রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

প্রক্সি রাজপুত্র ও জাদুর পুতুল

বহু বছর আগের কথা। নীল নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা নয়, বরং কল্পনার মানচিত্রে থাকা এক অচিন দেশে একটি বড় রাজ্য ছিল—নাম 'কাল্পনিকপুর'। সেই রাজ্যের রাজা বেশ বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর একমাত্র পুত্র, রাজপুত্র হবুচন্দ্রকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করার তোড়জোড় শুরু হলো। রাজপুত্র হবুচন্দ্র দেখতে-শুনতে বেশ সুপুরুষ। তিনি দামি রেশমি পোশাক পরেন, ভালো মানের রাজকীয় মুকুট মাথায় দেন, আর সিংহাসনে বসে খুব চমৎকারভাবে হাত নাড়তে পারেন। কিন্তু রাজ্যের শাসনকার্য নিয়ে তাঁর তেমন কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তিনি বড়ই আরামপ্রিয় মানুষ। কাল্পনিকপুর রাজ্যে তখন এক অদ্ভুত আইন জারি ছিল। রাজ্যের সবচেয়ে জ্ঞানী ও বৃদ্ধ উজির, যিনি আসলে পুরো রাজ্য চালাতেন, একদিন একটি নতুন 'রাজকীয় ফরমান' জারি করলেন। ফর্মানটির নাম দেওয়া হলো: **"দ্য রয়্যাল আউটসোর্সিং অ্যাক্ট"** (The Royal Outsourcing Act)। সেদিন রাজদরবারে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল। রাজ্যের সব বড় বড় আমলা, সেনাপতি এবং সাধারণ প্রতিনিধিরা উপস্থিত। সিংহাসনে রাজপুত্র হবুচন্দ্র স্বশরীরে বসা। তিনি সুস্থ, সবল, এবং সিংহাসনে আরাম করে বসে একটু পরপর জাদুকরী গ্লাসে পানীয় পান করছিলেন। কিন্তু রাজপুত্র হবুচন্দ্রের সামনে একটা বড় সমস্যা। আজ তাঁকে রাজদরবারে রাজ্যের নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর 'গভীর জ্ঞানগর্ভ' বক্তব্য পেশ করতে হবে। এখন সমস্যা হলো, রাজপুত্রের পড়াশোনার দৌড় অত বেশি দূর নয়। তাঁর জ্ঞান ছিল অনেকটা এমন—"স্কুল কেন, ঘরে বসেই তো সবকিছু গুগল করা যায়।" কাজেই এত জটিল বিষয় নিয়ে কথা বলা তাঁর পক্ষে বড়ই কঠিন। ঠিক এমন সময় উজির মহোদয় রাজদরবারে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত গম্ভীর এবং গর্বের সাথে ঘোষণা করলেন: > *"মহামান্য রাজপুত্র আজ অত্যন্ত সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও, তিনি একটি বিশেষ 'আধ্যাত্মিক নীরবতা' পালন করছেন। তাই রাজ্যের সংবিধান অনুযায়ী, তাঁর পক্ষ থেকে তাঁর বিশেষ উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম সদস্য, জনাব 'প্রক্সি বাহাদুর' বক্তব্যটি পাঠ করবেন।"* > পুরো রাজদরবারে পিনপতন নীরবতা! সবাই একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। এক বিদেশি রাষ্ট্রদূত ফিসফিস করে আরেকজনের কান ভারী করে বললেন, "আচ্ছা, আমি তো জানতাম রাজপুত্ররা শুধু যুদ্ধের সময় প্রক্সি দেয়, কিন্তু নিজের মুখে বলার জন্যও কি প্রক্সি নেওয়া যায়? এটা তো দেখি একটা নতুন যুগের সৃষ্টি হলো!" জনাব 'প্রক্সি বাহাদুর' তখন রাজপুত্রের সামনে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোনটা এমনভাবে সেট করলেন যেন মনে হয় তাঁর মুখের কথাগুলো সরাসরি রাজপুত্রের কণ্ঠস্বর থেকেই বের হচ্ছে। তিনি এমনভাবে আবেগপূর্ণ স্বরে শিক্ষা ব্যবস্থার সুদূরপ্রসারী উপকারিতা বর্ণনা করতে লাগলেন যে, মনে হচ্ছিল তিনিই রাজ্যের আসল হর্তাকর্তা-বিধাতা। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, যখন 'প্রক্সি বাহাদুর' খুব আবেগঘন কথা বলছিলেন, তখন রাজপুত্র হবুচন্দ্র সিংহাসনে বসে একটু পরপর হাততালি দিচ্ছিলেন আর মাথা নাড়ছিলেন। তাঁর সেই মাথা নাড়ার মধ্যে একটা গভীর জ্ঞানের ছাপ ছিল, যা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি বলছেন, "হ্যাঁ, তুমি আমার হৃদয়ের কথাটাই বলছ!" উপস্থিত আমলারাও এই অদ্ভুত নাটকে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। তারা সবাই একমত যে, রাজপুত্রের বংশই সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। রাজপুত্র যদি ভুল কিছুও বলেন, তার জন্যও তো উপদেষ্টা আছে ভুলটাকে সঠিক করার জন্য। সেদিন থেকে কাল্পনিকপুর রাজ্যে নতুন এক নাম চালু হলো—**"প্রক্সি রাজপুত্র"**। রাজ্যের জনগণ রাজপুত্রকে শুধু দেখতেই পায়, তাঁর কথা বা তাঁর চিন্তা-ভাবনা কখনও জানতে পারে না। আর জনাব 'প্রক্সি বাহাদুর' হয়ে উঠলেন সেই রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, যার মুখে রাজপুত্রের আওয়াজ শোনা যায়। তবে রাজ্যের কিছু কৌতূহলী মানুষ এখনও মাঝেমধ্যে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, "আচ্ছা, রাজপুত্রকে কি শুধু রাজ্য চালানোর জন্যই প্রক্সি বাহাদুর দরকার? নাকি তিনি যখন রাতের বেলা গল্প শোনেন, তখনও প্রক্সি বাহাদুর তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে গল্প শোনান?" এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কেউ জানে না, তবে কাল্পনিকপুর রাজ্যে 'প্রক্সি' দেওয়ার শিল্পটি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে, যেখানে সবকিছুই প্রতীকী, আর আসল কাজটা সবসময় পর্দার আড়াল থেকেই হয়! ## **বি: দ্র:** এই গল্পটি একটি রূপক মাত্র এবং কাল্পনিক চরিত্রদের নিয়ে লেখা। বাস্তবতার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, কোনো রাজ্যের পুলিশ আপনাকে ধরে নিয়ে যাবে না। 😉

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন