রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

স্যার আইজ্যাক নিউটনের ধর্ম বিষয়ক মতামত

এখানে স্যার আইজ্যাক নিউটনের ধর্মীয় চিন্তাভাবনা ও বিশ্বাসের ওপর লেখাটি সহজ, সাবলীল এবং মার্জিত বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা হলো। সাধারণ পাঠকের পড়ার সুবিধার জন্য জটিল ধর্মতাত্ত্বিক শব্দগুলোকে সহজ করে উপস্থাপন করা হয়েছে। *(অনুবাদ থেকে অপ্রাসঙ্গিক নম্বর বা কোডগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে)* ## স্যার আইজ্যাক নিউটন: বিজ্ঞানীর অন্তরালে এক গোপন ধর্মবিশ্বাসী স্যার আইজ্যাক নিউটন একাধারে যেমন ছিলেন একজন একনিষ্ঠ খ্রিস্টান, তেমনি ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম এক ভিন্নপন্থী ধর্মতাত্ত্বিক। তিনি ধর্ম নিয়ে প্রায় ১৩ লাখ শব্দ লিখে গেছেন—যা তাঁর গণিত ও পদার্থবিদ্যার মোট লেখার চেয়েও বেশি। তাঁর জীবদ্দশায় এর বেশিরভাগই প্রকাশিত হয়নি। বর্তমানে এই লেখাগুলো জেরুজালেমের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে 'ইহুদা পাণ্ডুলিপি' (Yahuda manuscripts) হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। ### যুক্তিবাদী ও বাইবেল-ভিত্তিক ঈশ্বরবিশ্বাসী নিউটন প্রকৃতিকে একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র হিসেবে দেখতেন না, বরং একে জীবন্ত ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে মনে করতেন। তাঁর বিখ্যাত বই *অপটিক্স (Opticks)*-এ তিনি প্রশ্ন করেছিলেন: "চোখ কি আলোর বিজ্ঞান না জেনেই তৈরি হয়েছে? কিংবা কান কি শব্দের জ্ঞান ছাড়াই তৈরি হয়েছে?" তিনি নিজেই উত্তর দিয়েছেন—এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বে একজন "অশরীরী, জীবন্ত, বুদ্ধিমান ও সর্বব্যাপী সত্তা" রয়েছেন। ১৭১৩ সালে তাঁর প্রধান গ্রন্থ *প্রিন্সিপিয়া (Principia)*-র পরিশিষ্টে (General Scholium) তিনি এই ধারণার আরও বিস্তার ঘটান: > "সূর্য, গ্রহ এবং ধূমকেতু নিয়ে গঠিত এই চমৎকার জগৎ কেবল একজন বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী সত্তার পরিকল্পনা ও শাসন থেকেই আসতে পারে।" > "এই সত্তা সবকিছু শাসন করেন। তবে জগতের আত্মা হিসেবে নয়, বরং সবার প্রভু হিসেবে... ঈশ্বরত্ব মানে নিজের শরীরের ওপর কর্তৃত্ব নয়, বরং তাঁর দাস বা সৃষ্টির ওপর আধিপত্য।" > "ঈশ্বর চিরন্তন ও অসীম... তিনি কেবল অনন্তকাল বা অসীমতা নন, বরং তিনি নিজেই নিত্য ও সীমাহীন; তিনি কেবল সময় বা স্থান নন, বরং তিনি চিরকাল টিকে থাকেন এবং সর্বত্র বিরাজ করেন।" > নিউটনের কাছে ঈশ্বরের সংজ্ঞা ছিল তাঁর আধিপত্যে, কোনো বিমূর্ত তত্ত্বে নয়। এই "শাসনকর্তা ঈশ্বর"-এর ধারণাই নিউটনকে পরম স্থান ও কালের (absolute space and time) বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁর মতে, প্রকৃতির নিয়মগুলো আসলে ঈশ্বরের ইচ্ছেরই বহিঃপ্রকাশ—যা আধুনিক গবেষকেরাও স্বীকার করেন। ধর্মবিশ্বাসের চেয়েও নিউটনের কাছে সত্য খোঁজার পদ্ধতিটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি অন্ধভাবে কোনো প্রথা মেনে নেওয়া পছন্দ করতেন না। নিজেই বাইবেল পড়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেছিলেন: > "ধর্মগ্রন্থ নিজে নিজে খুঁটিয়ে পড়ো। বারবার পড়ো, গভীর মনোযোগ দিয়ে ভাবো এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো যেন তিনি তোমার বোঝার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেন।" > তিনি বাইবেলকে ল্যাবরেটরির ডেটা বা উপাত্তের মতো করে দেখতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আসল ধর্মমত সেটাই যা "প্রথম যুগের শিক্ষকদের স্পষ্ট কথায় প্রচার করা হয়েছিল এবং একদম শুরু থেকেই শেখানো হতো।" এই সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তিনি খ্রিস্টধর্মের শুরুর দিকের গ্রিক ও ল্যাটিন লেখকদের মূল নথিপত্র পরীক্ষা করতেন। ### ত্রিত্ববাদ-বিরোধী অবস্থান ও অ্যারিয়ান বিশ্বাস ১৬৭২ সালের দিকে নিউটন 'অ্যারিয়ানবাদ' (Arianism)-এর দিকে ঝুঁকে পড়েন। তাঁর বোঝাপড়া অনুযায়ী, এই মতবাদের মূল কথা ছিল—যিশু খ্রিস্ট "মানুষের চেয়ে বড়, কিন্তু ঈশ্বরের চেয়ে ছোট।" অর্থাৎ, তিনি প্রচলিত ত্রিত্ববাদ (Trinity - পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা সমপর্যায়ের, এই বিশ্বাস) স্বীকার করতেন না। নিজের এই গোপন বিশ্বাসকে তিনি ১২টি যুক্তিতে সাজিয়েছিলেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল: * "ধর্মগ্রন্থের কোথাও 'ঈশ্বর' শব্দটি দিয়ে একসাথে তিনজনকে (পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা) বোঝানো হয়নি।" * "সাধারণভাবে যেখানেই 'ঈশ্বর' শব্দটি এককভাবে বসেছে, তা সবসময় 'পিতা'-কে নির্দেশ করে।" * "পুত্র (যিশু) নিজেই স্বীকার করেছেন যে পিতা তাঁর চেয়ে বড়, এবং পিতাকেই নিজের ঈশ্বর বলে ডেকেছেন।" বাইবেলের দুটি জায়গার চুলচেরা বিশ্লেষণ তাঁর এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছিল: ১. **১ যোহন ৫:৭ (1 John 5:7):** নিউটন প্রমাণ করে দেখান যে, প্রথম দিকের গ্রিক পাণ্ডুলিপিগুলোতে ত্রিত্ববাদকে সমর্থনকারী একটি নির্দিষ্ট অংশ (Comma Johanneum) ছিলই না। তিনি দাবি করেন, ত্রিত্ববাদকে জোর করে টিকিয়ে রাখার জন্য পরবর্তীকালে ইচ্ছাকৃতভাবে এটি যোগ করা হয়েছিল। ২. **অ্যাথানাসিয়ান ক্রিড (The Athanasian Creed):** চার্চের এই নিয়মের ভাষা ("কেউ কারও চেয়ে বড় বা ছোট নয়") তাঁর কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, "যারা পারে তারা এর যৌক্তিক অর্থ খুঁজে নিক; আমি তো এর কোনো মাথামুণ্ডু পাই না।" তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ত্রিত্ববাদ "বাইবেল দ্বারা সমর্থিত নয় এবং এটি একটি অযৌক্তিক ধারণা।" এর বদলে তিনি বিশ্বাস করতেন যে পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা সম্পূর্ণ আলাদা তিনটি সত্তা। ### চার্চের ইতিহাস: সত্য বিচ্যুতি ও ভবিষ্যৎ সংস্কার নিউটন বিশ্বাস করতেন যে আদি খ্রিস্টধর্ম খুব দ্রুতই কলুষিত হয়ে পড়েছিল, বিশেষ করে চতুর্থ শতাব্দীর পর। তিনি লিখেছিলেন, রোমান ক্যাথলিক চার্চ "আবার পৌত্তলিকতায় ফিরে গেছে" এবং প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলনও "যথেষ্ট দূর এগোতে পারেনি।" বাইবেলের 'বুক অব রেভেলেশন' (Revelation) নিয়ে গবেষণা করে তিনি বলেন: > "আসল চার্চ একসময় হারিয়ে যাবে এবং তার জায়গায় এক মিথ্যা বা মূর্তিপূজক চার্চ দুনিয়া শাসন করবে।" > ধর্মের এই "মহাবিচ্যুতি" দেখে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর যুগে যুগে ধর্মকে সংস্কার করেন। তিনি নূহ, ইব্রাহিম, মুসা এবং যিশুর মাধ্যমে আসা সংস্কারের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে ভবিষ্যদ্বাণী করেন—"আমরা আশা করতে পারি যে ঈশ্বর যথাসময়ে আবার একটি নতুন সংস্কার আনবেন।" বাইবেলের বিভিন্ন ভবিষ্যদ্বাণী ঘেঁটে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ভবিষ্যতে সবকিছু আবার তার মূল ও পবিত্র রূপে ফিরে যাবে। ### সাবধানে যাপন করা এক গোপন বিশ্বাস নিউটনের এই ধর্মীয় চিন্তাভাবনা তৎকালীন ইংল্যান্ডের আইন অনুযায়ী মারাত্মক অপরাধ বা 'ধর্মদ্রোহিতা' হিসেবে গণ্য হতো। তাই তিনি সমাজে নিজের আসল বিশ্বাস লুকিয়ে রাখতেন। * ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির ফেলোশিপ ধরে রাখার জন্য তাঁর চার্চের যাজক হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানান। এতে তাঁর চাকরি যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অবশেষে ১৬৭৫ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লসের বিশেষ আদেশে তিনি যাজক না হয়েও লুকাসিয়ান অধ্যাপকের পদে থাকার অনুমতি পান। * তিনি তাঁর ধর্মতাত্ত্বিক লেখাগুলো গোপন রাখতেন এবং অনেকগুলোর গায়ে লিখে রেখেছিলেন "প্রকাশের যোগ্য নয়।" ১৯৩৬ সালে সোথবি’স (Sotheby's) নিলামের পর এই লেখাগুলো প্রথমবারের মতো পৃথিবীর সামনে আসে। * ১৭২৭ সালে মৃত্যুর শয্যায় শায়িত অবস্থাতেও তিনি চার্চের শেষকৃত্যের আচার গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। বিজ্ঞান ও ধর্মের পাশাপাশি তিনি 'কিমিয়াবিদ্যা' (Alchemy) এবং বাইবেলের কালানুক্রম নিয়েও গবেষণা করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, এগুলো ঈশ্বরের লেখা দুটি বই পড়ার ভিন্ন মাধ্যম—একটি হলো ধর্মগ্রন্থ (Scripture), অন্যটি প্রকৃতি (Nature)। নিউটনের কাছে কঠোর বিজ্ঞানচর্চা আর গভীর ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল একটাই—চার্চের ভুল নিয়ম ও দুর্নীতির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া আদি সত্যকে পুনরুদ্ধার করা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন