মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
সমাজ পরিবর্তনের লড়াই শুধু রাজপথে হয় না; তা হয় চিন্তায়, ভাষ্যে, বয়ানে এবং মিডিয়ার পরিসরেও। আধুনিক বিশ্বে মিডিয়া শুধু তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়—এটি জনমত নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। ফলে যারা রাষ্ট্র, সমাজ বা আদর্শিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে, তাদের জন্য মিডিয়া শক্তি অপরিহার্য। কিন্তু ইসলামপন্থী দল ও সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের “মিডিয়া সংকটে”ভুগছ; মূলধারার গণমাধ্যমে উপেক্ষা, নেতিবাচক ফ্রেমিং কিংবা নীতিগত দূরত্ব। এই বাস্তবতায় ইসলামের একটি প্রাচীন অর্থনৈতিক-সামাজিক ধারণা—মুআল্লাফাতুল কুলুব; নতুন প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মুআল্লাফাতুল কুলুব কী?
মুআল্লাফাতুল কুলুব (المؤلفة قلوبهم) বলতে ঐসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বোঝায় যাদের অন্তর ইসলামের প্রতি অনুকূল বা নিকটবর্তী করতে অর্থসহায়তা দেওয়া হয়। এর মূল ভিত্তি এসেছে কুরআনের আয়াতে যাকাত বণ্টনের আটটি খাতের একটি হিসেবে -এর উল্লেখ করে— “যাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন… এবং যাদের অন্তর অনুকূল করা প্রয়োজন (মুআল্লাফাতুল কুলুব)...”
— , সূরা আত-তাওবা ৯:৬০
রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কা বিজয়ের পর বিভিন্ন গোত্রপ্রধানকে অনুদান দিয়েছিলেন, যাতে তারা ইসলাম ও মুসলিম সমাজের প্রতি সদয় থাকে—যা সীরাতগ্রন্থে বিস্তারিত এসেছে, যেমন সীরাতে ইবনে হিশাম-এ। এখানে মূল দর্শন ছিল—সংঘাত নয়, হৃদয় জয়; বিচ্ছিন্নতা নয়, সম্পর্ক নির্মাণ।
অতএব, এটি কেবল দান নয়—বরং একটি কৌশলগত সামাজিক নীতিমালা (strategic social policy)।
মিডিয়া সংকট: বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট
ইসলামপন্থী রাজনীতি বা সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়, তাদের বক্তব্য মূলধারার মিডিয়ায় যথেষ্ট স্থান পায় না—অথবা পেলেও তা সমালোচনামূলক কাঠামোয় উপস্থাপিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে আদর্শগত দূরত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা পারস্পরিক অবিশ্বাস এর পেছনে কাজ করে। ফলত ইসলামপন্থীরা নিজেদের মিডিয়া তৈরি করতে চাইলেও পুঁজি, পেশাদারিত্ব ও নেটওয়ার্কের অভাবে তা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন দাঁড়ায়— এই সংকট মোকাবেলায় মুআল্লাফাতুল কুলুব কিভাবে ভূমিকা পালন করতে পারে।
ইসলামপন্থীদের মিডিয়া সংকট নিরসনে 'মুআল্লাফাতুল কুলুব' খাতটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর মাধ্যমে পুঁজি, পেশাদারিত্ব ও নেটওয়ার্কের ঘাটতি এভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব:
১. পুঁজি ও বিনিয়োগ আকর্ষণ: মুআল্লাফাতুল কুলুবের আওতায় যারা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারী, তাদের এই মহৎ কাজের অংশীদার করার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বড় অংকের পুঁজির সংস্থান করা সম্ভব।
২. পেশাদার জনবল ও দক্ষতা বৃদ্ধি: মিডিয়া সেক্টরে যারা ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও দক্ষ কিন্তু আদর্শিক দূরত্বের কারণে মূলধারার বাইরে আছেন, যাকাতের এই খাতের মাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ত করা সম্ভব। তাদের পেশাদারিত্বকে কাজে লাগিয়ে কন্টেন্টের মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা যায়।
৩. প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক তৈরি: মিডিয়া জগতের নীতিনির্ধারক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরিতে এই খাত ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে করে মূলধারার মিডিয়াতে ইসলামবিদ্বেষী বয়ান বা 'ন্যারেটিভ' পরিবর্তন করা সহজ হয়।
৪. সম্পর্কোন্নয়ন: মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, সম্পাদক, কলামিস্ট ও প্রভাবশালী সাংবাদিকদের সঙ্গে নীতিগত ও পেশাগত সম্পর্ক গড়ে তোলা। এটি ঘুষ বা অনৈতিক প্রভাব নয়; বরং গবেষণা-তথ্য সরবরাহ, ব্রিফিং, সংলাপ, কর্মশালা ও বুদ্ধিবিনিময়ের মাধ্যমে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা।
৫. পেশার মূল্যায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা: সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে উৎসাহিত সাহিত করা এবং তাদের যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা যাতে নতুনরা এ পেশা গ্রহণ করতে উৎসাহিত হয়। প্রয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতে হবে যাতে তৃণমূল পর্যায়ে হকপন্থী মিডিয়া ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। ইসলামপন্থীদের উচিত মিডিয়াকে “শত্রু” হিসেবে না দেখে “স্টেকহোল্ডার” হিসেবে বিবেচনা করা।
৬. সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন: অমুসলিম বা ভিন্ন মতাদর্শী প্রতিভাবান শিল্পী ও কলাকুশলীদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করলে মিডিয়া কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর না হয়ে সর্বজনীন হয়ে ওঠে, যা জনমনে প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হয়।
এক্ষেত্রে মূলনীতি হতে পারে -সংঘাত বাড়িয়ে সমাধান হবে, নাকি সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে?
৭. নৈতিক সীমারেখা:
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—
মুআল্লাফাতুল কুলুব কি আধুনিক কালে অর্থ দিয়ে মিডিয়া প্রভাবিত করার লাইসেন্স?
ইসলামের মৌলিক নীতি হলো ন্যায় ও স্বচ্ছতা। সুতরাং এই খাতের আধুনিক প্রয়োগ যদি হয় অনৈতিক প্রভাব, প্রোপাগান্ডা বা দুর্নীতির মাধ্যমে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ—তাহলে তা ইসলামের চেতনাবিরোধী হবে। বরং এর সঠিক অর্থ হবে—বৈরিতা কমিয়ে বোঝাপড়া বাড়ানো, ভুল ধারণা দূর করা, সংলাপের দরজা খোলা।
৮. ন্যারেটিভ নির্মাণে পেশাদারিত্ব
মিডিয়া শূন্যস্থান পছন্দ করে না। যে পক্ষ তথ্য, বিশ্লেষণ ও মানবিক গল্প সরবরাহ করতে পারে, তার বক্তব্যই প্রাধান্য পায়। ইসলামপন্থীরা যদি গবেষণা সেল, ডেটা টিম ও প্রশিক্ষিত মুখপাত্র তৈরি করে, তাহলে তাদের বক্তব্য আরও গ্রহণযোগ্য হবে। এখানে মুআল্লাফাতুল কুলুব অর্থ হতে পারে—বিতর্ক নয়, ব্যাখ্যা; উত্তেজনা নয়, প্রজ্ঞা।
ডিজিটাল যুগে নতুন সম্ভাবনা
আজকের বিশ্বে মূলধারার মিডিয়া একমাত্র প্ল্যাটফর্ম নয়। সোশ্যাল মিডিয়া, পডকাস্ট, ইউটিউব চ্যানেল—এসবই বিকল্প জনমত নির্মাণের ক্ষেত্র। ইসলামপন্থীরা যদি দক্ষ কনটেন্ট নির্মাতা, গবেষণাভিত্তিক ভিডিও এবং মানবিক বয়ান উপস্থাপন করতে পারে, তাহলে তারা সরাসরি জনগণের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারবে—যা মুআল্লাফাতুল কুলুবের মূল চেতনার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
উপসংহার
মিডিয়া সংকট মূলত আস্থার সংকট। আর আস্থার সংকট দূর করার উপায় শক্তি প্রদর্শন নয়—সম্পর্ক ও স্বচ্ছতা। মুআল্লাফাতুল কুলুব আমাদের শেখায়, সমাজ পরিবর্তনের পথে শুধু মতাদর্শ নয়, হৃদয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামপন্থীদের জন্য এটি একটি আর্থিক খাতের সীমাবদ্ধ বিধান নয়; বরং একটি কৌশলগত দর্শন—যেখানে সংলাপ, সহমর্মিতা ও পেশাদারিত্ব মিলিত হয়।
হৃদয় জয় করতে পারলে, বয়ানও জয় করা যায়। আর বয়ান জয় করতে পারলে, জনমতও বদলানো সম্ভব।#
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন