শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬
আবু লাহাবের পরিণাম
আবু লাহাব ছিল আল্লাহর রাসূল (সা)-এর আপন চাচা, কিন্তু তার অন্তর ছিল হিংসা ও শত্রুতায় পুড়ছিল। সে ছিল **হুযুরের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রতিবেশী**। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বাড়ির দরজায় ময়লা-আবর্জনা ও নাড়িভুঁড়ি ফেলে রাখা ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। শুধু তাই নয়, তার ইন্ধনে **তার স্ত্রী উম্মে জামিল** বুনো কাঁটা সংগ্রহ করে এনে রাতের অন্ধকারে আল্লাহর রাসূল (সা) যে পথ দিয়ে হাঁটতেন, সেখানে বিছিয়ে রাখত। কিন্তু এত কষ্টের মাঝেও রহমতুল্লিল আলামিনের ধৈর্যের কোনো কমতি ছিল না।
দাওয়াতি কাজে আবু লাহাবের বৈরিতা ছিল সব সীমা ছাড়ানো। যখনই আল্লাহর রাসূল (সা) মক্কার বাজারে বা দূর থেকে আসা হাজীদের তাঁবুতে গিয়ে তাওহীদের দাওয়াত দিতেন, আবু লাহাব পেছন পেছন গিয়ে চিৎকার করে বলত, *"হে লোকসকল! ও তো উন্মাদ, ও মিথ্যাবাদী! তোমরা ওর কথা শুনো না।"* আপন চাচার মুখে এমন কথা শুনে আরবরা দ্বিধায় পড়ে যেত। তারা ভাবত, ঘরের মানুষই যখন মানছে না, তখন নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে। **ইসলামী দাওয়াতের কাজে তার এই বিরোধিতা এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল**, যা নবাগতদের মনে সন্দেহের বীজ বুনে দিত।
আবু লাহাবের শত্রুতা শুধু মক্কার অলিতে-গলিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা আঘাত করেছিল রাসূল (সা)-এর পারিবারিক জীবনেও। আল্লাহর রাসূল (সা)-এর দুই কন্যা, হযরত রুকাইয়্যা (রা) ও হযরত উম্মে কুলসুম (রা)-এর বিয়ে হয়েছিল আবু লাহাবের দুই ছেলে উতবা ও উতাইবার সাথে। ইসলাম প্রচার শুরু হতেই আবু লাহাব চরম ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং **তার কন্যাদের তালাক দিতে নিজের পুত্রদের বাধ্য করে**। সে বলেছিল, *"মুহাম্মদের কন্যাদের বিদায় না করলে তোমাদের সাথে আমার সম্পর্ক শেষ।"*
তার নিষ্ঠুরতা এখানেই থেমে থাকেনি। যখন আল্লাহর রাসূল (সা)-এর শিশুপুত্র কাসেম ও আবদুল্লাহ একে একে ইন্তেকাল করেন, তখন পুরো মক্কা যখন স্তব্ধ, আবু লাহাব তখন আনন্দে মেতে ওঠে। **নবী পুত্রের মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ করে** সে মক্কার কাফেরদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে, *"মুহাম্মদ তো নির্বংশ (আবতার) হয়ে গেছে! তার নাম নেওয়ার আর কেউ রইল না।"*
এমনকি যখন গোটা কুরাইশ বংশ বনু হাশিমকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করে **'শিয়াবে আবি তালেব' নামক গিরিসঙ্কটে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল**, তখনো আবু লাহাবের রক্ত চাঙ্গা হয়ে ওঠেনি। ক্ষুধার তাড়নায় যখন অবরুদ্ধ শিশুরা গাছের পাতা চিবিয়ে কাঁদছিল, তখন আবু লাহাব মক্কার বাজারে গিয়ে ব্যবসায়ীদের বলত, *"তোমরা খাবারের দাম এত বাড়িয়ে দাও যেন মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীরা তা কিনতে না পারে। তোমাদের যা ক্ষতি হবে, তা আমি পুষিয়ে দেব।"* আপন গোত্রের এই চরম বিপদে সে কাফেরদের সাথে হাত মিলিয়েছিল।
### ঐশ্বরিক ঘোষণা ও অবমাননাকর পরিণতি
আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর এই সীমাহীন অত্যাচারের জবাব স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অবতীর্ণ করলেন। সূরা লাহাব (আল-মাসাদ) নাজিল হলো:
> *"আবু লাহাবের হাত ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও... শীঘ্রই সে প্রবেশ করবে লেলিহান আগুনে এবং তার স্ত্রীও—যে লাকড়ি বহনকারী, তার গলায় থাকবে খেজুর পাতার পাকানো রশি।"*
>
এই সূরা নাজিল হওয়ার পর আবু লাহাবের অহংকার আরও বেড়ে যায়, কিন্তু আল্লাহর বাণী তো অমোঘ। বদর যুদ্ধের সময় আবু লাহাব নিজে যুদ্ধে না গিয়ে তার পরিবর্তে অন্য একজনকে পাঠায়। কিন্তু বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের শোচনীয় পরাজয় এবং আবু জাহেলসহ মক্কার বড় বড় নেতাদের মৃত্যুর খবর যখন মক্কায় পৌঁছাল, আবু লাহাবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
ঠিক তার পরপরই আবু লাহাব এক মারাত্মক ও সংক্রামক চর্মরোগে (عدسة - এক ধরণের প্লেগ বা গুটিবসন্তের মতো রোগ) আক্রান্ত হলো। তার পুরো শরীর পচতে শুরু করল এবং গা থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হতে লাগল। রোগটি ছড়ানোর ভয়ে তার নিজের সন্তান ও পরিবারের লোকেরাও তাকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করল। মক্কার এক কোণে একাকী, ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে অত্যন্ত পৈশাচিক ও অবমাননাকরভাবে তার মৃত্যু হলো।
তার মৃত্যুর পর তিন দিন পর্যন্ত তার লাশ ঘরেই পড়ে রইল, কেউ ছুঁতেও সাহস পেল না। তীব্র দুর্গন্ধে যখন পুরো এলাকা অতিষ্ঠ হয়ে উঠল, তখন লোকলজ্জার ভয়ে তার ছেলেরা কিছু হাবশী গোলাম ভাড়া করল। তারা দূর থেকে লাঠি দিয়ে ঠেলে ঠেলে আবু লাহাবের লাশটিকে একটি গর্তে ফেলল এবং দূর থেকে পাথর ছুড়ে ছুড়ে লাশটি মাটি ও পাথরের নিচে চাপা দিল।
### উপসংহার
যে আবু লাহাব নিজেকে মক্কার প্রভাবশালী ও সম্পদশালী ভাবত, যার অহংকারে আল্লাহর জমিন কেঁপে উঠত, দুনিয়াতেই তার পরিণতি হয়েছিল চরম অসম্মানজনক ও ঘৃণ্য। আর তার স্ত্রী উম্মে জামিলও একদিন গলায় রশি পেঁচানো অবস্থায় পাহাড়ের পাথরে দম আটকে মারা যায়।
আবু লাহাবের এই গল্প ইতিহাসের পাতায় চিরকাল এই সাক্ষ্যই দেয় যে—সত্যের আলো নেভানোর চেষ্টা যারাই করবে, ক্ষমতা বা বংশমর্যাদা তাদের বাঁচাতে পারবে না; বরং তাদের কপালে জুটবে দুনিয়া ও আখিরাতের চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন