রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

১০০ উটের লোভে রাসুলকে ধরতে গেল সুরাকা

মরুভূমির তপ্ত বালু উড়িয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলছে সুরাকা ইবনে মালিক। তার চোখে-মুখে তখন তীব্র উত্তেজনা আর লোভের ঝিলিক। কোরাইশ নেতারা ঘোষণা করেছে— মোহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর সঙ্গী আবু বকর (রা.)-কে জীবিত অথবা মৃত ধরে দিতে পারলে **১০০টি লাল উট** পুরস্কার দেওয়া হবে। আরব সমাজে ১০০ উটের মালিক হওয়া মানে রাতারাতি বিশাল ধনী ও প্রভাবশালী হয়ে যাওয়া। সুরাকা ছিল একজন দক্ষ পথপ্রদর্শক এবং বীর যোদ্ধা। এক ব্যক্তি এসে তাকে গোপনে খবর দিল, সে মরুভূমির পথে কয়েকজন আরোহীকে যেতে দেখেছে। সুরাকা নিশ্চিত হলো, তাঁরাই আল্লাহর রাসুল (সা.) ও তাঁর সঙ্গী। কাউকে কিছু না জানিয়ে, পুরস্কারের সবটুকু একা পাওয়ার লোভে সুরাকা তার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দ্রুত ঘোড়ায় চড়ে রওনা হলো। ## অলৌকিক ঘটনা ও সুরাকার পঙ্গুত্ব কিছুক্ষণের মধ্যেই সুরাকা দূর থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং আবু বকর (রা.)-কে দেখতে পেল। সুরাকা তার ধনুক বের করল। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ তার ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল এবং সুরাকাও ছিটকে মাটিতে আছড়ে পড়ল। আরবদের রীতি অনুযায়ী, সুরাকা তার তূণ থেকে ভাগ্যপরীক্ষার তীর বের করল। তীর বলল, "আগে বাড়বে না।" কিন্তু ১০০ উটের লোভ সুরাকার বিবেককে অন্ধ করে দিয়েছিল। সে তীরের ইশারা অমান্য করে আবার ঘোড়ায় চড়ল এবং রাসুল (সা.)-এর দিকে এগোতে লাগল। এবার সে এতটাই কাছে পৌঁছে গেল যে, রাসুল (সা.)-এর পবিত্র মুখ থেকে কোরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল। আবু বকর (রা.) বারবার পেছনে তাকিয়ে দেখছিলেন আর চিন্তিত হচ্ছিলেন, কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) ছিলেন সম্পূর্ণ শান্ত, পরম করুণাময়ের ওপর ভরসা রেখে তিনি অবিচলভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সুরাকা যখনই তাঁর ওপর আক্রমণ করতে যাবে, ঠিক তখনই অলৌকিক ঘটনাটি ঘটল। আচমকা এক বিকট শব্দ হলো এবং **সুরাকার ঘোড়ার সামনের পা দুটি মরুভূমির শক্ত বালুর ভেতর হাঁটু পর্যন্ত দেবে গেল!** সুরাকা ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ল। ঘোড়াটি পা দুটো বালু থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করতেই সেই গর্ত থেকে ধোঁয়ার মতো ধূলিঝড় আকাশের দিকে উঠতে লাগল। > সুরাকা বুঝতে পারল, এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। কোনো এক অদৃশ্য মহাশক্তি এই মহান মানবকে রক্ষা করছেন। তলোয়ার বা তীর দিয়ে এই মানুষকে স্পর্শ করা অসম্ভব। > ## অভয়বাণী ও পারস্য সম্রাটের কঙ্কণ ভয়ে সুরাকার শরীর কাঁপতে লাগল। সে চিৎকার করে বলল, "হে মোহাম্মদ! আমি বুঝতে পেরেছি এটা আপনারই দোয়া ও অলৌকিক ক্ষমতা। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আমার ঘোড়াটি মুক্ত হয়ে যায়। আমি কসম খাচ্ছি, আমি আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না, বরং পেছনের শত্রুদের বিভ্রান্ত করে ফিরিয়ে দেব।" দয়ার সাগর রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। সাথে সাথে সুরাকার ঘোড়ার পা বালু থেকে মুক্ত হয়ে গেল। সুরাকা তখন রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে ক্ষমা চাইল এবং মক্কার কাফেরদের কুচক্রের নানা তথ্য দিল। বিদায় নেওয়ার সময় আল্লাহর রাসুল (সা.) সুরাকাকে একটি অবিশ্বাস্য ভবিষ্যৎবাণী করলেন। তিনি হাসিমুখে বললেন: > "হে সুরাকা! কেমন হবে সেদিন, যেদিন তুমি পারস্য সম্রাট কিসরার (খসরু) সোনার কঙ্কণ (বালা) পরিধান করবে?" > সুরাকা অবাক হয়ে গেল! পারস্য তখন পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তি। আর মক্কা থেকে পালিয়ে যাওয়া একজন মানুষ বলছেন যে, একদিন পারস্য জয় হবে এবং সেই সম্রাটের সোনার অলঙ্কার পরবে এই সুরাকা! সুরাকা রাসুল (সা.)-এর কাছ থেকে একটি নিরাপত্তা সনদ লিখে নিয়ে মক্কার দিকে ফিরে গেল। এরপর পথে যার সাথেই দেখা হতো, সুরাকা বলত, "আমি এই পথ পুরো খুঁজে দেখেছি, এদিকে কেউ নেই।" ফলে শত্রুরা অন্য পথে চলে যায়। ## গল্পের শেষ পরিণতি এই ঘটনার বহু বছর পর, মক্কা বিজয়ের পর সুরাকা ইবনে মালিক ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর, দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর আমলে মুসলমানদের হাতে পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ মালামাল যখন মদিনায় নিয়ে আসা হলো, তার মধ্যে পারস্য সম্রাট কিসরার সেই বিখ্যাত সোনার কঙ্কণ, মুকুট ও রাজকীয় পোশাকও ছিল। খলিফা ওমর (রা.) ভরা মজলিসে সুরাকা (রা.)-কে ডেকে পাঠালেন। তিনি সুরাকাকে সম্রাটের সেই রাজকীয় পোশাক ও সোনার কঙ্কণ পরিয়ে দিলেন। উপস্থিত সাহাবিদের চোখে তখন অশ্রু। ১০০ উটের লোভে যে মানুষটি একদিন রাসুল (সা.)-কে ধরতে গিয়েছিল, আল্লাহর রাসুলের সেই ঐতিহাসিক ভবিষ্যৎবাণী সত্যি করে আজ সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্রাটের সোনার কঙ্কণ হাতে দাঁড়িয়ে আছে!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন