মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
হেরা গুহায় নূরের জ্যোতি:
চারিদিকে নিশ্ছিদ্র, জমাট বাঁধা অন্ধকার। মক্কার আকাশচুম্বী পাহাড়গুলো যেন এক একটি মৌন প্রহরী, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরবের বুকে বয়ে যাওয়া অবক্ষয়, হাহাকার আর পঙ্কিলতার নীরব সাক্ষী। মানবতা সেখানে ডুকরে কাঁদছিল। যে পবিত্র কাবা গৃহ নির্মিত হয়েছিল এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য, তা তখন অবদমিত ছিল তিনশো ষাটটি জড় প্রতিমার পাথুরে শৃঙ্খলে। গোত্রে গোত্রে সামান্য কারণে বছরের পর বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার নিষ্ঠুরতা, আর নৈতিকতার চরম দেউলিয়াত্ব—সব মিলিয়ে আরব ভূখণ্ড যেন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা ছিল এক বিস্মৃত, গাফেল জাতি, যাদের পূর্বপুরুষদের কাছে দীর্ঘকাল কোনো ঐশী আলোর দিশারী আসেনি, কোনো সতর্ককারী তার হাত বাড়িয়ে দেয়নি।
কিন্তু এই ঘোর অমাবস্যার বুকেই নিভৃতে তৈরি হচ্ছিল এক মহাজাগতিক ভোরের পটভূমি। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং মহাবিশ্বের মহান স্রষ্টার সেই চিরন্তন নিয়মেরই ধারাবাহিকতা, যা তিনি যুগে যুগে মূসার কিতাব কিংবা ঈসার বাণীর মাধ্যমে মানবজাতিকে উপহার দিয়েছিলেন।
মক্কার এই চরম কোলাহল, মূর্তিপূজার উৎসব আর নৈতিক পচনের আবহ যাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারেনি, তিনি হলেন আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ (সা)। তাঁর বয়স যখন চল্লিশের কোঠায় পৌঁছাল, তখন এক অদ্ভুত, স্বর্গীয় নির্জনতাপ্রিয়তা ভর করল তাঁর অন্তরে। শহরের জৌলুস আর কোলাহল থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে তিনি আশ্রয় খুঁজলেন জাবালে নূরের চূড়ায় অবস্থিত অন্ধকার, সংকীর্ণ **হেরা গুহায়**। সামান্য কিছু ছাতু আর পানি সম্বল করে তিনি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত সেই পাথুরে গুহায় কাটিয়ে দিতেন। তাঁর দুই চোখ চেয়ে থাকত মহাশূন্যের নক্ষত্ররাজির দিকে, আর অন্তর ব্যাকুল হয়ে খুঁজত মহাবিশ্বের সেই পরম সত্যকে, যিনি এই সৃষ্টিজগতের একমাত্র নিয়ন্তা।
সেদিন ছিল রমজান মাসের এক শান্ত, মহিমান্বিত রাত। পুরো পৃথিবী তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। হেরা গুহার ভেতরে ধ্যানে মগ্ন মুহাম্মাদ (সা)। হঠাৎ পুরো গুহা এক অপার্থিব, স্বর্গীয় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বাতাসে স্পন্দন জাগিয়ে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন এক অতিপ্রাকৃতিক, জ্যোতির্ময় সত্তা—আল্লাহর প্রধান ফেরেশতা হযরত জিব্রাইল (আ)।
ফেরেশতা গম্ভীর, বজ্রকঠিন অথচ সুমধুর কণ্ঠে আদেশ করলেন: **"ইকরা! (পড়ুন!)"**
মুহাম্মাদ (সা) এই অতর্কিত ও অলৌকিক উপস্থিতিতে শিউরে উঠলেন। ভয় আর বিস্ময়ে কাঁপতে কাঁপতে তিনি উত্তর দিলেন: "আমি তো পড়া জানি না।"
তখন সেই জ্যোতির্ময় সত্তা এগিয়ে এসে মুহাম্মাদ (সা)-কে সজোরে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সেই আলিঙ্গনের চাপ এতটাই তীব্র ছিল যে, মনে হচ্ছিল তাঁর প্রাণবায়ু বুঝি ওষ্ঠাগত হবে। ফেরেশতা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে দ্বিতীয়বার বললেন: "পড়ুন!"
নবীজী আবারও একই উত্তর দিলেন, "আমি তো পড়া জানি না।"
জিব্রাইল (আ) দ্বিতীয়বার এবং অতঃপর তৃতীয়বার তাঁকে বুকে চেপে ধরে ছেড়ে দিলেন। এবার আর কোনো মানবিক ভয় রইল না, জিব্রাইলের সেই আধ্যাত্মিক স্পর্শে মুহাম্মাদ (সা)-এর অবচেতন মন খুলে গেল। ফেরেশতা তখন আবৃত্তি করলেন সেই অমর বাণী, যা শোনার জন্য আসমান-জমিন যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করছিল:
> *"পড়ো তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়ো, আর তোমার রব মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে এমন বিষয় যা সে জানত না।"*
>
ঐশী বাণীর গুরুভারে হেরা গুহা তখন কাঁপছে। জিব্রাইল (আ) অদৃশ্য হয়ে গেলেন, কিন্তু সেই পাঁচটি আয়াত চিরতরে খোদাই হয়ে গেল মুহাম্মাদ (সা)-এর পবিত্র অন্তরে।
নবুয়তের এই প্রচণ্ড ভার এবং প্রথম অভিজ্ঞতার ধাক্কায় নবীজীর শরীর তখন কাঁপছিল। তিনি পাহাড় থেকে নেমে সোজা নিজের বাড়ির দিকে ছুটলেন। তাঁর হৃদপিণ্ড তখন দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে, কপাল বেয়ে ঝরছে ঘাম। ঘরে ঢুকেই মহিয়সী স্ত্রী খাদীজার বুকে যেন শান্তি খুঁজে পেলেন। কম্পিত কণ্ঠে তিনি কেবল বলতে পারলেন: **"আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও! আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও!"**
হযরত খাদীজা (রা) কোনো প্রশ্ন না করে পরম মমতায় স্বামীকে চাদর দিয়ে জড়িয়ে দিলেন। দীর্ঘক্ষণ পর যখন নবীজীর শরীরের কাঁপন থামল এবং মনের ভীতি দূর হলো, তখন তিনি হেরা গুহার সেই রোমহর্ষক ঘটনা বিস্তারিত খুলে বললেন। নিজের জীবনের আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, "খাদীজা, আমার নিজের জীবনের ওপর বড্ড ভয় হচ্ছে।"
আরবের সেই দুঃসময়ে হযরত খাদীজা (রা) যে জবাব দিয়েছিলেন, তা কোনো সাধারণ নারীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় ও প্রত্যয়ী কণ্ঠে বললেন:
> *"আল্লাহর কসম! কখনো নয়; আল্লাহ আপনাকে কখনো লজ্জিত বা অপদস্থ করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখেন, অসহায়-দরিদ্রদের সাহায্য করেন, নিঃস্ব মানুষের দায়িত্ব বহন করেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করেন এবং প্রকৃত সত্য ও হকের বিপদে মানুষকে সাহায্য করে থাকেন।"*
>
খাদীজার এই আশ্বাসবাণী নবীজীর অন্তরে এক প্রশান্তির হাওয়া এনে দিল। কিন্তু খাদীজা কেবল মুখে সান্ত্বনা দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না। এই অলৌকিক ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য তিনি নবীজীকে নিয়ে গেলেন তাঁর বৃদ্ধ চাচাতো ভাই **ওরাকা বিন নওফেল**-এর কাছে। ওরাকা ছিলেন প্রাচীন কিতাবসমূহের এক অগাধ পণ্ডিত, যিনি তৎকালীন মূর্তিপূজা ত্যাগ করে একত্ববাদের সন্ধান করছিলেন।
অন্ধ, জরাজীর্ণ ওরাকার সামনে যখন রসূলুল্লাহ (সা) হেরা গুহার পুরো ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করলেন, তখন সেই বৃদ্ধ পণ্ডিতের শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। তিনি তাঁর লাঠিতে ভর দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন এবং আবেগঘন কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন:
> *"ইনি তো সেই পরম বিশ্বস্ত রাজদূত (নামূস), যাঁকে আল্লাহ তায়ালা ইতিপূর্বে মূসা (আ)-এর কাছে পাঠিয়েছিলেন! আপনিই এই যুগের শেষ নবী!"*
>
ওরাকা সেখানেই থেমে গেলেন না। তিনি নবীজীর দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, *"হায়! আফসোস! আপনার দাওয়াতের যুগে যদি আমি যুবক থাকতাম! আফসোস, আপনার জাতি যখন আপনাকে এই মক্কা নগরী থেকে বের করে দেবে, তখন যদি আমি জীবিত থাকতাম!"*
শান্ত, পরোপকারী মুহাম্মাদ (সা) জীবনে কখনো কারও ক্ষতি করেননি, মক্কাবাসী তাঁকে ‘আল-আমীন’ বা বিশ্বাসী বলে জানত। তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, *"তারা কি সত্যিই আমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে?"*
ওরাকা অত্যন্ত গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন, *"হ্যাঁ, ইতিহাসে এমন কোনো মানুষ আসেনি যিনি আপনার মতো এই সত্যের বাণী নিয়ে এসেছেন, আর তাঁর আপন জাতি তাঁর চরম শত্রু বনে যায়নি। আপনার সেই কঠিন দিনে আমি যদি বেঁচে থাকি, তবে আপনাকে সর্বাত্মক সাহায্য করব।"*
ওরাকার এই ভবিষ্যদ্বাণী আরবের আসন্ন এক মহাবিপ্লবের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। এর কিছুদিন পরই ওরাকা ইন্তেকাল করেন এবং মহান আল্লাহর এক বিশেষ হেকমতের কারণে বেশ কিছুদিনের জন্য অহী অবতরণ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। এই নীরবতার সময়টুকুতে নবীজী নিজেকে মানসিকভাবে আরও দৃঢ় করে গড়ে তোলেন, আর মক্কার আকাশে তখন জমা হতে থাকে এক নতুন ভোরের আলো, যা খুব শীঘ্রই তিন বছরের এক নিভৃত, গোপন দাওয়াতের মধ্য দিয়ে আরবের বুক চিরে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছিল।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন