ইসলাম মানবতার ধর্ম, মানবসেবার ধর্ম। ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্বের সকল ধর্মের, সকল বর্ণের ও সকল জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ এক আদমের সন্তান এবং তারা সকলে মূলত এক জাতি। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল ঘোষণা করেছেন :
‘হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন।নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, তিনি সকল বিষয়ে অবহিত।’-[আল হুজরাত : ১৩]
আমাদের আদি পিতা হজরত আদম আলাইহিস সালাম ও মা হজরত হাওয়া আলাইহিস সালাম হতে আমাদের মানবকূলের বংশ বিস্তৃত। সে হিসেবে আমরা প্রত্যেকে একজন আরেকজনের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে জড়িত।
মহানবীর মিশনের চূড়ান্ত লক্ষও ছিল সারা বিশ্বের মানব সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা বা মানবতার কল্যাণ। তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বজাহানের জন্য আল্লাহর রহমত।আল্লাহ বলেন,
“আর আমি তো তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।”-[আল আম্বিয়া : ১০৭]
মুসলিম উম্মাহর অন্যতম মিশনও ছিল মানবতার কল্যাণ। আর এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন মুসলিম উম্মাহকে দিয়েছিলেন শ্রেষ্ঠত্বের সনদ।পবিত্র কালামে মজিদে ঘোষণা করা হয়েছে- ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। মানব জাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদেরকে আবির্ভূত করা হয়েছে। - সূরা আল ইমরান, আয়াত ১১০
মানব সেবায় ইসলাম এতো উৎসাহ দিয়েছে যে, রাস্তা ও চলার পথে মানুষের জন্য কষ্টদায়ক সামান্য পাথর সরিয়ে ফেলাকে মহৎ কাজ হিসেব গণ্য করা হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘ইমানের ৭২টি শাখা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি হলো রাস্তা থেকে কোনো কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া।’ (মুসলিম শরিফ)।
মানুষের জন্যে যার মনে কোনো দয়া নেই আল্লাহ তায়ালার রহমতও তার ওপর নেই। হাদিস শরীফে এসেছে- ‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে না আল্লাহও তার প্রতি রহমত করেন না।’ (তিরমিযী শরীফ)।
আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ২৬১ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা উৎপন্ন করল সাতটি শিষ, প্রতিটি শিষে রয়েছে ১০০ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান, তার জন্য বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ গরীব, দুঃখী, অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের নিয়ে কাজ করলে একটি সমাজ সুন্দর হয়ে ওঠে। হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে কখনো কোনো সাহায্য প্রার্থীকে না বলেননি।
এ কারণেই মুসলিম সমাজের শক্তি ও ঐক্যের মূলমন্ত্রই হচ্ছে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। যেখানে একে অন্যের বিপদে-আপদে এগিয়ে আসা, সাহায্য-সহযোগিতা করা, গরীব-অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করা পবিত্র ধর্মীয় দায়িত্ব বলে গণ্য করা হয়।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দেবে আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আর আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্য করে যায়।’ (মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বিদায় হজে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আজকের এ মহান ইয়ামুন্নাহারের দিনে, এ পবিত্র জিলহজ মাসে এ পবিত্র হেরেম শরিফে তোমাদের তথা প্রতিটি মুসলমানের জান, মাল, সম্পত্তি, ইজ্জত, শরীরের চামড়া যেভাবে হারাম ও সুরক্ষিত, ঠিক তেমনিভাবে সব দিন, সব মাস ও সর্ব স্থানে হারাম ও সুরক্ষিত বলে গণ্য হবে। খবরদার! তোমরা আমার অবর্তমানে পুনরায় কাফেরদের ন্যায় পরস্পর মারামারি, কাটাকাটিতে লিপ্ত হবে না।’ (বুখারি শরিফ)।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহর ইবাদত কর, দরিদ্রকে খাদ্য দান কর এবং উচ্চ শব্দে সালাম কর। নিরাপত্তা সহকারে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ এমনই ছিল মহানবী (সা.) এর শিক্ষা। মহানবী আমাদের ভোগ বিলাস ত্যাগ করে অন্যের সাহায্যে নিজেকে নিয়োজিত করার জন্যে উৎসাহ দিয়েছেন। অসহায়কে সাহায্য করাকে নবীজি (সা.) জিহাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে; তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘বিধবা ও অসহায়কে সাহায্যকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য।’ (বর্ণনাকারী বলেন,) আমার ধারণা তিনি আরো বলেন, ‘এবং সে ওই সালাত আদায়কারীর ন্যায় যার ক্লান্তি নেই এবং ওই সিয়াম পালনকারীর ন্যায় যার সিয়ামে বিরত নেই।’ (সহিহ বোখারি,সহিহ মুসলিম)।
হজরত আবু হুরায়রা ( রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কেয়ামত দিবসে নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ‘হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমার শুশ্রূষা করোনি।’ বান্দা বলবে, ‘হে আমার প্রতিপালক। আপনিতো বিশ্বপালনকর্তা কীভাবে আমি আপনার শুশ্রূষা করব?’ তিনি বলবেন, ‘তুমি কী জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, অথচ তাকে তুমি দেখতে যাওনি। তুমি কী জান না, যদি তুমি তার শুশ্রূষা করতে তবে তুমি তার কাছেই আমাকে পেতে।’ ‘হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে আহার চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে আহার করাওনি।?’ বান্দা বলবে, ‘হে আমার রব, তুমি হলে বিশ্ব পালনকর্তা, তোমাকে আমি কীভাবে আহার করাব?’ তিনি বলবেন, ‘তুমি কী জান না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিল, কিন্তু তাকে তুমি খাদ্য দাওনি। তুমি কি জান না যে, তুমি যদি তাকে আহার করাতে তবে আজ তা প্রাপ্ত হতে।?’ ‘হে আদম সন্তান, তোমার কাছে আমি পানীয় চেয়েছিলাম, অথচ তুমি আমাকে পানীয় দাওনি।’ বান্দা বলবে, ‘হে আমার প্রভু, তুমি তো রাব্বুল আলামীন তোমাকে আমি কীভাবে পান করাব?’ তিনি বলবেন, ‘তোমার কাছে আমার অমুক বান্দা পানি চেয়েছিল কিন্তু তাকে তুমি পান করাওনি। তাকে যদি পান করাতে তবে নিশ্চয় আজ তা প্রাপ্ত হতে।’ (মুসলিম : ৬৭২১; সহীহ ইবন হিব্বান : ৭৩৬)
সুতরাং আমাদের উচিত সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় মানুষের বিপদে এগিয়ে আসা, গরীব, অসহায় মানুষকে সাহায্য করা, মানব কল্যাণে অবদান রাখা। তাহলে একদিকে যেমন মানব সমাজে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় হবে, অন্যদিকে আল্লাহর নৈকট্য লাভও সহজ হবে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন