রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬
গোলাম মোহাম্মদের 'হে সুদূর হে নৈকট্য' শব্দের সৈকতে আধ্যাত্মিক অবগাহন:
আশির দশকের বাংলা কবিতায় গোলাম মোহাম্মদ (১৯৫৯-২০০২) এক নিভৃতচারী অথচ প্রদীপ্ত নক্ষত্র। তাঁর কাব্যজগত কেবল শব্দের কারুকার্য নয়, বরং তাতে রয়েছে কবির অন্তর্জগতের গভীর অভিব্যক্তি। 'হে সুদূর হে নৈকট্য' কাব্যগ্রন্থটি কবির আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার এক প্রামাণ্য দলিল, যেখানে জীবনের নশ্বরতা, স্রষ্টার প্রতি অকৃত্রিম প্রেম এবং প্রকৃতির মরমী রূপ একাকার হয়ে গেছে।
বাংলা কবিতার মানচিত্রে আশির দশক ছিল নানা বাঁকবদলের সময়। আধুনিকতার নামে যখন বিজাতীয় অনুকরণ আর নাস্তিক্যবাদের জয়গান বাজছিল, তখন গোলাম মোহাম্মদ অত্যন্ত ধীরলয়ে উচ্চারণ করেছেন বিশ্বাসের অমিয় বাণী। 'হে সুদূর হে নৈকট্য' কাব্যগ্রন্থ কবি এখানে কেবল শব্দ সাজাননি, বরং তাঁর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আর স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের ব্যাকুলতাকে ছন্দবদ্ধ করেছেন। তিনি এমন এক 'শব্দের সৈকতে' আমাদের নিয়ে যান, যেখানে নীল চোখের মুগ্ধতা আর রহস্যের বিচিত্র ভ্রমণ আমাদের সাধারণ দৃষ্টিকে অতীন্দ্রিয় জগতের দিকে ধাবিত করে।
১. নাম কবিতার দার্শনিক ব্যঞ্জনা: সুদূর ও নৈকট্যের মিলন
কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতাটি মূলত পুরো বইয়ের মূল সুর বা 'কি-নোট'। এখানে 'সুদূর' হলো সেই পরম সত্তা, যিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে, অসীম। আর 'নৈকট্য' হলো সেই অনুভূতি, যা মুমিনের হৃদস্পন্দনে মিশে থাকে। কবি যখন বলেন—
> "চোখ বুজলেই থেমে যায় আলোর প্রিজম / দিন রাত, রাত দিন সমতল অবসর যেন শিল্পখন্ড।"
- তখন বোঝা যায়, তিনি জাগতিক আলোর চেয়ে অন্তরের আলোর ওপর বেশি আস্থাশীল। কবির দৃষ্টিতে পৃথিবীটাA এক ক্ষণস্থায়ী সরাইখানা। তিনি জীবন ও মৃত্যুকে আলাদা করে দেখেননি, বরং বলেছেন:
"প্রসারিত নিদ্রার মধ্যেই অনন্ত জীবনের শুরু।"
- এই পঙ্ক্তিটি কবির মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও প্রস্তুতির স্বাক্ষর বহন করে।
২. আধুনিক নগরজীবনের অবক্ষয় ও প্রকৃতি প্রেম
কবি গোলাম মোহাম্মদ নিসর্গকে দেখেছেন স্রষ্টার নিপুণ কারুকাজ হিসেবে। কিন্তু আধুনিক যান্ত্রিক নগর সভ্যতার কৃত্রিমতা তাঁকে পীড়িত করেছে। 'মাতাল নগর' কবিতায় তাঁর ক্ষোভ ও হাহাকার অত্যন্ত স্পষ্ট:
"যেটুকু সবুজ ছিল ভালোবাসা ছিল / মানুষে মানুষে ছিল সতেজ বন্ধন / ধোয়াহীন বিষহীন শোকহীন ছিল।"
তিনি আজকের নগরকে 'ভোগের নগর' ও 'মাতাল নগর' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মানুষের কৃত্রিম জীবনযাপনের সমালোচনা করে তিনি বলেন:
"ঘুমের বড়ির খোঁজ শিখেছে মানুষ / কৃত্রিম বাঁচার জ্বালা শরীরে ভীষণ।"
এই যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে তিনি ফিরে যেতে চান প্রকৃতির কাছে। 'কেন এত কষ্ট কেন এত সুখ' কবিতায় কবির প্রকৃতি চেতনা এক অনন্য উচ্চতা লাভ করে। শিউলি তলার ঝরা ফুল, আমন ক্ষেতের রোদ আর নদীর মমতা তাঁকে বিমুগ্ধ করে। তিনি প্রশ্ন করেন—
"প্রিয়জনের মুখ কেন বার বার মনে পড়ে / নুয়ে পড়া আমন ক্ষেতে অঘ্রাণের রোদ যেমন আহ্লাদে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।"
৩. মৃত্যুদর্শন: এক শৈল্পিক আলিঙ্গন
সাধারণত মানুষের কাছে মৃত্যু এক বিভীষিকা, কিন্তু গোলাম মোহাম্মদের কবিতায় মৃত্যু এক পরম বন্ধু বা প্রশান্তির ছায়া। 'মৃত্যুর সাথে' কবিতায় তিনি মৃত্যুকে একজন কবির সাথে হেঁটে বেড়াতে দেখেন। তাঁর কাছে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়, বরং মহাজাগতিক ভ্রমণের শুরু। কবির ভাষায়:
"কবির সোনার কাঠিতে নড়ে ওঠে মৃতজীর্ণ ঘাসহীন / প্রান্তর। ... গৃহবধুর ভাঁজ করে রাখা কাপড়ের মত / কবি গুছিয়ে রাখেন নিজের কফিন।"
কফিন গুছিয়ে রাখার এই চিত্রকল্পটি বাংলা সাহিত্যে বিরল। এটি কবির আধ্যাত্মিক পূর্ণতা ও পরকালমুখিতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। আবার 'রাত' কবিতায় তিনি রাতকে কেবল অন্ধকারের আধার হিসেবে দেখেননি, বরং একে ইবাদতের এক অনন্য সুযোগ হিসেবে দেখেছেন:
"তোমার বিনীত রাত সিজদায় হতে পারে / ঝলমলে আলোক রঙিন।"
৪. মানবিকতা ও নারীত্বের মর্যাদা
গোলাম মোহাম্মদের কবিতায় নারী কোনো সস্তা কামনার বস্তু নয়, বরং তিনি নারীকে দেখেছেন মমতা, পবিত্রতা এবং জান্নাতের সুবাস হিসেবে। 'রক্তজবা' কবিতায় একটি ছোট মেয়ে বা কন্যাশিশুর উপস্থিতি যেভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন, তা অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী:
"আমি ভাবতে লাগলাম মেয়ে না থাকলে পৃথিবী কত বর্ণহীন হতো / ফুল না থাকলে বাগান যেমন অর্থহীন লাগে।"
তিনি কন্যাসন্তানকে 'হুরের মত' এবং তাদের উপস্থিতিকে 'বিকেল জান্নাত' বানিয়ে দেওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। এটি ইসলামি মূল্যবোধে নারীর উচ্চাসনেরই এক কাব্যিক বহিঃপ্রকাশ।
৫. স্বদেশপ্রেম ও ইতিহাসের চালচিত্র
কবি গোলাম মোহাম্মদ কেবল আধ্যাত্মিক নন, তিনি ছিলেন একজন সচেতন দেশপ্রেমিক। 'ভালোবাসার ফটোশপ' কবিতায় তিনি বাংলাদেশের শেকড় ও ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন। বুড়িগঙ্গার তামাটে মানুষ, তিতুমীরের পাগড়ি আর বায়তুল মোকাররমের আজান তাঁর কবিতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি ঘোষণা করেন:
"তিতুমীরের পাগড়ী আমাদের ভালবাসার ফটোশপ / রজব আলীর লোহাকাঠের মত রুখে দাঁড়ানো / বর্গী তাড়ানোর কাজিয়া এখন আমাদেরা রপ্ত।"
ঢাকার উঁচু মিনার আর স্বাধীনতার গর্বিত ফলককে তিনি এক সুতোয় গেঁথেছেন, যা তাঁর জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় পরিচয়ের এক সুন্দর সমন্বয়।
৬. মুসলিম উম্মাহর আর্তি ও প্রতিবাদী কণ্ঠ
বিশ্বের কোথাও মুসলিমরা নির্যাতিত হলে কবির কলম গর্জে উঠেছে। 'আনারফুলের গ্রাম' কবিতাটি মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান বা মুসলিম জনপদের এক করুণ চিত্র। যেখানে 'কার্পেট বোম্বিং' আর 'পরাশক্তির অন্ধ চোখের ক্রুদ্ধ আঘাত' শান্তি কেড়ে নিয়েছে, সেখানে ঈদের চাঁদ দেখা দেওয়াকে কবি বিড়ম্বনা মনে করেন। তিনি দাম্ভিক বিশ্বের নেতাদের মিথ্যাচারের প্রতি তীব্র ধিক্কার দিয়ে বলেন:
"সভ্য পৃথিবীর; মিলিত আক্রোশে হারিয়ে গেছে কান্দাহারের চাঁদ / ... পৃথিবী! এখনও কি তুমি মানবতার কথা বলো! ধিক তোমার মিথ্যাচারে।"
কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কবি আশাবাদী। তিনি বিশ্বাস করেন—
"অল্প সংখ্যক ঈমানদারের কাছে বশ্যতা লিখে দেয় পারস্য ও রোম।"
>এই পঙ্ক্তিটি কবির ইতিহাস চেতনা ও ঈমানি দৃঢ়তার পরিচয় দেয়।
৭. শব্দের সৈকতে কবির নিঃসঙ্গতা
একজন কবি যখন সত্যের পথে চলেন, তখন তিনি প্রায়শই একাকী হয়ে পড়েন। 'একা' কবিতায় গোলাম মোহাম্মদ সেই নিঃসঙ্গতাকে বরণ করে নিয়েছেন। তিনি জানেন—
> "মানুষেরা যে আসলেই একা- / একা আসে একা যায়।"
আবার 'কবিরা' কবিতায় তিনি আপোষহীনতার কথা বলেছেন। সমাজের কৃষ্টিহীন হাতগুলোর ঘৃণা সহ্য করেও তিনি তাঁর আদর্শে অবিচল। কবি নিজেকে 'ঘরে আটকা পড়া চড়ুই ছানার' মতো ছটফট করতে দেখলেও সূর্যাস্তের আগেই বিজয়ী হওয়ার সংকল্প করেন।
৮. আধ্যাত্মিক নিবেদন ও প্রার্থনা
কাব্যগ্রন্থের শেষে 'হে ঘুম' এবং 'সিজদার আবে জমজম' কবিতায় কবির আধ্যাত্মিক আকুতি চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। তিনি ৪২ বছরের অসতর্ক ঘুমে অনুতপ্ত হয়ে প্রভুর কাছে মাগফেরাত চান। তিনি চান—
"নিমগ্ন হতে দাও- জিকিরে জিকিরে / ডুবে যেতে দাও অনন্ত সুরের সাথে।"
তাঁর কাছে প্রতিটি সিজদাহ হলো 'আবে জমজম'-এর মতো পবিত্র ও তৃষ্ণা নিবারক। তিনি এক পরম সত্যের জন্য পুরো পৃথিবীকেই তুচ্ছজ্ঞান করেছেন:
"কি আমার ভালোবাসা নগণ্য নিবেদন / সামান্য মূল্যে বেচে ফেলেছি পুরোটা পৃথিবী।"
৯. আঙ্গিক ও ভাষা শৈলী
গোলাম মোহাম্মদের কাব্যভাষা অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ ও চিত্রল। তিনি শব্দ চয়নে যেমন আধুনিক, তেমনিভাবে আল কুরআন ও ঐতিহ্যের শব্দমালা ব্যবহারে দক্ষ। তাঁর কবিতায় 'প্রিজম', 'ইলেক্ট্রন প্রবাহ', 'ফটোশপ'-এর মতো আধুনিক বিজ্ঞানের পরিভাষা যেমন এসেছে, তেমনি 'সিজদাহ', 'মাগফেরাত', 'হেদায়াত'-এর মতো ধর্মীয় শব্দগুলোও শৈল্পিক মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তাঁর রূপক ও উপমাগুলো অত্যন্ত মৌলিক, যেমন— "গৃহবধূর ভাঁজ করে রাখা কাপড়ের মতো কফিন গুছিয়ে রাখা" কিংবা "কষ্টের ইলেকট্রন প্রবাহ"।
উপসংহার: এক অবিনাশী সুরের পথিক
গোলাম মোহাম্মদের 'হে সুদূর হে নৈকট্য' কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি আত্মিক প্রশান্তির এক তপোবন। তিনি আশির দশকের সেই বিরল কবিদের একজন, যিনি আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনের যুগেও নিজের শেকড় ও বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। তাঁর কবিতায় স্রষ্টা ও সৃষ্টি, ইহকাল ও পরকাল, প্রেম ও দ্রোহ এমনভাবে মিশে গেছে যে তা পাঠককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। নিভৃতচারী এই কবির কাব্যধারা বাংলা সাহিত্যে চিরকাল এক শুদ্ধতম স্রোত হিসেবে প্রবাহিত থাকবে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, শব্দের সৈকতে দাঁড়িয়ে কীভাবে অনন্তের ডাক শুনতে হয় এবং কীভাবে 'নীল মৃত্যুর মুখোমুখি' দাঁড়িয়েও প্রশান্তির হাসি হাসতে হয়।
গোলাম মোহাম্মদের এই কাব্যসম্ভার কেবল আলোচনার বিষয় নয়, বরং তা হৃদয়ে ধারণ করার মতো এক ঐশ্বরিক সম্পদ। তাঁর প্রতিটি পঙ্ক্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— জীবন ছোট, কিন্তু সত্য ও সুন্দরের পথ অন্তহীন।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন