শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬
ইরান যুদ্ধের আড়ালে ইসরায়েল কি লেবানন দখলের চেষ্টা করছে?
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন:
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি কখনোই সরল রেখায় চলে না। এক সংঘাতের আড়ালে আরেকটি সংঘাত, এক যুদ্ধের ছায়ায় আরেকটি কৌশল—এই অঞ্চলের বাস্তবতা প্রায়ই এমনই জটিল। ২০২৬ সালের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ও -এর সরাসরি উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে সীমান্ত। প্রশ্ন উঠছে—এই যুদ্ধ কি কেবল প্রতিরক্ষামূলক, নাকি এর আড়ালে রয়েছে ভূখণ্ড দখলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী দক্ষিণ লেবাননে একটি “নিরাপদ বাফার জোন” তৈরির কথা বলেছেন। তাদের ভাষ্য—উত্তর ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লিতানি নদী পর্যন্ত এলাকা হিজবুল্লাহমুক্ত করা জরুরি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই “বাফার জোন” কতটা সাময়িক? ইতিহাস বলে, নিরাপত্তার অজুহাতে দখল অনেক সময় স্থায়ী রূপ নেয়। ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলের প্রবেশও শুরু হয়েছিল নিরাপত্তার যুক্তিতে, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উপস্থিতিতে রূপ নেয়।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল -বিরোধী অভিযান নয়। বরং একটি বিস্তৃত কৌশল কাজ করছে: অবকাঠামো ধ্বংস: সড়ক, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করে অঞ্চলকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলা; জনশূন্য অঞ্চল তৈরি: “ফ্রি-ফায়ার জোন” বানিয়ে বেসামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনা; দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ: সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে স্থায়ী উপস্থিতির ভিত্তি তৈরি। এই প্রক্রিয়া কার্যত একটি “ডি-ফ্যাক্টো” দখল তৈরি করতে পারে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার না-ও করা হতে পারে।
দক্ষিণ লেবাননের দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমারেখা। এই নদী পর্যন্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণ মানে: হিজবুল্লাহর রকেট হামলার পরিসর কমিয়ে আনা; একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা লাইন তৈরি; সীমান্তে নজরদারি সহজ করা
তবে এর মানে দাঁড়ায়—লেবাননের সার্বভৌম ভূখণ্ডের একটি অংশ কার্যত অন্য একটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া।
ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা এই মুহূর্তে চরমে। ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, নেতৃত্ব সংকট এবং আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বলতা ইসরায়েলের জন্য একটি “উইন্ডো অব অপরচুনিটি” তৈরি করেছে।
সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পরিণতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সিরিয়ার ভূখণ্ড বহুদিন ধরেই হিজবুল্লাহ ও ইরানের সরবরাহ লাইনের অংশ ছিল। সেই নেটওয়ার্ক দুর্বল হওয়ায় দক্ষিণ লেবানন এখন তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন।
ফলে, ইসরায়েল মনে করতে পারে—এখন আঘাত হানার সময়, যখন প্রতিপক্ষ পুরোপুরি সংগঠিত নয়।
কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, দক্ষিণ লেবাননের নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে। ভবিষ্যতে যদি ইরানের সাথে বৃহত্তর কোনো সমঝোতা হয়, তাহলে এই ভূখণ্ড হতে পারে দর-কষাকষির অংশ।
অর্থাৎ, যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যকে কূটনৈতিক টেবিলে রূপান্তর করার একটি পরিকল্পনাও এখানে থাকতে পারে।
একটি সার্বভৌম দেশের ভূখণ্ডে সামরিক প্রবেশ আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। জাতিসংঘের নীতিমালা অনুযায়ী, আত্মরক্ষার যুক্তি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি দখল বৈধতা পায় না।
ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বড় শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে কার্যকর পদক্ষেপ প্রায়ই সীমিত থাকে।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। দক্ষিণ লেবাননে চলমান সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত; খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সংকট তীব্র; অবকাঠামো ধ্বংসে দীর্ঘমেয়াদি মানবিক বিপর্যয়।
এই মানবিক দিকটি অনেক সময় কৌশলগত আলোচনার আড়ালে চাপা পড়ে যায়, কিন্তু বাস্তবতার সবচেয়ে কঠিন অংশ এটি।
এই সংঘাত কেবল ইসরায়েল-লেবানন সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। এর ফলে ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়তে পারে; উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে; বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে।
একটি সীমান্ত সংঘাত খুব দ্রুতই আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে—এটাই মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের শিক্ষা।
১৯৮২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি ছিল। সেই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামরিকভাবে একটি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করা যতটা সহজ, রাজনৈতিকভাবে তা ধরে রাখা ততটাই কঠিন।
আজকের পরিস্থিতি অনেক দিক থেকেই সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে—যদিও প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
সব দিক বিবেচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—ইসরায়েলের বর্তমান পদক্ষেপকে একমাত্র প্রতিরক্ষামূলক বলা কঠিন। এর মধ্যে নিরাপত্তা, কৌশল, ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ এবং কূটনৈতিক হিসাব—সবকিছুই জড়িত।
লেবাননে একটি স্থায়ী “বাফার জোন” তৈরি হলে তা কার্যত আংশিক দখল হিসেবেই বিবেচিত হবে। আর সেটিই হয়তো এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সত্য প্রায়ই বহুস্তরীয়। তাই এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই—ইসরায়েল কি লেবানন দখল করতে চায়?
তবে লক্ষণগুলো বলছে, যুদ্ধের আড়ালে ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন