শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

পানির বিষ্ময়কর রহস্য

একদিন দুপুরবেলা স্কুল থেকে ফিরে রূপম খুব ক্লান্ত হয়ে এক গ্লাস পানি খেলো। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে গ্লাসের নিচে একটুখানি পানি রেখেই সে টেবিলের ওপর রেখে দিল। তা দেখে তাদের দাদু এসে রূপমকে আদর করে বললেন, "দাদুভাই, এই যে এক চুমুক পানি তুমি অবহেলা করে রেখে দিলে, তুমি কি জানো এই পানি কত মূল্যবান এবং এর মধ্যে লুকিয়ে আছে কত রহস্য? রূপম আর তুলি দুজনেই অবাক হয়ে দাদুর দিকে তাকাল। তুলি চোখ বড় বড় করে বলল, "পানির আবার কী রহস্য দাদু? এটা তো আমরা রোজ খাই, হাত-মুখ ধুই!" দাদু হেসে বললেন, "তাহলে শোনো পানির বিষ্ময়কর রহস্যের গল্প। আজ থেকে অনেক বছর আগে রাশিয়ার একজন মস্ত বড় বিজ্ঞানী ছিলেন, নাম মেন্ডেলিফ। তিনি পৃথিবীর সব উপাদান নিয়ে একটা নিয়মের ছক তৈরি করেছিলেন। বিজ্ঞানের সেই নিয়ম অনুযায়ী, পানির যে ওজন, সেই হিসেবে পানির কিন্তু তরল থাকারই কথা ছিল না! সামান্য গরমেই সব পানি গ্যাস হয়ে উড়ে যাওয়ার কথা ছিল।" রূপম ভুরু কুঁচকে বলল, " "উড়ে যেত? তাহলে তো নদী-নালা, সাগর-মহাসাগর কিচ্ছু থাকত না!,আরেকটু বুঝিয়ে বলো তো দাদু!" দাদু বললেন, "পানির সমগোত্রীয় হওয়া সত্ত্বেও অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন সালফাইড কিন্তু পানির মত তরল না, সেগুলো সাধারণ তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অবস্থায় বিরাজমান থাকে। এছাড়া পানির সমগোত্রীয় একই ধরনের যত রকমের গ্যাসীয় উপাদান আছে—যেমন হাইড্রোজেন সালফাইড বা হাইড্রোজেন ফ্লোরাইড—তারা সবাই খুব কম তাপমাত্রায় উবে যায়। কিন্তু পানি সেটা করতে পারে না। এর ভেতরে আছে এক অদৃশ্য 'হাইড্রোজেন চেইন', যা পানিকে সহজে উড়ে যেতে দেয় না। আর পানি তরল থাকে বলেই সাগরে বড় বড় জাহাজ ভেসে বেড়াতে পারে।" তুলি হাততালি দিয়ে বলল, "বাহ্! তাহলে তো খুব ভালো!" দাদু বললেন, "আসলে এটা সৃষ্টিকর্তার এক নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ এবং মানুষ সহ পৃথিবীর সব প্রাণী, গাছপালা, সৃষ্টি জগতের প্রতি তাঁর অসীম দয়ার নিদর্শন। তুলি বলল, "আল্লাহকে অনেক ধন্যবাদ।" দাদু বললেন, "শুধু কি তাই? পানির আরও একটা রহস্য আছে। শীতের দেশে যখন খুব ঠান্ডা পড়ে, তখন চারপাশের সব পানি বরফ হয়ে যায়। আচ্ছা রূপম, ভারী জিনিস নিচে যায় নাকি হালকা জিনিস?" রূপম চট করে উত্তর দিল, "ভারী জিনিস নিচে যায়।" দাদু বললেন, "হ্যাঁ, এটাই নিয়ম। কিন্তু পানি যখন বরফ হয়, তখন সে হালকা হয়ে যায় আর পানির ওপর ভেসে ওঠে! আর বরফ হওয়ার সময় সে নিজের ভেতর থেকে গরম তাপমাত্রা বা সুপ্ততাপ বের করে দেয়। ফলে কী হয় জানো? ওপরের দিকে বরফ জমে শক্ত হয়ে গেলেও, নিচের পানিটুকু গরম থাকে। আর সেই জাদুর চাদরের নিচে সাগরের মাছ আর জলজ প্রাণীরা মনের সুখে সাঁতার কাটে, ঠান্ডায় মরে যায় না। পানি যদি এই জাদুটা না দেখাত, তবে পুরো পৃথিবী একটা আস্ত বরফের টুকরো হয়ে যেত আর কোনো জীবন থাকত না।" রূপম আর তুলি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাদুর কথা শুনছিল। দাদু এবার রূপমের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "পবিত্র কোরআনেও এই পানির কথা বলা হয়েছে। স্রষ্টা যদি এই পানিকে আমাদের থেকে কেড়ে নেন বা অদৃশ্য করে দেন, তবে পৃথিবীর কোনো বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি দিয়ে আমরা আর এক ফোঁটা পানিও তৈরি করতে পারব না। আমাদের শরীর বলো আর গাছের শরীর বলো, সবকিছুর প্রাণ এই পানি। তাই পানি হলো আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় দয়া আর আশীর্বাদ।" দাদুর কথা শুনে রূপম টেবিলের দিকে তাকাল। সেই এক চিমটি উচ্ছিষ্ট পানিকে এখন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী হিরের টুকরোর মতো মনে হলো। সে গ্লাসটা তুলে নিয়ে বাকি পানিটুকু খেয়ে নিল আর মনে মনে বলল, "আল্লাহকে ধন্যবাদ, আমাদেরকে পানির মতো এত সুন্দর একটা উপহার দেওয়ার জন্য!" গল্পের শিক্ষা: প্রকৃতিতে পানির প্রতিটি ফোঁটা এক একটি অলৌকিক নিদর্শন। পানির অপচয় করা মোটেও উচিত নয়, কারণ পানি ছাড়া পৃথিবীতে জীবনের কোনো অস্তিত্বই থাকত না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন