বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬
আগুনের মানচিত্র
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
রাত তখন গভীর। ঢাকার আকাশে কুয়াশার মতো ঝুলে আছে অদৃশ্য এক উদ্বেগ। মুসা তার ছোট্ট ঘরের ভেতর বসে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে আছে। লাইভ সম্প্রচার চলছে—হোয়াইট হাউসের ক্যাবিনেট মিটিং শেষ হয়েছে মাত্রই।
স্ক্রিনে ভেসে উঠলো ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর মুখ। ঠোঁটে হালকা হাসি। সাংবাদিকদের প্রশ্ন—ইরান যুদ্ধে কারা এগিয়ে?
তিনি উত্তর দিলেন এমন স্বরে, যেন যুদ্ধ কোনো খেলার নাম— “ইরানকে আমাদের প্রস্তাব মানতে হবে। না হলে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।”
মুসার বুকের ভেতর হালকা একটা ধাক্কা লাগে।
একটা দেশ ধ্বংসের কথা এভাবে হাসতে হাসতে বলা যায়?
সে চুপ করে থাকে। স্ক্রিনের আলো তার মুখে পড়ে, আর বাইরে শহরটা অস্বাভাবিকভাবে নিশ্চুপ।
সে চোখ বন্ধ করল। কিন্তু শব্দটা থেকে গেল।
পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার পথে সে লক্ষ্য করল—সবকিছু স্বাভাবিক। রিকশা চলছে, মানুষ বাজার করছে, চায়ের দোকানে আড্ডা।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে যেন পৃথিবী অন্য এক দিকে ঘুরছে।
মুসা কাগজের অফিসে যায়। সহকর্মীরা ফিসফিস করে কথা বলছে।
অফিসে পৌঁছেই সে খবর খুলল। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র যেন আগুনে জ্বলছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা।
বাব-এল-মান্দেব প্রণালী নিয়েও হুমকি।
“যদি এই দুই প্রণালি বন্ধ হয়, বিশ্ব অর্থনীতি থেমে যাবে,” একজন বলে।
আরেকজন যোগ করে—
“ইউক্রেন আবার রাশিয়ার তেল স্থাপনায় হামলা করেছে।”
মুসা চুপচাপ শুনে। তার মনে হয়, পৃথিবী যেন একটা অদৃশ্য দাবার বোর্ড—আর সাধারণ মানুষ শুধু ঘুঁটি।
এক সহকর্মী বলল,
“এই দুইটা বন্ধ হলে তেল বন্ধ। তেল বন্ধ মানে পৃথিবী থেমে যাওয়া।”
এক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বিশ্লেষক বলছেন—
“ইরানের সিস্টেম ভাঙা এত সহজ নয়।”
আর দূরে হুথি আন্দোলন ঘোষণা দিয়েছে—প্রয়োজনে তারা যুদ্ধে নামবে।
মুসা চুপ করে রইল। তার মনে হলো—যুদ্ধ এখন শুধু সীমান্তে না, বাজারের ভেতরেও।
দুপুরের দিকে আরেকটা খবর আসে।
টোটাল এনার্জি তাদের কর্মীদের সরিয়ে নিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
মুসা ভাবল— যারা সবচেয়ে আগে বিপদ বোঝে, তারা আগে পালায়।
তাহলে কি সত্যিই কিছু ঘটতে যাচ্ছে?
সন্ধ্যায় সে নতুন একটা রিপোর্ট পড়তে শুরু করল।
এইবার লেবানন।
লেবানন।—ছোট্ট একটা দেশ। কিন্তু সেখানে আগুন জ্বলছে বড় যুদ্ধের মতো।
রাইটস ওয়াচ বলছে— দক্ষিণ লেবাননে আবারও সাদা ফসফরাস ব্যবহার করা হয়েছে।
মুসা থেমে গেল। সে ধীরে ধীরে পড়তে লাগল।
M825 সিরিজের ১৫৫ মিমি আর্টিলারি প্রজেক্টাইল।বিস্ফোরণের পর আকাশে ছড়িয়ে পড়ে সাদা ফসফরাস।
জ্বলন্ত ফেল্টের টুকরো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
আর আকাশে তৈরি হয় গাঁটের মতো ধোঁয়ার এক অদ্ভুত আকৃতি।
সে চোখ বন্ধ করে কল্পনা করল—
একটা শহর,
মানুষ দৌড়াচ্ছে,
আর আকাশ থেকে আগুনের বৃষ্টি পড়ছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে—
দক্ষিণ লেবাননের ইয়োহমর শহরের আবাসিক এলাকায় এই বিস্ফোরণ দেখা গেছে।
ছবি যাচাই করা হয়েছে।
ভিডিও এসেছে আরও।
কিন্তু সব কিছু কি ধরা পড়েছে?
না।
কারণ প্রায় আট লাখ মানুষকে ওই এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
যারা পালিয়েছে, তারা তো ক্যামেরা নিয়ে দৌড়ায় না।
তারা শুধু বাঁচতে চায়।
মুসা ভাবল—
এই যুদ্ধটা আসলে কী?
গাজা, লেবানন, পশ্চিম তীর—
সব জায়গায় একই আগুন।
প্রতিরোধ করছে।
প্রস্তুত।
আর অন্যদিকে, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের হিসাব কষছে।
রাত নামলে হুসাইন আবার লিখতে বসে।
তার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরছে—
লেবাননে এই হামলার উদ্দেশ্য কী?
সে নিজের কাছে উত্তর খোঁজে।
এটা কি শুধু সামরিক লক্ষ্য?
না কি আরও বড় কিছু?
তার মনে পড়ে পশ্চিম তীরের খবর।
বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বাড়ছে।
মানুষ বলছে—এখন আর কোথাও নিরাপদ না।
তাহলে কি এই সবকিছুর পেছনে একটা কৌশল আছে?
সে লিখে—
“সম্ভবত লক্ষ্য শুধু যুদ্ধ জেতা না। লক্ষ্য জায়গা খালি করা।”
মুসা থামে।
কলমের নিব কাগজে ঠেকে থাকে।
তার মনে হয়—
একটা মানচিত্র ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
মানুষ সরছে,
ঘর ফাঁকা হচ্ছে,
শহর ধ্বংস হচ্ছে।
আর সেই ফাঁকা জায়গাগুলো—
দখল করবে নতুন কেউ; যেমন দখল করা হয়েছিল ফিলিস্তিনিদের ভূমি।
রাত আরও গভীর হয়।
সে আবার স্ক্রিনে চোখ রাখে।
খবর আসছে—
ইউক্রেন রাশিয়ার তেল স্থাপনায় হামলা করেছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ ক্ষতিগ্রস্ত।
মুসা হিসাব করে—
একদিকে মধ্যপ্রাচ্য,
অন্যদিকে রাশিয়া।
তাহলে পৃথিবীর জ্বালানি কোথা থেকে আসবে?
সে জানালার বাইরে তাকায়।
ঢাকা শহর তখনও বেঁচে আছে নিজের মতো করে।
কিন্তু তার মনে হয়—
এই শহরও সেই আগুনের বাইরে না।
কারণ যুদ্ধ এখন সীমান্ত মানে না।
যুদ্ধ এখন অর্থনীতি, খাদ্য, জ্বালানি—সবকিছুর ভেতর ঢুকে গেছে।
মুসা আবার লিখতে শুরু করে—
“যুদ্ধ এখন আর শুধু বন্দুকের না।
যুদ্ধ এখন কৌশলের।
যেখানে একদিকে বোমা, অন্যদিকে প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া।”
সে মনে করে —
যেখানে শক্তি থাকলেও জয় আসেনি।
শেষ অংশে এসে সে থামে।
তার সামনে তিনটা ছবি ভেসে ওঠে—
একটা ধোঁয়ায় ভরা লেবাননের আকাশ,
একটা উত্তপ্ত প্রণালি,
আর একটা হাস্যোজ্জ্বল মুখ, যে বলছে—ধ্বংস করা হবে।
এই তিনটা ছবির মধ্যে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক আছে।
মুসা শেষ লাইনগুলো লিখে—
“এই পৃথিবী এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে,
যেখানে যুদ্ধ না করেও যুদ্ধ চালানো যায়।
যেখানে শহর ধ্বংস হয়, মানুষ সরে যায়, আর মানচিত্র বদলে যায়।
লেবাননের আকাশে সাদা ফসফরাসের ধোঁয়া শুধু আগুনের চিহ্ন না,
এটা এক নতুন কৌশলের সংকেত—
যেখানে লক্ষ্য শুধু প্রতিপক্ষ না,
লক্ষ্য পুরো ভূখণ্ড।”
কলম নামিয়ে রাখে মুসা। তার ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা।
দূরে ফজরের আজান ভেসে আসে।
সে জানে—
নতুন একটা দিন শুরু হবে।
কিন্তু এই দিনটা আগের দিনের মতো হবে না।
কারণ পৃথিবী বদলাতে শুরু করেছে।
আর সেই পরিবর্তনের আগুন—
এখন সবার ঘর ছুঁয়ে যাচ্ছে।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন