শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬

কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতি

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন কোয়ান্টাম প্রযুক্তি বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন রণক্ষেত্র, যেখানে ইরান বেশ নিঃশব্দে কিন্তু দ্রুতগতিতে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করছে। কোয়ান্টাম প্রযুক্তি কী সহজ ভাষায়- কোয়ান্টাম প্রযুক্তি হলো ২০শ শতকের কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তিনটি অদ্ভুত নিয়মকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যবহার করা: সুপারপজিশন: একটি কণা একই সময়ে 0 এবং 1 দুই অবস্থাতেই থাকতে পারে। ক্লাসিক্যাল বিটের বদলে "কিউবিট" এ তথ্য রাখলে সমান্তরাল গণনা বহুগুণ বাড়ে। এনট্যাঙ্গলমেন্ট: দুটি ফোটন হাজার কিলোমিটার দূরে থাকলেও একটিকে মাপলে অন্যটি তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া দেখায়। এটি হ্যাক-প্রুফ যোগাযোগের ভিত্তি। টানেলিং ও পরিমাপ: অতি সূক্ষ্ম সেন্সরে পরমাণুর কম্পন মেপে সময়, গতি, চৌম্বক ক্ষেত্র ন্যানো-স্কেলে ধরা যায়। ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (AEOI) উপপ্রধান ড. জাভাদ করিমি সাবেতের ভাষায়, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি মূলত পাঁচ শাখায় ভাগ হয়: কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও পরিমাপ, কোয়ান্টাম তথ্য ও যোগাযোগ, সিমুলেশন, সেন্সর এবং জৈব-প্রযুক্তি। তিনি আরও বলেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটার "সাধারণ কম্পিউটারের চেয়ে অনেক বেশি গতিতে পরিমাপ" করতে পারবে, যা ওষুধ, উপাদান বিজ্ঞান এবং "যোগাযোগ নিরাপত্তার মাত্রা" বাড়াবে। ১. কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে টিকে থাকতে এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে নিজেদের সামরিক ও সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ইরান কোয়ান্টাম গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নিচে ইরানের কোয়ান্টাম প্রযুক্তির অগ্রগতি, বিশেষ করে সাইবার নিরাপত্তা, সামরিক ব্যবহার এবং এতে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। ইরানের কোয়ান্টাম যাত্রা: ২০০০ থেকে ২০২৬ ১). প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ২০০০ সাল থেকে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা পড়ানো শুরু হয়। ইরানের কোয়ান্টাম গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ইরান পরমাণু শক্তি সংস্থা (AEOI)। তারা ২০১১ সালে তাদের "জাতীয় ব্যাপক বৈজ্ঞানিক রোডম্যাপ" তৈরি করে, যেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং সেন্সর প্রযুক্তিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে "কোয়ান্টাম প্রযুক্তি উন্নয়ন দলিল" তৈরি হয়, যার আওতায় উন্নত ল্যাব, কৌশলগত প্রকল্প এবং বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ বাস্তবায়িত হয়। ২) প্রাথমিক সাফল্য ও ধাক্কা AEOI দাবি করে তারা "উন্মুক্ত স্থানে এনট্যাঙ্গলড ফোটন ও কোয়ান্টাম কোডিং" অর্জন করেছে, এবং ফাইবারে কোয়ান্টাম কোডিং, কোয়ান্টাম নেভিগেশন, রাডার, মেট্রোলজি, অ্যাটমিক ক্লক নিয়ে কাজ চলছে। ২০২৩ সালে বড় ধাক্কা আসে। ইমাম খোমেনি বিশ্ববিদ্যালয় একটি "কোয়ান্টাম প্রসেসর" প্রদর্শন করে, পরে স্বীকার করে এটি আসলে ৬০০ ডলারের ZedBoard Zynq-7000 FPGA বোর্ড, যার কোনো কোয়ান্টাম ক্ষমতা নেই। এই ঘটনা ইরানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে, কিন্তু গবেষণা থামায়নি। ৩) ২০২৫-এর জাতীয় অগ্রগতি ৩০ অক্টোবর ২০২৫, ভাইস-প্রেসিডেন্ট হোসেইন আফশিন ঘোষণা দেন: ইরান তার প্রথম জাতীয় কোয়ান্টাম কমিউনিকেশন ল্যাবরেটরি এবং অ্যাটমিক ক্লক ল্যাবরেটরি স্থাপন করবে। সরকার বৈজ্ঞানিক ভাইস-প্রেসিডেন্সি থেকে ৫৫% অর্থায়ন করবে, বাকিটা ICT রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যৌথভাবে। ল্যাবকে "অতি-সুরক্ষিত যোগাযোগের জাতীয় রেফারেন্স সেন্টার" হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যা এনট্যাঙ্গলমেন্ট ও সুপারপজিশনের মাধ্যমে হ্যাক-প্রতিরোধী নেটওয়ার্ক তৈরি করবে। আফশিন বলেন, এটি ইরানকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে "বিশ্ব কোয়ান্টাম প্রতিযোগিতায়" রাখবে। ২০২৬ সালের মধ্যে ইরান তাদের প্রথম জাতীয় কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক চালুর ঘোষণা দেয় এবং একই সময়ের মধ্যে একটি কার্যকরী কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রদর্শনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে। ইরানের এই অগ্রগতির তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলো: কোয়ান্টাম কী ডিস্ট্রিবিউশন (QKD): নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত করা। কোয়ান্টাম সেন্সর: রাডার ও নেভিগেশন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং: জটিল তথ্য বিশ্লেষণ ও এনক্রিপশন ভাঙা। ২. সাইবার নিরাপত্তায় ইরানের কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ব্যবহার ইরানের জন্য সাইবার নিরাপত্তা একটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। স্টাক্সনেট (Stuxnet) হামলার পর থেকে ইরান বুঝতে পেরেছে যে প্রচলিত এনক্রিপশন পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ নয়। ক) কোয়ান্টাম কী ডিস্ট্রিবিউশন (QKD) এনট্যাঙ্গলড ফোটন দিয়ে তৈরি কী যদি কেউ শোনে, কোয়ান্টাম অবস্থা ভেঙে যায়, তাই প্রেরক তাৎক্ষণিক বুঝতে পারে। ইরান চায় পারমাণবিক স্থাপনা, ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক, রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ড লিঙ্কে এই প্রযুক্তি বসাতে। ইরান সাফল্যের সাথে QKD পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। ২০২০ সালে তারা ৩০০ মিটার দূরত্বে এবং পরবর্তীতে তেহরানের বিখ্যাত মিলাদ টাওয়ার ও আজাদি টাওয়ারের মধ্যে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরত্বে কোয়ান্টাম এনক্রিপ্টেড ডাটা পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। এটি এমন এক যোগাযোগ ব্যবস্থা যেখানে তথ্য হ্যাক করার চেষ্টা করলেই ফোটন বা আলোর কণাগুলোর অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যায়, যা প্রেরক ও প্রাপককে সাথে সাথে সতর্ক করে দেয়। খ) সুরক্ষিত ডাটা নেটওয়ার্ক ইরান ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তাদের প্রথম জাতীয় কোয়ান্টাম যোগাযোগ ল্যাবরেটরি উদ্বোধন করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান, সামরিক কমান্ড সেন্টার এবং পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে এমন এক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করা যা প্রচলিত কোনো সুপারকম্পিউটার বা হ্যাকিং টুল দিয়ে ভাঙা সম্ভব নয়। করিমি সাবেত সতর্ক করেন, "নিকট ভবিষ্যতে যেসব দেশের এই প্রযুক্তি নেই, তারা গুরুত্বপূর্ণ ডেটা স্থানান্তরে বিপদের মুখে পড়বে"। ইরান জানে, একদিন শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার RSA-2048 ভাঙতে পারবে, তাই এখন থেকেই কোয়ান্টাম-নিরাপদ চ্যানেল দরকার। ল্যাবের লক্ষ্য এক বছরের মধ্যে চালু হওয়া, যা ইঙ্গিত দেয় ইরান প্রথমে মেট্রো-স্কেল ফাইবার QKD (তেহরান-ইসফাহান) পরীক্ষা করবে, পরে স্যাটেলাইট লিঙ্কে যাবে। বাস্তবে ইরানের সক্ষমতা এখনও প্রাথমিক। কিন্তু সরকার এটিকে "জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের" সঙ্গে যুক্ত করছে। ৩. ইরানের সামরিক সক্ষমতায় কোয়ান্টাম প্রযুক্তির প্রয়োগ ইরানি সামরিক বাহিনী তাদের ড্রোন, মিসাইল এবং সাবমেরিন প্রযুক্তিতে কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটাচ্ছে। কোয়ান্টাম রাডার ও স্টিলথ প্রযুক্তি প্রচলিত রাডার ব্যবস্থা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ ব্যবহার করে, যা আধুনিক স্টিলথ (যেমন আমেরিকার F-35) বিমান শনাক্ত করতে হিমশিম খায়। কিন্তু ইরান কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট (Quantum Entanglement) ভিত্তিক সেন্সর নিয়ে কাজ করছে। তাত্ত্বিকভাবে, কোয়ান্টাম রাডার ব্যবহার করে অত্যন্ত সূক্ষ্ম সিগন্যাল শনাক্ত করা সম্ভব, যা স্টিলথ বিমান বা সাবমেরিনের উপস্থিতি ধরে ফেলতে পারে। AEOI-এর তালিকায় "কোয়ান্টাম রাডার, মেট্রোলজি" স্পষ্টভাবে আছে। এনট্যাঙ্গলড ফোটন ব্যবহার করে স্টেলথ বিমানের ক্ষীণ প্রতিফলন শনাক্ত করা যায়। জিপিএস-মুক্ত নেভিগেশন বা কোয়ান্টাম সেন্সিং ও অ্যাটমিক ক্লক: অ্যাটমিক ক্লক স্যাটেলাইট নেভিগেশন, ক্ষেপণাস্ত্র গাইডেন্স ও যোগাযোগ সিঙ্ক্রোনাইজেশনে অতি-সুনির্দিষ্ট সময় দেয়। GPS জ্যাম হলে ইরান নিজস্ব সময়-ভিত্তিক নেভিগেশন চায়। যুদ্ধক্ষেত্রে জিপিএস জ্যামিং বা স্পুফিং একটি সাধারণ ঘটনা। ইরান “কোয়ান্টাম গ্র্যাভিমিটার” এবং “অ্যাটমিক ক্লক” নিয়ে গবেষণা করছে। এই প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করে ড্রোন বা মিসাইল কোনো জিপিএস সিগন্যাল ছাড়াই পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্র মেপে নিজের অবস্থান নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করতে পারে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইরান একটি অত্যন্ত নির্ভুল 'অ্যাটমিক ক্লক ল্যাব' স্থাপন করেছে, যা তাদের লং-রেঞ্জ মিসাইল গাইডেড সিস্টেমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোয়ান্টাম সিমুলেশন: নতুন বিস্ফোরক, উপাদান বা ওষুধের মডেলিং ক্লাসিক্যাল সুপারকম্পিউটারে কঠিন। কোয়ান্টাম সিমুলেটর দিয়ে ইরান পারমাণবিক উপাদান বিজ্ঞান দ্রুত করতে চায়। এই সামরিক আগ্রহ AEOI-এর নেতৃত্বে হওয়ায় পশ্চিমা পর্যবেক্ষকরা একে দ্বৈত-ব্যবহার (dual-use) হিসেবে দেখেন। ৪. চীন ও রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহায়তা ইরানের এই দ্রুত অগ্রগতি তাদের একক প্রচেষ্টার ফল নয়, বরং চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত অংশীদারিত্বের বড় ভূমিকা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্রায়োজেনিক ডাইলিউশন রেফ্রিজারেটর, সিঙ্গেল-ফোটন ডিটেক্টর বা উচ্চ-বিশুদ্ধ ফাইবার পাওয়া কঠিন ছিল । এখানে "Look East" নীতি কাজ করে। পশ্চিম থেকে বিচ্ছিন্ন এই তিনটি দেশ একটি "প্রযুক্তিগত জোট" গঠন করেছে। ক) চীনের ভূমিকা চীন বর্তমানে কোয়ান্টাম কমিউনিকেশনে বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা (তাদের 'মিসিয়াস' স্যাটেলাইট এর প্রমাণ)। ইরান ও চীনের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদী যে কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার একটি বড় অংশ হলো উন্নত প্রযুক্তির বিনিময়। ২৫ বছরের সহযোগিতা চুক্তির আওতায় চীন ইরানকে BeiDou-3 নেভিগেশনে স্থানান্তর করতে সাহায্য করেছে, যা GPS-এর বদলে জ্যাম-প্রতিরোধী সেন্টিমিটার-স্তরের নির্ভুলতা দেয়। চীন ৫০০+ স্যাটেলাইট দিয়ে SIGINT ও রিয়েল-টাইম ম্যাপিং সরবরাহ করে, যা ইরানকে পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌ চলাচল ট্র্যাক করার সুযোগ দেয়। কোয়ান্টামে চীন বিশ্বনেতা: বেইজিং-সাংহাই ১,২৬৩ মাইল QKD লিঙ্ক এবং Micius স্যাটেলাইট ২০১৯ সালেই সফল হয়েছে। চীনা গবেষকরা ইরানি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ, ফোটন সোর্স ও QKD প্রোটোকল হস্তান্তর করছে বলে ASPI ট্র্যাকার উল্লেখ করে — "সীমিত কিন্তু কৌশলগত দ্বৈত-ব্যবহার সহযোগিতা।" এছাড়া YLC-8B অ্যান্টি-স্টেলথ UHF রাডার সরবরাহ করা হয়েছে, যা কোয়ান্টাম রাডার গবেষণার ভিত্তি হতে পারে। খ) রাশিয়ার ভূমিকা: হার্ডওয়্যার অ্যাঙ্কর মস্কো-তেহরান ২০ বছরের চুক্তির পর রাশিয়া ইরানকে "প্রযুক্তিগত অ্যাঙ্কর" হিসেবে সমর্থন দিচ্ছে, সরাসরি যুদ্ধ নয়, প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে। রাশিয়া মূলত ইরানের কোয়ান্টাম সক্ষমতাকে সাইবার যুদ্ধে প্রয়োগ করতে সহায়তা করছে। ক্রিপ্টোগ্রাফি: রুশ বিজ্ঞানীরা ইরানি বিশেষজ্ঞদের সাথে মিলে এমন কিছু এনক্রিপশন মেথড তৈরি করছেন যা 'কোয়ান্টাম রেসিস্ট্যান্ট'। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে যখন শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার আসবে, তখনও যেন ইরানের প্রতিরক্ষা কোড সুরক্ষিত থাকে। মহাকাশ প্রযুক্তি: রাশিয়ার রকেট প্রযুক্তির সহায়তায় ইরান তাদের কোয়ান্টাম সেন্সর ও QKD সিস্টেমকে স্যাটেলাইটে স্থাপন করার পরিকল্পনা করছে। এটি সফল হলে ইরান মহাকাশ থেকে সুরক্ষিত বৈশ্বিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতে পারবে। সরঞ্জাম: Khayyam স্পাই স্যাটেলাইট (১.২ মিটার রেজোলিউশন), S-400 এয়ার ডিফেন্স, Su-35 যুদ্ধবিমান, এবং Rezonans-NE ওভার-দ্য-হরাইজন রাডার। রাশিয়ার নিজস্ব কোয়ান্টাম প্রোগ্রাম (Rosatom) ইরানি বিজ্ঞানীদের ক্রায়োজেনিক ও ভ্যাকুয়াম প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ২০২৫-এর "১২ দিনের যুদ্ধ" পর এই সহযোগিতা ত্বরান্বিত হয়। কেন তারা সাহায্য করে? SpecialEurasia-এর ২০২৬ রিপোর্ট বলে, রাশিয়া ও চীন ইরানকে INSTC ও Belt and Road-এর "ভূ-কৌশলগত গভীরতা" হিসেবে দেখে। ইরান ভেঙে পড়লে তাদের শক্তি করিডোর ধ্বংস হবে। তাই তারা ইরানকে এমন প্রযুক্তি দিচ্ছে যা পশ্চিমা স্টেলথ ও জ্যামিংকে নিরপেক্ষ করে। তবে সহায়তা বিনামূল্যে নয়। চীন কম দামে তেল পায়, রাশিয়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি পায়। ইরানও ঝুঁকি নেয় — চীনা BeiDou বা রাশিয়ান স্যাটেলাইটে ব্যাকডোর থাকতে পারে। ৫. ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ইরানের এই অগ্রযাত্রা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। নিষেধাজ্ঞার অকার্যকারিতা: কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হওয়া মানে হলো পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আর সহজেই ইরানের তথ্য চুরি করতে পারবে না। আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব: মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় ইরান যদি আগে কোয়ান্টাম রাডার মোতায়েন করতে পারে, তবে পারস্য উপসাগরে বিদেশি নৌবহরের চলাচল কঠিন হয়ে পড়বে। চ্যালেঞ্জসমূহ: ১. মেধা পাচার (Brain Drain): অনেক মেধাবী ইরানি বিজ্ঞানী উন্নত সুযোগের আশায় বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ২. হার্ডওয়্যার সংকট: ল্যাবরেটরি পর্যায়ের বাইরে শিল্পভিত্তিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় হাই-এন্ড সরঞ্জাম তৈরিতে ইরান এখনো কিছুটা পিছিয়ে।নিষেধাজ্ঞার কারণে সুপারকন্ডাক্টিং কিউবিটের জন্য প্রয়োজনীয় dilution refrigerator আমদানি প্রায় অসম্ভব। মানবসম্পদ: ইরানে প্রায় ২০০-৩০০ জন কোয়ান্টাম পিএইচডি আছে, চীনে ৩,০০০+। বিশ্বাসযোগ্যতা: ২০২৩ সালের ভুয়া প্রসেসর কেলেঙ্কারি এখনও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বাধা। উপসংহার ইরানের কোয়ান্টাম অগ্রগতি কেবল বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়, এটি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঢাল। চীন ও রাশিয়ার সাথে ত্রিমুখী এই সহযোগিতার ফলে ইরান এমন এক স্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে যেখানে তারা পশ্চিমা প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে পারে। তাই কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ইরানের জন্য শুধু বিজ্ঞান নয়, এটি টিকে থাকার হাতিয়ার। সাইবারে হ্যাক-প্রুফ যোগাযোগ, সামরিকে GPS-বিহীন নেভিগেশন ও স্টেলথ-বিরোধী সেন্সর — এই তিনটি লক্ষ্য তেহরানকে চীন ও রাশিয়ার দিকে ঠেলেছে। বেইজিং দেয় স্যাটেলাইট, QKD জ্ঞান ও নেভিগেশন; মস্কো দেয় রাডার, স্যাটেলাইট ইমেজ ও প্রতিরক্ষা স্তর। বিনিময়ে তারা পায় মধ্যপ্রাচ্যে একটি নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি-ঘাঁটি। ইরান এখনও কোয়ান্টাম সুপারপাওয়ার নয়, কিন্তু ২০২৫ সালের জাতীয় ল্যাব, AEOI-এর রোডম্যাপ এবং পূর্বমুখী প্রযুক্তি প্রবাহ মিলে দেশটিকে আঞ্চলিক কোয়ান্টাম খেলোয়াড়ে পরিণত করছে — এমন এক খেলোয়াড় যার অগ্রগতি মূলত নিজের ল্যাবের চেয়ে বেইজিং ও মস্কোর ল্যাব থেকে আসা যন্ত্রাংশ ও জ্ঞানের উপর দাঁড়িয়ে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন