সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬

আবু জাহেলের পতন

-----------------------------
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
------------------------------





আরবের মরুভূমির মাঝখানে একটি শহর—মদিনা। শহরটি খুব বড় নয়, কিন্তু খুব প্রাণবন্ত। চারদিকে খেজুর গাছ, ছোট ছোট ঘর, আর ব্যস্ত বাজার। ভোর হলেই শহরের মানুষ জেগে ওঠে। ফজরের আজান শোনা যায়। মানুষ নামাজ পড়ে দিনের কাজ শুরু করে।

এই শহরেই বাস করে বারো বছরের এক কিশোর—আবদুল্লাহ। খুব কৌতূহলী ছেলে। সে সব সময় নতুন কিছু জানতে চায়।

তার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে—সালিম এবং আম্মার। তিন বন্ধু প্রায় প্রতিদিনই খেজুর বাগানে দৌড়াদৌড়ি করে, কখনো উটের পেছনে ছুটে, কখনো বাজারে গিয়ে গল্প শোনে।

একদিন দুপুরে তারা বাজারে বসে খেজুর খাচ্ছিল। হঠাৎ তারা দেখল অনেক মানুষ দ্রুত হাঁটছে।

সালিম বলল, —“আজ বাজারটা এত ব্যস্ত কেন?”

আম্মার বলল, —“নিশ্চয়ই বড় কোনো খবর এসেছে।”

আবদুল্লাহ কৌতূহলী হয়ে উঠল। সে দৌড়ে গেল লোকজনের ভিড়ের দিকে।



অদ্ভুত খবর

বাজারের মাঝখানে কয়েকজন লোক উত্তেজিতভাবে কথা বলছিল। একজন বলল, “মক্কার কুরাইশরা বড় বাহিনী নিয়ে বের হয়েছে।”
এই কথা শুনে আবদুল্লাহর বুক ধক করে উঠল। সে দৌড়ে বাড়ি গেল। তার বাবা তখন ঘরের সামনে বসে উটের দড়ি ঠিক করছিলেন। —“আব্বা! বাজারে সবাই বলছে যুদ্ধ হবে!”

বাবা শান্ত গলায় বললেন, “হতে পারে।”

আবদুল্লাহ অবাক হয়ে বলল, —“তুমি কি যুদ্ধে যাবে?”
বাবা একটু হাসলেন। 
“যদি দরকার হয়, অবশ্যই যাব।”

সেদিন বিকেলে শহরের মানুষ জড়ো হলেন মহান নেতা (সা.)-এর চারপাশে। তিনি সবাইকে বললেন,
“আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন।”

এই কথা শুনে মানুষের মুখে সাহসের আলো ফুটে উঠল।



অভিযানের প্রস্তুতি

পরদিন সকাল থেকেই মদিনা শহরে ব্যস্ততা শুরু হলো। কেউ উট প্রস্তুত করছে। কেউ অস্ত্র ঠিক করছে। কেউ পানি ভরছে।
মুসলমানদের সংখ্যা খুব বেশি নয়—মাত্র তিনশতের একটু বেশি। কিন্তু সবাই দৃঢ় মন নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে।

আবদুল্লাহর মনে একটাই ইচ্ছা—সে এই যাত্রায় যাবে। সে বাবার কাছে গিয়ে বলল, —“আব্বা, আমিও যাব।”
বাবা হেসে বললেন, “তুমি তো এখনো ছোট।”
আবদুল্লাহ বলল, —“আমি যুদ্ধ করব না। শুধু সাহায্য করব।”
শেষ পর্যন্ত বাবা রাজি হলেন। তিনি বললেন, “ঠিক আছে। কিন্তু তুমি আমার কাছ থেকে দূরে যাবে না।”

আবদুল্লাহ আনন্দে লাফিয়ে উঠল। সে দৌড়ে বন্ধুদের কাছে গেল।

সালিম বলল, “সত্যি? তুমি যাচ্ছ?”
আম্মার বলল, “তাহলে আমরাও যাব!”

তিন বন্ধুর চোখে তখন নতুন এক অভিযানের উত্তেজনা।



মরুভূমির পথে

অবশেষে যাত্রার দিন এল। ভোরের আলো ফুটতেই ছোট্ট কাফেলা মদিনা ছেড়ে মরুভূমির পথে বেরিয়ে পড়ল। কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন মহান নেতা (সা.)।

সূর্য উঠতেই মরুভূমি গরম হয়ে উঠল। বালুতে হাঁটলে পা জ্বলে যায়। দূরে মরীচিকা দেখা যায়—মনে হয় যেন পানির হ্রদ।

আবদুল্লাহ পানির মশক বহন করছিল। সে মাঝে মাঝে ক্লান্ত সৈন্যদের পানি দিচ্ছিল।
একজন সাহাবি তাকে দেখে বললেন, “তুমি তো ছোট হলেও বড় কাজ করছ।” 
আবদুল্লাহ লজ্জা পেয়ে হাসল।

দুপুরের দিকে সবাই বিশ্রাম নিল।

সালিম বলল, “এই মরুভূমি শেষ হবে তো?”
আম্মার বলল, “শেষ না হলেও আমরা এগিয়ে যাব।”

দূরে সূর্যের আলোয় বালুর পাহাড় ঝিলমিল করছিল। কিন্তু তাদের সামনে অপেক্ষা করছিল ইতিহাসের এক বড় দিন।



তিন বন্ধুর ছোট অভিযান

দুপুরের বিশ্রামের পরে কাফেলা আবার পথ চলা শুরু করল। সূর্য তখন একটু নরম হয়েছে। হালকা বাতাস বইছে মরুভূমির ওপর দিয়ে।

আবদুল্লাহ তার দুই বন্ধু সালিম আর আম্মারের সঙ্গে হাঁটছিল।
হঠাৎ আম্মার দূরে আঙুল তুলে বলল, —“ওদিকে দেখ!”
দূরে দুইজন লোক উট নিয়ে কোথাও যাচ্ছে। তারা যেন খুব সাবধানে চারদিকে তাকাচ্ছিল।

সালিম নিচু স্বরে বলল, —“ওরা নিশ্চয়ই সাধারণ পথিক নয়।”

তিন বন্ধু ধীরে ধীরে তাদের অনুসরণ করল। কিছু দূর গিয়ে তারা শুনতে পেল লোক দুজন কথা বলছে। তাদের কথায় বোঝা গেল—তারা কুরাইশদের জন্য পানি নিয়ে যাচ্ছে।

আবদুল্লাহর বুক ধক করে উঠল। সে বলল, —“চলো, দ্রুত খবর দিই।”

তারা দৌড়ে কাফেলায় ফিরে এল। সাহাবিরা খবর শুনে সতর্ক হয়ে গেলেন।
একজন বললেন, “এর মানে শত্রুরা খুব কাছেই আছে।”

আবদুল্লাহ তখন বুঝল—তাদের ছোট অভিযানটি আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে।



বদরের কূপ

কিছুক্ষণ পরে মরুভূমির দৃশ্য একটু বদলে গেল। দূরে কিছু খেজুর গাছ দেখা গেল। আর একটু এগিয়ে যেতেই দেখা গেল একটি কূপ।

মরুভূমিতে পানি মানেই জীবন। মুসলমানরা কূপের কাছাকাছি অবস্থান নিলেন। সেখানে ছোট ছোট বালুর টিলা ছিল। কেউ তাঁবু গাঁড়ছে, কেউ বিশ্রাম নিচ্ছে, কেউ পানি তুলছে।

আবদুল্লাহ কূপের কাছে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা পানি খাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল—এখানেই কিছু বড় ঘটনা ঘটবে।



যুদ্ধের আগের রাত 

সেই রাতটা ছিল অদ্ভুত। আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছিল। মরুভূমি নিস্তব্ধ। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার ভেতরে লুকিয়ে ছিল উত্তেজনা। দূরে পাহারা দিচ্ছিলেন সাহাবিরা।

আবদুল্লাহ তার বাবার পাশে বসে ছিল। সে জিজ্ঞেস করল, —“আব্বা, তুমি কি ভয় পাচ্ছ?”

বাবা মৃদু হাসলেন। “যুদ্ধের আগে সবার মনেই কিছু ভাবনা আসে। কিন্তু আমরা সত্যের জন্য দাঁড়িয়েছি।”

একটু পরে মহান নেতা (সা.)-কে দেখা গেল আল্লাহর কাছে দোয়া করতে। এই দৃশ্য দেখে অনেকের মন আরও দৃঢ় হয়ে উঠল।

আবদুল্লাহ আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল— “আগামীকাল কী হবে?”



বীরদের দ্বন্দ্ব


পরদিন ভোর। মরুভূমির আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। দূরে ধুলো উড়তে দেখা গেল। কুরাইশদের বিশাল বাহিনী এসে গেছে। তাদের সংখ্যা প্রায় এক হাজার। মুসলমানদের সংখ্যা মাত্র ৩১৩।

আবদুল্লাহর বুক কেঁপে উঠল। কিন্তু সাহাবিদের চোখে দৃঢ়তা।

আরবের নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে তিনজন করে যোদ্ধা সামনে এলেন। মুসলমানদের পক্ষ থেকে এগিয়ে এলেন তিনজন বীর—

আলী ইবনে আবি তালেব
হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব
উবায়দা ইবনে ইবনে আল হারিথ


মরুভূমি যেন নিঃশব্দ হয়ে গেল। হঠাৎ তলোয়ারের ঝলক দেখা গেল। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল মুসলমানদের বীরেরা জয়ী হয়েছেন।

এই দৃশ্য পুরো মুসলিম বাহিনীর মনোবল অনেক বাড়িয়ে দিল।



তুমুল যুদ্ধ 


এরপর শুরু হলো বড় যুদ্ধ। ঘোড়ার খুরের শব্দে বালু উড়তে লাগল। তলোয়ারের ঝনঝন শব্দ মরুভূমি কাঁপিয়ে দিল। আবদুল্লাহ যুদ্ধক্ষেত্রের একটু দূরে দাঁড়িয়ে আহতদের পানি দিচ্ছিল।
তার মনে হচ্ছিল—এ যেন মরুর ঝড়।

সংখ্যায় কম হলেও মুসলমানরা সাহসের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। অনেকক্ষণ ধরে যুদ্ধ চলল।


আবু জাহেলের পতন ও দুই কিশোরের সাহস


যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মরুভূমির বালুতে তলোয়ারের ঝলক, ঢালের শব্দ আর চিৎকারের মধ্যে সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত গর্জন তৈরি করেছে।
মধ্যবয়সী সাহাবিরা লড়ছে, প্রবীণরা সাহস দেখাচ্ছে। 

কিন্তু দুই কিশোর— মুয়াজ ইবনে আমর ইবনে আল জামুহ এবং মুয়ায়িদ ইবনে আফরা —তাদের হৃদয়ে ছিল অদম্য সাহস। দূরে তারা লক্ষ্য করল—, সেই অত্যাচারী নেতা, যিনি বহু বছর ধরে মুসলমানদের কষ্ট দিয়েছেন। মহান নেতা আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছেন। তারা চুপচাপ একে অপরের দিকে তাকাল। তাদের চোখে ছিল দৃঢ় সংকল্প, মুখে হাসি—ভয়ের নয়, প্রতিজ্ঞার।

হঠাৎ তারা একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

আবু জাহেল হতভম্ব হয়ে পিছলে গেল। তার অহংকার আর শক্তি কিছুই কাজে লাগল না। ছোটরা সাহসের সাথে তার দিকে আঘাত করল। 
মাটিতে পড়ে যাওয়া আবু জাহেল চিৎকার করার চেষ্টা করলেও তার শক্তি ছিল কম।
সেই সময় উপস্থিত সাহাবি দ্রুত এগিয়ে গেলেন এবং নিশ্চিত করলেন—অত্যাচারী নেতা আর নেই।

মরুভূমির সেই দিন, দুই কিশোরের সাহস ও দৃঢ়তা ইতিহাসে নাম লিখে গেল।



বিজয়ের মুহূর্ত


মরুভূমির উপর তখন ধুলো উড়ছে। ঘোড়ার খুরের শব্দ, মানুষের ধ্বনি, তলোয়ারের ঝলক—সব মিলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র যেন এক ভয়ংকর ঝড়ে পরিণত হয়েছে।

আবদুল্লাহ একটু দূরে দাঁড়িয়ে আহতদের পানি দিচ্ছিল। তার হাত কাঁপছিল, কিন্তু সে সাহস করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে দেখল—মুসলমানদের সাহস যেন আরও বেড়ে গেছে।

সাহাবিরা দৃঢ়ভাবে লড়াই করছেন। কিছুক্ষণ পর যুদ্ধের আওয়াজ ধীরে ধীরে কমে এল। ধুলো বসে গেলে বোঝা গেল—যুদ্ধ শেষ হয়েছে।

মুসলমানরা বিজয়ী হয়েছেন। সংখ্যায় কম হলেও তারা সাহস আর বিশ্বাসের জোরে জয় লাভ করেছেন।

আবদুল্লাহ বিস্ময়ে চারদিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল—সে যেন ইতিহাসের এক মহান মুহূর্তের সাক্ষী।

মহান নেতা (সা.) তখন সবাইকে শান্ত থাকতে বললেন। তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। সবাই তাঁর সঙ্গে মাথা নত করল।



নতুন শিক্ষা


সেদিন সন্ধ্যায় মরুভূমি আবার শান্ত হয়ে গেল। যুদ্ধের ধুলো বসে গেছে। আকাশে তারা জ্বলছে। আবদুল্লাহ তার বাবার পাশে বসে ছিল। সে ধীরে ধীরে বলল, —“আব্বা, আজ আমি অনেক কিছু দেখলাম।” 

বাবা মৃদু হাসলেন। “কি শিখলে?”
আবদুল্লাহ একটু ভেবে বলল, “সাহস মানে শুধু শক্তি নয়।” “সাহস মানে সত্যের পাশে দাঁড়ানো।”

বাবা তার মাথায় হাত রাখলেন। “তুমি ঠিকই বুঝেছ।”

দূরে সাহাবিরা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কেউ কথা বলছিলেন, কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মরুভূমির বাতাসে তখন এক ধরনের শান্তি। 
আবদুল্লাহ মনে মনে ভাবল— এই দিনের গল্প সে কখনো ভুলবে না।



মদিনায় ফিরে আসা


কয়েকদিন পরে কাফেলা আবার মদিনার পথে রওনা দিল। মরুভূমির সেই দীর্ঘ পথ এবার যেন ছোট মনে হচ্ছিল। কারণ তাদের হৃদয়ে ছিল বিজয়ের আনন্দ।

মদিনার কাছে পৌঁছাতেই মানুষ ছুটে এল। শহরে খবর পৌঁছে গেছে—মুসলমানরা বিজয়ী হয়েছেন। মানুষ আনন্দে একে অপরকে অভিনন্দন জানাচ্ছে।

আবদুল্লাহর বন্ধুরা তাকে ঘিরে ধরল।
সালিম বলল, “তুমি তো সত্যিই বড় অভিযানে গিয়েছিলে!”
আম্মার বলল, “তুমি এখন সত্যিকারের গল্পের নায়ক।”
আবদুল্লাহ হেসে ফেলল। কিন্তু সে জানত—এই বিজয় কোনো এক মানুষের নয়। এটি ছিল সাহস, বিশ্বাস এবং সত্যের বিজয়।

মহান নেতা (সা.) সবাইকে বললেন— “এই বিজয় আমাদের শক্তির কারণে নয়। এটি আল্লাহর সাহায্য।”
মানুষ কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করল।

সেদিন রাতে মদিনার আকাশে তারা আগের মতোই জ্বলছিল। কিন্তু আবদুল্লাহর মনে হচ্ছিল—সে যেন নতুন কিছু শিখেছে। সে বুঝেছে— সত্যের পথে দাঁড়ালে ছোট মানুষও বড় ইতিহাসের অংশ হয়ে যেতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন