রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬
সাওর গুহার উদ্দেশ্যে যাত্রা
দারুন নাদওয়ার সেই কুখ্যাত চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) যখন হযরত আবু বকর (রা.)-কে সাথে নিয়ে মক্কার সীমানা পেরিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, তখন ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হলো আরেকটি রোমাঞ্চকর অধ্যায়।
মক্কার কাফেররা যখন দেখল তাদের এত নিখুঁত পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে এবং মুহাম্মাদ (সা.) অলৌকিকভাবে মক্কা থেকে বের হয়ে গেছেন, তখন তাদের ক্রোধের সীমা রইল না। তারা ঘোষণা করল:যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ বা আবু বকরকে জীবিত অথবা মৃত ধরে এনে দিতে পারবে, তাকে একশোটি লাল উট পুরস্কার দেওয়া হবে!
পুরস্কারের লোভে মক্কার সেরা ঘোড়সওয়ার এবং মরুভূমির পথপ্রদর্শকেরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এই চরম বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনা কীভাবে কাজ করেছিল, তা নিয়েই আজকের গল্প।
সাওর গুহার উদ্দেশ্যে যাত্রা
হিজরতের চেনা পথ ছিল মদিনার উত্তর দিকে। কিন্তু কাফেরদের বিভ্রান্ত করতে আল্লাহর রাসূল (সা.) এবং আবু বকর (রা.) দক্ষিণ দিকে রওনা হলেন। তিন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তারা এসে পৌঁছালেন দুর্গম 'সাওর' পর্বতের পাদদেশে।
পাহাড়টি ছিল অত্যন্ত খাড়া এবং পাথুরে। রাসূল (সা.)-এর জুতো ছিঁড়ে পা মোবারক ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল। প্রিয় নবীজির এই কষ্ট দেখে হযরত আবু বকর (রা.) ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন এবং সেই অবস্থাতেই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সাওর গুহার মুখে গিয়ে পৌঁছালেন।
### গুহার ভেতর আবু বকর (রা.)-এর আত্মত্যাগ
গুহার মুখে পৌঁছে আবু বকর (রা.) বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আপনি ভেতরে প্রবেশ করবেন না, আগে আমি ঢুকে এটি পরিষ্কার করি। যদি কোনো ক্ষতিকারক জীবজন্তু থাকে, তবে তা যেন আমাকে দংশন করে, আপনাকে নয়।"
আবু বকর (রা.) গুহার ভেতরে ঢুকলেন। চারিদিকের অন্ধকার আর আবর্জনার মধ্যে তিনি বেশ কিছু গর্ত দেখতে পেলেন, যেখানে বিষাক্ত সাপ বা বিচ্ছু থাকতে পারত। তিনি নিজের চাদরটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে একে একে সবকটি গর্ত বন্ধ করলেন। কিন্তু সবশেষে দুটি গর্ত বাকি রয়ে গেল, যা বন্ধ করার মতো আর কোনো কাপড় ছিল না।
তিনি নিজের পায়ের গোড়ালি দুটি সেই গর্ত দুটির ওপর চেপে ধরলেন এবং রাসূল (সা.)-কে ভেতরে আসার অনুরোধ করলেন। দীর্ঘ ক্লান্তির পর আল্লাহর রাসূল (সা.) আবু বকর (রা.)-এর কোলের ওপর মাথা রেখে গভীর ঘুমে মগ্ন হলেন।
ঠিক তখনই একটি গর্তের ভেতর থেকে একটি বিষাক্ত সাপ আবু বকর (রা.)-এর পায়ে দংশন করল। তীব্র বিষের যন্ত্রণায় তাঁর শরীর কেঁপে উঠল, কিন্তু তিনি এতটুকু নড়লেন না—পাছে রাসূল (সা.)-এর ঘুম ভেঙে যায়! তবে যন্ত্রণার তীব্রতায় তাঁর চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল রাসূল (সা.)-এর পবিত্র চেহারা মোবারকে।
রাসূল (সা.)-এর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "আবু বকর, কী হয়েছে তোমার?"
আবু বকর (রা.) বললেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে সাপে কেটেছে।"
আল্লাহর রাসূল (সা.) কালবিলম্ব না করে তাঁর পবিত্র মুখের লালা (উৎসৃষ্ট থুতু) ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন। অলৌকিকভাবে মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত বিষ ও যন্ত্রণা কর্পূরের মতো উড়ে গেল!
## গুহার মুখে শত্রুর পায়ের আওয়াজ
রাসূল (সা.) এবং আবু বকর (রা.) এই গুহায় টানা তিন দিন ও তিন রাত অবস্থান করেন। এদিকে মক্কার কাফেররা খুঁজতে খুঁজতে ঠিক সাওর গুহার প্রবেশদ্বারে এসে হাজির হলো। তাদের পায়ের শব্দ এবং কথাবার্তা গুহার ভেতর থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
শত্রুদের এত কাছে দেখে হযরত আবু বকর (রা.) অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়লেন। তবে তিনি নিজের জন্য ভয় পাননি, তিনি ভয় পাচ্ছিলেন ইসলামের শেষ আশার প্রদীপ—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুরক্ষার জন্য। তিনি ফিসফিস করে বললেন:
> "হে আল্লাহর রাসূল! তারা যদি কেউ নিজের পায়ের দিকে তাকায়, তবেই তো আমাদের দেখে ফেলবে!"
>
পৃথিবীর যেকোনো মানুষ এই পরিস্থিতিতে হয়তো ঘাবড়ে যেত, কিন্তু আল্লাহর ওপর যার অবিচল আস্থা, সেই পরম শান্ত কণ্ঠে রাসূল (সা.) উত্তর দিলেন:
> "লা তাহযান, ইন্নাল্লাহা মা'আনা—ভয় পেও না আবু বকর, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।"
>
তিনি আরও বললেন, "আবু বকর! তুমি সেই দুজনের ব্যাপারে কী ভাবছ, যাদের তৃতীয়জন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা?"
## আসমানি পাহারা এবং কাফেরদের ফিরে যাওয়া
কাফেররা যখন গুহার মুখে দাঁড়ানো, তখন সেখানে এক অবিশ্বাস্য অলৌকিক ঘটনা ঘটল। আল্লাহ তাআলার নির্দেশে মুহূর্তের মধ্যে এক জোড়া বুনো কবুতর গুহার প্রবেশদ্বারে বাসা তৈরি করে ডিম পেড়ে বসল। আর একটি মাকড়সা এসে গুহার মুখজুড়ে এক চমৎকার জালের বুনন তৈরি করে দিল।
কুরাইশদের প্রধান গোয়েন্দা এবং কাফেররা যখন গুহার মুখে একদম কাছে এল, তখন উমাইয়া ইবনে খালাফ বলল, "ভেতরে চলো, দেখে আসি।"
কিন্তু দলের অন্য একজন (কারো মতে আবু জাহেল বা অন্য কেউ) মাকড়সার জাল এবং কবুতরের বাসা দেখে বিরক্ত হয়ে বলল:
> "তুমি কি পাগল হয়েছ? এই মাকড়সার জাল তো মুহাম্মাদের জন্মের আগের তৈরি মনে হচ্ছে! আর ভেতরে মানুষ থাকলে এই বুনো কবুতর কি শান্তিতে ডিম নিয়ে বসে থাকত? তারা অন্য কোথাও গেছে, চলো এখান থেকে।"
>
মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অত্যাধুনিক তল্লাশি দল একটি মাকড়সার সুতোর জালের কাছে পরাজিত হলো! কাফেররা গুহার ঠিক মুখে দাঁড়িয়েও অন্ধের মতো ফিরে গেল। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবীবকে এভাবেই আসমানি পাহারায় রক্ষা করলেন।
## বিদায় সাওর, মদিনার পথে
তিন দিন পর যখন মক্কার কাফেরদের শোরগোল কিছুটা কমে এল, তখন পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত দুটি উট নিয়ে সাওর গুহার পাদদেশে এলেন।
হযরত আবু বকর (রা.) এবং আল্লাহর রাসূল (সা.) সাওর গুহা থেকে বের হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। এরপর তারা মদিনার উদ্দেশ্যে এক নতুন দিগন্তের দিকে রওনা হলেন, যেখানে আনসাররা অধীর আগ্রহে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।
সাওর গুহার এই ঘটনা প্রমাণ করে, চক্রান্তকারী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আল্লাহ যাকে রক্ষা করতে চান, তাকে পৃথিবীর কোনো শক্তি স্পর্শ করতে পারে না।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন