আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা পোষণ করা ঈমানের অংশ। এ বিষয়ে বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আব্বাস রাযিআল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সে ব্যক্তিই ঈমানের প্রকৃত স্বাদ লাভ করেছে, যে আন্তরিকভাবে আল্লাহকে রব; ইসলামকে দ্বীন ও মুহাম্মদ (সা.)-কে রাসূল হিসেবে গ্রহণ করে সন্তুষ্ট হয়েছে। আর পবিত্র কুরআন মজিদে স্বয়ং আল্লাহ পাক বলেছেন -‘তোমাদের মুমিনদের বন্ধু কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণ, যারা সালাত কায়েম করে এবং যাকাত প্রদান করে বিনীত হয়ে।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত : ৫৫)
তিনি আরও বলেছেন, “বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমার অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (আলে ইমরান: ৩১)
আল্লাহকে ভালোবাসার স্বরূপ
আল্লাহকে কেমন ভালোবাসতে হবে তাও আল্লাহ আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছেন-
“বল, 'আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ— সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।” (সূরা আন-আম, আয়াত ১৬২)
এর অর্থ হলো, মুমিন জীবনের প্রতিটি কাজ শুধুমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে রাজি খুশি করার জন্য এবং শুধুমাত্র তার ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে।
আল্লাহর রাসূল বলেছেন - “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্যই কাউকে ভালোবাসলো, আল্লাহর জন্যই কাউকে ভালোবাসা থেকে বিরত থাকলো, আল্লাহর জন্য কাউকে কিছু দান করলো এবং আল্লাহর জন্যই কাউকে কিছু দান করা থেকে বিরত থাকলো; সে তার ঈমানকে পরিপূর্ণ করে নিলো।” (বুখারী: আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত।)
আর আল্লাহর প্রতি এই ভালোবাসার নিদর্শন হল - মুমিন অবশ্যই আল্লাহর হুকুম মেনে চলার ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূলের অনুসরণকে প্রাধান্য দিবেন, তিনি যেভাবে আল্লাহর হুকুম মেনে চলতেন সেভাবে মেনে চলবে আল্লাহর রাসূল যেভাবে আল্লাহকে ভালবাসতেন সেভাবে ভালোবাসবেন এবং সর্বক্ষেত্রে তাঁকে অনুসরণ করবেন।
আল্লাহর প্রতি রাসূল (সা.)-এর ভালোবাসা ছিল সর্বোচ্চ ও অকৃত্রিম, যা ছিল তাঁর জীবনের চালিকাশক্তি এবং তাঁর সকল কর্মের মূল ভিত্তি। তিনি আল্লাহকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, নিজেকে সম্পূর্ণরূপে তাঁর ওপর সমর্পণ করেছিলেন এবং তাঁর ইচ্ছাকে নিজের ইচ্ছার ওপর প্রাধান্য দিতেন। এই ভালোবাসা ছিল তাঁর ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা তাঁকে ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে ইসলামের বার্তা প্রচার করতে এবং মানবজাতির প্রতি রহমত হিসেবে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
কেউ যদি আল্লাহর রাসূলকে এবং তাঁর কাজকে ভালো না বাসে এবং তাঁকে অনুসরণ না করে তাহলে সে প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাদের কাছে তোমাদের বাবা, সন্তান ও অন্য সকল মানুষের চেয়ে প্রিয় না হব, ততক্ষণ তোমরা মুমিন হতে পারবে না।” (বোখারীও মুসলিম, হযরত আনাস থেকে বর্ণিত)
রাসূল (সঃ)কে ভালোবাসার তাৎপর্য
রাসূল (সঃ)কে ভালোবাসার মানে হল তাঁর নীতি ও আদর্শকে ভালোবাসা, তাঁর মিশনকে ভালোবাসা, তাঁর দাওয়াত ও সংগ্রামকে ভালোবাসা।
এ প্রসঙ্গে হযরত আনাস (রা) বলেন, “রাসূল (সা) আমাকে বলেছেন: ‘প্রিয় বৎস, তুমি যদি এভাবে জীবন যাপন করতে পার যে, তোমার মনে কারো বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও অশুভ কামনা নেই, তাহলে তাই কর। এটাই আমার সুন্নাত বা নীতি। (অর্থাৎ আমি কারো প্রতি বিদ্বেষ, ঘৃণা বা অশুভ কামনা পোষণ করিনা। ) আর যে ব্যক্তি আমার নীতিকে ভালোবাসে, নিঃসন্দেহে সে আমাকে ভালোবাসে। আর যে ব্যক্তি আমাকে ভালোবাসে, সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে। (মুসলিম)
আমরা যদি নিজেদেরকে আশেকে রাসুল দাবি করি তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই রাসূলের জীবনাদর্শকে ভালবাসতে হবে। একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে এসে বললো, “হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনাকে ভালোবাসি। তখন তিনি বললেন, তুমি যে কথাটা বললে, তা নিয়ে আরো একটু চিন্তাভাবনা কর। এরপরও সে তিনবার বললো যে, আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে ভালোবাসি। রাসূল (সা) বললেন, তুমি যদি সত্যবাদী হয়ে থাক, তাহলে দারিদ্রের মুখোমুখি হবার জন্য প্রস্তুত হও। কেননা যে ব্যক্তি আমাকে ভালোবাসে, তার কাছে অভাব ও ক্ষুধা স্রোতের পানির চেয়েও দ্রুতবেগে আসে। (হাদীসটি তিরমিযি শরীফে সংকলিত, হযরত আবদুল্লাহ (রা) বর্ণিত।)
একটি জাহেলী সমাজে অবস্থান করে রাসূলের আদর্শকে ধারণ এবং সে আদর্শের আলোকে নিজের, পরিবারের এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠন করা চারটি খানি কথা নয়। এ এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া। এরজন্য অনেক বাধা প্রতিবন্ধকতা, অনেক পরীক্ষা, অনেক ত্যাগ কোরবানির সম্মুখীন হতে হবে এবং ঈমানের পথে অটল থেকে এগিয়ে যেতে হবে। তার জন্য অনেক হিম্মত প্রয়োজন।
রাসূলকে (সাঃ) ভালোবাসা ও প্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে গ্রহণ করার অর্থ হলো, তিনি যে পথে চলেছেন, সে পথের যাবতীয় চিহ্ন ও রূপরেখা সঠিকভাবে জেনে ও মেনে সেই পথে চলতে হবে।
হালাল হারাম মেনে চলতে হবে। অবৈধ পথে অর্থ আয় ও লোভ লালসা থেকে বিরত থাকতে হবে। ফলে অভাব ও ক্ষুধার মুখোমুখি হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। আর অর্থনৈতিক আঘাতটাই যে সবচেয়ে দুঃসহ আঘাত, তা সবাই জানে। এ আঘাতের মোকাবিলা কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা ও আল্লাহর ভালোবাসার অস্ত্র দিয়েই করা সম্ভব। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম তার সাহাবীকে এদিকে ইঙ্গিত করেছেন।
মেশকাতে সংকলিত এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার ইচ্ছা ও কামনা বাসনা আমার আনীত বিধানের (তথা কোরআনের) অনুসারী না হয়।”
অপর একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলকে ভালোবাসে অথবা আল্লাহ ও রাসূলের ভালোবাসা পেয়ে আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ করতে চায়, তার উচিত যখন কথা বলবে সত্য বলবে, যখন তার কাছে আমানত রাখা হবে তখন আমানত হিসাবে রক্ষিত জিনিস অক্ষতভাবে মালিককে ফিরিয়ে দেবে এবং প্রতিবেশীদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে। (মেশকাত)
সুতরাং মুখে মুখে শুধু নিজেকে আল্লাহর রাসূলের আশেক দাবি করাই মানুষের জন্য যথেষ্ট নয় বরং আল্লাহর রাসূল যে কাজ করার জন্য পৃথিবীতে এসেছিলেন সেই কাজকে জানতে হবে বুঝতে হবে। আল্লাহর রাসূলকে ভালবাসতে হলে রাসূলের কাজকে, তাঁর আদর্শকে ভালোবাসতে হবে।
রাসূলের কাজ কী ছিল:
আল্লাহর রাসূল কি কাজ করে গেছেন তাকে কি কাজের জন্য পাঠানো হয়েছিল সেই সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কালামে পাকে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-
''তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্যদ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি সকল দ্বীনের উপর তা বিজয়ী করে দেন। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।'' সূরা সফ, আয়াত ৯
আল্লাহর রাসূল এসেছিলেন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দিনকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। যেমন এসেছিলেন পূর্ববর্তী নবী রাসুলগণও। এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে আল্লাহ বলেছেন-
"তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই বিধি-ব্যবস্থাই দিয়েছেন যার হুকুম তিনি দিয়েছিলেন নূহকে। আর সেই (বিধি ব্যবস্থাই) তোমাকে ওয়াহীর মাধ্যমে দিলাম যার হুকুম দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ‘ঈসাকে। তা এই যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠিত কর, আর তাতে বিভক্তি সৃষ্টি করো না। ব্যাপারটি মুশরিকদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে যার দিকে তুমি তাদেরকে আহবান জানাচ্ছ। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে করেন তাঁর পথে বেছে নেন, আর তিনি তাঁর পথে পরিচালিত করেন তাকে, যে তাঁর অভিমুখী হয়।" - সূরা আস শূরা, আায়াত ১৩
সুতরাং দিন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন নতুন কোন আবিষ্কার নয় বরং এই দায়িত্ব এই আন্দোলন ছিল নবী রাসুলদের আন্দোলন। সুতরাং নবীর উত্তরসূরী যারা আমরা আছি আমাদেরকে নবীদের এই মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
মুসলিম উম্মার দায়িত্ব
“আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর।” (বাকারা: ১৪৩)
সুতরাং কথা স্পষ্ট। আল্লাহ মুসলমানদেরকে একটি মাধ্যমপন্থি জাতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অর্থাৎ মুসলমানরা চরমপন্থী হবে না আবার আদর্শ বিমুখ হবে না, চরিত্রহীন হবে না। হীনমন্যতায় আক্রান্ত হবে না। বরং তাদেরকে বিশ্ববাসীর সামনে ইসলামের মডেল বা আদর্শ হতে হবে আর এই আদর্শ হওয়ার ক্ষেত্রে মুসলমানদের সামনে তাদের মডেল হবেন আল্লাহর রাসূল। অর্থাৎ বিশ্বাসীদের আদর্শ এবং আল্লাহর রাসূল বিশ্বাসীরা হবে মানবজাতির সামনে ইসলামের মডেল বা সত্যের স্বাক্ষ্য। আর ইসলামের আদর্শকে পরিপূর্ণভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য মুসলমানদেরকে প্রথমে নিজেদের সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে বিশ্ববাসীর সামনে ইসলামের একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের নমুনা পেশ করতে হবে আর এজন্য ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সংগ্রাম করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে প্রধান বাধা হবে মক্কার মুরশরিকদের মত বর্তমান কালের মুশরিকরা যারা বিভিন্নভাবে শিরকের মধ্যে নিমজ্জিত। সুতরাং শিরক, বেদায়াত ও বিভেদের ফেতনা থেকে মুক্ত হয়ে মুসলমানদেরকে আল্লাহর পথে সীসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করতে হবে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন