শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

হাসান আলীমের শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু কবিতায় স্বাধীনতা ও সংগ্রামচেতনা

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন ১. ভূমিকা: পিতার রক্তে লেখা বিপ্লবের পাঠ হাসান আলীমের ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’ কেবল একটি কবিতা নয়, এটি এক আত্মজৈবনিক ইশতেহার। এখানে পিতা একাধারে শিল্পী, প্রকৌশলী, সংগ্রামী পুরুষ এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শের উত্তরাধিকারী। তাঁর মধ্য দিয়েই কবি স্বাধীনতা, জিহাদ ও শাহাদাতের চেতনাকে ব্যক্তিগত থেকে জাতীয়, আধ্যাত্মিক থেকে রাজনৈতিক পরিসরে বিস্তৃত করেছেন। ২. নির্মাণ ও প্রতিরোধ: সংগ্রামের দ্বৈত রূপ কবিতার শুরুতে পিতা ‘সুদৃশ্য ইমারত’ নির্মাণকারী প্রকৌশলী। কিন্তু এই নির্মাণ নিছক ইট-পাথরের নয়, এটি নতুন জনপদ গড়ার উল্লাস: যার রক্তের স্রোতে পদ্মার অবাধ্য বুক দুলে উঠতো। নতুন জনপদ সৃষ্টির উল্লাসে তিনি একজন অম্লান যুবক। আবার সেই পিতাই ‘পাথর বৃষ্টিতে সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত হয়ে গেলেও / যার নির্মাণ কৌশল বন্ধ হয়ে যায় নি।’ এখানে স্বাধীনতা দুটি স্তরে কাজ করে — এক, উপনিবেশ ও শোষণের বিরুদ্ধে নতুন সমাজ নির্মাণ; দুই, নির্যাতন সত্ত্বেও আদর্শ থেকে সরে না আসার অটলতা। এই দ্বৈততা-ই আলীমের সংগ্রামচেতনার মূল। ৩. ক্ষমা ও ন্যায়: নবী-আদর্শের রাজনীতি কবি পিতার চরিত্রে হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও হযরত হামযা (রা.)-এর ছায়া ফেলেছেন। ক্ষমার প্রসঙ্গে বলেন: তাঁর হৃদয়ে ছিল একটি 'হীরামন' পাখি তাজা কলিজা চিবিয়ে খেয়েছিল যে পিতৃব্য হন্তারক তাকে তিনি মারাত্মক রকম ক্ষমা করে দিলেন। এটি ওহুদের যুদ্ধে হামযা (রা.)-এর কলিজা ভক্ষণকারী হিন্দাকে রাসূল (সা.)-এর ক্ষমার ইঙ্গিত। ফলে আলীমের স্বাধীনতা-চেতনা প্রতিশোধমুখী নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্য ক্ষমা ও দৃঢ়তার সমন্বয়। কিন্তু জালিমের বিরুদ্ধে তিনি আপসহীন: কোরান আমাদের সংবিধান, রাসূল আমাদের নেতা, জেহাদ আমাদের কর্মপদ্ধতি শাহাদাৎ আমাদের কাম্য। এই চার দফা ঘোষণা কবির রাজনৈতিক-আদর্শিক মানচিত্র। এখানে স্বাধীনতা মানে পশ্চিমা ধাঁচের ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ইনসাফের সমাজ। ৪. শ্বাপদ অরণ্য: নব্য-উপনিবেশের রূপক দ্বিতীয় স্তবকে কবি সমকালকে দেখেন ‘শ্বাপদ অরণ্য’ হিসেবে। এখানে রাষ্ট্র, মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী সবাই শোষকের সহযোগী: ইচ্ছে হয় / এই সব অর্বাচীন সাংবাদিকসহ বেশ্যালয় সমৃদ্ধ প্রাসাদ নগরী নিমিষে ধ্বংস করে দেই / অথবা একটি প্রচণ্ড ধমকে নিভে যাক যত কৃত্রিম বাতি ‘রঙিন মাছের মত শৈবাল সমৃদ্ধ হাউজে জলকেলি’ করা এলিটদের বিপরীতে ‘হাড্ডিসার শরীর’ নিয়ে বেঁচে থাকা মজলুমের ছবি আঁকেন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও ‘জাতীয় বেঈমানদের দস্যুবৃত্তি, সুগভীর ষড়যন্ত্র’ চলছে, ‘এক হাতে বন্দুক ধরে বলছে: মার্ক্সের বালাখানায় ভূরিভোজ হবে’। ফলে আলীমের কাছে সংগ্রাম শেষ হয়নি; একাত্তরের অসমাপ্ত কাজ শেষ করাই আজকের জিহাদ। ৫. অগ্নিশিশু: প্রজন্মান্তরের শপথ ‘অগ্নিশিশু’ রূপকে কবি নিজেকেই বোঝান — পিতার রক্ত ও আদর্শ বুকে নিয়ে জন্ম নেওয়া নতুন যোদ্ধা। পিতার শাহাদাত তাঁকে ভাঙেনি, বরং দায়িত্ব দিয়েছে: আমাদের পিতা যে সত্যের জন্য জান দিলেন সেই ঘর গড়ে নিতে হবে আমাদেরই। প্রতিটি কণা থেকে চমকে উঠুক তীর্ষক শাসন। ‘পিতার রক্তাক্ত পানজাবী গায়ে দিলে শরীরের প্রতিটি কোষে প্রবাহিত হবে আনবিক ঝড়’ — এই পঙ্‌ক্তি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিপ্লবের জিনগত সঞ্চারণ বোঝায়। স্বাধীনতা তাই উত্তরাধিকার, যা রক্ষার জন্য প্রতিটি ‘অগ্নিশু’কে রাজপথে নামতে হবে। ৬. সংগ্রামের নন্দনতত্ত্ব: কুরআনী রেফারেন্স ও গণঅভ্যুত্থান কবি বারবার কুরআনের আয়াতের ভাবানুবাদ ব্যবহার করে সংগ্রামকে ইবাদতে রূপ দেন। জালিম জনপদ থেকে মুক্তির প্রার্থনায় সূরা নিসার ৭৫ নং আয়াত তুলে ধরেন: "তোমাদের কি হয়েছে? / স্ত্রীলোক, / তোমরা কেন সংগ্রাম করছো না আল্লার পথে, সেই সব পুরুষ, শিশুদের জন্য-যারা দুর্বল, যারা নিপীড়িত হচ্ছে..." এটি কবির কাছে কেবল দোয়া নয়, গণজাগরণের ডাক। তাই তিনি ‘বুনিয়ানুম মারসুস’ — সীসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যের কথা বলেন। শেষ স্তবকে ‘সূর্যের আকাশ’, ‘কালো পাথর চুম্বন’, ‘দীপ্ত আরাফাত’ — হজের রূপক দিয়ে বোঝান, চূড়ান্ত মুক্তি আসবে তাওহিদভিত্তিক বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বে। ৭. উপসংহার: নির্মাণের শপথে অসমাপ্ত কবিতা ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’ শেষ হয় না, এটি চলমান প্রজেক্ট। পিতার ‘অসমাপ্ত কাজ সম্প্রসারিত হয়ে যায়’ বলেই কবি-পুত্র ঘোষণা করেন: আমরা এই রকম একটি গৃহ নির্মাণ করতে চাই যেখানে কোন প্রতিকৃতি থাকবে না / নগ্ন ভেনাস মূর্তির ভগ্নাবশেষ মুক্ত / এমন কিছু ছবি থাকবে যার দিকে তীক্ষ্ণ চোখ ফেল্লে দৃষ্টিশক্তি উজ্জ্বল আর বিস্তারিত হয়ে যায় এই গৃহই আলীমের স্বাধীনতার রূপক — শিরক, অশ্লীলতা ও শোষণমুক্ত ইনসাফের সমাজ। সেখানে ‘মুকাদ্দাসে তুয়া’র ছবি বক্ষে ধরলেই মানুষ শক্তি ফিরে পায়। সারকথা: হাসান আলীমের স্বাধীনতা-চেতনা একাত্তরের রক্ত থেকে উৎসারিত, কিন্তু তার গন্তব্য নবী-আদর্শের আলোকে নতুন সভ্যতা নির্মাণ। তাঁর সংগ্রাম বন্দুকের পাশাপাশি কলমের, ঘৃণার পাশাপাশি ক্ষমার, ধ্বংসের পাশাপাশি নির্মাণের। তাই ‘শ্বাপদ অরণ্যে’ জন্ম নেওয়া প্রতিটি ‘অগ্নিশু’র জন্য এই কবিতা একই সঙ্গে শোকগাথা, রণ-সংগীত ও ভবিষ্যতের ব্লু-প্রিন্ট। প্রবন্ধটি সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতায় প্রকাশযোগ্য আকারে বিন্যস্ত করা হয়েছে। কবির অন্যান্য কবিতা পেলে তুলনামূলক আলোচনা আরও সমৃদ্ধ করা যাবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন