শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬
আকাশের কত রূপ!
স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শুরুর আগ থেকেই দেশের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বখতিয়ারের মনটা আনচান করছিল। সময় যেন আর কাটতেই চায় না। নচ্ছার পরীক্ষাটা কবে শেষ হবে আর কবে সে দাদীর কাছে যেতে পারবে, এই অস্থিরতার যেন শেষ নেই। আলীর অবস্থাও প্রায় একই। দাদী আর তুপ্পির জন্য তার ছোট্ট মনটাও কেমন যেন আকুলি-বিকুলি করে। সে বারবার আব্বুকে জিজ্ঞেস করে, “আব্বু, আমরা কবে দেশে যাব?”
আব্বু যতই বলেন, “এই তো বাবা, পরীক্ষাটা আগে শেষ করো, তারপরই আমরা দেশে যাব”, ততই যেন তার ছেলেমানুষি অস্থিরতা বেড়ে যায়। দাদীর জন্য আর বিশেষ করে তুপ্পির জন্য দুই ভাইয়ের মনই কেবল ছটফট করে।
এখানে বলে রাখা ভালো, আলী-বখতিয়ারের ‘তুপ্পি’ মানে তাদের ফুপু। ছোটবেলায় বখতিয়ার তার ফুপুকে ‘তুপ্পি’ বলে ডাকত। পরে তার দেখাদেখি আলীও সেই ডাক শুরু করে। এখন তারা অনেকটাই বড় হয়েছে, কিন্তু সেই আদুরে ডাকটি আর বদলাতে রাজি নয়। তাদের কাছে ‘তুপ্পি’ ডাকটাই সবচেয়ে আপন। আর তাদের ফুপু সায়মাও এই ডাক শুনে ভীষণ খুশি হন। ছোট্ট ভাইপোদের কচি মুখের সেই স্মৃতিমাখা ডাকটি তিনি ধরে রাখতে চান। তাই কেউ তাদের সংশোধন করতে গেলে তিনিও আপত্তি করেন।
শহরের বৈচিত্র্যহীন নাগরিক জীবনে বন্দী থাকতে থাকতে বড়রাই হাঁপিয়ে ওঠে, সেখানে ওরা তো ছোট মানুষ! গ্রামের মেঠোপথ, খোলা মাঠ, প্রাণভরে দৌড়ঝাঁপ আর সতেজ বাতাসে নিশ্বাস নেওয়ার জন্য স্কুল বন্ধের এই সময়টাতে তারা অস্থির হয়ে ওঠে। তাই বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই তিন ভাইয়ের চলছিল বাড়ি যাওয়ার হিসাব-নিকাশ। পারলে যেন তখনই উড়াল দেয়!
কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল পরীক্ষা। বখতিয়ারের তো পরীক্ষার ওপর রীতিমতো রাগই হচ্ছিল। নচ্ছার পরীক্ষাটা যেন কিছুতেই শেষ হতে চায় না!
আর আলীর কাছে এটি ছিল একপ্রকার গায়ের জ্বরের মতো। যত দ্রুত এই জ্বর কাটে, ততই যেন সে বাঁচে। রাইয়ানের অবশ্য পরীক্ষা নিয়ে তেমন কোনো চিন্তাই নেই।
দাদী আর তুপ্পির মায়াবী মুখের মতো গ্রামের শ্যামল-সবুজ রূপও বখতিয়ার ও আলীকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ, সবুজ বৃক্ষের সারি, নদীর বুকে পালতোলা নৌকা, ছায়াঘেরা পাখিডাকা মেঠোপথ, পথের ধারে ঝলমলে সরিষাফুলের ঢেউ, কলাই-কলমি লতার নীলাভ-সাদা ফুল, পুকুরভরা শাপলা, এমনকি কচুরিপানার ফুলও তাদের মুগ্ধ করে। এসব তো শহরের একঘেয়ে পরিবেশে কল্পনাও করা যায় না।
আর পুকুরে সাঁতার কাটা, মাছ ধরা, নৌকা চালানো কিংবা মাঠে-মেঠোপথে ছুটে বেড়ানোর আনন্দও তো বছরের এই কটা দিন ছাড়া তারা পায় না।
গ্রামের বাড়ি যেতে দুই ভাইয়ের সবচেয়ে প্রিয় বাহন হলো স্টিমার আর পালতোলা নৌকা। আজকাল সড়কপথেও দেশে যাওয়া যায়, কিন্তু সড়কপথের কোলাহল, যানজট আর কালো ধোঁয়া তাদের একেবারেই অপছন্দ। তাই প্রতি বছরই দেশে যাওয়ার সময় নদীপথে যাওয়ার জন্য তারা আগেভাগেই আব্বুকে বলে রাখে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বলা যায়, তাদের আগাম নোটিশ পেয়েই আব্বুকে স্টিমারের টিকিট কাটতে হয়েছে।
আসলে নদীপথে ভ্রমণের মজাই আলাদা। একদিকে সড়কপথের নানা বিড়ম্বনা থেকে বাঁচা যায়, অন্যদিকে নদীপথে ভ্রমণে উপভোগ করা যায় প্রকৃতি ও জীবনের অপার বৈচিত্র্য। নদীর তীরে গড়ে ওঠা হাট-বাজার, শহর-বন্দর, গ্রাম, জনপদ একের পর এক যেন চলমান চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
জেলেদের মাছ ধরা, ধানক্ষেতে কৃষকের ব্যস্ততা, নদীর ঘাটে কলসিতে পানি ভরতে আসা গ্রামীণ নারীরা, উঠোনে ধান শুকানো, ইটভাটা, কলকারখানার কর্মচাঞ্চল্য, ঘাটে মালামাল ওঠানামা, গয়না নৌকায় পণ্য পরিবহন, পালতোলা নৌকায় মাঝি-মাল্লাদের গান—সব মিলিয়ে যেন পুরো নদীমাতৃক রূপসী বাংলাকে একসঙ্গে দেখে ফেলা যায়।
আর গাঙচিলের উড়াউড়ির কথা তো বলাই হয়নি! জেলে নৌকায় ধরা জ্যান্ত ইলিশ যখন লাফিয়ে ওঠে আর তার রুপালি গায়ে সোনালি রোদের ঝিলিক পড়ে, তখন যে চোখধাঁধানো দৃশ্যের সৃষ্টি হয়, তা নদীভ্রমণ না করলে বোঝা যায় না।
সকালের বা দুপুরের নদীভ্রমণের আনন্দ একরকম। কিন্তু বিকেলে স্টিমার যখন মাঝনদীতে পৌঁছে যায়, তখন সৃষ্টি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতি। যতদূর চোখ যায়, শুধু জল আর জল। দূরের গ্রামগুলোকে মনে হয় দিগন্তে টানা কোনো কাজলরেখা। আকাশ যেন এসে মিশেছে নদীর তটরেখায়। উপরের বিশাল নীলাকাশ আর নিচের বিস্তৃত জলরাশি একাকার হয়ে গেছে। বিকেলে স্টিমার যখন মাঝনদীতে পৌঁছে যায়, তখন সৃষ্টি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতি। যতদূর চোখ যায়, শুধু জল আর জল। দূরের গ্রামগুলোকে মনে হয় দিগন্তে টানা কোনো কাজলরেখা। আকাশ যেন এসে মিশেছে নদীর তটরেখায়। উপরের বিশাল নীলাকাশ আর নিচের বিস্তৃত জলরাশি একাকার হয়ে গেছে। প্রকৃতির এই অপূর্ব রূপ ও রহস্য নদীপথে ভ্রমণ না করলে কি সত্যিই উপলব্ধি করা যায়?
বিকেলে চা-নাস্তা শেষে রাইয়ান, বখতিয়ার ও আলী যখন আব্বুর সঙ্গে স্টিমারের ডেকে রেলিং ধরে দাঁড়াল, তখন আকাশের রূপ দেখে তারা মুগ্ধ হয়ে গেল। বখতিয়ার তো তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইল পশ্চিম আকাশের দিকে।
সূর্য তখন ধীরে ধীরে হেলে পড়ছে। সাদা মেঘগুলো সুনীল আকাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সূর্য ডুবতে শুরু করতেই শুরু হলো রঙের এক অপূর্ব খেলা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাদা মেঘগুলো হলুদ ও কমলার মিশ্রণে নতুন রূপ ধারণ করল। এরপর সেই রঙ গাঢ় হয়ে লাল-কমলার আবেশে ছড়িয়ে পড়ল আকাশজুড়ে। তারপর ধূসর মেঘের গায়ে যেন কেউ লালচে রঙের প্রলেপ বুলিয়ে দিল। রহস্যময় রঙের জাদু ছড়িয়ে সূর্য ধীরে ধীরে দিগন্তের বুকে ডুবে যেতে লাগল।
নদীর বুকে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের সেই দৃশ্য দেখে দুই ভাইয়ের মুখ থেকে একসঙ্গে বেরিয়ে এল একটি শব্দ—“অপূর্ব!”
আলী বলল, “ঠিকই বলেছ ভাইয়া। আকাশের গায়ে রঙের এত নিপুণ আলপনা দেখে আমার মনে হচ্ছে, এ যেন কোনো মহান শিল্পীর আঁকা এক অনুপম শিল্পকর্ম।”
আব্বু মৃদু হেসে বললেন, “সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি তাঁর সৃষ্টিজগতকে আমাদের জন্য এত সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছেন।”এই সংস্করণে পুনরাবৃত্ত অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে, বানান ও যতিচিহ্ন সংশোধন করা হয়েছে, বাক্যপ্রবাহ মসৃণ করা হয়েছে এবং শিশুতোষ গল্পের আবেগ ও প্রকৃতিবর্ণনার সৌন্দর্য আরও উজ্জ্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন