সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬

এসএসসির ফলে ব্যাপক বিপর্যয়, প্রতিকার জরুরি

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে যে বড় ধরনের ধস নেমেছে, তা কেবল একটি বার্ষিক পরীক্ষার পরিসংখ্যানগত অবনতি নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নীতিগত হোঁচট খাওয়ার এক নিদারুণ প্রতিফলন। গত দুই দশকের মধ্যে এমন বেদনাদায়ক ও হতাশাজনক ফলাফল আর দেখা যায়নি। সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, দেশব্যাপী গড় পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬২.২৫ শতাংশে এবং জিপিএ-৫ অর্জন করেছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। অথচ এর আগের বছরগুলোতে পাসের হার ও উচ্চতর গ্রেড অর্জনের প্রবণতা অনেক উর্ধমুখী ছিল। এই আকস্মিক ও তীব্র পাসের হার পতনের পেছনে একাধিক জটিল কারণ নিহিত রয়েছে। শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইংরেজি ও গণিতে ব্যাপক হারে অনুত্তীর্ণ হওয়া, খাতা মূল্যায়নে পরীক্ষকদের অধিকতর কঠোর ও বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড অনুসরণ এবং প্রান্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার মানের ভয়াবহ ঘাটতিই এই ফলাফল বিপর্যয়ের প্রধান চালিকাশক্তি। তবে এই বিপর্যয়কে নিছক শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেগে দিলে সমস্যার মূল শেকড় আড়ালেই থেকে যাবে। এর পেছনে শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষক সমাজ, পরিবার এবং সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোর সুদূরপ্রসারী দায় রয়েছে। ফলাফল ধসের প্রধান অন্তরায় ও কারণসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের ফলাফল বিপর্যয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে দুটি মূল বিষয়—ইংরেজি এবং গণিত। বছরের পর বছর ধরে এই দুটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভীতি এবং দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা আজ জাতীয় সংকটের রূপ নিয়েছে। ১. ইংরেজি ও গণিতে ব্যাপক ফেল: মৌলিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের এই বিপুল সংখ্যায় ফেল করার প্রধান কারণ হলো দুর্বল ভিত্তি, মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা, নিয়মিত চর্চার অভাব এবং শৈশব থেকেই মনে গেঁথে থাকা একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি। এই দুটি বিষয়ে মৌলিক ধারণা স্পষ্ট না থাকায় এবং সৃজনশীল বা বাস্তবভিত্তিক সমস্যার সমাধান করতে না পেরে প্রতিবছর বড় একটি অংশ অকৃতকার্য হয়। ইংরেজিতে ফেলের প্রধান কারণ: ইংরেজিকে একটি কঠিন ও ভিনদেশি ভাষা হিসেবে ধরে নেওয়ার মানসিকতা। ভাষা হিসেবে শোনার, বলার ও লেখার চর্চা না করা। সঠিক গ্রামার ও টেন্সের নিয়ম না বুঝে অন্ধভাবে মুখস্থ করার প্রবণতা। প্রয়োজনীয় শব্দভাণ্ডার বা ভোকাবুলারির তীব্র অভাব, যার ফলে লেখার সময় শিক্ষার্থীরা নিজের মতো করে বাক্য তৈরি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। অনুচ্ছেদ বা প্যাসেজ পড়ে তার মূলভাব অনুধাবন করতে না পারা এবং নিজের ভাষায় প্রকাশের অক্ষমতা। গণিতে ফেলের প্রধান কারণ: ছোটবেলা থেকেই গণিত বিষয়টিকে নিয়ে একধরনের মানসিক আতঙ্ক বা ভীতি তৈরি হওয়া। পাটিগণিত, বীজগণিত বা জ্যামিতির প্রাথমিক সূত্র ও নিয়ম পরিষ্কার না থাকা। গণিত বুঝে অনুশীলন করার পরিবর্তে শুধু দেখে যাওয়া বা গতানুগতিক নিয়মে মুখস্থ করা। প্রশ্ন পড়ে ঠিক কী চেয়েছে এবং কোন সূত্রে সমস্যার সমাধান করতে হবে, তা ধরতে না পারা। পরিসংখ্যানের আয়না: এবারের ফলাফলে ১০০ শতাংশ ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৩১২টিতে দাঁড়িয়েছে। প্রান্তিক ও মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই বিপর্যয় সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে। ২. শিক্ষাদান পদ্ধতি ও ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতির পাশাপাশি আমাদের শিক্ষাদান ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার ভেতরকার ত্রুটিগুলোও কম দায়ী নয়। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজির মতো কঠিন বিষয়গুলো সহজ, আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক পদ্ধতিতে বোঝানোর মতো দক্ষ শিক্ষকের তীব্র অভাব রয়েছে। শিক্ষকদের একটি বড় অংশের মধ্যে কেবল কোনোমতে সিলেবাস শেষ করার তাড়া লক্ষ করা যায়। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী বিশেষ যত্ন বা প্রতিকারমূলক ক্লাসের ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রায় অনুপস্থিত। এর পাশাপাশি, এবারের পরীক্ষায় খাতা মূল্যায়নে পরীক্ষকরা অত্যন্ত সঠিক ও কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করেছেন। অতীতে খাতা মূল্যায়নে কিছু ক্ষেত্রে নমনীয়তা বা ঢিলেঢালা ভাব থাকলেও এবার তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এর ফলে ইচ্ছেমতো বা অযাচিত নম্বর পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। অন্যদিকে, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের অনুত্তীর্ণ হওয়াও সার্বিক ফলাফলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ও সামাজিক মাধ্যমের আসক্তি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে, যার ফলে তারা পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দিতে পারেনি। ফলাফল বিপর্যয়ের অংশীজনভিত্তিক দায় ও ব্যর্থতা এই ফলাফল বিপর্যয়ের দায় কোনোভাবেই শুধু কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পক্ষই এই ব্যর্থতার অংশীদার। ১. শিক্ষা প্রশাসনের নীতিগত ব্যর্থতা আমাদের শিক্ষা প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা ও ঘনঘন পরিবর্তন শিক্ষার পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। পরীক্ষা পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রমের অতিদ্রুত ও অপরিকল্পিত পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীরা নতুন পদ্ধতির সাথে মানিয়ে নিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিখন কারিকুলাম সম্পর্কে মাঠপর্যায়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে স্পষ্ট, পর্যাপ্ত এবং সময়োপযোগী নির্দেশনার মারাত্মক ঘাটতি ছিল। নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে একধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ২. শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার ঘাটতি শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ও পেশাগত দক্ষতার অভাব আজকের এই সংকটের অন্যতম অনুঘটক। বহু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতিতে পাঠদানের ওপর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। খাতা মূল্যায়নের নতুন ও কঠোর মানদণ্ড সম্পর্কেও সব শিক্ষক পরীক্ষার আগে পুরোপুরি অভ্যস্ত বা প্রস্তুত ছিলেন না। এছাড়া, শ্রেণিকক্ষে আন্তরিকভাবে পাঠদান না করে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট টিউশন বা কোচিংয়ের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করেছে। ৩. পারিবারিক ও অভিভাবকত্বে সচেতনতার অভাব বর্তমান ডিজিটাল যুগে পারিবারিক তদারকি ও সচেতনতার ঘাটতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অভিভাবকরা অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানের ওপর অতিরিক্ত প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দেন, কিন্তু তাদের দৈনন্দিন মানসিক চাপ, পড়াশোনার অগ্রগতি এবং প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কঠোরভাবে তদারকি করতে পারেন না। সন্তানরা পড়াশোনার চেয়ে মোবাইল ফোন, অনলাইন গেম ও সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে কি না, তা অনেক পরিবারই খেয়াল করার সময় পায় না। পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং নিয়মানুবর্তিতা শেখানোর ক্ষেত্রে অভিভাবক মহলের উদাসীনতা শিক্ষার্থীদের বিপথগামী করছে। ৪. প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও তদারকির অভাব গ্রামীণ ও মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সম্পদের চরম সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান ল্যাব, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক নেই। সবচেয়ে বড় কথা, যে ৩১২টি প্রতিষ্ঠান থেকে এবার একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, সেগুলোর ওপর শিক্ষা বোর্ডগুলোর আগাম কোনো তদারকি, মূল্যায়ন বা জবাবদিহিতার ব্যবস্থা ছিল না। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স বা অনুমোদন টিকিয়ে রাখার পেছনে কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বা উদাসীনতা কাজ করছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। প্রতিকারের পথ ও করণীয় এসএসসির এই ফলাফল বিপর্যয় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি শক্তিশালী অ্যালার্ম বেল বা সতর্কবার্তা। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে: ভিত্তি মজবুত করা: প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তর থেকেই ইংরেজি এবং গণিতের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর ভীতি দূর করতে হবে এবং আনন্দদায়ক ও প্রায়োগিক শিক্ষণপদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মানোন্নয়ন: শিক্ষকদের নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কোচিং নির্ভরতা কমাতে শ্রেণিকক্ষেই শিখন ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রান্তিক বিদ্যালয়ের উন্নয়ন: মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকট দূর করা, ল্যাব ও লাইব্রেরি সুবিধা বৃদ্ধি করা এবং নিবিড় মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি: প্রযুক্তির আসক্তি রোধে অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌথ কাউন্সেলিং এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। নীতিগত স্থিতিশীলতা: বারবার পরীক্ষা পদ্ধতি ও কারিকুলাম পরিবর্তন না করে একটি স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদী ও বাস্তবমুখী শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করতে হবে যা শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ না বাড়িয়ে তাদের প্রকৃত মেধা বিকশিত করবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারে রেখে কোনো জাতি উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে না। আজকের এই ফলাফল বিপর্যয়কে নিছক একটি বছরের ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে, একে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। সংশ্লিষ্ট সকল মহলের আন্তরিক সদিচ্ছা, কার্যকর পদক্ষেপ এবং সুদৃঢ় তদারকির মাধ্যমেই কেবল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এই গভীর সংকট থেকে উদ্ধার করা সম্ভব।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন