সোমবার, ১ জুন, ২০২৬
উম্মে মা'বাদের ছাগল
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ইতিহাসের পাতায় **উম্মে মা’বাদ (রা.)** এবং তাঁর দুর্বল ছাগলটির ঘটনা এক অবিস্মরণীয় অলৌকিক বা মোজেজা হয়ে আছে। মরুভূমির তীব্র খরা আর ক্লান্তির মাঝে আল্লাহর পক্ষ থেকে নেমে আসা এক অপূর্ব বরকতের গল্প এটি।
### মরুভূমির সেই ক্লান্তিকর যাত্রা
৬২২ খ্রিস্টাব্দ। মহানবী (সা.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। সাথে আছেন তাঁর পরম বিশ্বস্ত সঙ্গী **হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)**, পথপ্রদর্শক আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত এবং খাদেম আমের ইবনে ফুহাইরা।
কুরাইশদের চোখ ফাঁকি দিতে তাঁরা চেনা পথ ছেড়ে মরুভূমির এক দুর্গম ও অচেনা পথ ধরে এগোচ্ছিলেন। তীব্র রোদ আর মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে দিনের পর দিন পথ চলায় তাঁরা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। সাথে থাকা খাবার এবং পানিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল।
### উম্মে মা’বাদের তাঁবুতে আগমন
চলতে চলতে তাঁরা ‘কাদিদ’ নামের একটি মরু এলাকায় এসে পৌঁছালেন। সেখানে একটি একাকী তাঁবু ছিল। তাঁবুটি ছিল এক মেষপালক বেদুইন নারীর, যাঁর নাম ছিল আতিকা বিন্তে খালেদ। তবে সবাই তাঁকে **উম্মে মা’বাদ** নামেই চিনত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও অতিথি পরায়ণ। তাঁবুর সামনে বসে আসা-যাওয়ার পথে ক্লান্ত পথিকদের খাবার ও পানি দিয়ে সাহায্য করাই ছিল তাঁর আনন্দ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেনার মতো কোনো মাংস বা খেজুর উম্মে মা’বাদের কাছে আছে কি না।
উম্মে মা’বাদ খুব আফসোস করে বললেন, *"আল্লাহর কসম! আমাদের কাছে যদি বিন্দুমাত্র খাবার থাকত, তবে আপনাদের তা চেয়ে নিতে হতো না। তীব্র খরায় চারপাশ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, আমাদের ঘরের সব খাবার শেষ।"*
### সেই দুর্বল ও বন্ধ্যা ছাগলটি
ঠিক তখনই আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁবুর এক কোণে একটি জীর্ণ-শীর্ণ, দুর্বল ছাগল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন।
> নবীজী (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, *"হে উম্মে মা’বাদ! ওই কোণে ওটা কোন ছাগল?"*
> উম্মে মা’বাদ উত্তর দিলেন, *"ওটা এতই দুর্বল ও অসুস্থ যে অন্য ছাগলদের সাথে মাঠে চড়তে পর্যন্ত যেতে পারেনি।"*
> নবীজী (সা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, *"ও কি কোনো দুধ দেয়?"*
> উম্মে মা’বাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, *"দুধ দেবে কী করে! ওর শরীরে এক ফোঁটা দুধও নেই।"*
> তখন নবীজী (সা.) মৃদু হেসে বললেন, *"তুমি কি আমাকে ওটার ওলন্দ (দুধের স্থান) থেকে দুধ দোহন করার অনুমতি দেবে?"*
> উম্মে মা’বাদ অবাক হলেন, তবে বিনীতভাবে বললেন, *"আমার বাবা-মা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন! আপনি যদি মনে করেন ওর শরীরে দুধ পাবেন, তবে অবশ্যই দোহন করতে পারেন।"*
>
### অলৌকিক বরকতের ছোঁয়া
রাসূলুল্লাহ (সা.) পরম মমতায় সেই দুর্বল ছাগলটির কাছে গেলেন। তিনি তাঁর বরকতময় হাত দিয়ে ছাগলটির ওলন্দ স্পর্শ করলেন এবং আল্লাহর নাম (**বিসমিল্লাহ**) স্মরণ করে বরকতের দোয়া করলেন।
সাথে সাথেই সেখানে এক অভাবনীয় অলৌকিক ঘটনা ঘটল:
* ছাগলটির শুকনো ওলন্দ মুহূর্তের মধ্যে দুধে ভরে ওজনে ভারী হয়ে উঠল।
* যে ছাগলটি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না, সেটি সুস্থ-সবল হয়ে পরম শান্তিতে জাবর কাটতে শুরু করল।
নবীজী (সা.) একটি বড় পাত্র চাইলেন, যা দিয়ে কয়েকজন মানুষের তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব। তিনি দুধ দোহন করতে শুরু করলেন এবং পাত্রটি ঘন, সাদা দুধে একদম উপচে পড়ল।
নেতা হিসেবে নবীজী (সা.) কিন্তু নিজে আগে পান করেননি। তিনি প্রথমে সেই দুধের পাত্রটি **উম্মে মা’বাদ**কে দিলেন। উম্মে মা’বাদ পেট ভরে তৃপ্তি সহকারে সেই দুধ পান করলেন। এরপর নবীজী (সা.) তাঁর সঙ্গীদের দিলেন এবং তাঁরাও মন ভরে পান করলেন। সবার শেষে আল্লাহর রাসূল (সা.) নিজে পান করলেন এবং বললেন: *“যিনি মানুষকে খাওয়ান বা পান করান, তিনি সবার শেষেই পান করবেন—এটাই নিয়ম।”*
সবাই তৃপ্ত হওয়ার পর নবীজী (সা.) দ্বিতীয়বার আবার সেই ছাগলটির দুধ দোহন করলেন এবং পুরো পাত্রটি দুধে পূর্ণ করে উম্মে মা’বাদের কাছে উপহার হিসেবে রেখে দিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে আবার যাত্রা শুরু করলেন।
### স্বামীর বিস্ময় ও নবীজীর রূপ বর্ণনা
সন্ধ্যাবেলায় উম্মে মা’বাদের স্বামী **আবু মা’বাদ** তাঁর হাড্ডিসার, ক্ষুধার্ত ছাগলের পাল নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। ঘরে এসে দুধের বড় পাত্রটি উপচে পড়া তাজা দুধে ভরা দেখে তিনি তো অবাক!
তিনি বিস্ময় নিয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, *"উম্মে মা’বাদ, এই দুধ তুমি কোথায় পেলে? আমাদের ছাগলগুলো তো মাঠেই ছিল, আর ঘরে তো দুধ দেওয়ার মতো কোনো ছাগলই নেই!"*
উম্মে মা’বাদ তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, *"আল্লাহর কসম! আজ আমাদের এখানে একজন অত্যন্ত বরকতময় মানুষ এসেছিলেন এবং এই অলৌকিক ঘটনাটি ঘটেছে।"*
আবু মা’বাদ কৌতুহলী হয়ে বললেন, *"আমাকে একটু বলো তো, কেমন দেখতে ছিলেন তিনি?"*
তখন উম্মে মা’বাদ নবীজী (সা.)-এর এমন এক অপরূপ ও নিখুঁত বর্ণনা দিলেন, যা ইসলামের ইতিহাসে নবীজীর সৌন্দর্যের সবচেয়ে সুন্দর বর্ণনাগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হয়। তিনি বলেছিলেন:
* "তিনি ছিলেন এক দীপ্তিময় চেহারার অধিকারী, যাঁর স্বভাব ছিল অসম্ভব সুন্দর।
* তাঁর চোখ দুটো ছিল গভীর কালো, আর চোখের পাপড়িগুলো ছিল দীর্ঘ ও আকর্ষণীয়।
* তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত মিষ্টি এবং গলার গড়ন ছিল চমৎকার।
* তিনি যখন চুপ থাকতেন, তখন তাঁর মাঝে এক গম্ভীর মর্যাদা প্রকাশ পেত; আর যখন তিনি কথা বলতেন, তখন যেন চারপাশ মুগ্ধ হয়ে যেত।
* দূর থেকে দেখলে তাঁকে সবচেয়ে সুন্দর ও উজ্জ্বল দেখাত, আর কাছ থেকে দেখলে মনে হতো তিনি কত আপন।"
সব শুনে আবু মা’বাদ আবেগপ্লুত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন, *"আল্লাহর কসম! ইনিই তো কুরাইশদের সেই মহামানব, যাঁকে মক্কার লোকেরা হন্যে হয়ে খুঁজছে। আমার তীব্র ইচ্ছা ছিল ওঁর সঙ্গী হওয়ার। আমি যদি কোনোদিন সুযোগ পাই, তবে অবশ্যই ওঁর কাছে চলে যাব।"*
### গল্পের শেষ অংশ
নবীজী (সা.) চলে যাওয়ার পরও এই অলৌকিক বরকত শেষ হয়ে যায়নি। ইসলামের ইতিহাসে উল্লেখ আছে যে, উম্মে মা’বাদের সেই ছাগলটি এরপর অনেক বছর বেঁচে ছিল। পরবর্তীতে যখন মদিনায় তীব্র দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, তখনও এই ছাগলটি প্রচুর দুধ দিত, যা উম্মে মা’বাদের পুরো পরিবারের অভাব দূর করেছিল।
এই ঘটনার কিছুদিন পর, উম্মে মা’বাদ এবং তাঁর স্বামী আবু মা’বাদ মদিনায় গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আজীবন অনুগত ও প্রিয় সাহাবি হিসেবে ধন্য হন।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন