শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬
ধর্ম ও বিবেক : ইসলামী দৃষ্টিকোণ
ভূমিকা
ধর্ম হলো জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত একটি নির্দিষ্ট ধারণা, বোধ বা বিশ্বাস (অথবা অবিশ্বাস), যা কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর কর্ম ও জীবন পদ্ধতির ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। এর মাধ্যমেই একটি নির্দিষ্ট নীতি, আদর্শ, মূল্যবোধ, অনুশীলন ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি গড়ে ওঠে। জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত এই নির্দিষ্ট ধারণা সাধারণত ঐশ্বরিক বা অতীন্দ্রিয় বিষয়কেন্দ্রিক মনে করা হলেও, এটি সেক্যুলার বা জাগতিক বোধ-বিশ্বাসভিত্তিকও হতে পারে। অর্থাৎ, ধর্ম যেমন ঐশ্বরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে হতে পারে, তেমনি অবিশ্বাসের ভিত্তিতেও হওয়া সম্ভব। এ কারণে সেক্যুলার মতাদর্শকেও এক ধরনের ধর্ম বা জীবনদর্শন বলা যেতে পারে।
অন্যদিকে, বিবেক হলো মানুষের মতাদর্শ বা মূল্যবোধের সংরক্ষক, যা ব্যক্তির কর্ম বা জীবনাচারকে তার আদর্শ, নীতি ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে ভালো বা মন্দ বলে বিচার করে। সুতরাং ধর্ম এবং বিবেক দুটি স্বতন্ত্র ধারণা হলেও পরস্পর সম্পর্কিত ও সম্পূরক; একটিকে ছাড়া অন্যটি অচল। বিবেক মানুষকে তার সর্বজনীন মূল্যবোধের ভিত্তিতে কর্মের ভালো-মন্দ বিচার করার সক্ষমতা দেয়। সাধারণত বলা হয় বিবেক সর্বজনীন, তবে তা একান্তই নির্ভর করে ব্যক্তির মতাদর্শ বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর। মানুষের মতাদর্শ বা ধর্ম যে মাত্রায় সর্বজনীন মূল্যবোধ তৈরি করতে পারে, বিবেকও ঠিক সেই মাত্রায় সর্বজনীন মানবিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম। অর্থাৎ, বিবেক সর্বদা মতাদর্শ বা ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত ও জাগ্রত হয়।
ধর্ম ও বিবেক উভয়ই মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে সুরক্ষিত, যার মধ্যে (ধর্মীয় বা ধর্মনিরপেক্ষ যাই হোক না কেন) বিশ্বাস ধারণ এবং তা প্রকাশ করার স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত। এই অধিকার ব্যক্তিকে তার বিশ্বাস বেছে নিতে, তা অনুশীলন করতে এবং গভীরতম বিশ্বাস অনুসারে কাজ করতে অনুমোদন দেয়। তবে জননিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অন্যের অধিকার রক্ষার প্রয়োজনে এই স্বাধীনতা আইনগতভাবে সীমাবদ্ধ হতে পারে।
## ধর্ম
ধর্ম বা 'Religion' বলতে সাধারণত অতিপ্রাকৃত বিষয়, স্রষ্টা বা ঐশ্বরিক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাস, নৈতিক মূল্যবোধ, বিধি-বিধান, প্রথা এবং এসবের অনুশীলনকে বোঝায়। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে ধর্ম মানুষকে এমন এক বিশেষ জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা সাধারণ অবস্থায় মানুষের বস্তুগত জ্ঞান বা বোধগম্যতার অতীত। ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল বিষয়সমূহ মানুষের জাগতিক বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান দ্বারা স্পর্শ করা যায় না। এক অপার্থিব ও অদৃশ্য জগতের সংবাদ বা জ্ঞানের ওপরই ধর্মের মূল ভিত্তি স্থাপিত। বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে একে আপাত অতিপ্রাকৃত এবং যুক্তির অতীত মনে হতে পারে; তাই তর্কের চেয়ে এখানে বিশ্বাস বা 'Faith' বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ইংরেজিতে ধর্মকে অনেক সময় *Faith* বা *Belief System* বলা হয়। বিশ্বকোষে (Encyclopedia) এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে:
> "Religion—sometimes used interchangeably with faith or belief system—is commonly defined as belief concerning the supernatural, sacred, or divine, and the moral codes, practices, values, institutions and rituals associated with such belief."
>
অতিপ্রাকৃত বা অদৃশ্য যাই বলা হোক না কেন, বিশ্বব্যবস্থার অনেক অপরিহার্য নিয়মের মতোই ধর্ম সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে মানুষের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে আসছে। আধুনিক কালে ধর্ম নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বহু বিতর্ক হলেও মানুষ এর প্রভাব, আবেদন ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হতে পারছে না; বরং দিন যতই যাচ্ছে, ধর্মের প্রয়োজনীয়তা ও আবেদন মানুষের জীবনে আরও অনিবার্য হয়ে উঠছে।
## ধর্ম ও দ্বীন
বাংলা ভাষায় আমরা যাকে 'ধর্ম' বলছি, আল-কোরআনের পরিভাষায় তাকে বলা হয়েছে 'দ্বীন'। বাংলা 'ধর্ম' শব্দের অভিধানিক অর্থ শাস্ত্রনির্দিষ্ট বিধি-বিধান, সৎ বা পুণ্যকর্ম, ন্যায়-অন্যায় বা পাপ-পুণ্যের বিচারকর্তা, বিশ্ববিধাতা, মনুষ্যত্ব, কর্তব্য-অকর্তব্য এবং আইন-রীতি।
আরবি ভাষায় আভিধানিকভাবে 'দ্বীন' শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন:
* **শক্তি ও ক্ষমতা:** শাসন, কর্তৃত্ব এবং অপরকে আনুগত্যে বাধ্য করা।
* **দাসত্ব ও আনুগত্য:** সেবা, কারো নিকট বশীভূত হওয়া এবং নির্দেশাধীন কাজ করা। (আরবিতে আনুগত্যপরায়ণ জাতিকে 'কওমুন দাইয়্যেনুন' বলা হয়)।
* **শরিয়ত ও আইন:** পথ-পন্থা, মিল্লাত, রসম-প্রথা বা জীবনপদ্ধতি।
* **কর্মফল ও প্রতিদান:** বিনিময়, ফয়সালা, হিসাব-নিকাশ এবং বিচার।
আল-কোরআনে 'দ্বীন' শব্দটি একটি মৌলিক ও অত্যন্ত ব্যাপক পরিভাষা হিসেবে বিকশিত হয়েছে। কোরআনে এর প্রধানত চার ধরনের ব্যবহার দেখা যায়:
1. স্রষ্টার সর্বোচ্চ, সার্বিক ও সার্বভৌম ক্ষমতার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও আধিপত্য অর্থে।
2. আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার সামনে মাথা নত করা, তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য প্রকাশ অর্থে।
3. আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাঁর নিকট আত্মসমর্পণের ভিত্তিতে গঠিত জীবনবোধ ও জীবনবিধান (আল্লাহর আইন ও বিধান) অর্থে।
4. বিচার, প্রতিফল, পুরস্কার, শাস্তি এবং চূড়ান্ত ফয়সালা অর্থে। *(উৎস: ইসলামের চারটি মৌলিক পরিভাষা, আধুনিক প্রকাশনী)*
সামষ্টিকভাবে আল-কোরআনের পরিভাষায় 'দ্বীন' বলতে একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান বা আল্লাহর আনুগত্যের সার্বিক ব্যবস্থা 'ইসলাম'-কে বোঝায়। কোরআনের পাতায় পাতায় দ্বীন সম্পর্কে যত আলোচনা এসেছে, তার মূলে রয়েছে আল্লাহর সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের ঘোষণা। মানুষকে আহ্বান জানানো হয়েছে আল্লাহর সামনে সম্পূর্ণভাবে আনুগত্যের মস্তক অবনত করতে, কারণ এটিই একমাত্র সঠিক জীবনপথ, যাতে রয়েছে মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন শান্তি ও সফলতা।
এ প্রসঙ্গে আল-কোরআনের কিছু অমিয় বাণী উল্লেখ করা যায়:
> "তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমাদের জন্য জমিনকে বাসস্থান এবং আসমানকে ছাদস্বরূপ করেছেন। তিনি তোমাদের আকৃতি দান করেছেন এবং তা সুষম করেছেন। তিনি পবিত্র বস্তু থেকে তোমাদের রিজিক সরবরাহ করেছেন। সেই আল্লাহই তোমাদের প্রভু—বিশ্বজগতের প্রতিপালক, মহান মর্যাদা ও সমৃদ্ধির মালিক। তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ছাড়া আর কোনো যথার্থ হুকুমকর্তা ও বিধানদাতা নেই। সুতরাং দ্বীনকে (আনুগত্য বা জীবন-ব্যবস্থাকে) একান্তভাবে তাঁর জন্য নিবেদিত করে তোমরা কেবলমাত্র তাঁকেই ডাকো। সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।" (সূরা আল-মুমিন: ৬৪-৬৫)
>
> "বলো, দ্বীনকে একান্তভাবে তাঁর জন্য নির্দিষ্ট করে শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি। সর্ব প্রথম আমাকেই আনুগত্যের মস্তক অবনত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে... বলো, আমার দ্বীনকে আল্লাহর জন্য একান্তভাবে নির্দিষ্ট করে আমি শুধু তাঁরই আনুগত্য-দাসত্ব করব। তোমরা অবশ্য তাকে পরিত্যাগ করে যাকে ইচ্ছা তার গোলামী করতে পারো... (তবে) যারা তাগুতের (অবাধ্য ও সীমালঙ্ঘনকারী) দাসত্ব ত্যাগ করে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ।" (সূরা আজ-জুমার: ১১-১৭)
>
> "আমরা তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং আল্লাহর জন্য দ্বীনকে খাঁটি করে কেবল তাঁরই ইবাদত করো। জেনে রেখো, একনিষ্ঠ দ্বীন কেবল আল্লাহরই জন্য নিবেদিত।" (সূরা আজ-জুমার: ২-৩)
>
> "আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সব তাঁরই এবং আনুগত্য চিরকাল তাঁরই প্রাপ্য। তবুও কি তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করবে?" (সূরা আন-নাহল: ৫২)
>
> "তারা কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন তালাশ করে? অথচ আসমান ও জমিনের প্রতিটি বস্তু ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, আল্লাহরই নির্দেশ মেনে চলছে। আর তাঁরই কাছে সবাইকে ফিরে যেতে হবে।" (সূরা আলে ইমরান: ৮৩)
>
> "বিধান দেওয়ার কর্তৃত্ব আল্লাহ ছাড়া আর কারো নয়। তাঁর নির্দেশ—তিনি ব্যতীত তোমরা আর কারো আনুগত্য বা দাসত্ব করো না। এটাই সত্য-সঠিক দ্বীন।" (সূরা ইউসুফ: ৪০)
>
> "তাদের এছাড়া অন্য কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।" (সূরা আল-বায়্যিনাহ: ৫)
>
একইভাবে, দ্বীন বলতে কোরআনের নির্দিষ্ট আইনি বিধি-বিধানকেও বোঝানো হয়েছে। যেমন:
> "ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী—উভয়কে একশত চাবুক মারো। আল্লাহর দ্বীনের (বিধানের) ব্যাপারে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের প্রভাবিত না করে।" (সূরা আন-নূর: ২)
>
> "তারা কি (আল্লাহর সাথে) এমন কিছু অংশীদার সাব্যস্ত করেছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন আইন রচনা করেছে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?" (সূরা আশ-শূরা: ২১)
>
পবিত্র কোরআনের ভাষায় দ্বীনকে 'হেদায়াত' বা পথনির্দেশ হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে। মানবজাতির সার্বিক কল্যাণের জন্য যুগে যুগে আম্বিয়া কেরাম ও আসমানি কিতাবের মাধ্যমে যেসব বিধান পাঠানো হয়েছে, তা-ই দ্বীন বা হেদায়াত। আল্লাহ প্রদত্ত সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর মাধ্যমে প্রেরিত সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থ আল-কোরআন। ইসলাম ধর্ম বলতে মূলত আল-কোরআনের পথনির্দেশ ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শকেই বোঝায়।
## বিবেক
সাধারণভাবে বিবেক বলতে মানুষের সেই আত্মিক সত্তা, নৈতিক শক্তি বা অনুভূতিকে বোঝায়, যা ব্যক্তিকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ ভালো বা মন্দ বলে বিশ্বাস করতে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে প্ররোচিত করে বা বাধা দেয়। উইকিপিডিয়ায় বিবেকের (Conscience) সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
> "Conscience is generally thought of as a moral faculty, sense or feeling that impels individuals to believe that particular activities are morally right or wrong."
>
১৯১৩ সালের 'Webster Dictionary'-তে আধুনিক ধারণায় বিবেকের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে:
> "বিবেক হচ্ছে একটি নৈতিক ধারণা, একটি নৈতিক শক্তি বা ক্ষমতা, অথবা মানুষের অভ্যন্তরীণ মুখ্য সত্তা; যা তার নিজস্ব কর্মধারার চরিত্র ও কাজের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে, তাকে সমর্থন বা সতর্ক করে, মন্দ কাজের জন্য তিরস্কার করে এবং ভালো কাজের অনুমোদন ও উৎসাহ জোগায়।"
>
বিবেক হলো এমন এক নৈতিক শক্তি, যা মানুষকে আত্মবিচারে অভ্যস্ত করে। বস্তুত, মানুষের স্বভাবের মধ্যে ভালো ও মন্দের পার্থক্য বোঝার একটি স্বাভাবিক বোধ প্রকৃতিগত ও সহজাতভাবেই বিদ্যমান। এই সুপ্রবৃত্তিকেই আমরা বিবেক বলি, যা সবসময় মানুষের সৎবৃত্তির বিকাশ কামনা করে। একে নীতিবোধ বা চৈতন্যও বলা হয়; ইসলাম এরই নাম দিয়েছে 'কালব' বা অন্তর।
### মানব প্রকৃতিতে বিবেক
বিবেক মানুষের একটি জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া, যা নৈতিক দর্শন ও মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এটি আবেগ এবং যুক্তিসঙ্গত চিন্তাভাবনার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। বিবেককে মানুষের আদর্শ ও মূল্যবোধের সংরক্ষক বলা যায়। একটি সচল বিবেক মানুষকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে এবং সমাজের নৈতিক মান উন্নত করতে সহায়তা করে। সমাজে যখন নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়, তখন বিবেকের আহ্বানে সাড়া দিয়েই মানুষ শান্তি, ন্যায়বিচার ও সামাজিক কল্যাণের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত হয়।
## ধর্ম ও বিবেকের সম্পর্ক
বিবেকের সাথে ধর্মের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। মানুষের বিশ্বাস ও জীবনবোধই তার বিবেককে দিকনির্দেশনা দেয়; অর্থাৎ বিবেক দাঁড়িয়ে থাকে বিশ্বাসের ভিত্তির ওপর। বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণে বিবেক বিভিন্ন ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে। যেমন, একজন ব্যক্তি স্বদেশের পক্ষে যুদ্ধে যাওয়াকে নৈতিক কর্তব্য মনে করতে পারেন, আবার অন্য একজন যেকোনো পরিস্থিতিতে যুদ্ধ পরিহার করাকেই তার নৈতিক দায়িত্ব মনে করতে পারেন। যেমনটি বলা হয়েছে:
> "Conscience can prompt different people in quite different directions, depending on their beliefs."
>
অনেক চার্চ বা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেন, আবার অনেকে প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশ পালনকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। কখনো কখনো বিবেক মানুষের মনে এই নৈতিক দ্বিধাও জাগিয়ে তুলতে পারে যে—সে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামরিক কর্তৃপক্ষ বা রাজনৈতিক নেতার আনুগত্য করবে, নাকি নিজের অন্তরের ডাক শুনবে।
এই পর্যায়ে এসে অনেকে ধর্ম ও বিবেকের মধ্যে এক কাল্পনিক বিরোধ আবিষ্কার করে বসেন। তারা মনে করেন ধর্মের কোনো প্রয়োজন নেই, মানুষের বিবেকই তার জন্য যথেষ্ট। এমনকি অনেক বুদ্ধিজীবী বিবেকের দোহাই দিয়ে ধর্মের বিরোধিতাও করেন। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, মানুষের বিবেক তার লালিত বিশ্বাস বা জীবনবোধেরই সমর্থন করে মাত্র।
একজন সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী আর একজন ইসলামী চিন্তাবিদ জীবন ও জগৎ সম্পর্কে এক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন না। যিনি পরকালে বিশ্বাস করেন না, তিনি মনে করেন এই জগতের কোনো স্রষ্টা নেই, দৃশ্যমান জীবনের বাইরে মানুষের আর কোনো অস্তিত্ব নেই এবং স্রষ্টার নির্দেশ মানা বা জবাবদিহিতার কোনো প্রশ্নই আসে না। ফলে তাঁর কাছে ধর্মের অনুশাসন অর্থহীন মনে হতেই পারে।
অন্যদিকে, যিনি বিশ্বাস করেন এই ক্ষণস্থায়ী জীবনই শেষ নয়, বরং এর বাইরেও এক অসীম ও চিরস্থায়ী আখেরাত অপেক্ষা করছে এবং এই মহাবিশ্বের একজন মহান সৃষ্টিকর্তা আছেন যিনি মানুষকে তাঁর 'খলিফা' বা প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছেন—তাঁর জীবনদর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি জানেন, ইহজীবনের সকল কাজের হিসাব স্রষ্টার কাছে দিতে হবে এবং সেই জবাবদিহিতাই মানুষের চূড়ান্ত সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করবে।
এই জীবনবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণেই একজন সেক্যুলার মানুষের কাছে ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘন করা বিবেকহীন কাজ মনে নাও হতে পারে। কিন্তু একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান যখন কোনো ধর্মীয় অনুশাসন পালনে ব্যর্থ হন, তখন তাঁর বিবেক তীব্র দংশন অনুভব করে।
বস্তুত, জীবনদৃষ্টিই মানুষের সমস্ত কাজের নিয়ন্ত্রক—তিনি আস্তিক হোন কিংবা নাস্তিক। দুনিয়াতে যত মত ও পথের মানুষ আছে, সবারই জগৎ সম্পর্কে একটি নিজস্ব ধারণা থাকে এবং প্রত্যেকেই তার নিজের মতকে সঠিক মনে করে। মানুষের বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে এবং বিবেক সবসময় সেই বিশ্বাসের অনুসারী হয়। যারা ধর্ম বিশ্বাস করেন না, তারাও মূলত 'সেক্যুলার জীবনদর্শন' নামক একটি বিশ্বাসকেই ধারণ করেন, যা তাদের মনের মণিকোঠায় আদর্শ হিসেবে কাজ করে। সেই আদর্শের পরিপন্থী কিছু করলে তাদের বিবেকও তাদের তিরস্কার করে।
সুতরাং, বিবেক আসলে মানুষের স্বাধীন বা স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো সত্তা নয়, বরং সে বিশ্বাসের অধীন এবং তার প্রতিনিধি বা পাহারাদার। মানুষের মূল চালিকাশক্তি হলো তার জীবনবোধ ও বিশ্বাস, যাকে ইসলামের পরিভাষায় আমরা 'ঈমান' বা 'প্রত্যয়' বলি। বিবেক হলো এই ঈমানের বডিগার্ড বা সম্পূরক শক্তি মাত্র। জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত মানুষের বিশ্বাস যদি সঠিক ঐশী জ্ঞানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, তবেই তার জীবন সুন্দর ও সুসংহত হয়। অন্যথায় বিভ্রান্ত ও বিক্ষিপ্ত বোধ মানুষকে কখনো প্রকৃত শান্তি এনে দিতে পারে না।
### বিবেক: বোধ ও বিশ্বাসের বন্ধু, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়
মানুষ চলার পথে প্রধানত দুটি শক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়—একটি তার ধর্ম বা বিশ্বাস এবং অন্যটি তার বিবেক। মানুষ যখন তার বিশ্বাসের অনুকূলে কাজ করে তখন বিবেক স্বস্তি পায়, আর বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গেলে বিবেক দংশন করে। কাজেই বিবেক কখনো বিশ্বাসের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অন্ধ সমর্থক বা পরম বন্ধু। জীবন পরিচালনায় বোধ ও বিবেক পরস্পরের সহযোগী ও সম্পূরক।
### বিবেকের প্রতিদ্বন্দ্বী কুপ্রবৃত্তি, ধর্ম নয়
বিবেকের প্রকৃত শত্রু ধর্ম নয়, বরং মানুষের 'কুপ্রবৃত্তি'। একে পশুবৃত্তি, জৈববৃত্তি বা 'নফস' বলা হয়। মানুষের প্রকৃতিতে সুপ্রবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তি দুটিই সহজাত। সুপ্রবৃত্তি যেমন মানুষকে সুনীতি, সৎকর্ম ও আধ্যাত্মিকতার দিকে নিয়ে যায়; কুপ্রবৃত্তি তেমনি দুর্নীতি, দুষ্কর্ম ও ইতরতার দিকে আকৃষ্ট করে। মানব প্রকৃতিতে এই দুই বৃত্তির লড়াই চিরন্তন, আর এই লড়াইয়ে ধর্ম সবসময় বিবেকের পক্ষাবলম্বন করে কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে বিবেককে শাণিত করে তোলে।
ধর্ম মানুষকে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভে উদ্বুদ্ধ করে প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়। ফলে সংকীর্ণ স্বার্থপরতা, লোভ ও ভোগবাদ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। কিন্তু যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না এবং পার্থিব ভোগ-বিলাসকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে করে, তারা কুপ্রবৃত্তির গোলামে পরিণত হয়। বৈধ-অবৈধ উপায়ে সম্পদের পাহাড় গড়া, দস্যুতা ও স্বার্থপরতাই তখন তাদের স্বভাব হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তাদের বিবেক নফসের কাছে পরাস্ত হয়ে একপর্যায়ে মরে যায়।
মনীষীরা বলেন, মানুষের দুটি সত্তা—দেহসত্তা ও নৈতিক সত্তা। নফস বা কুপ্রবৃত্তি মানুষের দেহসত্তার প্রতিনিধিত্ব করে, যা হালাল-হারাম বিচার না করে কেবল জৈবিক চাহিদা ও আরাম-আয়েশ খোঁজে। অন্যদিকে, মানুষের রূহ বা বিবেক এসেছে সরাসরি স্রষ্টার কাছ থেকে। হযরত আদম (আ.)-এর মাটির শরীরে যখন সৃষ্টিকর্তা রূহ ফুঁকে দিলেন, তখনই তিনি সচল মানুষে পরিণত হলেন। তাই মাটির শরীর বস্তুবাদের দিকে ধাবিত হতে চাইলেও, রূহ বা বিবেক সবসময় আধ্যাত্মিকতা ও ধর্মের দিকে যেতে চায়। সুতরাং ধর্ম কখনো বিবেকের প্রতিপক্ষ নয়, বরং অধর্ম ও নীতিহীনতাই বিবেকের আসল প্রতিপক্ষ।
## ধর্ম ও বিবেকের পার্থক্য
ধর্ম ও বিবেকের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বিবেক মানুষের প্রকৃতিতে জন্মগত ও সহজাত, কিন্তু ধর্ম সহজাত নয়; ধর্ম হলো অর্জনসাপেক্ষ একটি বিশিষ্ট জ্ঞান ও বিশ্বাস। মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট জীবনবোধ নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয় না, বরং জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা থেকে তা তৈরি হয়।
অবশ্য মানুষের বিবেক স্বভাবগতভাবেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকৃষ্ট হয়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ইসলামকে 'স্বভাবধর্ম' বা 'ফিতরাতের ধর্ম' বলা হয়েছে, কারণ ইসলামের বিধি-বিধান মানুষের মূল প্রকৃতির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে একটি মধ্যপন্থী জাতি (ওয়াসাত) হিসেবে অভিহিত করেছেন। তা সত্ত্বেও, বিবেক মানুষ জন্মগতভাবে পেলেও, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে সঠিক ঐশী জ্ঞান বা ধর্মবোধ মানুষ জন্মগতভাবে নিজে নিজে লাভ করতে পারে না। এ কারণে যারা বলেন, "ধর্মের প্রয়োজন নেই, বিবেকই যথেষ্ট"—তাদের এই চটকদার বক্তব্যের মূলে কোনো দূরদর্শিতা নেই।
## বিবেক সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
মানব প্রকৃতিতে পাপ ও পুণ্যবোধ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। মহান রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেছেন:
> "কসম মানুষের নফসের (প্রবৃত্তির) এবং কসম সেই সত্তার, যিনি একে যথাযথভাবে গঠন করেছেন। অতঃপর তার ওপর তার পাপ ও পুণ্যবোধ ইলহাম (অনুপ্রেরণা) করেছেন।" (সূরা আস-শামস: ৭-৮)
>
এই বিষয়টি আরও ব্যাখ্যা করে মহানবী (সা.) বলেছেন:
> "যে কাজে তোমার মন স্থিতি লাভ করে এবং তোমার আত্মা স্বস্তি পায়, তা-ই পুণ্য। আর যে কাজে তোমার মন শান্তি পায় না এবং তোমার আত্মা বা বিবেক খটকা অনুভব করে, তা-ই পাপ।"
>
আল-কোরআনে মানুষের নফসের তিনটি রূপের কথা বলা হয়েছে:
1. **নফসে আম্মারা:** যা মানুষকে সবসময় অন্যায় ও দুষ্কৃতির দিকে উস্কানি দেয়।
2. **নফসে লাউয়ামা:** যা কোনো ভুল বা অন্যায় কাজ করলে মানুষকে লজ্জিত, অনুতপ্ত ও ভেতর থেকে তিরস্কার করে। একেই আমরা 'বিবেক' বলতে পারি।
3. **নফসে মুতমায়িন্না:** যা সত্য ও সঠিক পথে চলার মাধ্যমে অন্তরে পরম প্রশান্তি ও নিশ্চয়তা অনুভব করে।
ইসলামী পরিভাষায় 'ইলহাম' হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে অবচেতনে মানুষের মনে নামিয়ে দেওয়া কোনো পুণ্যময় ভাবনা বা বোধ। মানুষের মধ্যে পাপ ও পুণ্যের এই সহজাত বোধ বা নৈতিক মানদণ্ড আল্লাহ সৃষ্টিগতভাবেই রেখে দিয়েছেন, যা প্রতিটি মানুষ কম-বেশি অনুভব করতে পারে।
## বিবেক ও বোধের বিকাশে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা
### ১. জীবনবোধের পূর্ণতায়
ঐশী পথনির্দেশ বা হেদায়াত এমন এক বিশেষ জ্ঞান, যা মানুষ নিজের বুদ্ধি দিয়ে লাভ করতে পারে না। এই জ্ঞানের উৎস মানুষের সাধারণ বোধগম্যতার অতীত। অথচ এই জ্ঞান মানবসত্তার অস্তিত্বের তাৎপর্য বোঝার জন্য অপরিহার্য। তাওহীদের শিক্ষা, পরকাল, হাশর, জান্নাত-জাহান্নামের মতো বিষয়গুলো পরীক্ষাগারে প্রমাণ করা সম্ভব নয়, অথচ এগুলোর ওপর বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের ভিত্তিতেই মানুষের নৈতিক জীবন ও সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। এই পরম জ্ঞান আল্লাহ আমাদের না জানালে মানুষের জীবনবোধ চিরকাল অপূর্ণ থেকে যেত। কোরআন নাজিলের শুরুতেই আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:
> "পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ো, আর তোমার রব পরম দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন এমন জ্ঞান, যা সে জানত না।" (সূরা আল-আলাক: ১-৫)
>
কোরআনে আরও বলা হয়েছে:
> "আর যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তঃকরণ—এদের প্রতিটির ব্যাপারে জওয়াবদিহি করতে হবে।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ৩৬)
>
> "আর হে বিবেকসম্পন্নরা! কিসাসের (ন্যায়বিচারের) মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো।" (সূরা আল-বাকারা: ১৭৯)
>
### ২. সব সৃষ্টিকে আল্লাহর পথপ্রদর্শন
আল্লাহ তাআলা শুধু বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তাই নন, তিনি সবার প্রতিপালক ও পথপ্রদর্শক। তিনি তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে তাদের স্বরূপ ও মর্যাদা অনুযায়ী স্বভাবজাত জ্ঞান (ইলহাম) দান করেছেন। যেমন সূরা ত্ব-হা-য় বলা হয়েছে:
> "মুসা বলল, আমাদের রব তিনি, যিনি প্রত্যেক জিনিসকে তার উপযুক্ত আকৃতি প্রদান করেছেন, অতঃপর তাকে পথনির্দেশ করেছেন।" (সূরা ত্ব-হা: ৫০)
>
এই জন্মগত গাইডলাইনের কারণেই মানবেতর প্রাণীকে আলাদা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হয় না। মাছ নিজে নিজেই সাঁতার কাটে, পাখি উড়তে পারে, আর মৌমাছি বা বাবুই পাখি কোনো প্রকৌশল বিদ্যা ছাড়াই চমৎকার মৌচাক ও বাসা তৈরি করে।
মানুষকেও বিভিন্ন পর্যায়ে এই বিশেষ প্রাকৃতিক জ্ঞান দেওয়া হয়েছে। যেমন, মানবশিশু জন্মের পরপরই কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই মায়ের দুধ চুষতে শুরু করে। আবার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী হিসেবে আল্লাহ মানুষকে সভ্যতার শুরু থেকেই প্রতিনিয়ত উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের মানসিক সক্ষমতা দিয়ে চলছেন, যার ফলে মানব সভ্যতার এই ধারাবাহিক বিকাশ সম্ভব হয়েছে।
## ধর্ম মানুষকে মহীয়ান করে
বস্তুবাদী বা সেক্যুলার শিক্ষা-দর্শন মানুষকে নিছক একটি উন্নত বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী মনে করে। ডারউইনের অনুসারীরা মনে করেন মানুষ বিবর্তনের মাধ্যমে বানর থেকে এসেছে। এই তত্ত্ব মানুষকে কোনো উচ্চতর মর্যাদা বা মহৎ জীবনের উদ্দেশ্য প্রদান করে না। ধর্মকে বাদ দিলে আমাদের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিতে মানুষকে পশুর চেয়ে খুব বেশি উন্নত ভাবা কঠিন।
প্রকৃতপক্ষে, ধর্মই মানুষকে মহিমান্বিত করে তুলেছে। ইসলাম মানুষকে সমস্ত সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব বা 'আশরাফুল মাখলুকাত'-এর মর্যাদা দিয়েছে এবং তাকে পৃথিবীতে আল্লাহর 'খলিফা' বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছে। এই বিশাল মহাবিশ্বের সবকিছু আল্লাহ মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে:
> "সেই মহান আল্লাহই তোমাদের পৃথিবীতে তাঁর খলিফা নিযুক্ত করেছেন।" (সূরা আল-আনআম: ১৬৫)
>
> "তোমরা কি দেখতে পাও না, পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার সবই আল্লাহ তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন?" (সূরা আল-হজ্জ: ৬৫)
>
> "আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সব তিনি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য আয়ত্তাধীন করে দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এর মধ্যে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।" (সূরা আল-জাসিয়াহ: ১৩)
>
আল্লাহ নির্ধারিত এই অনন্য পরিচয়ের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বিশ্বমানবতার প্রকৃত ইজ্জত, শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা। মানুষকে এই গুরুদায়িত্ব পালনের উপযোগী করেই তৈরি করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
> "আল্লাহ, যিনি তোমাদের জন্য জমিনকে স্থিতিশীল করেছেন এবং আসমানকে করেছেন ছাদ। আর তিনি তোমাদের আকৃতি দিয়েছেন, অতঃপর তোমাদের আকৃতিকে সুন্দর করেছেন এবং পবিত্র বস্তু থেকে রিজিক দান করেছেন। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব।" (সূরা আল-মুমিন: ৬৪)
>
মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্বের কারণেই তাকে সুন্দরতম শারীরিক অবয়ব দেওয়া হয়েছে। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, *“আমি তো মানুষকে সুন্দরতম গঠনে সৃষ্টি করেছি।”* (সূরা আত-তীন: ৪)। পাশাপাশি তাকে দেওয়া হয়েছে এমন এক উন্নত মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিবৃত্তি, যা অন্য কোনো প্রাণীর নেই; যার মাধ্যমে সে জটিল চিন্তা, বিশ্লেষণ ও প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
পশু সমাজে শিক্ষার কোনো প্রচলন বা প্রয়োজন নেই, কারণ তারা জন্মগত পশুত্ব নিয়েই বাঁচে। মানুষের মধ্যেও একটি পাশবিক সত্তা রয়েছে, যা বিনা পরিশ্রমে অর্জন করা যায়। কিন্তু মানুষের আসল শ্রেষ্ঠত্ব তার 'মনুষ্যত্ব'-এর মধ্যে, যা শিক্ষা, নৈতিকতা, সঠিক জীবনবোধ ও বিবেকের অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।
জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রেও মানুষ পশুর মতো অন্যের গ্রাস কেড়ে নেয় না, বরং সততা ও মর্যাদার সাথে তা উৎপাদন ও উপার্জন করে। সমাজে যারা পশুর মতো জোর-জুলুম বা চুরির মাধ্যমে জীবিকা খোঁজে, তারা মূলত মানুষরূপী পশু হিসেবেই সমাজ ও সৃষ্টিকর্তার কাছে ঘৃণিত হয়।
ধর্ম মানুষকে এই পশুপবৃত্তি থেকে মুক্ত করে প্রকৃত মানুষে রূপান্তরিত করে। স্রষ্টার খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য মানুষের অন্তরে আল্লাহ সহজাতভাবে দয়া, নৈতিকতা ও লজ্জা-শরমের গুণাবলি দিয়ে দিয়েছেন। বুদ্ধি এবং অবচেতন মনের ইলহামী জ্ঞানের পাশাপাশি মানুষের সবচেয়ে বড় রক্ষা কবচ হলো তার নৈতিক সত্তা বা বিবেক এবং আল্লাহর আইন বা ধর্ম পালন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
> "আমি কেবল উত্তম নৈতিক চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্যই আবির্ভূত হয়েছি।" তিনি আরও বলেন, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।"
>
কোরআনে মানুষের দুটি প্রধান পরিচয় পাওয়া যায়—একদিকে সে আল্লাহর 'খলিফা' (প্রতিনিধি), অন্যদিকে সে আল্লাহর 'আবদ' (গোলাম বা বান্দা)। আল্লাহ বলেন: *“আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের (দাসত্বের) জন্যই সৃষ্টি করেছি।”* (সূরা আজ-যারিয়াত: ৫৬)। স্রষ্টার অবাধ্য বা বিদ্রোহী হয়ে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করা অসম্ভব।
একমাত্র আল্লাহর নিরঙ্কুশ দাসত্ব স্বীকার করার মাধ্যমেই মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্বের অবসান ঘটে। এর অর্থ হলো—আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মানুষের অন্যায় প্রভুত্ব মানি না, আবার নিজেও অন্য কোনো মানুষের ওপর অন্যায় কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিই না। এই দর্শনের মধ্যেই মানবতার সার্বিক মুক্তি নিহিত। আজ পৃথিবীতে যত যুদ্ধ, অবিচার ও শোষণ চলছে, তার মূল কারণ মানুষ স্রষ্টাকে ভুলে নিজেই খোদা সেজে বসেছে। এক আল্লাহর দাসত্বের শৃঙ্খল গলায় পরলে পৃথিবীর অন্য সব দাসত্বের শৃঙ্খল আপনা-আপনি খুলে যায়।
আরবের অন্ধকার জাহেলিয়াত আজকের আধুনিক জাহেলিয়াতের চেয়ে কম ভয়াবহ ছিল না। কিন্তু ইসলামের শিক্ষার আলোকেই আল্লাহর রাসূল (সা.) সেই বর্বর, বিশৃঙ্খল ও ব্যর্থ জাতিকে একটি সুশৃঙ্খল, কল্যাণকামী বিশ্ব-সভ্যতায় রূপান্তরিত করেছিলেন। অথচ আজ সংস্কারের নামে সমাজ থেকে ধর্মকে নির্বাসন দিয়ে অধর্ম ও নাস্তিক্যবাদকে জায়গা দেওয়া হচ্ছে, যা মানবতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
জাগতিক বিজ্ঞান দিয়ে আমরা কেবল দৃশ্যমান জগৎ সম্পর্কে জানতে পারি। কিন্তু এর বাইরের বিশাল অদৃশ্য জগতের রহস্য ও সঠিক পথের দিশা পেতে হলে আমাদের অবশ্যই স্রষ্টার বিধানের কাছেই ফিরে যেতে হবে, কারণ স্রষ্টার নির্দেশ ও ওহীর জ্ঞানই হলো পরম সত্য ও আলোর উৎস।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন