শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬
দারুন নাদওয়ার সেই কালো রাত ও আসমানের ফয়সালা
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
ইতিহাসের পাতায় মক্কার দারুন নাদওয়া (কুরাইশদের নগর সংসদ) বহু সভার সাক্ষী হয়ে আছে। কিন্তু নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষের সফর মাসের সেই কালো দিনটিতে সেখানে যে ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছিল, তা ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম চক্রান্ত।
ইসলামের আলো যখন মক্কার সীমানা পেরিয়ে মদিনায় ছড়িয়ে পড়ছিল এবং মক্কার মুসলমানরা একে একে মদিনায় হিজরত করছিলেন, তখন কুরাইশ কাফেরদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তারা বুঝতে পারল, মুহাম্মাদ (সা.) যদি মদিনায় গিয়ে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেন, তবে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নেতৃত্ব চরম হুমকির মুখে পড়বে।
এই সংকট থেকে বাঁচতে কুরাইশদের শীর্ষ নেতারা দারুন নাদওয়ায় এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হলো। সেই ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর ঘটনাপ্রবাহের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
## দারুন নাদওয়ার সেই কুখ্যাত বৈঠক
সেদিন কুরাইশদের বড় বড় সব লিডার—আবু জাহেল, উতবা, শায়বা, উমাইয়া ইবনে খালাফ এবং আবু সুফিয়ানসহ মক্কার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দারুন নাদওয়ায় জড়ো হয়েছিল। ঠিক যখন তারা ভেতরে ঢুকবে, তখন দরজায় এক অদ্ভুত চেহারার বুড়ো এসে দাঁড়াল। গায়ে দামি চাদর।
নেতারা জিজ্ঞেস করল, "আপনি কে?"
বৃদ্ধ উত্তর দিল, "আমি নজদ অঞ্চলের এক শেখ। আপনাদের বৈঠকের খবর শুনে এলাম, যদি কোনো ভালো পরামর্শ দিতে পারি।"
আসলে এই বৃদ্ধ আর কেউ ছিল না, স্বয়ং **ইবলিস শয়তান** মানুষের রূপ ধরে তাদের কুৎসিত পরিকল্পনায় শরিক হতে এসেছিল। কুরাইশরা তাকে ভেতরে আসার অনুমতি দিল।
### তিনটি প্রস্তাব ও আবু জাহেলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
বৈঠক শুরু হতেই আলোচনা উঠল—কীভাবে মুহাম্মাদ (সা.)-এর দাওয়াত বন্ধ করা যায়? একের পর এক প্রস্তাব আসতে লাগল:
1. **দেশান্তর করার প্রস্তাব:** একজন বলল, তাকে মক্কা থেকে বের করে অন্য কোথাও নির্বাসিত করা হোক।
* *নজদি শেখের (শয়তানের) আপত্তি:* "ভুল সিদ্ধান্ত! তোমরা কি তার মিষ্টি কথা এবং জাদু দেখনি? সে অন্য কোনো গোত্রে গিয়ে সবাইকে আপন করে নেবে এবং তোমাদের ওপরই আক্রমণ করবে।"
2. **বন্দি করার প্রস্তাব:** অন্য একজন বলল, তাকে একটি ঘরের ভেতর শিকল দিয়ে বন্দি করে রাখা হোক, যতক্ষণ না সে কবিদের মতো স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে।
* *নজদি শেখের আপত্তি:* "এও অসম্ভব! তার সাহাবিরা এই খবর পেলে যেকোনো উপায়ে তাকে মুক্ত করে নিয়ে যাবে।"
সবশেষে কুরাইশদের প্রধান খলনায়ক **আবু জাহেল** তার কুৎসিত ও চূড়ান্ত প্রস্তাবটি পেশ করল। সে বলল:
> "আমাদের প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে শক্তিশালী, অভিজাত এবং সাহসী যুবককে বেছে নেওয়া হোক। তাদের প্রত্যেকের হাতে থাকবে ধারালো তলোয়ার। তারা সবাই মিলে একসাথে মুহাম্মাদের ওপর আঘাত করবে এবং তাকে হত্যা করবে। এতে করে তার রক্তের দায় সমস্ত কুরাইশ গোত্রের ওপর ভাগ হয়ে যাবে। বনু আবদে মানাফ (রাসূলের গোত্র) একা পুরো কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সাহস পাবে না। বাধ্য হয়ে তারা রক্তের বিনিময় মূল্য (দিয়াত) মেনে নেবে, আর আমরা সবাই মিলে তা পরিশোধ করে দেব।"
>
এই নির্মম প্রস্তাব শুনে নজদি শেখ (শয়তান) আনন্দে চিৎকার করে উঠল, "হ্যাঁ! এটাই শ্রেষ্ঠ প্রস্তাব। এর বাইরে আর কোনো পথ নেই।"
## আল্লাহর পরিকল্পনা এবং জিবরাঈল (আ.)-এর আগমন
কুরাইশরা যখন মানুষের ইতিহাসে অন্যতম নিখুঁত খুনের পরিকল্পনা সাজাতে ব্যস্ত, তখন আসমানের ওপর মহাবিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা অন্য পরিকল্পনা করছিলেন। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন:
> "আর স্মরণ করো, কাফেররা যখন তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল তোমাকে বন্দি করার, হত্যা করার কিংবা দেশান্তর করার। তারা ষড়যন্ত্র করছিল এবং আল্লাহও পরিকল্পনা করছিলেন। আর আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী।" (সূরা আনফাল: ৩০)
>
আল্লাহ তাআলা তৎক্ষণাৎ জিবরাঈল (আ.)-কে পাঠালেন। জিবরাঈল (আ.) এসে আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে কুরাইশদের সেই গোপন ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দিলেন এবং বললেন, **"আজ রাতে আপনি আপনার বিছানায় ঘুমাবেন না। আজই আপনার মক্কা ছাড়ার রাত।"**
## সেই রোমাঞ্চকর রাত এবং অলৌকিক মুক্তি
রাত গভীর হলো। আবু জাহেলের পরিকল্পনা অনুযায়ী মক্কার কুখ্যাত ঘাতক যুবকেরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলল। তারা অপেক্ষা করতে লাগল রাসুল (সা.) কখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হবেন, আর তারা ঘরে ঢুকে একযোগে আক্রমণ করবে।
এদিকে ঘরের ভেতরে আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর বিশ্বস্ত ও সাহসী ভাই হযরত আলী (রা.)-কে ডেকে বললেন:
> "আলী, তুমি আজ রাতে আমার এই সবুজ চাদরটি গায়ে দিয়ে আমার বিছানায় শুয়ে থাকো। আল্লাহর ইচ্ছায় তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। আর মক্কাবাসীদের যেসব আমানত (টাকা-পয়সা, অলঙ্কার) আমার কাছে জমা আছে, সেগুলো সকালে সবার কাছে ফেরত দিয়ে তুমি মদিনায় চলে এসো।"
>
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও আমানতদারিতার এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল! আলী (রা.) নিজের জীবনের পরোয়া না করে সানন্দে রাসুলের বিছানায় শুয়ে পড়লেন।
### চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেন রাসুল (সা.)
মধ্যরাতে যখন ঘাতকেরা দরজার ফাঁক দিয়ে দেখছিল বিছানায় কেউ একজন শুয়ে আছে, ঠিক তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) ঘর থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। তিনি এক মুঠো ধুলো বা মাটি হাতে নিলেন এবং সূরা ইয়াসীনের প্রথম অংশ থেকে ৯ নম্বর আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:
> "এবং আমি তাদের সামনে প্রাচীর ও পেছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি, অতঃপর তাদেরকে আবৃত করে দিয়েছি, ফলে তারা দেখতে পায় না।"
>
আল্লাহর এক অলৌকিক ক্ষমতায় কুরাইশ যুবকদের চোখ ও মস্তিস্ক সাময়িকভাবে অন্ধ ও অবশ হয়ে গেল। আল্লাহর রাসূল (সা.) সেই ধুলো তাদের মাথার ওপর ছিটিয়ে দিয়ে শান্ত পায়ে তাদের চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। অথচ কেউ তাকে দেখতেই পেল না!
## ব্যর্থ চক্রান্ত এবং কাফেরদের হতাশা
ভোর হওয়ার কিছু আগে এক পথচারী এসে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ঘাতকদের বলল, "তোমরা এখানে কার জন্য অপেক্ষা করছ?"
তারা বলল, "মুহাম্মাদের জন্য।"
পথচারী হেসে বলল, "তোমরা তো বোকার স্বর্গে আছ! মুহাম্মাদ তো তোমাদের মাথায় ধুলো দিয়ে কখন যেন চলে গেছে! বিশ্বাস না হলে নিজেদের মাথায় হাত দিয়ে দেখো।"
ঘাতকেরা চমকে উঠে মাথায় হাত দিয়ে দেখল সত্যিই সেখানে মাটি লেগে আছে। তারা তখনো বিশ্বাস করতে পারছিল না। তারা দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল বিছানায় সবুজ চাদর জড়ানো কেউ একজন শুয়ে আছে। তারা ভাবল, "ঐ তো মুহাম্মাদ শুয়ে আছে।"
সকাল হতেই যখন বিছানার চাদর সরিয়ে হযরত আলী (রা.) উঠে দাঁড়ালেন, তখন কাফেরদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। আবু জাহেল চিৎকার করে উঠল, "মুহাম্মাদ কোথায়?!"
আলী (রা.) শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, "আমি জানি না। তোমরা কি তাকে আমার জিম্মায় রেখে গিয়েছিলে?"
কুরাইশদের এত নিখুঁত, এত বড় চক্রান্ত এবং অহংকার ধুলোয় মিশে গেল। দারুন নাদওয়ার সেই মহাপরিকল্পনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো। আর আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর প্রিয় বন্ধু আবু বকর (রা.)-কে সাথে নিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক হিজরতের যাত্রা শুরু করলেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন