বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

মৃত্যু কি জীবনের শেষ নাকি রূপান্তর: একটি দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান

​ভূমিকা মানুষের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি তাকে আজ পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে মহাকাশের অসীমতায় নিয়ে গেছে। মানুষ চাঁদে পা রেখেছে, মহাকাশ স্টেশনে বছরের পর বছর অবস্থান করছে এবং এখন মঙ্গল গ্রহে মানববসতি গড়ার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু এই মহাজাগতিক যাত্রার একটি পরম সত্য হলো—পৃথিবীর বাইরে কোথাও মানুষ তার বর্তমান স্বাভাবিক দেহ নিয়ে এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে পারে না। চাঁদে যেতে হলে নভোচারীদের বিশেষ স্পেসস্যুট বা পোশাক পরতে হয়। কারণ, মানুষের বর্তমান শরীর কেবল পৃথিবীর পরিবেশ ও বায়ুমণ্ডলের জন্য উপযোগী করে তৈরি। এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি আমাদের সামনে একটি গভীর দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক প্রশ্ন উত্থাপন করে: মানুষের বর্তমান দেহ যদি সামান্য চাঁদের পরিবেশেই অচল হয়ে পড়ে, তবে মৃত্যুর পর পরকালের যে অনন্ত ও বিশাল জগত রয়েছে, সেখানে এই নশ্বর দেহ নিয়ে পাড়ি দেওয়া কীভাবে সম্ভব? ​উপযোগিতার সার্বজনীন নিয়ম ও পার্থিব দেহ মানুষের শরীর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, মাধ্যাকর্ষণ, বায়ুচাপ এবং পরিবেশগত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গঠিত হয়েছে। পৃথিবীর জীবজগতের দিকে তাকালেও আমরা একই সত্য দেখতে পাই। মাছ পানিতে বেঁচে থাকে, কিন্তু স্থলে নয়। পাখি আকাশে উড়তে পারে, কিন্তু পানির গভীরে শ্বাস নিতে পারে না। মরুভূমির প্রাণী ও মেরু অঞ্চলের প্রাণীর দেহকাঠামোর মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। অর্থাৎ, প্রকৃতির নিয়মই হলো—প্রতিটি পরিবেশ তার উপযোগী সুনির্দিষ্ট অস্তিত্ব ও অবয়ব দাবি করে। ​চাঁদে মানুষের উপস্থিতি এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। পৃথিবী থেকে মাত্র কয়েক লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাঁদ আমাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও সেখানে মানুষের জন্য নেই শ্বাস নেওয়ার মতো অক্সিজেন, নেই বায়ুমণ্ডলের সুরক্ষা। ফলে সেখানে মানুষের শরীরকে কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখতে স্পেসস্যুটের প্রয়োজন হয়। স্পেসস্যুট মূলত পৃথিবীর পরিবেশেরই একটি কৃত্রিম ক্ষুদ্র সংস্করণ, যা নভোচারী তার শরীরের চারপাশে বহন করেন। ​অনন্তের যাত্রা: পোশাক নাকি মৌলিক রূপান্তর? এখন প্রশ্ন আসে, মানুষ যদি এমন কোনো জগতে প্রবেশ করে যার প্রকৃতি বর্তমান মহাবিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন? এমন এক জগত যেখানে সময় স্থবির, যেখানে স্থান ও পদার্থের নিয়ম আমাদের চেনা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র মানে না; সেখানে কি শুধু একটি কৃত্রিম পোশাক যথেষ্ট হবে? অবশ্যই না। সেখানে প্রয়োজন হবে অস্তিত্বের এক আমূল এবং মৌলিক রূপান্তর। ​এখানেই মৃত্যুকে দেখার একটি নতুন ও ইতিবাচক দিগন্ত উন্মোচিত হয়। আমরা সাধারণত মৃত্যুকে জীবনের নির্মম সমাপ্তি বা এক অন্ধকার অবসান হিসেবে দেখি। কিন্তু প্রকৃতির গভীর নিয়মের দিকে তাকালে দেখা যায়, সমাপ্তি বলে যা মনে হয়, তা আসলে এক নতুন ও বৃহত্তর রূপান্তরের সূচনা মাত্র। একটি বীজ মাটির নিচে পচে গিয়ে বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু সেখান থেকেই জন্ম নেয় এক বিশাল মহীরুহ। একটি শুঁয়োপোকা কোকুনের বা গুটির ভেতরে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে গুটিয়ে নেয়, যা দেখে মনে হতে পারে তার জীবন শেষ; কিন্তু কিছুদিন পর সেখান থেকেই ডানা মেলে এক বর্ণিল প্রজাপতি। প্রকৃতির এই রূপান্তরই প্রমাণ করে যে, রূপ বা অবয়বের পরিবর্তন মানেই বিনাশ নয়। ​ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি: পরকালের প্রস্তুতি ও নতুন দেহ ধর্মীয় ঐতিহ্যসমূহ, বিশেষ করে ইসলাম, আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই এই রূপান্তরের অমোঘ বার্তা মানবজাতিকে দিয়েছে। ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, মৃত্যু কোনো বিনাশ নয়, বরং এটি 'বারজাখ' বা অন্তর্বর্তীকালীন জগতের মাধ্যমে পরকালের অনন্ত জীবনে প্রবেশের একটি সেতু বা দ্বার মাত্র। ​ইসলাম আমাদের স্পষ্ট করে জানায়, পৃথিবীর এই নশ্বর, ক্ষয়িষ্ণু এবং সীমাবদ্ধ দেহ নিয়ে পরকালের জীবনে পাড়ি দেওয়া অসম্ভব। পরকাল হলো চিরস্থায়ী—সেখানে জান্নাতের নিয়ামত যেমন সীমাহীন, তেমনি জাহান্নামের শাস্তিও তীব্র। বর্তমান মানবদেহ সামান্য আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, সামান্য অসুখ বা আঘাতে অচল হয়ে পড়ে। এই ভঙ্গুর শরীর নিয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকা প্রকৃতির নিয়মের পরিপন্থী। ​তাই মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে, মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের দিনে তিনি মানুষকে এক নতুন সৃষ্টিতে পরিণত করবেন এবং এক নতুন দেহ দান করবেন, যা হবে পরকালের নতুন জগতের উপযোগী। সূরা আল-ওয়াকিয়াহ-তে আল্লাহ বলেন: ​"আমি তোমাদের স্থানে তোমাদের মতো অন্য লোক নিয়ে আসতে পারি এবং তোমাদের এমন এক রূপে সৃষ্টি করতে পারি যা তোমরা জানো না।" (সূরা ওয়াকিয়াহ: ৬১) ​হাদিসের বর্ণনা থেকেও জানা যায়, জান্নাতিদের শরীর হবে রোগ-শোকহীন, বার্ধক্যহীন, নিখুঁত এবং চিরযৌবনা। সেখানে ক্ষুধা-পিপাসা বা মলমূত্র ত্যাগের মতো পার্থিব শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকবে না। অর্থাৎ, চাঁদে যাওয়ার জন্য যেমন বিশেষ পোশাকের প্রয়োজন, ঠিক তেমনি পরকালের অতিপ্রাকৃতিক জগতে টিকে থাকার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ 'নতুন দেহ' অপরিহার্য। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, মৃত্যু হলো মানুষের সেই মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক রূপান্তরের প্রথম ধাপ। ​বিজ্ঞান ও দর্শনের সীমারেখা এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, বিজ্ঞান কেন এই পরলৌকিক রূপান্তর নিয়ে কথা বলে না? বাস্তবতা হলো, বিজ্ঞান মূলত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষাগারের প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল। যা কিছু পঞ্চেন্দ্রিয় ও যন্ত্রের সীমানার বাইরে, সে বিষয়ে বিজ্ঞান নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। তাই পরকাল সম্পর্কে বিজ্ঞানের এই নীরবতা কোনোভাবেই তার 'অসততা' বা 'অসত্যতা'র প্রমাণ নয়; বরং এটি বিজ্ঞানের পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার পরিচয় দেয়। ​যেখানে বিজ্ঞানের সীমানা শেষ, সেখান থেকেই দর্শনের গভীর যাত্রা শুরু। দর্শন প্রশ্ন করে—মানুষের এই বিপুল মেধা, চেতনা ও ন্যায়বিচারের আকঙ্ক্ষার শেষ পরিণতি কী? পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ আজীবন অন্যায়ের শিকার হয়েও বিচার পায় না, আবার বহু অপরাধী বুক ফুলিয়ে পার পেয়ে যায়। যদি মৃত্যুর মাধ্যমেই সব শেষ হয়ে যেত, তবে এই মহাবিশ্ব হতো চরমতম অবিচারের এক রঙ্গমঞ্চ। কিন্তু পরকালের ধারণা ও ঐশ্বরিক আদালত সেই অতৃপ্ত প্রশ্নের এক যৌক্তিক সমাধান দেয়। পরকাল আমাদের শেখায়, পার্থিব জীবন হলো একটি পরীক্ষাক্ষেত্র, আর মৃত্যু হলো সেই পরীক্ষার খাতা জমা দিয়ে ফলাফল ও নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মহালগ্ন। ​উপসংহার চাঁদে যাওয়ার আগে মানুষ যেমন দীর্ঘ প্রস্তুতি নেয় এবং স্পেসস্যুট পরিধান করে, ঠিক তেমনি অনন্তকালের অন্তহীন যাত্রার আগেও মানুষের এক মহান প্রস্তুতির প্রয়োজন। পার্থিব জীবনে নেক আমল, নৈতিকতা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে মানুষ মূলত পরকালের সেই দীর্ঘ যাত্রার পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মৃত্যু হলো সেই মহান রূপান্তরকামী প্রক্রিয়া, যা মানুষকে তার জীর্ণ, সীমাবদ্ধ ও নশ্বর খোলস থেকে মুক্ত করে এক চিরন্তন, অবিনশ্বর এবং জ্যোতির্ময় অস্তিত্বের দিকে নিয়ে যায়। অতএব, মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; মৃত্যু হলো এক নশ্বর জগত থেকে মহিমান্বিত অন্য জগতে প্রবেশের এক অনিবার্য ও সুন্দর তোরণদ্বার।

মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬

হেরা গুহায় নূরের জ্যোতি:

চারিদিকে নিশ্ছিদ্র, জমাট বাঁধা অন্ধকার। মক্কার আকাশচুম্বী পাহাড়গুলো যেন এক একটি মৌন প্রহরী, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরবের বুকে বয়ে যাওয়া অবক্ষয়, হাহাকার আর পঙ্কিলতার নীরব সাক্ষী। মানবতা সেখানে ডুকরে কাঁদছিল। যে পবিত্র কাবা গৃহ নির্মিত হয়েছিল এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য, তা তখন অবদমিত ছিল তিনশো ষাটটি জড় প্রতিমার পাথুরে শৃঙ্খলে। গোত্রে গোত্রে সামান্য কারণে বছরের পর বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার নিষ্ঠুরতা, আর নৈতিকতার চরম দেউলিয়াত্ব—সব মিলিয়ে আরব ভূখণ্ড যেন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা ছিল এক বিস্মৃত, গাফেল জাতি, যাদের পূর্বপুরুষদের কাছে দীর্ঘকাল কোনো ঐশী আলোর দিশারী আসেনি, কোনো সতর্ককারী তার হাত বাড়িয়ে দেয়নি। কিন্তু এই ঘোর অমাবস্যার বুকেই নিভৃতে তৈরি হচ্ছিল এক মহাজাগতিক ভোরের পটভূমি। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং মহাবিশ্বের মহান স্রষ্টার সেই চিরন্তন নিয়মেরই ধারাবাহিকতা, যা তিনি যুগে যুগে মূসার কিতাব কিংবা ঈসার বাণীর মাধ্যমে মানবজাতিকে উপহার দিয়েছিলেন। মক্কার এই চরম কোলাহল, মূর্তিপূজার উৎসব আর নৈতিক পচনের আবহ যাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারেনি, তিনি হলেন আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ (সা)। তাঁর বয়স যখন চল্লিশের কোঠায় পৌঁছাল, তখন এক অদ্ভুত, স্বর্গীয় নির্জনতাপ্রিয়তা ভর করল তাঁর অন্তরে। শহরের জৌলুস আর কোলাহল থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে তিনি আশ্রয় খুঁজলেন জাবালে নূরের চূড়ায় অবস্থিত অন্ধকার, সংকীর্ণ **হেরা গুহায়**। সামান্য কিছু ছাতু আর পানি সম্বল করে তিনি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত সেই পাথুরে গুহায় কাটিয়ে দিতেন। তাঁর দুই চোখ চেয়ে থাকত মহাশূন্যের নক্ষত্ররাজির দিকে, আর অন্তর ব্যাকুল হয়ে খুঁজত মহাবিশ্বের সেই পরম সত্যকে, যিনি এই সৃষ্টিজগতের একমাত্র নিয়ন্তা। সেদিন ছিল রমজান মাসের এক শান্ত, মহিমান্বিত রাত। পুরো পৃথিবী তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। হেরা গুহার ভেতরে ধ্যানে মগ্ন মুহাম্মাদ (সা)। হঠাৎ পুরো গুহা এক অপার্থিব, স্বর্গীয় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বাতাসে স্পন্দন জাগিয়ে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন এক অতিপ্রাকৃতিক, জ্যোতির্ময় সত্তা—আল্লাহর প্রধান ফেরেশতা হযরত জিব্রাইল (আ)। ফেরেশতা গম্ভীর, বজ্রকঠিন অথচ সুমধুর কণ্ঠে আদেশ করলেন: **"ইকরা! (পড়ুন!)"** মুহাম্মাদ (সা) এই অতর্কিত ও অলৌকিক উপস্থিতিতে শিউরে উঠলেন। ভয় আর বিস্ময়ে কাঁপতে কাঁপতে তিনি উত্তর দিলেন: "আমি তো পড়া জানি না।" তখন সেই জ্যোতির্ময় সত্তা এগিয়ে এসে মুহাম্মাদ (সা)-কে সজোরে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সেই আলিঙ্গনের চাপ এতটাই তীব্র ছিল যে, মনে হচ্ছিল তাঁর প্রাণবায়ু বুঝি ওষ্ঠাগত হবে। ফেরেশতা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে দ্বিতীয়বার বললেন: "পড়ুন!" নবীজী আবারও একই উত্তর দিলেন, "আমি তো পড়া জানি না।" জিব্রাইল (আ) দ্বিতীয়বার এবং অতঃপর তৃতীয়বার তাঁকে বুকে চেপে ধরে ছেড়ে দিলেন। এবার আর কোনো মানবিক ভয় রইল না, জিব্রাইলের সেই আধ্যাত্মিক স্পর্শে মুহাম্মাদ (সা)-এর অবচেতন মন খুলে গেল। ফেরেশতা তখন আবৃত্তি করলেন সেই অমর বাণী, যা শোনার জন্য আসমান-জমিন যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করছিল: > *"পড়ো তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়ো, আর তোমার রব মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে এমন বিষয় যা সে জানত না।"* > ঐশী বাণীর গুরুভারে হেরা গুহা তখন কাঁপছে। জিব্রাইল (আ) অদৃশ্য হয়ে গেলেন, কিন্তু সেই পাঁচটি আয়াত চিরতরে খোদাই হয়ে গেল মুহাম্মাদ (সা)-এর পবিত্র অন্তরে। নবুয়তের এই প্রচণ্ড ভার এবং প্রথম অভিজ্ঞতার ধাক্কায় নবীজীর শরীর তখন কাঁপছিল। তিনি পাহাড় থেকে নেমে সোজা নিজের বাড়ির দিকে ছুটলেন। তাঁর হৃদপিণ্ড তখন দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে, কপাল বেয়ে ঝরছে ঘাম। ঘরে ঢুকেই মহিয়সী স্ত্রী খাদীজার বুকে যেন শান্তি খুঁজে পেলেন। কম্পিত কণ্ঠে তিনি কেবল বলতে পারলেন: **"আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও! আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও!"** হযরত খাদীজা (রা) কোনো প্রশ্ন না করে পরম মমতায় স্বামীকে চাদর দিয়ে জড়িয়ে দিলেন। দীর্ঘক্ষণ পর যখন নবীজীর শরীরের কাঁপন থামল এবং মনের ভীতি দূর হলো, তখন তিনি হেরা গুহার সেই রোমহর্ষক ঘটনা বিস্তারিত খুলে বললেন। নিজের জীবনের আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, "খাদীজা, আমার নিজের জীবনের ওপর বড্ড ভয় হচ্ছে।" আরবের সেই দুঃসময়ে হযরত খাদীজা (রা) যে জবাব দিয়েছিলেন, তা কোনো সাধারণ নারীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় ও প্রত্যয়ী কণ্ঠে বললেন: > *"আল্লাহর কসম! কখনো নয়; আল্লাহ আপনাকে কখনো লজ্জিত বা অপদস্থ করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখেন, অসহায়-দরিদ্রদের সাহায্য করেন, নিঃস্ব মানুষের দায়িত্ব বহন করেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করেন এবং প্রকৃত সত্য ও হকের বিপদে মানুষকে সাহায্য করে থাকেন।"* > খাদীজার এই আশ্বাসবাণী নবীজীর অন্তরে এক প্রশান্তির হাওয়া এনে দিল। কিন্তু খাদীজা কেবল মুখে সান্ত্বনা দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না। এই অলৌকিক ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য তিনি নবীজীকে নিয়ে গেলেন তাঁর বৃদ্ধ চাচাতো ভাই **ওরাকা বিন নওফেল**-এর কাছে। ওরাকা ছিলেন প্রাচীন কিতাবসমূহের এক অগাধ পণ্ডিত, যিনি তৎকালীন মূর্তিপূজা ত্যাগ করে একত্ববাদের সন্ধান করছিলেন। অন্ধ, জরাজীর্ণ ওরাকার সামনে যখন রসূলুল্লাহ (সা) হেরা গুহার পুরো ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করলেন, তখন সেই বৃদ্ধ পণ্ডিতের শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। তিনি তাঁর লাঠিতে ভর দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন এবং আবেগঘন কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন: > *"ইনি তো সেই পরম বিশ্বস্ত রাজদূত (নামূস), যাঁকে আল্লাহ তায়ালা ইতিপূর্বে মূসা (আ)-এর কাছে পাঠিয়েছিলেন! আপনিই এই যুগের শেষ নবী!"* > ওরাকা সেখানেই থেমে গেলেন না। তিনি নবীজীর দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, *"হায়! আফসোস! আপনার দাওয়াতের যুগে যদি আমি যুবক থাকতাম! আফসোস, আপনার জাতি যখন আপনাকে এই মক্কা নগরী থেকে বের করে দেবে, তখন যদি আমি জীবিত থাকতাম!"* শান্ত, পরোপকারী মুহাম্মাদ (সা) জীবনে কখনো কারও ক্ষতি করেননি, মক্কাবাসী তাঁকে ‘আল-আমীন’ বা বিশ্বাসী বলে জানত। তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, *"তারা কি সত্যিই আমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে?"* ওরাকা অত্যন্ত গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন, *"হ্যাঁ, ইতিহাসে এমন কোনো মানুষ আসেনি যিনি আপনার মতো এই সত্যের বাণী নিয়ে এসেছেন, আর তাঁর আপন জাতি তাঁর চরম শত্রু বনে যায়নি। আপনার সেই কঠিন দিনে আমি যদি বেঁচে থাকি, তবে আপনাকে সর্বাত্মক সাহায্য করব।"* ওরাকার এই ভবিষ্যদ্বাণী আরবের আসন্ন এক মহাবিপ্লবের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। এর কিছুদিন পরই ওরাকা ইন্তেকাল করেন এবং মহান আল্লাহর এক বিশেষ হেকমতের কারণে বেশ কিছুদিনের জন্য অহী অবতরণ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। এই নীরবতার সময়টুকুতে নবীজী নিজেকে মানসিকভাবে আরও দৃঢ় করে গড়ে তোলেন, আর মক্কার আকাশে তখন জমা হতে থাকে এক নতুন ভোরের আলো, যা খুব শীঘ্রই তিন বছরের এক নিভৃত, গোপন দাওয়াতের মধ্য দিয়ে আরবের বুক চিরে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছিল।

সত্যকে সমুন্নত করার সংগ্রাম

মক্কার তপ্ত মরুভূমির বুক চিরে তখন কেবলই দুপুরের খরতাপ নামেনি, নেমেছিল এক বিশ্বাসের অগ্নিপরীক্ষা। আরবের কুরাইশদের শতাব্দী প্রাচীন মূর্তিপূজা আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে যখন আল্লাহর রাসূল (সা.) হকের বাণী—"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"—উচ্চস্বরে ঘোষণা করলেন, তখন থেকেই মক্কার আকাশ-বাতাস যেন এক লহমায় বদলে গেল। শান্তি ও সত্যের সুশীতল বার্তার জবাবে নেমে এলো নির্মমতার এক কাল অধ্যায়। ### কাবার চত্বরে বিশ্বাসের অবিচলতা এক বিকেলে আল্লাহর রাসূল (সা.) কাবার চত্বরে সেজদায় অবনত ছিলেন। পরম প্রভুর দরবারে তিনি যখন নিমগ্ন, ঠিক তখনই কুরাইশদের কুখ্যাত নেতা আবু জেহেল এবং তার সহযোগীরা এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল। আগের দিন জবাই করা একটি উটের পচা, দুর্গন্ধযুক্ত নাড়িভুঁড়ি এনে তারা সেজদারত রাসূল (সা.)-এর পবিত্র পিঠ ও ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দিল। ভারী এবং নোংরা সেই বোঝার নিচে রাসূল (সা.) আটকে রইলেন, কিন্তু সেজদা থেকে মাথা তুললেন না। কাফেররা তা দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল, একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল বিদ্রূপে। অবশেষে খবর পেয়ে ছোট্ট ফাতেমা (রা.) চোখের জল মুছতে মুছতে ছুটে এলেন এবং নিজ হাতে সেই ময়লা সরিয়ে বাবাকে মুক্ত করলেন। নির্যাতন কেবল সেখানেই থেমে থাকেনি। কখনো কাবা প্রাঙ্গণে নামাজরত অবস্থায় উকবা ইবনে আবি মুআইত তার চাদর দিয়ে রাসূল (সা.)-এর গলায় পেঁচিয়ে এমনভাবে টান দিয়েছিল যে তাঁর শ্বাসরোধ হয়ে আসছিল। আবু বকর (রা.) ছুটে এসে তাকে রক্ষা করেন এবং কেঁদে বলেন, *"তোমরা কি এমন একজন মানুষকে হত্যা করতে চাও, যিনি বলেন আমার রব আল্লাহ?"* শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত চলত জাদুকর, পাগল কিংবা কবি বলে মানসিক কটূক্তি এবং একপর্যায়ে তাঁকে হত্যার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র। ### তপ্ত বালুকারাশির ওপর 'আহাদ' ধ্বনি রাসূল (সা.)-এর ওপর নির্যাতনের পাশাপাশি তাঁর অনুসারী সাহাবিদের ওপর নেমে এসেছিল অমানুষিক টর্চার সেল। উমাইয়া ইবনে খালাফ তার ক্রীতদাস হযরত বিলাল (রা.)-কে ইসলামের অপরাধে মক্কার দুপুরের ফুটন্ত বালুর ওপর শুইয়ে দিত। এখানেই শেষ নয়, বুক ফেটে যাওয়ার মতো এক বিশাল ভারী পাথর তাঁর বুকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো, যাতে তিনি নড়াচড়া করতে না পারেন। উমাইয়া চিৎকার করে বলত, *"মুহাম্মদের ধর্ম ত্যাগ কর, নয়তো এভাবেই মরবি!"* কিন্তু সেই মরুভূমির উত্তাপ আর পাথরের চাপকে তুচ্ছ করে বিলালের শুষ্ক ও ফাটা ঠোঁট বেয়ে কেবল একটি শব্দই উচ্চারিত হতো—**"আহাদ! আহাদ!"** (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক)। নিকটেই অন্য এক গলিতে কামার হযরত খাব্বাব (রা.)-কে কাফেররা জ্বলন্ত লাল অঙ্গারের (কয়লা) ওপর খালি পিঠে শুইয়ে রাখত। একজন কাফের তার বুকের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে রাখত যাতে তিনি উঠতে না পারেন। খাব্বাব (রা.)-এর পিঠের চর্বি ও রক্ত গলে গলে যখন সেই আগুন নিভে যেত, তখন কেবল তিনি রেহাই পেতেন। পরবর্তী জীবনেও তাঁর পিঠের সেই সাদা দাগগুলো সাহাবিদের চোখ ভিজিয়ে দিত। ### ইসলামের প্রথম রক্তের দাগ মক্কার অলিগলি তখন কাঁপছিল ইয়াসির পরিবারের আর্তনাদে। বনু মাখজুম গোত্র হযরত ইয়াসির (রা.), তাঁর স্ত্রী হযরত সুমাইয়া (রা.) এবং পুত্র আম্মার (রা.)-কে লোহার বর্ম পরিয়ে মক্কার রোদে দাঁড় করিয়ে রাখত। রাসূল (সা.) যখন তাদের পাশ দিয়ে যেতেন, ব্যথায় তাঁর বুক ফেটে যেত। তিনি বলতেন, *"হে ইয়াসির পরিবার, ধৈর্য ধরো! তোমাদের জন্য জান্নাতের ওয়াদা রয়েছে।"* এক সন্ধ্যায় আবু জেহেল ক্ষিপ্ত হয়ে বৃদ্ধা হযরত সুমাইয়া (রা.)-কে চরম অপমান করতে শুরু করল। কিন্তু সুমাইয়ার ঈমানি দৃঢ়তার সামনে আবু জেহেলের অহংকার চূর্ণ হয়ে গেল। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পিশাচ আবু জেহেল তার হাতের বর্শা দিয়ে সুমাইয়া (রা.)-এর লজ্জাস্থানে আঘাত করল। মক্কার তপ্ত বালু লাল হয়ে উঠল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম শহীদের রক্তে। কিছুদিনের মধ্যে নির্যাতনে শহীদ হলেন তাঁর স্বামী বৃদ্ধ ইয়াসির (রা.)-ও। ধনী ও সম্ভ্রান্ত ঘরের যুবকদেরও রেহাই ছিল না। মক্কার সবচেয়ে সুবেশ ও আদুরে যুবক মুস'য়াব ইবনে উমাইর (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তাঁর মা-ই তাঁকে অনাহারে রেখে ঘরের কোণে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখল। হযরত উসমান (রা.)-কে তাঁর চাচা খেজুর পাতার চাটাইয়ে মুড়িয়ে ধোঁয়া দিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করত। ### শি'বে আবু তালিবের অবরুদ্ধ জীবন যখন কোনো নির্যাতনেই মুসলমানদের ঈমান টলানো গেল না, তখন কুরাইশরা মেতে উঠল এক দীর্ঘমেয়াদি ও নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রে। তারা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের সাথে সমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার চুক্তিপত্র কাবার দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিল। রাসূল (সা.) এবং তাঁর পরিবারসহ মুসলমানদের আশ্রয় নিতে হলো 'শি'বে আবু তালিব' নামক একটি সংকীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকায়। দীর্ঘ তিনটি বছর (৭ম হিজরি পূর্ব থেকে ১০ম হিজরি পূর্ব) তারা সেখানে অবরুদ্ধ রইলেন। মক্কায় কোনো খাবার ঢুকলে কাফেররা তা চড়া দামে কিনে নিত যেন মুসলমানরা তা কিনতে না পারে। ক্ষুধার জ্বালায় অবুঝ শিশুদের কান্নায় মক্কার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, হযরত খাদিজা (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবিরা বন্য গাছের পাতা আর শুকনো চামড়া পানিতে ফুটিয়ে চিবিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতেন। এই তিন বছরের অবর্ণনীয় কষ্ট ও অনাহার রাসূল (সা.)-এর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিবের শরীরকে এতটাই ভেঙে দিয়েছিল যে, বয়কট প্রত্যাহারের কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা দুজনে ইন্তেকাল করেন। > মক্কার সেই নির্মম দিনগুলো ছিল এক চরম অন্ধকার আর ত্যাগের মহাকাব্য। কিন্তু শত চাবুকের আঘাত, উত্তপ্ত পাথর, জ্বলন্ত কয়লা আর তিন বছরের ক্ষুধা—কোনো কিছুই সাহাবায়ে কেরামের বুক থেকে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা আর ঈমানের আলো নিভিয়ে দিতে পারেনি। তাঁদের এই অমানুষিক আত্মত্যাগ আর রক্তের বিনিময়েই আজ পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইসলাম। >

সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

আঁধারে ফোটা পদ্ম

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন আরব্য মরুভূমির বুক চিরে তখন তপ্ত হাওয়া বইছে। ধূ ধূ বালুকারাশির মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন শহর মক্কা। সেই শহরেরই এক সম্ভ্রান্ত কুরাইশ পরিবারে, ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে, যখন এক শিশু পৃথিবীর আলো দেখল, চারপাশটা যেন এক অলৌকিক শান্তিতে ভরে উঠল। মা আমেনা তাঁর সদ্যোজাত সন্তানের নাম রাখলেন 'মুহাম্মদ' (সা.)। কিন্তু এই আনন্দের আলোয় মিশে ছিল এক গভীর বিষাদের ছায়া। শিশু মুহাম্মদের জন্মের আগেই তাঁর পিতা আবদুল্লাহ পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। পৃথিবীর বুকে আসার আগেই তিনি হারিয়েছেন পিতৃস্নেহ। বনু সাদ গোত্রে অলৌকিক দিনগুলো মক্কার তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী, কোলাহলমুক্ত পরিবেশ, বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষা এবং সুস্থ শারীরিক গঠনের জন্য শিশু মুহাম্মদকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো মরুভূমির বনু সাদ গোত্রে। তাঁর দায়িত্ব নিলেন এক ভাগ্যবতী নারী—দুধমাতা হালিমা। বনু সাদ গোত্রে পা রাখার পর থেকেই ঘটতে লাগল একের পর এক অলৌকিক ঘটনা। হালিমা যখন মক্কায় এসেছিলেন, তখন তাঁর স্তনে দুধ ছিল না, তাঁদের সওয়ারির গাধাটি ছিল দুর্বল আর খিটখিটে। কিন্তু শিশু মুহাম্মদকে কোলে তুলে নেওয়ার সাথে সাথেই হালিমার স্তন দুধে ভরে উঠল। দুর্বল গাধাটি এত দ্রুত ছুটতে শুরু করল যে কাফেলার অন্য সবাই অবাক হয়ে গেল। শুধু তাই নয়, মুহাম্মদের উপস্থিতিতে হালিমার শুষ্ক চারণভূমি সবুজ হয়ে উঠল, ছাগলগুলো ওলন্দা ভরা দুধ নিয়ে ফিরতে লাগল। অভাবের সংসারে ফিরল অলৌকিক সচ্ছলতা। মরুভূমির উন্মুক্ত বাতাস আর সাদাসিধে জীবনযাত্রার মাঝে কাটতে লাগল মুহাম্মদের শৈশব। অন্য শিশুদের সাথে খেলতে খেলতেই কেটে গেল জীবনের প্রথম পাঁচটি বছর। এতিমত্বের তীব্র আঘাত ও চাচার আশ্রয় পাঁচ বছর বয়সে মুহাম্মদ (সা.) আবার ফিরে এলেন মক্কায়, মায়ের কোলে। কিন্তু মায়ের স্নেহের আঁচল বেশিদিন তাঁর কপালে জুটল না। মাত্র ৬ বছর বয়সে মা আমেনাও মদিনা থেকে ফেরার পথে 'আবওয়া' নামক স্থানে ইন্তেকাল করলেন। মরুভূমির সেই নিঝুম প্রান্তরে মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মুহাম্মদ (সা.)-এর চোখের পানি যেন মরুভূমির বালুকেও কাঁদিয়েছিল। তিনি হয়ে পড়লেন সম্পূর্ণ পিতৃ-মাতৃহীন, এক পরম এতিম। মায়ের মৃত্যুর পর পরম স্নেহে নাতিকে বুকে টেনে নিলেন দাদা আবদুল মুত্তালিব। কিন্তু মুহাম্মদের (সা.) বয়স যখন মাত্র ৮ বছর, তখন দাদাও দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। একের পর এক আপনজনকে হারিয়ে ছোট্ট মুহাম্মদের মন যখন নিদারুণ কষ্টে ভেঙে পড়েছে, তখন তাঁর দায়িত্ব নিলেন আপন চাচা আবু তালিব। চাচার আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে ছিল ভাতিজার জন্য উজাড় করা ভালোবাসা। সিরিয়া সফর ও পাদ্রি বহিরার ভবিষ্যৎবাণী চাচা আবু তালিবের ঘরে এসে মুহাম্মদের (সা.) কৈশোরকাল শুরু হলো। ১২ বছর বয়সে এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন তিনি। চাচা আবু তালিব ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। প্রিয় ভাতিজাকে মক্কায় একা রেখে যেতে মন চাইছিল না তাঁর। তাই মুহাম্মদকেও (সা.) সাথে নিলেন। দীর্ঘ মরু পথ পাড়ি দিয়ে কাফেলা যখন সিরিয়ার 'বুসরা' নামক স্থানে পৌঁছাল, তখন সেখানে 'বহিরা' নামে এক খ্রিষ্টান পাদ্রি থাকতেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, একটি মেঘখণ্ড দূর আকাশ থেকে এসে কাফেলার ওপর ছায়া দিচ্ছে, আর মুহাম্মদ যে গাছের নিচে বসেছেন, তার ডালগুলো ঝুঁকে তাঁকে রোদ থেকে আড়াল করছে। বহিরা কাফেলাকে নিমন্ত্রণ করলেন এবং কিশোর মুহাম্মদকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। তিনি তাঁর হাত ও পিঠের মোহরে নবুওয়াত দেখে চিনে ফেললেন। বহিরা আবু তালিবকে ডেকে বললেন, "এই বালক সাধারণ কোনো শিশু নয়। ও শেষ জামানার নবী। একে মক্কার ইহুদিদের হাত থেকে সাবধানে রাখুন। চাচার মন এক অজানা বিস্ময় ও শ্রদ্ধায় ভরে উঠল। তিনি ব্যবসা দ্রুত শেষ করে মক্কায় ফিরে এলেন। কৈশোরের কর্মজীবন ও সততার পরীক্ষা মক্কার তপ্ত বালুকাভূমির উপর সূর্যের প্রখর তাপ মরুভূমির হাওয়াকে যখন আরও উত্তপ্ত করে তুলছিল, তখন কিশোর মুহাম্মদ (সা.) নিজের কর্মদক্ষতা ও সততার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। তিনি চাচার সংসারে সচ্ছলতা আনতে এবং নিজের দায়িত্ববোধ থেকে ব্যবসার কাজে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। একবার এক বাণিজ্যিক কাফেলা যখন মরুভূমির কঠিন পথ পাড়ি দিচ্ছিল, তখন ক্লান্তি ও তৃষ্ণা মেটাতে একটি স্থানে সবাই যাত্রাবিরতি নেন। চারদিকে যখন বণিকদের ব্যস্ততা আর উটের কোলাহল, ঠিক তখনই কাফেলার একজন বয়োবৃদ্ধ বণিক আবিষ্কার করলেন যে, তাঁর অত্যন্ত মূল্যবান অলংকার ও অর্থ ভর্তি চামড়ার ব্যাগটি কোথাও হারিয়ে গেছে। মরুভূমির এই অন্তহীন বালুকারাশির মাঝে সেই ব্যাগ খুঁজে পাওয়া ছিল একপ্রকার অসম্ভব। বণিক যখন নিরাশ হয়ে বিলাপ করছিলেন, তখন কিশোর মুহাম্মদ (সা.) তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং পরম মমতায় তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন। তপ্ত রোদে গা ঘেমে নেয়ে উঠলেও মুহাম্মদ (সা.) ক্লান্তিহীনভাবে মরুভূমির ধূলিময় বালুর প্রতিটি কোণ ও পাথরের আড়াল খুঁজতে শুরু করলেন। তাঁর এই অসাধারণ নিষ্ঠা দেখে কাফেলার অভিজ্ঞ বণিকরাও বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। দীর্ঘ সময় নিখুঁতভাবে খোঁজার পর একটি বড় পাথরের আড়ালে বালুচাপা পড়ে থাকা সেই মূল্যবান ব্যাগটি তিনি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন। তিনি ব্যাগটি এনে সেই বৃদ্ধ বণিকের হাতে তুলে দিলে, বণিক পরীক্ষা করে দেখলেন তাঁর একটি মুদ্রাও খোয়া যায়নি। কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে বণিক তাঁকে বড় অঙ্কের পুরস্কার দিতে চাইলেন, কিন্তু কিশোর মুহাম্মদ (সা.) মৃদু হেসে তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, "আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি, এর জন্য কোনো প্রতিদানের প্রয়োজন নেই।" এই ঘটনা কাফেলার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে তাঁর প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করেছিল। জাহিলিয়াতের মাঝে এক টুকরো আলো তৎকালীন মক্কার সমাজ ডুবে ছিল জাহিলিয়াত বা চরম অন্ধকারের সাগরে। জুয়া, মদ্যপান, ব্যভিচার, লুটতরাজ আর তুচ্ছ কারণে গোত্রীয় মারামারি ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। কিন্তু কিশোর মুহাম্মদ (সা.) এই পাপাচারের পঙ্কিলতার মাঝেও ছিলেন পদ্মফুলের মতো পবিত্র। তিনি কখনো কোনো মূর্তির সামনে মাথা নত করেননি, কখনো কোনো পাপকাজে অংশ নেননি। মক্কার যুবকেরা যখন আমোদ-প্রমোদে মেতে থাকত, তিনি তখন শান্ত মনে চিন্তা করতেন প্রকৃতির সৃষ্টি রহস্য নিয়ে। চাচার সংসারের হাল ধরতে তিনি মাঝে মাঝে মাঠে মেষ চড়াতেও যেতেন। নির্জন প্রান্তর আর প্রকৃতির মাঝে একা কাটাতে কাটাতে তাঁর মন হয়ে উঠেছিল আরো কোমল ও সংবেদনশীল। পরম বিশ্বাসী 'আল-আমিন' শৈশব ও কৈশোর থেকেই মুহাম্মদ (সা.)-এর মুখে কখনো কেউ একটিও মিথ্যা কথা শোনেনি। তিনি কারো সাথে কখনো কোনো প্রতারণা করেননি, কাউকে কষ্ট দেননি এবং কারো আমানতের খেয়ানত করেননি। মরুভূমির সেই হারিয়ে যাওয়া ব্যাগ ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাসহ তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের অতুলনীয় সততা, বিনয় আর পরম আমানতদারিতার কারণে মক্কার শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সমাজের সবাই এক নামে তাঁকে 'আল-আমিন' বা 'পরম বিশ্বাসী' উপাধিতে ভূষিত করেছিল। মানুষ নিজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ নিশ্চিন্তে এই কিশোরের কাছে এনে গচ্ছিত বা আমানত রাখত। ফিজার যুদ্ধ ও হিলফুল ফুজুল গঠন কিশোর পেরিয়ে মুহাম্মদ (সা.) যখন তারুণ্যের শুরুতে (১৫ থেকে ২০ বছর বয়সের মাঝে), তখন মক্কায় এক ভয়াবহ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল, যার নাম 'ফিজার যুদ্ধ' বা অন্যায় সমর। পবিত্র মাসে নিষিদ্ধ জেনেও কুরাইশ ও কায়েস গোত্রের মাঝে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ প্রায় চার বছর ধরে চলেছিল। কিশোর মুহাম্মদ (সা.) তার চাচাদের সাথে এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তবে তিনি নিজে কারো ওপর অস্ত্র তোলেননি; শুধু শত্রুর ছুঁড়ে দেওয়া তীরগুলো কুড়িয়ে চাচাদের হাতে তুলে দিতেন। যুদ্ধের এই নিষ্ঠুরতা, লাশের স্তূপ আর নিরপরাধ মানুষের আর্তনাদ তাঁর কোমল হৃদয়কে গভীরভাবে ব্যথিত করল। তিনি ভাবলেন, এভাবে একটি সমাজ চলতে পারে না। যুদ্ধ শেষ হলে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি সমমনা ও পরোপকারী যুবকদের একত্রিত করলেন। তাঁদের নিয়ে তিনি গঠন করলেন একটি শান্তি সংঘ, যার নাম 'হিলফুল ফুজুল'। এই সংঘের মূল শপথ ছিল: * সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। * মজলুম ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষা করা। * কোনো অন্যায়কারীকে মক্কায় প্রশ্রয় না দেওয়া এবং বহিরাগত পথিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো ধরনের বিলাসিতা বা অহংকার ছাড়াই, তীব্র এতিমত্ব আর কষ্টের মাঝে বড় হওয়া এই কিশোরের হাত ধরেই মক্কার অন্ধকার সমাজে শান্তির প্রথম আলো জ্বলে উঠেছিল—যা পরবর্তীতে পুরো পৃথিবীর ইতিহাসকে বদলে দেওয়ার মূল ভিত্তি তৈরি করেছিল।

মদিনার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ

১.মদিনার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ মদিনার ইতিহাসে এমন উৎসবের দিন আর কখনো আসেনি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মক্কার কাফেরদের সমস্ত নির্যাতন ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আল্লাহর রাসুল (সা.) এবং তাঁর সঙ্গী হযরত আবু বকর (রা.) মদিনার সীমানায় এসে পৌঁছেছেন। চারিদিকে আনন্দ-উল্লাস। মদিনার আনসার (সাহায্যকারী) মুসলমানেরা তাঁদের প্রিয় নবীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। বনু নাজ্জার গোত্রের ছোট ছোট মেয়েরা দফ (এক ধরণের বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে সমস্বরে গেয়ে উঠল সেই অমর পঙক্তিমালা: > *"তালাআল বাদরু আলাইনা, মিন ছানিয়্যাতিল ওয়াদা,* > *ওয়াজাবাশ শুকরু আলাইনা, মা দাআ লিল্লাহি দা..."* > *(আমাদের ওপর পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে ‘ওয়াদা’ উপত্যকা থেকে। আমাদের ওপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা ওয়াজিব হয়েছে, যতদিন কোনো আহ্বানকারী আল্লাহকে আহ্বান করবে।)* > আনসারদের প্রতিটি পরিবার চাইছিল আল্লাহর রাসুল (সা.) যেন তাদের বাড়িতে মেহমান হন। সবাই তাঁর উটের লাগাম ধরে টানাটানি করছিল এবং বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছিল, "হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের এখানে অবস্থান করুন। এখানে নিরাপত্তা এবং লোকবল দুই-ই আছে।" রাসুলুল্লাহ (সা.) কারও মনে কষ্ট দিতে চাইলেন না। তিনি মৃদু হেসে এক ঐতিহাসিক ফয়সালা দিলেন। তিনি বললেন: > "তোমরা কাসওয়াকে (রাসুলের উটের নাম) ছেড়ে দাও। একে আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি যেখানে গিয়ে বসবে, সেখানেই আমার বাসস্থান হবে।" > সবাই উটের পেছনে পেছনে হাঁটতে লাগল। কাসওয়া ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বনু নাজ্জার গোত্রের একটি খালি জায়গায় গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। জায়গাটি ছিল দুজন এতিম শিশু— সাহল ও সুহাইলের। পাশেই ছিল হযরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর বাড়ি। রাসুল (সা.) বললেন, "এখানেই হবে আমাদের মসজিদ ও আবাস।" তিনি আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর বাড়িতে মেহমান হিসেবে উঠলেন। ## ২. মসজিদে নববীর ভিত্তিপ্রস্তর: ঐক্যের প্রথম ধাপ রাসুল (সা.) মদিনায় পা রেখেই বুঝতে পেরেছিলেন, একটি শক্তিশালী সমাজ গঠনে প্রথম প্রয়োজন একটি কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে সবাই দিনে পাঁচবার একত্রিত হবে। তিনি এতিম দুই ভাইয়ের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য দিয়ে সেই জমিটি কিনে নিলেন। শুরু হলো **মসজিদে নববী** নির্মাণের কাজ। এটি কেবল ইবাদতের জায়গা ছিল না, বরং এটি ছিল একাধারে সংসদ ভবন, আদালত এবং মুসলমানদের মিলনমেলা। মসজিদ নির্মাণে কোনো রাজকীয় জাঁকজমক ছিল না। কাঁচা ইট, খেজুরের ডাল আর গাছের খুঁটি দিয়ে তৈরি হচ্ছিল এই ঐতিহাসিক স্থাপনা। সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিল— স্বয়ং আল্লাহর রাসুল (সা.) সাধারণ শ্রমিকদের মতো মাথায় করে ভারী ভারী পাথর আর ইট বহন করছিলেন। তাঁর গা থেকে ঘাম ঝরে পড়ছিল। তাঁকে এভাবে কাজ করতে দেখে আনসার ও মুহাজিরদের (মক্কা থেকে হিজরতকারী) ক্লান্তি উবে গেল। তাঁরা দ্বিগুণ উৎসাহে গান গেয়ে গেয়ে কাজ করতে লাগলেন: > *"হে আল্লাহ! পরকালের কল্যাণই আসল কল্যাণ,* > *তুমি আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি দয়া করো।"* > মসজিদটি যখন সম্পন্ন হলো, তখন সেটি মদিনার বুকে এক টুকরো জান্নাতে পরিণত হলো। কিন্তু রাসুল (সা.) জানতেন, কেবল ইটের দেয়াল দিয়ে সমাজ গড়া যায় না; সমাজ গড়তে হলে মানুষের অন্তরের দেয়ালগুলো ভাঙতে হয়। ## ৩. আনসারদের ত্যাগ ও মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভ্রাতৃত্ববন্ধন মক্কা থেকে আসা মুহাজিররা ছিলেন রিক্তহস্ত। কাফেরদের ভয়ে তাঁরা ঘরবাড়ি, ব্যবসা, সম্পদ— সব মক্কাতেই ফেলে শুধু নিজের প্রাণ আর ইমান বাঁচিয়ে মদিনায় এসেছিলেন। তাঁদের না ছিল থাকার জায়গা, না ছিল জীবিকার উপায়। এই সংকট নিরসনে আল্লাহর রাসুল (সা.) এক অতুলনীয় ও অলৌকিক সামাজিক পদক্ষেপ নিলেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে "মুআখাত" বা ভ্রাতৃত্ববন্ধন নামে পরিচিত। তিনি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বাড়িতে আনসার এবং মুহাজিরদের এক সমাবেশের ডাক দিলেন। সেখানে রাসুল (সা.) একজন মুহাজির ও একজন আনসারকে ডেকে বললেন, "আজ থেকে তোমরা একে অপরের ভাই।" মক্কার মুহাজিরদের প্রতি মদিনার আনসারদের এই অগাধ ভালোবাসা ও ত্যাগ ছিল মূলত আল্লাহর প্রতি তাদের আন্তরিক ভালোবাসারই এক পরম বহিঃপ্রকাশ। তবে এর পেছনে আরেকটি গভীর কারণও ছিল— তা হলো মক্কার মুহাজিরদের এক অনন্য ও মহান বিশেষত্ব। এই মুহাজিররা ছিলেন সরাসরি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতে গড়া ও সুপ্রশিক্ষিত মানুষ, যাঁরা দীর্ঘ ১৩ বছর মক্কার কাফেরদের অমানুষিক ও নিষ্ঠুর অত্যাচার সহ্য করেও ইমানের ওপর পাহাড়ের মতো অটল ছিলেন। তাঁরা সরাসরি আল্লাহর রাসুলের পবিত্র সান্নিধ্য থেকে দ্বীনের প্রকৃত তালিম বা শিক্ষা পেয়েছিলেন এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের আত্মগঠন করেছিলেন। শুধুমাত্র আল্লাহর দ্বীন ও সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার খাতিরে তাঁরা নিজেদের পরম মায়ার ঘরবাড়ি, চেনা পরিবেশ ও সমস্ত সহায়-সম্পদ এক পলকে ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। এই কারণেই মুহাজিরদের প্রতি আনসারদের অন্তরে ছিল এক গভীর ও বিশেষ শ্রদ্ধা। আনসাররা সবসময় এই মুখলেস মুহাজির ভাইদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। কারণ, তাঁদের সাথে থাকলে, তাঁদের সান্নিধ্যে বসলে দ্বীন সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানা যেত এবং রাসুলের সরাসরি ছাত্রদের দেখে নিজেদের চরিত্র ও জীবনকে আদর্শ রূপ দেওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি হতো। এই আত্মিক টানের কারণেই ঘোষণা হওয়া মাত্রই আনসাররা তাঁদের মুহাজির ভাইদের শুধু মুখে আপন বলেননি, বরং তাঁদের অন্তরের গভীরে জায়গা দিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, মদিনার ধনী আনসার সাহাবি হযরত সাদ ইবনুর রাবি (রা.)-কে মক্কার মুহাজির সাহাবি হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর ভাই বানিয়ে দেওয়া হলো। সাদ (রা.) তাঁর ভাইকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন, "ভাই আবদুর রহমান! আমি মদিনার অন্যতম ধনী ব্যক্তি। এই নাও আমার সমস্ত সম্পত্তি, একে সমান দুই ভাগে ভাগ করো। এক ভাগ তোমার, অন্য ভাগ আমার।" আনসারদের এই অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগ দেখে মুহাজিররা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তবে তাঁরাও কোনো পরজীবী বা অলস লোক ছিলেন না। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) চোখের পানি মুছে বললেন, "ভাই সাদ! আল্লাহ তোমার পরিবার ও সম্পত্তিতে বরকত দিন। আমার এসবের প্রয়োজন নেই। তুমি শুধু আমাকে মদিনার বাজারের পথটা দেখিয়ে দাও।" (পরবর্তীতে আবদুর রহমান ইবনে আউফ নিজের পরিশ্রমে মদিনার বড় ব্যবসায়ী হয়েছিলেন)। যাঁদের চাষের জমি ছিল, তাঁরা মুহাজির ভাইদের অর্ধেক জমি লিখে দিলেন। যাঁদের খেজুর বাগান ছিল, তাঁরা বললেন, "শ্রম আমরা দেব, কিন্তু ফল কাটার পর অর্ধেক তোমার ঘরে যাবে।" মদিনার আনসারদের এই নিঃস্বার্থ ও পবিত্র ভালোবাসার কথা পবিত্র কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সুরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে অবিনশ্বর করে রেখেছেন: "তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত।" ## ৪. এক নতুন সভ্যতার জন্ম মসজিদে নববী নির্মাণ এবং এই অভূতপূর্ব ভ্রাতৃত্ববন্ধনের মাধ্যমে মদিনায় এমন এক মজবুত ভিত্তি তৈরি হলো, যা আরবের হিংসা, গোত্রবাদ আর অহংকারকে চিরতরে মিটিয়ে দিল। মক্কার কুরাইশ, মদিনার আওস ও খাজরাজ গোত্র এবং দাস-মনোভাবাপন্ন সমাজ ভেঙে সবাই এক দেহে পরিণত হলো। আনসারদের সেই উদারতা ও মুহাজিরদের আত্মমর্যাদাবোধের ওপর ভর করেই মদিনা হয়ে উঠল পৃথিবীর বুকে ইসলামের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণ রাষ্ট্র। যেখানে ভালোবাসা জয় করেছিল সমস্ত অভাবকে, আর ত্যাগ প্রতিষ্ঠা করেছিল এক অপরাজেয় সভ্যতাকে।

উম্মে মা'বাদের ছাগল

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ইতিহাসের পাতায় **উম্মে মা’বাদ (রা.)** এবং তাঁর দুর্বল ছাগলটির ঘটনা এক অবিস্মরণীয় অলৌকিক বা মোজেজা হয়ে আছে। মরুভূমির তীব্র খরা আর ক্লান্তির মাঝে আল্লাহর পক্ষ থেকে নেমে আসা এক অপূর্ব বরকতের গল্প এটি। ### মরুভূমির সেই ক্লান্তিকর যাত্রা ৬২২ খ্রিস্টাব্দ। মহানবী (সা.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। সাথে আছেন তাঁর পরম বিশ্বস্ত সঙ্গী **হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)**, পথপ্রদর্শক আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত এবং খাদেম আমের ইবনে ফুহাইরা। কুরাইশদের চোখ ফাঁকি দিতে তাঁরা চেনা পথ ছেড়ে মরুভূমির এক দুর্গম ও অচেনা পথ ধরে এগোচ্ছিলেন। তীব্র রোদ আর মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে দিনের পর দিন পথ চলায় তাঁরা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। সাথে থাকা খাবার এবং পানিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। ### উম্মে মা’বাদের তাঁবুতে আগমন চলতে চলতে তাঁরা ‘কাদিদ’ নামের একটি মরু এলাকায় এসে পৌঁছালেন। সেখানে একটি একাকী তাঁবু ছিল। তাঁবুটি ছিল এক মেষপালক বেদুইন নারীর, যাঁর নাম ছিল আতিকা বিন্তে খালেদ। তবে সবাই তাঁকে **উম্মে মা’বাদ** নামেই চিনত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও অতিথি পরায়ণ। তাঁবুর সামনে বসে আসা-যাওয়ার পথে ক্লান্ত পথিকদের খাবার ও পানি দিয়ে সাহায্য করাই ছিল তাঁর আনন্দ। রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেনার মতো কোনো মাংস বা খেজুর উম্মে মা’বাদের কাছে আছে কি না। উম্মে মা’বাদ খুব আফসোস করে বললেন, *"আল্লাহর কসম! আমাদের কাছে যদি বিন্দুমাত্র খাবার থাকত, তবে আপনাদের তা চেয়ে নিতে হতো না। তীব্র খরায় চারপাশ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, আমাদের ঘরের সব খাবার শেষ।"* ### সেই দুর্বল ও বন্ধ্যা ছাগলটি ঠিক তখনই আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁবুর এক কোণে একটি জীর্ণ-শীর্ণ, দুর্বল ছাগল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। > নবীজী (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, *"হে উম্মে মা’বাদ! ওই কোণে ওটা কোন ছাগল?"* > উম্মে মা’বাদ উত্তর দিলেন, *"ওটা এতই দুর্বল ও অসুস্থ যে অন্য ছাগলদের সাথে মাঠে চড়তে পর্যন্ত যেতে পারেনি।"* > নবীজী (সা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, *"ও কি কোনো দুধ দেয়?"* > উম্মে মা’বাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, *"দুধ দেবে কী করে! ওর শরীরে এক ফোঁটা দুধও নেই।"* > তখন নবীজী (সা.) মৃদু হেসে বললেন, *"তুমি কি আমাকে ওটার ওলন্দ (দুধের স্থান) থেকে দুধ দোহন করার অনুমতি দেবে?"* > উম্মে মা’বাদ অবাক হলেন, তবে বিনীতভাবে বললেন, *"আমার বাবা-মা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন! আপনি যদি মনে করেন ওর শরীরে দুধ পাবেন, তবে অবশ্যই দোহন করতে পারেন।"* > ### অলৌকিক বরকতের ছোঁয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) পরম মমতায় সেই দুর্বল ছাগলটির কাছে গেলেন। তিনি তাঁর বরকতময় হাত দিয়ে ছাগলটির ওলন্দ স্পর্শ করলেন এবং আল্লাহর নাম (**বিসমিল্লাহ**) স্মরণ করে বরকতের দোয়া করলেন। সাথে সাথেই সেখানে এক অভাবনীয় অলৌকিক ঘটনা ঘটল: * ছাগলটির শুকনো ওলন্দ মুহূর্তের মধ্যে দুধে ভরে ওজনে ভারী হয়ে উঠল। * যে ছাগলটি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না, সেটি সুস্থ-সবল হয়ে পরম শান্তিতে জাবর কাটতে শুরু করল। নবীজী (সা.) একটি বড় পাত্র চাইলেন, যা দিয়ে কয়েকজন মানুষের তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব। তিনি দুধ দোহন করতে শুরু করলেন এবং পাত্রটি ঘন, সাদা দুধে একদম উপচে পড়ল। নেতা হিসেবে নবীজী (সা.) কিন্তু নিজে আগে পান করেননি। তিনি প্রথমে সেই দুধের পাত্রটি **উম্মে মা’বাদ**কে দিলেন। উম্মে মা’বাদ পেট ভরে তৃপ্তি সহকারে সেই দুধ পান করলেন। এরপর নবীজী (সা.) তাঁর সঙ্গীদের দিলেন এবং তাঁরাও মন ভরে পান করলেন। সবার শেষে আল্লাহর রাসূল (সা.) নিজে পান করলেন এবং বললেন: *“যিনি মানুষকে খাওয়ান বা পান করান, তিনি সবার শেষেই পান করবেন—এটাই নিয়ম।”* সবাই তৃপ্ত হওয়ার পর নবীজী (সা.) দ্বিতীয়বার আবার সেই ছাগলটির দুধ দোহন করলেন এবং পুরো পাত্রটি দুধে পূর্ণ করে উম্মে মা’বাদের কাছে উপহার হিসেবে রেখে দিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে আবার যাত্রা শুরু করলেন। ### স্বামীর বিস্ময় ও নবীজীর রূপ বর্ণনা সন্ধ্যাবেলায় উম্মে মা’বাদের স্বামী **আবু মা’বাদ** তাঁর হাড্ডিসার, ক্ষুধার্ত ছাগলের পাল নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। ঘরে এসে দুধের বড় পাত্রটি উপচে পড়া তাজা দুধে ভরা দেখে তিনি তো অবাক! তিনি বিস্ময় নিয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, *"উম্মে মা’বাদ, এই দুধ তুমি কোথায় পেলে? আমাদের ছাগলগুলো তো মাঠেই ছিল, আর ঘরে তো দুধ দেওয়ার মতো কোনো ছাগলই নেই!"* উম্মে মা’বাদ তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, *"আল্লাহর কসম! আজ আমাদের এখানে একজন অত্যন্ত বরকতময় মানুষ এসেছিলেন এবং এই অলৌকিক ঘটনাটি ঘটেছে।"* আবু মা’বাদ কৌতুহলী হয়ে বললেন, *"আমাকে একটু বলো তো, কেমন দেখতে ছিলেন তিনি?"* তখন উম্মে মা’বাদ নবীজী (সা.)-এর এমন এক অপরূপ ও নিখুঁত বর্ণনা দিলেন, যা ইসলামের ইতিহাসে নবীজীর সৌন্দর্যের সবচেয়ে সুন্দর বর্ণনাগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হয়। তিনি বলেছিলেন: * "তিনি ছিলেন এক দীপ্তিময় চেহারার অধিকারী, যাঁর স্বভাব ছিল অসম্ভব সুন্দর। * তাঁর চোখ দুটো ছিল গভীর কালো, আর চোখের পাপড়িগুলো ছিল দীর্ঘ ও আকর্ষণীয়। * তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত মিষ্টি এবং গলার গড়ন ছিল চমৎকার। * তিনি যখন চুপ থাকতেন, তখন তাঁর মাঝে এক গম্ভীর মর্যাদা প্রকাশ পেত; আর যখন তিনি কথা বলতেন, তখন যেন চারপাশ মুগ্ধ হয়ে যেত। * দূর থেকে দেখলে তাঁকে সবচেয়ে সুন্দর ও উজ্জ্বল দেখাত, আর কাছ থেকে দেখলে মনে হতো তিনি কত আপন।" সব শুনে আবু মা’বাদ আবেগপ্লুত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন, *"আল্লাহর কসম! ইনিই তো কুরাইশদের সেই মহামানব, যাঁকে মক্কার লোকেরা হন্যে হয়ে খুঁজছে। আমার তীব্র ইচ্ছা ছিল ওঁর সঙ্গী হওয়ার। আমি যদি কোনোদিন সুযোগ পাই, তবে অবশ্যই ওঁর কাছে চলে যাব।"* ### গল্পের শেষ অংশ নবীজী (সা.) চলে যাওয়ার পরও এই অলৌকিক বরকত শেষ হয়ে যায়নি। ইসলামের ইতিহাসে উল্লেখ আছে যে, উম্মে মা’বাদের সেই ছাগলটি এরপর অনেক বছর বেঁচে ছিল। পরবর্তীতে যখন মদিনায় তীব্র দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, তখনও এই ছাগলটি প্রচুর দুধ দিত, যা উম্মে মা’বাদের পুরো পরিবারের অভাব দূর করেছিল। এই ঘটনার কিছুদিন পর, উম্মে মা’বাদ এবং তাঁর স্বামী আবু মা’বাদ মদিনায় গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আজীবন অনুগত ও প্রিয় সাহাবি হিসেবে ধন্য হন।

রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

স্যার আইজ্যাক নিউটনের ধর্ম বিষয়ক মতামত

এখানে স্যার আইজ্যাক নিউটনের ধর্মীয় চিন্তাভাবনা ও বিশ্বাসের ওপর লেখাটি সহজ, সাবলীল এবং মার্জিত বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা হলো। সাধারণ পাঠকের পড়ার সুবিধার জন্য জটিল ধর্মতাত্ত্বিক শব্দগুলোকে সহজ করে উপস্থাপন করা হয়েছে। *(অনুবাদ থেকে অপ্রাসঙ্গিক নম্বর বা কোডগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে)* ## স্যার আইজ্যাক নিউটন: বিজ্ঞানীর অন্তরালে এক গোপন ধর্মবিশ্বাসী স্যার আইজ্যাক নিউটন একাধারে যেমন ছিলেন একজন একনিষ্ঠ খ্রিস্টান, তেমনি ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম এক ভিন্নপন্থী ধর্মতাত্ত্বিক। তিনি ধর্ম নিয়ে প্রায় ১৩ লাখ শব্দ লিখে গেছেন—যা তাঁর গণিত ও পদার্থবিদ্যার মোট লেখার চেয়েও বেশি। তাঁর জীবদ্দশায় এর বেশিরভাগই প্রকাশিত হয়নি। বর্তমানে এই লেখাগুলো জেরুজালেমের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে 'ইহুদা পাণ্ডুলিপি' (Yahuda manuscripts) হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। ### যুক্তিবাদী ও বাইবেল-ভিত্তিক ঈশ্বরবিশ্বাসী নিউটন প্রকৃতিকে একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র হিসেবে দেখতেন না, বরং একে জীবন্ত ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে মনে করতেন। তাঁর বিখ্যাত বই *অপটিক্স (Opticks)*-এ তিনি প্রশ্ন করেছিলেন: "চোখ কি আলোর বিজ্ঞান না জেনেই তৈরি হয়েছে? কিংবা কান কি শব্দের জ্ঞান ছাড়াই তৈরি হয়েছে?" তিনি নিজেই উত্তর দিয়েছেন—এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বে একজন "অশরীরী, জীবন্ত, বুদ্ধিমান ও সর্বব্যাপী সত্তা" রয়েছেন। ১৭১৩ সালে তাঁর প্রধান গ্রন্থ *প্রিন্সিপিয়া (Principia)*-র পরিশিষ্টে (General Scholium) তিনি এই ধারণার আরও বিস্তার ঘটান: > "সূর্য, গ্রহ এবং ধূমকেতু নিয়ে গঠিত এই চমৎকার জগৎ কেবল একজন বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী সত্তার পরিকল্পনা ও শাসন থেকেই আসতে পারে।" > "এই সত্তা সবকিছু শাসন করেন। তবে জগতের আত্মা হিসেবে নয়, বরং সবার প্রভু হিসেবে... ঈশ্বরত্ব মানে নিজের শরীরের ওপর কর্তৃত্ব নয়, বরং তাঁর দাস বা সৃষ্টির ওপর আধিপত্য।" > "ঈশ্বর চিরন্তন ও অসীম... তিনি কেবল অনন্তকাল বা অসীমতা নন, বরং তিনি নিজেই নিত্য ও সীমাহীন; তিনি কেবল সময় বা স্থান নন, বরং তিনি চিরকাল টিকে থাকেন এবং সর্বত্র বিরাজ করেন।" > নিউটনের কাছে ঈশ্বরের সংজ্ঞা ছিল তাঁর আধিপত্যে, কোনো বিমূর্ত তত্ত্বে নয়। এই "শাসনকর্তা ঈশ্বর"-এর ধারণাই নিউটনকে পরম স্থান ও কালের (absolute space and time) বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁর মতে, প্রকৃতির নিয়মগুলো আসলে ঈশ্বরের ইচ্ছেরই বহিঃপ্রকাশ—যা আধুনিক গবেষকেরাও স্বীকার করেন। ধর্মবিশ্বাসের চেয়েও নিউটনের কাছে সত্য খোঁজার পদ্ধতিটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি অন্ধভাবে কোনো প্রথা মেনে নেওয়া পছন্দ করতেন না। নিজেই বাইবেল পড়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেছিলেন: > "ধর্মগ্রন্থ নিজে নিজে খুঁটিয়ে পড়ো। বারবার পড়ো, গভীর মনোযোগ দিয়ে ভাবো এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো যেন তিনি তোমার বোঝার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেন।" > তিনি বাইবেলকে ল্যাবরেটরির ডেটা বা উপাত্তের মতো করে দেখতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আসল ধর্মমত সেটাই যা "প্রথম যুগের শিক্ষকদের স্পষ্ট কথায় প্রচার করা হয়েছিল এবং একদম শুরু থেকেই শেখানো হতো।" এই সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তিনি খ্রিস্টধর্মের শুরুর দিকের গ্রিক ও ল্যাটিন লেখকদের মূল নথিপত্র পরীক্ষা করতেন। ### ত্রিত্ববাদ-বিরোধী অবস্থান ও অ্যারিয়ান বিশ্বাস ১৬৭২ সালের দিকে নিউটন 'অ্যারিয়ানবাদ' (Arianism)-এর দিকে ঝুঁকে পড়েন। তাঁর বোঝাপড়া অনুযায়ী, এই মতবাদের মূল কথা ছিল—যিশু খ্রিস্ট "মানুষের চেয়ে বড়, কিন্তু ঈশ্বরের চেয়ে ছোট।" অর্থাৎ, তিনি প্রচলিত ত্রিত্ববাদ (Trinity - পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা সমপর্যায়ের, এই বিশ্বাস) স্বীকার করতেন না। নিজের এই গোপন বিশ্বাসকে তিনি ১২টি যুক্তিতে সাজিয়েছিলেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল: * "ধর্মগ্রন্থের কোথাও 'ঈশ্বর' শব্দটি দিয়ে একসাথে তিনজনকে (পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা) বোঝানো হয়নি।" * "সাধারণভাবে যেখানেই 'ঈশ্বর' শব্দটি এককভাবে বসেছে, তা সবসময় 'পিতা'-কে নির্দেশ করে।" * "পুত্র (যিশু) নিজেই স্বীকার করেছেন যে পিতা তাঁর চেয়ে বড়, এবং পিতাকেই নিজের ঈশ্বর বলে ডেকেছেন।" বাইবেলের দুটি জায়গার চুলচেরা বিশ্লেষণ তাঁর এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছিল: ১. **১ যোহন ৫:৭ (1 John 5:7):** নিউটন প্রমাণ করে দেখান যে, প্রথম দিকের গ্রিক পাণ্ডুলিপিগুলোতে ত্রিত্ববাদকে সমর্থনকারী একটি নির্দিষ্ট অংশ (Comma Johanneum) ছিলই না। তিনি দাবি করেন, ত্রিত্ববাদকে জোর করে টিকিয়ে রাখার জন্য পরবর্তীকালে ইচ্ছাকৃতভাবে এটি যোগ করা হয়েছিল। ২. **অ্যাথানাসিয়ান ক্রিড (The Athanasian Creed):** চার্চের এই নিয়মের ভাষা ("কেউ কারও চেয়ে বড় বা ছোট নয়") তাঁর কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, "যারা পারে তারা এর যৌক্তিক অর্থ খুঁজে নিক; আমি তো এর কোনো মাথামুণ্ডু পাই না।" তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ত্রিত্ববাদ "বাইবেল দ্বারা সমর্থিত নয় এবং এটি একটি অযৌক্তিক ধারণা।" এর বদলে তিনি বিশ্বাস করতেন যে পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা সম্পূর্ণ আলাদা তিনটি সত্তা। ### চার্চের ইতিহাস: সত্য বিচ্যুতি ও ভবিষ্যৎ সংস্কার নিউটন বিশ্বাস করতেন যে আদি খ্রিস্টধর্ম খুব দ্রুতই কলুষিত হয়ে পড়েছিল, বিশেষ করে চতুর্থ শতাব্দীর পর। তিনি লিখেছিলেন, রোমান ক্যাথলিক চার্চ "আবার পৌত্তলিকতায় ফিরে গেছে" এবং প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলনও "যথেষ্ট দূর এগোতে পারেনি।" বাইবেলের 'বুক অব রেভেলেশন' (Revelation) নিয়ে গবেষণা করে তিনি বলেন: > "আসল চার্চ একসময় হারিয়ে যাবে এবং তার জায়গায় এক মিথ্যা বা মূর্তিপূজক চার্চ দুনিয়া শাসন করবে।" > ধর্মের এই "মহাবিচ্যুতি" দেখে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর যুগে যুগে ধর্মকে সংস্কার করেন। তিনি নূহ, ইব্রাহিম, মুসা এবং যিশুর মাধ্যমে আসা সংস্কারের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে ভবিষ্যদ্বাণী করেন—"আমরা আশা করতে পারি যে ঈশ্বর যথাসময়ে আবার একটি নতুন সংস্কার আনবেন।" বাইবেলের বিভিন্ন ভবিষ্যদ্বাণী ঘেঁটে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ভবিষ্যতে সবকিছু আবার তার মূল ও পবিত্র রূপে ফিরে যাবে। ### সাবধানে যাপন করা এক গোপন বিশ্বাস নিউটনের এই ধর্মীয় চিন্তাভাবনা তৎকালীন ইংল্যান্ডের আইন অনুযায়ী মারাত্মক অপরাধ বা 'ধর্মদ্রোহিতা' হিসেবে গণ্য হতো। তাই তিনি সমাজে নিজের আসল বিশ্বাস লুকিয়ে রাখতেন। * ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির ফেলোশিপ ধরে রাখার জন্য তাঁর চার্চের যাজক হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানান। এতে তাঁর চাকরি যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অবশেষে ১৬৭৫ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লসের বিশেষ আদেশে তিনি যাজক না হয়েও লুকাসিয়ান অধ্যাপকের পদে থাকার অনুমতি পান। * তিনি তাঁর ধর্মতাত্ত্বিক লেখাগুলো গোপন রাখতেন এবং অনেকগুলোর গায়ে লিখে রেখেছিলেন "প্রকাশের যোগ্য নয়।" ১৯৩৬ সালে সোথবি’স (Sotheby's) নিলামের পর এই লেখাগুলো প্রথমবারের মতো পৃথিবীর সামনে আসে। * ১৭২৭ সালে মৃত্যুর শয্যায় শায়িত অবস্থাতেও তিনি চার্চের শেষকৃত্যের আচার গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। বিজ্ঞান ও ধর্মের পাশাপাশি তিনি 'কিমিয়াবিদ্যা' (Alchemy) এবং বাইবেলের কালানুক্রম নিয়েও গবেষণা করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, এগুলো ঈশ্বরের লেখা দুটি বই পড়ার ভিন্ন মাধ্যম—একটি হলো ধর্মগ্রন্থ (Scripture), অন্যটি প্রকৃতি (Nature)। নিউটনের কাছে কঠোর বিজ্ঞানচর্চা আর গভীর ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল একটাই—চার্চের ভুল নিয়ম ও দুর্নীতির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া আদি সত্যকে পুনরুদ্ধার করা।