শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬

তুরাগের তীরে কান্না ভাসে

ঈদের রাত বারোটায় টঙ্গীর তুরাগ ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে রফিক প্রথম বুঝল, চামড়া আর পণ্য নয়, এখন বোঝা। সে সিজনাল ব্যবসায়ী। সারা বছর রিকশার গ্যারেজে কাজ করে, কোরবানির তিন দিন আগে ধার করে নেমে পড়ে চামড়া কেনায়। এবার চল্লিশটা গরুর চামড়া কিনেছিল, গড়ে সাতশো টাকা করে। ভেবেছিল, সাভারের ট্যানারি অন্তত হাজার বারোশো দেবে। ঈদের দিন দুপুরে ভ্যান ভরে নিয়ে গেল আড়তে। সন্ধ্যা পর্যন্ত দাম শুধু নামল। আড়তদার বলল, "দুইশো দেব, নিলে দাও।" পাশের আরেকজন বলল, "দেড়শো।" রফিক হিসাব কষল মনে — এক বস্তা লবণ ঈদের আগে ছয়শো ছিল, ঈদের দিন সাতশো হয়ে গেছে। একটা ছেলেকে খাটাতে তিন হাজার টাকা লাগে, ভ্যান ভাড়া আলাদা। চামড়া না বেচলে লবণ দেবে কোথা থেকে? রাত দশটায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার টিএ রোডে যেমন বহু ব্যবসায়ী সারা রাত দাঁড়িয়ে থেকেও ক্রেতা পায়নি, টঙ্গীতেও একই দৃশ্য। রফিক দেখল, মাদ্রাসার দুই ছাত্র মাথায় করে সত্তরটা ছাগলের চামড়া এনেছে। সারা মহল্লা থেকে কোরবানির চামড়া তারা সংগ্রহ করে, সেই টাকায় এতিমখানার তিন মাসের চাল কেনা হয়। মাদ্রাসার সুপার মাওলানা ইদ্রিস সাহেব ফোনে ফোনে ঘুরছেন, কোনো আড়ত ফোন ধরছে না। রাত একটায় আড়তদাররা একসাথে দাম নামিয়ে দিল। ব্যবসায়ীরা বলাবলি করছিল, এটা ইচ্ছা করেই করা হচ্ছে, যাতে তারা বাধ্য হয়ে ফেলে দেয়। রফিকের পাশে এক ছেলে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "পাঁচশো টাকায় কেনা চামড়া দুইশোতেও নিচ্ছে না।" সাভারে সকাল আটটার মধ্যে দুই লাখ বিশ হাজারের বেশি চামড়া পৌঁছেছে, কিন্তু বিক্রেতারা সবাই বলছে দাম প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। সেই খবর শুনে রফিক বুঝল, বড়দের মাল গেছে, ছোটদেরটা আর নেবে না। দুইটার দিকে মাওলানা ইদ্রিস এসে রফিকের ভ্যানের পাশে বসলেন। বললেন, "চামড়া পচে গেলে গুনাহ হবে, এলাকায় দুর্গন্ধ হবে। কী করি?" রফিক কোনো উত্তর দিল না। তারা দুজন মিলে ভ্যান ঠেলে নিয়ে গেল ব্রিজের ঢালে। তুরাগ তখন ভাটা। পানিতে আগের দিনের কোরবানির রক্তের হালকা লালচে দাগ। প্রথমে একটা, তারপর দশটা, তারপর পুরো চল্লিশটা চামড়া রফিক নদীতে ফেলে দিল। মাদ্রাসার ছেলেরা তাদের বস্তাগুলো রাস্তার পাশে রেখে দিল, কারণ নদী পর্যন্ত নেওয়ার শক্তিও আর ছিল না। সকালে সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি এসে সেই পচা স্তূপ তুলবে, যেমন চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীরা রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল। মাওলানা ইদ্রিস পানির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "আমরা ভাবতাম চামড়া বিক্রি মানে এতিমের মুখে ভাত। আজ দেখলাম, চামড়া বিক্রি মানে লবণের দামের কাছে হেরে যাওয়া।" রফিক বাড়ি ফেরার পথে ভাবছিল না লাভ-লোকসানের কথা। ভাবছিল, যে চামড়ায় একদিন জায়নামাজ হতো, বইয়ের মলাট হতো, সেই চামড়া আজ নদীতে ভাসছে প্লাস্টিকের বোতলের মতো। ঈদের তাকবির তখনও মাইকে বাজছে দূরে, কিন্তু তার ভ্যান খালি, পকেটে ধারের হিসাব, আর তুরাগের বুকে ভেসে যাচ্ছে চল্লিশটা অসমাপ্ত নিয়ত। ভোরের আলোয় একটা ছোট ছেলে ব্রিজের নিচে নেমে একটা ভেজা ছাগলের চামড়া তুলে নিল। রফিক জিজ্ঞেস করল, "কী করবি?" ছেলেটা হাসল, "আম্মা বলছে, শুকাইলে পাপোশ বানাবে।" সেই একটুকরো ব্যবহারের আশায় রফিকের বুকটা একটু হালকা হলো। সব চামড়া নদী নেয়নি, কিছু এখনো মানুষের হাতে ফিরছে। 0d7c742b51958822

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন