্রকৃতপক্ষে, এটি এই প্রধান লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিবেচনা করে সমস্ত বিষয় উপস্থাপন করে। যাইহোক, পদার্থ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এটি যে তথ্য দেয় তা মানবতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসাবে কাজ করে এবং নিম্নলিখিত উদাহরণগুলো থেকে বুঝা যায় এটি পরিচিত সত্যগুলোর সাথে সম্পূর্ণরূপে সম্মতি প্রদান করে ।
পবিত্র কুরআন প্রজনন ও ভ্রূণ গঠনের বিষয়ে কিছু মূল তথ্য উপস্থাপন করে, যা আধুনিক বিজ্ঞান অতি সম্প্রতি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। প্রফেসর ড. কিথ এল. মুর ভ্রূণবিদ্যার উপর তার ভ্রূণবিদ্যার বইতে গর্ভে মানব ভ্রূণের পর্যায়সমূহ ব্যাখ্যা করার পর সেগুলো পবিত্র কুরআনের আয়াতের বর্ণনার সাথে তুলনা করেছেন। তিনি উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, বিজ্ঞান পবিত্র কুরআনের সাথে একমত, এমনকি, কোরান যেভাবে উদাহরণ ও বর্ণনা দিয়েছে, তাতে এই ঐশীবাণী চিকিৎসা বিজ্ঞানের চেয় বেশি এগিয়ে রয়েছে। তার গবেষণার পর, মুর কুরআন এবং মহানবী (সা.)-এর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধা অনুভব করেন এবং তিনি ১৪ শ' বছর আগের কুরআনের এই অলৌকিকতাকে অত্যন্ত বিশ্বাসের সাথে স্বীকার করেন। তিনি কুরআন থেকে যে তথ্য শিখেছেন তা তার বই Before We are Born -এর দ্বিতীয় সংস্করণে যোগ করেছেন। যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, "আপনি কিভাবে কুরআনে এই তথ্যের অস্তিত্বকে ব্যাখ্যা করবেন?" তিনি উত্তরে বলেন, "কোরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ প্রত্যাদেশ ছাড়া আর কিছুই নয়।"
সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে সক্ষম হন যে, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং গ্যালাক্সিগুলো প্রচণ্ড গতিতে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই আবিষ্কার অনুসারে বুঝতে পারা যায় যে, মহাবিশ্ব এক অসীম শক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন। সে কারণেই অতিকায় গ্যালাক্সি সমূহ পরস্পর থেকে তাদের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব অনুসারে আরও বেশি দূরে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ, আমাদের থেকে ১০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে থাকা একটি গ্যালাক্সি সেকেন্ডে ২৫০ কিলোমিটার বেগে আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, একইভাবে আমাদের থেকে ১০ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্যালাক্সি প্রতি সেকেন্ডে ২৫০,০০০ কিলোমিটার বেগে দূরে চলে যাচ্ছে। পবিত্র কু-রানে এই পরিস্থিতির প্রতিটিকেই নিম্নরূপভাবে নির্দেশ করা হয়েছে: "আমি আকাশ নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতা বলে এবং আমি অবশ্যই মহাসম্প্রসারণকারী," (আয-যারিয়াত ), ৫১:৪৭)
মহিমান্বিত স্রষ্টা পৃথিবীকে নক্ষত্রের টুকরো (উল্কা) থেকে রক্ষা করেন যখন তারা তাদের আয়ুকাল সম্পূর্ণ করার পর বিস্ফোরিত হয়। সৌরজগতের দুটি গ্রহ বৃহস্পতি (এর বিশাল মাধ্যাকর্ষণ সহ) ও শনি দারোয়ানের অবস্থানে রয়েছে যারা পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকর এমন অনেক মহাজাগতিক কাঠামোকে ফিরিয়ে দেয়। কখনও কখনও, কিছু উল্কা যারা এই দুটি গ্রহের উপর দিয়ে চলে যায় এবং আমাদের পৃথিবীর কাছে আসতে পারে। তখন তাদের জন্য আরেকটি প্রহরী অপেক্ষা করছে, অর্থাৎ চাঁদ। যেহেতু এটির কোনো বায়ুমণ্ডল নেই, তাই চাঁদে পতিত সমস্ত উল্কা এর পৃষ্ঠকে প্রভাবিত করে। আমরা এমনকি ছোট এক জোড়া দূরবীন দিয়েও তাতে এমন সব গর্ত দেখতে পাই যা এই উল্কা পতনের ফলে তৈরি হয়েছে। আবার যে উল্কাগুলো চাঁদকে পাশ কাটিয়ে পৃথিবীর দিকে আসতে শুরু করে তারা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার সময় জ্বলতে শুরু করে; যদি না তারা খুব বড় হয়। এই ঘটনার ফলস্বরূপ, উল্কাগুলো (যাকে আমরা "শ্যুটিং স্টার"ও বলি) পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছানোর আগেই মেসোস্ফিয়ার স্তরে ধূলিকণার মত সামান্য কণাতে বিভক্ত হয়ে যায়। তারপর, এই ধূলিকণাগুলোর প্রত্যেকটিই আকারে এক ফোঁটা বৃষ্টির সাথে তুলনীয় বীজে পরিণত হয়। একইভাবে বায়ুমণ্ডল মহাকাশ থেকে আসা ক্ষতিকারক রশ্মি থেকেও পৃথিবীকে রক্ষা করে। কুরআন মজীদে এই সত্যগুলোকে এভাবে তুলে ধরা হয়েছে:
“আর আমি আকাশকে তৈরি করেছি সুরক্ষিত ছাদ স্বরূপ, কিন্তু এ সবের নিদর্শন থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়।” (আল-আম্বিয়া' , ২১:৩২)
এইভাবে পবিত্র কুরআন একদিকে সেই সত্য সমূহের বর্ণনা করে যা মানুষের ক্রিয়াকলাপ ও আচরণকে নির্দেশ করে; অন্যদিকে, মহাবিশ্বের রহস্য সমূহের প্রতিও নির্দেশ করে এটিকে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থের মতো পড়ার আহবান জানায় যাতে মানুষ মহাবিশ্বের রহস্য সমূহকে জানতে পারে; গবেষণা ও প্রকাশ করতে পারে।
চৌদ্দ শতাব্দী আগে পবিত্র কুরআন ঘোষণা করে: "আর আমি বায়ুকে ঊর্বরকারীরূপে প্রেরণ করি, অতঃপর আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা তোমাদের পান করাই। তবে তোমরা তার সংরক্ষণকারী নও।" (আল-হিজর, ১৫:২২)
এই আয়াতটি নাযিল হওয়ার কয়েক শত বছর পরে এটি আবিষ্কৃত হয় যে, বাতাস গাছপালা ও মেঘকে উর্বর করে।
সূরা আর-রহমান এর ১৯ ও ২০ তম আয়াতে বলা হয়েছে যে- "তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়। উভয়ের মধ্যে রয়েছে এক আড়াল যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।"
সূরা ফুরকানের ৫৩তম আয়াতেও অনুরূপ অভিব্যক্তি রয়েছে।
জিব্রাল্টার প্রণালীতে, যেখানে ভূমধ্যসাগর ও এটলাস মহাসাগর মিলিত হয়েছে, সেখানে সর্বশেষ আবিষ্কারে দেখা গেছে, একটি অজানা বাধা, অদেখা অন্তরাল রয়েছে, যা পানিকে পরস্পর মিশে যেতে বাধা দেয়। এইভাবে, দুই সাগরের দুই রং ও বৈশিষ্ট্যের পানি একে অপরের সাথে মিশে না এবং দুই সাগরের পানিই তাদের মূল বৈশিষ্ট্য রক্ষা করে চলছে। ক্যাপ্টেন জ্যাক কৌস্টো পরবর্তীতে আবিষ্কার করেন যে, বিভিন্ন কাঠামো সহ সমস্ত সমুদ্রের মিলনস্থলে একই ধরনের অন্তরাল বিদ্যমান।
পবিত্র কোরানের আরও বড় অলৌকিকত্ব হলো, এতে যে বিধান দেয়া হয়েছে তা সমস্ত যুগের চাহিদা পূরণ করে। এতে এমন কোন ঘাটতি বা অপ্রাসঙ্গিকতা নেই যা কারো বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। এতে এমনকি সেসব সমস্যারও সমাধান রয়েছে যা অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইসলাম যে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে তা ছিল জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ। এটি এমন এক মহৎ সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্থাপন করে যা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বর্জিত একটি জাতিকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সভ্যতার শিখরে নিয়ে যায় যা অন্য আর কোন সভ্যতার ক্ষেত্রে দেখা যায় না। বিশেষ করে এই আমূল পরিবর্তনটি হয়েছিল এমন একজন নবীর মাধ্যমে যিনি ছিলেন নিরক্ষর এবং যিনি কখনো কোন বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাননি।
বস্তুত, সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থ পবিত্র কুরআনের নিখুঁত নির্দেশনার কল্যাণেই তিনি মাত্র মাত্র ২৩ বছর সময়ের মধ্যে পুরো আরব উপদ্বীপের মানুষের নৈতিকতা ও মন-মানসিকতাকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়ে একটি পরিপূর্ণ সুশীল, মানবিক ও সুশৃঙ্খল সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন।
চতুর্থ অধ্যায়
রহমতের নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স.)
১. শৈশব ও যৌবন
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে, ইসলামিক চান্দ্র মাস রবিউলওয়ালের ১২ তারিখ সোমবার সকালে পবিত্র নগরী মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর পিতা ও মাতা উভয় পক্ষেই কুরাইশ গোত্রের সবচেয়ে সম্মানিত পরিবারভুক্ত।
আল্লাহর রসূল (সাঃ)-এর শৈশব ও যৌবন কেটেছে পবিত্রতা ও নৈতিক উচ্চতায় যা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পক্ষে যথাযথ প্রতিফলন ঘটায়। তিনি কিছু সময়ের জন্য রাখাল ছিলেন। এরপর তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ব্যবসায় সততা ও ন্যায়পরায়ণতার জন্য সমাদৃত হন এবং আস্থা, সম্মান ও শ্রদ্ধা লাভ করেন।
আল্লাহর রসূল (সাঃ) ছিলেন তাঁর জাতির মধ্যে পূণ্যের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ, বংশের দিক থেকে সবচেয়ে সম্মানিত এবং নৈতিকতার দিক থেকে সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি প্রতিবেশীদের অধিকারকে সবচেয়ে বেশি সম্মান করতেন, সবচেয়ে নম্র, অনুগত ও বিশ্বস্তত ছিলেন। তিনি মানুষের প্রতি খারাপ আচরণ ও কারও ক্ষতি করা থেকে দূরে থাকতেন। এমনকি তিনি কারও নিন্দা করেছেন বা কাউকে তিরস্কার করেছেন বা কারো সাথে ঝগড়া করেছেন এমনটাও কখনো দেখা যায়নি।
আসলে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তার মধ্যে সমস্ত উন্নত মানবিক গুণ-বৈশিষ্ট সন্নিবেশিত করেছিলেন। তাঁর সততা ও বিশ্বস্ততার স্বীকৃতি স্বরূপ তার গোত্র তাকে "মুহাম্মদ আল আমিন" বলে ডাকতো যার অর্থ মুহাম্মদ বিশ্বস্ত। এমনকি পরবর্তীকালে, পৌত্তলিকরা তাদের গোত্রের অন্য লোকদের পরিবর্তে আল্লাহর রাসূলের নিকট তাদের মূল্যবান জিনিস আমানত রাখতো।
যখন কাবা মেরামত করা হচ্ছিল তখন লোকেরা আল-হাজার-উল-আসওয়াদকে (কাবার পবিত্র কালো পাথর) তার জায়গায় পুনঃস্থাপন করার সম্মান ও গৌরব কে লাভ করবে তা নিয়ে মতানৈক্য করেছিল, তখন তারা সর্বজনপ্রিয়, আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদকে (সাঃ) সালিসকারী হিসাবে মেনে নিয়েছিলো। তখন তিনি প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে প্রতিনিধি নিলেন, তারপর একটি কাপড়ের মাঝখানে সেটিকে স্থাপন করে প্রত্যেক গোত্রপতিকে বললেন নিজ নিজ গোত্রের পক্ষ হয়ে কাপড়ের একটি কোণে ধরে উঁচু করে পাথরটিকে তার নিজ স্থানে নিয়ে যেতে। এরপর তিনি স্বহস্তে পাথরটিকে নামিয়ে যথাস্থানে পুনস্থাপন করলেন। তাঁর এই ব্যবস্থাপনায় সকলেই খুশি হলো। এভাবে তিনি আল্লাহর ইচ্ছায় একটি বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান দিয়ে মক্কার লোকদেরকে একটি বড় ধরনের সংঘাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।
আল্লাহর রসূলের (সা.) বয়স যখন পঁচিশ বছর তখন মক্কার অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত মহিলা খাদিজা তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তিনি আল্লাহর রাসূলের বিশ্বস্ততা ও আমানতদারিতে মুগ্ধ ও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। যদিও তিনি বয়সে আমাদের নবীর চেয়ে পনের বছরের বড় ছিলেন এবং তিনি সন্তানসহ বিধবা ছিলেন; তা সত্তেও মহানবী (সাঃ) তার প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং তার সাথে একটি অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও নির্মল পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবন প্রতিষ্ঠা করেন যা মানবতার জন্য একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। তাঁর বিবাহের প্রথম চব্বিশ বছর; অন্যভাবে বললে তাঁর পুরো যৌবনকালটাই কেবলমাত্র হযরত খাদিজার (আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট) এর সাথেই কেটেছিল। একইভাবে, পরবর্তী পাঁচ বছর মহানবীর দ্বিতীয় স্ত্রী হযরত সাওদার সাথেই কেটে যায়, তিনিও একজন বিধবা মহিলা ছিলেন। তাঁর পরবর্তী সমস্ত বিবাহও মানবিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যের উপর নির্ভরশীল। যদি এটি সত্য হত যে, (যেমনটি কেউ কেউ দাবি করে থাকে) তাঁর বিবাহের কারণ ছিল লালসা; তাহলে আল্লাহর রসূল (সাঃ) তাঁর জীবনের সবচেয়ে তারুণ্যদীপ্ত ও সবচেয়ে উদ্যমী সময়টা এমন একজন বিধবার সাথে অতিবাহিত করতেন না যার সন্তান ছিল এবং তার বয়সও ছিল তাঁর থেকে পনেরো বছরের বড়।
২. নবুওয়াতের সময়কাল
অবশেষে যখন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)’র বয়স চল্লিশ বছর হলো তখন আল্লাহতায়ালা তাঁকে নবুওয়াত দান করে ওহি (প্রত্যাদেশ) অবতীর্ণ করে নির্দেশনামা জারি করলেন, “পড়! তোমার প্রভূ ও পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।' (সূরা আলাক:১)
আল্লাহর দিকে আহবান করার প্রথম দিকে, আল্লাহর রসূল (সাঃ) সাফা পাহাড়ের একটি উঁচু পাথরের উপর থেকে কুরাইশ গোত্রের লোকদের সম্বোধন করে বললেন: “হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে এই পাহাড়ের ওপাশে বা ওই উপত্যকায় অশ্বারোহী শত্রু সৈন্যরা তোমাদেরকে আক্রমণ করার, তোমাদের সম্পত্তি দখল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাহল কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে?"
তারা বিনা দ্বিধায় সমস্বরে বলল: "হ্যাঁ আমরা আপনাকে বিশ্বাস করব কারণ এখন পর্যন্ত আমরা আপনাকে সবসময় সত্য বলতে শুনেছি। আমরা আপনাকে কখনো মিথ্যা বলতে শুনিনি! তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘোষণা করলেন, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত পুরুষ, আল্লাহর নবী ও রাসূল। অত্যন্ত আবেগের সাথে তিনি লোকদের বলেন, যে তার কথায় বিশ্বাস করবে এবং আল্লাহর আদেশ অনুসরণ করে সৎ জীবনযাপন করবে তাকে পরকালে অফুরন্ত পুরস্কার প্রদান করা হবে। আর যারা অবিশ্বাস করবে তারা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে। তিনি তাদের জানিয়ে দিলেন যে, পরকালের জীবন অন্তহীন এবং এই পৃথিবীতে থাকতেই পরকালের সেই অন্তহীন জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। কিন্তু তিনি শীঘ্রই দেখতে পেলেন যে, লোকেদেরকে তাদের ভুল বিশ্বাস থেকে দূরে সরিয়ে আনা খুবই কঠিন। (সহিহ বুখারী:৪৭৭০)
আল্লাহর রসূল (সাঃ) সেদিনের পর শত নির্যাতন-নিপীড়ন সত্ত্বেও তাঁর সম্প্রদায়কে সত্যের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন গাফিলতি করেননি। তিনি দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতেন, হজ্জ যাত্রীদের দলে ও বাজারে যেতেন এবং প্রতিটি সুযোগে মানুষকে সঠিক পথে ডাকতেন। তিনি কখনই এসব নিয়ে বিরক্ত বা অধৈর্য হতেন না, তিনি একই সত্য বারবার বলতেন, এমনকি এমন লোকদের কাছেও যেতেন যারা তার প্রতি অত্যন্ত শত্রুভাব্রাপন্ন ছিল। লোকেদেরকে বলতেন, "আমি এর (কোরআন) জন্য তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই না এবং আমি প্রতারকও নই।" তিনি লোকদের জানান যে, তিনি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দ্বীনের প্রচার করছেন।
আল্লাহর রসূল (সাঃ) তাঁর সময়ের অনেকের মতই নিরক্ষর ছিলেন, তিনি পড়তে বা লিখতে জানতেন না। সুতরাং, তার পক্ষে এটা অসম্ভব ছিল যে তিনি যা বলছিলেন (অর্থাৎ আল্লাহর কালাম আল কুরআন) তা অন্য কোন মানুষের কাছ থেকে তা শিখেছিলেন বা কোন বই পড়ে সেখান থেকে বলছিলেন। আসলে একজন নিরক্ষর ব্যক্তির পক্ষে এভাবে হঠাৎ করে সর্বোচ্চ স্তরের ভাষাশৈলী ও বাগ্মীতার মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে শুরু করা একেবারেই অসম্ভব। সে সময় তাঁর শত্রুরাও বিষয়টা জানত ও স্বীকার করতো যে এটা কেবলমাত্র ঐশী অলৌকিক বাণী বা প্রত্যাদেশ হওয়াই সম্ভব।
পৌত্তলিকরাও আমাদের মহান নবীর নৈতিকতার প্রশংসা করত। তারা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করত যে তিনি মিথ্যা বলছেন না। কিন্তু তারা অন্যায়ভাবে লাভ করা পার্থিব সুবিধা বা কামনা-বাসনা ত্যাগ করতে ইচ্ছুক ছিল না। একদিন, আল্লাহর রসূলকে (সাঃ) আবু জাহেল ও তার বন্ধুরা পথিমধ্যে থামালো; যারা ছিল তাঁর চরম শত্রু। তারা বলল, “হে মুহাম্মদ! আল্লাহর কসম আমরা আপনাকে মিথ্যাবাদী মনে করি না, আপনি আমাদের মধ্যকার একজন অত্যন্ত সত্যবাদী মানুষ। তবে, আমরা আপনার আনা আয়াতগুলোকে অস্বীকার করছি।”
পৌত্তলিকরা সর্বাত্মক চেষ্টা করতো যাতে আল্লাহর নবী তাঁর মিশন ছেড়ে দেন। তারা তাঁর প্রিয় চাচাকে দিয়েও চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছিল যাতে তিনি হস্তক্ষেপ করেন। তারা আল্লাহর রাসূলকে রাজত্ব, সবচেয়ে ধনী করে দেয়া ও আরবের সবচেয়ে সুন্দরী নারীর সাথে বিয়ে দেয়ার মতো লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে বলেছিল "আপনি যা চান তাই করতে আমরা প্রস্তুত।" আল্লাহর রসূল (সাঃ) স্পষ্ট ও অকপটে তাদেরকে জানিয়ে দেন: “আমি তোমাদের কাছ থেকে কিছুই চাই না; না মাল, না উপকরণ, না রাজ্য, না নেতৃত্ব! আমি যেটা চাই তা হল: তোমরা পৌত্তলিকতা ত্যাগ কর এবং একমাত্র আল্লাহর হুকুম মেনে চলো যিনি এক ও অদ্বিতীয়!" (ইবনে কাছির, আল বিদায়া, ৩য় খণ্ড, ৯৯-১০০)।
পৌত্তলিকরা যখন বুঝতে পেরেছিল যে তারা আল্লাহর রসূলকে আপোষের পথে আনতে পারবে না, তখন তারা শত্রুতার পথ বেছে নিল। দিন দিন তারা মুসলমানদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন বাড়িয়ে দিল। তাদের নির্যাতনে বাধ্য হয়ে সেসময় কিছু মুসলমান ইথিওপিয়ায় হিযরত করতে বাধ্য হয়; যেটি তখন একটি সুশাসনের অধীনে ছিল।
পৌত্তলিকরা মক্কার সব মুসলিম ও তাদের সহযোগী বনু হাশিম (নবীর গোত্র)-কে বয়কট করে তাদের সাথে বিবাহ ও সামাজিক লেনদেন সহ সমস্ত মানবিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। মুসলমানদের বিপক্ষে পৌত্তলিকদের এই সম্মিলিত বয়কটের বিষয়টি তারা একটি লিখিত চুক্তিতে লিপিবদ্ধ করেছিল যা তারা কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছিল। এই বয়কট ও নিষেধাজ্ঞা তিন বছর ধরে ক্রমবর্ধমান তীব্রতার সাথে অব্যাহত ছিল। এর ফলে খাবার ও নানাবিধ সংকটে মুসলমানদের জীবন তখন দূর্বিসহ হয়ে পড়েছিল।
নিজ শহরের লোকদের এমন নিষ্ঠুরতায় হতাশ হয়ে একদিন আল্লাহর রাসূল, যায়েদ বিন হারিসের সাথে মক্কা থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরে তায়েফ শহরে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে ১০ দিন অবস্থান করে তাকিফ গোত্রের নেতাদেরকে ইসলামের পথে আসার আহবান করেছিলেন, যাদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁর মায়ের দিকের আত্মীয়-স্বজনও ছিল। কিন্তু তারাও তাকে অপমান করে, অপদস্ত করে তাড়িয়ে দিল। এমনকি তারা তাদের ক্রীতদাস ও বখাটে যুবক ছেলেদেরকে আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) উপর লেলিয়ে দিল যারা তাকে মারধর করে, পথের দুপাশ থেকে বৃষ্টির মত পাথর ছুঁড়ে রক্তাক্ত করে দিল। এমনকি, তাঁর শরীর থেকে এমনভাবে রক্তের ধারা গড়িয়ে পরেছিল যে রক্তে তার পায়ে স্যান্ডেল আটকে গিয়েছিল। কিন্তু এই জঘন্য অপরাধের পরও রহমতের নবী তাদের অভিশাপ দেননি বরং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন এই বলে:
“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে নিজেকে সমর্পণ করছি, আমি শক্তিহীন হয়ে পড়েছি, আমি অসহায়, আমি মানুষের চোখে নিচু ও মূল্যহীন বলে বিবেচিত হচ্ছি। হে পরম করুণাময়! আপনি যদি আমার উপর অসন্তুষ্ট না হন তাহলে আমি কোন দুঃখ-কষ্টের পরোয়া করি না। হে আমার প্রভূ! আপনি তাদের সামনে সত্যকে উদ্ভাসিত করে দিন, তারা তো সত্যকে জানে না প্রভূ! হে আমার মালিক! আপনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি এখানে আপনার ক্ষমা চাই।" (ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় ২য় খণ্ড, ২৯-৩০; হাইথামি, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৩৫)।
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তায়েফ থেকে ফিরে আসার পর একদিন নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেন:
“আমি ফেরার পথে গভীর দুঃখে হাঁটছিলাম। কারনুল সেলিব নামক জায়গায় এসে নিজেকে আর টেনে নিতে পারলাম না। আমি তখন সেখানে মাথা তুলে দেখলাম একটা মেঘ আমাকে ছায়া দিচ্ছে। যখন আমি আরও মনোযোগ সহকারে তাকালাম তখন আমি জিব্রাইল (আঃ)-কে লক্ষ্য করলাম। জিব্রাইল আমাকে বললেন: 'আপনার লোকেরা আপনাকে যা যা বলেছে ও সুরক্ষা দিতে অস্বীকার করেছে তার সবই সর্বশক্তিমান আল্লাহ শুনেছেন। তিনি আপনার জন্য পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন, আপনি তায়েফবাসীদের ব্যাপারে যা চান তারা তাই করবে।’ তারপর, পর্বতের ফেরেশতা আমাকে সালাম দিয়ে বললেন: ‘হে মুহাম্মাদ!.. আল্লাহতায়ালা আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন আপনার আদেশ পালন করার জন্য। আপনি আমাকে কী করতে বলেন? আপনি চাইলে আমি এই দুই পাহাড় তাদের মাথায় ভেঙ্গে ফেলতে পারি।’ তারপর আমি বললাম: ‘না, আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তাদের রক্তের ধারা থেকে এমন বংশধরদের উত্থান ঘটান যারা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৭; মুসলিম: ১১১)
তায়েফের ঘটনার কয়েক দিন পর মদিনা থেকে একদল লোক এসে মুসলমান হয়ে যায়। তারা মদিনায় ইসলাম প্রচার শুরু করে। তারা আআল্লাহর রাসূলের কাছে একজন জ্ঞানী লোক পাঠানোর অনুরোধ করেন যিনি আল্লাহর কালাম সম্পর্কে ভাল জানেন। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যে মদীনায় এমন কোনো ঘর বাকি থাকেনি যেখানে ইসলাম প্রবেশ করেনি। অবশেষে, তারা আল্লাহর রসূলকে (সাঃ) মদিনায় আমন্ত্রণ জানায় এবং অঙ্গীকার করে যে তারা তাঁকে নিরাপত্তা দিবে।
৩. মাদানী যুগ
পৌত্তলিকদের অত্যাচার যখন অসহনীয় হয়ে উঠল, তখন আল্লাহর রাসূলের নির্দেশে সাহাবীরা গোপনে হিজরত করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে যখন প্রায় সব সাহাবীরা চলে গেলেন এবং হুজুর (সা.) প্রায় একা রয়ে গেলেন; তখন পৌত্তলিকরা পরিকল্পনা করলো আল্লাহর রাসূলকে হত্যা করার। এই জঘন্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করার জন্য তারা এক কুটকৌশলের আশ্রয় নিল। তারা মহানবীকে (সা.) হত্যা করার জন্য প্রতি গোত্র থেকে একজন ঘাতককে বেছে নিল যাদের সবাই এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিবে যাতে এককভাবে কোন গোত্রকে খুনের দায় নিতে না হয় এবং তাঁর আত্মীয়-স্বজনরা এই খুনের প্রতিশোধ বা ক্ষতিপূরণ নিতে চাইলে তাদেরকে একসাথে মক্কার সকল গোত্রের মুখোমুখি হতে হয়।
এভাবে হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য ঘাতকরা আবু জাহেলের নেতৃত্বে এক রাতে আল্লাহর রাসূলের বাড়ী ঘেরাও করে। এ অবস্থায় আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন তাঁর নবীকে ঐ রাতেই হিজরত করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ পেয়ে আল্লাহর রাসূল ঘর থেকে বের হন। তার আগে তিনি তাঁর কাছে গচ্ছিত কুরায়েশদের মূল্যবান আমানত সমূহ হযরত আলীর (রাঃ) কাছে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য তাকে ডাকেন এবং তাঁর কাছে অর্পিত জিনিসগুলি তাদের মালিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁকে তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে থাকতে বলেন। তিনি তাঁর প্রিয় সাহাবী হযরত আলী (রাঃ)’র হাতে নিজের চাদর দিয়ে বললেন, এটি গায়ে দিয়ে ঘুমিয়ে থাকো, ইনশাআল্লাহ তোমাকে কেউ ক্ষতি করতে পারবে না। তারপর তারা যখন আসবে তখন তাদের আমানত তাদেরকে ফিরিয়ে দিবে। ইতিমধ্যেই আমরা উল্লেখ করেছি, মক্কার লোকেরা তাদের মূল্যবান দ্রব্যাদি আল্লাহর রাসূলের কাছে আমানত হিসেবে গচ্ছিত রাখতো; কেননা তারা তাঁর আমানতদারী ও বিশ্বস্ততার কথা জানত।
এদিকে ঘাতক দল যখন আল্লাহর রাসূলের বাড়ি ঘেরাও করল তখন তারা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। এমন সময় প্রিয় নবী (সাঃ) মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে ঘর থেকে বের হলেন। তিনি দেখতে পেলেন কুরাইশ সরদাররা খোলা তরবারি হাতে তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে আছে। আল্লাহর রাসূল মোটেও ভয় পেলেন না। তিনি একমুঠ ধুলো নিয়ে তাদের দিকে ছড়িয়ে দিলেন এবং আল কুরআনের সুরা ইয়াসিনের প্রথম কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াত (আবৃত্তি) করতে করতে তাদের বেষ্টনীর ভেতর থেকে ধীরে সুস্থে নির্বিঘ্নে বেড়িয়ে গেলেন, অথচ তাদের কেউই তাঁকে দেখতে পেল না। এভাবে শেষনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) দীর্ঘ তের বছর তাঁর জন্মভূমি পবিত্র মক্কার অধিবাসীদেরকে সঠিক পথে আনার কঠিন সংগ্রাম করার পর মদীনায় হিজরত করতে বাধ্য হন।
আল্লাহর রাসূলের মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা জানতে পেরে সেখানকার মুসলমানরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল। প্রতিদিন মদিনার উপকণ্ঠে এসে আনসার ও মুহাজির নারী-পুরুষ ও শিশুরা উদগ্রীব হয়ে আল্লাহর রাসুলকে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করত। অবশেষে প্রিয়নবী (সাঃ) যখন মদিনায় পৌঁছুলেন তখন তারা ব্যপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবের মাধ্যমে আল্লাহর রাসুল ও তাঁর সাথীদের বরণ করে নেন। বস্তুত মদিনার পরিস্থিতি ছিল মক্কার সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানকার প্রধান দুই গোত্র আওস ও খাজরাজ সহ অধিকাংশ অধিবাসী মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। যে আওস ও খাজরাজ গোত্রের লোকেরা পরস্পরকে শত্রু মনে করত, বংশানুক্রমে যারা এতদিন হানাহানি, রক্তপাত ও যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, ইসলাম গ্রহণ করার কারণে এখন তারা একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ভাই হয়ে গেল। আর সত্য ধর্ম গ্রহণ করার কারণে মক্কার যে মুসলমানরা অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজেদের বাড়িঘর সহায়-সম্পত্তি ফেলে পালিয়ে মদিনায় আশ্রয় নিয়েছিল সেসব মুহাজিরকেও তারা ভাই বলে বুকে টেনে নিয়েছিল। আনসাররা তাদের মুহাজির ভাইদের জন্য তাদের দরজা খুলে দিয়ে বলেছিল, “এই যে আমার সম্পত্তি, অর্ধেক তোমাদের!” জবাবে মুহাজিরগণ যাদের অন্তর প্রশান্তির ভান্ডারে রূপান্তরিত হয়েছিল তারা এই বলে পরিপক্কতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিলেন: “তোমার সামগ্রী ও সম্পত্তি বরকতময় হোক, হে আমার ভাই! তুমি যদি আমাকে বাজারের পথ দেখাও তাহলেই যথেষ্ট।"
আল্লাহর রাসূল মুসলমানদের মধ্যে ভাতৃত্ববোধের সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করলেন।
সে সময় মদিনায় ইহুদিদেরও বসতি ছিল। তারা ছিল আহলে কিতাব বা কিতাবধারী (ঐশীগ্রন্থে বিশ্বাসী)। মদিনার মোট জনসংখ্যার তুলনায় তাদের অবস্থান নগণ্য হলেও ধর্মীয় কারণে তাদের একটা প্রভাব ছিল। আবার আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যেকার বিবাদের কারণেও তারা সুদী কারবারসহ নানাভাবে শুবিধা ভোগ করতো। কিন্তু মহানবীর আগমনে এবং আওস ও খাজরাজ গোত্র ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় তাদের প্রভাব অনেকটা কমে যায়।
আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় বসবাসকারী সকল অধিবাসী - মুসলিম (আনসার- মুহাজির) ও ইহুদীদের আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ করার তাগিদ অনুভব করে মদীনাকে একটি সুসংহত ও শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্রের রূপ দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। এ লক্ষ্যে সর্ব প্রথম তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি মূলনীতি বা সনদ তৈরি করলেন যা সকল পক্ষের সম্মতিতে লিখিত আকারে গৃহীত হয়েছিল এবং তাতে পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম লিখিত সনদ বা সংবিধান।
এদিকে মক্কার পৌত্তলিক কুরাইশরা বসেছিল না। মদীনায় মুসলমানরা আরও বেশি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নেতা মেনে নিয়ে মদীনাবাসী একটি নতুন রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেছে এটা জানতে পেরে তারা আরও বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো। এ কারণে আল্লাহর রাসূল মদীনায় হিজরতের পর মাত্র এক বছরের মাথায় মক্কার যুদ্ধবাজ নেতারা এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মদীনায় হামলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রটিকে অংকুরেই ধ্বংস করে দেয়া। তখন আল্লাহর রাসূলের নেতৃত্বে মদীনাবাসী নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কুরাইশদের মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নেন। যার কারণে মদীনার নিকটবর্তী বদর প্রান্তরে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে কুরাইশদের সৈন্য সংখ্যা মুসলমানদের তুলনায় তিন গুণ বেশি হওয়া সত্ত্বেও তারা শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়। এই যুদ্ধে আবু জেহেল ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতাসহ কোরাইশদের ৭০ জন সৈন্য নিহত হয়। উল্লেখ্য, বদর যুদ্ধে কুরাইশদের সৈন্য ছিল এক হাজার। তাদের সবাই ছিল সশস্ত্র, ঘোড়া, বল্লম, ঢাল, তলওয়ারে সুসজ্জিত। অন্যদিকে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন এবং অধিকাংশই ছিলেন নিরস্র। তাই মুসলমানদের হাতে এই পরাজয় ছিল কুরাইশদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। তারা কিছুতেই এটি মেনে নিতে পারছিল না। তাই বদর যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পরের বছরই তারা আবার মদীনায় আক্রমণ করে, সংঘটিত হয় ওহুদ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মুসলমানদের অনেক ক্ষতি হলেও হানাদার বাহিনী বিজয় লাভে ব্যর্থ হয়। এদিকে মদীনার ইহুদিরা কোরাইশদের সাথে হাত মিলিয়ে ভিতর থেকে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছিলো। মদিনার সনদ অনুযায়ী মদীনার উপর বাইরের শক্তির যে কোন হামলা মোকাবিলায় মদীনার সকল পক্ষ শত্রুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ করার কথা থাকলেও তারা তা করেনি। বরং বার বার চুক্তি লংঘন করে কুরাইশদের সাথে হাত মিলিয়ে রাষ্ট্র বিরোধী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিলো। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে পৌত্তলিক ও মুনাফিকদের উস্কে দিয়ে অস্থিরতা তৈরি করছিলো। আসলে ইহুদিরা কখনোই মদিনায় ইসলামের উত্থানকে মেনে নিতে পারেনি। তাই মদিনা সনদে স্বাক্ষর করলেও সব সময়ই মুসলমানদের তথা রাষ্ট্রের বিনাশ কামনা করতো। একই অবস্থা ছিল মুনাফিকদের। তারা ছিল বর্ণচোরা গোষ্ঠী ; যারা মন থেকে নয় বরং পরিস্থিতির চাপে পড়ে মুসলমান হয়েছিল। এরা ছিল মদীনার এক সরদারের অনুসারী যাকে মদিনাবাসী এক সময় নিজেদের রাজা বানাতে চেয়েছিল। কিন্তু মদিনাবাসী মুসলমান হয়ে যাওয়ায় এবং আল্লাহর রাসূলকে নিজেদের নেতা মেনে নেয়ায় তার সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। তাই মদিনার এই মুনাফিক ও ইহুদিরা আর মক্কার কুরাইশরা মিলে সব সময়ই মদিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে গেছে। তাদের কারণেই আল্লাহর রাসূলকে (সাঃ); যাকে সমস্ত বিশ্বের জন্য রহমত হিসাবে প্রেরণ করা হয়েছিল, তাকে বার বার যুদ্ধের মত অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছিল। এবং যদিও তাকে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের মাদ্ধমেই সমগ্র আরব উপদ্বীপ জয় করতে হয়েছিল; এই সমস্ত সামরিক অভিযানে তিনি এমন নীতি অনুসরণ করেছিলেন যা কোনো পক্ষের মধ্যে রক্তপাত ঘটতে দেয়নি। তিনি প্রথমতঃ চুক্তির মাধ্যমে সমস্ত সমস্যা সমাধান করতে পছন্দ করেন।
আমাদের প্রিয়নবী ব্যক্তিগতভাবে ২৯টি সামরিক অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন। সেগুলোর মধ্যে ১৬টিতে কোনও সংঘর্ষ বা রক্তপাতের ঘটনা ঘটেনি বরং প্রতিপক্ষের সাথে চুক্তি করা হয়েছিল। মাত্র তেরোটি যুদ্ধে তাকে প্রত্যক্ষ অংশ নিতে হয়েছিল। এসব যুদ্ধে মোট ১৪০ জন মুসলমান শহীদ হন এবং প্রতিপক্ষের মারা পড়ে ৩৩৫ জন।
ইসলামে যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য মানুষকে হত্যা করা নয় কিংবা যুদ্ধের মালামাল লাভ, বিশ্বের ক্ষতি, ব্যক্তিগত সুবিধা ও বস্তুগত লাভ বা প্রতিশোধ নেওয়া নয়। বরং উদ্দেশ্য হল জুলুম-অত্যাচার দূর করা, বিশ্বাসের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা, মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং সকল প্রকার অন্যায়-দুষ্কৃতির মূলোৎপাটন করা।
৪. মহানবীর মহানুভবতা
মহানবীর (সা.) মহানুভবতা শুধু মানুষের প্রতিই সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়; বরং পশুপাখি ও উদ্ভিদের প্রতিও তাঁর অফুরন্ত দয়া ও ভালোবাসা ছিল। পৌত্তলিকদের বিশ্বাসঘাতকতা ও চুক্তি লঙ্ঘনের কারণে যখন যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন আল্লাহর রসূল (সাঃ) তাঁর দশ হাজার সৈন্য নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। যখন তিনি আরজ নামক স্থান থেকে তালুবের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি একটি মা কুকুরকে দেখতে পেলেন যে তার কুকুরছানাদের উপর প্রসারিত হয়ে তাদের খাওয়াচ্ছে। তিনি তৎক্ষণাত সাহাবীদের মধ্য থেকে জুয়েল বিন সুরাকাকে ডেকে এই পশুগুলোকে পাহারা দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি তাকে সতর্ক থাকতে বলেন যাতে মা কুকুর ও তার ছানাগুলোকে সৈন্যরা বিরক্ত না করে।
একদিন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এক আনসারের বাগানের কাছে থামলেন। হুজুর (সাঃ)কে দেখে বাগানের ভিতর থেকে একটি উট গোঙ্গানি দিয়ে শব্দ করে কাঁদছিল। হুজুর (সাঃ) তখন উটটির পাশে গিয়ে তার কানের পিছনে হাত দিয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করে আদর করলেন। উট শান্ত হল। আল্লাহর রসূল (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন:
"এই উটটি কার?"
মদিনার এক যুবক কাছে এসে বলল, “এটা আমার হে আল্লাহর রাসূল!”
মহানবী (সাঃ)প্লবললেন: “তোমার কি এই পশুটির ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় হয় না, যা তিনি তোমাকে দিয়েছেন? এটা আমার কাছে অভিযোগ করছে যে তুমি একে খাওয়াওনি এবং সে অনেক ক্লান্ত।" (হুনান আবু দাউদ:২৫৪৯)
একদিন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে দেখলেন যে সে একটি ভেড়া জবাই করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে ভেড়াটিকে শুইয়ে দেওয়ার পর তার ছুরি ধারালো করার চেষ্টা করছিল। তার এই অনুভূতিহীন ও নির্দয় মনোভাব দেখে মহানবী (সাঃ) দুঃখ পেলেন। তিনি লোকটিকে সতর্ক করে বললেন: “তুমি কি প্রাণীটিকে অনেকবার মারতে চাও? এটাকে শুইয়ে দেওয়ার আগে ছুরিটা ধারালো করনি কেন?" (মুস্তাদরাক হাকিম:৭৫৭০)
আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এমন লোকদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন যারা তাঁর বিরুদ্ধে বড় অন্যায় করেছিল। তিনি চাইলেই তাদের শাস্তি দিতে পারতেন, সেই ক্ষমতা তাঁর ছিল। এমনকি একটি শব্দ বা ইঙ্গিত দিয়েও তিনি তাদেরকে বিব্রত করেননি। তিনি তাঁর শত্রুরও ক্ষতি চাননি। কারণ, তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন আল্লাহর রহমত হিসেবে। তিনি এসেছিলেন মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতার পূর্ণ প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি যখন রক্তপাত ছাড়াই মক্কা জয় করেন, তখন একুশ বছর ধরে যারা তার শত্রুতা করেছিলো, তারা তার সামনেই নত মস্তকে সমবেত হয়েছিল এবং তাদের সম্পর্কে তিনি কী রায় দেন তা শোনার অপেক্ষায় ছিল। তিনি তাদের বললেন:
“হে কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমাদের কী মনে হয়, আমি এখন তোমাদের সাথে কী ব্যবহার করব?"
কুরাইশরা বলল, "আপনি ভালো ব্যবহার করবেন এটাই আমাদের ধারণা। আপনি দয়ালু এবং দয়ালু ভাইয়ের পুত্র।"
জবাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: "তাহলে আমিও তোমাদেরকে সেই কথাই বলছি, যে কথা হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর ভাইদের বলেছিলেন, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই, আজ তোমরা সবাই মুক্ত। " (দেখুন সিরাতে ইবনে হিশাম, ৪র্থ, ৩২; ভাকিদি, ২য়, ৮৩৫; ইবনে-ই সাদ, ২য়, ১৪২-১৪৩)
আল্লাহর রাসূল সেদিন হিন্দকেও ক্ষমা করেছিলেন, যে উহুদের যুদ্ধে তার মৃত চাচা হামজার কলিজা চিবিয়ে খেয়েছিল। এমনকি তিনি হেব্বার বিন আসওয়াদকেও ক্ষমা করেছিলেন, যে আল্লাহর রসূলের প্রাণপ্রিয় কন্যা জয়নাবকে হত্যা করেছিল।
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ ছিলেন। বিজয়ের এই দিনে যখন তাকে মানুষের দৃষ্টিতে সবচেয়ে শক্তিশালী হিসাবে দেখা হচ্ছিল, তখন তিনি তাঁর নিকট আগত এক ব্যক্তিকে শান্ত হতে বলছিলেন যে তার উপস্থিতিতে কথা বলার সময় কাঁপতে শুরু করেছিল। আল্লাহর রাসূল তাঁকে বললেন, "শান্ত হও! আমি রাজা বা শাসক নই। আমি কুরাইশের এমন এক মায়ের সন্তান যে শুকনো গোশত খেত।" (হুনান ইবনে মাজাহ, ৩০; মুস্তাদরাক হাকিম:৪৩৬৬)।
তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে নির্দেশ দিতেন: “দয়া করে আমাকে ‘আল্লাহর বান্দা ও রসূল’ বলবে।
তাঁর নবুওয়াত গ্রহণের ঘোষণাপত্রে তিনি "আবদুহু" (আল্লাহর দাস বা বান্দা) শব্দটি যোগ করার জন্য জোর দিতেন। এইভাবে তিনি তাঁর অনুসারীদেরকে মানুষের প্রতি দেবত্ব আরোপ করার বিপদ থেকে রক্ষা করতেন। তিনি এই বিষয়ে আরও বলতেন: "আমাকে আমার ন্যায্য পদমর্যাদার উপরে উন্নীত করবে না। আল্লাহ আমাকে তাঁর রসূল হিসেবে গ্রহণ করার আগে, তিনি আমাকে তাঁর গোলাম হিসেবে কবুল করেছেন।” (হায়তামি: ৯/২১)
হযরত আবূ উমামা (রাঃ) বলেন: “আল্লাহর রসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কথা সবই কুরআনের সাথে সম্পর্কিত ছিল (তিনি এটি সম্পর্কে কথা বলেছেন এবং ব্যাখ্যা করেছেন)। তিনি প্রচুর পরিমাণে আল্লাহর নাম পাঠ করতেন। তিনি কখনোই অহেতুক কথাবার্তায় লিপ্ত হতেন না। তিনি তাঁর খুতবা সংক্ষিপ্ত এবং তিলাওয়াত দীর্ঘ করতেন। তিনি একজন বিধবা বা নিঃস্ব দরিদ্রের সাথে হাঁটতে দ্বিধা করতেন না। তিনি সাধারণ মানুষের সাথে তাদের আপনজনের মতই মিশতেন, তাদের ব্যবসার খোঁজ খবর নিতেন এবং কখনও অহংকার করতেন না।” ( হায়তামি, ৯/২০; সুনান নাসায়ি:৩১)।
মহানবী (সাঃ) উদারতা, ভদ্রতা ও সৌহার্দ্যের ক্ষেত্রে আদর্শ ছিলেন। তিনি যথাসম্ভব ভালো কাপড় পড়তে বলতেন এবং ছেড়া-ন্যাকড়া ও মলিন কাপড় পড়া ও চুল বা দাড়িতে জট পাকানো পছন্দ করতেন না। এছাড়া মানুষ যে খারাপ বা অভদ্র শব্দ ব্যবহার করত তা তিনি কখনো উচ্চারণ করতেন না। তিনি বলেছেন: “কিয়ামতের দিন, মুমিনের (সৎ কাজ পরিমাপের) পাল্লায় উত্তম নৈতিকতার চেয়ে ভারী কিছু থাকবে না। মহান আল্লাহ এমন ব্যক্তিকে ঘৃণা করেন যে অশ্লীল কাজ করে বা অশ্লীল কথা বলে।" (সুনান তিরমিযী:২০০২)
যখন কেউ কোন আপত্তিকর বা অগ্রহণযোগ্য কথা বলেছে বলে কোন খবর তার কাছে পৌঁছাতো তখন তিনি এটা বলতেন না যে "অমুক অমুক কেন অমুক বলছে?" পরিবর্তে, তিনি বলতেন "কেন কিছু লোক এরকম কথা বলছে?" (সুনান আবু দাউদ, আদাব, ৫/৪৭৮৮)।
আল্লাহর নির্দেশে তাঁর রাসূল নারীর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য আইন প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। যার ফলে শালীনতা ও সদাচারে নারী হয়ে ওঠেন অনুকরণীয়। মাতৃত্বের প্রতিষ্ঠানটি সম্মান অর্জন করে। নবীর উক্তি "মায়ের সেবা কর, কেননা তার পায়ের নিচে জান্নাত!" মুমিনদের মা আয়েশা বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর জীবনে কখনও পারিবারিক সহিংসতায় লিপ্ত হননি বা কারও উপর হাত তুলেন্নি। কারণ, সর্বশক্তিমান আল্লাহর নির্দেশ ছিল:
وَ عَاشِرُوۡهُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ فَاِنۡ کَرِهۡتُمُوۡهُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَهُوۡا شَیۡئًا وَّ یَجۡعَلَ اللّٰهُ فِیۡهِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا ﴿۱۹
"আর তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর। আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রেখেছেন।" (আন-নিসা', ৪:১৯)
আল্লাহর নবী অত্যন্ত উদার মানুষ ছিলেন। মক্কার পৌত্তলিকদের মধ্যে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি সাফওয়ান বিন উমাইয়া হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধে প্রিয়নবীর সাথে ছিলেন, যদিও তিনি তখন মুসলিম ছিলেন না। যখন তারা জিরানাতে যুদ্ধের গনীমতের মাল পরীক্ষা করছিলেন, তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লক্ষ্য করলেন যে, সাওফান কিছু পশু পালের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তখন আল্লাহর রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করলেন: "তুমি যা দেখছ তা কি পছন্দ কর?" সাফওয়ান হ্যাঁ বললে নবী বললেন: "তাহলে তাদের নিয়ে নাও, তারা সব তোমার!"
তখন সাফওয়ান নিজেকে সামলাতে না পেরে বলল, "একজন নবী ছাড়া আর কোন হৃদয় এত উদার হতে পারে না!" সে তার ঈমানের কথা ঘোষণা করে মুসলমান হয়ে গেল। যখন তিনি তার গোত্রে ফিরে গেলেন তখন তিনি বললেন: “ওহে আমার গোত্র! (দৌড়ে এসে) মুসলমান হও। মুহাম্মদের (সঃ) মহান উদারতা ও দানশীলতা দেখে যাও।" (সহীহ মুসলিম:৫৭-৫৮; মুসনাদ আহমদ: ৩/১০৭-১০৮)।
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ৬৩২ খৃষ্টাব্দের ৮ই জুন ইসলামিক ক্যালেন্ডারের ১১তম বছরে, রবিউলওয়াল মাসের ১২ তারিখে সোমবার ইন্তেকাল করেন।
মদিনায় অভিবাসী হিসেবে আসার মাত্র দশ বছর পর, আল্লাহর রাসূল (সা.) ওমান থেকে লোহিত সাগর এবং দক্ষিণ সিরিয়া থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত সমগ্র আরবে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আরব ভূখণ্ডে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
একজন ফরাসি চিন্তাবিদ মহানবীর মিশনের সাফল্যে তাঁর মহৎ প্রতিভার প্রশংসা করে বলেছেন: "উদ্দেশ্যের মহিমা, সীমিত উপায় এবং ফলাফলের বিশালতা যদি মানব প্রতিভার তিনটি মহান মাপকাঠি হয়, তাহলে আধুনিক ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বদেরকেও নবী মুহাম্মদের সাথে তুলনা করার সাহস কেউ করতে পারে না"
৫. মহানবীর প্রতি সাহাবীদের অন্তহীন ভালোবাসা
আমরা মুসলমানরা আমাদের নবীকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম যখন আমাদের নবীকে সম্বোধন করতেন, তারা সর্বদা বলতেন, "আমার মা বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক!" আল্লাহর রাসূলকে একটি কাঁটাও যাতে আঘাত করতে না পারে সে জন্য তারা তাদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকতেন। পৌত্তলিকরা যখন যায়েদ বিন দাথিনা ও হুবায়েব (রাঃ)কে বন্দী করার পর হত্যা করার জন্য অত্যাচার করছিল, তখন তাদের প্রত্যেককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “তোমরা কি চাও তোমাদের প্রাণের বিনিময়ে তোমাদের নবী তোমাদের জায়গায় আসুক?” তারা দুজনেই জবাব দিলেন:
“আমার নবী এখানে থাকার বিনিময়ে আমি আমার সন্তান ও পরিবারের সাথে নিরাপদে থাকতে চাই না; শুধু তাই নয়, তিনি যেখানে আছেন সেখানে যদি একটি কাঁটাও তার ক্ষতি করে তবে আমার হৃদয় শান্তি পাবে না।" এই অতুলনীয় ভালোবাসার মুখে হতবাক আবু সুফিয়ান বললেন: "আমি এই পৃথিবীতে কোন লোককে এমনভাবে তার বন্ধুকে ভালোবাসতে দেখিনি, যেভাবে মুহাম্মদের সাহাবীরা তাকে ভালোবাসে।”
আমরা সাহাবায়ে কেরামের এই আবেগ ও ভালোবাসা প্রত্যক্ষ করতে পারি তাদের শ্রদ্ধা ও মনোযোগের ক্ষেত্রেও, যখন তারা নবীর বাণীগুলো বর্ণনা করতেন। শ্রদ্ধেয় সাহাবীগণ যখন মহানবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে একটি বাণী বর্ণনা করতেন, অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু ভুল বলার ভয়ে তাদের হাঁটু কাঁপত এবং তাদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যেত।
৬. মহানবীর মোজেজা বা অলৌকিক ঘটনা
মহানবীর হাতে অগণিত অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। এর মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:
এক.
হযরত জাবির (রা.) বর্ণনা করেন: “হুদায়বিয়ার দিনে লোকেরা তৃষ্ণার্ত হয়ে হুজুরের কাছে আসতে লাগলো। এ সময় আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অযু করছিলেন। তাঁর সামনে একটি মাত্র চামড়ার পাত্রে পানি ছিল। লোকজন তার কাছে গেলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হয়েছে?’
তারা বলল: ‘আপনার সামনের পাত্র ব্যতীত অযু বা পান করার জন্য আর কোনো পানি অবশিষ্ট নেই।’ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাত্রটিতে তাঁর হাত মুবারক রাখলেন। তার আঙ্গুলের মধ্যে পানির বুদবুদ হতে শুরু করে, এটি ঠিক ঝরনায় পানির বুদবুদের মতো। তারপর আমরা সবাই সে পাত্র থেকে পান করলাম ও ওযু করলাম।"
জাবির (রাঃ)-কে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো,
"সেদিন আপনারা কতজন ছিলেন?" তিনি বলেন: " আমরা যদি লক্ষাধিকও হতাম, তাহলেও পানি যথেষ্ট হত, কিন্তু আমরা ছিলাম মাত্র দেড় হাজার মানুষ।"
দুই.
কুরাইশরা আল্লাহর রাসূলের কাছে অলৌকিক ঘটনা দেখতে চাইতো। একদিন তারা চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করে দেখানোর দাবি করে বলল, তাহলে তারা বিশ্বাস করতে পারবে যে তিনি সত্যিই আল্লাহর নবী। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর প্রভুর কাছে দোয়া করলেন, পরে সত্যি সত্যি চাঁদ দু’ভাগ হয়ে গেল। এই অলৌকিক ঘটনা সর্বত্র দেখা গেল। চাঁদ যখন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল, তখন তার এক অর্ধেক আবু কুবাইস পাহাড়ের উপর এবং অন্য অংশ কুয়াকিয়ান পাহাড়ের উপরে দেখা গেল। পৌত্তলিকরা মক্কার বাইরে দূর-দূরান্ত থেকে আসা কাফেলার লোকজনকে জিজ্ঞাসা করতে থাকলো যে তারা এমন ঘটনা দেখেছে কিনা। তারাও তাদের জানায় যে তারা দেখেছে যে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েছে।
তিন.
মসজিদের মিম্বার নির্মিত হওয়ার আগে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কেটে ফেলা একটি গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে খুতবা দিতেন। কিন্তু মিম্বার নির্মিত হওয়ার পর গুঁড়িটি পরিত্যক্ত হওয়ার সময় হলে সবাই তার হাহাকার শুনতে পেল, কারণ সেটাকে তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে দূরে রাখতে হয়েছিল।
চার.
আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে একটি অভিযানে ছিলাম। একপর্যায়ে সেনাদের খাবার সরবরাহ কমে যাওয়ায় তারা তাদের কিছু বাহন (ঘোড়া, উট) জবাই করতে চাইলো। তখন হযরত ওমর (রা.) বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি ভাল হবে না যদি আমি আমাদের কাছে থাকা অবশিষ্ট খাদ্য একত্রিত করি এবং আপনি তাতে বরকত দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন?" হুজুর (সাঃ) এই পরামর্শ পছন্দ করলেন। তখন যাদের গম ছিল তারা গম নিয়ে এলো, যাদের খেজুর ছিল তারা খেজুর নিয়ে এলো এবং এমনকি যাদের খেজুরের দানা বা আঁটি ছিল তারা তাই নিয়ে এলো।”
শ্রোতারা বিস্মিত হয়ে আবু হুরায়রাকে জিজ্ঞাসা করলেন: "তারা খেজুরের আঁটি দিয়ে কী করতো?"
মহান সাহাবী জানালেন, "লোকেরা যখন খাওয়ার মত কিছু পেত না, তখন তারা খেজুরের আঁটি চুষতো, তারপর পানি পান করতো।"
তিনি আবার ঘটনার বর্ণনা শুরু করলেন: “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তখন সালাত (নামাজ) আদায় করলেন। এরপর খাবারে এত বরকত হলো যে প্রত্যেকে তার খাবারের পাত্র ভর্তি করে নিল। এই জান্নাতি উপহারের পর আল্লাহর রাসূল বললেন: “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ (প্রভু, প্রতিপালক) নেই এবং আমি তাঁর প্রেরিত রাসূল। যারা এ দুটি বিষয়ে দ্বিধা না করে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে তারা জান্নাতে যাবে।’’
উপসংহার
এই বইটিতে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে সর্বশেষ ঐশ্বরিক ধর্ম ইসলামের সৌন্দর্যের একটি আভাস উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে যা আসলে সমুদ্রের সাথে এক ফোঁটা পানিকে তুলনা করার মত। যখন ইসলামকে আরও বিস্তারিতভাবে জানা যাবে, তখন সহজেই দেখা যাবে এর সৌন্দর্য আরো অনেক ব্যাপক। দুর্ভাগ্যবশত, আজ ইচ্ছাকৃতভাবে হোক বা অনিচ্ছাকৃতভাবে হোক, ইসলামকে ভুল পন্থায় শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে এবং এর সৌন্দর্যকে আড়াল করে রাখা হচ্ছে। তবে, প্রতিটি বুদ্ধিমান ব্যক্তি বস্তুনিষ্ঠ ও কুসংস্কারমুক্ত সঠিক উৎস থেকে দ্বীন ইসলামের সম্পূর্ণ চিত্র দেখার পর ইসলাম সম্পর্কে তাদের নিজস্ব ধারণা তৈরি করতে পারে।
তথ্যসূত্র:
Abu Dawud, Salman bin Sh’as es-Sistani, Sünenü Ebî Dâvud, I-V, Istanbul 1992.
Ahmad bin Hanbal, el-Müsned, I-VI, Istanbul 1992;
Bardakoğlu, Ali, Ayşe Sucu et al., Gençlik ve Din (Youth and Religion), Ankara 2005.
Belazuri, Ensâbu’l-Eşrâf, Egypt, 1959; Fütûhu’l-büldan, Beirut 1987.
Böken, Ahmet and Ayhan Eryiğit, Yeni Hayatlar (New Lives), I-II, Izmir 2005.
Bukhari, Ebû Abdillah Muhammad bin Ismail, el-Câmiu’s-sahîh, I-VIII, Istanbul, 1992.
Bûtî, M. Said Ramazan, Islamic Creed (İslâm Akâidi), Istanbul 1986; Min Ravâi’ı’l-Kur’ân, Beirut 1996.
Çakmak, Osman, Bir Çekirdekti Kâinat (The Universe was a Seed), Istanbul 2005; Kâinat Kitap Atom-lar Harf (Universe is a Book Atoms are Letters), Istanbul 2007.
Darimi, Sünenü’d-Dârimî, I-II, Istanbul 1992.
Department of Religious Affairs, İslâm’a Giriş (Introduction to Islam) I-II, Ankara, 2006.
Hakim en-Nisaburi, el-Müstedrek ale’s-Sahîhayn, I-V, Beirut 1990.
Hamîdullah, M. Introduction to Islam (İslâm’a Giriş), Istanbul 2003.
Heysemî, Hâfız Nûreddîn Ali bin Ebî Bekir, Mecmau’z-zevâid, I-X, Beirut 1988.
Ibn-i Ebî Şeybe, el-Musannef, I-VII, thk. Kemal Yûsuf el-Hût, Riyad 1409.
Ibn-i Hacer el-Askalânî, el-İsâbe fî temyîzi’s-sahâbe, I-IV, Beirut 1328.
Ibn-i Hişâm, Abu Muhammed Abdulmelik bin Hişâm, Sîretü’n-Nebî, I-IV, Beirut 1937.
Ibn-i Kesîr, el-Bidâye ve’n-Nihâye, I-XV, Cairo 1993.
Ibn-i Sa’d, Muhammed, et-Tabakâtü’l-kübrâ, I-IX, Beirut, Dâru Sâdır.
Malik bin Enes, Muvatta’, I-II, Istanbul 1992.
Morrison, A. C. Man Does Not Stand Alone: Man, Universe and Beyond (1944), Istanbul reprint1979.
Muslim, Abû’l-Hüseyin bin Haccâc el-Kuşeyrî, el-Câmiu’s-sahîh, I-III, Istanbul, 1992.
Nasr, Seyyid Hüseyin, Islamic Science (İslam ve İlim), Istanbul 1989.
Nesâî, Abû Abdirrahmân Ahmad bin Şuayb, Sünenü’n-Nesâî, I-VIII, Istanbul 1992.
Topbaş, Osman Nuri, Faziletler Medeniyeti (The Civilization of Virtues) I-II, Istanbul 2007;
İslâm, Îmân, İbadet (Islam, Faith, Worship), Istanbul 2006;
Rahmet Esintileri (Breeze of Mercy) (Extented New Edition), Istanbul 2008 (http://www.islamiyayinlar.net/content/view/106/8/).
Şentürk, Recep, İnsan Hakları ve İslâm (Human Rights and Islam), Istanbul 2007.
Süyûtî, Ebû’l-Fazl Celâleddîn Abdurrahmân bin Abû Bekir, el-Câmiu’s-sağîr, Egypt 1306.
Tirmizî, Ebû İsâ, Muhammed bin İsâ, Sünenü’t-Tirmizî, I-V, Istanbul 1992.
Wâhidî, İmâm Ebu’l-Hasen Ali bin Ahmad, Esbâbü nüzûli’l-Kur’ân, Beirut 1990.
Vahidüddin Han, İslâm Meydan Okuyor (Islam is Challenging), trans. Cihad H. Reşad, Istanbul 1996.
Wâkidî, Ebû Abdillah Muhammed bin Ömer, Meğâzî, I-III, Beyrut, 1989; Egypt 1948.