বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

বিস্ময়কর বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা

নিকোলা টেসলা ছিলেন বিজ্ঞানের জগতের এমন এক 'পাগলাটে জাদুকর', যার কাহিনী শুনলে মনে হবে কোনো সায়েন্স ফিকশন মুভির গল্প পড়ছ। চলো, আজ আমরা টেসলার জীবনের সেইসব অদ্ভুত, মজার আর অবিশ্বাস্য ঘটনার গভীরে ডুব দিই। ১. বজ্রপাতের রাতে জন্ম গল্পটা শুরু হয় ১৮৫৬ সালের এক ভয়ংকর ঝড়ের রাতে। বর্তমান ক্রোয়েশিয়ায় তখন আকাশ ফেটে বজ্রপাত হচ্ছিল। মাঝরাতে যখন টেসলা জন্ম নিলেন, ধাত্রী ভয় পেয়ে বলেছিলেন, "এই শিশু হবে অন্ধকারের সন্তান।" কিন্তু টেসলার মা গর্জে উঠে বলেছিলেন, "না, সে হবে আলোর সন্তান।" সত্যিই, বড় হয়ে টেসলা সারা পৃথিবীকে বৈদ্যুতিক আলোয় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। ২. সেই বিড়াল আর বিদ্যুতের প্রথম পাঠ ছোট্ট টেসলার সেরা বন্ধু ছিল তাঁর পোষা বিড়াল 'ম্যাকাক'। একদিন সন্ধ্যায় টেসলা যখন ম্যাকাকের পিঠে হাত বোলাচ্ছিলেন, হঠাৎ দেখলেন বিড়ালের লোমের ওপর দিয়ে নীল রঙের ছোট ছোট স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে বেরোচ্ছে! তিনি অবাক হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন এটা কী। বাবা বললেন, "এটা বিদ্যুৎ, যা আমরা বজ্রপাতের সময় আকাশে দেখি।" টেসলা সেদিনই ঠিক করেছিলেন, তিনি সারাজীবন এই বিদ্যুৎ নিয়ে খেলা করবেন। ৩. মাথায় আস্ত একটা ল্যাবরেটরি টেসলার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল। তিনি কোনো যন্ত্রের কথা চিন্তা করলে সেটা তাঁর চোখের সামনে ত্রিমাত্রিক (3D) ছবির মতো দেখতে পেতেন। তাঁকে কোনো নকশা কাগজে আঁকতে হতো না। তিনি মনের ভেতর যন্ত্রটা চালাতেন এবং দেখতেন কোথায় সমস্যা হচ্ছে। একবার তো তিনি মনে মনেই একটা ইঞ্জিন চালিয়ে কয়েক সপ্তাহ রেখে দিয়েছিলেন, শুধু দেখার জন্য যে সেটার কোনো পার্ট ক্ষয়ে যায় কি না! ৪. এডিশন বনাম টেসলা: লড়াই যখন চরমে তরুণ টেসলা যখন আমেরিকায় এলেন, তাঁর পকেটে ছিল মাত্র ৪ সেন্ট আর একটা সুপারিশপত্র। তিনি কাজ শুরু করলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিশনের কোম্পানিতে। এডিশন ব্যবহার করতেন 'ডিসি' (Direct Current) বিদ্যুৎ, যা খুব দূরে পাঠানো যেত না। টেসলা প্রস্তাব দিলেন 'এসি' (Alternating Current) বিদ্যুতের, যা মাইলের পর মাইল পাঠানো সম্ভব। এডিশন তাঁকে চ্যালেঞ্জ করে বললেন, "যদি তুমি আমার জেনারেটর উন্নত করতে পারো, তবে তোমাকে ৫০ হাজার ডলার দেবো।" টেসলা দিনরাত এক করে কাজটা সফলভাবে করলেন। কিন্তু যখন টাকা চাইলেন, এডিশন হেসে বললেন, "টেসলা, তুমি আমেরিকান কৌতুক বোঝো না!" অপমানিত টেসলা সাথে সাথে চাকরি ছেড়ে দিলেন। শুরু হলো 'কারেন্ট ওয়ার' বা বিদ্যুতের যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত টেসলার 'এসি' বিদ্যুৎই জয়ী হলো, যা আজও আমাদের ঘরে ঘরে জ্বলে। ৫. পকেটে ভূমিকম্প! নিউইয়র্কে টেসলার একটা ল্যাবরেটরি ছিল। একদিন তিনি একটা ছোট্ট যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন যা কম্পন তৈরি করে। তিনি যন্ত্রটা চালু করে একটা লোহার পিলারের সাথে লাগিয়ে দিয়ে কাজে মন দিলেন। কিছুক্ষণ পর পুরো বিল্ডিং কাঁপতে শুরু করল! আশেপাশের মানুষ ভাবল ভূমিকম্প হচ্ছে। পুলিশ আসার আগেই টেসলা একটা হাতুড়ি দিয়ে যন্ত্রটা ভেঙে ফেললেন। পরে তিনি মজা করে বলেছিলেন, "আমি চাইলে এই ছোট্ট যন্ত্র দিয়ে আস্ত একটা সেতু বা এমনকি এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংও ধসিয়ে দিতে পারতাম!" ৬. তার ছাড়াই বিদ্যুৎ পাঠানো টেসলার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল 'ওয়ারলেস পাওয়ার'। তিনি চেয়েছিলেন কোনো তার ছাড়াই সারা পৃথিবীর মানুষ বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পাবে। এজন্য তিনি কলোরাডোতে বিশাল এক টাওয়ার বানিয়েছিলেন। সেখানে তিনি কৃত্রিম বজ্রপাত তৈরি করতেন যা ১৩৫ ফুট দূর পর্যন্ত যেত। সেই বজ্রপাতের শব্দে ১৫ মাইল দূরের মানুষ পর্যন্ত চমকে উঠত! যদিও টাকার অভাবে তাঁর এই প্রজেক্ট শেষ হয়নি, কিন্তু আজ আমরা যে ওয়াই-ফাই (Wi-Fi) বা রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার করি, তার মূলে ছিল টেসলার সেই চিন্তা। ৭. অদ্ভুত সব স্বভাব আর সংখ্যা '৩' টেসলা মানুষটা যেমন মেধাবী ছিলেন, তেমনি ছিলেন খ্যাপাটে। তাঁর কিছু অদ্ভুত নিয়ম ছিল: * তিনি যে কোনো বিল্ডিংয়ে ঢোকার আগে সেটাকে তিনবার প্রদক্ষিণ করতেন। * খাওয়ার সময় তিনি ১৮টি রুমাল ব্যবহার করতেন প্লেট আর চামচ মুছতে। * তিনি তিন দিয়ে ভাগ করা যায় না এমন কোনো রুমে থাকতেন না (যেমন হোটেল রুম নম্বর ৩০৩)। * তিনি মুক্তার গয়না একদম সহ্য করতে পারতেন না। কেউ মুক্তার দুল পরে থাকলে তিনি তাঁর সাথে কথাই বলতেন না! ৮. পায়রাদের সাথে মিতালী জীবনের শেষ দিকে টেসলা খুব একা হয়ে গিয়েছিলেন। মানুষের চেয়ে তিনি পায়রাদের বেশি ভালোবাসতেন। প্রতিদিন পার্কে গিয়ে পায়রাদের খাওয়াতেন। এমনকি একটি বিশেষ সাদা পায়রাকে তিনি এতটাই ভালোবাসতেন যে বলতেন, "আমি যেমন পায়রাটিকে ভালোবাসি, সেও আমাকে তেমন ভালোবাসে।" যখন সেই পায়রাটি মারা যায়, টেসলা বলেছিলেন যে তাঁর জীবনের আলো নিভে গেছে। ৯. দূরদ্রষ্টা টেসলা ১৯২৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে টেসলা বলেছিলেন, "ভবিষ্যতে এমন একটা যন্ত্র আসবে যা আমরা পকেটে নিয়ে ঘুরব এবং সারা বিশ্বের মানুষের সাথে ভিডিও কলে কথা বলতে পারব।" তখনকার মানুষ এটা শুনে হেসেছিল, কিন্তু আজ আমাদের হাতের স্মার্টফোনটি ঠিক তেমনই, যা টেসলা ১০০ বছর আগেই কল্পনা করেছিলেন! আজকের ডিজিটাল যুগে আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যা কিছু করি, তার প্রায় প্রতিটা পদক্ষেপে নিকোলা টেসলার ছোঁয়া রয়েছে। আমরা হয়তো অনেক সময় তাঁর নাম নিই না, কিন্তু তাঁর তৈরি প্রযুক্তি ছাড়া আমাদের আধুনিক জীবন এক মুহূর্তও চলবে না। চলো দেখে নিই, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টেসলার কোন কোন আবিষ্কার আমরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছি: ১. ঘরের এসি, ফ্রিজ আর ফ্যান (অল্টারনেটিং কারেন্ট বা AC) তুমি যখনই ঘরের কোনো সুইচে চাপ দিয়ে ফ্যান, এসি, ফ্রিজ কিংবা কম্পিউটার চালাচ্ছ, তখনই তুমি টেসলার সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটি ব্যবহার করছ। একে বলে “AC বা অল্টারনেটিং কারেন্ট”। টেসলার এই আবিষ্কারের ফলেই শত শত মাইল দূর থেকে পাওয়ার গ্রিডের মাধ্যমে খুব সহজে এবং কম খরচে আমাদের ঘরে বিদ্যুৎ চলে আসে। যদি টেসলা এটি আবিষ্কার না করতেন, তবে প্রতি এক কিলোমিটার পর পর একটা করে বড় পাওয়ার স্টেশন বসাতে হতো! ২. স্মার্টফোন ও ওয়াই-ফাই (তারবিহীন যোগাযোগ) আমরা যে পকেটে স্মার্টফোন নিয়ে ঘুরি, মেসেজ পাঠাই কিংবা তার ছাড়াই ওয়াই-ফাই (Wi-Fi) ব্যবহার করে ইন্টারনেট চালাই—এর মূল আইডিয়াটা ছিল টেসলার। ১৯০১ সালেই তিনি বলেছিলেন, এমন একটা দিন আসবে যখন মানুষ তার ছাড়াই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছবি, গান আর কথা পাঠাতে পারবে। রেডিও তরঙ্গের (Radio Wave) ওপর তাঁর করা গবেষণাই আজকের মোবাইল নেটওয়ার্কের ভিত্তি। ৩. রিমোট কন্ট্রোল (টিভি ও খেলনা গাড়ি) সোফায় শুয়ে রিমোট টিপে টিভির চ্যানেল বদলানো কিংবা রিমোট দিয়ে ড্রোন ও খেলনা গাড়ি ওড়ানো—এসবই সম্ভব হয়েছে টেসলার কারণে। ১৮৯৮ সালে তাঁর সেই 'জাদুর নৌকা'র গল্প তো আগেই শুনেছ! দূর থেকে কোনো তার ছাড়া যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার এই প্রযুক্তি তিনিই প্রথম পৃথিবীকে দেখিয়েছিলেন। ৪. নিয়ন ও এলইডি লাইট (আধুনিক আলো) দোকানের বাইরে বা রাস্তায় আমরা যে সুন্দর সুন্দর নিয়ন সাইনবোর্ড বা ফ্লুরোসেন্ট লাইট জ্বলতে দেখি, তা টেসলার ল্যাবরেটরিতেই প্রথম তৈরি হয়েছিল। তিনি প্রচলিত বাল্বের চেয়ে অনেক কম বিদ্যুতে কীভাবে বেশি আলো তৈরি করা যায়, সেই রাস্তা দেখিয়েছিলেন, যা আজ আমাদের এলইডি (LED) লাইটের যুগে নিয়ে এসেছে। ৫. এক্স-রে (X-Ray) আমাদের শরীরে কোথাও চোট লাগলে বা হাড় ভেঙে গেলে ডাক্তাররা যে এক্স-রে করতে বলেন, সেই এক্স-রে প্রযুক্তির শুরুর দিকের গবেষণায় টেসলার বড় অবদান ছিল। তিনি নিজের হাতের এক্স-রে ছবি তুলেছিলেন এবং এই রশ্মিটি যে শরীরের ভেতরের ছবি তুলতে পারে, তা নিয়ে বিজ্ঞানী রন্টজেনকে সাহায্য করেছিলেন। ৬. হাইড্রো-ইলেকট্রিক পাওয়ার (পানি থেকে বিদ্যুৎ) নায়াগ্রা জলপ্রপাতের নাম নিশ্চয়ই শুনেছ? সেই বিশাল জলপ্রপাতের পানির স্রোতকে কাজে লাগিয়ে পৃথিবীর প্রথম বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করেছিলেন নিকোলা টেসলা। আজ কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সারা বিশ্বে পানি থেকে যে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ তৈরি হয়, তার শুরুটা টেসলাই করেছিলেন। ৭. টেসলা গাড়ি (বৈদ্যুতিক মোটর) আজকাল রাস্তায় যে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ি (Electric Cars) চলছে—যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত কোম্পানির নামই 'Tesla'—তা কিন্তু টেসলার তৈরি “ইন্ডাকশন মোটর (Induction Motor)” দিয়ে চলে। টেসলা ১০০ বছরেরও বেশি সময় আগে যে মোটরের নকশা করেছিলেন, আজ আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়িগুলো সেই একই নিয়মে চলে! একটি মজার তথ্য: আজ আমরা ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য যে “ওয়্যারলেস চার্জার” (প্যাডের ওপর ফোন রাখলেই চার্জ হয়) ব্যবহার করি, তা কিন্তু টেসলার সেই তারবিহীন বিদ্যুৎ পাঠানোর স্বপ্নেরই একটা ছোট্ট রূপ! নিকোলা টেসলা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে আমাদের হাতের স্মার্টফোন, ড্রোন আর বৈদ্যুতিক গাড়ি দেখে নিশ্চয়ই মুচকি হাসতেন আর বলতেন, “দেখেছ? আমি তো ১০০ বছর আগেই তোমাদের এই ভবিষ্যতের কথা বলেছিলাম!” বিদায় এক মহান বিজ্ঞানীর ১৯৪৩ সালে নিউইয়র্কের একটি হোটেল রুমে এই মহান বিজ্ঞানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর কাছে কোনো টাকা ছিল না, কারণ তিনি তাঁর সব পেটেন্ট বা আবিষ্কারের স্বত্ব মানুষকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন যাতে বিদ্যুৎ সস্তা হয়। তিনি টাকার পেছনে ছোটেননি, ছুটেছেন জ্ঞানের পেছনে। উপসংহার: নিকোলা টেসলা আমাদের শিখিয়েছেন যে, লোকে পাগল বললেও নিজের স্বপ্নের ওপর বিশ্বাস রাখা উচিত। আজ আমরা যে বাল্ব জ্বালাই, যে রিমোট দিয়ে টিভি চালাই বা যে স্মার্টফোনে কথা বলি—তার প্রতিটা স্পন্দনে মিশে আছে এই 'বিদ্যুতের জাদুকর'-এর ছোঁয়া।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন