শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু: হাসান আলীমের কাব্যে স্বাধীনতা ও সংগ্রামের পূর্ণপাঠ

কবি হাসান আলীমের ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’ ছয় খণ্ডে বিন্যস্ত এক দীর্ঘ কবিতা, যা একই সঙ্গে আত্মজীবনী, ইশতেহার ও দোয়া। এখানে স্বাধীনতা কোনো তারিখ নয়, এটি একটি চলমান নির্মাণ প্রকল্প। সংগ্রাম কোনো স্লোগান নয়, এটি পিতার রক্ত, পুত্রের বুকের জলপ্রপাত এবং পানকৌড়ির ডুবসাঁতার। ১. শুরুতে আলিঙ্গন: মুক্তির আধ্যাত্মিক ভিত্তি কবিতা শুরু হয় যুদ্ধের ডাক দিয়ে নয়, একটি আর্তি দিয়ে: আমাকে একটি আলিঙ্গন দাও / আমার এই বিক্ষত বুকের মধ্যে রাতদিন কেবল তুমুল জলপ্রপাত এই ‘তুমি’ একাধারে প্রেমাস্পদ, রাসূল ও আল্লাহ। আলীম বোঝান, বাইরের শোষণ থেকে মুক্তির আগে ভেতরের শূন্যতা ভরতে হয়। তাই তিনি ‘মেরাজ’ চান: আমাকে একটি মেরাজ দাও, হে কাঙ্ক্ষিত পুরুষ—আমার কম্পিত শরীরটাকে তোমার বাহুলগ্ন কর, তোমার ছয়শত পাখার উষ্ণ আরামে আমাকে পৌঁছে দাও সিদ্রাতুল মোন্তাহায় এখানে স্বাধীনতার প্রথম স্তর আধ্যাত্মিক। চাঁদ দ্বিখণ্ডনের মতো অলৌকিক বিশ্বাস ছাড়া ‘দগদগে রাজপথ থেকে বিপরীত উচ্চারণ’ সম্ভব নয়। ২. পিতা প্রকৌশলী: নির্মাণই প্রতিরোধ দ্বিতীয় স্তরে আসেন পিতা, যিনি কবির রাজনৈতিক আদর্শের উৎস: আমার পিতা ছিলেন একজন শিল্পী, একজন নিপুণ প্রকৌশলী; যার সোনালী আঙুল নির্মাণ করে দিত সুদৃশ্য ইমারত। তাঁর রক্তে ‘পদ্মার অবাধ্য বুক দুলে উঠতো’, তিনি ‘নতুন জনপদ সৃষ্টির উল্লাসে অম্লান যুবক’। আবার তিনিই: প্রিয়নেতা মুহাম্মদ (স)-এর একজন ঘনিষ্ঠ ছাত্র / পাথর বৃষ্টিতে সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত হয়ে গেলেও যার নির্মাণ কৌশল বন্ধ হয়ে যায় নি। পিতার হৃদয়ে ‘হীরামন পাখি’, যিনি হামজা (রা.)-এর হত্যাকারীকে ‘মারাত্মক রকম ক্ষমা’ করেন। এই ক্ষমা দুর্বলতা নয়, এটি রাষ্ট্র নির্মাণের কৌশল। পিতা সন্তানকে বলেন: যারা সাহসী কৃষক কেবল তারাই সংসারে সুখ ফলাতে পারে অর্থাৎ স্বাধীনতা মানে জমি চাষ, ঘর বাঁধা, প্রজন্ম তৈরি। ৩. শ্বাপদ অরণ্য: স্বাধীনতার পরের যুদ্ধ পিতার মৃত্যুর পর কবি দেখেন দেশ বদলেছে, মুক্তি আসেনি: এখন সকলেই রঙিন মাছের মত শৈবাল সমৃদ্ধ হাউজে জলকেলি করে। রোদগলা রাজপথে আমাদের হাড্ডিসার শরীর নিয়ে ব্যবসা করে। এই অরণ্যে ‘অর্বাচীন সাংবাদিক’, ‘বেশ্যালয় সমৃদ্ধ প্রাসাদ নগরী’, ‘জাতীয় বেঈমানদের দস্যুবৃত্তি’। কবি ক্ষুব্ধ: ইচ্ছে হয়... লুত নগরীর মত উল্টে যাক অভিশপ্ত জনপদ এখানে শত্রু বহুমুখী। ‘এক হাতে বন্দুক ধরে বলছে: মার্ক্সের বালাখানায় ভূরিভোজ হবে’, অন্যদিকে ‘জালালী কবুতর ছিঁড়ে কুরে ইহুদীর রাজধানী গড়ছে’। আলীমের উত্তর স্পষ্ট, পিতার কণ্ঠে: কোরান আমাদের সংবিধান, রাসূল আমাদের নেতা, জেহাদ আমাদের কর্মপদ্ধতি শাহাদাৎ আমাদের কাম্য। এবং কুরআনের প্রতিধ্বনি: "যারা আল্লার পথে জীবন দিয়েছে মৃত মনে করোনা তোমরা তাদের বরং তারাতো জীবিত।" ### ৪. অগ্নিশিশুর জন্ম: রাইফেল যখন বাউল এই অরণ্যেই জন্ম নেয় ‘অগ্নিশিশু’। কবি প্রার্থনা করেন: আমাকে এমন একটি রাত উপহার দাও যেন আমার গর্ভের সন্তানেরা এক একটা বিপ্লবী আক্কানীর মত উপল উপত্যকা পেরিয়ে আসে। সন্তান এখানে আদর্শ। তার চোখে ‘ইব্রাহীমের জ্যোতির্ময় সাহস’। এই জন্মের জন্য অস্ত্র ও সংস্কৃতি এক হয়: আমার হাতের রাইফেল যার পবিত্র মুখ থেকে জন্মভূমির জন্য আশীর্বাদ ঝরেছে... সেই রাইফেল থেকে বাউলের কণ্ঠ বের হ'ল "খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়..." আলীমের স্বাধীনতা তাই দুই ধারায় চলে। একটি ধ্বংস করে ‘সাদ্দাতের বেহেস্ত’, অন্যটি গড়ে ‘হীরামন পাখির দেশে’ নির্ভয় গান। ৫. পানকৌড়ি ও আঁধার গাঁ: নিঃসঙ্গ বিপ্লবীর মানচিত্র কবিতার সবচেয়ে ব্যক্তিগত রূপক ‘পানকৌড়ি’: পানকৌড়ি! আর কতকাল অগাধ জলের ভেতরে বোবা কান্নায় চলবে একাকী পথ। পানকৌড়ি ডুবে মাছ ধরে, ভেসে ওঠে। বিপ্লবীও গোপনে সংগঠন করে, প্রকাশ্যে আঘাত করে। কবি তাকে বলেন পাখার ধারে ‘কেটে যাক সব জঞ্জাল, শৈবাল পচা দাম’। একই নিঃসঙ্গতা ‘আঁধার গাঁয়ের কথা’য়: আমরা এখন গভীর রাতে বনের ভেতর বাঘের সাথে বসত করি এক জামাতে। বাপের কালের ভিটে মাটি সকল কিছু হারিয়ে ফেলে এখানে স্বাধীনতা মানে হারানো ভিটে ফিরে পাওয়া, ‘পিদিম জ্বেলে ঘরের মেঝে খেজুর-পাটি বিছিয়ে’ আবার কুরআন পড়া। ৬. শেষ শপথ: বুনিয়ানুম মারসুস কবিতা শেষ হয় নির্মাণের আহ্বানে, ধ্বংসের নয়: আমাদের পিতা যে সত্যের জন্য জান দিলেন সেই ঘর গড়ে নিতে হবে আমাদেরই। এই ঘরের ভিত্তি ‘বুনিয়ানুম মারসুস’, সীসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্য। পিতার ‘রক্তাক্ত পানজাবী’ গায়ে দিলে ‘শরীরের প্রতিটি কোষে প্রবাহিত হবে আনবিক ঝড়’। মতিউর রহমান মল্লিককে লেখা চিঠিতে কবি নিজেকে ‘খাকসার বড় গোনাহগার’ বলেন, তবু শহীদদের রক্তকে ‘উর্বর ঊষর জমিন’ বলেন। তিনি ‘শাব্বিরের কলিজা’র কথা স্মরণ করে বলেন, ত্যাগ ছাড়া কোনো গৃহ দাঁড়ায় না। শেষে তিনি ঘোষণা করেন: আলোর পাখীরা পাখা মেলে দাও ঊর্ধ্বাকাশে... দুইবার মরে না কেউ। মৃত্যু সেতো হবেই একবার। ### উপসংহার ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’তে হাসান আলীম স্বাধীনতাকে তিন স্তরে দেখেন। প্রথম, ব্যক্তির মেরাজ। দ্বিতীয়, পিতার মতো প্রকৌশলীর হাতে সমাজ নির্মাণ। তৃতীয়, পানকৌড়ির মতো নিঃসঙ্গ কিন্তু নিরন্তর ডুবসাঁতারে শ্বাপদ অরণ্য পরিষ্কার করা। তাঁর সংগ্রামচেতনা প্রতিশোধমুখী নয়, এটি ‘হীরামন’ পাখির ক্ষমা ও ‘কোরান আমাদের সংবিধান’ এর দৃঢ়তার মিশ্রণ। তিনি রাইফেলকে বাউল করেন, শহীদকে বীজ করেন, আর অগ্নিশিশুকে ভবিষ্যতের কৃষক করেন। তাই আজ, যখন ‘পদ্মা, মেঘনা, যমুনার তীরে তীরে মুক্তি পিয়াসী বনিআদমের শ্লোগান’ আবার ওঠে, আলীমের কবিতা মনে করিয়ে দেয়: স্বাধীনতা একবার অর্জিত হয়, কিন্তু প্রতিদিন তাকে আলিঙ্গন করে, মেরাজে নিয়ে, এবং পাথরের বুকে আঘাত করে নতুন করে জন্ম দিতে হয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন