শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬
শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু: হাসান আলীমের কবিসত্তা, ভাষা ও মুক্তির দর্শন
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
ভূমিকা:
অরণ্যের ভেতর যে শিশু আগুন হয়ে জ্বলে
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর কবিতায় দুটি প্রধান স্রোত পাশাপাশি বয়ে গেছে। একদিকে নাগরিক আধুনিকতা, বাম প্রগতিশীলতা ও ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ। অন্যদিকে ফরুখ আহমদ, আল মাহমুদ, মতিউর রহমান মল্লিকদের হাত ধরে গড়ে ওঠা ঈমান-ভিত্তিক সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ। হাসান আলীম দ্বিতীয় ধারার কবি, কিন্তু তিনি অনুকরণ করেন না। তাঁর ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’ পড়লে বোঝা যায়, তিনি একই সঙ্গে মরমি বাউল, কুরআনের তিলাওয়াতকারী, রাজনৈতিক ইশতেহার লেখক এবং একজন শোকাহত পুত্র।
কবিতাটি ছয়টি খণ্ডে লেখা, প্রায় মহাকাব্যিক দৈর্ঘ্যের। শুরু হয় ব্যক্তিগত আলিঙ্গনের আকুতি দিয়ে, শেষ হয় ‘বুনিয়ানুম মারসুস’ বা সীসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যের ডাকে। মাঝখানে আছে পিতার শাহাদাত, শহরের পচন, পানকৌড়ির নিঃসঙ্গ ডুব, এবং শহীদ মালেক-সাব্বিরের স্মৃতি। এই বিস্তৃত পরিসরে আলীম স্বাধীনতাকে কেবল ১৯৭১-এর রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে স্বাধীনতা তিন স্তরের মুক্তি: নফসের দাসত্ব থেকে মেরাজ, সাংস্কৃতিক উপনিবেশ থেকে আত্মপরিচয়, এবং অর্থনৈতিক শোষণ থেকে ইনসাফ।
কবিসত্তার নির্মাণ: পুত্র, প্রেমিক ও প্রকৌশলী
আলীম নিজেকে কখনো ‘অগ্নিশিশু’, কখনো ‘পানকৌড়ি’, কখনো ‘খাকসার বড় গোনাহগার’ বলেন। এই তিনটি পরিচয় তাঁর কবিসত্তার মূল।
প্রথম পরিচয় পুত্র। পুরো কবিতার কেন্দ্রে আছেন পিতা:
আমার পিতা ছিলেন একজন শিল্পী, একজন নিপুণ প্রকৌশলী; যার সোনালী আঙুল নির্মাণ করে দিত সুদৃশ্য ইমারত।
পিতা শুধু জন্মদাতা নন, তিনি রাসূলের ছাত্র, যিনি ‘পাথর বৃষ্টিতে সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত হয়ে গেলেও যার নির্মাণ কৌশল বন্ধ হয়ে যায় নি’। পিতার বুকে ‘হীরামন পাখি’, তিনি হামজা (রা.)-এর হত্যাকারীকে ক্ষমা করেন। এই পিতাই পুত্রকে দায়িত্ব দেন, ‘যারা সাহসী কৃষক কেবল তারাই সংসারে সুখ ফলাতে পারে’। ফলে কবির সংগ্রাম পিতৃঋণ শোধের চেষ্টা।
দ্বিতীয় পরিচয় প্রেমিক। কবিতার প্রথম পঙ্ক্তি:
আমাকে একটি আলিঙ্গন দাও / আমার এই বিক্ষত বুকের মধ্যে রাতদিন কেবল তুমুল জলপ্রপাত
এই আলিঙ্গন কামনা শরীরী নয়, আধ্যাত্মিক। তিনি ‘একটি মেরাজ’ চান, ‘ছয়শত পাখার উষ্ণ আরামে’ সিদ্রাতুল মুনতাহায় পৌঁছাতে চান। প্রেম এখানে শক্তি সঞ্চয়ের উৎস। যখন বুক ভরে, তখনই তিনি বলেন, ‘আমার সিনা থেকে বের হোক নগর বিধ্বংসী আয়াত’।
তৃতীয় পরিচয় প্রকৌশলী। পিতার মতো তিনিও নির্মাতা, কিন্তু তাঁর উপকরণ ইট নয়, শব্দ। তিনি বলেন, ‘আমার হাতের রাইফেল... সেই রাইফেল থেকে বাউলের কণ্ঠ বের হ'ল "খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়"’। অস্ত্র ও গানকে এক করা এই কবির বিশেষত্ব।
ভাষা ও চিত্রকল্প: কুরআন, বাউল ও আধুনিকতার সংঘাত
আলীমের ভাষা মিশ্র। একদিকে আরবি-ফারসি শব্দ: মেরাজ, সিদ্রাতুল মুনতাহা, জেহাদ, শাহাদাত, বুনিয়ানুম মারসুস, তশবী, রেহেল। অন্যদিকে একেবারে গ্রামীণ বাংলা: ‘কাঁথাঝুল খুপরি’, ‘পিদিম জ্বেলে’, ‘খেজুর-পাটি’, ‘শবনম ঘাস’। আবার আধুনিক পশ্চিমা রেফারেন্স: ‘মার্ক্স, নীটশে, এঙ্গেলস’, ‘মোজার্ট, মোনালিসা, ভ্যানগগ’, ‘ভেনাসের নগ্ন ছবি’।
এই মিশ্রণ ইচ্ছাকৃত। তিনি পশ্চিমা সংস্কৃতিকে ‘ধূলি ধূসরিত’ বলে ছুঁড়ে ফেলেন ‘এঁদো পুকুরে’, কারণ তা ‘নগ্ন ভেনাস মূর্তির ভগ্নাবশেষ’। বিপরীতে তিনি চান এমন শিল্প:
যার দিকে তীক্ষ্ণ চোখ ফেল্লে দৃষ্টিশক্তি উজ্জ্বল আর বিস্তারিত হয়ে যায়
তাঁর চিত্রকল্প প্রায়ই সহিংস ও সুররিয়াল। ‘মাংসল পাটাতন ধ্বসে যাচ্ছে’, ‘আরবি ঘোড়ার মত পাথরের বুকে ঘা মেরে আগুন ঝরায়’, ‘আমার পেটের ভেতর সহস্র হাভীয়া দাউ দাউ করে জ্বলছে’। এই আগুন ভেতরের ক্ষুধা ও বাইরের জুলুমকে এক করে।
স্বাধীনতা চেতনা: তিনটি মুক্তি
১. আত্মিক মুক্তি: আলীমের প্রথম স্বাধীনতা নফস থেকে। তিনি বলেন, ‘কতক্ষণ আর হৃদয়ের সমস্ত জানালা খুলে শ্রাবণ অরণ্য হ'ব’। মুক্তি মানে আল্লাহর আলিঙ্গনে যাওয়া।
২. সাংস্কৃতিক মুক্তি: তিনি ‘শ্বাপদ অরণ্য’ বলতে বোঝান স্বাধীনতা-উত্তর ঢাকা, যেখানে ‘ভার্সিটি, নীলক্ষেত, আর বায়তুল মোকাররমে যুবতী মেয়েরা বেগানা শরীর দোলায়’। এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি ‘হীরামন পাখির দেশ’ চান, ‘যেখানে নির্ভয়ে গান করা যায় গৃহ নির্মাণ করা যায় সবুজ অরণ্যে’।
৩. রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মুক্তি: সবচেয়ে স্পষ্ট উচ্চারণ:
আমাদের ক্ষুধার্ত পেট মিশে গ্যাছে পিঠের সাথে... এখন প্রয়োজন শুধু প্রচণ্ড ভূমিকম্পের মত জালিম-জনপদ ধ্বংস করার
তিনি মুক্ত স্বদেশে ‘নাগরিকত্ব ছিনিয়ে আনে সফেদ শিশুর’ স্বপ্ন দেখেন, যে শিশুর চোখে ‘ইব্রাহীমের জ্যোতির্ময় সাহস’।
সংগ্রাম চেতনা: জেহাদ, শাহাদাত ও নির্মাণ
আলীমের সংগ্রাম কোনো নৈরাজ্য নয়। এর চারটি স্তম্ভ তিনি পিতার মুখে বলেন:
কোরান আমাদের সংবিধান, রাসূল আমাদের নেতা, জেহাদ আমাদের কর্মপদ্ধতি শাহাদাৎ আমাদের কাম্য।
জেহাদ এখানে ধ্বংস নয়, নির্মাণ। তিনি বারবার ‘সাহসী কৃষক’, ‘সমুদ্রের তলদেশ থেকে সম্পদ সংগ্রহ’, ‘মাটির কেলাস থেকে সবুজ জায়নামাজ’ এর কথা বলেন। শাহাদাতও শেষ নয়, শুরু। কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, শহীদরা জীবিত। তাই পিতা ‘আমার এই বুকে-এই চোখ আর আঙুলের মধ্যে বেঁচে থাকবেন’।
সংগ্রামের নৈতিকতা আসে ক্ষমা থেকে। পিতা হত্যাকারীকে ক্ষমা করেন, কিন্তু জালিমের সাথে আপস করেন না। কবি নিজেও ‘সাবলীল ছুরি, তুই কিভাবে শাব্বিরের কলিজা পর্যন্ত ঢুকে গেলি’ বলে কাঁদেন, আবার বলেন ‘বিষদাঁত ভাঙতেই হবে’।
এই দ্বৈততা তাঁকে আলাদা করে। তিনি এক হাতে ‘হাতুড়ী শাবল দিয়ে প্রাসাদ ভাঙ্গো’ বলেন, অন্য হাতে ‘শান্তির আয়াত ঠোঁটে করে নূহের কবুতরের মত’ সন্তানদের নিয়ে বসেন।
পানকৌড়ি ও অগ্নিশিশু: কবির দুই প্রতিমা
‘পানকৌড়ি’ অংশে কবি নিজের নিঃসঙ্গতার কথা বলেন:
পানকৌড়ি! আর কতকাল অগাধ জলের ভেতরে বোবা কান্নায় চলবে একাকী পথ।
পানকৌড়ি ডুব দেয়, মাছ ধরে, আবার ওড়ে। এটি গোপন সংগঠন ও প্রকাশ্য আন্দোলনের রূপক। কবি তাকে অনুরোধ করেন, ‘তোমার পাখার সুতীক্ষ্ণ ধারে কেটে যাক সব জঞ্জাল’।
‘অগ্নিশিশু’ এর বিপরীত। সে আগুন, সে প্রকাশ্য। ‘পাথর তলার শিশু, এখনও খেলবে পাথরের সাথে লুকোচুরি! আঘাত কর পাথরে পাথর প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ছড়িয়ে দাও লকলকে আগুন’। এই দুই প্রতিমা মিলেই আলীমের কবিসত্তা: ভেতরে ধ্যানী ডুবুরি, বাইরে বিপ্লবী।
প্রাসঙ্গিকতা: কেন আজ পড়তে হবে
আলীম যখন লেখেন ‘আমরা এখন গভীর রাতে বনের ভেতর বাঘের সাথে বসত করি’, তখন তা ১৯৮০-র এরশাদ আমলের সেন্সরশিপের কথা মনে করায়। আজকের ডিজিটাল নজরদারি, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের যুগেও তা সমান প্রাসঙ্গিক।
তাঁর সমাধানও আজকের জন্য দরকারি। তিনি মার্ক্স বা নীটশেকে অস্বীকার করেন না ঘৃণা থেকে, করেন বিকল্প দিতে। তিনি বলেন, ‘চার্বাক, মজদকী, মার্ক্স নীটশে, এঙ্গেলস ধূলি ধূসরিত’, কারণ তারা মানুষকে ‘মমী’ করে। বিপরীতে তিনি ‘বুনিয়ানুম মারসুস’ এর কথা বলেন, যেখানে ‘জালিমের ব্যর্থ বুলেট গড়াগড়ি যাবে’।
শেষ কথা
হাসান আলীম প্রচলিত অর্থে জনপ্রিয় কবি নন। তাঁর ভাষা কঠিন, তাঁর রেফারেন্স ঘন। কিন্তু ‘শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু’ প্রমাণ করে, তিনি বাংলা কবিতায় একটি সম্পূর্ণ দর্শন এনেছেন। যেখানে স্বাধীনতা মানে শুধু মানচিত্র নয়, আত্মার মেরাজ। যেখানে সংগ্রাম মানে শুধু মিছিল নয়, পিতার অসমাপ্ত ইমারত শেষ করা।
কবিতার শেষে তিনি বলেন:
এইতো এখানে আমি একবার হারিয়ে যাকে পেয়েছি অনেক বার। এ হৃদয়ে শুরু হোক সমুদ্র চাষাবাদ
এই ‘সমুদ্র চাষাবাদ’ই আলীমের উত্তরাধিকার। শ্বাপদ অরণ্যের ভেতরেও যে শিশু আগুন হয়ে জ্বলতে পারে, যে পানকৌড়ি একা ডুব দিয়েও মুক্তো তুলতে পারে, সেই বিশ্বাসই তাঁকে আজও পড়ার যোগ্য করে তোলে। সাহিত্য সাময়িকীর পাঠকের জন্য এ কবিতা শুধু বিশ্লেষণের বিষয় নয়, এটি একটি আহ্বান: আঁধারের খিমা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন