শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬
হলুদ বরণ রোদ
আহসান হাবিব বুলবুল
ফাহিমের দু'টি কলম
ব ড় মানুষের ছোটবেলার স্কুল পালানোর গল্পও অনেক সময় মহান হয়ে ওঠে। এখন আর স্কুল পালানোর সুযোগ নেই। সন্তানদের ক্লাসে ঢুকিয়ে দিয়ে মায়েরা বাইরে বসে থাকেন। ফাহিম অনেক দিনই চেয়েছে স্কুল পালাতে। প্রথম প্রথম স্কুলে যাওয়ার প্রচুর উৎসাহ ছিল তার। সে উৎসাহে ভাটা পড়েছে অনেকটা। এর কারণ হলো, ক্লাসের দুষ্টু ছেলেরা বড্ড বিরক্ত করে তাকে। ফাহিম খুব শান্তশিষ্ট প্রকৃতির ছেলে। তার এই ভদ্রতার সুযোগ নেয় ওরা।
যেদিন ফাহিম বেঞ্চের এক প্রান্তে বসে সেদিন দুষ্টুরা ওকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কখনো ওর খাবার পানি এঁটো করে দেয়, কলম লুকিয়ে রাখে। ফাহিম ভাবে ক্লাসে স্যার এলে অভিযোগ দিবে, পরে আর দেয় না। ও কোনো ঝামেলা পছন্দ করে না। বাড়ি গিয়ে মাকে বলে এসব কথা। মা বলেন, ফাহিম সোনা। শোন, ক্লাসে দুষ্টু ছেলের সংখ্যা হাতেগোনা ক'জন। অন্যরা কিন্তু সবাই ভালো। তুমি ভালো ছেলেদের সঙ্গে ভাব করবে। ভালো ছেলেরা তোমার বন্ধু হয়ে গেলে দুষ্টুরা আর সাহস করবে না তোমাকে জ্বালাতে। মায়ের কথা ওর খুব মনে ধরে।
'মা ঠিকই বলেছেন। ভালো ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে। কিন্তু কীভাবে। ওরাও তো দুষ্টুদের ভয় করে।'
ফাহিম ভাবে, ভয়। লে চলবে না। ও ভালো ছেলেদের। করতে নেই। আমরা সবাই তো বন্ধু সহপাঠী। সঙ্গে নিয়ে ওদের বোঝাবে দুষ্টামি
ওর ভাবনা- ক্যাভাবে সবার সাথে বন্ধুত্ব শিক্ষকের প্রশংসা কুড়াতে হবে। তাহলে ফাহিম এখন আর স্কুল পালানোর কথা ভাবে না। এ ভালো রেজাল্ট করে সম্ভাব গড়ে তোলা যায়। 'হ্যাঁ। তাকে গুনবে ওপর। সবাই সবার দৃষ্টি পড়বে তার।
করেন। বাদাল ফাহিমের আব্বু। তাদের। ফাহিম স্কুল। ক্লাসে ফার্স্ট, এমনি ভাবান্তর ওে সরকারি চাকরি লির কারণে নতুন উপজেলায় আসতে হয়েছে বদল করে ভর্তি হয়েছে এই স্কুলে। তাই তার রোল নম্বরটা অনেক পিছনে। বার্ষিক পরীক্ষায় ওদের উপকানো কি সম্ভব হবে। সেকেন্ড ও থার্ড বয় রয়েছে বান্তর ওকে আচ্ছন্ন করে। কোনো কিছুই অসম্ভব নয় বলে ও পড়াশোনায় মন দেয়।
প্রতিদিন ক্লাসে মন খারাপের মতো দু-একটি ঘটনা ঘটেই। কিন্তু ফাহিম কিছু মনে করে না। বরং সহপাঠীদের একটা খারাপের জবাব একটা ভালো দিয়ে দেয়। এটা ওকে কেউ শিখিয়ে দেয়নি। ও নিজে থেকেই এমনটা করে। এতে দুষ্টু ছেলেরা লজ্জা পেয়ে আর ওর সাথে দুষ্টামি করে না। যারা আগে ওকে উত্ত্যক্ত করতো তারা এখন ওর কাছের মানুষ হয়ে উঠছে।
সেদিন ক্লাস পরীক্ষা ছিল। সবাই মনোযোগ দিয়ে লিখছে। ফাহিমও লিখছে। লিখতে লিখতে মাঝপথে ওর কলমের কালি ফুরিয়ে যায়। এখন কী করবে। ও ঘামছে। কাউকে কিছু বলছে না। শিক্ষককে বলবে। তবে যে সহপাঠীরা হাসাহাসি করবে। টিপ্পনী কাটবে। ফাহিম তাই নিশ্চুপ। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
পাশের সারিতে বসা মৌমিতা। একটুখানি একটা মেয়ে। ওর দৃষ্টিতে পড়ে ফাহিম।
: কী হয়েছে, লিখছ না কেন?
: কলমে কালি নেই।
: একটু সবুর করো। আমার লেখা প্রায় শেষ। আমার কলম দিয়ে লিখবে।
ফাহিম লেখা শেষ করে। মৌমিতাকে কলম ফিরিয়ে দিতে গিয়ে ধন্যবাদ জানায়। মৌমিতাও অদ্রতার সুরে বলে ওয়েলকাম।
বাসায় গিয়ে ফাহিম মাকে সব বলে। মা বলেন, "মৌমিতা অনেক ভালো কাজ করেছে। ওকে ধন্যবাদ দিয়ে তুমিও ভালো করেছ। এখন থেকে তুমি ব্যাগে দুটো কলম রাখবে। ক্লাসে কেউ যদি তোমার মতো সমস্যায় পড়ে, তবে তুমি তাকে একটি কলম দিয়ে সাহায্য করতে পারবে।"
মায়ের পরামর্শটা ফাহিমের খুব পছন্দ হয়।
-"গুড আইডিয়া আম্মু!"
সেই থেকে ফাহিম দুটো কলম রাখে। ক্লাসে কেউ কলম হারিয়ে ফেললে বা লিখতে গিয়ে কালি শেষ হয়ে গেলে ও কলম দিয়ে তাকে সাহায্য করে। আর এ রকম প্রায়ই ঘটে। অল্প দিনের মধ্যেই জানাজানি হয়ে যায় যে, ফাহিমের কাছে দুটো কলম আছে। তাই কেউ বিপদে পড়লে ফাহিমের কাছে আসে কলমের জন্য। ফাহিমও তাকে কলম দিয়ে সহযোগিতা করতে পেরে আনন্দ বোধ করে। একদিন শিক্ষকও ফাহিমের কাছে কলম চেয়ে বসেন। এভাবেই ফাহিম কলমের জন্য সবার কাছে প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠে।
ফাহিম এখন অনেক বড় হয়েছে। নামকরা একটি উচ্চবিদ্যালয়ে মাধ্যমিকে পড়ছে। সেদিন ছিল স্কুলে বার্ষিক সাহিত্য সংস্কৃতি ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা। নির্ধারিত বক্তৃতা পর্বে সবাইকে জীবনের স্মরণীয় ঘটনা নিয়ে কথা বলতে হবে। এক এক করে বন্ধুরা বক্তৃতা করছে। এবার ফাহিমের পালা। ফাহিম ছোটবেলায় স্কুলজীবনে মৌমিতার কলম দিয়ে সহযোগিতার গল্প করলো। আরো বললো, তার পকেটে দুটো কলম রাখার গল্প। ফাহিমের বক্তৃতায় প্রচুর করতালি পড়লো। শিক্ষকরাও উচ্ছ্বসিত হলেন।
ইতি অন্তরা
সকালবেলা এক চিলতে রোদ এসে পড়ে অন্তরাদের বেলকুনিতে। হাঁটি-হাঁটি-পা-পা করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় অন্তরা। দু'টি চড়ুই পাখি কিচিরমিচির শব্দ তোলে। শিক গলিয়ে ভেতরে এসে আবার ফুরুৎ করে উড়ে যায়। পাখিদের ডানার ছোঁয়ায় টবের লতানো গাছগুলো দুলে ওঠে। অন্তরা ভেবে পায় না কোন ভাষায় ডাকলে ওরা আবার আসবে। মুহূর্তেই আবার আসে। সেই চিরচেনা শব্দ ঝঙ্কার। ঘুম ভাঙানোর গান। 'কিচিরমিচির'- অন্তরা ওঠো। বেলা হয়েছে। ভোরের ফুরফুরে হাওয়ায় গা ভাসাবে। শিশির ভেজা ঘাসে পা ভিজাবে। শিউলি তলায় ফুলের মেলায় হলদে রোদে গা মাখাবে। কিচিরমিচির।'
অন্তরা এবার ওদের ভাষা বোঝে। মিষ্টি মিষ্টি হাসে। 'ও' প্রতিদিন ভোরে এক মুঠো শস্যদানা ছিটিয়ে দেয় বেলকুনিতে। পাখিরা এসে খেয়ে যায়। 'ও' মুগ্ধ হয়ে দেখে। এভাবে পাখিদের সাথে ওর সখ্য গড়ে ওঠে।
ফিরোজ সাহেব এ বাসায় আজ অনেকদিন। অন্তরার জন্ম এ বাড়িতেই। মেয়েকে নিয়ে তাদের অনেক স্বপ্ন সুখ জড়িয়ে আছে এ বাড়ির প্রকৃতিতে। দেখতে দেখতে সাতটি বছর কেটে যায়। অন্তরা বড় হয়েছে। স্কুলে যায়। 'ও' এতদিন জানতো এটা তাদের বাড়ি। এখন বুঝতে পারে ভাড়াবাড়ি আর নিজের বাড়ির মধ্যে পার্থক্য। তারপরও ওর কাছে এ বাড়িটি খুব নিজের মনে হয়। জানালা দিয়ে নীল আকাশ দেখা যায়। পাশের বাড়ির নারিকেল গাছটা পাখনা মেলে বাতাস করে। অদূরে পেয়ারা গাছটায় চড়ুই আর টুনটুনিদের আড্ডা। অন্তরার বেশ ভালো লাগে।
বাড়ির মালিক খান সাহেব খুব ভালো মানুষ। উনি ওপর তলায় থাকেন। অন্তরার সাথে খুব ভাব। সকাল-সন্ধ্যায় মসজিদে যেতে আসতে অন্তরাকে ডেকে যান। 'ও' নানুভাই নানুভাই বলে সাড়া দেয়।
রাজধানী ঢাকা শহরের একটি উন্নয়নশীল ওয়ার্ড সবুজবাগ। সবুজবাগে আর সবুজ নেই। দালান-কোঠায় ভরে গেছে। ব্যস্ত সড়ক, বাজার-ঘাট। নগর জীবনের কোলাহলের ঢেউ এসে লেগেছে এখানেও। ফিরোজ সাহের ঢাকায় এসে কর্মজীবন শুরু করেন একটি জাতীয় দৈনিকে যোগদানের মধ্যদিয়ে। তারপর বাসা যেন এখানে। পরপর বাসা পরিবর্তন করেছেন কয়েকটি। তবে এ বাসাতে রয়ে গেছেন অনেক দিন। ফিরোজ সাহেবের স্ত্রী মিসেস জেরিন একজন আদর্শ গৃহিণী। স্বামীর স্বল্প রোজগারেই সংসার সাজিয়েছেন সুন্দরভাবে। তবে সাধ থাকলেও সাধ্যের সীমানার বাইরে যান না। মেয়েকে ভালো স্কুলে ভর্তি করেছেন। তিনি নিজেই মেয়েকে স্কুলে আনা-নেয়া করেন। মায়ের সাথে স্কুলের পথে চলতে চলতে শহুরে জীবনের অনেক কিছুই চেনা-জানা হয়ে উঠছে অন্তরার। মাসের শেষে শহরের রাস্তার একটি দৃশ্য ওকে খুব ভাবায়। যখন দেখে পুরো একটি সংসারের সরঞ্জাম ভ্যানগাড়িতে বা মিনি ট্রাকে তুলে নিয়ে কেউ যাচ্ছে কেউ আসছে। বাড়ি বদলের এই দৃশ্য খুব করুণ লাগে ওর কাছে। 'ও' আম্মুকে জিজ্ঞেস করে, ওরা বাড়ি বদল করে কেন? উত্তরে আম্মু বলেন, সমস্যার কারণে বাড়ি বদল করতে হয়। আমাদেরও একদিন অন্য বাসায় যেতে হবে।
অন্তরা ভাবে, বাসা বদল করলে পাখিদের কি হবে। ওরা কি আসবে। ঘুম ভাঙানোর গান গাইবে। নতুন যারা আসবে তারা কি টুনীদের খেতে দিবে। ভাবতে ভাবতে সেদিনের মতো পথ শেষ হয়ে যায়।
অন্তরা আঁকিবুকিতে খুব ভালো। ওর আঁকা অনেক ছবি পত্রিকায় ছোটদের পাতায় ছাপা হয়েছে। 'ও' আজ স্কুল থেকে ফিরে খুব মনোযোগ দিয়ে কি যেন আঁকছে। আম্মুর দৃষ্টি কাড়ে। জিজ্ঞেস করেন, কি আঁকা হচ্ছে। ও বলে, আঁকা হোক দেখবে।
আর্ট পেপারে যেশ বড়সড়ো করে আঁকা ছবি। বেশ বর্ণাঢ্য। প্রথম দর্শনেই ভালো লাগার মতো। ছিমছাম একটি বাড়ি। সামনে ফুলের বাগান। দখিনা জানালা দিয়ে নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে। পাখিরা ডানা মেলছে দিগন্তে। গাছ-পালায় ছায়া সুর্নিবিড় মায়াবি 'আবেশ'।
অন্তরা ছবিটি ড্রয়িং রুমের দেয়ালে টাঙ্গিয়ে দেয়। আম্মু দেখে খুব প্রশংসা করেন। 'ও' অপেক্ষায় আছে আব্বু দেখে কি বলেন তিনি কি তার ইচ্ছা বুঝতে পারবেন।
ফিরোজ সাহেব সন্ধ্যায় বাসায় ফেরেন। প্রথমেই ছবিটির দিকে নজর পড়ে। তিনি অবাক হয়ে দেখেন আর দেখেন। মেয়ের অভিপ্রায় বুঝতে আর বাকি থাকে না। তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন। বলেন, "মা-মণি দেখো তোমার ছবির মতো আমাদেরও একটি বাড়ি হবে।" অন্তরা বলে, "আমাদের নিজের বাড়ি হবে।" খুশিতে ভরে ওঠে ওর মন। মিসেস জেরিন বাবা-মেয়ের খুশি দেখে আশায় বুক বাঁধেন।
মেয়ের স্কুল ও অফিসের যাতায়াতের সুবিধার কথা ভেবে বাসাটা ছাড়ার কথা ভাবছেন ফিরোজ সাহেব। বর্ষাকাল আসার আগেই বাসা পরিবর্তন করবেন। দেখতে দেখতে সময় ঘনিয়ে আসে। বাসা ছাড়ার প্রস্তুতি চলছে। অন্তরা বন্ধুদের কাছে বিদায় নিচ্ছে। নতুন বাসায় যাবার কথা বলছে। নানাভাইকেও বলেছে, "আমরা তো চলে যাচ্ছি। আমাদের জন্য দোয়া করো।"
আগামীকালই চলে যেতে হবে। রাতে অন্তরার আর ঘুম হয় না। 'ও' একটি কাগজে লিখে রাখে “তোমরা যারা নতুন আসবে, তোমরা নিশ্চয়ই পাখিদের ভালোবেসো। টুনটুনিদের খেতে দিও। ও তাহলে ভাববে তোমরা আমাদের আত্মীয়। ইতি অন্তরা।"
সেই মেয়েটি
এ কটি ক্লাসে দশজন ছাত্র-ছাত্রী থাকলে 'দশজন দশ রকমের হয়। কেউ একটু বেশি চঞ্চল, পুরো ক্লাস মাতিয়ে রাখে। কেউবা একটু অন্তর্মুখী- নীরব থাকতে পছন্দ করে। আবার কেউ খুব মেধাবী, আলাদা একটা গাম্ভীর্য নিয়ে থাকে। শিশু মনের এই বিচিত্র ভাবধারা স্রোষ্টারই সৃষ্টি। মহান আল্লাহ তার সৃষ্টিকে রূপময় করে তুলতে এই বৈচিত্র্য দান করেছেন।
একজন আদর্শ শিক্ষক বিষয়টি জানেন। তাই তিনি সবার মধ্যে ভাব বিনিময় মতবিনিময়ের পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। যাতে ক্লাসে সবার অংশগ্রহণ সমান হয়। কিন্তু সমস্যা হয়ে যায় অন্তর্মুখী ছেলে-মেয়েদের নিয়ে। এদের সহজে মেলে ধরা যায় না। কবি হয়তো তাই বলেছেন,
"করিতে পারি না কাজ সদা ভয় সদা লাজ, সংশয়ে সংকল্প সদা টলে পাছে লোকে কিছু বলে।
আড়ালে আড়ালে থাকি
নীরবে আপনা ঢাকি, সম্মুখে চরণ নাহি চলে পাছে লোকে কিছু বলে।"
অন্তর্মুখীদের কেউ লাজুক বলে। কেউবা বলে সুবোধ বালক। আবার কেউ বলে লক্ষ্মী মেয়ে। কেউবা আবার তাদের নিয়ে হতাশ। যারা এর বিপরীত, সমাজে তাদের সফলতা বেশি। নিজেকে তুলে ধরার বা প্রেজেন্ট করার যোগ্যতা সমাজ জীবনে ইতিবাচক ফল বয়ে আনে। অন্তর্মুখীরা সেটা পারে না। তাই তাদের পরিচিতি নেই। নাম নেই। যশ নেই।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া প্রীতি মেহজাবিন সে রকমই একজন মেয়ে। 'ও' বেশ মেধাবী। প্রাথমিকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। সে তার সমস্যার কথা বোঝে। সে অনেক চেষ্টা করেছে তার এই চুপচাপ নীরব বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু পারেনি। অন্তর্মুখিতা তাকে বেশি টানে। তার এই স্বভাবের জন্যে দু'-একজন শিক্ষকের ভৎসনাও শুনতে হয়েছে তাকে। একদিন তো অংকের টিচার বলেই বসলেন, “এ্যাই মেয়ে তুমি এত চুপচাপ থাকো কেন, তুমি গোয়েন্দা নাকি? সেদিন ক্লাসে সবাই হেসেছিল। প্রীতি লজ্জা পেয়ে দু'দিন স্কুলেই আসেনি।
শিক্ষিকা মিসেস নাসরিন জাহান অবশ্য প্রীতিকে নিয়ে হতাশ নন। তিনি প্রীতির অন্তর্মুখিতা (Introversion) বেশ উপভোগ করেন। তিনি ওর চোখে মুখে একটা মেধার দীপ্তি দেখতে পান। তিনি ভাবেন, সবার সহযোগিতা পেলে 'ও' একদিন ওর অন্তর্মুখী বলয় থেকে বের হয়ে আসতে পারবে।
প্রীতি লেখাপড়ায় খুব ভালো। ক্লাসে বেশ নিয়মিত। অপরের প্রতি সহানুভূতিশীলও।
প্রতি বছর স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কোনো বিষয়ে প্রীতিকে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় না। এবারই প্রথম সে অংশগ্রহণ করেছে, তাও আবার নির্ধারিত বিষয়ে রচনা প্রতিযোগিতায়। বিষয়বস্তু ছিল "ছাত্রজীবনে প্রেজেন্টশন ক্লাসের গুরুত্ব।"
আজ সকালে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। মেঘ ভেঙে রোদ্দুর বেরিয়েছে। নরম রোদ। হলুদ বরণ রোদ। বৃষ্টি ভেজা দখিনা মৃদুমন্দ বাতাস ছেলে-মেয়েদের চুল ছুঁয়ে যাচ্ছে। ছেলে-মেয়েদের হৈ হুল্লা আর ছোটাছুটিতে জেগে উঠেছে স্কুল আঙ্গিনা। রঙ বে-রঙের বেলুন ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে চারপাশ। স্কুলে আজ বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। সবাই পুরস্কার নিবে। যে কোনো ইভেন্টেই ভালো করতে পারেনি সেও পাবে সান্ত্বনা পুরস্কার। তাই সবার মনেই আনন্দ।
প্রতিযোগিতার ফল ঘোষণা হলো। প্রীতি প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে। কী আশ্চর্য?। যে কি না ক্লাসে দাঁড়িয়ে কথা বলে না। কোনো প্রেজেন্টেশন দেয় না সেই আবার সেই বিষয়েই প্রথম। ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। অভিভাবকদের আগ্রহের শেষ নেই। চারদিকে গুঞ্জন শুরু হয়-"চুপচাপ সেই মেয়েটি।"
বছরের প্রথম দু'মাস হৈচৈ করেই কেটে গেল। এখন পুরোদমে ক্লাস চলছে। এপ্রিলের শেষে বেশ গরম পড়েছে। হঠাৎ সেদিন একটা বিপত্তি ঘটলো প্রীতিদের স্কুলে। অ্যাসেম্বলি চলছিল। এমন সময় অষ্টম শ্রেণির একটি মেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আরো কয়েকজন ছাত্রী জ্ঞান হারায়। শিক্ষকরা কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না (কিংকর্তব্যবিমূঢ়)। এ সময় প্রীতি চিৎকার করে বলতে থাকে, সবাই সরে পাঁড়াও ভীড় করবে না। মুক্ত বাতাস আসতে দাও আমি এর প্রাথমিক চিকিৎসা (First Aid) জানি। ওদের একদিকে কাত করে দাও, যাতে মুখে ও গলায় যে লালা বা নিঃসরণ আছে তা বেরিয়ে আসতে পারে। জুতা খুলে দাও। পায়ের দিকট একটু উঁচু করে ধরো। ম্যাডাম দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স কল করুন, ট্রিপল নাইন-এ ফোন দিন।"
সবাই প্রীতির সেবা দেখে হতবাক হয়ে যায়। দূর থেকে কে যেন বলে ওঠে, "এ্যাই সেই মেয়েটি।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে স্কুল আঙ্গিনায় ঢোকে। সাইরেনের বিকট শব্দে চারদিকে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। খুব দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়া ছাত্রীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয় হয়।
সাধারণভাবে এটাকে অজ্ঞাত রোগ বলে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় "ম্যাস সাইকোলজিক্যাল ডিজিজ” বা গণহিস্টিরিয়া। সাধারণত ছাত্রীরাই এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয় আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে একজন থেকে আরেক জনে এ রোগ ছড়ায়। বয়ঃসন্ধিকালে এ সমস্য বেশি হয়। বিষণ্ণতা উৎকণ্ঠা ব্যক্তিত্বের বিকার প্রভৃতি মানসিক রোগ থেকে এ সমস্যা হতে পারে।
প্রীতিকে বন্ধুরা ঘিরে ধরেছে। সবাই বাহবা দিচ্ছে। শিক্ষকরাও প্রীতির প্রশংসা করছে একজন অভিভাবক বললেন, তুমি এতকিছু কিভাবে জানলে। প্রীতি বললো, সে পত্র-প্রত্রিকায় স্বাস্থ্য পাতার বিভিন্ন আর্টিক্যাল পড়ে এসব জেনেছে।
কারণ নেই। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ভালো খবর এলো, অসুস্থ মেয়েরা সুস্থ হয়ে উঠছে। ভয়ের কোনে
দু'দিন স্কুল বন্ধ থাকার পর আজ আবার খুলেছে। অসুস্থ ছাত্রীরা ঘরে ফিরেছে। আজ অ্যাসেম্বলি খুব সংক্ষিপ্ত করা হলো। হেড ম্যাডাম ঘোষণা করলেন, এখন থেকে প্রতিদিন অ্যসেম্বলি-তে তোমরা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা (Helth tips) করবে। এ ব্যাপারে তোমরা পড়াশোনা করে আসবে। তিনি সেদিনের ঘটনায় প্রীতির ভূমিকার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিলেন সাধুবাদ জানালেন।
প্রীতির মুখটা লজ্জায়, গর্বে কৃতজ্ঞতায় রক্তিম হয়ে উঠলো।
তিন বন্ধু
গ্রামটি ছবির মতো। রহমতপুর। একপাশ দিয়ে বয়ে গেছে করতোয়া নদী। মেঠোপথ ফসলের মাঠ স্কুল-মাদরাসা মসজিদ-মক্তব সব মিলে ছিমছাম একটি গ্রাম। গ্রামের মাঝে সুউচ্চ একটি তালগাছ গ্রামটির অবস্থান জানান দেয়। তালগাছ আরও ছিল, এক এক করে সব হারিয়ে গেছে। এখন ওই একটিই টিকে আছে। দূর থেকে তালগাছটি চোখে পড়লে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত সেই কবিতাটি মনে পড়ে যায়-তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে। মনে সাধ কালো মেঘ ফুঁড়ে যায় একেবারে উড়ে যায় কোথা পাবে পাখা সে!
সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার একটি গ্রাম রহমতপুর। রবীন্দ্রনাথের কাছারি বাড়ি এই শাহজাদপুরেই। সেখানে কবিতায় লেখা সেই তালগাছ আছে একটি নয়, দু'টি।
কিছু দিন আগে এই গ্রামে এক বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটে যায়। বজ্রপাতে তিনজন লোক মারা যায়। এদের মধ্যে একজন শিশুও ছিল। গ্রামের সবার চোখে-মুখে শোকের ছায়া নেমে আসে। মৃতদের জানাজা, দোয়া অনুষ্ঠান, প্রশাসনের লোকজনের ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সাহায্য প্রদান-এসব কাজ নিয়েই কেটে যায় মাসটি।
রতন, আশিক ও ফরহাদ-ওরা তিন বন্ধু। গ্রামের হাইস্কুলে একই ক্লাসে পড়ে। গত মাসটা ওরা এসব কাজে সময় দিয়ে কাটিয়েছে। শোক প্রকাশ করতে স্কুলও দু'দিন বন্ধ ছিল। আজ বিকালে ওরা এসে বসেছে স্কুল মাঠে। আলাপচারিতায় একটু সময় কাটাতে। ঘুরে ঘুরে সেই একই কথা উঠে আসে ওদের আলাপনে।
"কীভাবে বজ্রপাত প্রতিরোধ করা যায়। প্রশাসনের লোকজন তো বলে গেল বেশি বেশি তালগাছ লাগাতে। কিন্তু তালগাছ কীভাবে বজ্রপাত ঠেকায় তা তো জানা হলো না। এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা কী।" রতন বলে-
: বিষয়টি নিয়ে স্কুলের বিজ্ঞান স্যারের সাথে কথা বলা যেতে পারে।
: ঠিক বলেছিস। আশিক জবাব দেয়।
: প্রয়োজনে আমরাই উদ্যোগ নেবো। ঘরে ঘরে গিয়ে তালের আঁটি (বীজ) সংগ্রহ করবো। রাস্তার দু-ধারে বপন করবো। ফরহাদ বলে।
: শুনেছি একসময় গ্রামে প্রচুর তালগাছ ছিল। সেসব কোথায় গেল? রতনের প্রশ্ন।
: কোথায় আবার যাবে। মানুষ তো এখন সর্বভুক হয়ে পড়েছে। দেখিস না, ইটভাটার
জ্বালানি হচ্ছে গাছ। জমির উপরিভাগের মাটি (Topsoil) যা নাকি খুব উর্বর, তা যাচ্ছে ভাটায়। মানুষ সামান্য ক'টা টাকা বেশি পাবে বলে মূল্যবান বৃক্ষ, জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছে। বলল আশিক।
: প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেন হয় জানিস। আমরা যখন গাছ কাটি, নদী ভরাট করি, যত্রতত্র আবর্জনা ফেলি তখন পরিবেশ দূষিত হয়। এর জের ধরে যত দুর্যোগ-মসিবত নেমে আসে। এই ধর বজ্রপাত, অতিবন্যা, রোগ-ব্যাধি ইত্যাদি। -কথাগুলো বলে থামে রতন।
: দোস্ত। তুই ভালো বলেছিস। আজ ওঠা যাক, সন্ধ্যা হয়ে এলো। -ফরহাদ বলল।
ভূমির মাটির মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে যে প্রক্রিয়ায় বজ্রপাত হয়, তাকে লাইটনিং স্ট্রোক বলে। লাইটনিং স্ট্রোকগুলো এর আশপাশের নিকটতম টার্গেটে আঘাত হানে। তালগাছ অনেক লম্বা হওয়ায় এটি উক্ত স্ট্রোকের নিকটবর্তী হয়ে থাকে। তাই ফসলের ক্ষেতে তালগাছ লাগানো হয়। যাতে বজ্রপাত হলেও কৃষক ও অন্য যারা মাঠে কাজ করে, তারা যেন ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারে। তোমরা শুনে আশ্চর্য হবে যে, বজ্রপাত যে শুধু ক্ষতি করে তা নয়, আমাদের উপকারও করে। তা হলো, বৃষ্টিপাতের সময় যে বজ্রপাত হয় তাতে এক প্রকার রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে বাতাসের নাইট্রোজেন মাটিতে প্রবেশ করে, এতে মাটির গুণগত পরিবর্তন হয়। মাঠির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পায়। ফসলের ফলন বাড়ে। তাই তো বলা হয়, মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা কোনো কিছুই নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। শুধু আমরা যদি আমাদের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারি তবে ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।
ফরহাদ বলল, স্যার আমরা গ্রামের মাঠে-ঘাটে তালগাছ লাগাতে পারি।
স্যার বললেন, অবশ্যই সেটা করা যেতে পারে। তোমরা তরুণ, সে উদ্যোগটা তোমরাই নিবে বৈকি।
আজ আবার স্কুলমাঠে আড্ডা জমিয়েছে তিন বন্ধু। স্যারের লেকচারটা ওদের কানে বাজছে। রতন বলল, তাহলে বল কীভাবে আমরা উদ্যোগটা নিতে পারি। আশিক বলল, এখন ভাদ্র মাস চলছে। এ মাসেই তাল পাকে। ঘরে ঘরে তালের রস, তালের পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তালের আঁটি সংগ্রহ করবো। তারপর মুরুব্বিদের পরামর্শে কোথায় কোথায় বীজ বপন করা যায়, সেটা ঠিক করবো। ফরহাদ বলল, চমৎকার আইডিয়া। তেমনটাই হবে। তাহলে কাল থেকেই কাজ শুরু করা যাক। শুরু হয়ে গেল তিন বন্ধুর তাল বীজ সংগ্রহের কাজ। প্রথম বীজ বপনের কাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলো। উদ্বোধন করলেন, তাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনসুর আলী খান।
তিন বন্ধুর এই কাজের কথা শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকল না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলো। পৌঁছে গেল উপজেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তির কাছেও। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একদিন এলেন গ্রামে। তিন বন্ধুর কাজ দেখতে। তিনি তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলেন। তিনি তিন বন্ধুর সঙ্গে আরো ক'জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি নিয়ে একটি কমিটি করে দিলেন। বললেন, শুধু বীজ বপন করলেই হবে না। গাছের পরিচর্যাও করতে হবে। তিনি তাদের কাজের জন্য একটা আর্থিক অনুদান দিলেন। বছরখানেকের মধ্যেই বপনকৃত বীজ থেকে চারাগাছ অঙ্কুরিত হয়ে সবুজ বৃক্ষে পরিণত হলো। তিন বন্ধু এখন প্রতিদিন বিকালে স্কুল মাঠে খেলাধুলা শেষে, সারা গ্রাম ঘুরে গাছগুলো দেখে, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করে বাড়ি ফেরে।
আজ স্কুলে তিন বন্ধু বিজ্ঞান ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করছে। স্যারের কাছ থেকে আজ তারা জানবে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি রোধে তালগাছ এত প্রয়োজন কেন। বিজ্ঞান শিক্ষক ক্লাসে নিজ থেকেই প্রসঙ্গটা উঠালেন। স্যার বললেন, বজ্রপাত রোধে তালগাছ রোপণের জন্য সরকারিভাবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কেন। তোমরা কি জান?
রতন বলল, না স্যার। সেটাই তো আমরা জানতে চাই। স্যার বললেন, শোন, মেঘ ও ভূমির মাটির মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে যে প্রক্রিয়ায় বজ্রপাত হয়, তাকে লাইটনিং স্ট্রোক বলে। লাইটনিং স্ট্রোকগুলো এর আশপাশের নিকটতম টার্গেটে আঘাত হানে। তালগাছ অনেক লম্বা হওয়ায় এটি উক্ত স্ট্রোকের নিকটবর্তী হয়ে থাকে। তাই ফসলের ক্ষেতে তালগাছ লাগানো হয়। যাতে বজ্রপাত হলেও কৃষক ও অন্য যারা মাঠে কাজ করে, তারা যেন ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারে। তোমরা শুনে আশ্চর্য হবে যে, বজ্রপাত যে শুধু ক্ষতি করে তা নয়, আমাদের উপকারও করে। তা হলো, বৃষ্টিপাতের সময় যে বজ্রপাত হয় তাতে এক প্রকার রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে বাতাসের নাইট্রোজেন মাটিতে প্রবেশ করে, এতে মাটির গুণগত পরিবর্তন হয়। মাঠির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পায়। ফসলের ফলন বাড়ে। তাই তো বলা হয়, মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা কোনো কিছুই নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। শুধু আমরা যদি আমাদের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারি তবে ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।
ফরহাদ বলল, স্যার আমরা গ্রামের মাঠে-ঘাটে তালগাছ লাগাতে পারি।
স্যার বললেন, অবশ্যই সেটা করা যেতে পারে। তোমরা তরুণ, সে উদ্যোগটা তোমরাই নিবে বৈকি।
আজ আবার স্কুলমাঠে আড্ডা জমিয়েছে তিন বন্ধু। স্যারের লেকচারটা ওদের কানে বাজছে। রতন বলল, তাহলে বল কীভাবে আমরা উদ্যোগটা নিতে পারি। আশিক বলল, এখন ভাদ্র মাস চলছে। এ মাসেই তাল পাকে। ঘরে ঘরে তালের রস, তালের পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তালের আঁটি সংগ্রহ করবো। তারপর মুরুব্বিদের পরামর্শে কোথায় কোথায় বীজ বপন করা যায়, সেটা ঠিক করবো। ফরহাদ বলল, চমৎকার আইডিয়া। তেমনটাই হবে। তাহলে কাল থেকেই কাজ শুরু করা যাক। শুরু হয়ে গেল তিন বন্ধুর তাল বীজ সংগ্রহের কাজ। প্রথম বীজ বপনের কাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলো। উদ্বোধন করলেন, তাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনসুর আলী খান।
তিন বন্ধুর এই কাজের কথা শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকল না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলো। পৌঁছে গেল উপজেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তির কাছেও। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একদিন এলেন গ্রামে। তিন বন্ধুর কাজ দেখতে। তিনি তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলেন। তিনি তিন বন্ধুর সঙ্গে আরো ক'জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি নিয়ে একটি কমিটি করে দিলেন। বললেন, শুধু বীজ বপন করলেই হবে না। গাছের পরিচর্যাও করতে হবে। তিনি তাদের কাজের জন্য একটা আর্থিক অনুদান দিলেন। বছরখানেকের মধ্যেই বপনকৃত বীজ থেকে চারাগাছ অঙ্কুরিত হয়ে সবুজ বৃক্ষে পরিণত হলো। তিন বন্ধু এখন প্রতিদিন বিকালে স্কুল মাঠে খেলাধুলা শেষে, সারা গ্রাম ঘুরে গাছগুলো দেখে, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করে বাড়ি ফেরে।
রাজকন্যা
না দির আলী রিকশায় উঠলেই রিকশাওয়ালার সাথে গল্প জুড়ে দেন। এটা তার অভ্যাস বলতে পারেন। রিকশাওয়ালাদের জীবনের অনেক গল্পই তার জানা। ভেবেছেন, এসব খেটে খাওয়া মানুষের সুখ-দুঃখ নিয়ে কখনো কিছু একটা লিখবেন। স্কুলজীবন থেকেই তার লেখালেখির একটা ন্যাক আছে। কর্মজীবনে এসে তাতে কিছুটা ভাটা পড়লেও মাঝে মধ্যে লেখেন। পত্র-পত্রিকায় ছাপাও হয়। নাদির আলীর এমনও হয়েছে, রিকশাওয়ালার কষ্টের কথা শুনতে শুনতে নেমে যাবার সময় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দশ-বিশ টাকা বেশি দিয়ে চলে গেছেন।
নাদির আলী খিলগাঁও রেলগেট থেকে রিকশায় চেপেছেন। আজ তিনি চুপচাপ। অন্যদিনের মতো চালকের সঙ্গে কথা বলার প্রসঙ্গ টানছেন না। তার কারণ হলো, মেয়ে সঙ্গে আছে।
নিজে থেকেই কথা শুরু করলেন। ষাটোর্ধ্ব এই চালক বয়সের ভারে, জীবন যন্ত্রণার চাপে কিছুটা মেয়েকে কলেজ গেটে নামিয়ে দিয়ে তিনি অফিসে যাবেন। কিছুদূর অগ্রসর হতেই রিকশাচালক হলেও নুয়ে পড়েছেন। নাদির আলী ভাবলেন, ভালোই হলো আমাকে প্রসঙ্গ টানতে হয়নি। তে উনি বললে শুনতে আপত্তি কী?
নাদির আলীর মেয়ের নাম উর্মি।
উর্মি বলল, চাচা এত কথা বললে তো অ্যাক্সিডেন্ট করবেন। মনোযোগ দিয়ে রিকশা চালান। রিকশাওয়ালা মেয়েটার কথায় কোনো কর্ণপাত করলেন না। কথা বলোই চললেন। কথা তো নয় যেন জীবনের গল্প। নাদির আলী এবার মাঝে মধ্যে অনুসন্ধানী দু-একটি প্রশ্নও করছেন।
'স্যার। বড় ইচ্ছা ছিল পোলাডারে লেখাপড়া শিখায়্যা মানুষ করব। তা আর হইল না। হে বছর নদী-ভাঙনে জমি-জিরাত ঘর-বাড়ি সব যমুনায় গ্যালো। পেটের দায়ে গেরাম ছাইড়া ঢাকায় আইলাম। রিকশার প্যাডেলে পা উঠলো। পোলাডা গাড়ির কারখানায় কাম করে। অল্প বয়সেই বিয়া করচে। যা কামাই-রোজগার করে তাতে তাগোরেই চলে না। আমাগো কী দ্যাখবো। বিয়ার এক বছর না যাইতই আলাদা থাকে, আলাদা খায়। আমরা বুড়া-বুড়ি শুধু চাইয়া থাকি-কখখন একটু আইসা চোখের দ্যাখা দিয়া যাইবো। বুড়ির সময় কাটে না। তাই একডা মাইয়া সন্তান 'পালক' নিছে। হে নাকি বড় হইয়া তারে দ্যাখবো। প্রথম প্রথম আমার মত ছিল না। পরে মত দিছি। কয়েকদিন হইল মাইয়া ডার জ্বর। ডাক্তার বলচে ডেঙ্গুতে ধরচে। মা মাইয়্যা দুনোজনই এহুন হাসপাতালে। আমি রিকশা নিয়া নামচি ওষুধ-পত্তরের পয়সা তো জোগাড় করতে হইবো।" সামনে ঈদ মাইয়াডার জন্য একটা নতুন জামাও কিনতে হইবো।
কলেজগেট আসতেই উর্মি বলে, চাচা রিকশা ঘুরান। মেডিক্যালে যাবো। আপনার মেয়েকে দেখতে যাবো।"
রিকশাওয়ালা এই প্রথম পিছন ফিরে উর্মিকে দেখল; 'কী কন মা। না, আফনের দেরি হইয়া যাইবো। আফনে ইস্কুলে যান।
: চাচা রিকশা ঘুরান।
- উর্মির কণ্ঠে এক কলস মমতা ঢেলে পড়ে।
নাদির আলী হকচকিয়ে যান। একি উর্মি কথা বলছে; তার মেয়ে উর্মি।
তিনি মেয়েকে না বলতে পারেন না। তিনি মেয়ের জন্য গর্ববোধ করেন। এই না হলে আমার মেয়ে।
পথিমধ্যে রিকশা থামিয়ে কিছু ফল কিনে নেয় উর্মি। হাসপাতাল বেডে খুকিকে দেখে ফেরার সময় উর্মি রিকশাওয়ালা চাচার হাতে এক হাজার টাকার একটা নোেট তুলে দেয়। রিকশাওয়াল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে উর্মির দিকে। তার মুখে কোনো ভাষা নেই, শুধু মাথার গামছ দিয়ে দু'চোখ মুছতে থাকেন।
নাদির আলী বলেন, মা উর্মি আজ থেকে আমি আমার ভুবনের রাজা, তুমি রাজকন্যাl
কুসুমের স্বপ্ন
প্র জাপতির সাত রঙা পাখায় ভর করে পরীরা নেমে আসে আকাশের সিঁড়ি বেয়ে। নীল পরী, লাল পরী। কী নরম তুলতুলে। ওরা আদর করে। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয় কপোলখানি। ঘুম পাড়ানি গান গায়। উষ্ণতায় দু'চোখ জুড়ে ঘুম আসে কুসুমের।
কুয়াশার চাদর জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে রাজধানী ঢাকা শহর। এখন গভীর রাত।
মধ্য পৌষে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বইছে। কনকনে হিম। রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো ঘন কুয়াশায় ঘোলাটে দেখাচ্ছে।
কোথাও কোনো সাড়া শব্দ নেই। একজন হকার চায়ের কাপে টুং টাং শব্দ তুলে রাতের নিস্তব্ধতা ভাঙছে। পলিথিন কাগজের ঝুপড়ির ভেতর দু-একজন নারী-পুরুষ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে শীতকে ভ্রুকুটি করছে। সায়েদাবাদ-মালিবাগ বাইপাস সড়কের প্রশস্ত ফুটপাথে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে এই ছিন্নমূল মানুষগুলো।
ঘন কুয়াশা ভেদ করে এগিয়ে আসে একটি জিপগাড়ি আধো লাইট জ্বেলে। ধীরে শব্দে সন্তর্পণে এসে থামে। গাড়ির ভেতর থেকে ক'জন কর্মী নেমে আসে। তারা বড় একটা প্যাকেট থেকে হাতে হাতে রঙবেরঙের কম্বল নিয়ে ঘুমন্ত মানুষগুলোর ওপর ছড়িয়ে দেয়। হয়তো মহানুভব কোনো খেয়ালি মানুষের অনবদ্য এ দান। যাকে কেউ চিনবে না। জানবে না। নিরন্ন-বিবস্ত্র মানুষগুলো শুধু বিস্ময়ে উষ্ণতার পরশ নেবে।
কিছুক্ষণ পর অন্য একটি ভ্যানগাড়ি একই পথে এসে থামে। কালো ধোঁয়ার গন্ধ মিশছে বাতাসে। গাড়ির ভেতর থেকে একজন ঘাড় বাড়িয়ে বলে এ্যাই বুইড়া ব্যাডা, কম্বলডা দিয়া দে দেড় শ' টাকা পাবি।
: পাঁচশ' ট্যাহার কম্বল দেড় শ' ট্যাহায় দিমু! এ্যা কেমুন কতা কন।
: বেশ তো দুইশ'ই দিমু।
: কই আগে ট্যাহা দ্যান।
: সত্য কইরা কম্বলডা তুমি বেইচ্যা দিলা। মাইয়াডা আমার উম পাইয়া কী সুন্দর ঘুম
আইচে!
: এ্যাই নতুন দামি কম্বল দিয়া আমরা কী করুম। দুইশ' ট্যাহা হইলে সক্কাল বেলা গরম ভাত খাইবা। মাইয়াডারে একডা নতুন ফরগ কিনা দিমুনে।
কুসুমের মা মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নেয়।
কাকডাকা ভোরে উঠে পড়ে ছমিরন বিবি। লোকে ডাকে কুসুমের মা। কাজে ছুটতে হবে এক্ষুনি তাকে। কুসুমের বাপ তখনো ছেঁড়া একটা কাঁথায় নিজেকে মুড়িয়ে পড়ে আছে।
খুক খুক করে কাশছে। কুসুম ঘুম ভেঙে যায়। ছমিরন বিবি এক অজানা আশঙ্কায় মেয়ের দিকে চেয়ে থাকে। কুসুমের মায়ের চোখে চোখ রাখে।
: কী খোঁজোস মা!
: কিছু না। আইজ রাতে আমি একডা সপন দ্যাখছি। সপনডা খুব ভালা।
ছমিরন বিবি মেয়ের দিকে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
একদা হেমন্তে
হে মন্ত এসেছে, শুভ্র সকাল শিউলি ঝরেছে বাগানে, চিক চিক করছে শিশির দূর্বাঘাসে।
-থামলে কেন।
-না- এই তিন লাইনই লিখেছি।
-শেষ করো; সুন্দর হয়েছে তো!
-আচ্ছা আব্বু, তুমি না বলেছিলে এই হেমন্তে দেশের বাড়ি যাবে। এক বছর হয়ে এলো বাড়ি যাওয়া হয় না। সাদিয়া আপু, সৌরভ ভাইয়া ওদের কত না মিস করছি!
হ্যাঁ যাবো মা। শীত একটু কমলেই যাবো ইন্শাআল্লাহ্।
জারিনের মনে আনন্দ খেলে যায়। সেই যে গত বছর ওরা হেমন্তে বাড়ি গিয়েছিল, কত না আনন্দ করে এসেছে। সেসব টুকরো টুকরো স্মৃতির রোমন্থনে 'ও' হারিয়ে যায় গ্রামের মেঠোপথে।
জারিন মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে; "আম্মু জান, আব্বু এই হেমন্তে গ্রামে যেতে রাজি হয়েছে। তুমি যাবে তো। তোমার তো আবার স্কুল। ছুটি ম্যানেজ করতে পারবে।”
- হ্যাঁ মা, ছুটি পাব। এবার আমরা গ্রামের বাড়ি গিয়ে অনেক মজা করব, আনন্দ করব। -আমার সোনা মামণি- জারিন মায়ের কপালে একটা মিষ্টি করে চুমু এঁকে দেয়।
আশরাফ জামান আর শিউলী আফরোজার ছোট্ট সংসার। জামান সাহেব খবরের কাগজে চাকরি করেন। সাংবাদিকতা। মিসেস শিউলী একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। বিয়ের পরই তারা ঢাকা চলে আসেন। জীবিকার তাগিদে। সেই থেকে তাদের প্রবাস জীবন। গ্রামের টানটা তারা সব সময়ই অনুভব করেন। কিন্তু বাড়ি যাওয়া আর হয়ে ওঠে না। বিয়ের দু'বছরের মাথায় এক কন্যাসন্তান আসে তাদের ঘর আলো করে। তারা মেয়ের নাম রাখেন 'জারিন'। অর্থ- সোনালি তার। এই তারেই যেন তারা বাঁধা পড়েছেন। সব স্বপ্ন তাদের এখন জারিনকে নিয়ে। তাই তারা কোনো চাওয়াই অপূর্ণ রাখেন না জারিনের।
গ্রামের বাড়িতে জারিনের দাদ-দাদী, চাচা-চাচী আর চাচাতো ভাই-বোন থাকে। সাদিয়া জারিনের সমবয়সী, সৌরভ ওদের বড়। বাড়িতে গেলে ওদের নিয়েই যত হইচই, যত খুনসুটি। বাড়ি যাওয়ার কথা শোনার পর থেকেই জারিন খুব আনন্দে আছে। বান্ধবী তাবাসসুমকে ফোন করা হয়ে গেছে। ওকে জানিয়েছে বাড়ি যাবার কথা। দাওয়াতও করেছে- "যাবি নাকি আমাদের সাথে। গ্রাম দেখে আসবি, খুব মজা হবে। হেমন্তে গ্রামে কত আয়োজন।"
তাবাসসুম হু-হ্যাঁ করে সায় দেয় 'ও' জানে ওরা নিরেট শহুরে পরিবার। আব্বু-আম্মু কি একা ছাড়বে তাকে। তাবাসসুম জানায়, তারাও একবার গ্রাম দেখতে যাবে, তাদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় আছে গ্রামে। তারা প্রায়ই দাওয়াত করে ওদের গ্রামে আসতে। আব্বু-আম্মু কথা দিয়েছে একবার গ্রাম দেখিয়ে আনবে তাকে।
জারিন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সব সময় নিজে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করে। কেউ ওর 'হবি'র কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, 'লেখালিখি'। বন্ধুরা হাসে বলে, লেখালিখি একটা 'হবি' হয়। বাগান করা, পাখি পোষা, টিকিট সংগ্রহ, গান শোনা, ঘুরতে যাওয়া- এসব হলো 'হবি'। আর তোর কি না লেখালিখি তা কী লিখিস একটু বল, দেখা দেখি।
জারিন তার হেমন্তের ওপর লেখা অসমাপ্ত কবিতাটা পড়ে শোনায়-
হেমন্ত এসেছে, শুভ্র সকাল শিউলি ঝরেছে বাগানে চিক চিক করছে শিশির দুর্বাঘাসে।
এতদিনে বুঝি ধানকাটা হলো সারা খন্দ তুলতে ব্যস্ত বাড়ির গৃহিণী ভরবে গোলা নতুন ধানে, সে যে সোনার ধান।
এটা কবিতা হলো। মিল নাই ছন্দ নাই। তার চেয়ে বল গদ্য রচনা।
- ঠিক আছে বাবা, আমি গদ্যই লিখেছি। হলো তো!
বন্ধুরা উৎসাহ না দিলেও জারিনের আব্বা কিন্তু সবসময় ওকে লেখালিখিতে উৎসাহ দেন। বলেন, মা জারিন, তুমি পড়ো এবং লেখো। যা মনে আসে তাই লেখো। সারাদিন তোমার কেমন কাটলো লিখে ফেলো। পদ্য ফর্মে হোক আর গদ্য ফর্মে হোক, লিখে যাও। হাতের কাছে পড়ার মতো কিছু না থাকলে পুরনো কোনো পঞ্জিকাই পড়। এভাবে পড়তে পড়তে লিখতে লিখতে তোমার ভেতর একটা নতুন ভুবন সৃষ্টি হবে। তখন তুমি সহজে লিখতে পারবে এবং তা অর্থবহ হয়ে উঠবে।
বাবার কথাটা জারিন মনে গেঁথে রেখেছে। তাই পড়াশোনার ফাঁকে অবসর পেলেই জারিন একটু লেখালিখি একটু আঁকিঝুঁকি করে।
শরতের স্নিগ্ধ সকাল। মেঘমুক্ত আকাশ। ঝির ঝির বাতাসে দুলে উঠছে জানালার পর্দাটা। কী এক মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে ভোরের বাতাস। জারিন জানালার পাশে পড়ার টেবিলে বসে ভাবছে, এখানে দৃষ্টি আটকে যায় দালান-কোঠায় আর গ্রামে অবারিত মাঠ, দৃষ্টি হারায় দূর সীমানায়। গ্রামে শিউলি ঝরে, শিশিরে পা ভিজে আর শহর জীবনে আমরা কতকাল আকাশ দেখি না। এমনই হাজারো ভাবান্তরে জারিন কিছু একটা লেখায় মন দেয়- "ষড় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ঋতু বৈচিত্র্যে, রূপ-রসে, মায়া মমতায় ঘেরা এই দেশটি, এই দেশে জন্মগ্রহণ করে আমি ধন্য। গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত ও বসন্ত। এ ছয়টি ঋতু কারো থেকে কেউ কম নয়। প্রতিটি ঋতুই স্ব-স্ব মহিমায় ভাস্বর-উজ্জ্বল। কার্তিক-অগ্রহায়ণ দুই মাস হেমন্তকাল। শরতের হাত ধরে আসে হেমন্ত। এ ঋতুতে কৃষকের ঘরে নতুন ধান ওঠে। এই উৎসবকে বলে নবান্ন। নবান্নকে ঘিরে পিঠা-পুলির আয়োজন করা হয়। আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত করা হয়। রাতে আয়োজন করা হয় গানের আসর। জারি সারি বাউল গানে মেতে ওঠে পুরো গ্রাম।
গত বছর যখন গ্রামে গেলাম তখন আমি আরো ছোট ছিলাম। সেই হেমন্তে ছিল কত আয়োজন। খালা ফুফুরা এলেন। তাদের ছেলে-মেয়েরা এলো। আমার ডজন খানেক ভাই-বোন হয়ে গেল। আনন্দ আর ধরে না। একদিন সকালে উত্তরের বাতাসে পিঠা পুলির মৌ-মৌ গন্ধ ভেসে এলো। আমরা তখনো ঘুমিয়ে। একটু-একটু শীত পড়ছে বলে উঠতে ইচ্ছে করছিল না। ফুপি এসে সবাইকে জাগিয়ে দিলেন- "ওঠো ওঠো পিঠা খাবে না।" আমরা হুড়মুড় করে উঠে পড়লাম। তারপর আমরা সবাই উননের চারপাশ ঘিরে বসলাম। কুসুম কুসুম ওম পেয়ে আমরা সতেজ হয়ে উঠলাম। চলল রকমারি সব পিঠা খাওয়ার ধুম। দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেলে আমরা গ্রামময় ঘুরে বেড়ালাম। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা। দেখলাম পাখিরাও আমাদের সাথে ঘরে ফিরছে। নীল আকাশে মেঘের ভেলা। আলোর খেলা। -কীসব হাবিজাবি লিখলাম। যা: কিচ্ছু হলো না। থাক এখন। কাল তো রওনা দিতে হবে। আজ সব প্রস্তুতি শেষ করতে হবে। কত কাজ। আম্মুটা যে কখন আসবে।
ঢাকা থেকে আমরা সকাল সকাল রওনা দিলাম। ছয় ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের বাস দিনাজপুর এসে পৌঁছল। এখান থেকে ভ্যানগাড়িতে আমাদের গ্রাম উদয়পুরে যেতে আরও এক ঘণ্টা লাগল। চাচা-চাচী সাদিয়া সৌরভ ভাইয়া বহির্বাটীতে এসে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জন্য। কী আনন্দ। সাদিয়া এসে জড়িয়ে ধরলো আমাকে। চাচা-চাচাকে সালাম করে আমরা ঘরে ঢুকলাম। চাচী বললেন তোমরা সব ফ্রেশ হয়ে এসো, আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি। চাচী দিনাজপুরের বিখ্যাত কাটারীভোগ চালের খিচুড়ি আর গরুর গোশত রান্না করেছেন। জিভে পানি এসে গেল।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে একটা লম্বা ঘুম দিলাম সবাই। জার্নির ক্লান্তি অনেকটাই কেটে গেছে। বিকালে চা পর্ব সেরে সৌরভ ভাইয়া সাদিয়া আর আমি বেরিয়ে পড়লাম গ্রাম ঘুরে দেখতে। গতবারের দেখা স্মৃতিময় স্থানগুলো ঘুরে ঘুরে বেড়ালাম। দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে লাল শাপলা দেখার আনন্দটাই আলাদা। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট করতোয়া নদী। শীতকে সামনে রেখে অতিথি পাখির আগমন ঘটেছে। আকাশে বালি হাঁসের ঝাঁক উড়তে দেখা গেল। সৌরভ ভাইয়া বলল, এই আর কিছুদিনের মধ্যেই নদীতীর অতিথি পাখির সমাগমে কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠবে। ইতোমধ্যে শীতের অতিথি পাখি আসতে শুরু করেছে। সারস, পাতিহাঁস বালিহাঁস বক গাংচিল কত না নাম না জানা পাখি। একদিন তোকে দেখাতে নিয়ে যাবো। আমরা আল পথ ধরে হাঁটছি দুই ধারে জমির ধান কাটা চলছে। কোনো কোনো ক্ষেতে ধান কাটা প্রায় শেষ। রাশি রাশি ধান কেটে ঘরে তুলছে কৃষক। সুগন্ধি ধানের মৌ মৌ গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ একটি সদ্য ধান কাটা ক্ষেতে কয়েকজন ছেলে মেয়েকে দেখা গেল। ওরা কী যেন খুঁজছে, সংগ্রহ করছে। জিজ্ঞেস করতেই সাদিয়া জানায়, ওরা অতি সাধারণ ঘরের ছেলে-মেয়ে। ধান কাটা ক্ষেতে কিছু ধান ঝরে যায়, ইঁদুরের গর্তেও ধান থাকে সেসব ধান কুড়িয়ে নেয় ওরা। বেশ ধান পায় ওরা। তাতে ওদের লাভ হয়। ওদের কেউ কিছু বলে না। আমি হাঁটতে হাঁটতে ওদের কাছে চলে যাই। খুব কাছ থেকে ওদের দেখি। শত আনন্দের মাঝেও একটা দুঃখ ছুঁয়ে যায় আমাকে। দু'টি মেয়ে কতই বা বয়স। পরনে ফ্রক, কী যে রঙ ছিল তা বোঝার উপায় নেই। কোঁকড়ানো ঝাঁকড়া চুলে কতকাল যত্নের হাত পড়েনি, কে জানে। আমাকে দেখে একটু চমকে উঠলো। বললাম, কী নাম তোমার, বেশ ধান পেয়েছ তো। শেফালীরা হাসে, কুড়ানো ধান দেখায়। ফোকলা হাসি আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এ যে সোনার ধান, সোনামুখ ওদের।
বসেছি। দাদী এবার রূপকথার গল্প না বলে এ সময়ের গল্প শুনালেন। দাদী বললেন, "তোমরা এবার রাতে ঘুমানোর আগে দাদীর গল্প শোনার পালা। আমরা বোনেরা সব দাদীকে ঘিরে তো বই পুস্তকে পড়েছ, গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছ। এ দৃশ্য এখন আর নেই গ্রামে। এখন আর নদীতে পাল তোলা নৌকা দেখা যায় না। নববধূর পালকি তো হারিয়েই গেছে। ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দও আর শোনা যায় না। এসবের স্থান দখল করেছে তোমাদের আধুনিক সব যন্ত্রপাতি।
আচ্ছা দাদু, এবার নবান্ন হবে না।" হবে তো দাদু! কালই পিঠা পুলির আয়োজন করা হবে।
সবাইকে দাওয়াত করা হয়েছে। এবার তবে সবাই ঘুম দাও। কাল কিন্তু খুব ভোরে উঠতে হবে, সেই কাকডাকা ভোরে। দেখব কে আগে উঠতে পারে।
ক'দিন হলো আমরা ঢাকায় ফিরেছি। আজ হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলে শুধু শেফালীর ফোকলা হাসি খুব করে মনে পড়ছে।
সন্ধ্যায় জামান সাহেব ঘরে ফেরেন। হাতে মিষ্টির প্যাকেট। জারিন বলে, কী ব্যাপার 'আব্বু মিষ্টি হাতে এতগুলো পত্রিকা।
: তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে। তোমার আম্মুকে ডাকো। কই কোথায় তুমি। তোমা মেয়ের লেখা গল্প ছাপা হয়েছে!
জারিন বিশ্বাস করতে পারে না। আব্বুর হাত থেকে পত্রিকা নিয়ে বিস্ময়ে আনন্দে আব্বুলে জড়িয়ে ধরে। মা তখন বাবা-মেয়ের আনন্দঘন মুহূর্ত উপভোগ করতে থাকেন।
মধুর স্মৃতি
মেহমান আসার কথা শুনে জবার মায়ের আজ ব্যস্ত সময় কাটছে। ঘর গোছানো, রান্না-বান্না কত কাজ। ছেলে-মেয়েরাও সাধ্যমতো মাকে সাহায্য করছে। । দুপুরের আগেই ঘরদোর ঝকঝকে তকতকে পরিপাটি হয়ে উঠলো। মেহমান আসরের পরপরই এসে পৌঁছলেন। মেহমান আর কেউ নন। জবার বাবার ছোট বেলার বন্ধু আব্দুল করিম। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি ঢাকা এলে বন্ধুর বাড়িতেই ওঠেন। এবারও তার ব্যত্যয় হয়নি। তবে অনেক দিন পর এলেন। ঢাকা এসেছেন চিকিৎসার কাজে।
মাস্টার সাহেব একটু ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে বন্ধুর সাথে বসেছেন আলাপচারিতায়। এমন সময় আব্দুর রহমান সাহেবের মেঝ ছেলে সুজন এসে বললো,
: আব্বু আজ কি আমাদের বৈঠক হবে?
: কেন হবে না।
: চাচা যে এসেছেন।
: তাতে কি। তোমাদের চাচা আজকে আমাদের বৈঠকে মেহমান হিসেবে থাকবেন। উনিও তোমাদের উদ্দেশে কথা বলবেন। তুমি সভার আলোচনার বিষয় (এজেন্ডা) সাজিয়ে ফেল।
জনাব রহমান খেয়াল করলেন তার বন্ধুর চোখেমুখে উৎসুক ভাব। তা হবারই কথা। এ ধরনের প্র্যাক্টিস ক'জনের পরিবারেই বা আছে। তিনি বিষয়টি খুলে বললেন- 'শোন মাস্টার, আমরা সপ্তাহে একদিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে এক টেবিলে বসি। সদস্যদের কার কি সমস্যা, লেখা-পড়া, চরিত্র গঠন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলি। মতবিনিময় পরামর্শ এই আর কি। পারিবারিক আড্ডাও বলতে পারো। আমার সাপ্তাহিক ছুটির দিন বসা হয়। ব্যস্ততার কারণে কোনো সপ্তাহে আবার বসাও হয় না। আজ তুমি আছো, সন্ধ্যার পর আমাদের আড্ডা জমবে ভালো'।
আব্দুল করিম মাস্টার এই প্রথম এমন আড্ডার কথা শুনলেন। বেশ আগ্রহ প্রকাশ করলেন।
সন্ধ্যার পর যথারীতি বৈঠক শুরু হলো।
রহমান সাহেবের দুই ছেলে এক মেয়ে। ওরা স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে। মেয়ে বড় জারিন আফরোজ জবা- কলেজে ফার্স্ট ইয়ার, মেঝ ছেলে আহমদ শাব্বির সুজন, নাইনে। সবার ছোট শাকিল আহমদ শুভ ক্লাস সেভেনে পড়ে।
সুজন অনুষ্ঠানের আলোচ্যসূচি সাজিয়েছে। একান্ত পারিবারিক বিষয় নেই। মেহমানের কথা ভেবে হয়তো এমনটা করা হয়েছে। সূচিটা পড়ে শোনানো যাক:
সঞ্চালক- আহমদ শাব্বির সুজন
পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত-শুভ
আলোচনা-
পারিবারিক বৈঠকের গুরুত্ব- বড় আপা
প্রশ্নোত্তর পর্ব- উত্তর দিবেন আব্বু
মেহমানের কথা- চাচা (আব্দুল করিম)
মুনাজাত
আলোচ্যসূচি দেখে রহমান সাহেব খুব খুশি হলেন, মনে মনে ভাবলেন, ছেলের বুদ্ধি আছে বলতে হয়। যা হোক, আলোচনার এক ফাঁকে মিসেস রহমান (সুজনের মা) চা আর ঝালমুড়ি পরিবেশন করলেন। মাস্টার সাহেব বললেন, ভাবী এবার আলোচনা আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। আপনি বসুন।"
রহমান সাহেবের ছোট ছেলে শুভ প্রশ্নোত্তর পর্বে হাত উঠিয়ে অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন করলো-
আচ্ছা আব্বু, আল্লাহ তো তার বান্দাকে খুব ভালোবাসেন; কিন্তু কতটুকু ভালোবাসেন?
রহমান সাহেব ভাবলেন, এক কথায় এ প্রশ্নের উত্তর দিলে, ছেলেকে সন্তুষ্ট করা যাবে না। তবে কী উদাহরণ টেনে বলা যায়।
রহমান সাহেবের ইতঃস্তত ভাব দেখে মাস্টার সাহেব বললেন, দোস্ত তুমি অনুমতি দিলে আমি এ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলার চেষ্টা করতে পারি। রহমান সাহেব বললেন, অবশ্য অবশ্যই, তুমি শিক্ষক মানুষ, তুমি ভালো বলতে পারবে।
মাস্টার সাহেব: "বাবাজিরা শোন-আল্লাহ মানুষকে কতটা ভালোবাসেন তা পরিমাপ কর খুবই কঠিন। সন্তানকে বেশি ভালোবাসে কে নিশ্চয়ই বাবা-মা। আল্লাহ মা-বাবার চেয়েও তার বান্দাকে অনেক বেশি ভালোবাসেন। বাবা-মা'র অন্তরে এই ভালোবাসা আল্লাহই দান করেছেন। একটা উদাহরণ দেয়া যাক, দুরন্ত ডানপিটে কোনো সন্তানকে তার দুষ্টুমির জন্য মা খুব বকা দিলেন। ছেলে রাগ করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। ছেলে আর ঘরে ফেরে না। মা'র মনে কুডাকে। বুকটা দুরুদুরু করে। মা পথ পানে চেয়ে থাকেন। উঁকিঝুকি দেন। কখন ছেলে ঘরে ফিরবে। অপেক্ষা যেন মৃত্যুর কষ্টের মতো মনে হয়। হঠাৎ ঘরের দরজায় টোকা শোনা যায়। মা দৌড়ে গিয়ে দরজা খোলেন। ছেলেকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরেন। চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেন। চোখের পানিতে ভাসেন। বুঝতেই পারছ, এই মায়ের ভালোবাসা থেকেও আল্লাহ তার বান্দাকে শত কোটি গুণে বেশি ভালোবাসেন, বান্দা যখন তাঁকে স্মরণ করে বা তাঁর দুয়ারে ধর্ণা দেয়।"
পরিবেশটা একটু ভারী হয়ে উঠলো। মিসেস রহমান একটু হালকা করতে বললেন, ভাইজান আপনি খুব ভালো বলেছেন। সন্তানরা, তোমরা এ আলোচনা থেকে শিক্ষা নিবে- মা-বাবা সন্তানদের নিয়ে কতটা ভাবেন। তার চেয়েও বেশি ভাবেন মহান আল্লাহ, যদি তোমরা সৎপথে থাকো। তাকে স্মরণ করো, তাহলে আল্লাহর সাহায্য সবসময় তোমাদের সাথে থাকবে।
: জবার মা, আমার চা তো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। মাস্টার ভাইয়ের কথা শুনতে-শুনতে আমি আমার শৈশবে হারিয়ে গিয়েছিলাম।
: অসুবিধা নেই। আমি চা আবার গরম করে দিচ্ছি।
: জানো মাস্টার, আমি ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। আমার জীবনটা ছিল ছন্নছাড়া। খুব দুরন্ত ছিলাম। একবার হলো কি-বর্ষার নতুন পানি এসেছে। বিলে পানি থৈ-থৈ করছে। আমি বন্ধুদের সাথে সাঁতরে বিল পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করলাম। বন্ধুরা কিছুদূর এসেই ফিরে গেল। আমি ফিরলাম না। আরো কিছুটা যেতেই ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। তখন জেগে থাকা একটা উচ্চ জায়গায় গিয়ে উঠলাম। অনেকটা দ্বীপের মতো। চারদিকে পানি আর পানি। আমি আর সাহস করছি না ফিরে যাবার। ততক্ষণে মায়ের কানে খবরটা পৌঁছে গেছে। মা' একটা ডিঙ্গি নৌকা সংগ্রহ করে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলেন। সেদিন শুধু মায়ের চোখে কান্না দেখেছি। সেই মাও আজ আর নেই।
-পরিবেশটা আবারো ভারী হয়ে উঠলো। মিসেস রহমান একটু হালকা করতে বললেন, আমি একটা ধাঁধা বলব- দেখি কে উত্তর দিতে পারে। "হরি'র উপর হরি, তার উপর হরি। হরিকে দেখিয়া হরি হরিতে লুকায়।” পারছো না কেউ!
জবা বললো, আম্মু একটু আভাস-ইঙ্গিত (Clue) দাও।
জবার মা বললেন, এই ধর তোমাদের আব্বু যে বিল-ঝিলের কথা বললো, এটা তার সাথে সম্পৃক্ত। সবাই আমতা আমতা করছে।
: আচ্ছা বলে দিচ্ছি, হরি মানে পানি। হরি মানে পদ্ম। হরি মানে ব্যাঙ। হরি মানে সাপ। এবার মিলিয়ে দেখ।
-এবার হাসির রোল পড়ে যায়।
: আচ্ছা বন্ধু! তোমার ছেলে-মেয়েরা কি সাঁতার জানে?
: জানবে কিভাবে। গ্রামে গেলে তো বেশিদিন থাকা হয় না। তারপর আবার পুকুরগুলোতে সব মাছ চাষ হয়। গোসল করার কোনো উপায় নেই। মাছের কৃত্রিম খাবারের গন্ধে পানি বিবর্ণ হয়ে থাকে। আমার ইচ্ছে হয় কি দোস্ত! আমার যদি অনেক অর্থ সম্পদ থাকতো, আমি গ্রামে একটা দীঘি কেটে দিতাম। সেটা গোসল আর সন্তানদের সাঁতার শেখার জন্য উন্মুক্ত থাকতো।
: তোমার নেক ইচ্ছা আল্লাহ পূরণ করুন।
ক'দিন হলো মাস্টার সাহেব গ্রামে ফিরে এসেছেন। সাথে নিয়ে এসেছেন একটি পরিবারের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, মিলে মিশে থাকার ভালোবাসার এক মধুর স্মৃতি। সেই কথাই আজ তিনি ক্লাসে তার ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে শেয়ার করছিলেন। তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরাও অনুপ্রাণিত হয় তার গল্পে।
অন্য রকম গল্প
গাজীপুর জেলার ধীরাশ্রম গ্রাম। পাশ দিয়ে চলে গেছে সিটি করপোরেশনের পাকা রাস্তা।
জায়গাটা উন্নয়নশীল। নগরায়ণ হচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে গড়ে উঠছে শিল্প-কারখানা। রাস্তার একপাশে ইটভাঙার শ্রমিকরা কাজ করছেন। এই সাতসকালে খট্ খট্ শব্দ চার দিকের নীরবতা ভাঙছে। আজ চৈত্রের কত তারিখ নয়ন তা জানে না। তবে সকালটা তেতেছে তা খুব আঁচ করতে পারে।
: মা! ছাতাটা টাঙ্গায়্যা দাও। সকাল বেলাতেই সূর্যির তেজটা কেমুন দ্যাখছ।
: হ বাবা দিতাছি।
সাবিহা খাতুন একটি লম্বা লাঠির সাথে ছাতাটা বেধে সূর্যের দিকে মুখ করে টাঙিয়ে দেয়। একটা শীতল ছায়া নয়নের কপালে এসে পড়ে। নয়নের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। বাঁ হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে, ছাতার দিকে এক নজর তাকিয়ে নয়ন আবার ইটের ওপর হাতুড়ির খট্ খট্ শব্দ তোলে। মায়ের সাথে ইট ভাঙার কাজটা নয়ন এখনও রপ্ত করে উঠতে পারেনি। কচি হাতের আঘাতে ইটের দু'-একটি টুকরা ওকে কখনও কখনও পাল্টা আঘাত করে বসে। তাতে 'ও' বিচলিত হয় না। 'ও' জানে এ থেকেও মায়ের মনের আঘাত অনেক বেশি।
একটু অন্যমনস্ক হতেই হাতুড়ির একটা আঘাত সজোরে বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির ওপর এসে
পড়ে।
'উহ্ মা গো মরছি!'- আর্তনাদটা দিগন্তে না মিলাতেই একটা লাল রঙের সুবারু গাড়ি ওদের সামনে এসে থামে। ভেতর থেকে একজন ভদ্রলোক বেরিয়ে আসেন।
: একি! ছেলেটির আঙুল কেটে রক্ত ঝরছে, আর তুমি মা হয়ে দেখছ!
: ভদ্রলোকের কথায় সাবিহা খাতুনের সম্বিত ফেরে।
মা কাঁদতে শুরু করে-হায়! হায়! আমার পোলাডা শেষ হইয়া গ্যাল। নয়ন হাতটা উঁচু করে ধরে আছে। টপ্ টপ্ করে রক্ত ঝরে পড়ছে কালো পাথরের ওপর। মা শাড়ির আঁচলের কিছুটা ছিঁড়ে নয়নের হাতটা বেঁধে দেয়। ভদ্রলোক মা ও ছেলেকে গাড়িতে তুলে নিয়ে রওনা দেন হাসপাতালের দিকে।
ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল কোনো একদিন। সেদিন তিনি তার জীবনের গল্প বলেছেন আমাকে। অনুরোধ করেছেন আমি যেন তার নাম প্রকাশ না করি। আমি তার অনুরোধ রাখবো। এসো আমরা তার একটা ছদ্মনাম দেই; 'আকাশ'
আকাশ সাহেব তখন খুব ছোট। তাঁর বাবা গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি করতেন। গার্মেন্টস দুর্ঘটনায় তাঁর বাবা মারা যান। চল্লিশ দিন না যেতেই চাচারা বললেন, এ বাড়িতে তোমাদের কোনো অধিকার নেই। মায়ের মাথায় তখন বাজ ভেঙে পড়লো।
অথচ বাবা তার ছোট ভাইদের নিয়ে একটি ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তুলেছিলেন বাড়িতেই। সেই আয়ে তাদের পরিবার চলতো স্বাচ্ছন্দ্যে। বাবার অবর্তমানে চাচাদের সংসারে ঠাঁই হলো না তাদের। নিরুপায়-অসহায় মা শিশু আকাশকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন অজানার উদ্দেশ্যে। দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে তাদের আশ্রয় মিললো। এর পরের কাহিনি অনেক বেদনার, অনেক বঞ্চনার। সেসব কথা নাই বা বললাম।
তবে একটি ঘটনা না বললেই নয়। আকাশের মা প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে। কোলে সন্তান দেখে কেউ কাজ দিতে চায় না। সবাই কোলের সন্তানের দিকে তাকিয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায়। এটা তার সম্মানে লাগে। তার মন সায় দেয় না এভাবে জীবন ধারণ করতে। তিনি মনস্থির করেন সন্তানকে বাড়িতে রেখেই কাজে বেরুবেন। কিন্তু কে সন্তান দেখবে, কে সামলাবে তার শিশু সন্তানকে। ভাবেন, আশ্রয়দাতার এক মেয়ে রয়েছে কিশোরী
বয়সের। ওকে বলে দেখবেন।
সত্যি সত্যি একদিন তাই হলো। কিশোরী মেয়েটি তার সন্তান দেখতে রাজি হলো। আকাশের মা আকাশকে খাওয়ায়ে ঘুম পাড়িয়ে সকাল সকাল কাজে বেড়িয়ে পড়লেন। ঘণ্টা দুই পরই শিশু আকাশ ঘুম থেকে জেগে উঠলো। মাকে না দেখে জুড়ে দিলো ভীষণ কান্না। কিশোরী মেয়েটি অনেক চেষ্টা করেও সে কান্না থামাতে পারছিল না। বাড়ির অন্যরাও অনেক চেষ্টা করলো কিছুতেই কিছু হলো না। মা কোথায় গেছে কেউ কিছু জানে না। বলেও যায়নি।
অবস্থা বেগতিক আঁচ করতে পেরে বাড়ির কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করা শুরু করে দিলো। একপর্যায়ে কুকুরটি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো। খুঁজে বের করলো আকাশের মা'কে। কুকুরটি তাকে ঘেউ ঘেউ করে লেজ নেড়ে নেড়ে বাড়ির পথ দেখাতে চাইল। তিনি কুকুরটিকে চিনতে পারলেন; কিন্তু কিছু বুঝে উঠতে পারলেন না। পরে কুকুরটা যখন পথ পানে একবার চলে যায় আবার ফিরে আসে, তাকে বোঝাতে চায় তুমি আমার পিছু নাও তখন মায়ের মনটা আঁতঙ্কে ওঠে। তিনি কালবিলম্ব না করে, কাজ ফেলে রেখে কুকুরের পিছু পিছু বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এসে দেখেন তার সন্তান অঝরে কাঁদছে। তিনি সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। কুকুরটি তার পাশে দাঁড়িয়ে আনন্দে লেজ নাড়তে থাকে। বাড়ির সবাই বিস্ময়ে কুকুরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এরপর কেটে গেছে অনেক বছর। অনেক ত্যাগ আর অধ্যবসায়ের পর শিশু আকাশ এখন আকাশ সাহেব হয়েছেন। মায়ের দুঃখ ঘুচিয়েছেন। বাবার ব্যবসা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। কোনো মায়ের কোনো শিশুর কষ্ট দেখলে আকাশ সাহেবের মনটা তাই কাঁদে। আকাশ সাহেব সাবিহা ও তার ছেলে নয়নকে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন। কাজ দিয়েছেন। নয়ন এখন স্কুলে পড়ে।
আজ ১লা মে। মে দিবস। শ্রমিক দিবস। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন। সাভারের রানা প্লাজার সামনে সকাল থেকেই ভিড় জমে উঠেছে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির কথা তোমরা জান। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে দু'হাজার তেরো সালের চব্বিশে এপ্রিল রাজধানীর পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলখ্যাত সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় সহস্রাধিক গার্মেন্টস শ্রমিক নিহত ও শত শত শ্রমিক আহত হন। ধ্বংসস্তূপের বেদিতে ফুল দিয়ে ভালোবাসা নিবেদন করতে এসেছেন নিহতদের স্বজনরা। নয়নের হাত ধরে সাবিহা খাতুনও এসেছেন। হাতে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা।
ধ্বংসস্তূপের মাটি ছুঁয়ে দেখতে চান সাবিহা। শুনতে চান তার স্বামীর হৃৎপিণ্ডের শব্দ, পায়ের আওয়াজ। নয়ন মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখে। অদূরে লাল গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন আকাশ সাহেব। তার দু'চোখে তখন অশ্রুধারা।
মিষ্টি পাওয়া যায়
জিবরানের বয়স তখন দেড় কি দুই বছর। কেবল হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে। বাবা নামাজ পড়তে দাঁড়ালে পাশে জায়নামাজে গিয়ে দাঁড়ায়। বাবার সাথে রুকু সিজদাহ করে। কখনো রুকুর আগেই সিজদাহ দিয়ে বসে। কখনো তার গায়ে জামা-কাপড় কিছুই থাকে না। দিব্যি নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। ওর নামাজ পড়ার এই দৃশ্য দেখে অন্যরা সবাই হেসে কুটিকুটি হয়। তবে কেউ কোনো শব্দ করে না। যাতে ওর ছন্দপতন না ঘটে।
জিবরান বেড়ে ওঠে। এখন শিশুশ্রেণিতে পড়ে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে অনেক কিছু জানতে চায়। ওর যেন জিজ্ঞাসার শেষ নেই। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা আম্মু নামাজ পড়লে কী হয়? মা আগে পিছে কিছু না ভেবেই বলে বসেন, মিষ্টি পাওয়া যায়। জিবরান বলে, তাহলে আমি এখন থেকে নিয়মিত নামাজ পড়বো।
মা ভাবেন, বলে তো ফেললাম, এখন কী হবে। নামাজ পড়ে জিবরান যদি মিষ্টি না পায় তবে তো হতাশ হবে। আমিও মিথ্যাবাদী হয়ে যাবো। আল্লাহ রাসূলের (সা.) প্রতিও ওর ভালোবাসা কমে যাবে।
মা করলেন কী প্রতি ওয়াক্ত নামাজের আগে জায়নামাজের নিচে বাতাসা (চিনির এক প্রকার শুকনো সাদা মিষ্টি) রেখে আসতেন। জিবরান নামাজ শেষে বাতাসা পেয়ে খুব খুশি হতো। মজা করে খেতো আর বলতো, এগুলো বুঝি ফেরেস্তারা দিয়ে যায়। মা বলতেন, হয়তো বা। বাবা-মা একদিন জিবরানকে সাথে নিয়ে আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে গেলেন।
সেটা ছিল জিবরানের খালার বাড়ি। খালাতো বোনকে নামাজ পড়তে দেখে ওর আগ্রহের শেষ নেই। ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে বলে, মিস্টি পেয়েছ।
: কীসের মিষ্টি ভাইয়া।
: কেন নামাজ পড়লে যে। আমি নামাজ পড়লে প্রতিদিন মিষ্টি পাই আর মজা করে খাই।
খালাতো বোন মিথিলা হেসে কুটিকুটি। ও বিষয়টি সিরিয়াসলি নেয় না। ও তো পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, অনেক কিছু বোঝে। মিথিলা জিবরানকে বুঝিয়ে বলে, শোনো ভাইয়া নামাজ পড়তে হবে শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তাহলে আমরা পরকালে বেহেশত পাব। আর সেখানে অ-নে-ক মিষ্টি অ-নে-ক ফলমূল খেতে পারবো। তুমি যা চাইবে তাই পাবে। জিবরান বলে, তাই বুঝি। তাহলে আজ থেকে আমিও শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়বো।
জিবরানরা বেড়ানো শেষে বাসায় ফিরে আসে। মাগরিবের ওয়াক্তে বাপ-বেটা নামাজে দাঁড়ায়। কাকতালীয়ভাবে ঐদিন মা মিষ্টি রাখতে ভুলে যান। জিবরান নামাজ শেষে মিষ্টির খোঁজ করে না। তারপরও জায়নামাজ তুলে একবার দেখে মিষ্টি আছে কি না। মিষ্টি না দেখে ভাবে, ঠিকই তো আমি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়েছি, মিষ্টি আসবে কেন। আমি বেহেশতে অনেক অনেক মিষ্টি পাব। জিবরানের মুখে হাসি ফোটে। মা বিষয়টি লক্ষ্য করেন। ভেবে পান না কি হলো। ছেলে তো কিছু বলছে না। মুখটাও হাসি-খুশি। তবে কি ছেলে সব রহস্য জেনে গেল।
জিবরান মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, জানো আম্মু মিথিলা আপু বলেছে, নামাজ শুধু দিবেন। আমিও আজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়েছি। তাই ফেরেস্তারা মিষ্টি দিয়ে যায়নি। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পড়তে হবে। তবে পরকালে আল্লাহ বেহেশতে আমাদের অনেক মিষ্টি মায়ের চোখে আনন্দ অশ্রু। অধর রেখায় হাসির ঝিলিক খেলে যায়। মা ছেলেকে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেন।
আত্মপরিচয়
একদিন এক শিকারি বনের ভেতর একটি আস্তানায় বাঘের বাচ্চা দেখতে পেল। সম্ভবত তখন বাঘিনী শিকারে বেরিয়েছিল। তাই তার বাচ্চা দুটো অরক্ষিত অবস্থায় ছিল। এই সুযোগে শিকারি একটি বাচ্চা ধরে বাড়িতে নিয়ে এলো। চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল। গ্রামের সবাই দেখতে ভিড় জমালো। এতক্ষণে শিকারি বুঝতে পারলো, কাজটি ঠিক হয়নি। এই মাসুম বাচ্চাকে কী খাওয়াবে। বাচ্চার চোখ দু'টি নীরবে বলছে, “আমি ক্ষুধার্ত আমাকে খেতে দাও।”
শিকারির বাড়িতে ছিল ছাগল। তার তিনটি ছানাাও ছিল। শিকারি দেখল, ছাগ ছানারা কী সুন্দর মনের সুখে ছাগীর দুধ খাচ্ছে। শিকারি ভাবলো, ব্যাঘ্র শিশুকে ছাগলের দুধ খাওয়ালে কেমন হয়। যে কথা সেই কাজ। বাঘের বাচ্চা দিব্যি ছাগলের ওলানের বাট চুষে দুধ খেয়ে জীবন ধারণ করতে লাগল। বাঘের সন্তান আর ছাগলের সন্তানরা এক সঙ্গে বড় হতে লাগল। এক বছর যেতে না যেতেই ছাগল ছানাদের মাথায় শিং গজালো। স্বভাবগত কারণেই ছাগল ছানারা বাঘের সন্তানকে শিং দিয়ে গুঁতাতে শুরু করলো। বাঘের সন্তান খুব বিরক্ত হতো। কিন্তু করার কিছুই ছিল না। তার তো আর শিং নেই। সে তার নরম তুলতুলে শরীরে ছাগলের গুঁতো খেয়েই চলল। ছাগলরাও তাকে গুঁতিয়ে খুব মজা পেত। বাঘের সন্তান শুধু সৃষ্টিকর্তার কাছে তারও যেন শিং গজায়- এই প্রার্থনা করতে থাকলো। এ অবস্থায় একদিন ছাগলের সন্তানরা ঘাস খেতে মাঠে গেল। বাঘের সন্তাও তাদের সঙ্গী হলো। মাঠের দূর প্রান্তে বন থেকে শিকার খুঁজতে আসা একটি বাঘ দেখল, ছাগলরা ঘাস খাচ্ছে আর তারই স্বজাতি (ব্যাঘ্র ছানা) একজনকে গুঁতাচ্ছে। বাঘ আর ঠিক থাকতে পারলো না। বীর বিক্রমে ছুটে এলো। পাহাড় কাঁপানো গর্জন তুলল। বাঘের গর্জন বলে কথা। ছাগলরা সব ছুটে পালালো। মা বাঘ শিশু ব্যাঘ্রটিকে বলল, তোর এ অবস্থা কেন?
চল আমার সাথে। বাঘ তার স্বজাতির শিশুটিকে নিয়ে বনের ভেতর চলে গেল। এরপর একটি জলাশয়ে পানি খেতে পাঠালো। ব্যাঘ্র শিশুটি পানি দেখে ভয় পেল। কেননা ততদিনে তার মধ্যে ছাগলের স্বভাব ঢুকে পড়েছে। পেছন থেকে মা বাঘের শাসনে শিশুটি পানির ধারে গেল এবং পানির মধ্যে নিজের চেহারা (ছবি) দেখতে পেল। ভাবলো, 'তাহলে আমি ছাগল নই, আমি তো ওই বড় বাঘের মতো।'
--ব্যাঘ্র শিশু পানি খেয়ে বুক টান করে সগর্বে ফিরে আসতে লাগল। মা বাঘ বলল,
কী দেখলে?
: দেখলাম আমি তো তোমার মতো, আমি তো তোমারই জাত।
: তবে এতদিন দুর্বল ছাগ হয়েছিলি কেন? এবার একসঙ্গে গর্জন তোল। হা-লু-মহা-লু-মা।
সারপ্রাইজ
: আম্মু---! পেস্ট নেই। আব্বুকে টুথপেস্ট আনতে বলবে।
: আজকে কোনো রকমে কাজ চালিয়ে নাও বাবা।
রওনক টিউব টিপে টিপে কিছুটা পেস্ট বের করে কাজ চালিয়ে নেয়। দ্বিতীয় দিন সকালে ওয়াশ রূমে ঢুকে রওনক নতুন পেস্ট না দেখে বলতে থাকে- 'আম্মু পেস্ট আননি। কি দিয়ে ব্রাশ করবো!"
: বলেছিলাম বাবা, তোর আব্বু আনতে ভুলে গেছে।
রওনক আজো টিউব টিপে অনেক কসরত করে কিছুটা পেস্ট বের করে দাঁত ব্রাশ করে।
তৃতীয় দিনেও একই ঘটনা ঘটে। পেস্ট নেই। আম্মু বলেন, তোর আব্বু তো পেস্ট না পেলে নিমের ডাল দিয়ে মেছওয়াক করে। তাই তার তাগাদা নেই। যত সমস্যা আমাদের। আজকে
তুমি স্কুলে যাবার সময় টাকা নিয়ে যাবে; ফেরার পথে টুথপেস্ট কিনে আনবে। রত্তনক ভাবে, আজ আর চেষ্টা করে লাভ হবে না। কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। তারপরও সে শক্তি খাটিয়ে টিপে টিপে একটুখানি পেস্ট বের করে।
'ও' ব্রাশ করে আর ভাবে, প্রথম দিনেই টিউবটা ফেলে দিলে তিন দিন কাজ চালানোর মতো পেস্ট অপচয় করা হতো। প্রতিদিন এক টাকা হিসাবে তিন দিনে তিন টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
এভাবে আমরা সাশ্রয়- সঞ্চয় করতে পারলে মাস শেষে বছর অন্তে ভালো একটা কিছু করা সম্ভব হতে পারে।
রওনক। পুরো নাম রওনক জাহান। 'ও' অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছে 'ও'। ছোটবেলা থেকেই 'ও' দেখে আসছে অভাব কি জিনিস। অভাব সামাল দেয়া, ধৈর্য ধারণ করা-এসব পরিবার থেকে শিখেই বড় হচ্ছে 'ও'।
সেদিন স্থানীয় একটি ব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল ওদের বিদ্যালয়ে এসেছিল; স্কুল ব্যাংকিং বিষয়ে ক্যাম্পেয়িং (Campaign) করতে। রওনক তাদের কথা বেশি মনোযোগ দিয়ে শোনেনি। ভেবেছে, এ বিষয়টি তার জন্য নয়। যে পরিবারে 'নুন আনতে পান্তা ফুরায়' সে পরিবারের সন্তান হয়ে কিভাবে সঞ্চয় করবো। আবার ব্যাংকিং! এটা তার কাছে মনে হয়েছে বড়লোকদের ব্যাপার-স্যাপার।
রওনক ব্রাশ করে আর ভাবে, সঞ্চয় করা তাদের পক্ষেও সম্ভব। সেদিন স্কুল ব্যাংকিং-এর বিষয়ে অমনোযোগী হওয়াটা ঠিক হয়নি। সে আজই বন্ধু কাউসারের সাথে কথা বলে বিস্তারিত জানবে। কাউসার সেদিন স্কুল ব্যাংকিং এর ব্যাপারে বেশ সাড়া দেয়। এবং হাতে-কলমে শিখে নেয় হিসাব খোলার ফরম কিভাবে পূরণ করতে হয়। কাউসার নিশ্চয়ই তাকে সহযোগিতা করবে।
রওনক আজ টিফিন আওয়ারে কাউসারকে বলে, দোস্ত! 'স্কুল ব্যাংকিং' বিষয়ে আমাকে একটু বিস্তারিত বল তো। কাউসার বলে, ওই দিন তো তোর কোনো সাড়াশব্দ দেখলাম না। আজ আবার বলছিস বলতে! রওনক বলে! আমার ভুল হয়েছে দোস্ত। আমাদের সবারই সঞ্চয় করার প্রয়োজন রয়েছে।
কাউসার বলে, শোন তাহলে- ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করে। এর উদ্দেশ্য হলো, শিক্ষার্থীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা এবং তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে শিক্ষিত করে তোলা। এই কার্যক্রমের লক্ষ্য হলো, ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে টাকা জমানোর অভ্যাস গড়ে তোলা। এর আরো একটি উদ্দেশ্য হলো, শৈশব থেকেই আধুনিক ব্যাংকিং প্রযুক্তির সাথে ছাত্রদের পরিচিত করানো। ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ব্যাংকিং অনুমোদন করো। কাউসার আরো বলে, এর সুবিধাগুলো কি জানিস-তোর জমানো টাকা নিরাপদে থাকবে; জমানো টাকার ওপর মুনাফা বা লাভ যোগ হবে: বৃত্তি/উপবৃত্তির টাকা গ্রহণ করা যাবেঃ স্কুলের বেতন/ফি পরিশোধ করা যাবে: প্রয়োজনে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করা যাবে। আর একটি সুবিধা কি- তোকে একটা এটিএম কার্ড দেয়া হবে। সেই কার্ড দিয়ে তুই যে কোনো স্থানের এটিএম ব্যুথ থেকে টাকা উঠাতে পারবি।
রত্তনক মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, সে স্কুল ব্যাংকিং করবে। হিসাব খুলবে। সঞ্চয় গড়ে তুলবে। সে সঞ্চয়ের পিছনে প্রেরণার সেই টুথপেস্ট ঘনঘটার গল্পটা লজ্জায় নীরবে চেপে যায়। কাউসারকে বুঝতে দেয় না। 'ও'-মনের অজান্তেই ভাব সম্প্রসারণের দু'টি পঙক্তি বিরবির করে আবৃতি করে-
ছোট ছোট বালুকণা বিন্দু বিন্দু জল
গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল
রওনক এখন টিফিনের খরচ বাচিয়ে, বিভিন্ন সময় বাবা-মা'র দেয়া হাতখরচ সাশ্রয় করে, ঈদ-জন্মদিনের উপহারের টাকা জমিয়ে সঞ্চয় গড়ে তুলতে থাকে। স্কুল ব্যাংকিং এর কথা 'ও' পরিবারের কাউকে জানায় না। ওর ইচ্ছা একদিন 'ও' বাবা-মা-ভাইবোনদের সারপ্রাইজ দিবে।
রত্তনকের বাবা শওকত আলী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। মা সুরাইয়া বেগম গৃহিনী। ওরা দু'ভাই এক বোন। 'ও' মেঝ। বড়ভাই ফারুক হাসান, কলেজে পড়ে। ছোট বোন তিন্নী স্কুলে যায় না। সামনে বছর যাবে। রওনক ভাবুক টাইপের একটি ছেলে। ওর চোখের সামনে কিছু ঘটলে বা কিছু দেখলে তা নিয়ে 'ও' ভাবতে থাকে। একটা অর্থ খুঁজে বের করে; একটা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দাঁড় করায়। এ জন্য বন্ধুদের মধ্যে কেউ ওকে পছন্দ করে আবার কেউ অপছন্দও করে।
সেদিন এক সহপাঠী বিচিত্র এক ফ্যাশন-এ চুল কেটে ক্লাসে আসে। রত্তনক দেখে অবাক।
: কি-রে, তোর চুলের এ অবস্থা! স্যার দেখলে তোকে আস্ত রাখবে ভেবেছিস্।
ইদানীং তো সবাই ফ্যাশন করে। আমিও করেছি, সমস্যা কি!
: আমার কোনো সমস্যা নেই, সমস্যা তোর।
শিক্ষক-যথারীতি ক্লাসে এলেন। পাঠদান করলেন। ঘণ্টা বাজলে চলেও গেলেন। কিন্তু তকে কিছুই বললেন না। রওনক আরেকবার আশ্চর্য হলো। যে শিক্ষক এত নীতির কথা বলেন; আমাদের শিষ্টাচার সভ্যতা-ভব্যতা শিখান, তিনি আজ কিছুই বললেন না। স্যারের এ আচরণ তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হলো। রত্তনক ভাবতে লাগলো। স্যারের এ আচরণের পেছনে সাম্ভাব্য কিছু কারণ খুঁজে বের করলো। এবং তা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করলো। বন্ধুরা ওর কথায় সায় দিলো। "পৌর কমিশনারের ছেলে বলে কথা। ওকে কিছু বলে স্যার বিপদে পড়বে নাকি।" রত্তনক বলে, শিক্ষকরা যদি হেরে যান, তবে আমরা ভরসা পাব কার কাছে। রওনক আসর নামাজের আগেই স্কুল থেকে বাসায় ফেরে। আজ বাসায় ঢুকেই দেখে সবকিছু ঝকঝকে-তকতকে, সাজানো-গুছানো, পরিপাটি পরিবেশ। মায়ের সাথে রওনকের খুব ভালো সম্পর্ক। খুনসুটি থেকে শুরু করে হাস্যরস সবই চলে। রত্তনক বলে, আম্মু! "চকচক করলেই সোনা হয় না"। তা বলো, কে আসছেন। মেহমান নিশ্চয়ই।
: হুম! তোর আব্বার ছোটবেলার বন্ধু। চিকিৎসার কাজে ঢাকায় আসছেন। একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, একটু সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখলে কত ভালো লাগে দেখ। তোদের জ্বালায় তো কিছুই পারি না। সেই কবে থেকে বলছি, বড় বাসা নাও। সংসার বড় হয়েছে। একটা আলমিরা করো। তোর আব্বা কেনার কথাই বলে না। রাখার ব্যবস্থা না থাকলে তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবেই। মেহমান আসার কথা শুনলেই শুরু হয়ে যায় আমার গোঁজাগুঁজি।" রওনক বলে, এত হতাশ হচ্ছো কেন, দেখো একদিন সব হবে।
সমস্যা হয়ে যায় রওনকের বাবার।
নামাজের সময় টুপিটা খুঁজে পান না। গোসলের সময় গামছাটা। ধোয়া লুঙ্গিটা বা কোথায়! চেঁচামেচিও করতে পারেন না, ঘরে মেহমান। আড়চোখে ইশারা করলেও গিন্নির সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। তিনি মেহমানদারিতে ব্যস্ত। শওকত সাহেবের খুব রাগ হয়। রাগগুলো ফুলের টবে পুঁতে রেখে ফুলগাছে পানি দিতে থাকেন তিনি।
: বন্ধু! তুমি খুব সৌখিন মানুষ। তুমি আর সেই আগের মতো নেই। ঢাকায় এসে বদলে গেছ। খুব পরিপাটি হয়েছ।
: না, তেমন কিছু না। ফুলগাছগুলোর একটু পরিচর্যা করছি আর কি।
: ভালো মনের মানুষরাই তো ফুল ভালোবাসে। আর ভাবীও তো খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে সংসারটা।
: তুমিও কম কিসে। স্কুলজীবনে তুমি ছিলে বইয়ের পোকা। তোমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিটা এতদিনে হয়তো অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে।
এভাবেই দুই বন্ধুর মধ্যে আলাপচারিতা চলে কিছুক্ষণ।
আজ ক'দিন হলো মেহমান চলে গেছে। ধীরে ধীরে সব আগের অবস্থায় ফিরে আসছে। আবার সেই অগোছালো ভাব। এলোমেলো সব। রওনক চায় সবকিছু গুছিয়ে রাখতে। মাকেও সে এ কাজে সাধ্যমতো সাহায্য করে। কিন্তু বড়ভাইয়া আর ছোট বোন তিন্নীর জন্য পেরে ওঠে না। তিন্নী সবার আদরের। ওর সাতখুন মাফ। বেডরুমের দেয়াল তো তিন্নীর আঁকিবুঝিতে ভরা। দেখলে মনে হবে প্রাচীন কোনো পাহাড়ের গুহার চিত্রকর্ম। তিন্নী সেদিন চা খেতে গিয়ে হাত থেকে ফেলে পিরিচ ভেঙে বসলো। টি-সেটটা কানা হয়ে গেল দেখে মা খুব হতাশ হলেন। তিন্নী তো কেঁদেই একশেষ। রওনক বললো, আম্মু তুমি চিন্তা করো না। আমি সেটটা পূরণ করে দেবো। সেট ভেঙে কি কেউ বিক্রি করবে। তাছাড়া তুমি টাকা পাবে কোথায়।
: আমার টাকা আছে। আমি সঞ্চয় করি না!
রওনক শুধু এতটুকুই বললো। ঠিকই একদিন রওনক বাজার ঘুরে অনুরূপ একটা কাপ-পিরিচ কিনে আনলো। মা তো দেখে অবাক। ভাঙলো পিরিচ, আর পেলাম পিরিচের সাথে কাপও। ভালোই হলো।
: রওনক সোনা। সত্যি করে বল তো, টাকা পেলি কোথায়।
: কেন তোমরা দাওনা, তা থেকে একটু একটু করে বাঁচিয়ে সঞ্চয় করি।
মায়ের মুখে হাসি দেখে রওনকের মনটা আনন্দে ভরে ওঠে।
তিন বছর পর
! ফাল্গুনের শেষে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। আজকের সকালটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। বসন্তের মৃদুমন্দ বাতা বাতাস ছেলে-মেয়েদের রাদে সবাই এসে লে-মেয়েদের চুল ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে। হলুদ বরণ রোদে। ভিড় জমিয়েছে স্কুল আঙ্গিনায়। গত রাতেই এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট ঘোষণা করা হয়েছে। আজ স্কুলের নোটিশ বোর্ডে তা টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়েছে। রওনক ও তার বন্ধুরা সবাই এসেছে।
আনন্দ ও শঙ্কার দোলাচলে সবার উৎসুক্য দৃষ্টি বোর্ডের দিকে। ভিড় ঠেলে এগোনো সামনে যারা রেজাল্ট দেখছে, তাদের কেউ কেউ আনন্দে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। লে ভার করে ফিরছে। রত্তনক রেজাল্ট দেখে আনন্দে ফেটে পড়ে। আল্লাহর শুকরিয়া আম বন্ধুরাও ভালো করেছে। ওরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে নেচে গেয়ে আনন্দ-উল্লাস
রওনক দ্রুত বাসায় ফিরে আসে। প্রথমে মাকে খবরটা দেয়। রওনক গোল্ডেন পেয়েছে। একে একে সবাই আনন্দের খবরটা জানো বড়ভাই ফারুক ছোট ভাইয়ের আনন্দিত। মা ও ভাইয়াদের খুশি দেখে ছোট বোন তিন্নীও আনন্দে নাচতে থাকে।
শওকত সাহেব আজ অপরাহ্নের আগেই বাসায় ফিরলেন। হাতে মিষ্টির প্যাকেট মিষ্টিমুখ করালেন। মিষ্টি প্রতিবেশীর ঘরে ঘরে পাঠানো হলো।
রাতে শতকত মাহেব ও তার স্ত্রী দু'জনকেই খুব চিন্তিত মনে হলো। স্বামী-স্ত্রী শলাপরামর্শ করছেন। খুব সতর্কতার সাথে, যাতে ছেলে-মেয়েদের কানে না যায়।। খেয়াল করলো, আব্বা-আম্মাকে বেশ চিন্তামগ্ন লাগছে। 'খুশির দিনে তাঁরা কেন এভহবে। এমন কি হতে পারে। রওনক ভাবতে থাকে--। "হ্যাঁ চিন্তিত হবারই কথা কৈ বছরই তিন্নীকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। বড় ভাইয়ার ইন্টার এর ফরম ফিলআপ হতে আব্বুকে অনেক টাকা যোগান দিতে হয়েছে। এখন আবার আমার ভালো একটা কলেজে পালা।-চিন্তা না করে কি উপায় আছে!"
রওনক ভাবে, সারপ্রাইজটা দেয়ার এটাই উপযুক্ত সময়। রওনক আব্বু-আম্মুর পানে বসে।
: তোমরা এত কি ভাবছ তোমাদের খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে।
: কিসের চিন্তা সোনা। আজ আমাদের খুশির দিন। তুমি আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছন
বাবা ছেলের কাছ থেকে নিজেকে একটু লুকাতে চাইলেন।
: আব্বু-আম্মু! আজ আমি তোমাদের একটা সারপ্রাইজ দিব। তোমাদের তো বলা আমি ক্লাস এইটে থাকতে স্কুল ব্যাংকিং প্রকল্পে সঞ্চয় হিসাব খুলেছিলাম। গত তিন লাভসহ প্রায় ৩৫ হাজার টাকার মতো জমেছে। এছাড়া আমার জুনিয়র বৃত্তির টাকার একটা এ হিসাবে যোগ হবে। আমার কলেজে ভর্তির জন্য যে খরচটা লাগবে তা আমি এ থেকে চা নিতে পারবো। তোমাদের কোনো চাপ নিতে হবে না।
-মা বলেন, এসব কথা আগে বলিসনি কেন বাবা। আমার ছেলে যে এত বুদ্ধিমানন্দ আমাদের জানতে হবে না।'
-মা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেয়। ওদিকে বাবা'র দু'চোখের কেন ভি ওঠে। তিনি টিসু পেপার নিয়ে চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করেন।
বাবা তুমি কাঁদছ!
: না বাবা এ কান্না নয়।
মানুষ মানুষের জন্য
য খন প্রথম করোনা আপদ দেখা দেয়, সে সময়ের কথা। মাসখানেকের মধ্যেই রাজধানী ঢাকা শহর ফাঁকা হয়ে গেল। দিনের বেলায়ও ঢাকা শহর ভুতুড়ে নগরী। দু-একটি রিকশার টুং টাং শব্দে নীরবতা ভাঙতো কেবল।
প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর আসতে লাগলো। স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেল। সবাই লকডাউনে। কোয়ারেন্টিনে। আমাকে বের হতেই হতো। খবরের কাগজে চাকরি। নিউজ ডেস্কের ছুটি নেই। রীতিমতো পিপিই পরে অফিসে যাতায়াত করি। একদিন এক রিকশাওয়ালা অফিসে নামিয়ে দিয়ে বলল, স্যার কয়েকটা টাকা বেশি দিবেন। প্যাসেঞ্জার নেই। আয়-রোজগার কম, সংসার আর চলে না। ঠিকই তো। সেদিনই বুঝলাম পরিস্থিতি ভয়াবহের দিকে যাচ্ছে। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। মানুষের কাজ নেই, ক্ষুদ্র ব্যবসা সব বন্ধ। মানুষ কী খাবে, কীভাবে চলবে।
সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরছি। দেখলাম মহল্লার রাস্তার পাশে 'লালচান' দাঁড়িয়ে আছে। হ্যাঁ লালচান। উনি জুতো সেলাই করেন- মুচি। আমাকে দেখে সালাম ঠুকলো। কী ব্যাপার লালচান। এখানে যে; দোকান বন্ধ বুঝি। লালচান ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু বলতে পারছে না। আমার বুঝতে বাকি থাকলো না। পকেট থেকে একশ' টাকা বের করে হাতে দিলাম। লালচানের ঠোঁটের রেখায় হরিষে-বিষাদ ধরনের একটি হাসি খেলে গেল।
বাসায় ঢুকতেই সবাই আমাকে ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে দিলো। গিন্নি দূরে দূরে। ছেলে-মেয়েরা রুম থেকে বের হচ্ছে না। কী আশ্চর্য! আপনজনও পর হয়ে যাচ্ছে। ওদিকে আবার মসজিদে যেতেও মানা। আমার রোজ হাশরের কথা মনে হলো। সেদিন কেউ কারো থাকবে না। সবাই নিজেকে বাঁচাতে ব্যাকুল হয়ে পড়বে। আল্লাহ কী আমাদের সেই নিশানাই দেখাচ্ছেন।
: তুমি তো কোনো বাজার-ঘাট করলে না। পাশের বাড়ির ভাবীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র বেশি বেশি করে কিনে রাখছে। সংকট নাকি হতে পারে।
: মজুদদারির কথা বলছ। আমি তা করবো না। সাধারণ মানুষের যা হবে আমাদেরও তাই হবে। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।
আমার ছোট মেয়ে তিন্নি বললো, আব্বু। করোনা তো আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ না করে আমরা করোনাকে ভয় পাচ্ছি কেন? আমি মেয়ের কথায় সায় দিলাম। মনে মনে ভাবলাম এতটুকু একটা মেয়ের ঈমানের কাছে আমরা পানসে হয়ে যাচ্ছি।
রাতে আর ভালো ঘুম হলো না। শুধুই ভাবছি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য কী করা যায়। কিছু একটা করতে হবে। সকালে স্থানীয় ক্লাবের সদস্য হিসেবে সভাপতিকে ফোন দিলাম। এ বিষয়ে মতবিনিময় করলাম। তিনি একমত হলেন। শিগগির একটা উদ্যোগ নিবেন বলে জানালেন।
দেখতে দেখতে রোজার ঈদ এসে পড়লো। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ড্রয়িং রুমে সন্তাদের আনাগোনা। গিন্নিকে জিজ্ঞেস করলাম, ওদিকে কী হচ্ছে।
: গিয়েই দেখে এসো।
রুমের দরজায় দাঁড়াতেই চোখ ছানাবড়া! আমার দুই ছেলে-মেয়ে তামিম ও তিন্নি। সাথে ওদের বন্ধুরা। ওদের অনেকেই আমার চেনা। সবার মুখে মাস্ক, চোখে চশমা। কেউ আবার পিপিই পরেছে। সবাই বসেছে দূরে দূরে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে। বললাম, এসব কী হচ্ছে। তামিম বললো, আব্বু! আমরা বন্ধুরা একটু বসেছি। সামনে ঈদ আসছে। আমরা গরিব দুস্থ শিশুদের জন্য কিছু একটা করতে চাই। করোনার জন্য তো সবার অবস্থাই খারাপ।
: আমিও তোমাদের সাথে থাকতে চাই: আমাকে নিবে?
: অবশ্যই নিব। তোমার পরামর্শ আমাদের খুব প্রয়োজন।
সেদিন আমার বিশ্বাস আরো বেড়ে গেল; এই আপদ বেশি দিন থাকবে না। এই পরীক্ষার একদিন শেষ হবে। যখন মানুষ মানুষের জন্য এগিয়ে আসে তখন আল্লাহর রহমত নেমে আসে।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন