বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬
দিন-রাত্রির রহস্য: পৃথিবীর লাটিম আর চাঁদের দেশ
টিনটিন আর তার ছোট বোন টুনি প্রতিদিন বিকেলে ছাদে এসে খেলা করে। কিন্তু আজকের বিকেলটা একটু অন্যরকম। সূর্য মামা যখন লাল টোপর পরে পশ্চিম আকাশে ডুব দিচ্ছে, ঠিক তখনই পূর্ব আকাশে গোল থালার মতো রুপোলি চাঁদ মামা উঁকি দিল।
টুনি হাততালি দিয়ে বলে উঠল, "ভাইয়া, দেখো দেখো! সূর্য মামা ঘুমাতে যাচ্ছে আর চাঁদ মামা ডিউটি করতে চলে এসেছে। আচ্ছা, এই দিন আর রাত কেন হয় বলো তো?"
টিনটিন ক্লাস ফাইভে পড়ে, সে একটু বিজ্ঞের মতো গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, "উঁহু টুনি, সূর্য কিন্তু কোথাও যায় না। আমাদের পৃথিবীটা লাটিমের মতো নিজের জায়গায় বনবন করে ঘোরে। যেদিকটা সূর্যের সামনে আসে সেদিকটা দিন, আর উল্টো দিকটায় রাত!"
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা চেনা গলা শোনা গেল, "একদম ঠিক বলেছিস টিনটিন! কিন্তু তোরা কি জানিস, এই দিন-রাতের খেলাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে?"
ঘুরে তাকিয়ে বাচ্চারা দেখল তাদের দাদুভাই হাতে দুটো গরম জিলিপি নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। দাদুভাই এসে ওদের পাশে বসলেন। টুনি জিলিপিতে কামড় দিয়ে বলল, "দিন-রাতের খেলা আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে? কীভাবে দাদুভাই?"
দাদুভাই আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন এক রূপকথার মতো সত্যি গল্প:
### মহাকাশের আজব রাজ্য
দাদুভাই বললেন, "শোন টুনি, আমাদের এই মহাবিশ্বটা একটা মস্ত বড় রাজ্য। আর সূর্য মামার পরিবারে আমাদের পৃথিবীর আরও অনেক ভাইবোন আছে। যেমন—বুধ, শুক্র, আর মঙ্গল। কিন্তু তারা কেউ পৃথিবীর মতো লক্ষ্মী নয়!
সবচেয়ে কাছে থাকা **বুধ ভাইয়া** এত অলস যে, নিজের জায়গায় ঘুরতেই চায় না! তার একটা দিন হতে আমাদের পৃথিবীর প্রায় ২৭ দিন লেগে যায়। ভাব তো একবার! একটানা ২৭ দিন শুধু রোদ আর রোদ! গরমে বুধের একপাশ ৩৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পুড়ে কয়লা হয়ে যায়, আর অন্যপাশে সূর্য পৌঁছায় না বলে মাইনাস ১৭০ ডিগ্রি শীতে বরফ হয়ে যায়! সেখানে কি কেউ বাঁচতে পারবে?"
টুনি চোখ বড় বড় করে বলল, "বাপরে! ২৭ দিন ধরে দুপুরবেলা? আমি তো রোদে কালো ভূত হয়ে যাব!"
টিনটিন বলল, "আর শুক্র গ্রহের কী অবস্থা দাদুভাই?"
দাদুভাই হাসলেন, "ওরে বাবারে, **শুক্র বোনটি** আরও অদ্ভুত! সে এত আস্তে ঘোরে যে তার একটা দিন হতেই ১২১ দিন পার হয়ে যায়! সেখানে এত গরম যে লোহাও গলে জল হয়ে যাবে। আর আমাদের পাশের বাড়ির **মঙ্গল দাদু**? মঙ্গলের দিন-রাত আমাদের পৃথিবীর মতোই। কিন্তু সে সূর্য থেকে এত দূরে থাকে যে, দিনেই কনকনে ঠাণ্ডা, আর রাতে মাইনাস ৮৬ ডিগ্রি শীত! রক্ত জমে আইসক্রিম হয়ে যাবে!"
### আমাদের রূপসী চাঁদ ও জাদুকরী পৃথিবী
টুনি তখন আকাশের চাঁদের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, "দাদুভাই, তাহলে আমাদের এই মিষ্টি চাঁদ মামার বাড়ি কেমন?"
দাদুভাই বললেন, "চাঁদকে দূর থেকে দেখতেই সুন্দর রে দিদিভাই! চাঁদ আর পৃথিবী কিন্তু সূর্য থেকে একই দূরত্বে আছে। কিন্তু চাঁদের কোনো বাতাস নেই, আর সে ঘোরেও খুব আস্তে। তাই চাঁদের যেদিকে রোদ পড়ে, সেদিকটা ফুটন্ত জলের চেয়েও বেশি গরম হয়ে যায়—১১৭ ডিগ্রি! আর উল্টো পিঠের অন্ধকার দিকটা মাইনাস ১৬৩ ডিগ্রি জমে পাথর! চাঁদের একপাশে গেলে তুই পুড়ে যাবি, আর অন্যপাশে গেলে জমে যাবি!"
টিনটিন অবাক হয়ে বলল, "তার মানে দাদুভাই, আমাদের পৃথিবী যদি ওই গ্রহগুলোর মতো খুব আস্তে ঘুরত, তাহলে আমাদেরও একপাশ পুড়ে ছাই হয়ে যেত আর অন্যপাশ বরফ হয়ে যেত?"
"একদম তাই!" দাদুভাই টিনটিনের পিঠ চাপড়ে বললেন, "আল্লাহ তায়ালা আমাদের পৃথিবীকে ঠিক ততটুকুই গতি দিয়েছেন, যাতে ১২ ঘণ্টায় দিন আর ১২ ঘণ্টায় রাত হয়। দিন ভরে আমরা কাজ করি আর সূর্য মামার আলো থেকে শক্তি নিই, আর রাত হলেই পৃথিবীটা ঠাণ্ডা হয়ে যায়, আমরা শান্তিতে ঘুমোতে পারি। এই নিখুঁত নিয়মের জন্যই পৃথিবীতে গাছপালা, ফুল-ফল আর আমরা মানুষরা বেঁচে আছি। কোরআন শরীফেও আল্লাহ বারবার বলেছেন, এই দিন আর রাতের পরিবর্তন হলো বুদ্ধিমান মানুষদের জন্য একটা মস্ত বড় নিদর্শন, যাতে আমরা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হই।"
### যদি রাত না ফুরোত?
টুনি জিলিপি শেষ করে বলল, "দাদুভাই, এমন কোনো জায়গা আছে যেখানে শুধুই দিন থাকে, কখনো রাত হয় না?"
দাদুভাই বললেন, "মহাকাশে এমন অনেক জায়গা আছে টুনি। আমাদের তো একটাই সূর্য। কিন্তু মহাকাশে এমন অনেক গ্রহ আছে যাদের দুটো বা তিনটে করে সূর্য আছে! ওদের বলা হয় 'বাইনারি সিস্টেম'। সেখানে একটা সূর্য ডুবলে আরেকটা সূর্য উঠে পড়ে। ফলে সেখানে কখনোই রাত হয় না, শুধুই দিন! ভাব তো, যদি কখনো রাত না হতো, আমরা ঘুমোতাম কখন? আমাদের শরীর তো একদম নষ্ট হয়ে যেত! তাই আল্লাহ আমাদের ভালোবেসে রাত বানিয়েছেন বিশ্রামের জন্য।"
টিনটিন বলল, "আর যদি শুধুই রাত থাকত?"
"তাহলে গাছপালা আলো পেত না, কোনো খাবার তৈরি হতো না। তীব্র শীতে পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত। তাই তো দিন আর রাত একে অপরের পেছনে চোরের মতো দৌড়ায়, কেউ কাউকে ছাড়িয়ে যায় না।"
ছাদে তখন হালকা ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। দাদুভাইয়ের গল্প শেষ হতে না হতেই চারপাশটা বেশ অন্ধকার হয়ে এল। আকাশের তারাগুলো যেন মিটিমিটি করে হেসে দাদুভাইয়ের কথার সাক্ষ্য দিল।
টুনি আর টিনটিন দুজনে মিলে আকাশ পানে হাত জোড় করে বলল, "ধন্যবাদ আল্লাহ, আমাদের এত সুন্দর একটা পৃথিবী আর মিষ্টি দিন-রাত উপহার দেওয়ার জন্য!"
দাদুভাই বললেন, "চলো এবার নিচে চলো, লক্ষ্মী সোনাদের এখন পড়তে বসার 'দিন', তারপর আসবে ঘুমের 'রাত'!" দুই ভাইবোন হাসতে হাসতে দাদুভাইয়ের হাত ধরে ছাদ থেকে নেমে গেল।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন