শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬
যে পৃথিবী একদিন শ্বাস নিতে জানত না
রাইয়ান সবসময়ই ভাবত, পৃথিবী তো এমনই ছিল। নীল আকাশ, সবুজ গাছ, নদী, পাহাড়, মানুষ, পাখি। যেন কেউ একদিন সব সাজিয়ে রেখে বলেছে, "এবার এসো, এখানে বাস করো।"
একদিন একটি পুরোনো বই হাতে পায় সে। বইটি খুলতেই তার চোখ আটকে যায় একটি বাক্যে।
"পৃথিবী একদিনে প্রস্তুত হয়নি।"
বাক্যটি তাকে নড়িয়ে দেয়।
সেই রাতেই যেন স্বপ্নের দরজা খুলে যায়।
রাইয়ান দেখতে পায়, সে কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে আগুনের সমুদ্র। গলিত শিলা ফেটে লাভা বের হচ্ছে। আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢাকা। শ্বাস নেওয়ার মতো বাতাস নেই। অক্সিজেন নেই। নেই কোনো পাখির ডাক, নেই কোনো গাছের ছায়া।
সে ভয়ে ফিসফিস করে বলে,
"এখানে তো মানুষ বাঁচতেই পারবে না!"
ঠিক তখনই অদৃশ্য এক কণ্ঠ ভেসে আসে,
"মানুষের জন্য পৃথিবী এখনও তৈরি হয়নি।"
হঠাৎ সে দেখতে পেল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কিছু প্রাণের জন্ম হচ্ছে। এত ছোট যে চোখে দেখা যায় না। কেউ তাদের নাম জানে না। কেউ তাদের জন্য কবিতা লেখে না। কেউ তাদের নিয়ে গল্প করে না।
কিন্তু তারাই নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
সূর্যের আলো, পানি আর কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে তারা ধীরে ধীরে অক্সিজেন তৈরি করছে। একদিনে নয়। এক বছরে নয়। লক্ষ বছরেও নয়। কোটি কোটি বছরের ধৈর্যে।
এরপর আকাশের রং বদলাতে শুরু করল।
বাতাস বদলাতে লাগল।
একদিন সেই অক্সিজেনের কারণেই জন্ম নিল নতুন নতুন প্রাণ।
তারও বহু পরে এলো মানুষ।
"বাবা, আল্লাহ যদি সবকিছু এক মুহূর্তেই সৃষ্টি করতে পারেন, তাহলে পৃথিবীকে মানুষের থাকার মতো করতে এত দীর্ঘ সময় কেন লাগল?"
রাতের আকাশে অসংখ্য তারা। ছাদের এক কোণে বসে প্রশ্নটি করল রাইয়ান। তার বাবা মৃদু হেসে বললেন,
"তুমি কি জন্মের প্রথম দিনেই হাঁটতে পেরেছিলে?"
রায়ান মাথা নাড়ল।
"না।"
"তুমি কি প্রথম দিনেই কথা বলতে পেরেছিলে?"
"না।"
"তাহলে?"
রাইয়ান একটু ভেবে বলল,
"আমাকে ধীরে ধীরে বড় হতে হয়েছে।"
বাবা বললেন,
"এটাই আল্লাহর সৃষ্টি-পদ্ধতি। তিনি চাইলে 'হও' বলেই সবকিছু সম্পূর্ণ করে দিতে পারেন। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা হলো, সৃষ্টি ধাপে ধাপে পূর্ণতা লাভ করবে। তাই আল-কুরআনে তিনি বলেছেন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীকে তিনি ছয়টি কালপর্বে সৃষ্টি ও পরিপূর্ণ করেছেন।"
রাইয়ান নীরবে শুনছিল।
বাবা এবার মাটিতে একটি বৃত্ত আঁকলেন।
"ভাবো, পৃথিবীর প্রথম দিন।"
বৃত্তের ভেতর আগুনের রেখা টেনে তিনি বললেন,
"তখন পৃথিবী ছিল উত্তপ্ত, গলিত এক জগৎ। মানুষের জন্য নয়, গাছের জন্যও নয়। শ্বাস নেওয়ার মতো অক্সিজেনও ছিল না।"
"তাহলে পৃথিবী কি অসম্পূর্ণ ছিল?"
"অসম্পূর্ণ নয়। বরং সে তখন তার প্রথম অধ্যায়ে ছিল।"
রাইয়ানের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
বাবা আবার বললেন,
"একটি শিশুকে যেমন প্রথমে মাতৃগর্ভে ভ্রূণ হতে হয়, তারপর ধাপে ধাপে হাত, পা, চোখ, হৃদয় গড়ে ওঠে, তেমনি পৃথিবীকেও তার নিজস্ব সৃষ্টিযাত্রা অতিক্রম করতে হয়েছে।"
"আর প্রজাপতি?"
"প্রথমেই কি প্রজাপতি জন্মায়?"
"না। আগে শুয়োপোকা, তারপর কোকুন, শেষে প্রজাপতি।"
"ঠিক তাই। আল্লাহর সৃষ্টির ভাষা হলো পর্যায়ক্রম।"
রাইয়ান যেন ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করল।
বাবা বললেন,
"পৃথিবীতেও একসময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অণুজীবের আবির্ভাব ঘটল। তখনও বাতাসে মুক্ত অক্সিজেন ছিল না। তারা তাদের কাজ করে যেতে লাগল। কেউ দেখল না, কেউ তাদের প্রশংসা করল না। কোটি কোটি বছর ধরে তারা বায়ুমণ্ডল বদলে দিল। ধীরে ধীরে অক্সিজেন তৈরি হলো। তারপর এল বনভূমি, প্রাণী, পাখি, আর সবশেষে মানুষ।"
"তাহলে অণুজীবগুলো কি কেবল ঘটনাচক্রে এসেছিল?"
বাবা মাথা নাড়লেন।
"না। একজন বিশ্বাসীর কাছে সৃষ্টিজগতে কোনো অর্থহীন ঘটনা নেই। পৃথিবীর আদি বায়ুমণ্ডল, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, অণুজীবের জন্ম, উদ্ভিদের অক্সিজেন তৈরি, সবই ছিল আল্লাহর নির্ধারিত পরিকল্পনার অংশ। প্রতিটি পর্যায় পরবর্তী পর্যায়ের জন্য পথ প্রস্তুত করেছে।"
রাইয়ান আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
মনে হলো, তারারাও যেন কোনো বিশাল পরিকল্পনার নীরব সাক্ষী।
বাবা ধীরে ধীরে কুরআনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন,
"তিনিই পৃথিবীকে তোমাদের জন্য বাসযোগ্য করেছেন।"
তারপর বললেন,
"বাসযোগ্য করেছেন, কিন্তু একদিনে নয়। তাঁর নির্ধারিত সময়ে, তাঁর নির্ধারিত নিয়মে।"
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"তাহলে আমরা আসার বহু আগেই পৃথিবী আমাদের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল!"
"হ্যাঁ," বাবা বললেন। "যে শিশুটি আজ জন্ম নেয়, তার জন্য যেমন মায়ের গর্ভে দীর্ঘ প্রস্তুতি চলে, তেমনি মানুষের আগমনেরও বহু আগে পৃথিবীকে প্রস্তুত করা হয়েছে।"
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর বাবা বললেন,
"এই শিক্ষা শুধু পৃথিবীর ইতিহাস নয়, আমাদের জীবনও শেখায়। আমরা অনেক সময় তাড়াহুড়ো করি। আজই সফল হতে চাই, আজই ফল চাই। অথচ আল্লাহর সৃষ্টি আমাদের বলে, পূর্ণতা সময়ের সন্তান।"
"বীজকে অপেক্ষা করতে হয় বৃক্ষ হওয়ার জন্য।
ভ্রূণকে অপেক্ষা করতে হয় মানুষ হওয়ার জন্য।
শুয়োপোকাকে অপেক্ষা করতে হয় প্রজাপতি হওয়ার জন্য।
আর পৃথিবীকেও অপেক্ষা করতে হয়েছে মানুষের আবাস হওয়ার জন্য।"
রায়ান মৃদু হেসে বলল,
"তাহলে অপেক্ষাও ইবাদত হতে পারে, যদি তা আল্লাহর নির্ধারিত পথে হয়।"
বাবা সন্তুষ্ট চোখে তার দিকে তাকালেন।
সেই রাতে রায়ান ডায়েরিতে লিখল,
"সৃষ্টির প্রতিটি ধাপের একটি সময় আছে। কোনো ধাপ অপ্রয়োজনীয় নয়, কোনো বিলম্ব অর্থহীন নয়। আল্লাহ যেভাবে পৃথিবীকে ধাপে ধাপে মানুষের জন্য প্রস্তুত করেছেন, তেমনি তিনি আমাদের জীবনকেও ধাপে ধাপে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যান। তাই আমি ফলের আগে প্রস্তুতিকে, গন্তব্যের আগে যাত্রাকে এবং সৃষ্টির প্রতিটি পর্যায়কে সম্মান করতে শিখলাম।”
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন