শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬
দরসুল কুরআন:সূরা হা-মীম আস-সাজদাহ (ফুসসিলাত) এর ৩৩ নম্বর আয়াত
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلاً مِّمَّن دَعَآ إِلَى ٱللَّهِ وَعَمِلَ صَـٰلِحًا وَقَالَ إِنَّنِى مِنَ ٱلْمُسْلِمِينَ0
“এবং তার চেয়ে কার কথা উত্তম, যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’?”
সূরার নাম:
হা-মীম দিয়ে শুরু এবং ভেতরে সিজদার আয়াত থাকায় "হা-মীম আস-সাজদাহ”l এই সূরার আরেকটি নাম- ফুসসিলাত।
বিষয়বস্তু: এই আয়াতে দাওয়াতি কাজের (আল্লাহর দিকে আহ্বানের) গুরুত্ব ও দাঈ'র (আল্লাহর পথে আহ্বানকারীর) মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে। এবং এর মাধ্যমে মূলত আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই মহতী কাজ করার জন্য মুমিনদেরকে উৎসাহিত করেছেন।
নাজিলের সময়কাল ও প্রেক্ষাপট
সূরা হামিম আস-সাজদা নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষে মক্কায় অবতীর্ণ হয়।
# এটা সেই সময় যখন কাফেরদের অত্যাচার সহ্য করতে না পারি মুসলমানরা হাবশায় হিজরত করেছিলেন।
# সহীহ রেওয়ায়েত অনুযায়ী, এটি হযরত হামযাহ (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের পরে এবং হযরত উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের আগে নাযিল হয়।
হামযা (রা.)’র ইসলাম গ্রহণের প্রেক্ষাপট:
একদিন আবু জাহল সাফা পর্বতের কাছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কটু কথা বলে পাথর ছুঁড়ে রক্তাক্ত করে। এ খবর শুনে শিকার থেকে ফেরা হামযা (রা.) রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে কাবা প্রাঙ্গণে গিয়ে আবু জাহলকে ধনুক দিয়ে আঘাত করেন এবং ঘোষণা করেন, "তুমি কি তাকে গালি দাও, অথচ আমি তাঁর ধর্ম গ্রহণ করেছি"।
ব্যাখ্যা:
১. আল্লাহর পথে আহ্বান করার গুরুত্ব ও মর্যাদা
সর্বোত্তম কথা: যে ব্যক্তি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, তার চেয়ে উত্তম কথা আর কারোরই হতে পারে না। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় কথা হলো তাঁর পথে আহ্বানকারী কথা। তিনি নিজে ঘোষণা করছেন যে- আল্লাহর পথে আহ্বান করার চেয়ে উত্তম কথা আর কিছুই হতে পারে না। এর মাধ্যমে দাওয়াতি কাজের গুরুত্ব এবং এই কাজে নিয়োজিত মুমিনদের মর্যাদা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অন্য আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সরাসরি নির্দেশ দিয়ে বলছেন:
ٱدْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِٱلْحِكْمَةِ وَٱلْمَوْعِظَةِ ٱلْحَسَنَةِۖ
তোমার রবের পথে আহবান কর প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর। (আন-নাহাল: আয়াতঃ ১২৫)
শুধু তাই নয় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন মুসলমানদের দায়িত্ব হচ্ছে মানবজাতির সামনে ইসলামের মডেল হওয়া বা সত্যের সাক্ষ্য (নমুনা) উপস্থাপন করা করা। কথা ও কাজের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য মানুষের সামনে তুলে ধরা:
وَكَذَٲلِكَ جَعَلْنَـٰكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُواْ شُهَدَآءَ عَلَى ٱلنَّاسِ وَيَكُونَ ٱلرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًاۗ
“এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষী হও এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী হন।" (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৪৩)।
অর্থাৎ মুসলমানরা হবে মানবজাতির জন্য ইসলামের মডেল। আর মুসলমানদের জন্য মডেল বা আদর্শ হবেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম।
সুরা আল-ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে মুসলিম উম্মার মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেনঃ ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনবে।’
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হল, আমাদের সমাজের অনেক নিষ্ঠাবান মুসলমান- যারা নিয়মিত নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন, হজ্ব ও যাকাত আদায় করেন তারাও দাওয়াতি কাজের গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে অবগত নন।
২. আল্লাহর পথে আহ্বানকারীর মর্যাদা নির্ভর করে যে বিষয় গুলোর ওপর:
১. সৎ কাজ বা (নেক আমল), ২. পরিচয় গোপন না করা, ৩. ঈমানের পরীক্ষা, ৪.জ্ঞান ও প্রজ্ঞার (বিচক্ষণতা) অধিকারী হওয়া, ৫. মানুষের কল্যাণকামী হওয়া, এবং ৬. সত্যের সাক্ষ্যদাতা বা ইসলামের মডেল হওয়া।
১. সৎ কাজ বা (নেক আমল)
আমল ছাড়া ঈমান অসম্পূর্ণ। ইমান ও আমল পরস্পর পরিপূরক - একটি ছাড়া অন্যটি অচল। সুতরাং কেউ যদি আল্লাহর পথে আহবান করে কিন্তু নিজে আমল না করে, আল্লাহর অবাধ্য হয়; তাহলে তার দাওয়াত মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে না এবং আল্লাহর কাছেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না; এবং সে দায়ীর মর্যাদাও পাবে না। বরং কথা ও কাজের এই গরমিল আল্লাহর নিকট খুবই অপছন্দনীয়। সূরা সফে আল্লাহ এই ধরনের কাজকে অত্যন্ত অপছন্দনীয় বলে উল্লেখ করেছেন।
ঈমান ও আমল বা বিশ্বাস ও কাজের মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রত্যেক মানুষের কাজকে নিয়ন্ত্রণ করে তার মন, তার বোধ ও বিশ্বাস, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তার ধারণা। মানুষ যে কাজই করুক না কেন; সে কাজ করার আগে তার মনে কাজটির প্রতি একটি আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছা তৈরি হয় এবং ভাল বা মন্দ যাই হোক না কেন সে কাজটি করার পক্ষে একটি মত বা যুক্তি খুঁজে পায় বা কাজটি সম্পাদন করাকে সে যুক্তিযুক্ত মনে করে। এভাবে সচেতনভাবে হোক কিংবা অবচেতন মন - মানুষের বোধ ও বিশ্বাস তার কাজের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। সুতরাং বলা যায়, মানুষের কাজ মূলত তার বিশ্বাসের প্রতিফলন। ঈমান ও আমলের ব্যাপারটিও এরকম। কেউ যদি সত্যি সত্যি আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করে, তাহলে সে অবশ্যই প্রতিটি কাজের পূর্বে আল্লাহকে স্মরণ রেখে এই অনুভূতি নিয়ে কাজ করবে যে আখেরাতে আল্লাহর কাছে তার এই কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু যার অন্তরে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি এই অনুভূতি থাকবে না আল্লাহ আল্লাহর স্মরণ অন্তরে থাকবে না সে কখনো ঈমানদার হতে পারে না বরং আল্লাহ তাকে ফাসেক বলে অভিহিত করেছেন। সুরা হাশরের শেষ রুকুতে ঈমানদারদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেছেন-
وَلَا تَكُونُواْ كَٱلَّذِينَ نَسُواْ ٱللَّهَ فَأَنسَـٰهُمْ أَنفُسَهُمْۚ أُوْلَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلْفَـٰسِقُونَ
“তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে। ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মভোলা বানিয়ে দিয়েছেন। এই লোকেরাই ফাসেক বাদুষ্কৃতকারী।”
২.পরিচয় গোপন না করা
পরিস্থিতি একটু প্রতিকূল হলেই দাওয়াত দিতে দ্বিধা করা কিংবা নিজের পরিচয় গোপন রাখা - এটা দুর্বল ঈমানের লক্ষণ আল্লাহ এটা পছন্দ করেন না। তিনি চান এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ঈমানদার ব্যক্তি বলিষ্ঠভাবে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে আল্লাহর পথে আহ্বান করে যাবে। আসলে এমন পরিস্থিতিতেও আল্লাহর দ্বীনের দিকে মানুষকে আহ্বান করা ঈমানের একটি পরীক্ষা। আল্লাহ দেখতে চান ঈমানের দাবিতে কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী। সূরা আন কাবুতে (২৯ : ২) আল্লাহ বলেছেন-
اَحَسِبَ النَّاسُ اَنۡ یُّتۡرَكُوۡۤا اَنۡ یَّقُوۡلُوۡۤا اٰمَنَّا وَ هُمۡ لَا یُفۡتَنُوۡنَ
“মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?”
আল্লাহর পথে আহ্বান বলতে কি বুঝায়:
সূরা মুদ্দাসসিরের প্রথম ৩টি আয়াতে মহানবী (সা.)-কে চাদরমুড়ি দেওয়া অবস্থা থেকে উঠে মানুষকে সতর্ক করার এবং আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে নবী করিম (সা.)-এর ওপর নবুয়তের দায়িত্ব অর্পিত হয়।
আল্লাহর রাসূলের দাওয়াত দানের পদ্ধতি:
আপ্যায়ন দাওয়াত
নবুয়তের চতুর্থ বছরে যখন আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন-"وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ"
"আর তুমি সতর্ক কর তোমার নিকটাত্মীয় স্বজনদের" (সূরা শুআরা: ২১৪)
তখন রাসূল (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে নির্দেশ দেন যেন তিনি বনু হাশিম ও অন্যান্য কোরাইশ বংশের নেতৃবৃন্দকে দাওয়াতের ব্যবস্থা করেন।
অতিথি:
আবু তালিব, আবু লাহাব, আব্বাস (রা.) ও হামজা (রা.)-সহ প্রায় ৪০-৪৫ জন গোত্রীয় নেতা।
খাবার: তাদের গোশত, রুটি ও দুধ দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।
রাসূল (সা.) যা বলেছিলেন-
খাবার গ্রহণের পর রাসূল (সা.) যখনই কথা বলতে উদ্যত হন, আবু লাহাব বা অন্য কেউ কথা ঘুরিয়ে দেয়, ফলে প্রথম দিন দাওয়াতটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়নি। পরবর্তীতে রাসূল (সা.) পুনরায় তাদের ডাকেন এবং বলেন:
"হে আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানগণ! আমি তোমাদের কাছে এমন এক দ্বীন নিয়ে এসেছি, যা মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণকর। আজ পর্যন্ত কোনো আরব যুবক তার কওমের কাছে এর চেয়ে উত্তম কিছু আনেনি। আমি তোমাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের সর্বোত্তম কল্যাণ নিয়ে এসেছি"।
এরপর তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বলেন:
"তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না"।
"আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের সতর্ককারী হিসেবে প্রেরিত হয়েছি"।
সাহায্যের আহ্বান:
"তোমাদের মধ্যে কে আমার এই কাজে সাহায্য করবে? কে আমার ভাই, অছি ও খলিফা (প্রতিনিধি) হতে চাও?"।
উতবা ইবনে রাবিয়ার বিখ্যাত ঘটনা
কুরাইশ নেতা Utbah ibn Rabi'ah
উত্তরে রাসূল কোনো তর্ক না করে বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা ফুসসিলাত তিলাওয়াত শুরু করেন। সিজদার আয়াত পর্যন্ত পৌঁছে এবং আদ-সামুদের আযাবের সতর্কবাণী শুনে উতবা ভীত হয়ে মুখে হাত চাপা দেয়।
ফিরে গিয়ে সে কুরাইশদের বলে, "আল্লাহর কসম, এটা কবিতা নয়, যাদু নয়। তাকে তার কাজ করতে দাও।”
কুরাইশদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল (সা.) তাঁর সাহাবীদের হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করার অনুমতি দেন। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম হিজরত, যা দাওয়াতের প্রচার ও সুরক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, যা মানব জীবনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক—সর্বক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যেন জীবনের কোনো অংশই ইসলামের মূলনীতি বা বিধানের বাইরে না থাকে।
মক্কায় দাওয়াতের তিনটি পর্যায়
১. গোপন দাওয়াত (১ম-৩য় বছর): নিকটাত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে। কেন্দ্র ছিল দারুল আরকাম।
২. প্রকাশ্য দাওয়াত (৪র্থ-১০ম বছর): সূরা শুআরার ২১৪ আয়াত নাজিলের পর Muhammad সাফা পাহাড়ে উঠে প্রকাশ্যে ডাক দেন। এরপর কুরাইশদের নির্যাতন, সামাজিক বয়কট এবং
৫ম বছরে হাবশায় প্রথম হিজরত হয়।
৩. মক্কার বাইরে দাওয়াত (১০ম-১৩শ বছর): হজের মৌসুমে আগত গোত্রগুলোর কাছে দাওয়াত, তায়েফ সফর এবং আকাবার বাইআতের মাধ্যমে মদীনায় হিজরতের প্রস্তুতি।
প্রকাশ্য দাওয়াত বা ইসলামের বাণী প্রকাশ্যে প্রচার করার নির্দেশ আসার পর, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তার নিকটাত্মীয় ও কোরাইশ বংশের নেতাদের দাওয়াত দিয়েছিলেন। একে ইসলামী ইতিহাসে "দাওয়াতে যুল-আশিরাহ" (নিকটাত্মীয়দের দাওয়াত) বলা হয়।
দারুল আরকাম - প্রথম মাদ্রাসা
মালিক: সাহাবী Arqam ibn Abi Arqam
অবস্থান: সাফা পর্বতের পাদদেশে
ব্যবহার: গোপন দাওয়াতের তিন বছরে কুরআন শিক্ষা, তারবিয়াত ও সালাতের প্রশিক্ষণ
বর্তমান: মসজিদুল হারামের সম্প্রসারণে অন্তর্ভুক্ত
কুরাইশদের বিরোধিতার পদ্ধতি
লেখায় বলা হয়েছে, আল্লাহ তাদের ব্যক্তিগত আক্রমণের জবাব দেননি, বরং তাদের কৌশল তুলে ধরেছেন:
কান বন্ধ করে রাখা ও মনের উপর পর্দা দেওয়া
কুরআন তিলাওয়াতের সময় হট্টগোল করা
আয়াতের অর্থ বিকৃত করে বিভ্রান্তি ছড়ানো
আপত্তি তোলা যে আরবী ভাষায় নাজিল হওয়ায় এতে কোনো মুজিযা নেই
দাওয়াত ইলাল্লাহর সংজ্ঞা
লেখার শেষাংশে বলা হয়েছে, আল্লাহর দিকে ডাকার অর্থ:
তাওহীদের প্রচার
শিরক ও পাপ থেকে মুক্ত করা
সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ
সুন্নাহর অনুসরণ ও বিদআত বর্জন
এবং আল্লাহই একমাত্র নিঃস্বার্থ আপনজন, যিনি বান্দার শাহরগের চেয়েও কাছে থাকেন, তওবা কবুল করেন এবং রিজিক দেন।
সংক্ষেপে শিক্ষা
আয়াতটি দেখায়, শ্রেষ্ঠ কথা শুধু মুখের দাওয়াত নয়, এটি ঈমান, আমল ও পরিচয়ের সমন্বয়। মক্কার ১৩ বছরের ধৈর্য, দারুল আরকামের গোপন প্রশিক্ষণ এবং প্রকাশ্য বিরোধিতার মোকাবিলা, সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল এই তিনটি গুণ।
মক্কায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াতী জীবনের দাওয়াতী কার্যক্রমকে প্রধানত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। এই পর্যায়গুলো হলো:
১. গোপন দাওয়াতের পর্যায় (নবুওয়াতের ১ম থেকে ৩য় বছর):
সময়কাল: নবুওয়াত প্রাপ্তির পর প্রথম তিন বছর।
পদ্ধতি: রাসূল (সা.) ইসলামের দাওয়াত অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে নিজের আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মাঝে প্রচার করতেন।
ফলাফল: এই সময়ে হযরত খাদিজা (রা.), হযরত আবু বকর (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা.)-সহ প্রথম সারির কয়েকজন সাহাবী ইসলাম গ্রহণ করেন।
২. প্রকাশ্য দাওয়াতের পর্যায় (নবুওয়াতের ৪র্থ থেকে ১০ম বছর):
উপস্থিত নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া
আবু লাহাবের বিরোধিতা: আবু লাহাব কঠোর ভাষায় এর বিরোধিতা করে এবং অনুষ্ঠানটি ভণ্ডুল করার চেষ্টা করে।
আলী (রা.)-এর সমর্থন: সমস্ত কুরাইশ নেতা নীরব থাকলেও কিশোর আলী (রা.) দাঁড়িয়ে রাসূল (সা.)-এর প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।
আবু তালিবের ভূমিকা:
রাসূল (সা.)-এর চাচা আবু তালিব তাকে ইসলাম গ্রহণ না করলেও, তাকে রক্ষা করার ও দাওয়াত চালিয়ে যাওয়ার নিরাপত্তা দেন।
২. জনসাধারণের মধ্যে প্রকাশ্য দাওয়াত:
সাফা পাহাড়ের ঘটনার পর তিনি মক্কার সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেন। তিনি বিভিন্ন গোত্রের লোকদের কাছে গিয়ে এবং হজের মওসুমে মক্কায় আগত হাজীদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করতেন।
৩. কোরাইশদের বিরোধিতা ও নির্যাতন: প্রকাশ্য দাওয়াত শুরু করার পর কুরাইশরা রাসূল (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করে। তারা ইসলাম প্রচার বন্ধ করার জন্য নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে।
হাবশায় হিজরত (নবুয়তের ৫ম বছর)
কুরাইশদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল (সা.) তাঁর সাহাবীদের হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করার অনুমতি দেন। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম হিজরত, যা দাওয়াতের প্রচার ও সুরক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
প্রশিক্ষণ
মক্কায় গোপনে ইসলাম প্রচার ও সাহাবীদের প্রশিক্ষণের জন্য আল্লাহর রাসূল (সা.) যে বাড়িটি ব্যবহার করতেন, তার নাম দারুল আরকাম বা দার আল-আরকাম (আর্কামের বাড়ি)।
মক্কায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রকাশ্য দাওয়াতের পর্যায়গুলো ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও কৌশলপূর্ণ। নবুয়তের চতুর্থ বছর থেকে হিজরত পর্যন্ত এই দাওয়াত কার্যক্রমের কয়েকটি প্রধান পর্যায় লক্ষ্য করা যায়:
১. নিকটাত্মীয়দের মধ্যে দাওয়াত (নবুয়তের ৪র্থ বছর): আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে "আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন" (সূরা আশ-শুআরা: ২১৪) আয়াত নাজিল হলে রাসূল (সা.) প্রকাশ্য দাওয়াতের সূচনা করেন।
আল্লাহর দিকে আহ্বান বা 'দাওয়াত ইলাল্লাহ' বলতে মানুষকে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ইবাদত, তাঁর একত্ববাদ (তাওহীদ) এবং রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণের পথে ডাকাকে বোঝায়। এর মূল উদ্দেশ্য মানুষকে শির্ক ও পাপ থেকে মুক্ত করে দ্বীনের সঠিক পথে পরিচালিত করা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে উৎসাহিত করা।
আল্লাহর দিকে আহ্বানের মূল বিষয়সমূহ:
তাওহীদের প্রচার: আল্লাহ ছাড়া কারো উপাসনা বা আনুগত্য না করার দিকে মানুষকে আহ্বান জানানো।
সত্যের পথে আহ্বান: কাফির, মুশরিক ও ভ্রান্ত মতবাদের অনুসারীদের ইসলামের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা।
ইবাদতে উৎসাহ প্রদান: আল্লাহর রহমত ও জান্নাতের কথা স্মরণ করিয়ে আমল করতে উদ্বুদ্ধ করা এবং জাহান্নামের ভয় দেখিয়ে পাপ থেকে বিরত রাখা।
সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ: সমাজকে নীতি-নৈতিকতা ও ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে তোলার আহ্বান।
সুন্নাহর অনুসরণ: বিদ‘আত বা দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্ট কাজ বর্জন করে রাসূল (সা.)-এর দেখানো পথে চলার আহ্বান।
সংক্ষেপে, এটি একটি মহান দায়িত্ব যা নবী-রাসূলগণ পালন করেছেন এবং বর্তমানে মুসলিম উম্মাহর ওপর অর্পিত দায়িত্ব, যা মানুষকে তাদের স্রষ্টার সাথে সংযুক্ত করে।
মহান আল্লাহই একমাত্র সত্তা, যিনি নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন, প্রতিটি মুহূর্তে বান্দার খোঁজখবর রাখেন এবং বিপদে সবার আগে সহায় হন [০.৫.১, ০.৫.৭]। মানুষ বা আত্মীয়-স্বজন স্বার্থপর হতে পারে, কিন্তু আল্লাহ কখনো নিরাশ করেন না। তিনি মানুষের রগ (রগ)-এর চেয়েও বেশি কাছে থাকেন এবং অন্তরের খবরও জানেন [০.৫.১৩, ০.৫.১৪]।
আল্লাহর থেকে আপন হওয়ার মূল অর্থ হলো:
নিঃস্বার্থ ভালোবাসা: আল্লাহ কোনো প্রতিদান ছাড়াই বান্দাকে ভালোবাসেন এবং রক্ষণাবেক্ষণ করেন [০.৫.১]।
সবচেয়ে কাছের সত্তা: দুনিয়ার সবাই দূরে সরে গেলেও আল্লাহ সর্বাবস্থায়, বিশেষ করে একাকীত্বে সবচেয়ে কাছের ও বিশ্বস্ত বন্ধু [০.৫.৩]।
অফুরন্ত দয়া ও ক্ষমা: মানুষ ভুল করলে বিচার করে, কিন্তু আল্লাহ তওবা করলে ক্ষমার মাধ্যমে আপন করে নেন [০.৫.৭, ০.৫.৮]।
অভাব পূরণকারী: মানুষের রিজিক থেকে শুরু করে সব ধরনের প্রয়োজন পূরণ করেন একমাত্র আল্লাহ [০.৫.৮]।
সংক্ষেপে, মানুষের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা হিসেবে আল্লাহ তাআলাই একমাত্র প্রকৃত ও পরম আপনজন, যার ওপর শতভাগ ভরসা (তাওয়াক্কুল) করা যায় [০.৫.২, ০.৫.১৪]।
নামকরণ
দুটি শব্দের সমন্বয়ে এ সূরার নামকরণ করা হয়েছে। একটি শব্দ (হা-মীম) ও অপরটি (আস সাজদাহ) । অর্থাৎ এটি সেই সূরা যা শুরু হয়েছে হা-মীম শব্দ দিয়ে এবং যার মধ্যে এক স্থানে সিজদার আয়াত আছে।
নাযিল হওয়ার সময়-কাল :
নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েত অনুসারে এর নাযিল হওয়ার সময়কাল হচ্ছে হযরত হামযার (রা) ঈমান আনার পর এবং হযরত উমরের (রা) ঈমান আনার পূর্বে। নবী করিম (সাঃ) প্রাচীনতম জীবনীকার মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক বিখ্যাত তাবেয়ী মুহাম্মাদ ইবনে কা’ব আল-কারযীর বরাত দিয়ে এই কাহিনী উদ্ধুত করেছেন যে, একদিন কিছু সংখ্যক কুরাইশ নেতা মসজিদে হারামের মধ্যে আসর জমিয়ে বসেছিল এবং মসজিদের অন্য এক কোণে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একাকী বসেছিলেন। এটা এমন এক সময়ের ঘটনা যখন হযরত হামযা ঈমান এনেছিলেন এবং কুরাইশরা প্রতিনিয়ত মুসলমানদের সাংগঠনিক উন্নতি দেখে অস্থির হয়ে উঠছিলো ।
এই সময় ‘উতবা ইবনে রাবী’ আ (আবু সুফিয়ানের শ্বশুর ) কুরাইশ নেতাদের বললেন, ভাইসব, আপনারা যদি ভালো মনে করেন তাহলে আমি গিয়ে মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) সাথে আলাপ করতে এবং তাঁর কাছে কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করতে পারি। সে হয়তো তার কোনটি মেনে নিতে পারে এবং আমাদের কাছেও তা গ্রহণ যোগ্য হতে পারে। আর এভাবে সে আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করা থেকে বিরত থাকতে পারে। উপস্থিত সবাই তার সাথে একমত হলো এবং ‘উতবা উঠে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে বসলো। নবী (সা) তার দিকে ফিরে বসলে সে বললোঃ ভাতিজা, বংশ ও গোত্রের বিচারে তোমার কওমের মধ্যে তোমার যে মর্যাদা তা তুমি অবগত আছো। কিন্তু তুমি তোমার কওমকে এক মুসিবতের মধ্যে নিক্ষেপ করেছো। তুমি কওমের ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছো। গোটা কওমকে নির্বোধ প্রতিপন্ন করেছো। কওমের ধর্ম ও তাদের উপাস্যদের সমালোচনা করেছো এবং এমন কথা বলতে শুরু করেছো যার সারবস্তু হলো, আমাদের সকলের বাপ দাদা কাফের ছিল।
এখন আমরা কথা একটু মনোযোগ দিয়ে শোন। আমি তোমার কাছে কিছু প্রস্তাব রাখছি প্রস্তাবগুলো গভীরভাবে চিন্তা করে দেখো। “হয়তো তার কোনটি তুমি গ্রহন করতে পার।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ আবুল ওয়ালীদ, আপনি বলুন, আমি শুনবো। সে বললো : ভাতিজা , তুমি যে কাজ শুরু করেছো তা দিয়ে সম্পদ অর্জন যদি তোমার উদ্দেশ্য হয় তাহলে আমরা সবাই মিলে তোমাকে এতো সম্পদ দেব যে, তুমি আমাদের মধ্যে সবার চেয়ে সম্পদশালী হয়ে যাবে। এভাবে তুমি যদি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব কামনা করে থাকো তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের নেতা বানিয়ে নিচ্ছি, তোমাকে ছাড়া কোন বিয়য়ে ফায়সালা করবো না। যদি তুমি বাদশাহী চাও তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের বাদশাহ বানিয়ে নিচ্ছি। আর যদি তোমার ওপর কোন জিন প্রভাব বিস্তার করে থাকে যাকে তুমি নিজে তাড়াতে সক্ষম নও তাহলে আমরা ভালো ভালো চিকিৎসক ডেকে নিজের খরচে তোমার চিকিৎসা করিয়ে দেই। “উতবা এসব কথা বলছিলো আর নবী (সা) চুপচাপ তার কথা শুনছিলেন। অতপর তিনি বললেন : আবুল ওয়ালীদ, আপনি কি আপনার সব কথা বলেছেন ? সে বললো : হ্যাঁ ।
তিনি বললেন : তাহলে এখন আমার কথা শুনুন । এরপর তিনি “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে এই সূরা তিলাওয়াত করতে শুরু করলেন । উতবা তার দুই হাত পেছনের দিকে মাটিতে হেলার দিয়ে গভীর মনোযোগের সাথে শুনতে থাকলো। সিজদার আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করে তিনি সিজদা করলেন এবং মাথা তুলে বললেন : হে আবুল ওয়ালীদ, আমার জবাবও আপনি পেয়ে গেলেন। এখন যা ইচ্ছা করেন।” উতবা উঠে কুরাইশ নেতাদের আসরের দিকে অগ্রসর হলে লোকজন দূর থেকে তাকে দেখেই বললো : আল্লাহর শপথ ! ‘উতবার চেহারা পরিবর্তিত হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে । যে চেহারা নিয়ে সে গিয়েছিল এটা সেই চেহারা নয়। সে এসে বসলে লোকজন তাকে জিজ্ঞেস করলো: কি শুনে এলে সে বললো: “আল্লাহর কসম !
আমি এমন কথা শুনেছি যা এর আগে কখনো শুনিনি। আল্লাহর কসম! এটা না কবিতা, না যাদু, না গননা বিদ্যা। হে কুবাইশ নেতৃবৃন্দ, আমার কথা শোন এবং তাকে তার কাজ করতে দাও। আমার বিশ্বাস, এ বাণী সফল হবেই। মনে করো আরবের লোকেরা যদি তার বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করে তাহলে নিজের ভাইয়ের গায়ে হাত তোলা থেকে তোমরা রক্ষা পেয়ে যাবে এবং অন্যরাই তাকে পরাভূত করবে। পক্ষান্তরে সে যদি আরবদের বিরুদ্ধে বিজয় হয় তাহলে তার রাজত্ব তোমাদেরই রাজত্ব এবং তার সম্মান ও মর্যাদা তোমাদের সম্মান ও মর্যাদা হবে।” তার এই কথা শোনা মাত্র কুরাইশ নেতারা বলে উঠলো : “ওয়লীদের বাপ, শেষ পর্যন্ত তোমার ওপর তার যাদুর প্রভাব পড়লো” উতবা বললো : “আমি আমার মতামত তোমাদের সামনে পেশ করলাম। এখন তোমাদের যা ইচ্ছা করতে থাকো।” ( ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩১৩-৩১৪)
আরো কতিপয় মুহাদ্দিস বিভিন্ন সনদে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে তাতে শব্দগত কিছু মতপার্থক্য আছে । ঐ সব রেওয়ায়েতের কোন কোনটিতে এ কথাও আছে যে, নবী (সা) তিলাওয়াত করতে করতে যে সময়
আরবী :
………………………………………………………………………………
( এখন যদি এসব লোক মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে এদেরকে বলে দাও আমি তোমাদেরকে আদ ও সামূদ জাতির আযাবের মত অকস্মাত আগমনকারী আযাব সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছি।) আয়াতটি পড়লেন তখন উতবা আপনা থেকেই তার মুখের ওপর হাত চেপে ধরে বললো : “আল্লাহর ওয়াসে- নিজের কওমের প্রতি সদয় হও।” পরে সে কুরাইশ নেতাদের কাছে তার এ কাজের কারণ বর্ণনা করেছে, এই বলে যে, আপনারা জানেন, মুহাম্মাদের (সা) মুখ থেকে যে কথা বের হয় তা সত্যে পরিণত হয়। তাই আমি আমাদের ওপর আযাব নাযিল না হয় এই ভেবে আতংকিত হয়ে পড়েছিলাম। ( বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৪র্থ খন্ড,পৃষ্ঠা ৯০-৯১, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৬২)।
আলোচ্য বিষয় ও মূল বক্তব্য :
‘উতবার এই কথার জবাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে বক্তব্য নাযিল হয়েছে তাতে সে নবীকে (সা) যে অর্থহীন কথা বলেছে সেদিকে আদৌ দৃষ্টিপাত করা হয়নি। কারণ, সে যা বলেছিলো তা ছিল প্রকৃতপক্ষে নবীর (সা) নিয়ত ও জ্ঞান-বুদ্ধির ওপর হামলা। তার গোটা বক্তব্যের পেছনে এই অনুমান কাজ করছিল যে, তাঁর নবী হওয়া এবং কুরআনের অহী হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। তাই অনিবার্য রূপে তাঁর এই আন্দোলনের চালিকা শক্তি হয় ধন-সম্পদ এবং শাসন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব লাভের প্রেরনা, নয়তো তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধিই লোপ পেয়ে বসেছে (নাউযুবিল্লাহ)। প্রথম ক্ষেত্রে সে নবীর (সা) সাথে বিকিকিনির কারবার করতে চাচ্ছিলো।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সে এ কথা বলে নবীকে (সা) হেয় করছিলো যে, আমরা নিজের খরচে আপনার উম্মাদ রোগের চিকিৎসা করে দিচ্ছি।এ কথা সুস্পষ্ট যে, বিরোধীরা যখন এ ধরনের মূর্খতার আচরণ করতে থাকে তখন তাদের এ কাজের জবাব দেয়া শরিফ সম্ভ্রান্ত মানুষের কাজ হয় না। তার কাজ হয় তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে নিজের বক্তব্য তুলে ধরা।
কুরআনের দাওয়াতকে ব্যর্থ করার জন্য মক্কার কাফেরদের পক্ষ থেকে সে সময় চরম হঠকারিতা ও অসৎচরিত্রের মাধ্যমে যে বিরোধিতা করা হচ্ছিলো ‘উতবার বক্তাব্য উপেক্ষা করে এখানে সেই বিরোধিতাকে আলোচ্য বিষয় হিসেবে গ্রহন করা হয়েছে। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতো, আপনি যাই করেন না কেন আমরা আপনার কোন কথাই শুনবো না। আমরা আপনাদের মনের গায়ে চাদর ঢেকে দিয়েছি এবং কান বন্ধ করে দিয়েছি। আমাদের ও আপনার মাঝে একটি প্রাচীর আড়াল করে দাড়িয়েছে, যা আপনাকে ও আমাদের কখনো এক হতে দেবে না।
তারা তাঁকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলো, আপনি আপনার দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যান, আপনার বিরোধিতায় আমাদের পক্ষে সম্ভবপর সবই আমরা করবো।
তারা নবীকে (সা) পরাস্ত করার উদ্দেশ্যে যে কর্মসূচী তৈরি করেছিলো তা হচ্ছে, যখনই তিনি কিংবা তাঁর অনুসারীদের কেউ সর্বসাধারণকে কুরআন শুনানোর চেষ্টা করবেন তখনই হৈ চৈ ও হট্টগোল সৃষ্টি করতে হবে এবং এতো শোরগোল করতে হবে যাতে কানে যেন কোন কথা প্রবেশ না করে।
কুরআন মাজীদের আয়াত সমূহের উল্টা পাল্টা অর্থ করে জনসাধারণের মধ্যে নানা রকম বিভ্রান্তি ছড়ানোর কাজ করা পূর্ণ তৎপরতার সাথে চালিয়ে যাচ্ছিলো। কোন কথা বলা হলে তারা তাকে ভিন্ন রূপ দিতো। সরল সোজা কথার বাঁকা অর্থ করতো। পূর্বাপর প্রসংগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক স্থানের একটি শব্দ এবং আরেক স্থানের একটি বাক্যাংশ নিয়ে তার সাথে নিজের পক্ষ থেকে আরো অধিক কথা যুক্ত করে নতুন নতুন বিষয়বস্তু তৈরী করতো যাতে কুরআন ও তার উপস্থাপনকারী রাসূল সম্পর্কে মতামত খারাপ করা যায়।
অদ্ভুত ধরনের আপত্তিসমূহ উত্থাপন করতো যার একটি উদাহরণ এ সূরায় পেশ করা হয়েছে। তারা বলতো, আরবী ভাষাভাষী একজন মানুষ যদি আরবী ভাষায় কোন কথা শোনায় তাতে মুজিযার কি থাকতে পারে? আরবী তো তার মাতৃভাষা । যে কেউ ইচ্ছা করলে তার মাতৃভাষায় একটি বাণী রচনা করে ঘোষণা করতে পারে যে, সেই বাণী তার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে। মুজিযা বলা যেতো কেবল তখনই যখন হঠাৎ কোন ব্যক্তি তার অজানা কোন ভাষায় একটি বিশুদ্ধ উন্নত সাহিত্য রস সমৃদ্ধ বক্তৃতা শুরু করে দিতো। তখনই বুঝা যেতো, এটা তার নিজের কথা নয়, বরং তা ওপরে কোথাও থেকে তার ওপর নাযিল হচ্ছে।
# মূল আলোচ্য বিষয় ও শিক্ষণীয় দিক:
১. আল্লাহর দিকে দাওয়াত: উত্তম কথা হলো সেই কথা, যা মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের দিকে আহ্বান করে। এটিই শ্রেষ্ঠ দাওয়াত [০.৫.১]।
২. সৎকর্ম (আমলে সালিহ): শুধু মুখে দাওয়াত দেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং দাওয়াতকারীকে নিজের জীবনেও সৎকর্ম ও ইসলামের বিধান বাস্তবায়ন করতে হবে [০.৫.১, ০.৫.৬]।
৩. মুসলিম হিসেবে ঘোষণা (আত্মসমর্পণ): আমি আল্লাহর অনুগত বান্দা—এ কথা গর্বের সাথে ঘোষণা করা এবং অহংকার বর্জন করে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা [০.৫.২]।
৪. ঈমান ও কাজের সমন্বয়: এই আয়াতে ঈমানের দাওয়াত এবং কাজের যোগ্যতার এক অপূর্ব সমন্বয় করা হয়েছে। দাওয়াত ও আমল—দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ [০.৫.৪]।
৫. মুমিনদের উৎসাহ: পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে মুমিনদের সান্ত্বনা দেওয়ার পর, এই আয়াতে তাদের আসল কাজের প্রতি অর্থাৎ দ্বীনের দাওয়াত ও সৎকাজের দিকে উৎসাহিত করা হয়েছে [০.৫.২]।
সংক্ষেপে, এই আয়াতটি একজন আদর্শ দাওয়াতকারীর বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে, যিনি নিজের কাজের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার করেন এবং নিজেকে আল্লাহর আজ্ঞাবহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন