রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬
খাদ্যে ভেজাল, রাসায়নিক প্রয়োগ ও সাপ্লাই চেইনে বিশৃঙ্খলা: হুমকির মুখে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
একটি দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা বিকাশের মূল ভিত্তি হলো নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য। বাংলাদেশ বিগত দশকগুলোতে খাদ্য উৎপাদনে, বিশেষ করে দানাদার শস্য উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। দেশ আজ চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবে খাদ্যের এই ‘লভ্যতা’ বা পরিমাণের দিক থেকে অগ্রগতি হলেও, ‘নিরাপত্তা’ ও ‘মান’-এর দিক থেকে দেশটি চরম সংকটের মুখোমুখি। খাদ্যে অনিয়ন্ত্রিত ভেজাল, যত্রতত্র ক্ষতিকারক রাসায়নিকের ব্যবহার এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনের দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা আজ বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে এক বড় ধরনের হুমকির মুখে দাঁড় করিয়েছে।
১. খাদ্যে ভেজাল: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক
বাংলাদেশের বাজারে এমন খুব কম খাদ্যপণ্যই আছে যা ভেজালের কবল থেকে মুক্ত। চাল, ডাল, তেল, মসলা থেকে শুরু করে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসে প্রতিনিয়ত ভেজাল মেশানো হচ্ছে।
নকল ও নিম্নমানের উপাদান: চা-পাতায় কাঠের গুঁড়ো বা ক্ষতিকর রং, মসলায় ইটের গুঁড়ো ও টেক্সটাইল ডাই, আর ভোজ্যতেলে সস্তা ও অখাদ্য পাম অয়েল বা খনিজ তেলের মিশ্রণ এখন ওপেন সিক্রেট।
দুধ ও মিষ্টিতে ভেজাল: তরল দুধের পরিমাণ বাড়াতে পানি মেশানোর পাশাপাশি স্টার্চ, ডিটারজেন্ট, ফরমালিন এবং সস্তা গুঁড়ো দুধের মিশ্রণ পাওয়া গেছে বিভিন্ন ল্যাবরেটরি পরীক্ষায়। ছানা ও মিষ্টি তৈরিতেও ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ের বিষাক্ত রং ও নিম্নমানের উপাদান।
এই ভেজাল মিশ্রিত খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী গ্যাস্ট্রিক, লিভার সিরোসিস, কিডনি বিকল হওয়া, হৃদরোগ এবং ক্যান্সারের মতো মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
২. রাসায়নিকের অবাধ ও অপপ্রয়োগ
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজারজাতকরণের প্রতিটি স্তরে রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার খাদ্যকে বিষাক্ত করে তুলছে।
কীটনাশকের অপব্যবহার: কৃষকেরা অজ্ঞতা বা অতিরিক্ত মুনাফার আশায় ফসলে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি কীটনাশক ব্যবহার করেন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, কীটনাশক প্রয়োগের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ফসল তোলা নিষেধ (উইথড্রয়াল পিরিয়ড), কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কীটনাশক ছিটানোর পরদিনই সেই সবজি বা ফসল বাজারে চলে আসে। ফলে বিষাক্ত রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ (Residue) মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
ফরমালিন ও কার্বাইড: মাছ ও মাংসে পচন রোধে ফরমালিন এবং ফলমূল (যেমন আম, কলা, পেঁপে) কৃত্রিম উপায়ে দ্রুত পাকানোর জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ব্যবহার দীর্ঘদিনের সমস্যা। যদিও ইদানীং নজরদারি কিছুটা বেড়েছে, তবুও এর আড়ালে নিত্যনতুন রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধ হয়নি।
ভারী ধাতুর উপস্থিতি: শিল্পবর্জ্য ও দূষিত পানির কারণে খাদ্যশৃঙ্খলে (বিশেষ করে মাছ, মুরগির মাংস এবং ডিমে) সিসা, ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর বিপজ্জনক উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে, যা শিশুদের মেধা বিকাশ ব্যাহত করছে এবং গর্ভবতী নারীদের জন্য চরম ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. সাপ্লাই চেইনে বিশৃঙ্খলা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য
খাদ্য নিরাপত্তা শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না, বরং উৎপাদিত পণ্য কীভাবে ভোক্তার থালায় পৌঁছাচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করে। বাংলাদেশের কৃষি বিপণন ও সরবরাহ শৃঙ্খল অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
কার্টেল বা সিন্ডিকেট: চাল, পেঁয়াজ, আলু বা ডালের মতো অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে প্রায়ই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। বড় বড় চাতাল মালিক, আমদানিকারক ও আড়তদারদের ‘সিন্ডিকেট’ বা কার্টেল বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান না, অথচ ভোক্তাকে চড়া দামে পণ্য কিনতে হয়।
সংরক্ষণাগার ও কোল্ড চেইনের অভাব: দেশে পর্যাপ্ত ও আধুনিক হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় প্রতিবছর উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলমূলের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ মাঠ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই পচে নষ্ট হয়ে যায়। এই বিপুল অপচয় খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে।
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও অব্যবস্থাপনা: দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে খাদ্যপণ্য পরিবহনের সময় মহাসড়কে ব্যাপক চাঁদাবাজির শিকার হতে হয় ট্রাক চালকদের। এই অতিরিক্ত খরচ পণ্যের মূল্যের সাথে যুক্ত হয়, যা কৃত্রিমভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয় এবং নিম্নবিত্ত মানুষের খাদ্য কেনার সক্ষমতা (Access to food) কমিয়ে দেয়।
উত্তরণের উপায় ও করণীয়
এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং একটি সমন্বিত ও কঠোর নীতিমালার বাস্তবায়ন প্রয়োজন:
১. আইনের কঠোর প্রয়োগ: ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ এবং ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন’ এর অধীন গঠিত সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা আরও বাড়াতে হবে। ভেজালকারী ও সিন্ডিকেটের হোতাদের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা না করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি (কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের জরিমানা) নিশ্চিত করতে হবে।
২. নিয়মিত বাজার ও ল্যাব মনিটরিং: ভ্রাম্যমাণ আদালতের (মোবাইল কোর্ট) সংখ্যা বাড়াতে হবে। শুধু উৎসব-পার্বণে নয়, বছরজুড়ে কাঁচাবাজার, সুপারশপ এবং উৎপাদন কেন্দ্রে আধুনিক ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে খাদ্যের মান পরীক্ষা নিশ্চিত করা দরকার।
৩. কৃষকদের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ: গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (GAP) বা উত্তম কৃষি চর্চা নিশ্চিত করতে কৃষকদের জৈব কীটনাশক ব্যবহার এবং রাসায়নিকের সঠিক মাত্রার ওপর ব্যাপক প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
৪. সাপ্লাই চেইন আধুনিকীকরণ: মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরাসরি ‘কৃষক থেকে ভোক্তা’ (Farm to Fork) মডেল বা ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া, দেশের প্রতিটি অঞ্চলে আধুনিক হিমাগার এবং কোল্ড চেইন লজিস্টিকস তৈরি করা জরুরি।
৫. ভোক্তা সচেতনতা: সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। অতিরিক্ত চকচকে চাল বা কৃত্রিমভাবে পাকা সুন্দর ফল বর্জন করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
উপসংহার
খাদ্য নিরাপত্তা মানে কেবল পেট ভরে খেতে পাওয়া নয়, বরং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা। খাদ্যে ভেজাল এবং সাপ্লাই চেইনের বিশৃঙ্খলাকে যদি এখনই কঠোর হস্তে দমন করা না যায়, তবে দেশ এক অসুস্থ ও মেধাহীন প্রজন্মের দিকে ধাবিত হবে। একটি সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে সরকারকে জরুরি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাদ্য খাতের এই ত্রিমুখী সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন