মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬

সত্যকে সমুন্নত করার সংগ্রাম

মক্কার তপ্ত মরুভূমির বুক চিরে তখন কেবলই দুপুরের খরতাপ নামেনি, নেমেছিল এক বিশ্বাসের অগ্নিপরীক্ষা। আরবের কুরাইশদের শতাব্দী প্রাচীন মূর্তিপূজা আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে যখন আল্লাহর রাসূল (সা.) হকের বাণী—"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"—উচ্চস্বরে ঘোষণা করলেন, তখন থেকেই মক্কার আকাশ-বাতাস যেন এক লহমায় বদলে গেল। শান্তি ও সত্যের সুশীতল বার্তার জবাবে নেমে এলো নির্মমতার এক কাল অধ্যায়। ### কাবার চত্বরে বিশ্বাসের অবিচলতা এক বিকেলে আল্লাহর রাসূল (সা.) কাবার চত্বরে সেজদায় অবনত ছিলেন। পরম প্রভুর দরবারে তিনি যখন নিমগ্ন, ঠিক তখনই কুরাইশদের কুখ্যাত নেতা আবু জেহেল এবং তার সহযোগীরা এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল। আগের দিন জবাই করা একটি উটের পচা, দুর্গন্ধযুক্ত নাড়িভুঁড়ি এনে তারা সেজদারত রাসূল (সা.)-এর পবিত্র পিঠ ও ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দিল। ভারী এবং নোংরা সেই বোঝার নিচে রাসূল (সা.) আটকে রইলেন, কিন্তু সেজদা থেকে মাথা তুললেন না। কাফেররা তা দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল, একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল বিদ্রূপে। অবশেষে খবর পেয়ে ছোট্ট ফাতেমা (রা.) চোখের জল মুছতে মুছতে ছুটে এলেন এবং নিজ হাতে সেই ময়লা সরিয়ে বাবাকে মুক্ত করলেন। নির্যাতন কেবল সেখানেই থেমে থাকেনি। কখনো কাবা প্রাঙ্গণে নামাজরত অবস্থায় উকবা ইবনে আবি মুআইত তার চাদর দিয়ে রাসূল (সা.)-এর গলায় পেঁচিয়ে এমনভাবে টান দিয়েছিল যে তাঁর শ্বাসরোধ হয়ে আসছিল। আবু বকর (রা.) ছুটে এসে তাকে রক্ষা করেন এবং কেঁদে বলেন, *"তোমরা কি এমন একজন মানুষকে হত্যা করতে চাও, যিনি বলেন আমার রব আল্লাহ?"* শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত চলত জাদুকর, পাগল কিংবা কবি বলে মানসিক কটূক্তি এবং একপর্যায়ে তাঁকে হত্যার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র। ### তপ্ত বালুকারাশির ওপর 'আহাদ' ধ্বনি রাসূল (সা.)-এর ওপর নির্যাতনের পাশাপাশি তাঁর অনুসারী সাহাবিদের ওপর নেমে এসেছিল অমানুষিক টর্চার সেল। উমাইয়া ইবনে খালাফ তার ক্রীতদাস হযরত বিলাল (রা.)-কে ইসলামের অপরাধে মক্কার দুপুরের ফুটন্ত বালুর ওপর শুইয়ে দিত। এখানেই শেষ নয়, বুক ফেটে যাওয়ার মতো এক বিশাল ভারী পাথর তাঁর বুকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো, যাতে তিনি নড়াচড়া করতে না পারেন। উমাইয়া চিৎকার করে বলত, *"মুহাম্মদের ধর্ম ত্যাগ কর, নয়তো এভাবেই মরবি!"* কিন্তু সেই মরুভূমির উত্তাপ আর পাথরের চাপকে তুচ্ছ করে বিলালের শুষ্ক ও ফাটা ঠোঁট বেয়ে কেবল একটি শব্দই উচ্চারিত হতো—**"আহাদ! আহাদ!"** (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক)। নিকটেই অন্য এক গলিতে কামার হযরত খাব্বাব (রা.)-কে কাফেররা জ্বলন্ত লাল অঙ্গারের (কয়লা) ওপর খালি পিঠে শুইয়ে রাখত। একজন কাফের তার বুকের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে রাখত যাতে তিনি উঠতে না পারেন। খাব্বাব (রা.)-এর পিঠের চর্বি ও রক্ত গলে গলে যখন সেই আগুন নিভে যেত, তখন কেবল তিনি রেহাই পেতেন। পরবর্তী জীবনেও তাঁর পিঠের সেই সাদা দাগগুলো সাহাবিদের চোখ ভিজিয়ে দিত। ### ইসলামের প্রথম রক্তের দাগ মক্কার অলিগলি তখন কাঁপছিল ইয়াসির পরিবারের আর্তনাদে। বনু মাখজুম গোত্র হযরত ইয়াসির (রা.), তাঁর স্ত্রী হযরত সুমাইয়া (রা.) এবং পুত্র আম্মার (রা.)-কে লোহার বর্ম পরিয়ে মক্কার রোদে দাঁড় করিয়ে রাখত। রাসূল (সা.) যখন তাদের পাশ দিয়ে যেতেন, ব্যথায় তাঁর বুক ফেটে যেত। তিনি বলতেন, *"হে ইয়াসির পরিবার, ধৈর্য ধরো! তোমাদের জন্য জান্নাতের ওয়াদা রয়েছে।"* এক সন্ধ্যায় আবু জেহেল ক্ষিপ্ত হয়ে বৃদ্ধা হযরত সুমাইয়া (রা.)-কে চরম অপমান করতে শুরু করল। কিন্তু সুমাইয়ার ঈমানি দৃঢ়তার সামনে আবু জেহেলের অহংকার চূর্ণ হয়ে গেল। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পিশাচ আবু জেহেল তার হাতের বর্শা দিয়ে সুমাইয়া (রা.)-এর লজ্জাস্থানে আঘাত করল। মক্কার তপ্ত বালু লাল হয়ে উঠল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম শহীদের রক্তে। কিছুদিনের মধ্যে নির্যাতনে শহীদ হলেন তাঁর স্বামী বৃদ্ধ ইয়াসির (রা.)-ও। ধনী ও সম্ভ্রান্ত ঘরের যুবকদেরও রেহাই ছিল না। মক্কার সবচেয়ে সুবেশ ও আদুরে যুবক মুস'য়াব ইবনে উমাইর (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তাঁর মা-ই তাঁকে অনাহারে রেখে ঘরের কোণে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখল। হযরত উসমান (রা.)-কে তাঁর চাচা খেজুর পাতার চাটাইয়ে মুড়িয়ে ধোঁয়া দিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করত। ### শি'বে আবু তালিবের অবরুদ্ধ জীবন যখন কোনো নির্যাতনেই মুসলমানদের ঈমান টলানো গেল না, তখন কুরাইশরা মেতে উঠল এক দীর্ঘমেয়াদি ও নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রে। তারা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের সাথে সমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার চুক্তিপত্র কাবার দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিল। রাসূল (সা.) এবং তাঁর পরিবারসহ মুসলমানদের আশ্রয় নিতে হলো 'শি'বে আবু তালিব' নামক একটি সংকীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকায়। দীর্ঘ তিনটি বছর (৭ম হিজরি পূর্ব থেকে ১০ম হিজরি পূর্ব) তারা সেখানে অবরুদ্ধ রইলেন। মক্কায় কোনো খাবার ঢুকলে কাফেররা তা চড়া দামে কিনে নিত যেন মুসলমানরা তা কিনতে না পারে। ক্ষুধার জ্বালায় অবুঝ শিশুদের কান্নায় মক্কার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, হযরত খাদিজা (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবিরা বন্য গাছের পাতা আর শুকনো চামড়া পানিতে ফুটিয়ে চিবিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতেন। এই তিন বছরের অবর্ণনীয় কষ্ট ও অনাহার রাসূল (সা.)-এর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিবের শরীরকে এতটাই ভেঙে দিয়েছিল যে, বয়কট প্রত্যাহারের কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা দুজনে ইন্তেকাল করেন। > মক্কার সেই নির্মম দিনগুলো ছিল এক চরম অন্ধকার আর ত্যাগের মহাকাব্য। কিন্তু শত চাবুকের আঘাত, উত্তপ্ত পাথর, জ্বলন্ত কয়লা আর তিন বছরের ক্ষুধা—কোনো কিছুই সাহাবায়ে কেরামের বুক থেকে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা আর ঈমানের আলো নিভিয়ে দিতে পারেনি। তাঁদের এই অমানুষিক আত্মত্যাগ আর রক্তের বিনিময়েই আজ পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইসলাম। >

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন