সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

মদিনার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ

১.মদিনার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ মদিনার ইতিহাসে এমন উৎসবের দিন আর কখনো আসেনি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মক্কার কাফেরদের সমস্ত নির্যাতন ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আল্লাহর রাসুল (সা.) এবং তাঁর সঙ্গী হযরত আবু বকর (রা.) মদিনার সীমানায় এসে পৌঁছেছেন। চারিদিকে আনন্দ-উল্লাস। মদিনার আনসার (সাহায্যকারী) মুসলমানেরা তাঁদের প্রিয় নবীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। বনু নাজ্জার গোত্রের ছোট ছোট মেয়েরা দফ (এক ধরণের বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে সমস্বরে গেয়ে উঠল সেই অমর পঙক্তিমালা: > *"তালাআল বাদরু আলাইনা, মিন ছানিয়্যাতিল ওয়াদা,* > *ওয়াজাবাশ শুকরু আলাইনা, মা দাআ লিল্লাহি দা..."* > *(আমাদের ওপর পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে ‘ওয়াদা’ উপত্যকা থেকে। আমাদের ওপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা ওয়াজিব হয়েছে, যতদিন কোনো আহ্বানকারী আল্লাহকে আহ্বান করবে।)* > আনসারদের প্রতিটি পরিবার চাইছিল আল্লাহর রাসুল (সা.) যেন তাদের বাড়িতে মেহমান হন। সবাই তাঁর উটের লাগাম ধরে টানাটানি করছিল এবং বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছিল, "হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের এখানে অবস্থান করুন। এখানে নিরাপত্তা এবং লোকবল দুই-ই আছে।" রাসুলুল্লাহ (সা.) কারও মনে কষ্ট দিতে চাইলেন না। তিনি মৃদু হেসে এক ঐতিহাসিক ফয়সালা দিলেন। তিনি বললেন: > "তোমরা কাসওয়াকে (রাসুলের উটের নাম) ছেড়ে দাও। একে আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি যেখানে গিয়ে বসবে, সেখানেই আমার বাসস্থান হবে।" > সবাই উটের পেছনে পেছনে হাঁটতে লাগল। কাসওয়া ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বনু নাজ্জার গোত্রের একটি খালি জায়গায় গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। জায়গাটি ছিল দুজন এতিম শিশু— সাহল ও সুহাইলের। পাশেই ছিল হযরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর বাড়ি। রাসুল (সা.) বললেন, "এখানেই হবে আমাদের মসজিদ ও আবাস।" তিনি আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর বাড়িতে মেহমান হিসেবে উঠলেন। ## ২. মসজিদে নববীর ভিত্তিপ্রস্তর: ঐক্যের প্রথম ধাপ রাসুল (সা.) মদিনায় পা রেখেই বুঝতে পেরেছিলেন, একটি শক্তিশালী সমাজ গঠনে প্রথম প্রয়োজন একটি কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে সবাই দিনে পাঁচবার একত্রিত হবে। তিনি এতিম দুই ভাইয়ের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য দিয়ে সেই জমিটি কিনে নিলেন। শুরু হলো **মসজিদে নববী** নির্মাণের কাজ। এটি কেবল ইবাদতের জায়গা ছিল না, বরং এটি ছিল একাধারে সংসদ ভবন, আদালত এবং মুসলমানদের মিলনমেলা। মসজিদ নির্মাণে কোনো রাজকীয় জাঁকজমক ছিল না। কাঁচা ইট, খেজুরের ডাল আর গাছের খুঁটি দিয়ে তৈরি হচ্ছিল এই ঐতিহাসিক স্থাপনা। সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিল— স্বয়ং আল্লাহর রাসুল (সা.) সাধারণ শ্রমিকদের মতো মাথায় করে ভারী ভারী পাথর আর ইট বহন করছিলেন। তাঁর গা থেকে ঘাম ঝরে পড়ছিল। তাঁকে এভাবে কাজ করতে দেখে আনসার ও মুহাজিরদের (মক্কা থেকে হিজরতকারী) ক্লান্তি উবে গেল। তাঁরা দ্বিগুণ উৎসাহে গান গেয়ে গেয়ে কাজ করতে লাগলেন: > *"হে আল্লাহ! পরকালের কল্যাণই আসল কল্যাণ,* > *তুমি আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি দয়া করো।"* > মসজিদটি যখন সম্পন্ন হলো, তখন সেটি মদিনার বুকে এক টুকরো জান্নাতে পরিণত হলো। কিন্তু রাসুল (সা.) জানতেন, কেবল ইটের দেয়াল দিয়ে সমাজ গড়া যায় না; সমাজ গড়তে হলে মানুষের অন্তরের দেয়ালগুলো ভাঙতে হয়। ## ৩. আনসারদের ত্যাগ ও মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভ্রাতৃত্ববন্ধন মক্কা থেকে আসা মুহাজিররা ছিলেন রিক্তহস্ত। কাফেরদের ভয়ে তাঁরা ঘরবাড়ি, ব্যবসা, সম্পদ— সব মক্কাতেই ফেলে শুধু নিজের প্রাণ আর ইমান বাঁচিয়ে মদিনায় এসেছিলেন। তাঁদের না ছিল থাকার জায়গা, না ছিল জীবিকার উপায়। এই সংকট নিরসনে আল্লাহর রাসুল (সা.) এক অতুলনীয় ও অলৌকিক সামাজিক পদক্ষেপ নিলেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে "মুআখাত" বা ভ্রাতৃত্ববন্ধন নামে পরিচিত। তিনি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বাড়িতে আনসার এবং মুহাজিরদের এক সমাবেশের ডাক দিলেন। সেখানে রাসুল (সা.) একজন মুহাজির ও একজন আনসারকে ডেকে বললেন, "আজ থেকে তোমরা একে অপরের ভাই।" মক্কার মুহাজিরদের প্রতি মদিনার আনসারদের এই অগাধ ভালোবাসা ও ত্যাগ ছিল মূলত আল্লাহর প্রতি তাদের আন্তরিক ভালোবাসারই এক পরম বহিঃপ্রকাশ। তবে এর পেছনে আরেকটি গভীর কারণও ছিল— তা হলো মক্কার মুহাজিরদের এক অনন্য ও মহান বিশেষত্ব। এই মুহাজিররা ছিলেন সরাসরি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতে গড়া ও সুপ্রশিক্ষিত মানুষ, যাঁরা দীর্ঘ ১৩ বছর মক্কার কাফেরদের অমানুষিক ও নিষ্ঠুর অত্যাচার সহ্য করেও ইমানের ওপর পাহাড়ের মতো অটল ছিলেন। তাঁরা সরাসরি আল্লাহর রাসুলের পবিত্র সান্নিধ্য থেকে দ্বীনের প্রকৃত তালিম বা শিক্ষা পেয়েছিলেন এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের আত্মগঠন করেছিলেন। শুধুমাত্র আল্লাহর দ্বীন ও সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার খাতিরে তাঁরা নিজেদের পরম মায়ার ঘরবাড়ি, চেনা পরিবেশ ও সমস্ত সহায়-সম্পদ এক পলকে ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। এই কারণেই মুহাজিরদের প্রতি আনসারদের অন্তরে ছিল এক গভীর ও বিশেষ শ্রদ্ধা। আনসাররা সবসময় এই মুখলেস মুহাজির ভাইদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। কারণ, তাঁদের সাথে থাকলে, তাঁদের সান্নিধ্যে বসলে দ্বীন সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানা যেত এবং রাসুলের সরাসরি ছাত্রদের দেখে নিজেদের চরিত্র ও জীবনকে আদর্শ রূপ দেওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি হতো। এই আত্মিক টানের কারণেই ঘোষণা হওয়া মাত্রই আনসাররা তাঁদের মুহাজির ভাইদের শুধু মুখে আপন বলেননি, বরং তাঁদের অন্তরের গভীরে জায়গা দিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, মদিনার ধনী আনসার সাহাবি হযরত সাদ ইবনুর রাবি (রা.)-কে মক্কার মুহাজির সাহাবি হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর ভাই বানিয়ে দেওয়া হলো। সাদ (রা.) তাঁর ভাইকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন, "ভাই আবদুর রহমান! আমি মদিনার অন্যতম ধনী ব্যক্তি। এই নাও আমার সমস্ত সম্পত্তি, একে সমান দুই ভাগে ভাগ করো। এক ভাগ তোমার, অন্য ভাগ আমার।" আনসারদের এই অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগ দেখে মুহাজিররা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তবে তাঁরাও কোনো পরজীবী বা অলস লোক ছিলেন না। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) চোখের পানি মুছে বললেন, "ভাই সাদ! আল্লাহ তোমার পরিবার ও সম্পত্তিতে বরকত দিন। আমার এসবের প্রয়োজন নেই। তুমি শুধু আমাকে মদিনার বাজারের পথটা দেখিয়ে দাও।" (পরবর্তীতে আবদুর রহমান ইবনে আউফ নিজের পরিশ্রমে মদিনার বড় ব্যবসায়ী হয়েছিলেন)। যাঁদের চাষের জমি ছিল, তাঁরা মুহাজির ভাইদের অর্ধেক জমি লিখে দিলেন। যাঁদের খেজুর বাগান ছিল, তাঁরা বললেন, "শ্রম আমরা দেব, কিন্তু ফল কাটার পর অর্ধেক তোমার ঘরে যাবে।" মদিনার আনসারদের এই নিঃস্বার্থ ও পবিত্র ভালোবাসার কথা পবিত্র কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সুরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে অবিনশ্বর করে রেখেছেন: "তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত।" ## ৪. এক নতুন সভ্যতার জন্ম মসজিদে নববী নির্মাণ এবং এই অভূতপূর্ব ভ্রাতৃত্ববন্ধনের মাধ্যমে মদিনায় এমন এক মজবুত ভিত্তি তৈরি হলো, যা আরবের হিংসা, গোত্রবাদ আর অহংকারকে চিরতরে মিটিয়ে দিল। মক্কার কুরাইশ, মদিনার আওস ও খাজরাজ গোত্র এবং দাস-মনোভাবাপন্ন সমাজ ভেঙে সবাই এক দেহে পরিণত হলো। আনসারদের সেই উদারতা ও মুহাজিরদের আত্মমর্যাদাবোধের ওপর ভর করেই মদিনা হয়ে উঠল পৃথিবীর বুকে ইসলামের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণ রাষ্ট্র। যেখানে ভালোবাসা জয় করেছিল সমস্ত অভাবকে, আর ত্যাগ প্রতিষ্ঠা করেছিল এক অপরাজেয় সভ্যতাকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন