রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬
মহিমা ও মুখোশ
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
গ্রামের নাম শান্তিপুর হলেও কুরবানির ঈদ আসার মাসখানেক আগে থেকেই সেখানে এক অশান্ত লড়াই শুরু হয়। এই লড়াইয়ের প্রধান দুই নায়ক হলেন ‘হাজী ভিলা’র মালিক আলহাজ্ব মতিন সাহেব এবং তাঁরই খালাতো ভাই, শহরফেরত ব্যবসায়ী আনিস চৌধুরী। তাঁদের লড়াইটা ঠিক শত্রুতার নয়, বরং ‘কার চেয়ে কার দাপট বেশি’ তা প্রমাণের।
ঈদের সাত দিন আগে আনিস চৌধুরী ঢাকা থেকে ট্রাকে করে এক বিশাল ‘ব্রাহমা’ জাতের গরু নিয়ে এলেন। গরুর গলায় ঝোলানো হলো লাল রঙের এক ডিজিটাল বোর্ড, যেখানে তার ওজন এবং দামের অংকটা লাল আলোয় জ্বলজ্বল করছে। গ্রামের মানুষ সেই গরু দেখতে ভিড় জমাল। আনিস চৌধুরী ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে দামি চুরুট টানতে টানতে বললেন, “বুঝলে মতিন, ত্যাগের কাজে কোনো কার্পণ্য করতে নেই। সাড়ে দশ লাখ টাকা দিয়ে আনলাম। আল্লাহর রাস্তায় সেরাটা না দিলে কি আর কুরবানি হয়?”
মতিন সাহেবের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, ‘আমি গ্রামের বনেদি গৃহস্থ, আমার ইজ্জত কি ওই শহরের নব্য ধনীর কাছে ধুলোয় মিশবে?’ পরদিন ভোরেই তিনি বিশ্বস্ত লোক নিয়ে কুষ্টিয়ার নামকরা খামারে ছুটলেন। অনেক দরদামের পর বারো লাখ টাকায় এক কালো কুচকুচে পাহাড়সম গরু কিনে তবেই শান্ত হলেন। গরুর নাম দিলেন ‘শান্তিপুরের রাজা’।
ঈদের দুই দিন আগে থেকে দুই বাড়িতেই উৎসবের আমেজ। আলোকসজ্জা হয়েছে এমনভাবে যেন ঈদ নয়, বিয়েবাড়ি। সারাদিন মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে দুই গরুর গুণগান। কিন্তু এই শোরগোলের ঠিক মাঝখানেই গ্রামের শেষ সীমানার এক জীর্ণ কুঁড়েঘরে বসে কাঁদছিলেন জমিলা বেওয়া। তাঁর একমাত্র নাতি কালু জ্বরে ধুঁকছে সাত দিন ধরে। হাতে কোনো টাকা নেই। কুরবানি তো দূরের কথা, নাতির মুখে দুমুঠো ভাতের চাল জোগাড় করাই দায়।
জমিলা বেওয়া অনেক আশা নিয়ে মতিন সাহেবের কাছে গেলেন। মতিন সাহেব তখন তাঁর ‘রাজা’কে আপেল খাওয়াচ্ছিলেন। জমিলা কাতর হয়ে বললেন, “হাজী সাব, নাতিটা আমার মইরা যাইতেছে। চিকিৎসার লাইগা কয়েকটা টাকা যদি ধার দিতেন, আমি আপনার ক্ষেতে কাম কইরা শোধ দিয়া দিমু।”
মতিন সাহেব বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকালেন, “দেখো জমিলা, এখন যজ্ঞের সময়। সামনে কুরবানি, কত খরচ বুঝতেই পারছো। আর এই সময়ে ওসব অলুক্ষুণে কথা বলো না তো! যাও, ঈদের পরে আসো।”
জমিলা বেওয়া এরপর গেলেন আনিস চৌধুরীর কাছে। আনিস সাহেব তখন ব্যস্ত গরুর সাথে সেলফি তুলতে। জ্যামিতিক হিসাব আর লৌকিকতার ভিড়ে জমিলার কথা তাঁর কানেই পৌঁছাল না। দারোয়ান দিয়ে বের করে দিলেন তাঁকে।
ঈদের দিন সকালে যখন দুই বাড়িতে রাজকীয় কুরবানি চলছে, তখন গ্রামের হাসপাতালের বারান্দায় একলা বসে ছিলেন জমিলা বেওয়া। তাঁর সেই ছোট্ট নাতি কালু চিরতরে শান্ত হয়ে গেছে। চিকিৎসার অভাবে নয়, বরং তার চেয়েও বড় ‘অভাবের’ বলি হয়েছে সে।
এদিকে মতিন সাহেব আর আনিস সাহেবের বাড়ির সামনে তখন গোশতের পাহাড়। কয়েক শ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেখানে চলছে হাড় আর চর্বি দেওয়ার মহোৎসব। ভালো গোশতগুলো প্যাকেট হয়ে বড় বড় ফ্রিজে চলে যাচ্ছে রাতের বড় ভোজের জন্য।
সন্ধ্যায় দুই ভাই একসাথে বসে ডিনার করছিলেন। আনিস চৌধুরী বললেন, “ভাইজান, এবারের কুরবানিটা কিন্তু জমল। সবাই আমার গরুর কথাই বলছে।”
মতিন সাহেব তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বললেন, “ঠিকই বলেছো। তবে আমার ‘রাজা’র গোশতটা কিন্তু বেশি নরম হয়েছে। তৃপ্তিই আলাদা!”
ঠিক তখনই জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মতিন সাহেব দেখলেন, দূরে হাসপাতালের দিক থেকে একটা ছোট খাটিয়া অন্ধকার রাস্তা দিয়ে গোরস্তানের দিকে যাচ্ছে। পেছনে শুধু একজন বুড়ি কুঁজো হয়ে হাঁটছেন।
হঠাৎ করে কেন জানি মতিন সাহেবের গলায় দামী গোশতটা আটকে গেল। তাঁর মনে পড়ল জমিলার সেই করুণ মুখটা। তিনি তাকিয়ে দেখলেন ড্রয়িংরুমে সাজানো সেই গরুর শিং আর ঝকঝকে আলোকসজ্জা। তাঁর মনে হলো, এই ঝকমকে আলো আর দানবীয় পশুর ভিড়ে প্রকৃত ত্যাগের আত্মাটা অনেক আগেই শ্বাসরোধ হয়ে মারা গেছে।
আনিস চৌধুরী আবার হাসিমুখে গোশতের টুকরো এগিয়ে দিলেন, কিন্তু মতিন সাহেব আর হাত বাড়াতে পারলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি আজ পশুকে কুরবানি দেননি, বরং পশুর মাংস আর নিজের অহংকারের উৎসবে মেতে উঠেছেন মাত্র। ত্যাগ নয়, এ কেবল এক মুখোশধারী বিজয়োল্লাস।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন