আস্তিক, নাস্তিক, মুসলিম, অমুসলিম, শিক্ষিত, অশিক্ষিত সব মানুষই সচেতনভাবে হোক কিংবা অবচেতন মনে; জীবন ও জগৎ সম্পর্কে একটি ধারণা কিংবা বোধ-বিশ্বাসকে লালন করে। এবং সেই ধারণা কিংবা বোধ-বিশ্বাসের আলোকে তার জীবনকে পরিচালনা করতে থাকে থাকে। কারণ, প্রত্যেক মানুষ জীবন ও জগৎ তার ধারণা বা বোধ-বিশ্বাসকে সঠিক মনে করে। এটাকে আত্মবিশ্বাসও বলা যায়। এই আত্মবিশ্বাস ছাড়া মানুষ কোন কাজ করতে পারে না, বা কোন কাজে এক কদমও অগ্রসর হতে পারে না। আসলে মানুষের আত্মবিশ্বাস ও কাজের মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রত্যেক মানুষের কাজকে নিয়ন্ত্রণ করে তার এই আত্মবিশ্বাস। মানুষ যে কাজই করুক না কেন; সে কাজটি করার আগে তার মনে কাজটির প্রতি একটি আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছা তৈরি হয় এবং ভাল বা মন্দ যাই হোক না কেন সে কাজটি করার পক্ষে একটি মত বা যুক্তি খুঁজে পায় বা কাজটি সম্পাদন করাকে সে যুক্তিযুক্ত মনে করে। এভাবে সচেতনভাবে হোক কিংবা অবচেতন মনে - মানুষের বোধ ও বিশ্বাস তার কাজের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। সুতরাং বলা যায়, মানুষের কাজ মূলত তার বিশ্বাসের প্রতিফলন। মানুষের জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত এই যে জীবনবোধ বা আত্মবিশ্বাস - ইসলামী পরিভাষায় একেই বলা হয় আকিদা। প্রত্যেকটা মানুষ যার যার আকিদা অনুসারে আমল বা কাজ করে থাকে।
জীবন ও জগতকে জানার গুরুত্ব
কৌতুহল হলো বৈজ্ঞানিক চিন্তার মূল সূত্র। আর আল কুরআন মানুষের মনের মধ্যে জীবন ও জগত সম্পর্কে এই কৌতূহল বোধই জাগিয়ে তুলতে চায়। আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা ও তাঁর দয়া ও মহত্ত্ব কে উপলব্ধি করার জন্য কুরআন কিন্তু অন্ধ বিশ্বাসের কথা বলেনি, জোর-জবরদস্তি বা বাধ্য করার কথাও বলেনি। বরং আল কুরআনের পরতে পরতে অল্লাহর অস্তিত্ব উপলব্ধির জন্য মানুষের বিবেকবোধকেই নাড়া দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে; সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনার আহবান জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে সৃষ্টির মধ্যেই নিহিত রয়েছে স্রষ্টার নিদর্শন। স্রষ্টার অস্তিত্ব উপলব্ধির জন্য বিভিন্ন যুক্তি-প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়েছে। মানুষের বিবেক ও চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগানোর আহবানের মাধ্যমে আল কোরআনে মূলত মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদকেই উৎসাহিত করা হয়েছে।
লোকেরা যখন জীবন ও জগৎ সম্পর্কে কৌতূহলী হয়, আকাশ, পৃথিবী, প্রকৃতিরাজ্যের রহস্য জানতে চায় তখনই তারা বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। কিন্তু, বেশির ভাগ লোকের মধ্যেই এই কৌতূহলবোধের অভাব রয়েছে। তাদের কাছে মহাকাশ ও প্রকৃতির রহস্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, বরং সংকীর্ণ ও স্থূল বৈষয়িক লাভ ও আনন্দই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেসব সমাজে এ ধরনের লোকেরাই নেতৃত্বস্থানীয় হয়, সেসব সমাজে বৈজ্ঞানিক উন্নতি হয় না। অলসতা ও অজ্ঞতাই তখন তাদেরকে শাসন করে। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব সমাজের লোকগুলো ছিল এ ধরনের।
আল্লাহর কালাম আল কোরআন মানুষকে তাদের জীবন ও জগৎ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করার এবং মনকে কাজে লাগানোর আহবান জানায়। আল কোরআনে বলা হয়েছে -
'তারা কি তাদের উটগুলোর প্রতি লক্ষ্য করে না কীভাবে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে? আর আকাশের পানেও লক্ষ্য করে না কীভাবে তাকে উর্ধে তুলে ধরা হয়েছে? পাহাড়গুলোও কি দেখে না কীভাবে তাকে সুদৃঢ় ভাবে গেঁথে দেয়া হয়েছে? আর তারা কি জমীনের প্রতিও লক্ষ্য করে না কীভাবে তাকে বিছিয়ে দেয়া হয়েছে? অতএব তাদেরকে সচেতন-সতর্ক করতে থাকো। আর তুমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র।' -[সূরা আল গাসিয়া : আয়াত ১৭-২১]
এভাবে আল কোরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ সৃষ্টি জগতের প্রতি, প্রকৃতিরাজ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করার ও সেগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার, শিক্ষা গ্রহণ করার, গবেষণা করার জন্য লোকদের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে। কেননা, সৃষ্টির মধ্যেই নিহিত রয়েছে স্রষ্টার অপরিসীম দয়া, তাঁর সৃষ্টিনৈপুণতা, নিখুঁত পরিকল্পনা, সৃষ্টি জগতের উপর তাঁর অপরিসীম কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বোপরি তাঁর অস্তিত্বের নিদর্শন। এ কারণে আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন ঈমানদারদের একটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করতে যেয়ে বলেছেন যে, তারা সব সময় আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে।
সূরা আলে ইমরানের ১৯১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন : 'তারা হলো সেসব লোক, যারা ওঠা, বসা ও শয়ন - সর্বাবস্থায় আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্য নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এবং বলে: হে আমাদের প্রভু, এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সকল প্রশংসা কেবল তোমারই প্রাপ্য। অতএব, দোযখের আযাব থেকে তুমি আমাদেরকে রক্ষা কর।'

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন