সোমবার, ১ জুন, ২০২৬
আঁধারে ফোটা পদ্ম
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
আরব্য মরুভূমির বুক চিরে তখন তপ্ত হাওয়া বইছে। ধূ ধূ বালুকারাশির মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন শহর মক্কা। সেই শহরেরই এক সম্ভ্রান্ত কুরাইশ পরিবারে, ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে, যখন এক শিশু পৃথিবীর আলো দেখল, চারপাশটা যেন এক অলৌকিক শান্তিতে ভরে উঠল। মা আমেনা তাঁর সদ্যোজাত সন্তানের নাম রাখলেন 'মুহাম্মদ' (সা.)।
কিন্তু এই আনন্দের আলোয় মিশে ছিল এক গভীর বিষাদের ছায়া। শিশু মুহাম্মদের জন্মের আগেই তাঁর পিতা আবদুল্লাহ পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। পৃথিবীর বুকে আসার আগেই তিনি হারিয়েছেন পিতৃস্নেহ।
বনু সাদ গোত্রে অলৌকিক দিনগুলো
মক্কার তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী, কোলাহলমুক্ত পরিবেশ, বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষা এবং সুস্থ শারীরিক গঠনের জন্য শিশু মুহাম্মদকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো মরুভূমির বনু সাদ গোত্রে। তাঁর দায়িত্ব নিলেন এক ভাগ্যবতী নারী—দুধমাতা হালিমা। বনু সাদ গোত্রে পা রাখার পর থেকেই ঘটতে লাগল একের পর এক অলৌকিক ঘটনা। হালিমা যখন মক্কায় এসেছিলেন, তখন তাঁর স্তনে দুধ ছিল না, তাঁদের সওয়ারির গাধাটি ছিল দুর্বল আর খিটখিটে। কিন্তু শিশু মুহাম্মদকে কোলে তুলে নেওয়ার সাথে সাথেই হালিমার স্তন দুধে ভরে উঠল। দুর্বল গাধাটি এত দ্রুত ছুটতে শুরু করল যে কাফেলার অন্য সবাই অবাক হয়ে গেল। শুধু তাই নয়, মুহাম্মদের উপস্থিতিতে হালিমার শুষ্ক চারণভূমি সবুজ হয়ে উঠল, ছাগলগুলো ওলন্দা ভরা দুধ নিয়ে ফিরতে লাগল। অভাবের সংসারে ফিরল অলৌকিক সচ্ছলতা। মরুভূমির উন্মুক্ত বাতাস আর সাদাসিধে জীবনযাত্রার মাঝে কাটতে লাগল মুহাম্মদের শৈশব। অন্য শিশুদের সাথে খেলতে খেলতেই কেটে গেল জীবনের প্রথম পাঁচটি বছর।
এতিমত্বের তীব্র আঘাত ও চাচার আশ্রয়
পাঁচ বছর বয়সে মুহাম্মদ (সা.) আবার ফিরে এলেন মক্কায়, মায়ের কোলে। কিন্তু মায়ের স্নেহের আঁচল বেশিদিন তাঁর কপালে জুটল না। মাত্র ৬ বছর বয়সে মা আমেনাও মদিনা থেকে ফেরার পথে 'আবওয়া' নামক স্থানে ইন্তেকাল করলেন। মরুভূমির সেই নিঝুম প্রান্তরে মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মুহাম্মদ (সা.)-এর চোখের পানি যেন মরুভূমির বালুকেও কাঁদিয়েছিল। তিনি হয়ে পড়লেন সম্পূর্ণ পিতৃ-মাতৃহীন, এক পরম এতিম। মায়ের মৃত্যুর পর পরম স্নেহে নাতিকে বুকে টেনে নিলেন দাদা আবদুল মুত্তালিব। কিন্তু মুহাম্মদের (সা.) বয়স যখন মাত্র ৮ বছর, তখন দাদাও দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। একের পর এক আপনজনকে হারিয়ে ছোট্ট মুহাম্মদের মন যখন নিদারুণ কষ্টে ভেঙে পড়েছে, তখন তাঁর দায়িত্ব নিলেন আপন চাচা আবু তালিব। চাচার আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে ছিল ভাতিজার জন্য উজাড় করা ভালোবাসা।
সিরিয়া সফর ও পাদ্রি বহিরার ভবিষ্যৎবাণী
চাচা আবু তালিবের ঘরে এসে মুহাম্মদের (সা.) কৈশোরকাল শুরু হলো। ১২ বছর বয়সে এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন তিনি। চাচা আবু তালিব ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। প্রিয় ভাতিজাকে মক্কায় একা রেখে যেতে মন চাইছিল না তাঁর। তাই মুহাম্মদকেও (সা.) সাথে নিলেন। দীর্ঘ মরু পথ পাড়ি দিয়ে কাফেলা যখন সিরিয়ার 'বুসরা' নামক স্থানে পৌঁছাল, তখন সেখানে 'বহিরা' নামে এক খ্রিষ্টান পাদ্রি থাকতেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, একটি মেঘখণ্ড দূর আকাশ থেকে এসে কাফেলার ওপর ছায়া দিচ্ছে, আর মুহাম্মদ যে গাছের নিচে বসেছেন, তার ডালগুলো ঝুঁকে তাঁকে রোদ থেকে আড়াল করছে। বহিরা কাফেলাকে নিমন্ত্রণ করলেন এবং কিশোর মুহাম্মদকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। তিনি তাঁর হাত ও পিঠের মোহরে নবুওয়াত দেখে চিনে ফেললেন। বহিরা আবু তালিবকে ডেকে বললেন, "এই বালক সাধারণ কোনো শিশু নয়। ও শেষ জামানার নবী। একে মক্কার ইহুদিদের হাত থেকে সাবধানে রাখুন। চাচার মন এক অজানা বিস্ময় ও শ্রদ্ধায় ভরে উঠল। তিনি ব্যবসা দ্রুত শেষ করে মক্কায় ফিরে এলেন।
কৈশোরের কর্মজীবন ও সততার পরীক্ষা
মক্কার তপ্ত বালুকাভূমির উপর সূর্যের প্রখর তাপ মরুভূমির হাওয়াকে যখন আরও উত্তপ্ত করে তুলছিল, তখন কিশোর মুহাম্মদ (সা.) নিজের কর্মদক্ষতা ও সততার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। তিনি চাচার সংসারে সচ্ছলতা আনতে এবং নিজের দায়িত্ববোধ থেকে ব্যবসার কাজে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। একবার এক বাণিজ্যিক কাফেলা যখন মরুভূমির কঠিন পথ পাড়ি দিচ্ছিল, তখন ক্লান্তি ও তৃষ্ণা মেটাতে একটি স্থানে সবাই যাত্রাবিরতি নেন। চারদিকে যখন বণিকদের ব্যস্ততা আর উটের কোলাহল, ঠিক তখনই কাফেলার একজন বয়োবৃদ্ধ বণিক আবিষ্কার করলেন যে, তাঁর অত্যন্ত মূল্যবান অলংকার ও অর্থ ভর্তি চামড়ার ব্যাগটি কোথাও হারিয়ে গেছে। মরুভূমির এই অন্তহীন বালুকারাশির মাঝে সেই ব্যাগ খুঁজে পাওয়া ছিল একপ্রকার অসম্ভব। বণিক যখন নিরাশ হয়ে বিলাপ করছিলেন, তখন কিশোর মুহাম্মদ (সা.) তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং পরম মমতায় তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন। তপ্ত রোদে গা ঘেমে নেয়ে উঠলেও মুহাম্মদ (সা.) ক্লান্তিহীনভাবে মরুভূমির ধূলিময় বালুর প্রতিটি কোণ ও পাথরের আড়াল খুঁজতে শুরু করলেন। তাঁর এই অসাধারণ নিষ্ঠা দেখে কাফেলার অভিজ্ঞ বণিকরাও বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। দীর্ঘ সময় নিখুঁতভাবে খোঁজার পর একটি বড় পাথরের আড়ালে বালুচাপা পড়ে থাকা সেই মূল্যবান ব্যাগটি তিনি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন। তিনি ব্যাগটি এনে সেই বৃদ্ধ বণিকের হাতে তুলে দিলে, বণিক পরীক্ষা করে দেখলেন তাঁর একটি মুদ্রাও খোয়া যায়নি। কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে বণিক তাঁকে বড় অঙ্কের পুরস্কার দিতে চাইলেন, কিন্তু কিশোর মুহাম্মদ (সা.) মৃদু হেসে তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, "আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি, এর জন্য কোনো প্রতিদানের প্রয়োজন নেই।"
এই ঘটনা কাফেলার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে তাঁর প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করেছিল।
জাহিলিয়াতের মাঝে এক টুকরো আলো
তৎকালীন মক্কার সমাজ ডুবে ছিল জাহিলিয়াত বা চরম অন্ধকারের সাগরে। জুয়া, মদ্যপান, ব্যভিচার, লুটতরাজ আর তুচ্ছ কারণে গোত্রীয় মারামারি ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। কিন্তু কিশোর মুহাম্মদ (সা.) এই পাপাচারের পঙ্কিলতার মাঝেও ছিলেন পদ্মফুলের মতো পবিত্র। তিনি কখনো কোনো মূর্তির সামনে মাথা নত করেননি, কখনো কোনো পাপকাজে অংশ নেননি। মক্কার যুবকেরা যখন আমোদ-প্রমোদে মেতে থাকত, তিনি তখন শান্ত মনে চিন্তা করতেন প্রকৃতির সৃষ্টি রহস্য নিয়ে। চাচার সংসারের হাল ধরতে তিনি মাঝে মাঝে মাঠে মেষ চড়াতেও যেতেন। নির্জন প্রান্তর আর প্রকৃতির মাঝে একা কাটাতে কাটাতে তাঁর মন হয়ে উঠেছিল আরো কোমল ও সংবেদনশীল।
পরম বিশ্বাসী 'আল-আমিন'
শৈশব ও কৈশোর থেকেই মুহাম্মদ (সা.)-এর মুখে কখনো কেউ একটিও মিথ্যা কথা শোনেনি। তিনি কারো সাথে কখনো কোনো প্রতারণা করেননি, কাউকে কষ্ট দেননি এবং কারো আমানতের খেয়ানত করেননি। মরুভূমির সেই হারিয়ে যাওয়া ব্যাগ ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাসহ তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের অতুলনীয় সততা, বিনয় আর পরম আমানতদারিতার কারণে মক্কার শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সমাজের সবাই এক নামে তাঁকে 'আল-আমিন' বা 'পরম বিশ্বাসী' উপাধিতে ভূষিত করেছিল। মানুষ নিজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ নিশ্চিন্তে এই কিশোরের কাছে এনে গচ্ছিত বা আমানত রাখত।
ফিজার যুদ্ধ ও হিলফুল ফুজুল গঠন
কিশোর পেরিয়ে মুহাম্মদ (সা.) যখন তারুণ্যের শুরুতে (১৫ থেকে ২০ বছর বয়সের মাঝে), তখন মক্কায় এক ভয়াবহ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল, যার নাম 'ফিজার যুদ্ধ' বা অন্যায় সমর। পবিত্র মাসে নিষিদ্ধ জেনেও কুরাইশ ও কায়েস গোত্রের মাঝে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ প্রায় চার বছর ধরে চলেছিল। কিশোর মুহাম্মদ (সা.) তার চাচাদের সাথে এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তবে তিনি নিজে কারো ওপর অস্ত্র তোলেননি; শুধু শত্রুর ছুঁড়ে দেওয়া তীরগুলো কুড়িয়ে চাচাদের হাতে তুলে দিতেন। যুদ্ধের এই নিষ্ঠুরতা, লাশের স্তূপ আর নিরপরাধ মানুষের আর্তনাদ তাঁর কোমল হৃদয়কে গভীরভাবে ব্যথিত করল। তিনি ভাবলেন, এভাবে একটি সমাজ চলতে পারে না। যুদ্ধ শেষ হলে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি সমমনা ও পরোপকারী যুবকদের একত্রিত করলেন। তাঁদের নিয়ে তিনি গঠন করলেন একটি শান্তি সংঘ, যার নাম 'হিলফুল ফুজুল'। এই সংঘের মূল শপথ ছিল:
* সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা।
* মজলুম ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষা করা।
* কোনো অন্যায়কারীকে মক্কায় প্রশ্রয় না দেওয়া এবং বহিরাগত পথিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
কোনো ধরনের বিলাসিতা বা অহংকার ছাড়াই, তীব্র এতিমত্ব আর কষ্টের মাঝে বড় হওয়া এই কিশোরের হাত ধরেই মক্কার অন্ধকার সমাজে শান্তির প্রথম আলো জ্বলে উঠেছিল—যা পরবর্তীতে পুরো পৃথিবীর ইতিহাসকে বদলে দেওয়ার মূল ভিত্তি তৈরি করেছিল।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন