কবি মতিউর রহমান মল্লিকের অনবরত বৃক্ষের গান :
অন্ধকারের ভেতর আলোর বৃক্ষ
সময়, সমাজ ও আত্মার সম্মিলিত ভাষ্য
বাংলা কবিতায় এমন কিছু কাব্যগ্রন্থ আছে, যেগুলো কেবল কবিতার সংকলন নয়—একটি সময়ের দলিল, একটি আত্মার আর্তি, একটি সমাজের গোপন মানচিত্র। কবি মতিউর রহমান মল্লিক–এর ‘অনবরত বৃক্ষের গান’ কাব্যগ্রন্থ তেমনই এক সংকলন। এখানে প্রকৃতি আছে, আছে রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকট, আছে অর্থনৈতিক বাস্তবতার দহন, আছে ঈমানী নির্ভরতা ও ঐতিহ্যচেতনা—সব মিলিয়ে এটি এক বহুমাত্রিক কাব্যভুবন।
১. নৈতিক অন্ধকার ও আত্মবিচ্ছিন্নতার চিত্র
“লোকটা এখন” কবিতায় আধুনিক মানুষের বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত মানসিকতা ধরা পড়ে—
“আলোর ভেতর চাক-চাক অন্ধকার দেখে দেখে লোকটা এখন দিনের বেলায় একা একা উল্টো দিকেই হেঁটে যেতে চায়।”
আলো এখানে আলোকিত করে না; বরং অন্ধকারের চাকচিক্যকে প্রকাশ করে। এই বিপরীতধর্মী ইমেজ আধুনিক সভ্যতার ছদ্ম-প্রগতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি আরও তীব্র হয় যখন—
“নিজের হাত নিজেই গুণতে গিয়ে আস্কন্ধ লম্বমান দু'টি কাষ্ঠখণ্ড ছাড়া আর কিছুই প্রত্যক্ষ করতে পারলো না।”
মানুষ নিজের মানবিক অঙ্গ হারিয়ে কাঠে পরিণত—এ এক আত্মবিচ্ছিন্নতার মর্মন্তুদ রূপক।
২. বুদ্ধিবৃত্তিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে দ্রোহ
“ক্রোধ” কবিতায় কবি তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন—
“গোখরো তোমার আত্মার প্রতিবেশ…”
“তুমি কি আসলে লেলিহান কঠোরতা?”
‘গোখরো’ হয়ে ওঠে অন্তর্গত বিষের প্রতীক। কবি দেখান, মানবিকতা হারালে জ্ঞান কেবল হিংস্র নখর হয়ে ওঠে। এই কবিতার ভাষা প্রতীকময় হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য সুস্পষ্ট।
৩. অর্থনৈতিক বাস্তবতার কাব্যিক ভাষ্য
“হিসেব করলেই” কবিতায় দৈনন্দিন জীবনের আর্থিক সংকট এক গভীর মানবিক বেদনায় রূপ নেয়—
“হিসেব করলেই কষ্ট বাড়ে…”
“এক মুঠো মাধ্যাকর্ষণ নাড়াচাড়া করতে করতে…”
মাধ্যাকর্ষণ এখানে জীবনের ভার। হিসেব মানেই দুঃখের উন্মোচন—
“হিসেব করলেই কষ্টের ভেতর থেকে উঠে আসে আরেক কষ্ট!”
এই সরল পুনরুক্তি কবিতাকে দিয়েছে তীব্র অনুরণন।
৪. বিপর্যয়ের ভূগোল ও সামষ্টিক আর্তি
“ভয়াবহতম আর্তনাদের মধ্যে” কবিতায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল যেন এক শোকের মানচিত্র—
“মহেশখালীর হতবাক জোয়ারে জোয়ারে ভেসে আসে অসংখ্য লাশ…”
স্থাননামের ধারাবাহিক উচ্চারণ কবিতাকে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড় করায়।
শেষ পঙ্ক্তি—
“আল্লাহ ছাড়া- এখন আর আমাদের কোন দাতাপক্ষ নেই।”
এখানে মানবিক অসহায়ত্ব ঈমানী আশ্রয়ে স্থিতি খুঁজে পায়।
৫. নজরুল-চেতনার পুনর্নির্মাণ
“নজরুলের ভালবাসা” কবিতায় কবি স্মরণ করেন কবি কাজী নজরুল ইসলামকে।
“নজরুলের ভালোবাসায় ছিলো আনন্দের আগে শতাব্দীর কান্না…”
“বিষের বাঁশীর মত অশেষ বিদ্রোহ…”
এখানে ভালোবাসা মানে সংগ্রাম, মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা। নজরুলকে তিনি কেবল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়, এক চলমান চেতনা হিসেবে পুনর্গঠন করেন।
৬. প্রকৃতি, জন্মভূমি ও কৃষিজীবনের নন্দন
“কাশ-শিউলির সময়” ও “হেমন্ত দিন” কবিতায় মল্লিক প্রকৃতির চিত্রকর।
“খেজুর গাছের নতুন নলির লোভে টপ্টপ্ করে…”
“হেমন্ত দিন রঙিন পালক তুলির মত রং এঁকে যায়…”
বাংলার গ্রামীণ জীবন, ফসল, শিশির, নদী—সব মিলিয়ে জন্মভূমির এক স্নিগ্ধ নন্দনচিত্র গড়ে ওঠে।
“মান্না-সাল্ওয়া” প্রসঙ্গ এনে কবি কৃষিজীবনকে ঐশী অনুগ্রহের সঙ্গে যুক্ত করেছেন—
“এবং মান্না-সাল্ওয়া এখন সব চাষীদের…”
৭. আত্মিক ঈদের দর্শন
“একটা ঈদ” কবিতায় ঈদ কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান নয়; এক অস্তিত্বময় অনুভব—
“আজ ক-দিন থেকে একটা ঈদ আমার বাইরে
আজ ক-দিন থেকে একটা ঈদ আমার ভেতরে”
ঈদ হয়ে ওঠে ছায়া ও স্বপ্নের মত এক আধ্যাত্মিক উপস্থিতি। ব্যক্তি ও সমাজ—দুই পরিসরেই তার অনুরণন।
৮. অন্তর্লীন ক্ষয়ের দহন
গ্রন্থের নামের গভীর তাৎপর্য ধরা পড়ে “বৃক্ষ কাটার শব্দ” কবিতায়—
“আমার ভেতরেও কেউ যেন অনবরত বৃক্ষ কেটে যাচ্ছে।”
বাইরের বৃক্ষনিধন ও অন্তরের ক্ষয় একাকার হয়ে যায়। সভ্যতার উন্নয়নের আড়ালে আত্মার বিনাশের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
৯. প্রতীকের শুদ্ধ রূপায়ণ
“বোরকাধারয়িতা ও দারুবৃক্ষের স্তোত্র” কবিতায় দারুবৃক্ষ এক পবিত্র প্রতীক—
“পল্লবিত বোরকায়…”
“একটি পূর্ণাংগ দারুবৃক্ষ কি একটি পরিমার্জিত পাহাড়ের সৌসাদৃশ্য?”
এখানে আচ্ছাদন মানে গোপন নয়; বরং মর্যাদা, সৌজন্য ও সহাবস্থানের মহিমা।
উপসংহার
এক বহুমাত্রিক কাব্যগ্রন্থ। এতে—
সামাজিক ও নৈতিক সংকটের বিশ্লেষণ আছে,
অর্থনৈতিক বাস্তবতার আর্তি আছে,
ধর্মীয় ও ঐতিহ্যচেতনার পুনর্পাঠ আছে,
প্রকৃতি ও জন্মভূমির নন্দন আছে,
এবং সর্বোপরি আত্মার অন্তর্লীন ক্ষয়ের স্বীকারোক্তি আছে।
মল্লিকের কাব্যভাষা দীর্ঘ, প্রবাহমান, উপমা-প্রতীকে ঘন। তিনি গদ্যকবিতার স্বাদে ছন্দের অন্তর্নিহিত সুর তৈরি করেন।
এই কাব্যগ্রন্থ আমাদের শেখায়—বৃক্ষ কেবল প্রকৃতির অংশ নয়; বৃক্ষ আমাদের অন্তরেরও প্রতীক। যখন বৃক্ষ কাটা যায়, তখন কেবল বন উজাড় হয় না—মানুষের ভেতরও এক অনবরত ক্ষয় শুরু হয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন