মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
গ্রামের নাম রসূলপুর। ছোট্ট একটি গ্রাম— চারদিকে সবুজ ধানক্ষেত, মাঝখান দিয়ে কাঁচা রাস্তা, দূরে সরু একটা নদী। বিকেলের শেষ আলো যখন মাঠের ওপর নরম হয়ে পড়ে, তখন মনে হয় গ্রামটা যেন সময়ের ভেতর ধীরে ধীরে ভেসে চলেছে।
এই গ্রামেরই এক বৃদ্ধ মানুষ—আবদুল করিম।
বয়স আশির কাছাকাছি। চুল সাদা, হাঁটার সময় লাঠি লাগে। কিন্তু তার চোখের গভীরে এখনো অদ্ভুত এক দীপ্তি আছে—যেন সেখানে কোনো পুরনো ইতিহাস জেগে আছে।
প্রতিদিন বিকেলে তিনি বাড়ির বারান্দায় বসেন। সামনে আমগাছ, নিচে মাটির উঠান। দূরের মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলে। মাঝে মাঝে তিনি চুপচাপ দূরের দিকে তাকিয়ে থাকেন—যেন সময়ের ভেতর হারিয়ে যাওয়া কোনো দিনের খোঁজ করছেন।
সেদিন বিকেলেও ঠিক তেমনই বসেছিলেন।
তার নাতি রায়হান এসে পাশে বসলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বয়স একুশ।
—দাদু, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
—কর।
—তুমি কি সত্যিই একাত্তরের সময় প্রতিরোধে ছিলে?
করিম একটু হেসে বললেন, —শুধু দেখিনি রে, সেই আগুনের ভেতর দিয়েই হেঁটেছি।
রায়হানের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
বৃদ্ধ একটু চুপ করে থাকলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—
“সেই সময় এই গ্রামটা অন্যরকম ছিল। চারদিকে ভয়, অনিশ্চয়তা। রাত হলেই দূরে গুলির শব্দ শোনা যেত। আমরা তখন তরুণ। বুকের ভেতর একটাই আগুন—দেশটা স্বাধীন হবে।”
তিনি একটু থামলেন।
“তখন মানুষ রাজনীতি বুঝত না খুব বেশি। কিন্তু একটা জিনিস বুঝত—অন্যায় মেনে নেওয়া যাবে না। নিজের ভাষা, নিজের মাটি, নিজের মর্যাদা—এসবের জন্য মানুষ জীবন দিতে প্রস্তুত ছিল।”
রায়হান চুপচাপ শুনছিল।
বৃদ্ধ আবার বললেন, “একদিন রাতে আমরা কয়েকজন নদী পার হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম। ভয় ছিল, ধরা পড়লে বাঁচবো না। কিন্তু তখন মনে হয়েছিল—এই ভয়কে জয় করতেই হবে।”
রাইয়ান একটু নরম গলায় বলল, —দাদু, এখনো কি সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে?
বৃদ্ধ করিমের চোখে এক ধরনের গভীরতা নেমে এল।
“স্বাধীনতা এসেছে। কিন্তু মানুষের আশা তো শুধু পতাকা না। মানুষ চায় ন্যায়, চায় মর্যাদা, চায় শোষণমুক্ত জীবন।”
রায়হান আগ্রহ নিয়ে বলল—
—আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার বলছিলেন, একাত্তর শুধু যুদ্ধ না, এটা ছিল মানুষের স্বপ্নের বিস্ফোরণ।
বৃদ্ধ করিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। যেন হঠাৎ অনেক দূরের কোনো দিনে ফিরে গেলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—
“১৯৭১ সালের মার্চের পর থেকে চারদিকে অদ্ভুত একটা সময় শুরু হলো। শহর থেকে খবর আসতে লাগল—হত্যা, ধ্বংস, আগুন। মানুষ ভয় পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ভয়ই একসময় রাগে পরিণত হলো।”
তিনি একটু থামলেন।
“আমাদের গ্রামে তখন কয়েকজন তরুণ একসাথে হলাম। কেউ সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা দলে যোগ দিল, কেউ খবর পৌঁছে দিত, কেউ খাবার নিয়ে যেত।”
বাতাসে আমপাতা নড়ে উঠছিল।
বৃদ্ধ করিম বললেন—
“একদিন রাতে আমরা তিনজন নদী পার হচ্ছিলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চাল আর শুকনো খাবার নিয়ে। আকাশে চাঁদ ছিল না। চারদিকে অন্ধকার।”
রায়হান নিঃশ্বাস আটকে শুনছিল।
“হঠাৎ দূরে একটা ট্রাকের শব্দ শুনলাম। পাকিস্তানি সেনারা পাশের গ্রামে ঢুকছে।”
তিনি একটু থামলেন।
“আমরা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর দূরে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা গেল। ঘরবাড়ি পুড়ছে।”
বৃদ্ধ করিমের কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল।
“সেই আগুনের সামনে একজন বৃদ্ধ মানুষ দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলছিল—
‘এই মাটি আমাদের। আমরা একদিন ফিরবো।’”
কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল।
রায়হান ধীরে বলল—
—দাদু, তখন কি তোমাদের খুব ভয় লাগত?
বৃদ্ধ করিম মৃদু হাসলেন।
—ভয় ছিল। কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল একটা বিশ্বাস—এই দেশ একদিন স্বাধীন হবে।
ঠিক তখন পাশের মাঠ থেকে ভেসে এল কিছু তরুণের স্লোগান। তারা শহর থেকে ফিরছে। হাতে ব্যানার।
রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
—দাদু, আমরা কয়েকদিন আগে ঢাকায় গিয়েছিলাম।
—কেন?
—একটা বড় সমাবেশ ছিল। অনেক ছাত্র-তরুণ গিয়েছিল।
বৃদ্ধ করিম কৌতূহলী হয়ে তাকালেন।
—কিসের সমাবেশ?
—মানুষ বলছিল—দুর্নীতি, অন্যায় আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। আমরা চাই দেশটা আরও ন্যায়ভিত্তিক হোক।
বৃদ্ধ করিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন—
—তোমরা কি এসব নিয়ে ভয় পাও না?
রায়হান একটু হেসে বলল—
—ভয় তো লাগে। কিন্তু মনে হয়, যদি আমরা চুপ থাকি তাহলে ভবিষ্যৎ বদলাবে কিভাবে?
বৃদ্ধ করিমের চোখে তখন অদ্ভুত একটা আলো জ্বলে উঠল।
তিনি ধীরে উঠে ঘরের ভেতরে গেলেন।
কিছুক্ষণ পরে ফিরে এলেন একটা পুরনো টিনের বাক্স নিয়ে।
বাক্সটা খুলে তিনি একটা ছোট ডায়েরি বের করলেন। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে।
—এটা কী দাদু?
—একাত্তরের সময় লিখতাম।
তিনি একটা পাতা খুললেন।
সেখানে কাঁপা হাতে লেখা—
“আমরা লড়ছি শুধু স্বাধীনতার জন্য নয়, এমন এক দেশের জন্য যেখানে মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচবে।”
রায়হান ডায়েরির দিকে তাকিয়ে রইল।
বৃদ্ধ করিম ধীরে বললেন—
—দেখিস রায়হান, একাত্তরে মানুষ শুধু একটা পতাকা চায়নি। মানুষ চেয়েছিল মর্যাদা, ন্যায় আর স্বাধীন জীবন।
বাতাসে তখন শিমুল ফুল উড়ে এলো।
দূরের আকাশে সূর্য ডুবতে শুরু করেছে।
রায়হান বলল—
—দাদু, কখনো কখনো মনে হয় আমাদের প্রজন্মও একটা নতুন লড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে।
বৃদ্ধ করিম নাতির কাঁধে হাত রাখলেন।
—সময়ের চেহারা বদলায়, কিন্তু মানুষের আকাঙ্ক্ষা বদলায় না।
তিনি আকাশের দিকে তাকালেন।
—একাত্তরে মানুষ চেয়েছিল স্বাধীনতা। আর যদি তোমরা চাও ন্যায়, স্বচ্ছতা আর মর্যাদা—তাহলে সেই আকাঙ্ক্ষা একই ধারার।
দূরের রাস্তা দিয়ে কয়েকজন তরুণ হাঁটছিল। তাদের কণ্ঠে ভেসে আসছিল স্লোগান।
বৃদ্ধ করিম কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
তারপর ধীরে বললেন—
—ইতিহাস আসলে নদীর মতো। কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল। কিন্তু তার স্রোত একই দিকে বয়ে চলে।
রায়হান চুপচাপ দাদুর পাশে বসে রইল।
তার হাতে তখন সেই পুরনো ডায়েরি।
পাতার ওপর কাঁপা হাতে লেখা শব্দগুলো যেন নতুন করে জেগে উঠছে।
সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলো ধীরে ধীরে।
গ্রামের বাতাসে তখন রাতের নীরবতা।
কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেও যেন দুটি সময় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে—
একটি ১৯৭১
আর একটি ২০২৪।
দুটি প্রজন্ম।
দুটি সময়।
কিন্তু স্বপ্ন একটাই—
একটি দেশ, যেখানে মানুষ অন্যায়ের সামনে মাথা নত করবে না।
একটি দেশ, যেখানে স্বাধীনতার অর্থ শুধু একটি পতাকা নয়—
মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার।
আর সেই স্বপ্নই হয়তো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলে—
একাত্তর থেকে চব্বিশে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন