মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
সত্যের আহ্বান এবং ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা
মক্কার আকাশে তখনো প্রকাশ্য দাওয়াতের সূর্য উদিত হয়নি। দীর্ঘ তিন বছর ধরে অত্যন্ত গোপনে, বিশ্বাসের এক সুশীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছিল মক্কার কতিপয় খাঁটি হৃদয়ের মাঝে। কিন্তু সত্যের আলো তো চিরকাল আড়ালে থাকার জন্য আসেনি। একদিন জিবরাইল (আ.) নিয়ে এলেন রাব্বুল আলামীনের সেই অমোঘ নির্দেশ—**"হে নবী, তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দের আল্লাহর আজাব সম্পর্কে সতর্ক করো।"** (সূরা শুয়ারা: ২১৪)
এই ঐশী আদেশ পাওয়ার পর আল্লাহর রাসূল (সা.) প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নিজের রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের কাছে সত্যের বাণী পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। আর সেখান থেকেই শুরু হলো এক আবেগঘন এবং চরম নাটকীয় অধ্যায়, যা সাফা পাহাড়ের সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার ভিত্তি তৈরি করেছিল।
### প্রথম ভোজসভা: আবু লাহাবের বিষাক্ত বাধা
আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর বংশ বনু হাশেমের লোকদের একটি ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁদের সাথে বনু মুত্তালিব ইবনে আবদে মান্নাফ গোত্রের একটি দলও যোগ দিল। সব মিলিয়ে রাসূল (সা.)-এর ঘরে সমবেত হলেন পঁয়তাল্লিশ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি।
খাওয়াদাওয়া শেষ হওয়ার পর রাসূল (সা.) যখনই মূল কথা শুরু করতে যাবেন, ঠিক তখনই তাঁর আপন চাচা আবু লাহাব কুটিল ভঙ্গিতে কথা লুফে নিল। সে পুরো মজলিসের সামনে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় বলে উঠল:
> "দেখো, এরা তোমার চাচা এবং চাচাতো ভাই। কথা বলো, তবে মূর্খতার পরিচয় দিয়ো না। মনে রেখো, তোমার এই ছোট খান্দান সমগ্র আরবের সাথে মোকাবিলা করতে পারবে না। (যদি তুমি নতুন কোনো ধর্ম প্রচার করো) তবে আমিই তোমাকে পাকড়াও করার বেশি হকদার। তোমার জন্য তোমার পিতৃকূলের লোকেরাই যথেষ্ট। যদি তুমি তোমার কথার ওপর অটল থাকো, তাহলে কুরাইশদের সমগ্র গোত্র তোমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, আরবের অন্যান্য গোত্রও তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। এরপর কী হবে? তোমার পিতৃকূলের মধ্যে তুমিই হবে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক কাজের মানুষ!"
>
নিজের আপন চাচার মুখে এমন বিষাক্ত ও হুমকিস্বরূপ কথা শুনে নবী করিম (সা.) সেই মজলিসে সম্পূর্ণ চুপ করে রইলেন। তিনি কোনো তর্কে গেলেন না, কোনো পাল্টা জবাব দিলেন না। প্রথম দিনের সেই সভা কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হলো এবং আত্মীয়রা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চলে গেল।
### দ্বিতীয় ভোজসভা: তাওহীদের অমিয় বাণী
কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ তো থমকে থাকার জন্য আসেনি। আল্লাহর রাসূল (সা.) দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। কয়েকদিন পর তিনি পুনরায় তাঁর আত্মীয়দের সেই একই ভোজসভায় সমবেত করলেন। এবার আর আবু লাহাবকে কথা কেড়ে নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে, খাবার শেষ হতেই আল্লাহর রাসূল (সা.) দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁর কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হলো এক অপূর্ব, হৃদয়গ্রাহী ভাষণ:
> "আল্লাহ পাকের জন্যেই সকল প্রশংসা। আমি তাঁর প্রশংসা করছি এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাইছি। তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করছি এবং তাঁর ওপরই ভরসা করছি। আমি এই সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত ইবাদতের উপযুক্ত কেউ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক নেই।"
>
একটু থেমে, উপস্থিত সবার চোখের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) পরম মমতায় বললেন:
> "পথপ্রদর্শক কখনো তার নিজের পরিবারের লোকদের নিকট মিথ্যা কথা বলতে পারে না। সেই আল্লাহর শপথ, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আমি তোমাদের প্রতি বিশেষভাবে এবং পৃথিবীর অন্য সব মানুষের প্রতি সাধারণভাবে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। আল্লাহর শপথ! তোমরা প্রতিদিন যেভাবে ঘুমিয়ে পড়ো, ঠিক সেভাবেই একদিন মৃত্যুমুখে পতিত হবে। আর ঘুম থেকে যেভাবে তোমরা প্রতিদিন জাগ্রত হও, ঠিক সেভাবেই কিয়ামতের দিন তোমাদের পুনরায় জীবিত করে ওঠানো হবে। এরপর তোমাদের প্রত্যেকের কৃতকর্মের নিখুঁত হিসাব নেওয়া হবে। আর সেই হিসাবের পর নিশ্চিতভাবে নির্ধারিত হবে—হয় চিরকালের জন্য জান্নাত, না হয় চিরকালের জন্য জাহান্নাম।"
>
### দুই চাচার দুই মেরু: আবু তালিব বনাম আবু লাহাব
রাসূল (সা.)-এর এই ওজস্বী ও সত্যবাণী শোনার পর মজলিসে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। সবার আগে সেই নীরবতা ভাঙলেন রাসূল (সা.)-এর পরম আশ্রয়, চাচা আবু তালিব। তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন:
> "হে ভাতিজা! তোমাকে সহায়তা করা আমার কতো যে পছন্দ, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তোমার উপদেশ অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য এবং তোমার কথা আমি মনেপ্রাণে সত্য বলে বিশ্বাস করি। এখানে তোমার পিতৃকূলের সকলেই উপস্থিত রয়েছে, আমিও তাদেরই একজন। কাজেই তুমি আল্লাহর পক্ষ থেকে যে কাজের নির্দেশ পেয়েছ, তা নির্দ্বিধায় করে যাও। আমি অব্যাহতভাবে তোমার হেফাজত এবং সহায়তা করে যাব। তবে... আমার মন আব্দুল মুত্তালিবের (পুরোনো) দ্বীন ছাড়ার পক্ষপাতি নয়।"
>
আবু তালিবের এই অভয়বাণী শুনে পাশে বসে থাকা আবু লাহাবের মুখ ক্রোধে কালো হয়ে গেল। সে চিৎকার করে বাকিদের উদ্দেশে বলল, *"আল্লাহর শপথ, এটা অত্যন্ত মন্দ কাজ! অন্যদের আগে তোমরা নিজেরাই কেন তার হাত ধরে তাকে থামিয়ে দিচ্ছ না?"*
আবু লাহাবের এই উগ্রতা দেখে বৃদ্ধ আবু তালিব গর্জে উঠলেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, **"আল্লাহর শপথ! আমি যতোদিন বেঁচে থাকি, ততোদিন আমি তাকে (মুহাম্মদকে) রক্ষা করতে থাকব এবং তার হেফাজত করব।"**
নিকট আত্মীয়দের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পরই মূলত আরবের কুরাইশদের ভেতরের মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে যায়। একদিকে আবু তালিবের স্নেহের ঢাল, অন্যদিকে আবু লাহাবের তীব্র বিদ্বেষ। আত্মীয়দের এই সতর্কবার্তা দেওয়ার পর, আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সামনে এবার উন্মুক্ত হলো পুরো মক্কাবাসীর দুয়ার। আর এরই ধারাবাহিকতায় একদিন তিনি আরোহণ করলেন সাফা পাহাড়ের চূড়ায়, যেখান থেকে উচ্চারিত হয়েছিল আরবের ইতিহাসের সেই প্রথম প্রকাশ্য বজ্রধ্বনি...
মক্কায় কাফেরদের অত্যাচার
তিন বছর গোপনে ইসলামের আলো ছড়ানোর পর এলো প্রকাশ্য দাওয়াতের নির্দেশ: "অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছ তা প্রকাশ্যে প্রচার কর এবং মুশরিকদের উপেক্ষা কর।"
আল্লাহর নির্দেশ এলো সত্যকে প্রকাশ করার, প্রকাশ্যে প্রচার করার এবং মুশরিকদের বিরোধিতাকে পরোয়া না করার।
একদিন আল্লাহর রাসূল (সা.) মক্কার সাফা পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করলেন। আরবের নিয়ম অনুযায়ী অত্যন্ত জরুরি কোনো বিপদের বার্তা দিতে তিনি উচ্চকণ্ঠে ডাক দিলেন—"ইয়া সাবাহাহ!" (হে ভোরের বিপৎসংকেত!)। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ডাক শুনে কুরাইশদের প্রতিটি গোত্রের মানুষ কৌতূহলী হয়ে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে এসে জড়ো হলো। যারা নিজে আসতে পারল না, তারা দূত পাঠাল।
রাসূল (সা.) সমবেত জনতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন:
"আমি যদি তোমাদের বলি যে, এই পাহাড়ের ওপাশ থেকে একদল শত্রুসৈন্য তোমাদের ওপর আক্রমণ করতে উদ্যত, তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে?"
সমবেত কুরাইশরা একমুখে চিৎকার করে বলে উঠল, "হ্যাঁ, অবশ্যই করব! কারণ আমরা তোমাকে কখনো মিথ্যা বলতে শুনিনি, তুমি আমাদের মাঝে 'আল-আমিন' (বিশ্বস্ত)।"
জনতার এই স্বীকৃতির পর আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর আসল বার্তাটি ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন, "তাহলে আমি তোমাদের এক কঠিন শাস্তি আসার পূর্বে সতর্ক করছি। তোমরা বলো—আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।"
মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবেশ থমথমে হয়ে গেল। কুরাইশদের অহংকারে আঘাত লাগল। রাসূল (সা.)-এর আপন চাচা আবু লাহাব ক্ষিপ্ত হয়ে পাথর ছুঁড়ে মারার ভঙ্গি করে বলে উঠল, "তোমার হাত ধ্বংস হোক! একথার জন্যই কি তুমি আমাদের ডেকেছ?"
তার আগে আল্লাহর রাসূলকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তার নিকট আত্মীয়দের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য এবং তার বিরুদ্ধে সতর্ক করার জন্য। আল্লাহ বলেন- "হে নবী তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দের আল্লার আযাব সম্পর্কে সতর্ক কর।"
এই প্রকাশ্য ঘোষণার পর থেকেই মক্কার কাফেররা পরম বিশ্বস্ত 'আল-আমিন'কে নিজেদের প্রধান শত্রুতে পরিণত করল। আস্তে আস্তে মক্কার আকাশে বিরোধিতার মেঘ জমতে শুরু করলো।
মক্কার তপ্ত মরুভূমির বুক চিরে তখন কেবলই দুপুরের খরতাপ নামেনি, নেমেছিল এক বিশ্বাসের অগ্নিপরীক্ষা। আরবের কুরাইশদের শতাব্দী প্রাচীন মূর্তিপূজা আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে যখন আল্লাহর রাসূল (সা.) হকের বাণী—"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"—উচ্চস্বরে ঘোষণা করলেন, তখন থেকেই মক্কার আকাশ-বাতাস যেন এক লহমায় বদলে গেল। শান্তি ও সত্যের সুশীতল বার্তার জবাবে নেমে এলো নির্মমতার এক কাল অধ্যায়।
আল্লাহর রাসূলের ওপর অত্যাচার
এক বিকেলে আল্লাহর রাসূল (সা.) কাবার চত্বরে সেজদায় অবনত ছিলেন। পরম প্রভুর দরবারে তিনি যখন নিমগ্ন, ঠিক তখনই কুরাইশদের কুখ্যাত নেতা আবু জেহেল এবং তার সহযোগীরা এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল। আগের দিন জবাই করা একটি উটের পচা, দুর্গন্ধযুক্ত নাড়িভুঁড়ি এনে তারা সেজদারত রাসূল (সা.)-এর পবিত্র পিঠ ও ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দিল।
ভারী এবং নোংরা সেই বোঝার নিচে রাসূল (সা.) আটকে রইলেন, কিন্তু সেজদা থেকে মাথা তুললেন না। কাফেররা তা দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল, একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল বিদ্রূপে। অবশেষে খবর পেয়ে ছোট্ট ফাতেমা (রা.) চোখের জল মুছতে মুছতে ছুটে এলেন এবং নিজ হাতে সেই ময়লা সরিয়ে বাবাকে মুক্ত করলেন।
নির্যাতন কেবল সেখানেই থেমে থাকেনি। একবার কাবা প্রাঙ্গণে নামাজরত অবস্থায় উকবা ইবনে আবি মুআইত তার চাদর দিয়ে রাসূল (সা.)-এর গলায় পেঁচিয়ে এমনভাবে টান দিয়েছিল যে তাঁর শ্বাসরোধ হয়ে আসছিল। আবু বকর (রা.) ছুটে এসে তাকে রক্ষা করেন এবং কেঁদে বলেন, *"তোমরা কি এমন একজন মানুষকে হত্যা করতে চাও, যিনি বলেন আমার রব আল্লাহ?"* শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত চলত জাদুকর, পাগল কিংবা কবি বলে মানসিক কটূক্তি এবং একপর্যায়ে তাঁকে হত্যার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র।
সাহাবীদের ওপর অত্যাচার
রাসূল (সা.)-এর ওপর নির্যাতনের পাশাপাশি তাঁর অনুসারী সাহাবিদের ওপর নেমে এসেছিল অমানুষিক টর্চার সেল। উমাইয়া ইবনে খালাফ তার ক্রীতদাস হযরত বিলাল (রা.)-কে ইসলামের অপরাধে মক্কার দুপুরের ফুটন্ত বালুর ওপর শুইয়ে দিত। এখানেই শেষ নয়, বুক ফেটে যাওয়ার মতো এক বিশাল ভারী পাথর তাঁর বুকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো, যাতে তিনি নড়াচড়া করতে না পারেন। উমাইয়া চিৎকার করে বলত, *"মুহাম্মদের ধর্ম ত্যাগ কর, নয়তো এভাবেই মরবি!"*
কিন্তু সেই মরুভূমির উত্তাপ আর পাথরের চাপকে তুচ্ছ করে বিলালের শুষ্ক ও ফাটা ঠোঁট বেয়ে কেবল একটি শব্দই উচ্চারিত হতো—**"আহাদ! আহাদ!"** (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক)।
নিকটেই অন্য এক গলিতে হযরত খাব্বাব (রা.)-কে কাফেররা জ্বলন্ত লাল অঙ্গারের (কয়লা) ওপর খালি পিঠে শুইয়ে রাখত। একজন কাফের তার বুকের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে রাখত যাতে তিনি উঠতে না পারেন। খাব্বাব (রা.)-এর পিঠের চর্বি ও রক্ত গলে গলে যখন সেই আগুন নিভে যেত, তখন কেবল তিনি রেহাই পেতেন। পরবর্তী জীবনেও তাঁর পিঠের সেই সাদা দাগগুলো সাহাবিদের চোখ ভিজিয়ে দিত।
ইসলামের প্রথম শহীদ
মক্কার অলিগলি তখন কাঁপছিল ইয়াসির পরিবারের আর্তনাদে। বনু মাখজুম গোত্র হযরত ইয়াসির (রা.), তাঁর স্ত্রী হযরত সুমাইয়া (রা.) এবং পুত্র আম্মার (রা.)-কে লোহার বর্ম পরিয়ে মক্কার রোদে দাঁড় করিয়ে রাখত। রাসূল (সা.) যখন তাদের পাশ দিয়ে যেতেন, ব্যথায় তাঁর বুক ফেটে যেত। তিনি বলতেন, "হে ইয়াসির পরিবার, ধৈর্য ধরো! তোমাদের জন্য জান্নাতের ওয়াদা রয়েছে।"
এক সন্ধ্যায় আবু জেহেল ক্ষিপ্ত হয়ে বৃদ্ধা হযরত সুমাইয়া (রা.)-কে চরম অপমান করতে শুরু করল। কিন্তু সুমাইয়ার ঈমানি দৃঢ়তার সামনে আবু জেহেলের অহংকার চূর্ণ হয়ে গেল। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পিশাচ আবু জেহেল তার হাতের বর্শা দিয়ে সুমাইয়া (রা.)-এর লজ্জাস্থানে আঘাত করল। মক্কার তপ্ত বালু লাল হয়ে উঠল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম শহীদের রক্তে। কিছুদিনের মধ্যে নির্যাতনে শহীদ হলেন তাঁর স্বামী বৃদ্ধ ইয়াসির (রা.)-ও।
ধনী ও সম্ভ্রান্ত ঘরের যুবকদেরও রেহাই ছিল না। মক্কার সবচেয়ে সুবেশ ও আদুরে যুবক মুস'য়াব ইবনে উমাইর (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তাঁর মা-ই তাঁকে অনাহারে রেখে ঘরের কোণে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখল। হযরত উসমান (রা.)-কে তাঁর চাচা খেজুর পাতার চাটাইয়ে মুড়িয়ে ধোঁয়া দিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করত।
### শি'বে আবু তালিবের অবরুদ্ধ জীবন
যখন কোনো নির্যাতনেই মুসলমানদের ঈমান টলানো গেল না, তখন কুরাইশরা মেতে উঠল এক দীর্ঘমেয়াদি ও নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রে। তারা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের সাথে সমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার চুক্তিপত্র কাবার দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিল।
রাসূল (সা.) এবং তাঁর পরিবারসহ মুসলমানদের আশ্রয় নিতে হলো 'শি'বে আবু তালিব' নামক একটি সংকীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকায়। দীর্ঘ তিনটি বছর (৭ম হিজরি পূর্ব থেকে ১০ম হিজরি পূর্ব) তারা সেখানে অবরুদ্ধ রইলেন। মক্কায় কোনো খাবার ঢুকলে কাফেররা তা চড়া দামে কিনে নিত যেন মুসলমানরা তা কিনতে না পারে।
ক্ষুধার জ্বালায় অবুঝ শিশুদের কান্নায় মক্কার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, হযরত খাদিজা (রা.) এবং অন্যান্য সাহাবিরা বন্য গাছের পাতা আর শুকনো চামড়া পানিতে ফুটিয়ে চিবিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতেন। এই তিন বছরের অবর্ণনীয় কষ্ট ও অনাহার রাসূল (সা.)-এর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিবের শরীরকে এতটাই ভেঙে দিয়েছিল যে, বয়কট প্রত্যাহারের কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা দুজনে ইন্তেকাল করেন।
> মক্কার সেই নির্মম দিনগুলো ছিল এক চরম অন্ধকার আর ত্যাগের মহাকাব্য। কিন্তু শত চাবুকের আঘাত, উত্তপ্ত পাথর, জ্বলন্ত কয়লা আর তিন বছরের ক্ষুধা—কোনো কিছুই সাহাবায়ে কেরামের বুক থেকে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা আর ঈমানের আলো নিভিয়ে দিতে পারেনি। তাঁদের এই অমানুষিক আত্মত্যাগ আর রক্তের বিনিময়েই আজ পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইসলাম।
>
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন